• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • আলো-অন্ধকারে যাই ( purano lekhaa; sa`mraxaNer jonye tolaa)

    Ranjan Roy
    বিভাগ : ব্লগ | ১০ আগস্ট ২০১৬ | ৪৬৬ বার পঠিত
  • আলো-অন্ধকারে যাই ============================
    ( এটি নেহাতই গপ্পো; এখানে যদি কোন ঘটনা বা কারো নাম দেখে আপনাদের পরিচিত কাউকে মনে পড়ে তো জানবেন তা নেহাৎই কাকতালীয়।)

    এক
    ----
    ট্রেন একটা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অনেকক্ষণ থেমে আছে। কিন্তু হরিদাস পালের চোখে যেন আঠা লেগে আছে, খুলতেই চাইছে না। এসি-থ্রির কোমল ঠান্ডায় শেষরাতের জম্পেশ ঘুম আর কি কি সব আহ্লাদী স্বপ্ন! ও আরেকবার কম্বলটা ভাল করে টেনে নিল। কিন্তু কামরার মধ্যে আলো বড় বেশি, আর লোকজনের কথাবার্তা যেন বেড়েই চলেছে। এই সাতসকালে কেন যে লোকে এত কথা বলে!
    নাঃ, এত শব্দদূষণের মধ্যে ঘুমোয় কার সাধ্যি! এবার আধশোয়া অবস্থায় একটু মাথা তুলে সামনের বার্থের ইয়ং ছেলেটিকে জিগ্যেস করলো--- ভাইজি, ইয়ে কৌন সা স্টেশন হ্যায়?
    -- দেহরাদুন, আংকল। আপ উতরোগে নেহি ক্যা? গাড়ি তো আগে নেহি যায়েগী। উঠিয়ে, সুটকেস প্যাক কীজিয়ে। করীব বিশ মিনিট হো গয়া।
    অ্যাঁ, ছোকরা বলে কি! দেহরাদুন এসে গেছে। ও তাড়াতাড়ি সুটকেস গুছিয়ে নেয়। কাঁধে তোলে একটি ব্যাগ, আর প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ে।
    সকাল ছ'টা বাজে, আগস্ট মাসের ময়লা আকাশ, টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। এই দেহরাদুন স্টেশন?
    -- আংকল, আপ মেরে সাথ চলিয়ে। আপ ভী মুসৌরি যায়েংগে না?
    অগত্যা হরিদাস পাল ঘুমচোখে একটি অ্যামবাসাডরে গিয়ে বসে। ট্যাক্সিটি রোজকার বিভিন্ন খবরের কাগজ মুসৌরিতে ডিলারের কাছে পৌঁছয়। পথে ফুরনে কিছু পকেট মানি কামিয়ে নেয়। সামনে ড্রাইভারের পাশে একজন মহিলা টিচার, মুসৌরিতে কোন স্কুলে পড়ান ও সেই সহযাত্রী যুবক। পেছনের সীটে হরিদাস পাল ও এক নিউজিল্যান্ড বাসী ডাক্তারদম্পত্তি। মুসৌরিতে কোন ক্রিশ্চিয়ান চ্যারিটেবল হাসপাতালে দু'বছরের জন্যে করসেবা করতে এসেছেন। মাঝবয়সী ডাক্তার দম্পত্তি দশবছরের ছোটবাচ্চাকে দিদিমার কাছে রেখে এসেছেন; কিন্তু মায়ের মন একটু কাঁদো-কাঁদো।
    অবশেষে ট্যাক্সি শহর ছেড়ে পাকদন্ডী পথ ধরে মুসৌরির রাস্তায় উঠতে শুরু করলো।

    এখানে ও এসেছিল প্রায় বত্রিশ বছর আগে, চাকরি জীবনের শুরুতে, স্টেট ব্যাংকের ট্রেনিং সেন্টারে। সেইসময় আটসপ্তাহ ট্রেনিংয়ের ফাঁকে ওরা প্রতি রোববার মুসৌরি যেত ঘুরতে। আর কিমাশ্চর্যমতঃপরম্! আজ চাকরিজীবনের সায়াহ্নে আর এক ট্রেনিং করতে ও মুসৌরির কাছে কেমটি ভিলেজ যাচ্ছে, অবশ্য এটি ব্যাংকের ট্রেনিং নয়।
    গাড়ির মধ্যে সবাই কথা বলছে। হরিদাস পাল জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখচে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি আর মেলাতে চেষ্টা করছে ফিকে হয়ে আসা পুরনো ছবিগুলোর সঙ্গে বর্তমানকে। নাঃ দেহরাদুন হারিয়ে ফেলেছে তার প্রিস্টাইন বিউটি। উত্তরাঞ্চলের রাজধানীটি এখন অনেক ঘিঞ্জি। সেই ঘন্টা ঘর বাজার আর রাস্তায় পথচলতি হাসিখুশি তরুণীর দল! যাদের জন্যে ছত্তিশগড় থেকে আসা সঙ্গীরা এই রাস্তাটির নাম দিয়েছিল-- বুকের ধুকধুকি বা খালিশ হিন্দিতে "" দিল ধড়কন্ রোড্''। কোথায় সেসব? আজ এ তো হিন্দিবলয়ের যে কোন শহরের প্যাটার্ণে গড়ে ওঠা আইডেন্টিটিবিহীন এক জনপদ! মরুকগে, মুসৌরিতে গেলে নিশ্চয়ই এই একঘেয়েমির বাইরে কিছু পাওয়া যাবে।
    হ্যাঁ, পাকদন্ডী রাস্তাটি আগের মতই, কিন্তু জঙ্গল একটু ফিকে, বেশ কয়েকটি হোটেল আর রেসিডেনশিয়াল স্কুল গড়ে উঠেছে যে!
    বৃষ্টির ছাঁট আসছে, ও কাঁচ নামিয়ে দিয়ে সহযাত্রীদের দিকে ফেরে।
    আজ চাকরিজীবনের সায়াহ্নে ও আর এক ট্রেনিং করতে যাচ্ছে মুসৌরির কাছে কেমটি ভিলেজ, অবশ্য এটি ব্যাংকের ট্রেনিং নয়।
    গাড়ির মধ্যে সবাই কথা বলছে। হরিদাস পাল জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখছে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি আর মেলাতে চেষ্টা করছে ফিকে হয়ে আসা পুরনো ছবিগুলোর সঙ্গে বর্তমানকে।
    নাঃ দেহরাদুন হারিয়ে ফেলেছে তার প্রিস্টাইন বিউটি। উত্তরাঞ্চলের রাজধানীটি এখন অনেক ঘিঞ্জি।
    সেই ঘন্টা ঘর বাজার আর রাস্তায় পথচলতি হাসিখুশি তরুণীর দল! যাদের জন্যে ছত্তিশগড় থেকে আসা সঙ্গীরা এই রাস্তাটির নাম দিয়েছিল-- বুকের ধুকধুকি বা খালিশ হিন্দিতে " দিল ধড়কন্‌ রোড্‌''। কোথায় সেসব?
    আজ এ তো হিন্দিবলয়ের যে কোন শহরের প্যাটার্ণে গড়ে ওঠা আইডেন্টিটিবিহীন এক জনপদ!
    মরুকগে, মুসৌরিতে গেলে নিশ্চয়ই এই একঘেয়েমির বাইরে কিছু পাওয়া যাবে।
    হ্যাঁ, পাকদন্ডী রাস্তাটি আগের মতই, কিন্তু জঙ্গল একটু ফিকে, বেশ কয়েকটি হোটেল আর রেসিডেনশিয়াল স্কুল গড়ে উঠেছে যে!
    বৃষ্টির ছাঁট আসছে, ও কাঁচ তুলে দিয়ে সহযাত্রীদের দিকে ফেরে।
    প্রায় সবাই ঢুলছে, এর মাথা ওর কাঁধে, খালি ড্রাইভার জেগে। একটু পরে পরেই আসছে শার্প টার্ন, ওর হাতে স্টিয়ারিং সমানে ঘুরছে।
    হরিদাস পাল জেগে থাকবে, খালি ড্রাইভারের একা জেগে থাকা ঠিক নয়। যদি কিছু হয়ে যায়?
    কিন্তু মুখভার করা মেঘলা সকালের ঠান্ডি-ঠান্ডি-হাওয়ায় কখন যে চোখ জুড়ে আসে!

    হরিদাস পাল এবার পৌঁছে গেছে ছোটবেলায়, স্বপ্নে দেখছে একটি বহু পুরনো ঘটনাকে।
    ক্লাস ফোরে পড়ার সময় কালীপূজোর ঠিক আগে কাকামণি দু'ভাইকে নিয়ে ভিলাইয়ে ওদের বাবা-মা'র কাছে যাচ্ছেন। সিটিং পাওয়া গেছে বম্বে মেলের সেকেন্ড ক্লাসে। লম্বা গদী আঁটা বেঞ্চিতে কাকার পাশে বসে ও দেখছে উল্টো দিকে বসা এক কোঁকড়ানো চুল গাউন পরা মেমসায়েবকে।
    ওর মাথায় খেলছে এক উদ্ভট চিন্তা।
    গাউনের নীচে মেসায়েবের দুটো স্তন, না চারটে? গরুর যদি চারটে হয়, ছাগলের দুটো, তবে বাঙালী মেয়েদের দুটো হলেও মেমসায়েবদের কেন চারটে হতে পারে না!
    কাকে জিগ্যেস করা যায়? ধ্যেৎ, কি সব উল্টোপাল্টা চিন্তা! কেউ জানতে পারলে মেরে পিঠের ছাল তুলে নেবে।
    মাথাটা ঠুকে গেল সামনের সীটে। বাঁকের মুখে গাড়ি হেব্বি ব্রেক মেরেছে।
    -- নামুন সবাই,মুসৌরির লাইব্রেরি চৌক এসে গেছে। গাড়ি আর আগে যাবে না। ভাড়াটা তাড়াতাড়ি দিন।

    সেই নিউজিল্যান্ডবাসী ডাক্তারদম্পতি হরিদাস পালকে বলেন-- দরজাটা খুলুন আর একটু তাড়াতাড়ি করুন, গাড়ির ছাদ থেকে আমাদের কিছু জিনিস নামাতে হবে।

    দুইঃ
    চোখ কচলে হরিদাস পাল দেখলো ছোট একটা স্কোয়ার মতন। গান্ধীজির স্ট্যাচু, মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরি, সারিসারি দোকান। বত্রিশ বছর আগে এ জায়গাটা পুরো ফাঁকা ছিল। সামনে তাকালে সোজা হিমালয় দেখা যেত। টিপ টিপ বৃষ্টি একটু বেড়েছে। অধিকাংশ দোকান খোলেনি।
    একটা চায়ের দোকানে মাত্র ঝাঁটপাট শুরু হয়েছে। আর বন্ধ দোকানগুলোর সামনে গুলতানি করছে বর্ষাতি পরা জনাকয়েক ট্যাক্সিওলা।
    ওরা জানালো কেম্পটি ফলস্‌ এখান থেকে ১৬ কিলোমিটার আর কেমটিগ্রাম সেখান থেকে আরও তিন কিলো মিটার। ভাড়া? এই সাতশো টাকা দেবেন, অন্ততঃ পাঁচশ', তার কমে হবে না। আর নইলে দেহরাদুন থেকে বাস আসছে , এই লাইব্রেরির সামনে দাঁড়াবে। আধঘন্টায় পৌঁছে যাবেন। তার পর তিনকিলোমিটার হন্টন।
    ছাঁটে ভিজে যাবেন, স্যার। বারান্দায় উঠে দাঁড়ান, নয়তো ওই চায়ের দোকানে গিয়ে বসুন। অন্ততঃ আধঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে।
    হরিদাস পাল ব্যাগ থেকে একটি উইন্ডচিটার বের করে গায়ে চাপাল।
    হ্যাঁ, এবার চা খাওয়া যেতে পারে।
    কিন্তু তলপেটে চাপ বাড়ছে যে! এখন সকাল আটটা। চা খেতে খেতে ঝারি করা যাক।
    স্কুটারে করে অল্পবয়সী বাবা নিয়ে আসছে হামপ্টি-ডাম্পটি বাচ্চাকে, দোকানের বারান্দায় উঠে অপেক্ষা করছে , তারপর হলদেরঙা স্কুলের বাস এলে চেপে বসে হাত নাড়াচ্ছে বাচ্চাটি।
    আর স্কুটি চেপে বৃষ্টিকে ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখিয়ে হুশ্‌ করে বেড়িয়ে যাচ্ছে তরতাজা পুঁইয়ের লতা। বেলা বাড়ছে, হাওয়ার গতি কমছে।
    এবার সিগ্রেট ফুঁকতে ফুঁকতে আসছে "হম তো মুহব্বত করেগা'' নিমের চারা।
    হরিদাস পাল জানতে পারলো উদ্দিষ্ট বাসটি আসার সময় হয়ে এসেছে, পাকদন্ডী বেয়ে ওপরে উঠতে থাকা বাসটি এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে।
    কিন্তু নির্ধারিত বাসস্টপে নেমে হাঁটতে হবে তিন কিলোমিটার? এই গরম জামাকাপড়-বইপত্তর ইত্যাদি ভরা ধামসা স্যুটকেস আর ব্যাগ টানতে টানতে? আবার তলপেটে চাপ।

    যাকগে, ঠেলে ঠুলে বাসে উঠে সীটের পাশে স্যুটকেস রেখে বসতেই কন্ডাক্টর খেঁকিয়ে উঠলো।
    -- আপনার স্যুটকেস প্যাসেজে রাস্তা আটকে রেখেছে, বলি যাবেন কোথায় কাকাজী?
    --- এই ষোলো কিলো মিটার দূরে, একটি গ্রাম আছে, একটা স্কুল আছে। বাস ওখানে থামবে?
    --- একটা চুঙ্গিকর দেয়ার ব্যারিয়ার আছে, তারপরের স্টপে নামবেন। তারপর জিগ্যেস করলেই লোকে হাঁটা পথ দেখিয়ে দেবেখন।
    একদম পেছনের সীটের কোণায় দুইযাত্রী ফিসফিস করছিলো। তাদের একজন এগিয়ে এসে কাঁধে টোকা দিয়ে জিগ্যেস করলো -- আপভী " আইস্যাবস্‌'' কী ট্রেনিংমেঁ?
    -- মতলব?
    ---হমলোগ ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর অ্যাপ্লাইড্‌ বিহেভিয়ারিয়াল সায়েন্স কী একসপ্তাহওয়ালে ট্রেনিংমেঁ জা রহে হেঁ। ওহি কেমপ্টি গ্রাম, ওহি আলোক গুপ্তাজী কী একস্পেরিমেন্টাল স্কুল মেঁ। শোচা -- আপ ভী শায়দ উসী মেঁ, তো একসাথ হো জায়েঙ্গে।
    হরিদাস পাল থতমত হয়ে ব্যাগের থেকে চিঠিটি বের করে দ্যাখে, তারপর সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
    বাঁকের মুখে নেমে পড়ে দেখা গেল একটি রেস্টুরেন্ট, তাতে কোল্ডড্রিংকস, স্ন্যাকস্‌। আর চারদিক ভোঁ-ভাঁ। সামনে টিলার ওপর একটু দূরে একটি বাড়ির ইশারা, পাকদন্ডী পথ বেয়ে উঠতে হবে।
    দু-একজনকে জিগ্যেস করে কিছুই বোঝা গেল না।
    নতুন সঙ্গীরা জানালেন আসছেন রাজস্থান থেকে, একই এন জি ওতে দুজনে কাজ করেন।
    বয়স্ক গাঁট্টাগোট্টা লোকটি আবদুল্লা আর ইয়ং লম্বা ছেলেটি কৈলাশ। দেখা গেল ওদের রিলায়েন্স মোবাইল নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না।
    হরিদাস পাল দিল্লিতে নিজের মেন্টরকে ফোন করে জানতে পারলো ওপরে একটি স্কুল , কিন্তু ট্রেনিংয়ের জায়গা হল দু-কিলোমিটার দূরের নীচের স্কুল। কন্ট্যাক্ট পার্সন হরজিন্দরের মোবাইল নম্বরে চেষ্টা করেও কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
    অল্পবয়সী সঙ্গীটি বল্লো- আপনারা দোকানে বসে চিপস্‌ আর কফি খান, আমি একটু খোঁজখবর করে দেখি।

    ছেলেটি একটু পরে ফিরে এসে বল্লো-- চলুন, এই বৃষ্টিতে আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। সবাই বল্লো নীচে যে পাকা রাস্তাটা নেমে গেছে সেটা সোজা কিন্তু অনেক লম্বা আর দেড় কিলোমিটার আগে নাকি কাল ধ্বস নেমেছে, রাস্তা বন্ধ। ফলে কোন ট্যাক্সি-ম্যাক্সি কিছুই পাওয়া যাবে না।
    তার চেয়ে উপরবাগে চড়াই রাস্তাটা ধরি, ওটা শর্টকাট, কিন্তু একটু এবড়োখেবড়ো। চলুন হাঁটা শুরু করি। কথা বলতে বলতে পৌঁছে যাবো।
    হরিদাস পাল ওদের দুজনের দিকে তাকায়। দুজনের কাঁধে একটি করে এয়ার ব্যাগ আর আবদুল্লার কাঁধে একটি শান্তিনিকেতনী কাপড়ের ঝোলা। এন জি ও কর্মীই বটেন!
    ইদিকে হরিদাস পাল মহা আলসে বলে ছ'জোড় মোজা, গেঞ্জী,রুমাল,জাঙ্গিয়া, শার্টপ্যান্ট গরম কাপড় সব নিয়ে এসেছে।
    আবদুল্লার পরনে খাদির পায়জামা-পাঞ্জাবী, বৃষ্টিতে ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গিয়েছে, ক্লীন শেভ করা মুখে অমায়িক হাসি, কৈলাসের পরণে জিনসের প্যান্ট আর জ্যাকেট।
    এখন চলা শুরু হল। কিন্তু চাকাওলা স্যুটকেস এবড়োখেবড়ো চড়াইয়ের রাস্তায় কাঁহাতক টানা যাবে, তিন কিলোমিটার?
    হে ঈশ্বর! আমার ঈশ্বর! তুমি কেন আমাকে ত্যাগ করিয়াছ? আমার যে নিজের কৃতকর্মের ক্রুশকাষ্ঠ বহন করিবার ক্ষমতা নাই। এই কঠিন রাস্তায় গাড়ি পাঠাও নাই ক্যানে? নাইবা যদি পাঠাইলে আমাকে এমন বাসব্দত্তা-আম্রপালী সদৃশ কোমল ছোট করপল্লব দিলে কেন? এই বয়সে মোট বহিবার শক্তি হারাইয়াছি, অন্ততঃ একজন বাহক দাও।
    নাঃ, ঈশ্বর পুরোপুরি ত্যাগ করেন নাই। তিনকদম চলিতেই কৈলাশ আসিয়া স্যুটকেস ছিনাইয়া লইল।
    -- আংকল, আপ বুজুর্গ হ্যাঁয়। এ ভারী সামান ম্যায় লে জাউঁগা।
    হরিদাস পাল ন্যাকামি করে দুর্বল বাধা দ্যায়।
    ছেলেটি বলে-- সংকোচ করবেন না, আমার অভ্যেস আছে। অনেক ট্রেকিং করেছি, আসামের পাহাড়ে।

    চলা শুরু হয়। ওপরে খানিক সমতল এবড়োখেবড়োর পর শুরু হল উঁচুনীচু এবড়োখেবড়ো। এই ঠান্ডার মধ্যেও হরিদাস পালের সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে। অ্যাজমায় অভ্যস্ত বুক হাপরের মত ওঠানামা করছে।
    বাড়িঘর শেষ। আরেকটু উঠলেই মস্ত বড় স্কুলঘর, বাগান, খেলার মাঠ দেখা যাচ্ছে।
    আ গয়া, আ গয়া। মেরি মঞ্জিল।
    না, তত দূর তো নয়। লোকে খামোখা কনফিউজড্‌ হয়। এটুকু পরিশ্রম তো প্রভূর কৃপা! সুখে আমায় রাখবে কেন, রাখ তোমার কোলে।
    কিন্তু স্কুলে তো প্রেয়ার হচ্ছে। তাহলে ট্রেনিং ক্যাম্প কোথায় হবে, ওপাশের বড় বিল্ডিংটায় কি?
    একজন আয়া আসছে , বাগানের মধ্যে দিয়ে।

    ---- আপনারা ভুল বুঝেছেন। এটা আমাদের মেইন স্কুল। আপনাদের ট্রেনিংস্থল হল দুইকিলোমিটার নীচে আমাদের এক্সপেরিমেন্টাল স্কুল ভবনটি।

    উৎসাহের বেলুনে কেউ আলপিন ফুটিয়ে দিয়েছে।
    --বুঝলাম, নামার রাস্তা কোথায়? আর কতক্ষণ লাগবে?
    --- এখানে অমনি কোন রাস্তা নেই। লোকজনের যাতায়াত হয় না। খালি আমরা স্কুল ও হোস্টেলের স্টাফরাই যাতায়াত করি। কাজেই ঐ যে বোল্ডারের আড়ালে একটু সংকরি পাকদন্ডি পায়েচলা হাঁটার ফাঁক দেখা যাচ্ছে, ওটাই।সাধারণতঃ আধঘন্টা লাগে, কিন্তু আজ বৃষ্টিভেজা পেছল পথ, সাবধানে নামবেন। ঘন্টাখানেক লাগবে।
    এবার বোল্ডারের ওপর বসে তিনজনের মিটিং হয়।
    -- দাদা, আপনি হরজিন্দরকে ফোন লাগান। ও লোক পাঠাক।

    ঈশ্বর আছেন, এবার ফোন লাগলো।
    -- আমি তো লোক পাঠিয়েছি, সে বাসরাস্তায় ওই কোল্ডড্রিংকসের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে।
    -- কি যা তা বকছেন! আমরা তো ওখান থেকেই আসছি, এখন একনম্বর স্কুলের শেষে পাহাড়ের ওপরে।
    -- আপনারা তাড়াহুড়ো করেছেন। সাতসকালে অমন না করলেও পারতেন। আরও চল্লিশ জন আসবে। তাই ওখান থেকে গাইড সরাতে পারবো না। আপনারা সোজা পাকদন্ডী ধরে সাবধানে নীচে নামুন। কালকেও ধ্বস নেমেছে। সাবধানের মার নেই।
    চলা শুরু হয়। ভয়ানক পেছল পথ অনেকটা খাড়া নেমেছে, তায় বৃষ্টি হয়ে কাদা। পা হড়কাচ্ছে।হরিদাস পালের পেছনে লালসুতো-নীল্‌সুতো বেরুচ্ছে।
    কৈলাস--- ভয় করবেন না, আমরা আছি। আপনার স্যুটকেস আমি বয়ে নিয়ে যাবো।
    আবদুল্লা-- দাদা, আপনি আমার হাত ধরুন। ঠিক সামলে নেবো। আমাকে দেখে দেখে পা ফেলুন।
    হরিদাস পালের মাথা ঝিমঝিম করে। এবার কালো পাথরের পহাড়, পাশ দিয়ে নতুন তৈরি ঝর্ণার মত। এসব তো সিনিমাতেই মানায় ভালো। আর ও জানে যে ও নায়ক হওয়ার জন্যে জন্মায় নি।
    পা হড়কালো। একটু গড়িয়ে গেল খাদের দিকে, কিন্তু ব্রেক লাগলো পাশের গাছের ডাল ধরে, আর আবদুল্লার শক্ত করে ধরা হাতের ছোঁয়ায় অনেক ভরসা।
    হটাৎ বাঁকের মুখে চমক!
    ঝোড়ো হাওয়া আর মেঘলা আকাশের চালচিত্র আলো করে দাঁড়িয়ে দুই যুবতী, নীল আর হলুদ পোশাকে শহুরে ছাপ। তিন সঙ্গীর বুকে বাড়ে চাপ।

    সাধে কি ব্রেখট গাহিয়াছেনঃ
    এই তো দেখুন ফাঁসির আসামী দাঁড়িয়ে,
    লোকটাতো যাবে জীবনের মায়া ছাড়িয়ে,
    সামনে মরণ বাড়িয়ে চরণ থমকে,
    তবুও তাহার বুকের রক্ত গমকে,
    কারণ কি তার?
    মেয়েমানুষ।

    কাছে গিয়ে হরিদাস পাল অবাক! এ কি? এতো দুটো ঝলমলে বাচ্চা মেয়ে! বিশ থেকে পঁচিশের ঘরে।
    এই ঝোড়ো হাওয়া, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, কুয়াশা আর পাহাড়ি ঢাল, এখানে এরা কেন? নিশ্চয়ই স্কুলের টিচার, এদেরই জিগ্যেস করা যাক।
    কিন্তু জিগ্যেস করে হাতে রইল পেন্সিল। এরা একই পথের পথিক। রাস্তা খুঁজছে, যাবে সেই ট্রেনিং সেন্টার। গুপ্তাজির অল্টারনেটিভ এডুকেশনের স্কুল এবং হোস্টেল।
    কিন্তু ছদিনের আবাসীয় প্রোগ্রাম, আর এত কম লাগেজ!
    না, না, এদের লাগেজ মেন রোড দিয়ে ঘুরপথে অন্যদের সঙ্গে আসছে। এরা দুইবোন অ্যাডভেঞ্চারের লোভে শর্টকাট চড়াই-উৎরাইয়ের পাহাড়ি পথ ধরেছে।
    আরো মজার ব্যাপার-- এরা দিল্লিবাসী বাঙালী, একজনের মাত্র বিয়ে হয়েছে। দাদু আইস্যাব্‌স এর মেম্বার। ওঁর উৎসাহে বাবা এদের আসতে দিয়েছেন। মালপত্র দিল্লির বড় গ্রুপটির সঙ্গে গাড়িতে আসছে।
    এই অবস্থায় হরিদাস পাল নিজস্ব অবতারে দেখা দিলেন। মেয়েদুটির কাকু হয়ে অভয় প্রদান করলেন। আমরা আছি, কোন ভয় নেই।( এদিকে ভয়ে নিজের তো লালসূতো-নীল্‌সূতো বেরিয়ে গেছে।)
    আমকে ফলো কর। যে দিকে খাদ সেদিকে না ঘেঁষে যে দিকে গাছপালা বা ঝোপঝাড় সেদিকে চেপে চেপে পা ফেল। ছোট ছোট স্টেপ নাও। ভেজা পথে ছোট ছোট নুড়িতে পা হড়কাতে পারে। সাবধান!
    এই ভাবে প্রতিটি বাঁকে প্রতিটি শার্প কোণ পেরোনোর সময় হরিদাস পালের ধারাবিবরণী চলতে থাকলো। যেন "" হাঁসুলী বাঁকের উপকথা''য় পাল্কিকাঁধে বেহারাদের দলের সর্দার বনোয়ারী।
    -- ভাইসব সাবধান! আলপথে নামিলাম।
    শেষে ওর বকবকানিতে বিরক্ত হয়ে মেয়েদুটো বললো-- কাকু, আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা দিল্লির মেয়ে, প্রতি বছর পাহাড়ে ট্রেকিং করতে যাই।
    এবার সামনে রাস্তা বাঁক নিয়েছে খুব শার্প অ্যাংগেলে আর অত্যন্ত ন্যারো, পেছলালে নীচে খাদে গড়াগড়ি।
    হরিদাস পালের মনে হল-এই কি মহাপ্রস্থানের পথ? বুকটা এবার ধড়াস ধড়াস করছে। হাঁটুতে হাঁটুতে বঙ্গ বাজছে। এই ঠান্ডার মধ্যেও ঘামে গেঞ্জি ভিজে একসা।
    --- রায়জি, একটু পাথরের ওপর বসে জিরিয়ে নিন।
    কৈলাস রায়ের স্যুটকেস হাতে লটকে নিয়েছে, নইলে ভিজে যাবে, আর কাদা!
    রায় লজ্জা পেল।
    --- কৈলাসভাই, আপ ফিকর ন করোঁ। ইসকো নীচে ফেক দো। বাদ মেঁ নীচে যব পহুঁছেঙ্গে তব কলেক্ট কর লেঙ্গে।
    ছ'ফিট লম্বা নেপালী যুবক এইসব ন্যাকা কথাকে পাত্তা না দিয়ে হাসে।
    চলা শুরু হয়। আরে, উল্টো দিক থেকে উঠে আসছে একজন মানুষ। ওহে, দাঁড়াও! আমরা স্কুল যাবো। হ্যাঁ, হ্যাঁ, লোয়ারভ্যালিতে যেটা।
    আর কতদূর? কাছে ? সে তো বুঝলাম, কিন্তু কতক্ষণ? আর কুড়ি মিনিট? বেশ।
    -- কুয়াশা না থাকলে এখান থেকেই দেখতে পেতেন। রাস্তা ঘুরে ঘুরে, তাই কুড়ি মিনিট।
    এবার জেগে উঠলো সাদা রঙের একতলা একটি ছড়ানো ছিটানো বাড়ি। কিছু মুরগী আর ছোট বাচ্চা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। যাক্‌, পৌঁছে গেছি। তাহলে এমনতরো ব্যায়ামের পর এবার কুল ডাউনের পালা।
    হরি! হরি! এ হল স্কুলের স্টাফ কোয়ার্টার।
    হস্টেল আরো একধাপ নীচে।
    পাওয়া গেল স্পার্টান লম্বা সুব্দর ডিজাইনের এক ডরমিটরি। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অনেক হাঁকাহাঁকি- ডাকাডাকির পর এক্‌জন ঘুমচোখে খাটো হাফপ্যান্ট পরে দরজা খুললেন।
    হরিদাস পাল আর বিরক্তি চেপে রাখতে পারে না।
    --- ঘোড়া বেচে ঘুমুচ্ছিলেন নাকি মশাই, সেই কখন থেকে----।
    লজ্জা লজ্জা মুখ করে তিনি বল্লেন-- আজ্ঞে, আমিও আপনাদের মত প্রতিভাগী। কুমায়ুন থেকে এসেছি। নীচে দু'কিমি দূরে ধ্বস নেমে রাস্তা আটকে গেছে, তাই ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে শেষ পথটুকু হেঁটে আসতে হয়েছে।একটু চোখ লেগে গেসলো।

    ৫)
    এবার ভাল করে ডরমিটরি পর্যবেক্ষণ করা গেল। এখানে ছ'দিন থাকতে হবে।
    পাহাড়ের ওপর একটি ছোট ধাপে লম্বা একটি হলঘর মত। তার মধ্যে একদিকে সিমেন্টের তিনফিট উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর দুটো করে খাট। তিনধাপ সিঁড়িতে পা রেখে কমন প্যাসেজে নামতে হয়। আর প্যাসেজের আরেক পাশে সিঙ্গল খাট।
    প্রত্যেকের মাথার কাছে ছোট চার ফিট করে দেয়ালের পার্টিশনের গায়ে একটি করে আলমারী গেঁথে দেয়া। প্রত্যেকটি বিছানার পাশে একটি বড় জানলা, কপাটে কাঁচ লাগানো, বাইরে লোহার জাল। ফলে পোকামাকড়-সাপখোপের ভয় নেই। কোন পাখা নেই, দরকারও নেই।কারণ ঘরের মধ্যে মেঘ ঢুকছে।
    কিন্তু উত্তরাঞ্চল সরকারের বলিহারি! দূর দূর পাহাড়ের গায়ে একএকটি হ্যামলেট, তবু খাম্বা টেনে বিজলী পৌঁছে গেছে।
    যা বলছিলাম, এমনি করে গোটা বিশেক বিছানার পর লাইন দিয়ে ছটি ল্যাভোটরি, পরিষ্কার, কিন্তু কমোড মাত্র একটিতেই। উল্টো লাইনে তিনটে স্নানঘর, মাঝের প্যাসেজে আয়না লাগানো তিনটে বেসিন; দাড়ি কামানো, মুখ ধোয়া, ফেস ওয়াশ, ক্রীম ইত্যাদির মাধ্যমে শ্রী তোলা, ইত্যাদি ইত্যাদি, এর পর আরো দশটি বিছানাসম্পন্ন একই ডিজাইনের হল। সব মিলিয়ে স্পার্টান কিন্তু নান্দনিক রুচিসম্পন্ন, মনটা ভাল হয়ে গেল।
    আরো জনাতিনেক ব্যাগম্যাগসুটকেস ইত্যাদি নিয়ে কাগভেজা হয়ে ঢুকলেন।
    বেলা বাজে এগারো, দাঁত বের করে জিগাইলেন-- চায় মিলেগা?
    আমরা ততোধিক দাঁত বের করে জানালাম- তোদের সন্ধান জানা থাকলে বল।
    ইতিমধ্যে একজন স্টাফ হাসিমুখে এসে একটি কাগজ ধরালেন।
    জানা গেল এই পুরুষমাত্র ডরমিটরিটির নাম গঙ্গাবিহার, আর এর উঠোন থেকে এবড়োখেবড়ো ধাপ ধরে প্রায় ছ'ফিট নীচে নামলে একই কায়দার যমুনাবিহার, যাতে মেয়েদের থাকার ব্যবস্থা।
    আরো জানা গেল -- আমরা কেউ কারো বিয়েতে বরযাত্রী আসিনি। লো-কস্ট এনজিও ট্রেনিংয়ে এসেছি। ফলে বেড-টি পাওয়া যাবে না। সকালে ডাইনিং হলে গিয়ে চা' নিতে হবে। দুবেলা খাওয়ার সময় লাইন দিয়ে নিজের নিজের থালাতে খাবার যত চাই নেয়া যাবে। কিন্তু থালা প্লেট নিজেদের মেজেধুয়ে আসতে হবে।

    মেয়েদের বিহারের নীচে পাহাড়ি ধাপ কেটে ফুলবাগানের পাশ দিয়ে খাড়াই পথ ধরে দোতলা সমান নীচে নামলে যে বড় হল দেখা যাচ্ছে ওটাই হল ডাইনিং হল। তার থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে আরো একতলা নামলে তবে ক্লাস রুম, অন্য মাথায় বড় কমিউনিটি হল।
    -- ও বউরে, তুই কনে গেলি রে! তোর হরিদাস যে খালি বসে বসে বই পড়ে আর ঠ্যাং নাচায়! ও যে বাজারেও যায় না, সব তোর ঘাড়ে চাপায়।
    এই বয়সে এমন ওঠবোস দু'বেলা করালে সেকি আর রায়পুরে ফিরতে পারবে?
    ভেতর থেকে কেউ বলে উঠলো-- মনে রাখিও, তুমি গ্রামীণ উন্নয়ন ও এন জি ও আন্দোলনের জন্য বলিপ্রদত্ত। মনে রাখিও কিশোর বয়সে রামকৃষ্ণ মিশনের হস্টেলে পাঁচ বছর ছিলে।
    এতেই কেলিয়ে পড়লি শ্লা!

    ঘরের মধ্যে মেঘ ঢুকছে। উইনচিটার মোজা জুতো সব ভিজে। হরিদাস পাল জানলার কোনে গিয়ে সব গুলো মেলে দেয়। তারপর ভিজে ঘাস এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি ঢাল ধরে নীচে নেমে খাবার ঘরে জিগ্যেস করে আরো এক ধাপ নেমে একটি বড় হল ঘরে পৌঁছয়। বিশাল বড় হলঘরের এ মুড়ো থেকে ও মুড়ো অব্দি সস্তা কার্পেট পাতা। এখানে কোন এক পবন গুপ্তাজির অল্টারনেটিভ এডুকেশনের স্কুল চলে।
    বিশাল বোর্ডে কিছু লেখা,দেয়ালে দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো মহাপুরুষদের অমৃতবাণী। সিনিক এবং বিশ্বনিন্দুক হরিদাস পাল সবকিছুই সন্দেহের চোখে দেখে।
    কাছে গিয়ে একেকটি লেখা মন দিয়ে পড়তে থাকে। মনে মনে গুণগুণ করে হো চি মিন না কার জেল থেকে লেখা একটি অণু কবিতার লাইন;-- সময় কাটাতে হবে দাবাখেলা শিখেছি আমরা!
    আ মোলো যা! এই পাহাড়ি গাঁয়ে ট্রেনিং করতে এসেছিস তো হো চি মিনের কবিতা কোত্থেকে এল?
    অ! হো চি মিন মানে অ্যান্টি আমেরিকানিজম্‌, অর্থাৎ অ্যাপ্লাইড বিহেভিয়ারাল সায়েন্সের এইসব হিউম্যান ল্যাব টি-গ্রুপ এসব নিয়ে খিল্লি করা।
    এইসব সাইকোলজি, অবচেতন মন, ইমোশন সব ফক্কিকারি। আসল হল সমাজ, ওটাকে বদলাও। যার ধক নেই সে চুপ করে থাকুক। এতসব ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তিমনের গহনে অবগাহনের চেষ্টা! এসব ইম্পিরিয়ালিস্ট চক্রান্ত, মানুষকে সংগ্রাম বিমুখ করা।
    বেশ কথা। তবে ন্যাকাচৈতন, এখানে এলি কেন? কে তোকে মাথার দিব্যি দিয়ে এখানে আসতে বলেছে? তাও পয়সা খরচ করে? আবার খালি-পিলি গাল পাড়ছিস? ভন্ড কোথাকার!
    --- শখ করে থোড়ি এসেছি? এবারের বেসিক হিউম্যান ল্যাব তো এন জি ও দের জন্যে। আর রিটায়ারমেন্টের পর যে এন জি ও তে যোগ দেব ওরা শর্ত রেখেছে যে ওদের পয়সায় এই ট্রেনিং করেআসতে হবে। নইলে কোন শালা এসব ইয়াংকি ঢ্যামনামিতে আসে?
    সে বেশ, এসেছ যখন যতক্ষণ খাওয়ার কথা না বলে বা রেজিস্ট্রেশনের ফর্ম না ভরায় ততক্ষণ দেয়ালে মাউন্টেড অমৃতবাণীগুলো পড়।

    • কে সভ্য, কে অসভ্য? সার্টিফিকেট কে দিচ্ছে?
    • প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব সভ্য, তৃতীয় বিশ্ব অসভ্য?
    • ইউরোপ আমেরিকা সভ্য?
    • এশিয়া আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকা অসভ্য?
    • সভ্যতা মাপার মাপকাঠি কি?ঃ

    -- একি র্যা ?
    • আবার " সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের পরিচয়-- সবচেয়ে বেশি বিরোধিমতকে সহ্য করা, স্পেস দেয়া"।
    - কালীদা গো, ও কালীদা, আর পারিনা।
    এদিকে আসুন, নাম রেজিস্ট্রি করিয়ে নিন।
    ফিরে তাকাতেই দেখা গেল হলের একমাথায় বেশ কজন পুরুষ ও স্ত্রী জাঁকিয়ে বসেছেন। একজন একটি ফাইল নিয়ে কিছু ফর্ম ভরাচ্ছেন ও কিছু কিট্‌ দিচ্ছেন।

    হরিদাস পাল ফাইল নিল, জানতে পারলো--- প্রচন্ড বৃষ্টিতে পাহাড়ে ধ্বস নামায় একদিকের রাস্তা বন্ধ। ফলে কিছু প্রতিভাগী এখনো পৌঁছয় নি। তাই ও যেন খেয়ে নেয়। বেলা আড়াইটে থেকে সেশন শুরু হবে।
    ও এবার মন দিয়ে ফাইল পড়তে থাকে।
    জানতে পারে ইন্ডিয়ান ইন্সটিট্যুট অফ অ্যা[প্লায়েড বিহেভিয়ারাল সায়েন্স বা ঈআ এদেশে সত্তরের দশকে ভারতে শুরু হয়, তাতে ঈঈ KKআটা 'র এক বাঙালী প্রফেসরের মুখ্য ভূমিকা ছিল।
    হরিদাস পালের হাড় পিত্তি জ্বলে যায়।
    বাঙালী না হলে বাঙালীকে বংশদন্ড কে দেবে!
    এদিকে তখন কোলকাতার অলিগলিতে "" হীরের টুকরো ছেলেরা সব অশ্বমেধের বলি'' হচ্ছে তখন প্রফেসর কোথায় পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিন্দায় মুখর হবে, তা না? গিয়ে দেখ সাইকোলজিতে আমেরিকার মডেল দেশে চালু করছে।
    একটি নামকে খুব মাথায় তোলা হচ্ছে-- উদয় পারিখ। উনি নাকি ভারতের পরিবেশে এই পদ্ধতি দিয়ে মানুষকে বোঝার মডেল বানিয়েছেন।
    এবার কিছু "" করিতে হইবে'' এবং ""অবশ্য করিবে না'' পড়া যাক।

    এটা কি?
    - এই মেথড মানুষের ব্যক্তিত্ব বদলাতে পারে, তাকে ধ্বংস করতে পারে। কোন মানসিক চাপ থাকলে তাকে শিজোফ্রেনিক করতে পারে।
    তাই একটি ফর্মে এই মর্মে সাইন করতে হবে যে এইসব এক্সপেরিমেন্টের সম্ভাব্য রিস্কের কথা জেনেই চোখকান খুলে ও এই ট্রেনিংয়ে এসেছে। তাই কোন ক্ষতি হলে আইস্যাব দায়ী নয়।
    বেশ, বাওয়া বেশ! এর চেয়ে বেশি ভদ্রতা তোমাদের থেকে আশা করা অন্যায়।
    কিন্তু এটা?
    "" এই মনস্তাত্ত্বিক কার্যশালায় স্বাভাবিক ভাবেই অ্যানিমেটরের সঙ্গে প্রতিভাগীদের একটি ইমোশনাল বন্ড গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু তার সুযোগ নিয়ে কোন স্যার বা ম্যাডাম যদি কোন প্রতিভাগীকে শোষণ করেন বা তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ব্যাপারে মর্যা ল কমিটিতে কমে্‌প্লন করা যেতে পারে। কমিটি মেম্বারদের নাম ও ফোন নং--।

    হরিদাস পাল পুলকিত! এর মানে এমন কান্ড এইসব হতচ্ছাড়া হিপি-ইয়াংকি--ডুডল-ডু ওয়ার্কশপে আকচার ঘটে থাকে।
    তাহলে হয়তো, হয়তো আমার সঙ্গেও এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে? কেন নয়?
    একটি পরকীয়া সম্পর্কের সম্ভাবনায় ওর পুলকিত মন গাইতে লাগলো-- কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে''?
    পুরো লাইনটা গাওয়াও হয় নি, চোখ আটকে গেলো দরজার দিকে ,-একটি " বৃষ্টিভেজা বাড়ির মতন রহস্যময়"হাসি হেসে ঢুকছেন সেরেনা উইলিয়ামস্‌। সেই ম্যাসকুলার দশাসই চেহারা, তামাটে চুলের স্ট্রিক, কালো চেহারায় একগাল হাসি , তবে একটু যেন কুঁজো! গায়ে একটি টকটকে লাল উইনচিটার।

    ৭)
    সেলিব্রিটির সামনে কাঁচুমাচু হরিদাস টেরিয়ে টেরিয়ে সেরেনাকে দেখছিল। হটাৎ কি মনে করে এগিয়ে গিয়ে সেরেনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল,--- হরিদাস, ফ্রম ছত্তিশগড়!
    জবাবে আবার একগাল হেসে সেরেনা বল্লেন-- সুপ্রিয়া ফ্রম রাজস্থান। য়ু বিলং টু কর্পোরেট, অর এন জি ও?
    --- এন জি ও, কর্মদক্ষ। হরিদাস পাল একটু তোতলায়।
    -- নেভার মাইন্ড, ওয়ন্স আই অলসো থট অফ ডুইয়িং দোজ এন জি ও থিংগ্‌স্।
    একটু পেট্রনাইজিং কি? হরিদাস চটে গিয়ে অসভ্যের মত জিগায়-- হুইচ কমিউনিটি ইউ বিলং টু?
    সেরেনার হাসিটি উজ্বল হয়।-- ইউ পি, কায়স্থ; নিগম ফ্যামিলি, ফ্রম আজমগড়।
    এবার দেশি সেরেনা এগিয়ে যান কোন পূর্বপরিচিতের দিকে।
    হরিদাস পাল তাকিয়ে দেখে ইতিমধ্যে হলে এসে খুঁটি গেড়েছ এন প্রায় জনা তিরিশেক মেয়েমদ্দ,প্রৌড়। এদের মধ্যে হরিদাসের মত টেকো বুড়োএকজনও নেই।
    ইতিমধ্যে একজন সামনে চুল টেনে টাক ঢাকা চল্লিশ পার ব্যাগ টেনে ল্যাপটপ কাঁধে হাজির হয়ে বেশ পরিচিতের মত রেজিস্ট্রেশন টেবিলের সামনে জাঁকিয়ে বসলো।
    বল্লো-- আমি দু'বছর আগেও এই হিউম্যান বেসিক ল্যাব অ্যাটেন্ড করেছি। আমাকে এবারও আসতে বলা হয়েছে। আচ্ছা, সোসাইটি থেকে অমুক বা তমুক এসেছেন কি? ওঁরা আমার পরিচিত। আমার পুরনো মেন্টর।
    ---- বলে ভাল করলে বাছা, আমাদের নিয়ম অনুযায়ী এই ল্যাবে পুরনো কোন ভাবে চেনা লোক তোমার মেন্টর হতে পারবে না।
    হরিদাস পাল মন দিয়ে দেখছে একটি সুন্দরীকে, যে হেসে গড়িয়ে পড়ছে একটি লম্বাটে পাজামা কুর্তা পরা তরুণের কোন চুটকি শুনে।
    আরে, পাঠান কুর্তা-পাজামা পরা বড় বড় চোখ ও রোমান নাকের একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলা ফেসিলিটেটর ও আছেন যে! উনি কি আমার মেন্টর হবেন?
    এমন সময় মাইক বেজে উঠলো।
    --সবাই এদিকে তাকান। আমি রাধাকৃষ্ণন, আমাকে রাধা বলেই ডাকবেন।( রাধা? এতো সাদা পাজামা-কুর্তা পরা সাদা গোঁফ কাঁচাপাকা চুলের কালোকোলো হাসি হাসি মুখের ছ'ফিট লম্বা তামিল ভদ্রলোক।)

    হাসিমুখে সেই প্রৌঢ় তামিল রাধার গলার স্বরে দক্ষিণীটানের মিষ্টি হিন্দি আর মাঝে মাঝে ইংরেজির পাঁচফোড়ন, বেশ লাগে।
    -- আভি আপলোগ বহুত দূর সে বহুত প্রকার কে উম্মিদ লেকর আয়া হ্যায়। শুরু মেঁ কুছ তকলিফ হোগা।
    কর্পোরেটদের জন্যে এই ওয়ার্কশপ যখন গুরগাঁও, হায়দ্রাবাদ, কোলকাতায় পাঁচতারা হোটেলে হয় তখন ওভারহেড বেড়ে যাওয়ায় একসপ্তাহের থাকাখাওয়া-খাইখরচা কুড়িহাজারের নীচে নামানো যায় না। আমরা প্রফেসনালরা এই হিউম্যান ওয়ার্কশপের জন্যে নিজেদের চার্জ খুব নমিনাল নিই।
    তাই এক্সক্লুসিভলি এন জি ও দের জন্যে করতে এই ধরনের মাত্র বেসিক সুবিধাযুক্ত লো কস্ট জায়গা খুঁজি। এছাড়া খরচ কমাতে ঠাসা প্রোগ্রাম রাখা হয়েছে। সকাল ন'টা থেকে রাত ন'টা।
    পুষ্টিকর সাধারণ খাওয়াদাওয়া, কাজেই কোন কমপ্লেন শুনবো না।
    আর এই গান্ধীয়ান ইনস্টিটুশন অনুগ্রহ করে নামমাত্র ভাড়ায় ওদের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবহার করতে দিয়েছেন। তাই ওঁদের কিছু মূল্যবোধকে সম্মান করা আমাদের ডিউটি। অতএব, সাধারণতঃ নিজেদের ট্রেনিং সেন্টারে যেসব নিয়ম ভাঙা অ্যাডভেঞ্চার করে আমরা মজা পাই সেগুলো এখানে স্ট্রিক্টলি নো-নো!
    কিন্তু হিমালয়ের কোলে এই প্রিস্টাইন বিউটির মাঝে 'আপনাকে জানা, নিজেকে নানাভাবে ফিরে ফিরে দেখার'এই হিউম্যান ল্যাব ওয়ার্কশপ আপনাদের ভালো লাগবে আশা করি।
    আপনাদের দশ-দশজনের চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। মিকস্‌ড গ্রুপ। খেয়াল রাখা হয়েছে যেন আগের থেকে পরিচিত সাথীরা একই গ্রুপে না পড়েন।
    আবার বলি এর থেকে কতটুকু লাভবান হয়ে ঘরে ফিরবেন তা ডিপেন্ড করছে আপনি কতটা নিজেকে দেবেন তার ওপর।
    এর ফলে আপনি খুব উন্নত মানুষ হবেন কি না সেটা বিতর্কিত বিষয়। কিন্তু আপনি আগের চেয়ে শক্তিমান হবেন, সার্টেনলি।
    কারণ, আপনি জানতে পারবেন নিজেকে, অন্ততঃ খানিকটা। আর জানতে পারবেন অন্যদের চোখে আপনি কেমন দেখান।
    নিজের মনের গোপন বা অন্ধ অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো বেশ রিস্কি!সেই সাহস বা ধক আছে তাই আপনারা এসেছেন।
    যাঁরা এই বেসিক ল্যাব উত্তীর্ণ হবেন তাঁরা আগামী ছ'মাস থেকে দু'বছরের মধ্যে অ্যাডভান্স ল্যাব অ্যাটেন্ড করার জন্যে এলিজিবল্‌ হবেন। তাঁদের ব্যক্তিগত ভাবে সেটা জানিয়ে দেয়া হবে।
    আসুন, আমরা এই বৃষ্টিঝরা অন্ধকার মেঘলা দিনে কিছু ওয়ার্ম আপ গেম খেলি।

    ৮)
    -- আপনারা অচেনা সাথীদের সাথে আলাপ পরিচয় করুন।
    --- এবার আপনারা ফিরে যান শৈশবে বা কৈশোরে। এই মিউজিকের সঙ্গে টিন এজারের মত বিহেভ করুন।
    --- মনে করুন খুব হাসির কথা মনে পড়েছে। বিন্দাস হাসুন, চেষ্টা করুন পাশের সঙ্গীটিকে এই আনন্দে সামিল করতে।
    --- অচেনা একজনকে সাথী করুন। চোখ বুঁজুন, অন্ধ হয়ে যান। সঙ্গের ব্যক্তিটির ওপর ভরসা রাখুন । ও আপনাকে জড়িয়ে ধরে হাঁটাবে-- হলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। ও আপনাকে নেভিগেট করবে, যাতে অন্য কোনো জোড়ার সঙ্গে বা দেয়াল-আসবাব এসবের সঙ্গে ধাক্কা না লাগে। সাথীটির ওপর ভরসা রাখুন।
    এবার রোল রিভার্স করুন। চক্ষুস্মান ব্যক্তিটি অন্ধের ভূমিকায় আসুন।
    এবার মাইকে আপনার এক্সপিরিয়েন্স বলুন।

    ধুস্‌ শালা! যত্তো ন্যাকামি! এইসব বস্তাপচা জিনিস অসংখ্য ট্রেনিংএ করা হয়েছে, নতুন কি করাচ্ছে! হরিদাস পালের মনে হল-- ফালতু এলাম।

    -- এবার পাঁচজনের গ্রুপ তৈরি করুন।
    একজন আরেকজনকে বলুন,- জীবনে সবচেয়ে আনন্দের দিনটির কথা; সবচেয়ে দুঃখের দিনটির কথা।
    যাকগে, এবার একটু কার্পেটের ওপর হাঁটুমুড়ে বসা যাবে, ও যে হাঁপিয়ে উঠেছে।
    কেয়াবাৎ!হরিদাসের গ্রুপে এসেছে সেই লাল কুর্তা পরা সেরেনা, হাসিমুখে বসেই লীড নিয়েছে।
    -- দশ-দশ মিনিট টাইম। যদি কেউ কিছু মনে না করেন আমি এটা মডারেট করি? প্রথমে সবাই নাম-অর্গানাইজেশন বলে এক এক করে নিজের কথা বলুন।
    মহা চালু তো! কেমন সবারটা শুনে নিয়ে শেষে নিজের টুকু পলিটিক্যালি করেক্ট ধাঁচে বলবে।
    কিন্তু হরিদাস পালের কপালে জ্যোতিষী হওয়া নেই।
    সেরেনা সবার ইতস্ততঃ ভাব দেখে বললো-- আচ্ছা, আমিই শুরু করছি।
    বাবাকে খুব ভালবাসতাম। অকালে চলে গিয়েছিলেন, তিন মেয়েকে রেখে, আমিই ছোট, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। সেই ছিল সবচেয়ে দুঃখের দিন।
    কিন্তু কসম খেয়েছিলাম- ভালো করে পড়াশুনো করে বড় চাকরি করে সংসারের হাল ধরবো। দিদিদের আর কষ্ট করতে দেব না।
    আমি এখন একটি সর্বভারতীয় বীমা কোম্পানীর রাজস্থানের এইচ আর চিফ। সম্মানজনক মাইনে। যেদিন জয়েন করলাম বড় আনন্দ হল। মনে হল কথা রাখতে পেরেছি। বাবা নিশ্চয় ওপর থেকে দে্‌সখে খুশি হয়েছেন, কফি খেতে খেতে হাসছেন। আমাকে আশীর্বাদ করছেন।
    এরপর পালা সেই নেপালী ছেলেটির যে স্যুটকেস টেনেছে।
    -- ইনফোসিস বেঙ্গালুরুতে আড়াই বছর চাকরি করতে করতে মনে হচ্ছিল দিস ইজ নট মাই কাপ অফ টি! কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।
    একদিন চাকরি ছাড়লাম। ওরা আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। শিলচরের রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পাস করে এসেছো, এখানে তোমার ভবিষ্যত উজ্বল, কেন যাবে?
    কিন্তু আমি আর কর্পোরেটের ধারে কাছে নেই। ছেড়ে এলাম রাজস্থানে, জয়েন করলাম এই নামকরা এন জি ও তে; গরীবদের মধ্যে শিক্ষার ইনোভেটিভ কাজ করি। আনন্দে আছি। নিজের টার্মসে বাঁচছি।
    এবার পালা একটি রূপুসী-ফুলটুসি ললি-পলি চশমা চোখে মেয়েটির।
    --- সবচেয়ে আনন্দের দিন হল যেদিন আমার দশ বছরের পুরনো বন্ধুকে জীবনসাথী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মালা বদল করলাম। আর দুঃখের দিন? ওই দিনটাই।
    কেন যে আমার মায়কা থেকে কেউ বিয়েটা তখন মেনে নিলেন না! এক ছোটমামা বাদে। ছোটবেলা থেকে চেনাপরিচিত আদরকাড়া-আদরদেয়া চেহারাগুলো এক লহমায় বদলে এল! কাউকেই চিনতে পারিনা!
    আজ প্রায় একবছর পরে ওঁরা মেনে নিয়েছেন, আসা-যাওয়া শুরু হয়েছেদ। কিন্তু সেদিনের শক্‌ সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।
    এবার হরিদাসের পালা।

    ৯)
    --কি হল হরিদাস পাল ফ্রম ছত্তিশগড় না কি চৌতিরিশগড়? চুপ করে আছেন কেন? মাত্র তিন মিনিট বাকি! শিগ্গির করুন, শুধু আপনারটারই শোনা বাকি।

    -- আমার সবচেয়ে দুঃখের দিন হল যেদিন আমার বাবা ভিলাই স্টীল প্ল্যান্টের ভেতরে বাড়ির কাজের লোকের ছোটভাই মিদনাপুরের কানুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে মারা গেলেন। মনে হল মাথার ওপর থেকে ছাত সরে গেল। মনে হল আমি কত তুচ্ছ, অসহায়! কিস্যু করতে পারলাম না।

    ( মিথ্যে কথা! হরিদাস পাল, সেদিন তুমি দুঃখের চেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছিলে। কত লোক তোমার বাবার প্রশংসা করছিল, বাড়িতে ভীড় করে এসে বলছিল যে কেমন ভাবে রায়সাব নে এক লেবার কো বাঁচানে কে লিয়ে শের জ্যায়সা কুদ কর অপনা জান দে দিয়ে। ইয়াদ রখনা বেটা, আপ কেইসন বাপ কা পুত্তর হো!
    তুমি গর্বিত হলে। কিন্তু স্বস্তি পেলে এই জন্যে যে ল্যাটা চুকেছে। যদি সলিলকুমার ভাঙা পা নিয়ে বেঁচে থাকতেন তাহলে কিছুদিন পরে ওনার কাছে পঙ্গু জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতো আর উনিও ক্রমশঃ বৌ-ছেলের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতেন। আস্তে আস্তে দৈনদিন তিক্ততার ধূলো লেগে বাবার শ্রদ্ধা-ভালবাসার ছবি ক্রমশঃ মলিন হতে থাকত। সেই দীনতার হাত থেকে সলিলকুমার মরে গিয়ে রেহাই পেলেন।
    তবে কেন মিথ্যে কথা বলছো, প্রথম দিনেই?
    -- বেশ করেছি। এদের কতটুকু চিনি জানি যে নিজেকে উলঙ্গ করে মেলে ধরবো? বাকি সবাই সত্যি কথা বলেছে? কি গ্যারান্টি!
    -- সত্যি কথা হল তোমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন হল যেদিন তোমার স্ত্রী একই শহরে আলাদা বাড়িতে থাকতে লাগলেন। ঘোষণা করে দিলেন যে এই অপদার্থ আত্মসুখী লোকটির সঙ্গে আর একছাতের নীচে থাকা যায় না।
    তোমার ইগোতে , শৈশব থেকে সযত্নে লালিত ছবিটিতে এমন লাথি কেউ এর আগে কষায়নি।
    -- চোপ শালা!)
    --আর আপনার সবচেয়ে সুখের দিন? তাড়াতাড়ি করুন সাবজি, মাত্র দু'মিনিট বাকি! এর পরেই গ্রুপ প্রেজেন্টেশন।

    ---যেদিন আমার মেয়ে দিল্লি থেকে ফোন করলো-- চাকরি পেয়ে গেছি, কোন চিন্তা কর না, বাবা! তোমার লোন শোধ হয়ে যাবে।
    - সত্যি, কি ভাল আপনার মেয়ে!
    ( ফের মিথ্যে কথা? ওটা তোর সবচেয়ে সুখের দিন ছিল? সবচেয়ে?
    আয়নার সামনে দাঁড়া রাস্কেল! একেবার নিজের চোখে চোখ রেখে সত্যি কথা বল!
    আমার স-অ-ব চাইতে সুখের দিন? বলা মুস্কিল!
    বড্ড ন্যাকা! এখানে আয়নাকে বল, কে জানতে পারছে! সেই দিনটার কথা বল, যা তুই কাউকে আজও বলিস নি। তোর বউকেও না। জামাকাপড়ের নীচে লুকিয়ে রাখা নিষিদ্ধ হাত থেকে পাওয়া আংটির মত যাকে মাঝে মধ্যে বের করে দেখিস্-- সেই দিনটার কথা বল্।
    -- হ্যাঁ, সে এক মেঘলা টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়া মন খারাপ করা দিন। জাহিদের বাড়ি গিয়েছিলাম একটা বই ফেরৎ দিতে। ও ঘরে ছিল না। বন্ধুপত্নী রফিয়া বল্লো-- বন্ধু নেই বলে চলে যাবেন? সে কি হয়, বসুন, আমি তো আছি। চমৎকার সেমাই বানিয়েছি। ভাবীর মত হয়তো হয়নি, তবু খেয়ে যান।
    নানান হাসিঠাট্টা গল্পে সময় কেটে গেল। ফেরার সময় রফিয়া জোর করে একটা রেনকোট গছালো, প্রায় হাত গলিয়ে পরিয়ে দিল।
    আর কাছে এসে বল্লো-- একটা কথা বলি, আপনাকে আমার ভালো লাগে, অন্যরকম লাগে।
    চমকে উঠলাম। রফিয়ার গলার আওয়াজে কোন অচেনা কর্ণাটকী রাগ।
    -- বাড়ি যান, আর এটা ফেরৎ দিতে নিজে আসবেন, প্লীজ। অন্য কারো হাতদিয়ে পাঠাবেন না।
    আর এসব কথা গল্পকরে বেড়াবেন না। আপনি যা পেট আলগা, ভুলো মনের লোক।

    --- কিন্তু ভীতুর ডিম! তুই ওটা অন্যের হাত দিয়েই ফেরৎ পাঠিয়েছিলি। কিন্তু বেশ ক'দিন ধরে গুনগুন করেছিলি-
    "" কে মোরে ফিরালে অনাদরে, কে মোরে ডাকিলে কাছে''।)

    --- হরিদাস পাল স্যার! বাবুমশায়! আপ হো কহাঁ, কিস দুনিয়ামেঁ খোয়ে হো? ( দেশি সেরেনা ডাকছেন।)
    আরে আমি-আপনি একই গ্রুপে, গ্রুপ নম্বর ৪। আমাদের যেতে হবে ডাইনিং হলের নীচের তলায় কামরা নং সাত। আমাদের মেন্টর বা ফেসিলেট করনে ওয়ালে শোলাংকী স্যার ও নিধি ম্যাডাম। এই আপনার ফোল্ডার, বগলদাবা করুন আর আমার সঙ্গে চলুন।
    লোহার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে সাত নম্বর কামরায় ঢোকার মুখে হরিদাস পাল থমকে দাঁড়ায়।
    সামনে ঝুলন্ত ব্যালকনি। ক'জন প্রতিভাগী ওখানে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানো হিমালয়ের দিকে।
    বিকেলের মুখে বৃষ্টি আর কুয়াশা কেটে গিয়ে হিমালয় অনেক নীল, আর তার শরীর যেন সবুজ র্যাপারে মোড়া। একটি সোনালী মন কেমন করা পাতলা ফিল্টার আলো ওর এখানে ওখানে। কিছু কিছু পাহাড়ের গা দিয়ে দুটো তিনটে জলধারা এঁকেবেঁকে গড়িয়ে পড়ছে।
    হরিদাসের মাথায় কোন গানের কলি এলো না। বরং মনে পড়লো "" সীতার বনবাস''।
    '' এই সেই জনস্থান মধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি। ইহার শিখরদেশ সততসঞ্চরমাণ জলধরপটল সংযোগে নিবিড়নীলিমায় অলংকৃত।''
    ১০)
    কামরা নম্বর সাতের ভেতর সেঁধিয়ে একবার চোখ বোলানো যাক। মাটিতে গোলাকারে গদি-চাদর-তাকিয়া সহযোগে দশজন ও দুজন ফ্যাসিলিটেটর, একুনে বারো জনের বসার যায়গা। মাঝখানটা খালি। এটির ভেতরে একটি বেডরুম আছে, আপাততঃ তার দরজায় তালা। আর আছে একটি বাথরুম। বসে আছে পাঁচটি পুরুষ ও তিনজন নারী। জানাগেল প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যে দু'জন কাল সকাল নাগাদ পৌঁছুবেন, দশজনের সার্কল পূর্ণ হবে।
    এবার ঢুকলেন দু'জন মেন্টর/ ফ্যাসিলিটেটর। একজন প্রায় সত্তর, লম্বামত, চোখে চশমা,কুর্তা-পাজামায় বেশ ইনফর্মাল লুক। আর ছোটখাটো মহিলার বয়স যদিও চল্লিশ পেরিয়েছে তবুও সাদামাটা সালোয়ার-কুর্তায় খানিকটা গার্ল-নেকস্ট ডোর ছবি। এঁরা বসলেন একেবারে যেন মেপেজুকে ডায়াগোনালি অপোজিট স্থানে।
    ( এরমধ্যেও বোধ্হয় কিছু ইয়াংকি তুকতাক্ আছে!)
    ছাত্ররা যত ধেড়েই হোক, ক্লাসে স্যারেরা ঢুকলে সন্ত্রস্ত হয়ে গলার বোতাম, শাড়ীর আঁচল গুছিয়ে নিয়ে মুখে কুলুপ আঁটার পলিটিক্যালি করেক্ট বিহেভিয়ার শিখে বড় হয়েছে। ফলে এখন পিনড্রপ সায়লেন্স।

    কিন্তু গুরুবাবা-গুরুমা'র মুখে কুলুপ কেন? এটা কি ছোঁয়াচে রোগ নাকি? অথবা এরা প্রতিভাগীদের থেকে ফার্স্ট মুভ আশা করছেন!

    সন্নাটা! ঘনঘোর সন্নাটা!! হরিদাস ঘড়ি দেখে, দশ মিনিট এইভাবেই কেটে গেছে।

    এবার শুরু হল গুজগুজ-ফুসফুস-ফিসফাস-ফিকফিক।
    এঁরা কি চাইছেন? কোথায় কোন ই®¾ট্রাডাক্টরি স্পীচ বা কী-নোট অ্যাড্রেস হবে, তা না যত্ত ইয়াংকি ভ্যন্তারা!!
    তবে কি প্রোগ্রাম ডায়রেক্টর আসবেন, তারপর শুরু হবে? তো সেকথা বল্লেই হয়!

    ফক্কুড়ি বুদ্ধির হরিদাসের মনে পড়ে ""বালিকা বধূ'' সিনেমায় বাসরঘরে অনুপকুমারের জিগানো ধাঁধা-
    ওগো ভালোমানুষের ঝি,
    ব্যাপারখানা কি?
    দিতে দিতে দিলেনাকো ছিঃ ছিঃ ছিঃ।।

    এবার একজন সাহস করে জিগ্যেস করে ফেললো-- স্যার, কি করতে হবে?
    বৃথা প্রশ্ন, উত্তর মেলে না।

    শেষে একজন চিট পাস করতে লাগলো--- মনে হচ্ছে এসব ওয়াঁদের ট্রিকস্ অফ দ্য ট্রেড। আসুন আমরাই বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধি। নিজেদের নাম-গোত্র-কুলপরিচয় দিয়ে শুরু করি।
    ১১)
    শক্তপোক্ত চোয়ালের হাড়,একটু যেন ঘোড়ামুখো, সাদা পাজামা-কুর্তা পরা অল্পবয়েসী ছেলেটি একটু তোতলায়।
    -- আ-আমরা তাহলে নি-নিজেদের পরিচয় দিয়ে শুরু করি। আমি শ্রবণকুমার, ইউপি। অমুক এন জি ওতে এইচ আর এ কাজ করি। এবার আমার ডানদিকের জন?
    দীঘল কালো চোখের পাতা, নতুন গালে-ব্লেড ছে্‌লটি বলে--আমি প্রসূন, রাজস্থান। আমিও শিক্ষা প্রমোট করছে অমুক এন জি ও তে কাজ করি।
    ঘোড়ামুখো আঙুল দেখিয়ে মেয়েটিকে বলে-- আ-আপনার টার্ন।
    চশমা চোখের ললি-পলি সুন্দরী স্পষ্ট উচ্চারণে বলে---- আমি অদিতি সায়গল। দিল্লির একটি এন জি ও তে কাজ করি যারা মেয়েদের যৌনস্বাস্থ্য ও ঘরোয়া অত্যাচার নিয়ে কাজ করে।
    -- বেশ বেশ, এবার আপনি!
    ঘোড়ামুখোর আঙুল সেরেনার দিকে।
    এইভাবে সবার প্রাথমিক পরিচয়ের পালা শেষ হয়। কিন্তুব দুই মেন্টর যেন পাথরের মূর্তি-- একেবারে নট্‌ নড়নচড়ন, নট্‌ কিস্যু!
    কি রে বাবা! আবার তো ব্যাক টু স্কোয়ার এ। এবার কি কতা? ফিসফিসিয়ে কথা ছড়ায়-- খালি আমাদের কেন? মেন্টরদেরও পরিচয় জিগ্যেস করা হোক।
    কে জিগায়! মেন্টররা দ্যাবতা। ওঁয়ারা কি পরিচয় দিতে বাধ্য?
    হরিদাসের মনে পড়ে ছোটবেলায় দুই তুতো- দাদাদিদির নিজেদের মধ্যে মন্তব্য-- পুরুত মশায়রা আবার সু-সু করেন নাকি? ওনারা তো খালি পূজো করেন!!
    তবু ঘোড়ামুখো ইউপির ছেলেটি সাহস করে জিগায়।
    কোন লাভ হল না।
    একজন বল্লেন-- বিক্রম আর একজন--নিধি।
    আবার তাঁরা পাথরের স্ট্যাচু।

    ঠিক আছে, ঠিক আছে। তোদের খেলার নিয়ম মেনেই খেলব।
    ( অথরেটিরিয়ানিজম চুলোয় যাক, আমরা গড়ে নেব নিজেদের নতুন ভুবন, নতুন নিজস্ব খেলার নিয়ম।)
    --চলুন, আমরা নিজেদের কাজের কথা , নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করি। কিছু ফললাভ হতে পারে।
    সেরেনা বলতে থাকে।
    --গতকাল আমি দিল্লি স্টেশনে নেমে মোবাইল চার্জ করাচ্ছিলাম। একজন মহিলা প্রায় ইউরিনাল যাওয়ার রাস্তায় বসে কোলের বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোয় মগ্ন। আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বল্লাম-- এখানে এভাবে চলাফেরার পথে কেন বসেছ?
    মেয়েটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। তারপর যা বল্লো তার নিগলিতার্থ হচ্ছে মুন্নির বাপ সকাল বেলায় কানপুরের গাগাড়ি থেকে নামার পর ওকে এইখানে বসিয়ে দুধ আর ওষুধ আনতে যাবার নাম করে সেইযে গেছে এখনো ফেরেনি। ও অপেক্ষায় বসে আছে, আর কিই বা করতে পারে! না, কোথাও কমপ্লেন করেনি। জানেনা কোথায় করতে পারে। আর মুন্নির বাপ ফিরে এসে যদি রাগ করে?
    এদের জন্যে কারোরই সময় নেই। সেরেনার ও নেই। ওকে যে গাড়ি ধরে দেরাদুন আসতে হবে। কিন্তু কি করে!
    শেষে ও মেয়েটিকে নিয়ে গিয়ে রেলওয়ে পুলিস চৌকিতে শিকায়ত দর্জ করায় আর মেয়েটির হাতে একশ' টাকা দেয়।

    -- এতে কিছুই হবে না। আর একশ টাকার দাম আছে, অন্ততঃ আমার কাছে। কিন্তু এটুকু করে আমার মনে একটা অদ্ভূত আনন্দ হয়েছে এইটুকু আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাইছি।
    কিন্তু নৈঋত কোণে মেঘ। কোণার থেকে চশমা পড়া কালোকোলো বুদ্ধিজীবি দেখতে ছেলেটির আওয়াজ মুদারার কোমল নিষাদ ছাড়িয়ে যায়।
    -- আপনার কি মনে হয় না যে আপনার ওই আলগা তাৎক্ষণিক সুখের জন্যে আপনি আপনার স্পেসের অপব্যবহার করলেন?
    সেরেনা হতভম্ব!
    -- আপনি কী বলতে চাইছেন, একটু খুলে বলবেন?

    -- জনতার ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া সরকার তার কাজ করছে না। আপনি আবার স্পষ্টতঃ ওদের স্পেসে ঢুকে ওদের কাজটা আধা-খ্যাচড়া ভাবে করে ওদের কাজ না করাকে র্যা শনালাইজ করলেন।

    বুদ্ধিজীবি নিজের পয়েন্টে অনড়।
    তর্ক জমে উঠলো।
    চশমা চোখে কোঁকড়ানো চুলের শ্যামল ছেলেটি বেশ গুছিয়ে নিজের বক্তব্য রাখছে।
    ওর কথার ধরতাই হল-- গণতন্ত্রে নির্বাচিত সরকারের জনতার ম্যানডেট হিসেবে কাজ করা উচিৎ। ওয়েলফেয়ার স্টেটে যে কাজ গুলো সরকারের কর্তব্য সেগুলো তাঁরা না করলে জন আন্দোলন তাঁদের বাধ্য করতে পারে।
    এজিটেশনাল এন জি ও'রা এই কাজই করে। কিন্তু সো-কলড্‌ ডেভেলপমেন্টাল এন জি ও রা সরকারের কিছু কাজ নিজেরা করে দিয়ে সরকারের অপদার্থতা ঢেকে দিচ্ছে।
    সিনিক বুড়ো ভাম হরিদাস পাল মুচকি হাসলো। ওর মনে হল এইকথা গুলো শ্রীমান বুদ্ধিজীবি আগেও বিভিন্ন ফোরামে বলে হাততালি পেয়েছে।
    কিন্তু ওর ভাল লেগে গেল ছেলেটিকে। কোথায় যেন নিজের প্রথম যৌবনের ছায়া দেখতে পেল।
    -- শোন ভাই, কয়েক দশক আগে আমিও তোমার মত করে ভাবতাম। বিশ্বাস ছিল যে সমাজতন্ত্র হল আসলি সল্যুশন। আর বাকি সব হল রাবার সল্যুশন, শুধু সাইকেলের পাংচার সারানো যায়।
    অতএব, যত সংস্কারবাদীরা শুধু বিপ্লবের দিন পিছিয়ে দিচ্ছে।
    আর দুনিয়াভরকে সারেঁ প্রবলেম, যেমন জাত-পাত, পরিবেশদূষণ, লিঙ্গবৈষম্য, শহর-গ্রাম-উন্নয়ন ডিকোটমি--- সব আসলে একই মূল সমস্যার উপসর্গ মাত্র। সমাজতন্ত্র এলে সব আপনি আপনি উধাও হয়ে যাবে।
    কিন্তু, আজকাল অন্যরকম ভাবি। মনে হয় বিপ্লব যবে আসবে স্বাগত। কিন্তু আমার জীবৎকালে মানুষের দুঃখ, ব্যথাবেদনা যদি কোনভাবে একটু কমানো যায়! সে চিকিৎসার উন্নতির ফল, বা লিব্যারাল সমাজ, বা সক্রিয় জনগণ -- যেভাবেই হোক না।
    এইসব বলে হরিদাস বেশ ঘ্যাম নিয়ে সবার দিকে তাকালো।
    বেশ একটু ইম্প্রেশন জমিয়েছে মনে হচ্ছে। কিন্তু দুই মেন্টরের কোন হেলদোল নেই। জেগে আছে না ঘুমুচ্ছে!
    খালি তর্কের নেশায় সেরেনা, বুদ্ধিজীবি, ঘোড়ামুখো বা হরিদাস যদি অন্য কাউকে থামিয়ে বা তার কথার মাঝখানে কিছু বলে বসে তখন আম্পায়ারের নো বল ডাকার মত হস্তমুদ্রায় ওয়াঁরা বুঝিয়ে দেন-- ওদের বলতে দাও।
    অর্থাৎ ওরা জেগে আছেন!!

    সন্ধ্যে গড়িয়ে গেছে, তর্ক থামছে না। ছেলেমেয়েগুলো তিনটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেছে। এক, যারা ভাবে রিফর্মিস্ট এন জি ও আসলে পঞ্চমবাহিনী।দুই, এই ব্যবস্থার মধ্যে সরকারের সহায়তা নিয়ে নিজেদের এজেন্ডা সম্ভব শিবির।
    তিন,-"" মা গো! কেন যে এতসব কথা"" শিবির।

    এমনি সময়ে বুদ্ধিজীবি বলে বসলো-- আপলোগ জনতাকে পবিত্র ক্রোধ পর রেতি ডালকর বুঝানে কা কাম কর রহেঁ হ্যাঁয়।

    হটাৎ সত্তরোর্ধ্ব মেন্টর বিক্রম শোলাংকি যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন।
    সামনের তাকিয়ায় চাপড় মেরে বলে উঠলেন--- গুস্‌সা, গুস্‌সা, গুস্‌সা! ইধর কা বাত উধর। গুস্‌সা হ্যাঁয় ইহাঁ, অন্দর মেঁ; বাত করেঙ্গে উধর কা, বাহর কা। আসলী বাত নহীঁ করেঙ্গে!
    এই বিস্ফোরণে সবাই হত্‌ব্ম্ব। সবার চোখেমুখে একই প্রশ্ন-- আমরা কি কোথাও পলিটিক্যালি ইনকরেক্ট বিহেভিয়র দেখিয়েছি?
    কিন্তু বিক্রমের থেকে কোন সাড়া নেই, আবার শামুক বা কচ্ছপের খোলে ঢুকে গেছেন।
    শুধু ঘরের বিপরীত কোণ থেকে মহিলা মেন্টর বলে উঠলেন--- বিক্রম, আপনি কি একটু ইমপেশেন্ট হয়ে পড়েছিলেন।
    বিক্রমের হাতের মুদ্রা বলছে-- হয়তো তাই!
    সেরেনা একটি চিট চালান করলো--- এটা হয়তো এদের ট্রিক্স্‌ অফ দ্য ট্রেড। চল, আমরা আবার নিজেদের দুনিয়ায় ফিরে যাই।
    কিন্তু, হল না সুর কেটে গেছে।
    হটাৎ ঘড়িতে আটটা বাজতেই ওঁরা দুজনে উঠে এমন ভাবে রওনা দিলেন যেন ঘরে আর কেউ নেই।
    এবার ক্লাসরুম থেকে ঘরে ফেরার পালা। খাতাপত্তর রেখে আবার খেতে আসতে হবে। অর্থাৎ অন্ধকার পেছল ফুলবাগিচার মাঝ দিয়ে পাকদন্ডী বেয়ে প্রায় দোতলা সমান উঁচু ডরমিটরিতে গিয়ে জামাকাপড় বদলে আবার ওই ভাবে নীচে নেমে এসো।
    না বাবা! হরিদাস পাল এতো সব ভ্যান্তারার মধ্যে নেই। ও সোজা খেয়ে দিয়ে একেবারে স্বগ্গের সিঁড়ি বেয়ে উঠেয় যাবে। সকালের আগে আর নামানামি নেই।
    খাবার হলে সেই লাইন দিয়ে কয়েদীদের মত থালা বাটি তুলে সাদামাটা কম তেলমশলায় রান্না করা ডাল-ভাত-রুটি একটা তরকারী আর স্যালাড নাও, এছাড়া দই আর একটি মিষ্টিও আছে।
    পালিশবিহীন সেগুনকাঠের টেবিলে আর লম্বা বেঞ্চিতে বসে খাওয়াদাওয়া। অল্প কজনের সঙ্গেই পরিচয়। তাই এককোণে মুখচোরার মত বসে সবাইকে লক্ষ্য করতে লাগলো।
    ফেসিলেটটর্‌রা সব আইস্যাব এর মেম্বার। নিজেদের মধ্যে আগে থেকেই চেনা জানা। কাজেই তারা কয়েদি সেজে খাবারদাবার নিলেও পাশাপাশি দুটো টেবিলে খেতে খেতে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। আর বকবকসম্রাট হরিদাসের আড্ডা দিতে না পেরে পেট ফেটে যাচ্ছে।
    কিন্তু নতুন জেনারেশনের ছেলেমেয়ারা এর মধ্যেই নিজেদের মধ্যে বিন্দাস জমিয়ে নিয়েছে।
    এই যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবে কে! হরে মুরারে!
    অজান্তেই একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
    খাওয়াদাওয়ার পর আবার পেছনের বারান্দায় কলতলায় লম্বা লাইন, বাসন ধোয়ার পালা। ভিম পাউডার, কেক,ছাই সবই আছে। ছাত্র-অধ্যাপক সব সমান।
    ফেরার পথে অন্ধকারে বাংক বুঝতে না পেরে হরিদাস নীচে খাদের দিকে নেমে যাচ্ছিল। একটি হরিয়ানার ছেলে হাত ধরে টেনে তুলে বললো--- নীচে নহীঁ, উপর জানা হ্যায় মহোদয়!

    ডরমিটরিতে খাটের ওপর বিছানায় চিত হয়ে ঠ্যাঙ নাচিয়ে নাচিয়ে হরিদাস পাল পড়ছে সমারসেট মমের ছোট গল্পের একটি খন্ড , যাতে গোটাকয় অ্যাসেন্ডেন ডিটেকটিভ সিরিজের গপ্পো আছে।
    বেশ একটু মন লেগেছে , ভয় পাচ্ছে অন্যেরা লাইট নেভাতে না বলে। কিন্তু কোথা থেকে একটা গানের সুর ভেসে আসছে না? এই হিমালয়ের কোলে রাত এগারটায় গান? কৌতূহলী কানে ধরা পরে কিছু কথা-- ভাষাটা যে বাঙালী! আওয়াজটা যেন নীচের পাড়া থেকেই আসছে! এবার তাকিয়ে দেখে চল্লিশ জনের হল প্রায় খালি। জনা সাতেক ঘুমিয়ে পড়ছে। বাকিরা সব গেল কোথায়?
    উঠে গিয়ে ব্যালকনি থেকে উঁকি মারতেই নীচের দৃশ্য দেখে ক্লান্ত মন একদম হলিউড-জলিগুড।
    নীচে মেয়েদের যমুনাবিহারের বারান্দায় ছেলেমেয়ে মিলে যেন চাঁদের হাট বসেছে। জনা দশেক মেয়ে আর প্রায় গোটা আঠেরো ছেলে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। সেই বাঙালী দুই বোন মাত্র গানটি শেষ করলো। সবাই হাততালি দিচ্ছে। এবারে একটি নেপালী মেয়ে গাইছে ওদের ফোক সঙ। সবাই তাল দিচ্ছে। এবার ক'জন নাচতে শুরু করলো। কয়েকজন ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল হরিদাস পালকে।
    --- আরে দাদা! নীচে আইয়ে। বাবুমশায়, দের ন করে। আ জাইয়ে।
    হরিদাস পাল হাসিমুখে মানা করে।
    এবার রাত বাড়ছে। কিন্তু দুটি ছেলে ওপরে এসে হাত ধরে ওকে নীচে নিয়ে যায়।
    আসর ভাঙার সময়।
    -- বাবুমশায়, আপনাদের ভাষায় দুই বোন কি চমৎকার গাইল। তাতে পানকৌড়ি না কি যেন একটা পাখি নিয়ে কিছু কথা আছে। আচ্ছা, পানকৌড়ি মানে কি?
    জানা গেল বিকেলের ওর গ্রুপের সেই বুদ্ধিজীবি ছেলেটি নাকি পেশাদারি দক্ষতায় ছবি তোলে। ভাল ডিজিটাল , এস এল আর সবই নিয়ে এখানে এসেছে।

    কথা হতে থাকে। কাল ভোর পৌনে ছটায় উঠে সবাই যাবে ঐ পাহাড়ের চুড়োয় উঠতে। ঠিক হয় মেয়েদের মোবাইলে কল করা হবে। মাত্র চারজন মেয়ে রাজি হল এই অভিযানে, ছেলেরা দশজন। ক্যামেরা নিয়ে ছেলেটিও যাবে, ওর নাম কে সুর্যকুমার।
    হরিদাস পাল রাজি হয় না। বলে-- আমার ঘুম ভাঙে ভোর পাঁচটায়। আমি ছেলের দলকে ডেকে দেব। আর তোমরা যখন পাহাড়ে চড়তে শুরু করবে তখন হাত নেড়ে টা-টা করব।
    ( শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকা! হিন্দিতে বলে না লৌন্ডোঁসে ইয়ারি, গধে কী সওয়ারি!)
    এবার শুতে যাওয়া যাক, সকালে উঠে দেখতে হবে হিমালয়ের রূপ!
    সবার শেষে ব্যালকনির লাইট নেভাতে যাবে এমন সময় চোখে পড়ল নীচের বারান্দা খালি হলেও জনমানব শূন্য নয়। ছোট পাঁচিলের ওপর বসে সেই সূর্যকুমার অন্য একটি গ্রুপের প্রাণচঞ্চলা এক সুন্দরীকে কিছু মন দিয়ে বোঝাচ্ছে। আর সেই হৈ-চৈ করা প্রগলভা তরুণী ? সে দুনিয়া ভুলে গিয়ে একদৃষ্টিতে তকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে। শুনছে ওর নীচুগলায় বলা কথা। সত্যি শুনছে? কান দিয়ে না চোখ দিয়ে?
    হরিদাস পাল বিছানার উষ্ণতায় ফিরে যায়। বারান্দার আলো নেভায় না।
    জ্বলুক, সারারাত জ্বলতে থাকুক।

    ১৩) নীল আকাশ-বজ্রবিদ্যুৎ-বৃষ্টিপাত
    -----------------------------------
    পরের দিনটি শুরু হল ভালো ভাবেই।
    শীতের সকালে সবাই হাঁকডাকে জেগে উঠে তৈরি হয়ে প্রভাতফেরির মত করে গান গেয়ে পাহাড়-বিজয়ে বেরিয়ে পড়লো।
    চশমাচোখে রোগাপতলা পাঞ্জাবী মেয়েটি হরিদাস পালকে হাত নেড়ে বল্লো- সব কটা পাপী পুরুষ আমাকে ফেলে চলে যাবে ভেবে রাত্তিরে জিনসের প্যান্ট পড়েই শুয়েছিলাম। তাও দেখুন না, বাঁদরগুলো জিগ্যেস করছে দাঁত মেজেছিলাম কি না! আরে, সাতসক্কালে পাহাড়ে চড়তে হলে দাঁত মজতেই হবে, এটা কোন শাস্তরে লিকেচে?

    দুঘন্টা পড়ে ডাইনিং হলে ঢুকতে থাকা মেঘ ও কুয়াশার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুরি ও ঘুগনির জলখাবার খেতে খেতে হরিদাস জিগ্যেস করলো-- ওই মেয়েটি বেশ! দিল্লির কোন এন জি ও থেকে এসেছে।
    --- আংকল, ও মেয়ে নয় মহিলা। তিনটি বাচ্চার মা। বিশ্বাস হচ্ছে না।
    ধেত্তেরি! এসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে যাবো কেন?
    ক্লাস রুমে ঢুকে পড়ি।

    কি বিপদ! এ যে দেখি বাংলাবাজারে হাতে হ্যারিকেন!
    শরীর খারাপ লাগায় ফুলটুসি মেয়েটি চা খেতে না গিয়ে ক্লাস রুমের গদি পাতা বিছানাতে চাদর জড়িয়ে শুয়ে ছিল। ঘোড়ামুখো শ্রবণকুমার মোবাইলের ক্যামেরায় তার ফোটো তুলিয়াছেন।
    টের পেয়ে ফুলটুসি অদিতি রেগে কাঁই।
    -- আমার অনুমতি ছাড়া আমার ঘুমন্ত অবস্থার ছবি তুলেছেন কেন? শিগ্গির ডিলিট করুন।
    -- আ-আপনি সে-সেলিব্রিটি। আপনার ছবি তুললে দো-দোষ নেই।
    --- ওসব ন্যাকামি ছাড়ুন। আমি সিরিয়াস।আমি প্রফেশনাল কলিগ। এখানে এই ধরণের ব্যবহারের ব্যাপারে সুপ্রীম কোর্টের রুলিং আছে। দরকার হলে আমি কোর্টে যাব।
    -- আ-আপনি বাড়াবাড়ি করছেন। এতে কি হয়েছে?
    -- দেখুন, আমি একটি এন জি ও তে জেন্ডার ইস্যু নিয়ে কাজ করি, আইন জানি। হরিদাসবাবু আইন পড়েছেন, কেসটা বলুন তো!
    ---- সেলিব্রেটেড বিশাখা কেস।
    হরিদাস পাল ইম্প্রেস করার সুযোগ ছাড়ে না।
    ইতিমধ্যে সিঁড়ি দিয়ে একটি অন্যব্যাচের মেয়ে নামছে, মাথায় চুল যেন শালের বনে বর্ষার জলভরা মেঘ ঘনিয়েছে।
    একজন কেউ ফোড়ন কাটল-- মৌমাছির ছাতা।
    এবার দুই সহেজকর্তা বা ফেসিলিটেটর আসরে নেমেছেন।
    কাল অব্দি চুপচাপ ধ্যানমগ্ন থাকা মহিলাটি জানতে চাইলেন--- কী হয়েছে?
    জবাবে অনেক হাঁউমাঁউখাঁউ মিলিয়ে শুনলেন সিন্ডারেলার ঘুমন্ত ফটোতোলা এবং মেয়েদের মৌমাছির চাক বলা।
    উনি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন।
    --- মেয়েদের মৌমাছির চাক বলা? বেশ, কিন্তু অন্য ব্যবহারে মনে হয় চাকভাঙা মধু খাবার ইচ্ছেও কিছু কম নয়। ঠিক আছে এ নিয়ে আমরা টি-ব্রেক এর পরে কথা বলবো।
    আবার সেই কৃত্রিম নীরব স্তব্ধতা, যেন সবাই ধ্যানে বসেছে।
    ফক্কুড়ি স্বভাবের হরিদাস পালর ফিক ফিক হাসি পাচ্ছে। কিন্তু ও যে জেনেশুনে শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকেছে।
    ও শুরু করে ওর ছোটবেলার পুরনো খেলা। অডিও অফ্‌ করে দিয়ে সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে আর মনে মনে রিওয়াইন্ড করে দেখতে থাকে পার হয়ে আসা দীর্ঘজীবনের সাদা কালো পুরনো ফিলিম।

    ভিলাইয়ের কাছে সরকারী কলেজে বড় ভীড়। সবে এম এ ইকনমিক্সে ভর্তির জন্যে ইন্টারভিউ শুরু হয়েছে।। দেশে জরুরী অবস্থা চলছে। কলেজে কলেজে ব্ল্যাক লিস্ট তৈরি।
    হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্টরা ডিসিপ্লিনের নামে দুষ্টু ছেলেদের ওপর জমে থাকা পুরনো খার সুদে-আসলে আদায় করে নিচ্ছেন।
    তাই প্রফেসর বিশ্বকর্মা লাইনের প্রথম ছেলেটিকে বল্লেন-- কি, একটু আগে বল্লাম না চুল ছোট করে কেটে এস। কথা কানে যায় নি?
    -- কেটে তো এসেছি স্যার।
    -- এর নাম কাটা? যাও আরো ছোট করে এস। কায়দা করে কান ঢেকে মেয়েদের মত চুল রাখা চলবে না। কথা না শুনলে অন্য কলেজে গিয়ে ভর্তির চেষ্টা কর।
    --ন্যাড়ামাথা করে আসবো?
    -- বাজে বকবক করবে না, বুঝলে? এটা গভমেন্ট কলেজ, ফালতু হিরোগিরি চলবে না।
    হরিদাস পাল দাদ না চুলকে থাকতে পারে না।
    -- স্যার, আপনি এন সি সি'র কম্যান্ডার। কিন্তু ভর্তি তো ইকনমিক্সের জন্যে করা হচ্ছে। কেন বেচারাকে হ্যারাস করছেন? তার চেয়ে ওই হেয়ার স্টাইল যাঁর সেই অমিতাভজিকে বলুন না দেশের স্বার্থে ইন্দিরাজীর হাত শক্ত করতে উনি যেন ছোট করে চুল কাটান। দেখবেন, পরের দিনই গোটা ভারতের যুবশক্তি চুল ছোট করেছে।
    -- কি হে! তোমারও খুজলি হচ্ছে না কি?

    চটকা ভেঙে যায়।
    ওর অন্যমনস্কতার সময় কিছু একটা ঘটে গেছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সেরেনা। ভারি কাঁধ উঠছে আর নামছে।
    ---- এক ঝুঠী জিন্দগী জী রহী থীঁ ম্যাঁয়!

    এইসব সাইকো অ্যানালিসিসের সময় কার কথায় কোন ট্রিগার কাজ করেছে কে জানে!

    ----বাবা গেলেন অকালে! তিনবোনের মধ্যে আমিই ছোট। বড় দুজন পড়া ছেড়ে টিউশনি করে সংসারের ঘানি টানতে লাগলো। আমাকে ছাড়তে হল গান শেখা। বাবা ভাবতেন সুযোগ পেলে আমি গানকেই পেশা করতে পারি। বলতেন-- নৌনি, তোর ভগবৎদত্ত গলা।
    ছাই গলা! সার্ভাইভাল স্ট্র্যাটেজি ঠিক হল আমাকে ভাল পড়াশুনো করে বড় চাকরি বাগিয়ে পরিবারকে জলে ডোবা অবস্থা থেকে টেনে তুলতে হবে।
    আজ আমি হরিয়ানায় অ্যাভিভা বীমা কোম্পানীর এইচ আর চিফ! বাবা ওপর থেকে দেখছেন।
    দুইদিদির বিয়ের ব্যবস্থা-খরচাপাতি সব আমার ডিসিশন। অফিসে -বাড়িতে সর্বত্র একটা ডিসিশন দেয়া আমার কখন অভ্যেস হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। সেই সুবাদে এখানেও অমন করছিলাম।
    ভুল করেছি; দিদিরাও আমার চেষ্টা ভালভাবে নেয় নি। বলে আমি নাকি শো-অফ করতে এসব করি!
    আমি একা, বড় একা! ভয় করে।

    সেরেনা কাঁদতে থাকে। হরিদাস পাল এমন স্বর্গীয় দৃশ্য ড্যাবডেবিয়ে দেখতে থাকে। সবাই তথৈবচ।

    এমন সময় নড়ে উঠলেন লম্বা চেহারার প্রৌঢ় ফেসিলিটেটর-- বিক্রম সোলাংকি।
    কুর্তার পকেট থেকে রুমাল বের করে সেরেনাকে চোখ মুছতে বাড়িয়ে দিলেন।
    আর নীচুগলায় মন্ত্র পড়ার মত একঘেয়ে সুরে বলে চললেন-- এখন কেমন লাগছে! আমার তো কালকের সেরেনার তুলনায় আজকের সেরেনা অনেক ভাল লাগছে। অনেক আকর্ষণীয়। অনেক ডাউন-টু-আর্থ! অনেক সংবেদনশীল,খসিয়ে ফেলেছে তার সবজান্তা নকল মুখোশ। কাঁদতে লজ্জা নেই। কান্নার মধ্যে দিয়ে মানুষ ধরায় নামে , পবিত্র হয়।
    এই সেরেনা অনেক সুন্দর, ইচ্ছে করছে একে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গনে বাঁধি।

    বিশহাজার ভোল্টের শক লাগে। এসব কি বলছেন উনি? লজ্জাশরম বলে কিছু নেই? সবাই চুপ করে আছে কেন? মেয়েটা এক চড় লাগাচ্ছে না কেন?
    হরিদাস পাল কি মুখ খোলা উচিৎ? এথিকস্‌ কমিটির কাছে অভিযোগ করা উচিৎ?

    ১৪)
    কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।
    একজন একটি চিট লিখে হাত বদল করতে লাগল। তাতে হরিদাস পাল লিখলো--- শুনেছিলাম, এমনি হয়। মানুষ ভেঙে পড়ে। নিজের মুখ ও মুখোশকে আলাদা করে চিনতে পারা বড় কষ্টের। এখন দেখতে পাচ্ছি।
    যথাক্রমে চিট গিয়ে পৌঁছলো ফেসিলিটেটর নিধির কাছে। উনি একনজর দেখে দলামোচা করে নিজের ব্যাগে ভরে দিলেন।

    লেঃ পচা!
    আবার শুরু হল কথা।
    ( মা গো, কেন যে এত সব কথা!)
    না, সবাইকে সেরেনার ব্যাপারে কিছু বলতে হবে। শালার ফিড্‌ব্যাক।
    হরিদাস পাল বলে--- উনি লো- সেল্ফ এস্টিমে ভুগছেন। তাই এইসব।

    কেমন এক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন নিধি ম্যাম।
    এবার বিক্রম একটু যেন কড়া সুরে হরিদাস পালকে বল্লেন-- আপনি র্যাইশনালাইজ না করে আপনার ফিলিং টা বলুন। আমরা ফিলিং এর ফিডব্যাক চাই। আপনার ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটির নয়।

    হরিদাস পাল বেদম চটেছে। এই শুকনো শকুন ওকে আঁতেল বল্ল কি?
    ওদের সত্তরের জমানায় আঁতলেমি অতি ঘৃণ্য কাজ। পাপের লিস্টিতে মাতৃগমন ও ব্রহ্মহত্যার পর ইহারই অধিষ্ঠান।

    -- বুঝলাম না, একটু এলুসিডেট করুন।
    -- আপনি আপনার র এমোতিওন কে বর্ণনা করুন। সেরেনার ব্যবহারে আপনার কেমন লাগছে। রাগ, দুঃখ, ঘৃণা, সহানুভূতি, ভালবাসা, যন্ত্রণা-- কোনটা?
    --- তাহা জানিয়া আপনি কি করিবেন?
    -- শুনুন হরিদাস, একটু কো-অপারেট করুন।

    হরিদাস পাল রাগে গরগর করছে।
    হ্যাঁ, হ্যাঁ, কো-অপারেশন। ্হেন োমন ূস অন্দ মন ওপেরতেস।

    -- করতে চাইছি আপনি আগে বুঝিয়ে বলুন যে কেন স্টেটমেন্ট না দিয়ে র' ইমোশনকে জানাতে হবে।
    -- কারণ, মানুষ মূলতঃ ইমোশন দ্বারা চালিত হয়েই ব্যবহার করে। ওটাই সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রাইভ। যুক্তি নয়। আগে আমরা নিজেদের র' ইমোশন কে চিনতাম। ফলে নিজেকে অনেক বেশি জানতাম। আজকাল আধুনিক সভ্যতায় আমরা নিজেদের ট্রু ইমোশনকে লুকিয়ে রাখি, যুক্তির জামা পরিয়ে। ফলে জীবন হয়ে গেছে অনেক জটিল। আমরা নিজেদের ইচ্ছে কে লুকিয়ে পলিটিক্যালি কারেক্ট বিহেভিয়র করতে চেষ্টা করি,-- পাছে লোকে কিছু বলে।
    ফলে পলিটিকিং করি, ষড়যন্ত্র করি।চাকরিতে বসকে খুশি করতে, সহকর্মীকে লেঙ্গি মারতে, কোন একটি মেয়েকে কাছে পেতে।
    -- উদাহরণ দিন,ওর কাটা কাটা কথাবার্তা।
    ভদ্রলোক যেন খেয়াল করেও করলেন না।
    --- ধরুন, আপনার পুরনো সহকর্মী আজ প্রমোশন পেয়ে আপনার বস্‌ হয়েছে।আপনি ওর সমস্ত নির্দেশের ভুল বের করার চেষ্টা করছেন।
    এটা প্র্যাকটিক্যাল না, ওটা হওয়ার মত রিসোর্স নেই, সেটা এইটুকু টাইমফ্রেমে হতে পারবে না, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আপনি দেখতে চাইছেন না যে কোন ইনস্ট্রাকশনই একশ'ভাগ সঠিক হতে পারে না। মানুষ ভগবান নয়।
    আসলে আপনি সহ্য করতে পারছেন না যে আপনার একসময়ের সহকর্মী বা দোস্ত আজ আপনাকে মনিটর করবে, কম্যান্ড দেবে।
    ( সত্যি তো, শালা দুবে কাজের কি জানে! সেদিনও তো আমাকে জিগ্যেস করে কাজ করতো। সেবার ওই তো অডিটের সময় ওকে বাঁচিয়েছিল। আর আজ---)।

    কাজেই যদি আপনার ব্যবহারের পেছনে লুকিয়ে থাকা ট্রু-ইমোশনকে আপনি চিনতে পারেন তাহলে গিয়ে ওকে বলবেন--- ভাই, আজ তোর আন্ডারে কাজ করা আমার পক্ষে পেইনফুল। তুই আমাকে অন্য বিভাগে বদলি করিয়ে দে, তাহলে আমাদের বন্ধুত্ব বেঁচে যাবে।
    এরপর আপনিও মেন্টাল পিস ফিরে পাবেন। তাই বলি নিজের ইমোশনকে চিনতে শিখুন।
    শুনুন, এই টি-গ্রুপ মেথড ইমোশনকে প্রাইমারি মনে করে। এই ক্লোজ ডোর হিউম্যান ল্যাবে আমরা যে প্রিন্সিপল অ্যাপ্লাই করি তাহল-- এরে & ণো ।
    অর্থাৎ এই ক'দিন রোজ আটঘন্টা আইসোলেটেড রুমে আমরা দশজন যেভাবে একে অপরের সঙ্গে যা ব্যবহার করছি তাই আমাদের নির্জ্ঞান মনের ডেটা বেস।

    -- ওসব মেটাফিজিক্যাল বা স্পিরিচুয়াল ধাপ্পাবাজি! নির্জ্ঞান চেতনাকে জানার গ্যারান্টি কি? কেউ কেউ তো মারিজুয়ানা , গ্রাস এই সব খেয়েও মনের অবচেতনের গহনে পৌঁছনোর চেষ্টা করে। সেশনের শেষে সমস্ত ক্যান্ডিডেটকে একটি করে মারিজুয়ানা বা হাশিশের পুরিয়া ধরিয়ে দেবেন না কি?

    শোলাংকি হো-হো করে হেসে উঠলেন।
    -- দেখুন, কে আস্তিক বা কে নাস্তিক সেটা তার নিজস্ব দর্শন বা ভ্যালু সিস্টেমের ব্যাপার। এই যে এখানে চারটি গ্রুপ এক্সারসাইজ চলছে, তাতে আমরা আটজন ফেসিলিটেটর আছি। তাদের মধ্যে অন্ততঃ দুজন হার্ডকোর নাস্তিক। দুজন, যেমন এই আমার পার্টনার নিধি ম্যাম, হার্ডকোর অধ্যাত্মবাদী।
    কিন্তু শরীর ও মন সবারই অসুস্থ হয়। সাদাকালো ইমোশন, যুক্তি দিয়ে বেসিক ইমোশনকে ঢেকে র্যাীশনালাইজ করা, আস্তিক-নাস্তিক সবার ক্ষেত্রেই কমন ফ্যাক্টর। কাজেই কোন একটা বিলিফকে ধাপ্পাবাজি বলায় সততা কম, অহংকার বেশি প্রকট হচ্ছে।
    এটা গ্রুপ পারফরম্যান্স। আমি-আপনি ইন্টেলেকচুয়াল আলোচনা কয়েক ঘন্টা চালাতে পারি, কিন্তু বাকিদের ইমোশন কি জিগ্যেস করবেন না? জানতে চাইবেন না?

    --- উই আর নট ইন্টারেস্টেড, খুব বোর হচ্ছি।
    ছুঁইমুই সুন্দরী, হকলা গোঁয়ারগোবিন্দ, দেখি-না-কি-হয় মাঝবয়েসী-- সবাই একসুরে গেয়ে ওঠে।

    -- তাহলে হরিদাস, এবার আপনার ইমোশন জানতে পারি কি?
    --- রাগ এবং সিমপ্যাথি।
    --- কার ওপর?
    -- সেরেনার ওপর। ও নিজের ভারী ভরকম চেহারা নিয়ে কমপ্লেক্সে ভুগছে। চেষ্টা করলে ওটা কমতে পারে। আর রয়েছে ভালবাসা পাওয়ার আকাংক্ষা। কিন্তু তা নিয়ে ওর মীরাবাঈয়ের মত ""প্রেম দিওয়ানী"" হয়ে ঘুরে বেড়ানো একধরণের নিজেকে করুণার পাত্র করে তোলা। এতে আমার আপত্তি।
    --- ফের ভুল করছেন । আপনি জাজমেন্টাল হচ্ছেন।
    প্রশ্ন আপনার দেয়া ডেটা সেরেনার অথেন্টিক মনে হচ্চে নাকি স্যুডো মনে হচ্ছে? ও আপনার দেয়া ফীডব্যাকের ভিত্তিতে নিজের ইমোশনকে রেকগনাইজ করার অবস্থায় আছে কি না, সেটা দেখতে হবে।
    প্রেম দিওয়ানী হয়ে যদি ও কম্ফর্টেবল থাকে তো আপনার-আমার কি আসে যায়! হু আর উই টু ডিসাইড?
    আর হরিদাস! জেন্ডার প্রশ্নে আপনার ইমোশন কি একটু ভেবে দেখবেন। বাইরের ব্যবহারে মনের ভেতরের এক্স-রে যতটুকু ধরা পড়ছে, সেটা দেখার সাহস আছে আপনার?

    -- বুঝতে পারছি, আপনাদের এই ওয়ার্কশপের নাম দেয়া যেতে পারে ""চোলি কে পিছে ক্যা হ্যায়?''
    সবাই হেসে ওঠে।
    হরিদাস পাল বলে-- সরি! মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। আমি এরকম ভাবিনি--।

    গর্জে উঠেছেন বিক্রম সোলাংকি।
    --না, কিছুই মুখ ফস্কে বেরোয় না। সবগুলোর পেছনেই একটা ডিজাইন থাকে। তাকে চিনতে হলে প্রথমে সত্যবচন করুন। নিজের ব্যবহারের দায়িত্ব স্বীকার করুন। কারণ ব্যবহারই হল মনের গোপন কক্ষে ঢোকার চাবিকাঠি। আস্তে আস্তে বুঝতে পারবেন।
    এখন বলুন-- আমি এরকম বলেছি যে কারো কারো খারাপ লেগেছে, তাই সরি!
    আর হরিদাস পাল, এই কমেন্ট অনায়াসে আপনার মুখ থেকে বেরিয়েছে। তাই জেন্ডার প্রশ্নে আপনি ও আপনার ইমোশন কোথায় দাঁড়িয়ে সেটা ভাববেন।

    যাঃ শালা! একটা ইয়ার্কি করতে গেলেও সাবধানে মেপেজুকে বলতে হবে? নইলে এরা সব কিছুর পেছনেই "পিছে-ক্যা-হ্যায়'' খুঁজে বেড়াবে। মার্কসবাদীরা যেমন সবেতেই শ্রেণীসম্পর্ক খুঁজে পায়।
    তাহলে "গয়লাদিদি গো, তোর ময়লা বড় প্রাণ!'' গাইলেও এরা জেন্ডার-বিকৃতি পেয়ে যাবে?
    নাঃ, বেঁচে থাকায় কোন সুখ নেই।

    ১৬)

    সেরেনার ফোঁপানো বন্ধ হয়েচে। হরিদাস বলে-- আমার কমেন্টের জন্যে মাপ করবেন। ঠিক ওরকম করে বলতে চাইনি, মানে---।

    --আবার? ওরকম করেই বলতে চেয়েছিলেন, এতে সাফাই দেবার কি আছে! আপনি ইমানদারীকে সাথ আপনার কর্তব্য করেচেন। আমাকে আয়না দেখিয়েছেন।
    আপনাকে জানাই আমি আসার আগে অন্ততঃ গত তিনামাসে দশ কেজি ওজন কম করে এসেছি, যদিও এটা যথেষ্ট নয়। আরো পনের কেজি কমানো দরকার।
    আর দিওয়ানী-টিওয়ানী নয়, ওই বাচ্চা মত সুরেশকে হেল্প করতে চাইছি, কিন্তু ও সাড়া দিচ্ছে না, এড়িয়ে যাচ্ছে।
    আবারও বলি-- আপনি আমাকে আয়না দেখিয়েছেন।

    ---- এটাই তো গ্রুপ এক্সার্সাইজের কাজ। ১৯৫০ এ আমেরিকায় আবিষ্কৃত টি-গ্রুপ মেথড।
    আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন? এটা " চোলি কে পিছে ক্যা হ্যায়' জানা নয়। গ্রুপের সদস্যেরা মিলেমিশে সবাইকে সবাইকে ডেটা দেয়, অর্থাৎ, আয়না দেখায়।
    সেই ডেটাকে মেপেজুকে কতটা স্বীকার করবো সেটা ব্যক্তির ব্যাপার। তার থেকে কেউ নিজের অন্তর্মনের চোলির পেছনে কি আছে তা জনলেও জানতে পারে।

    টি-ব্রেকের পর নিধি প্রশ্ন তোলে মেয়েদের ""মধুমক্ষী কা ছাত্তা'' বলার পেছনে বা ঘুমন্ত কারো ছবিতোলার পেছনে কি আছে তার আলোচনায়।
    গ্রুপ সিদ্ধান্ত নেয় যে এর পেছনে আছে মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় করার ইচ্ছে আর হীনমন্যতা- অম নোত উপ তো হের স্তন্দর্দ!
    নিধি শ্রবণকে বলেন-- মেয়েটিকে ভাল লাগে, ওর বন্ধু হতে ইচ্ছে করে একথা ওকে বলতে লজ্জা পাও কেন?
    ---ন্‌-না, ও বাত নেহি।
    -- ফির ক্যা বাত হ্যায়? এই সুন্দর মেয়েটিকে তোমার ভাল লাগেনা বলছ?
    -- হ্যাঁ, লাগে। লেকিন উয়ো তো শাদীশুদা হ্যায়!
    সবাই হেসে গড়িয়ে যায়।
    --- ও! সমস্যা হল যে অদিতি "" নো এϾট্র'' সাইন লাগিয়ে রেখেছে। ওকে ভাল লাগে বলতে সংকোচ, কিন্তু লুকিয়ে ফটো তোলার সময় মনে হয় নি যে ও বিবাহিত?
    বোকা ছেলে! এইসব না করে ওকে ভাল লাগলে সোজাসুজি বল। বিবাহিত হলেও সামাজিক গন্ডীর মধ্যে যে কয়-পা' দুজনার সম্মতিতে একসঙ্গে হাঁটা যায়, তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি তো নেই?

    অদিতি গোঁজ হয়ে থাকে।
    -- আচ্ছা, অদিতি, এই সাতজন পুরুষের মধ্যে কাকে কাকে তোমার বন্ধু হিসেবে পছন্দ?
    -- তিনজনের সঙ্গে ভালো করে আলাপ হয় নি। বাকি চারজন ওকে।
    --- সবচেয়ে কাকে?
    --- হরিদাস পালকে!
    সারা কামরা জুড়ে সমবেত হাসির হো-হো প্লুতস্বর। টেকো হরিদাসবাবু লজ্জায় অধোবদন হইলেন।
    -- এতে এত হাসির কি আছে?, অদিতির গলায় ফুটে ওঠেছে রাগের ঝাঁঝ।
    ও যে এই বয়সে নিজেকে সবার সামনে মেলে ধরতে সাহস করছে সেটাই অনেক। আর সবচেয়ে ধৈর্য্য ধরে সবার কথা শোনে। সবাইকে সাহায্য করে, স্পেস দেয়।
    -- হরিদাস, এবার তোমার পালা। তোমার অদিতিকে কেমন লাগছে?
    -- বিশেষ কিছু না।
    -- সে কি! মেয়েটাকে ভালো লাগে না?
    হরিদাস পাল আমতা আমতা করে।
    --লাগে না তা তো বলিনি।
    -- কেন লাগে?
    -- মানে, ও না আসলে আমার দিল্লিনিবাসী ভাইঝির মত খানিকটা, মানে চেহারায় একটু মিল আছে।
    হৈ হৈ করে হেসে ওঠেন নিধি।
    -- যাচ্চলে! দিল জল ঢেলে। এর মধ্যে ভাইঝিকে এনে শিখন্ডী দাঁড় করাচ্ছেন কেন? অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েকে দেখে ভাল লাগছে এটা স্বীকার করতে লজ্জা পাচ্ছেন কেন? কেন অপরাধবোধ? আপনার থেকে এত ন্যাকামি আশা করিনি।
    হরিদাস পাল কর্নারড্‌ হয়ে পাল্টা খেলে।
    -- সত্যি কথাটা বলি?
    -- তবে কি মিথ্যে কথা বলবেন?
    -- অদিতি, অপরাধ নেবেন না। কথাটা হল ও সুন্দরী কিন্তু আমার পছন্দের টাইপ নয়। একটু রূপুসী -ফুলটুসি টাইপ, আমি অনেক গেঁয়ো।
    --- ও, তাহলে ভাল লাগার কারণ? ওইসব ভাইঝি-টাইঝি ফয়েল বাদ দিয়ে?
    --- আমি হার্ডকোর ফেমিনিস্ট। ওই যে অদিতি কালকে বলেছিল না যে বস্‌ কে ভয় পায় ঠিকই, কিন্তু কিতনা ভি খুঁখার বস্‌ হো, গলত বাত হোনে পর ও প্রটেস্ট করেঙ্গী, ইসমেঁ দো রায় নহীঁ। ওর ওই ফাইটিং স্ট্যান্ড দেখে আমি ফিদা। বাইরে ছুঁইমুই, ভেতরে ফাইটার--- ভাল কম্বিনেশন, বুঝলেন কিনা।
    বিক্রম দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলেন-- এখানেও নিজেকে সুপিরিয়র দেখানোর চেষ্টা? রঞ্জন, আপনার অসুখ অনেক গভীরে, ভেবে দেখবেন। স্মার্ট হবার চেষ্টা না করে সিন্সিয়ার হলে তাড়াতাড়ি ফল পাবেন।
    দুপুরের খাবারের সময় যেন তাড়াতাড়ি এসে গেল। প্লেট ধুয়ে গুছিয়ে রাখার ফাঁকে রঞ্জন দেখে অদিতিকে, অদিতি চশমার ফাঁকে হাসছে।
    --- তোমাকে আমার খুব ভাল লাগছে অদিতি, ক্লাসে যাই বলে থাকি না কেন।
    ( এটা কি করলি! জীবনে কোন মেয়েকে ডাইরেক্টলি প্রোপোজ করতে পারিস নি। যখনি করেছিস, কোন বন্ধু বা বান্ধবীর মাধ্যমে। আর আজকে একটা আদ্দেক বয়সী মেয়েকে! নাঃ, দোষ তোর নয়, যত দোষ মুসৌরির, দোষ মেঘলা আকাশের, কুয়াশা চিরে বর্শার মত বাঁকা সোনালী রোদ্দূরের। আর আর ওই হিমালয়ের অপার্থিব সৌন্দর্য্যের।)
    মেয়েটির চোখ ঝিকিয়ে ওঠে হাসিতে।
    -- কেন বলুন তো? ক্লাসে আপনার সম্বন্ধে ভাল ভাল কথা বল্লুম বলে? কী, ঠিক বলেছি তো?
    পাশ দিয়ে থালাবাটি নিয়ে চলে যায় কিছু প্রতিভাগী, কথা বলতে বলতে যান কয়েকজন সহেজকর্তা। হটাৎ হরিদাস পালর খেয়াল হয় যে ওর হাতে ওই মেয়েটির হাত অনেকক্ষণ ধরে ধরা রয়েছে। মেয়েটি ছাড়িয়ে নেয় নি।
    -- ভবিষ্যতে দিল্লি আসলে খবর দেবেন, হরিদাসদা। দেখা করবো।
    -- আমি তো অনেক দূরে, সেই গুরগাঁওয়ে মেয়ের কাছে উঠি।
    -- তাতে কি, খবর দিয়েই দেখবেন, ঠিক পৌঁছে যাবো। আপনি খুব সুইট!

    হরিদাস পাল হতভম্ব, ওর কাছে একটু অস্বস্তিকর নতুন অভিজ্ঞতা।
    কফি ব্রেকের সময় বড়মেয়ের ফোন আসে।
    -- বিহেভিয়ার্যা ল সায়েন্সের ট্রেনিং কেমন চলছে বাবা? এই বয়সে তুমি করেক্ট বিহেভিয়ার শিখতে মুসৌরি গেছ এর চেয়ে বড় তামাশা কি হতে পারে?, মা বলছিল।
    -- এই তোর কিস্যু বুঝিস নি, কে বলেছে বিহেভিয়র শিখতে গেছি! গেছি মনের অন্ধকারকে জানতে।
    --কী দরকার! অন্ধকারকে না জেনে যদি জীবনের প্রথম ষাট বছর কেটে গিয়ে থাকে---।
    -- চুপ কর্‌, এই শোন-- একটি ইয়ং মেয়ে না আজ আমাকে ""হাউ সুইট'' বলেছে।
    --- উঃ বাবা, তোমার মত সেল্ফ-অবসেস্‌ড লোক খুব কম দেখা যায়।
    শোন, তোমাদের জেনরেশন আর আমাদের জেনারেশনের ইডিয়ম-মুহাবরা সব আলাদা। কাজেই বেশি লাফালাফি কোর না। আমাদের জেনারেশনের মেয়েরা "সুইট" বুড়োদের বলে।
    তুমি যা ভাবছ সেটা বোঝাতে বলে "" হাউ সেক্সি!''
    কি হল বাবা? জমীন পর আ গয়ে? এবার একটি হিন্দি মুহাবরা শোন । তারপর ক্লাসে যেতে যেতে মানেটা ভেবে বের কর।
    -" চৌবেজী চলে থে ছব্বেজী বননে, লৌট আয়ে দুবেজী বনকর।''
    ( চার আনার সাধ ছিল ছ'আনা হবে, ফিরে এল বেচারা দু'আনা হয়ে)।

    ১৭)
    বিকেলের দিকে অন্ধকার করে বৃষ্টি নামলো। জানলা দিয়ে হিমালয় সাদা ধোঁয়াশায় লেপা সুররিয়ালিস্ট ছবি হয়ে গেল। ঠান্ডা হাওয়ায় একটু একটু কাঁপন লাগছে। নিধির শরীর ভাল যাচ্ছিল না। এইসব তর্কবিতর্কের মাঝে উনি একটু জায়গা করে লম্বা হয়ে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ঘুমিয়ে পড়লেন।
    হরিদাস পাল নিধিকে দেখছে। কত শান্ত নির্ভরতায় ঘুমিয়ে পড়েছেন। এখন আর ওঁকে রহস্যময় নির্জ্ঞান মনের কুটিল-বক্রপথের নাবিক বা টারো কার্ডের রাণী মনে হচ্ছে না। বরং যেন পাশের্ব বাড়ির খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়া মেয়েটি।
    চওড়াকাঁধের গুঁফো চল্লিশছোঁয়া ভদ্রলোকটি একদিন দেরি করে এসেছেন।
    ফলে উনি বুঝতে পারেন নি যে গ্রুপ প্রথমদিনের একেকজনের জীবনের নানা পাঁচমেশালি গল্প শোনার স্টেজ ছাড়িয়ে গেছে।
    এখন গ্রুপ কথায় কথায় বলে- এরে & ণো-- য়েস; ঠেরে & ঠেন--ণো,
    আবার ধুয়ো ধরে-- অস্ত ইস ইস্তোর‌্য, উতুরে ইস য়্স্ত্র্য, রেসেন্ত ইস ওদ'স গিফ্ত।
    কাজেই কথা বল শুধু বর্তমান নিয়ে আর বর্তমানের অনুভূতি নিয়ে।

    উনি বল্লেন-- শ্রীমান ফটোগ্রাফার! এই যে আপনি একটু আগে আমার ওপর বল্লেন যে আমার কথা ঠিক স্পষ্ট হচ্ছে না, এটা পাঁচ বছর আগে কেউ বল্লে তাকে আমি মাটিতে শুইয়ে দিতাম।
    --কেন?
    -- যে অতীতকে আমি পেছনে ফেলে এসেছি, আপনি তাকে আবার সামনে নিয়ে এলেন।
    -- মানে?
    -- আমি ছোটবেলা থেকে একটু হক্‌লা ছিলাম। বাবা আমাকে দূরদূর করতেন।
    বলতেন- দু-দুটো মেয়ের পর একটি পুত্রসন্তান, সেও তোতোয়া?
    এতো জীবনে প্র্যাকটিক্যাল কিছু করতে পারবে না। আমাকে খাওয়াতে তো পারবে না, বরং আমার বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
    আমি মরমে মরে যেতাম। প্রাণপণে চেষ্টা করতাম যাতে বাবার সামনে ভাল করে কথা বলতে পারি। বাবার একটু প্রশংসা পাই।
    কিন্তু। যত এতসব ভেবে বাবার সামনে যেতাম, বাবা কড়া চোখে তাকাতেই সব গুলিয়ে যেত। কখনো-সখনো, বলতে লজ্জা নেই, প্যান্ট ভিজে যেত।
    বাবাকে এড়াতে শুরু করলাম। অধিকাংশ সময় কাটাতাম স্কুলে আর মাঠেঘাটে।
    কিন্তু কেউ আমাকে তোতলা বলে দেখুক তো, এমন মার মারতাম যে বাছাধন আর দ্বিতীয়বার পেছনে লাগতো না। মারতাম ও মার খেতাম।
    এমন মারতাম যে বিপক্ষের দাঁত, ঠোঁট কিছু রক্তাক্ত কান্ড।
    তারপর মার পড়তো আমার ওপরে। হয় বিরোধী দলের হাতে, নয় হেডমাস্টারের বেতের বাড়ি। তারপর বাড়িতে খবর গেলে বাবা তো আছেনই।
    কিন্তু একদিন এল যা আমি জীবনে ভুলতে পারি নি।
    আমার মা মারা যেতেই একমাসের মধ্যে বাবা আবার বিয়ে করলেন।
    নতুন মা আমার থেকে মাত্র একবছরের বড়।
    -- তো?
    --- আমি আর থাকতে পারলাম না। একটি পনের ইঞ্চি ছুরি ধার দিয়ে জামার মধ্যে লুকিয়ে একদিন বাবার অনুপস্থিতিতে মার ঘরে এলাম। উদ্দেশ্য? মাকে খুন করব।
    সবাই চুপ।
    নিধি বল্লেন-- এইসব গল্প শুনে বক্তা রামজীবন তিওয়ারির সম্বন্ধে আপনাদের কী কী অনুভূতি হচ্ছে কেউ বলবেন কি?
    ফুলটুসি বলে উঠলো--- বলার কি আছে? ফালতু লোক। এই অরুচিকর কাহিনীটি অন্ততঃ আমি শুনতে রাজি নই।ইন ফ্যাক্ট, আমার সন্দেহ ঘটনাটি আদৌ সত্যি নয়। বাবাজীবন এটা রঙ চড়িয়ে বলছে, যাতে আমাদের সহানুভূতি পায়, মেয়েদের ইম্প্রেস করে দেরীতে আসা মাপ হয়ে গিয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
    সব মিলিয়ে ফুটে উঠছে এমন একটি ইতর মানুষের ছবি আমি যার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইনা।
    রামজীবন তিওয়ারি বল্লেন-- আপনারা ভাবতে পারেন যে আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি বা রঙ চড়িয়ে বলছি। সেটা আপনাদের প্রেরোগেটিভ, আমি কি বলব!
    কিন্তু এখানে আমি মিথ্যে বলতে আসিনি।
    সেরেনা বল্লেন-- আপনি মেয়েদের ইম্প্রেস করতে এসব বানিয়ে বলছেন তা বলছিনে। কারণ এইসব গল্পে মেয়েরা আদৌ ইম্প্রেস হয় না। কিন্তু বীভৎস রসের গল্পে সবার চোখ আপনার দিকে যাবে, তাতো নিশ্চিত। কিন্তু ছোটবেলায় কি করেছিলেন সেসব এখন বলতে গেলে আপনার অজ্ঞাতসারেই একটু কল্পনার রঙ লেগে যায়। তাই বলছি এসব কেন বলছেন?
    রামজীবন কিছু বলার আগে হরিদাস পাল বলে ওঠে - আমি কিন্তু ওই গল্পের পরিণতিটুকু জানতে ইচ্ছুক। আপনি পনের ইঞ্চি ছুরি নিয়ে সৎমাকে মারতে গেলেন। কিন্তু মারলেন না কেন? মানে সত্যি সত্যি মেরে থাকলে হয়তো সারাজীবন জেলে থাকতেন। কিন্তু এখন জ্বলজ্যান্ত আমাদের সামনে বসে গল্প শোনাচ্ছেন তো, তাই বলছি।
    --- আহা উনি হয়তো জুভেনাইল ডেলিংকোয়েট হিসেবে ""বাল অপরাধ সংশোধনাগার'' এ কিচুদিন কাটিয়ে এসেছেন। আফটার অল্‌, তখন ওনার বয়স কত ছিল তা দেখতে হবে না!
    কেউ ফুট কাটে।
    বিক্রম শোলাংকি হাত তুললেন--- ওনাকে বলতে দেয়া হোক, যদিও এসব হেরে অন্দ নো না হয়ে থেরে অন্দ থেন ক্যাটিগরিতে পড়ছে।
    -- হ্যাঁ, আমি ছুরি নিয়ে সৎমাকে মার্ডার করতেই গেছলাম। মেরেই দিতাম কিন্তু মারতে গিয়ে টের পেলাম যে মা অন্তঃসঙ্কÄ¡, মায়ের পেটে বাচ্চা রয়েছে।
    সেই বাচ্চা আমার সবচেয়ে ছোটবোন। আমিই ওকে আজ বড় করে লেখাপড়া শিখিয়ে তারপর বিয়ে দিইয়েছি।
    -- কেন, আপনার বাবা?
    -- বাবা ওই ঘটনার পর আর বেশিদিন বাঁচেন নি।
    গল্প বেশ জমে উঠেছে এমন সময় দুই ফেসিলিটেটর, থুড়ি সহেজকর্তা ভাবলেশহীন মুখে উঠে রওয়ানা দিলেন।
    মহা বেরসিক তো!

    রাত্তিরে খাওয়াদাওয়া কোন রকমে শেষ হয়েছে এমন সময় আলো চলে গেল।
    নিকষকালো আঁধার। শুধু এখানে নয়, সামনে হিমালয়ের কোলে কোথাও কোন আলোর রেখা নেই। বাইরে ঝুপঝুপিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। ভেজা হাওয়ায় কেমন যেন শিহরণ। কোনরকমে হাত-টাত ধুয়ে পেছল পাকদন্ডী পথে অন্যের হাত ধরে আর মোবাইলের আলোয় পথ দেখে নিজের ঘর এবং বিছানায় পৌঁছনো গেল।
    আজ রাতে বিজলী আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
    হরিদাস পালের ভুতের ভয় নেই। তবে সাপ আর আরশোলার ভয় আছে। এখানে পাহাড়ের ওপর সাপ থাকার কথা, যদি একটা দুটো অন্ধকারে এই বৃষ্টির চোটে ঘরে ঢোকে, তারপর বিছানায়! বা রাত্তিরে ইয়ে পেলে বিছানা থেকে নামতে গেলাম আর পা পড়ল একটা ঠান্ড হিলহিলে কারো গায়ে।
    পাহাড়ি চিতি বা অজগর! আফ্রিকান ব্ল্যাক মাম্বা!
    দূর ছাই! আফ্রিকান মাম্বা হিমালয়ের কোলে কোত্থেকে? কোথায় যেন পড়েছিল ব্ল্যাক মাম্বা সাপের কথা? ছোটবেলায় শুকতারা মাসিক পত্রিকায়? না না, বিভুতিভূষণের "" চাঁদের পাহাড়''।
    ঘুমটা সবে এসেছে, এমন সময় এক ঝটকায় ও উঠে বসল।
    অন্য উইং থেকে জনাকয় ছেলে গান গাইছে। পরিচিত গান। ছোটবেলার হিন্দি ফিল্মি গান। দেশাত্মবোধক গান।
    "" আও বাচ্চো, তুমে দিখায়েঁ ঝাঁকি হিন্দোস্তান কী। ইস মিট্টিকে তিলক করোঁ ইয়ে ধরতী হ্যায় বলিদান কী।''

    আরে ! মূল গানটা এরা বদলে দিয়েছে! তার বদলে গাইছে এক অশ্লীল প্যারডি।
    -"" আও বাচ্চো তুমে দিখায়েঁ ঝাঁকি ফিল্মিস্তান কী, নুতন কো তুম--''
    অশ্লীল ক্রিয়াপদের ব্যবহারে অন্ধকারে বিশাল হল ঘরের একপ্রান্ত থেকেঅন্যপ্রান্ত অবধি বয়ে যায় হা-হা হাসির ঢেউ।
    এবার অন্যপ্রান্ত থেকে কোরাসে শোনা যাচ্ছে অন্তরার লাইনগুলো
    -- "" বৈজন্তীমালাকে পিছে দেবানন্দ যব দৌড়া থা,--""
    বর্ণনা বেশ চিত্রময় তো, ডিটেইলস্‌ এর কাজে ভর্তি। হরিদাস পালের ভেতর থেকে একটা হাসি কুলকুলিয়ে ওঠে।
    আচ্ছা, এই অশ্লীল প্যারডি কি করে হিন্দি বলয়ের লোকজন , রাজস্থান থেকে ইউ পি, মধ্যপ্রদেশ- সবাই জানে? কয়েকদশক ধরে? সেই শ্রুতি সাহিত্যের মত? সাব অল্টার্ন শ্রুতি না কি লোকগাথা?
    এইসব সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে হরিদাস পাল ঘুমিয়ে পড়ে।

    শিশুবিদ্যাপীঠ গার্লস্‌ স্কুল। কিন্তু ক্লাস ফাইভ অবধি ছেলেদের নেয়া হয়। রঞ্জন গেছে নতুন খাতা-বই সব নিয়ে সেশনের শুরুতে,ক্লাস থ্রি বিতে। ওরা পাস করে নতুন ক্লাসে এসেছে। একে অন্যের বইখাতা পরীক্ষা করে দেখছে। কার মলাট কেমন। কে নাম,ক্লাস বিষয় লেখা চৌকো লেভেল কেমন করে বইয়ের মলাটে বা খাতার মলাটে লাগিয়েছে।
    একজন বইয়ের শুরুতে কায়দা করে লিখেচে--
    এই বই যে করবে চুরি,
    পেটে তাহার পড়বে ছুরি।
    সামনে আছে পুলিশ ফাঁড়ি,
    ধরিয়ে দেব তাড়াতাড়ি।।
    বেশ তো, কিন্তু "ফাঁড়ি' কাকে বলে?
    সে কি রে! ফাঁড়ি কাকে বলে জানিস না? দাঁড়া, ফাঁড়ি হচ্ছে--।
    ক্লাস টিচার প্রতিভাদির হাত ধরে ক্লাসে ঢুকছে সাদা টপ ও নেভি ব্লু স্কার্ট পরা একটি মেয়ে। তার সদ্য বেঁধানো কানে সোনার পাতলা তার। কিন্তু এদিক-ওদিক ছটফট করা উজ্বল চোখজোড়া যেন মার্বেল খেলার কাঁচের গুলি।
    টিফিনের চুটির পরের ক্লাস থেকেই ও এসে রঞ্জনের পাশের খালি জয়গাটিতে বসে পড়ে। ওর নাম অর্পিতা। ওর বাবা চন্দ্রপুরা থেকে বদলী হয়ে এসেছেন।
    পিরিয়ডের ফাঁকে ও রঞ্জনকে শিখিয়ে দেয় শ্যামল মিত্রের হিট গান "" চিনি আমি চিনি, ওগো নন্দিনী''র প্যারডি।
    '' গুনি আমি গুনি, সেইদিন গুনি,
    কবে হবে মোর সহধর্মিণী''।
    বেশ মজার তো!
    "" দেখেছি তোমায় আমি দুপুর বেলায়,
    কলেজের ফাঁকে আর সিনেমাতলায়''।
    ছুটির পর বাড়ি ফিরে জামাপ্যান্ট বদলাতে বদলাতে ও গাইতে থাকে সদ্যশেখা দ্বিতীয় অন্তরা।
    "" তোমার বাবাকে তুমি বুঝিয়ে বলো,
    বেকার হলেও আমি ছেলেটি ভালো।
    প্রেম করে আমি তো গো কেটে পড়িনি''।
    -- আর একবার যদি এইসব ফালতু গান গাইতে শুনি তবে তোর স্কুল থেকে নাম কাটিয়ে দেব।''
    ছোটকা কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে থাকেন।

    --উঠিয়ে হরিদাসজী! নাস্তা কা টাইম হো গিয়া। কিতনা সোতে রহোগে?
    জানলা দিয়ে ঢুকে বিছানায় গড়াচ্ছে সোনালী রোদ্দূর। হেসে উঠছে বৃষ্টিস্নাত হিমালয়ের পাহড়চুড়ো গুলো।

    ১৮)
    আজকে সকাল থেকেই চারদিকে একটা খুশি খুশি ভাব। হলকা মেঘের বাংলাদেশের শরৎ সকালের মত অলস গতিতে ভেসেযাওয়া আর ঝিকিমিকি রোদ্দূরের ছোঁওয়া হিমালয়ের গায়ের চাদরের মিনিটে মিনিটে রঙ বদলানো,-- কোথাও একটা ছুটি ছুটি ভাব। এখানে বি এস এন এল আর রিল্যায়েন্স মোবাইল কাজ করছে না। ফলে অল্পবয়সী ছেলেছোকরার দল লাজুক মুখ করে হরিদাস পালের কাছে ওর এয়ার টেল মোবাইল চাইছে, বউয়ের সঙ্গে যে একটু কথা বলা দরকার।
    হরিদাসবাবু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অতিপ্রিয় ""বড়ে ভাইয়া'' বা ""তাউজী''(জ্যেঠু) অবতারের রূপ ধরলেন।
    -- হ্যাঁ, হ্যাঁ, বেটার হাফের সঙ্গে কথা বলবে বৈকি! না হলে অন্যায় হবে। না-না, একটু কেন, বেশি করে, বেশ অনেকটা করে কথ্‌গা বল। বিল-টিল নিয়ে তোমাদের চিন্তা না করলেও চলবে; আমার পোস্ট-পেড্।
    দলের মধ্যে যে আশুকবি, অর্থাৎ চটজলদি ছন্দ মিলিয়ে অন্ত্যমিল দিয়ে ছড়া বানাতে পারে, সেই ফচকে কল্‌কল্ করে ওঠে।
    --ও কিতাব, কিতাব নহীঁ,--- জিসকা কোঈ কভার নহীঁ,
    ও লড়কী, লড়কী নহীঁ,--- জিসকা কোঈ লাভার নহীঁ।
    ও রায় সাহাব ভী সাহাব নহীঁ, গর দারু পিকে "সোবার' নহীঁ।

    (মলাট- না-জোটা বইগুলো সব করুণ রয়েছে চেয়ে,
    নবযৌবনে জোটেনি প্রেমিক? সেই বা কেমন মেয়ে!
    হরিদাস রায়, চেষ্টা চালায়, কিন্তু বড়ই ঢ্যাঁটা ,
    দু-ফোঁটা পেটেতে গেলে বেসামাল,সায়েব বলিবে কেটা?)

    সবাই হেসে ওঠে। কিন্তু এই হতচ্ছাড়া ছড়া শুনে হরিদাসর হাড়পিত্তি জ্বলে যায়।
    -- অ্যাই শোন্‌, তোর কাব্যপ্রতিভা রেলগাড়ির বাথরুমে গ্রাফিতি লেখার জন্যে একেবারে ফিট।
    ---- রেগে যাচ্ছেন কেন সাহেব, আর দুদিন পড়েই সব ঘরে ফিরবে, সেই আনন্দ! তন্ত্রসাধনার গুহা থেকে মুক্তির আনন্দ।

    ১৯)
    আজকে ক্লাসরুমে আরো এক আপদ! দ্বিতীয় দিন থেকেই চল্লিশের ছোঁয়া লাগা চশমা পড়া একজন এককোণায় একটি থামের আড়ালে প্রায় নিজের অস্তিত্বকে লুকিয়ে সময় কাটিয়ে দিচ্ছিলেন। আমরা কেউ তাঁকে দেখেও দেখিনি।
    কিন্তু সহেজকর্তা থুড়ি ফেসিলিটেটর দুজনের চোখকে ফাঁকি দেয়া গেল না।
    আজকে নিধি ধরলেন শ্রীমান সদাশিবনকে।-- আদ্দেক দিন কেটে গেছে। আপনি বোধহয় মুচকি হাসি ছাড়া কিছুই কϾট্রবিউট করেন নি। ব্যাপারটা কি?
    --- কিছু না। (ফের মুচকি হাসি।)
    -- শুনুন, এটা তো একটা গ্রুপ এক্সারসাইজ। লক্ষ্য ব্যক্তিমানুষ। তার অবচেতন মন কে চেনাজানা। কিন্তু সে একা নিজেকে কোন সাহায্য করতে পারে না। সমষ্টির আয়নায় প্রতিফলিত হয় ব্যষ্টির চেতন, তার ব্যক্তিত্বের আসলি ছবি।
    এখানে আপনার পার্টিসিপেশন প্রায় শূণ্য। এমনটা কেন? আপনার এই মুহূর্তে ট্রু ফিলিং কী? সেটা অন্ততঃ আমাদের কাইন্ডলি জানান।
    -- আমার ফিলিং হল উদাসীনতা। আমি আপনাদের জন্যে কিছুই ফিল করছি না।
    --- আর নিজের জন্যে?
    --- কবে এই প্রোগ্রাম শেষ হবে। কবে বাড়ি ফিরব? অনেক কাজ পড়ে আছে।
    ফুলটুসি অদিতি চটে যায়।
    -- এত আমাদের জন্যে ইনসাল্টিং!
    ওকে থামিয়ে দিয়ে সেরেনা বলে-- তবে এলেন কেন মশাই? ঘরে থেকে দরকারী কাজগুলো সেরে আসলেই পারতেন!
    সদাশিবন আবার হাসেন। বেশ ভূবন ভোলনো হাসি।
    -- আমিও তাই ভাবি, মরতে এখানে কেন এসেছি! এরকম ট্রেনিং অনেক করেছি। আগের কোম্পানীতে থাকার সময় কোলকাতায় পোস্টিং ছিল। তখন জোকায় আই আই এম এ এইসব করেছি। আপনারা এনজিও ওলাদের জন্যে এসব নতুন ব্যাপারস্যাপার। কিন্তু আমি কর্পোরেটের পোড় খাওয়া লোক। শুনুন ম্যাডাম, এটাকে বলে ট Rঊ টড ।
    আমার এসবে কোন লাভ হয় নি। সবার জন্যে হোমিওপ্যাথির সাদাগুলির চিকিচ্ছে নয়।
    -- তাহলে আবার এয়েচেন কেন, বলুন দেখি!
    হরিদাস পালের গলায় ব্যঁগের সুর।
    সদাশিবন হেসে ফেলেন।
    -- আরে হরিদাসবাবু! চটে গেলেন কেন? মাইরি বলছি নতুন কোম্পানী আমাকে ঠেলে ঠুলে পাঠিয়েছে। বলছে আমার কোন পরিবত্তন আসবে। দূর!
    সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে সদাশিবনকে সদাশিব হয়েই থাকতে দেয়া যাক।

    কিন্তু আজকে গপ্পো তেমন জমছে না। ঘরের মধ্যে কোথায় একটা চাপা অস্থিরতা। বাইরে এই মেঘে ঢেকে যাচ্ছে চারদিক- পাহাড়ের রেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার নীল নীল ধোঁয়া ধোঁয়া চাদর সরিয়ে দিয়ে হেসে উঠছে হিমালয়।
    রামজীবন বিড়বিড় করছেন।
    -- আমি বাবার প্রভাব থেকে বেরোতে পারিনি। সারাজীবন চেয়েছি বাবা আমাকে ছেলে বলে স্বীকার করুক। আমি চেয়েছি বাবার মত রাফ-টাফ হতে।
    আমিও চেয়েছি এক সন্তান, অবশ্যই ছেলে যে আমার মত তোতোয়া হবে না, কিন্তু জবরদস্ত পুরুষমানুষ হবে।হ্যঁআ, অনেকটা আমার বাবার মত।
    তাই যখন আমার প্রথম স্ত্রীর পেটে পাঁচবছর বিয়ের পর বাচ্চা এলনা, আমি দ্বিতীয় বার দারপরিগ্রহ করলাম।
    -- দূর মশাই! চুপ করুন, আপনার এসব ভন্ডামির গপূ শুনতে আমরা চাইনি।
    সেরেনা বলে-- আমার বিরক্ত লাগছে, কেমন গা গুলোচ্ছে।
    -- আপনারা আমাদের পাহাড়ি গাঁয়ের সেন্টিমেন্ট বুঝবেন না। আমার স্ত্রী'র সম্মতি নিয়েই করেছি।
    -- জানা আছে। ওই যে হরিয়ানার জাঠদের খপ পঞ্চায়েতের অনার কিলিং, তারাও ওই সব বলে। গ্রামীণ সমাজ, পরিবারের সহমতি, সম্মান --এইসব।

    ফুলটুসি বলে-- কালকেই বলেছিলাম, ইনি এইসব গপ্পো বলে আমাদের, বিশেষতঃ মেয়েদের নজরকাড়তে চান, সস্তা সহানুভূতি পেতে চান। আর আজকে মনে হচ্ছে , শুনতে খারাপ লাগবে-- একজন মেল শভিনিস্ট পিগ!
    রামজীবন তিওয়ারির চোখ একবার জ্বলে উঠলো, তারপর ও চোখ নামিয়ে নিল।
    ফেসিলিটেটররা চুপ। নিধি যেন কথা ঘুরিয়ে দেবার জন্যে জিগ্যেস করলেন -- রায়জী! আপকা খুদ কে বারে মেঁ ক্যা কহেনা?
    মুচকি হেসে শোলাংকি বল্লীন-- উনি আর কি বলবেন! উনি তো এপাড়ার সর্বজ্ঞ জেঠু।

    ২০)
    দুপুরে লাঞ্চের ফাঁকে হরিদাস পাল ধরে সুরেশকে।
    --হ্যাঁ রে, তুই এত ভাল ছবি তুলিস, একটা এস এল আর আর একটা ডিজিটাল, আরও গত কিছু গ্যাজেট নিয়ে এসেছিস। তোর এন জি ও কোন ফিল্ডে কাজ করে? ছত্তিশগড়ে আসবি?
    আর সত্যি তুই বস্তারে গেছিলি? তোর দাদা ওখানের সরকারি কর্মচারী। আমাকে নিয়ে যাবি? ওখানে কি হচ্ছে কিছু জানিস? আলাদা করে বলিস তো!
    --- আমরা কাজ করি ভোপালে ঝোপড়পট্টি এলাকার কাগজ কুড়োনো বাচ্চাদের নিয়ে। এরা রাস্তাঘাটে গাটারে খেলে বড় হয়, ছোটবেলা থেকেই পান-মশালা-বিড়িতে আসক্ত হয়। আর বীভৎস গরীবি এবং কঠিন পরিস্থিতিতে বড় হতে হতে এরা ছোটখাটো চুরি এবং অন্য অপরাধের জগতে এϾট্র নেয়। বড় হয়ে বিভিন্ন পাওয়ার লবি ও রাজনৈতিক শক্তির ক্যানন ফডার হিসেবে জীবন কাটায়, তারপর অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
    আমরা চেষ্টা করি ওদের পাড়ায় গিয়ে ওদের ঘরের কাছে বিনাপয়সায় প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে ধীরে ধীরে মূলস্রোতের পড়াশোনার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে।
    দ্বিতীয় সেশনের সময় সুরেশ বসে হরিদাসের পাশে। এবার নিধি ধরেছেন সুরেশকে।
    -আমাদের হাতে আছে মাত্র দুটো দিন। এখনো তুমি খালি হিমালয়ের ছবি তুলে বেড়াচ্ছ। তোমার ভেতরের সুরেশকে দেখাতে চাও না?
    -- সাহস নেই। শুধু যে দেখাতে চায় না তাই নয়, জানতেও চায় না। অন্যের আয়নায় নিজের চেহারা দেখার সাহস নেই, নিজের সম্বন্ধে একটা মনগড়া ধারণাকে বেলুনের মতন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আত্মতৃপ্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
    সবাই চুপ। সুরেশএর চশমার ফাঁকে চোখ দুটো কি একটু বেশি জ্বলজ্বল করছে? হরিদাস পাল সুরেশকে কনুইয়ের খোঁচা মারে, ফিসফিসায়-- কিছু বল, এরম করিস না।
    অস্বস্তিকর নীরবতা। চা দিয়ে গেল।
    কথা শুরু হয়। কাল শেষ। আজ রাত্তিরে ক্যাম্প ফায়ার।অদ্যই শেষ রজনী। হরিদাস নিধিকে ধরে। রাস্তার ধ্বস তো মেরাম্মত হয়ে গেছে ? না, হয় নি। ফলে ট্যাক্সি দু'কিলোমিটার দূরে খাদের ধারে ধ্বসের ওপার অব্দি আসবে। কিন্তু দু'কিলোমিটার মাল টেনে নিয়ে যাওয়া? মেয়েদের জন্যে? মাল বওয়ার কুলি পাওয়া যায়। নাম লেখান, গাড়ি ও কুলি দুই আসবে।
    আর ক্যাম্প- ফায়ারের জন্যে চারটি আলাদা গ্রুপকেই আধঘন্টা করে সময় দেয়া হবে, গান-নাচ-কবিতা- স্কিট কিছু না কিছু করতেই হবে। আজ রাত্তিরে খাওয়াদাওয়ার পর বারান্দায় রিহার্সাল।
    ফক্কুড়ি-স্বভাবের হরিদাস পাল পরামর্শ দেয় যে অন্যান্য প্রোগ্রামের শেষে ছয় দশক আগের হিট ফিল্মি গান "" নজর লাগি রাজা তোরে বাংলো পর'' কোরাসে গাওয়া হোক, সেরেনা লীড করবে আর অন্যেরা নাচবে। -- দেখ্‌না, একদম ভব্বর মচ্‌ যায়েগা!
    কি আশ্চর্য, এই ফক্কুড়ি প্রস্তাবটি সবাই স্বীকার করে নেয় এক শর্তে,-- শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকা হরিদাস পালকে ঠুমকা লাগিয়ে নাচতে হবে আর আজ রাতের রিহার্সালে তার নমুনা পেশ করতে হবে।
    -- এক বাত শুনিয়ে!
    সবাই চমকে তাকায়। দাঁড়িয়ে উঠেছে সুরেশ, উত্তেজনায় একটু যেন বেঁকে আছে।
    -- আপনারা আমাকে নিয়ে বিব্রত আমি বুঝতে পারছি। আমি কি করব, আমি এখানে সবার সঙ্গে আছি কিন্তু মন পড়ে আছে ভোপালে এককামরার একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে আমার অপেক্ষায় থাকা মায়ের জন্যে। আমি আপনাদের সঙ্গে কি শেয়ার করবো? আমর ছোটবেলায় বাবা মাকে ছেড়ে চলে গেছে, কোন দায়িত্ব নেয়নি। পড়াশুনোয় ভালই ছিলাম। কিন্তু মা আমাকে ভাল কলেজে পড়াতে পারেনি। ছবিতোলা নিজে-নিজেই শিখেছি। এখন সামান্য মাসোহারায় এন জি ও তে কাজ করি, মা আর আমি থাকি। আপনাদের কিছু মিথ্যে বলেছিলাম। বস্তারে আমার পিসতুতো দাদা থাকেন, একবারই গিয়েছিলাম। অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিছুই হয় নি। তবু যখন কাজের পরে মাঝরাত্তিরে বা ভোরবেলায় বাড়ি ফিরি মা এসে ভাত গরম করে বেড়ে দেয়। হাসিমুখে আমার গল্প শোনে, নিজের গল্প বলে, তখন আমার আর কোন দুঃখ থাকে না।
    তাই আমি দিন গুণছি কখন ভোপাল ফিরব।
    এবার ওর গলা ভেঙে যায়, রুমাল বের করে চোখ মোছে। সেরেনা এগিয়ে আসে,-- কাম অন্‌ সুরেশ! ডোন্ট স্ট্যান্ড অন সেরিমনি, আই লাইক টু গিভ এ হাগ!
    ঘরের আর এক কোণ থেকে শ্লথ পায়ে সুরেশ এগিয়ে আসে, অন্যেরা পথ ছেড়ে দেয়। রোগাপাতলা তেলেগু সুরেশ আর দশাসই সেরেনা আলিঙ্গনাবদ্ধ।
    কিন্তু হরিদাস পাল কিছুই দেখতে পায় না। ওর ঝাপসা চোখের পর্দায় ভেসে উঠেছে অন্য একটি পুরনো বাতিল চলচিত্র।
    সিকোয়েন্স -এক, বরানগর রামকৃষ্ণ মিশনের হস্টেল থেকে টেন পাস হওয়া হরিদাস পালকে টিসি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ভর্তি হতে হবে পাড়ার নাকতলা হাই স্কুলে। রোববারের সকাল। মা ডাকছে-- ওঠ, উইঠ্যা পড়। পড়তে বস্‌। সাতদিন পর তর অ্যাডমিশন টেস্ট। পড়বি না? সকাল আটটা বাজে যে!
    হরিদাস পাশ ফিরে লেপ টেনে নেয়। কোন শালা পড়ে! আইজ যে রোববার। মেট্রো সিনেমায় সোফিয়া লোরেন আর জর্জ পেপার্ডের বই "" অপারেশন ক্রসবো'' দেখতে হবে পঁয়তাল্লিশ পয়সার টিকিটে। সাড়ে দশটায় মেট্রো গেলেই হবে।

    সিকোয়েন্স দুই-- সত্তরের গোড়ায় হরিদাস পাল বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। ভিলাই থেকে মা-বাবা আসার খবর পেয়ে দেখা করে জানিয়ে দেয় সে বাড়ি ফিরবে না আর। সার জেনে গেছে -এই ব্যবস্থায় যে যত পড়ে সে তত মুর্খ হয়!
    ক্রুদ্ধ বাবার মুখ আর কাঁদতে কাঁদতে ফিট হওয়া মায়ের মন্তাজ ওকে তাড়া করে বেড়ায়।

    সিকোয়েন্স- তিন,
    ভিলাইয়ের বড় ডাক্তার জানিয়েছেন যে হরিদাস পালর দুই ফুসফুসেই চাঁদের পাহাড়ের ছবি। যক্ষ্মার অ্যাডভান্সড স্টেজ। ওষুধের সঙ্গে ভগবানের কাছে প্রার্থনা ও দরকার। কাঠের পুতুলের মত ভাবলেশহীন মুখে সারাদিন ওষুধ-পথ্য দিয়ে যান মা স্মৃতিকণা। ঘড়ির কাঁটা ধরে।
    মাঝরাতে উঠে বাথরুম যাওয়ার সময় হরিদাস শুনতে পায় পাশের অন্ধকার ঘরে চাপা কান্নার শব্দ,

    সিকোয়েন্স চার,
    মায়ের গনগনে চেহারা।
    -- একটা কথা বলতে চাই। আমাদের ভাড়াটে অল্পবয়সী বউটি আমাদের আশ্রিত। ওর সম্মানের দায়িত্ব আমাদের। ও যখন পাঁচিলের ওপাশে চান করে তুই উঁকিঝুঁকি মারিস কেন? লজ্জা করে না? আমার করে।

    সিকোয়েন্স পাঁচ,
    হরিদাস পাল ফিরেছে ব্যাংক থেকে ট্রেন ধরে।
    হাতমুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে কম্পু খুলে বসবে- গুরুচন্ডালি সাইটে কি হচ্ছে!
    -- কি রে আজ যেন দেরী হল? ট্রেন লেট ছিল?
    -- না, রোজ তো এই সময়ই ফিরি।
    --রাগ করিস না, আমি আজকাল কানেও কম শুনি, চোখেও ছানি পড়েছে। কি বলতে কি বলে ফেলি, আমার ওপর রাগ করিস না।

    চটকা ভাঙে নিধির কথায়-- আরে পালজী! আপ কা ক্যা হুয়া?

    ২১)
    পরের দিন ফেরার তাড়া। কিন্তু সকালে দুটো সেশন ঠিকই হয়।
    হরিদাস পালের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিক্রম বলেন -- আপনি ডাক্তার কমপ্লেক্সে ভোগেন। যে যাই বলুক, সব ব্যাপারে আপনার কিছু বলা চাই। কারণ আপনি এদের মধ্যে সিনিয়র। সমস্ত সিচুয়েশনের জন্যে আপনার কাছে আছে ওষুধের পুরিয়া।ঝোলা থেকে বের করে দিতে থাকেন। পেট্‌খারাপ? এটা খাও; জ্বর হয়েছে? এইটা নাও; মাথাব্যথা করছে? কোন ভয় নেই? এই দেখ, এইটা এক দাগ খেয়ে দেখ! এই হল আপনার স্ট্র্যাটেজি। আপনি ওমনিপোটেন্ট, ওমনিশিয়েন্ট!
    আর আছে আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলি। তাতে আছে সব রঙবেরঙের গল্প।ওগুলো ডেইলি লাইফে কোন কাজে আসে না। হ্যাঁ, আপনার বাংলা ওয়েব ম্যাগাজিন, গুরুচন্ডালি না কি বল্লেন, তাতে লিখলে লোকে দাদ দেবে, ওয়া-ওয়া করে উঠবে। কিন্তু দয়া করে ওগুলোকে সর্বরোগহর বটিকা বলে চালাবেন না। আপনার অনুভবের ওপারেও দুনিয়া আছে।
    হরিদাস পাল চটে যায়।-- কাউকে সাহায্য করতে চাওয়া কি খারাপ?
    --- কেন খারাপ হবে? কিন্তু আপনি আগ বাড়িয়ে অযাচিত সাহায্য করতে চান। তার দুটো দিক। এক, আপনি জানলেন কি করে তার সাহায্যের দরকার আছে কি না,? দুই, তাকে আপনি দুর্বল ভাবলেন কি করে? সে সাহায্য চায় নি, তাকে অশক্ত ভেবে কি আপনি অপমান করছেন না? ভেবে দেখুন। তিন, এর পিছনে মোটিভেশন খুঁজুন, পাবেন যে আপনি চান সবাই আপনাকে মহান ভাবুক। আপনি যে সে ন'ন,-- গ্রেট হরিদাস পাল; দি হরিদাস পাল!
    এবার আসরে নেমেছেন নিধি, -- আপনি নিজেকে কি ভাবেন?কেমন শক্তিধর আপনি?
    হরিদাস উবাচ-- অ্যান অর্ডিনারি ম্যান উইথ অ্যান অ্যাভারেজ ক্যাপাবিলিটি।
    -- দেয়ার য়ু আর! দেন হোয়াই শুড য়ু বিহ্যাভ লাইক অ্যান একস্ট্রাঅর্ডিনারি পার্সন?
    বিহ্যাভ নর্মালি; ডীল উইথ আদার অ্যাজ ইয়োর পীয়ার- নট অ্যাজ ইয়োর পেশেন্ট।
    ওদিক থেকে তোতলা ছেলেটি বলে-- দাদা, মাজীকে বারে মেঁ ক্যা বিচার?
    -- আমি রায়পুরে ফিরেই ঘরে ঢুকে সবচে আগে মার সঙ্গে কথা বলবো।আর রোজ মার সঙ্গে আধা ঘন্টা নিয়ম করে আড্ডা দেব।
    আমার মেয়েরা ফোন করে বলে,- বাবা, ঠাম্মাকে জামাকাপড়-খাওয়া-বিছানা-বই-টিভি দিলেই হল না, কথা বল। অনেক পুরোনো গপ্পো বার-বার শোনাবে, ধৈর্য্য ধরে শুনবে। এগুলো তুমি ছাড়া আর কার সঙ্গে বলবে! তুমি যদি শোন, ঠাম্মাকে সঙ্গ দাও, তাহলে ঠাম্মার আয়ু হয়তো আরো কয়েক বছর বেড়ে যাবে।
    সুরেশ বলে-দাদা, এখন এসব বলছেন, বাড়ি গিয়ে মনে থাকবে তো? আমি কিন্তু ফোন করে জিগ্যেস করব।
    সেরেনা ও ফুলটুসি অদিতি চেপে ধরে হরিদাস পালকে,-- অর্ধাঙ্গিনীর কথা বলুন। তার সঙ্গে কি ডীল করে থাকেন? ঘরে কতটা সোশ্যালিস্ট আপনি? ওনাকে জিগ্যেস করলে কি শুনতে পাব আমরা?
    --- ও বলবে, বিয়ে কেন করলে? ভাবভঙ্গী দেখলে মনে হয় এখনো মিশনের হোস্টেলে দিন কাটাচ্ছ। সকালে চা বানানো থেকে বাজার করা, রান্না করা, কাপড় ধোয়া কোনটায় হাত লাগাও না। একটা বই নয়তো কম্পিউটারে গুরুচন্ডালি। তারপর আছে আড্ডা, নাওয়া খাওয়া ভুলে যাও । আর নাটকের রিহার্সাল হলে তো কথাই নেই।
    --- তখন আপনি কি বলেন?
    -- কোন্‌ কাজটা তুমি বলেছ আর আমি করিনি বা করবো না বলেছি?
    উত্তরে শুনতে হয়,-বলতে হবে কেন? তুমি এ'বাড়িতে থাক না? চোখ খুলে কেন দেখবে ণা যে সংসারে কি দরকার? গ্যাস ফুরিয়ে গেলে কখনো ফোন করেছ? বিজলী চলে গেল লাইনম্যান বা জলের লাইন গন্ডগোল দেখলে প্লাম্বার, কখনো কাউকে খুঁজে এনেছ? খালি মুখে বলবে-- ভালবাসি। ওসব শুকনো কথায় চিঁড়ে ভেজে না। তুমি হোস্টেলেই চলে যাও।
    আচ্ছা, তোমার ক্যাজুয়াল লীভ আছে। উইক এন্ড আছে, শুয়ে শুয়ে ঠ্যাং নাড়াও আর তিনটে পত্রিকা পড়। আমার কোন রোববার নেই? কোন ক্যাজুয়াল লীভ নেই? আজকে তুমি খাবার বানাও। সমাজতন্ত্র মাইকে না বলে আগে নিজের ঘরে করে দেখাও।
    --- বুঝতে পেরেছি; সেই মেল শভিনিস্ট পিগ! এ যে রক্তের ভেতরে খেলা করে, একদিনে যাবে না। তা আপনি কি করবেন?
    -- সকালের চা রোজ করে দেব। রিটায়ার হয়ে গেলে একবেলা রান্নায় হাত লাগাবো। রুটি বেলতে পারি না, কিন্তু ভাত-ডাল-তরকারি-ডিমের ঝোল নাবিয়ে দেব।আর বাজারে সঙ্গে গিয়ে ব্যাগ বয়ে দেব।
    -- ছ'মাস পরে অ্যাডভান্স হিউম্যান ল্যাব প্রোগ্রামে আপনি আসুন, আমরাও আসছি, তখন খবর নেব।
    হটাৎ এক বেসুরো চিৎকারে এদের নীচুগলায় আন্তরিক আলাপনের তার ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায়।

    গরিলার মত বুক চাপড়াচ্ছেন রামজীবন তিওয়ারি, হা-হা করে কেঁদে উঠছেন।

    -- আমি বুঝতে পারিনি! কি ভয়ানক পাপ করেছি। ছুরি নিয়ে মারতে গেছি নিরীহ সৎমাকে। বাবাকে বলার সাহস নেই। বলতে চাইতাম-- বাবা, বিয়ে কোর না। আমি তো আছি, আমার ওপর ভরসা কর, আমি সংসারের সব দায়িত্ব নেব, ভাইবোনদের দেখাশুনো করব। সাহস পাইনি, মারতে গেছি ওই নির্দোষ মহিলাকে। আমি কাপুরুষ,ঈশ্বর আমাকে সাজা দেবেন, হা-হা-হা!
    এরপর তিওয়ারি কাঁদতে কাঁদতে ক্লাস থেকে ছুটে বেরিয়ে দৌড়তে লাগলেন বাগানের মধ্যে দিয়ে। পাশে খাদ, অন্ততঃ পাঁচহাজার ফুট গভীর।
    ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মত সটান দাঁড়িয়ে পড়েছেন নিধি,-- শীগ্গির! শীগ্গির! অন্ততঃ দুজন যাও, দৌড়ও! ওকে ধরে আনো।
    তারপর রসগোল্লা চোখ করে তাকিয়ে থাকা হরিদাসাবাবুকে বোঝালেন-- মনের এই অবস্থায় মানুষ কি করবে কেউ জানে না; খাদে লাফিয়ে পড়তে পারে।
    তিনজন মিলে ধরে এনেছে তিওয়ারিকে; মৃগীরোগীর মত মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরুচ্ছে। ওরা পরম মমতায় শুইয়ে দিয়েছে ওকে। তোতলা ছেলেটা, নেপালি ছেলেটি আর সুরেশ । ওর বুকে পিঠে আস্তে আস্তে মালিশ করছে।আস্তে আস্তে তিওয়ারি স্বাভাবিক হয়ে আসেন। সবাইকে অপ্রস্তুত করার জন্যে ক্ষমা চান। এদিকে খাবার ঘন্টা বেজে গেছে। ফেসিলিটেটর দুজন চলে গেছেন। এদের যে উঠতে ইচ্ছে করছে না।
    আর ঘন্টা দুই। তারপর সবাই হিমালয়কে অলবিদা করে মুসৌরি এলাকার পাহাড়ের কোলে বসা এই কেমটি গাঁয়ের স্মৃতিকে মনের ক্যামেরায় বন্দি করবে বেরিয়ে পরবে দেরাদুনের জন্যে। রাতের ট্রেন ধরে সকালে হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশন, দক্ষিণ দিল্লি। তারপর সেই শুধু দিনযাপনের শুধু প্রাণধারণের গ্লানি।

    ঘুমন্ত অবস্থায় অদিতির ফটো তোলা ছেলেটি আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে,-- মাপ করে দিও, আমি তোমার সামনে ছবিটা ডিলিট করে দিচ্ছি। ফুলটুসি অদিতি খপ করে ওর হাত ধরে, ভিজে চোখে হাসে,-- ডিলিট করতে হবে না। থাকুক তোমার কাছে, আমরা তো বন্ধু।

    হরিদাস পাল চোখ ফিরিয়ে নেয়। জানি, ছ'মাস পরে আবার দেখা হবে। কিন্তু, হিমালয়ের কোলে নয়; অন্য কোথায়, অন্য কোন খানে।
    (প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

    দ্বিতীয় পর্ব
    -----------------
    ১)
    ফেব্রুয়ারির শেষ। শীতটা যেন যাবে যাবে করেও যাচ্ছে না। দুপুরের দিকে হাওয়ায় একটু গরম ভাব, পাখা চালাতে হয়। কিন্তু সন্ধ্যে হলেই হালকা শাল বা সোয়েটার চাই। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে "" গুলাবি জাড়া'' বা গোলাপি আমেজের শীত।
    দুপুর থেকেই পাতা ঝরা শুকনো ডালে ডেকে চলে এক বেয়াড়া কোকিল। এবছর আম গাছে মুকুল একটু তাড়াতাড়ি এসেছে। আর কি জানি কেন, এখনো কোন ঝড়বাদল হয়নি; ছোটখাট শিলপড়া ঝড় ও না। কাজেই আমের ফলন ভালই হবে। বাতাসে ভেসে বেড়ানো মিষ্টি গন্ধে তারই ইঙ্গিত।
    এমনি মরশুমে বেশ খুশি খুশি মনে সাতসকালে ইটার্সি স্টেশনে নেমেছেন বাবু হরিদাস পাল, সঙ্গে দুই ছোকরা স্যাঙাৎ।
    ওঁয়ারা যাবেন পঁয়তিরিশ কিলোমিটার দূরে ইটার্সি-নাগপুর হাইওয়ের পাশে এক জঙ্গলের মধ্যে ""প্রদান'' নামের এক সর্বভারতীয় এন জি ও'র ট্রেনিং সেন্টারে। সেখানে অল ইন্ডিয়া অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স অফ হিউম্যান বিহেভিয়র এর কোলকাতা চ্যাপ্টার এর সৌজন্যে এঁরা পাঠ নেবেন হিউম্যান ল্যাবে। জুনিয়র স্যাঙাতেরা যাবেন বেসিক ল্যাবে, আর হরিদাসবাবু অ্যাডভান্স কোর্সে।
    যদিও উনি জানেন যে এইসব বিহেভিয়রিয়াল সায়েন্স হল আসলে সিউডো সায়েন্স আর ওদের হিয়র অ্যান্ড নাউ ম্যাক্সিম একধরণের প্রতিক্রিয়াশীল মাম্বু-জাম্বু, এবং এসবের পেছনে আছে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত যার স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য হল মানুষের মধ্যে গোষ্ঠীচিন্তাকে খারিজ করে ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রকে তোল্লাই দেয়া; তবু হরিদাস পাল এর প্রতি কেমন একধরণের আকর্ষণ বোধ করেন। খানিকটা যেন কৈশোরোত্তীর্ণ হরিদাসকে পাড়ার বেয়াড়া দুঃসাহসী মেয়েটার সঙ্গে মা মিশতে পই পই করে মানা করলেও ওকে দেখলে যেমন কথা না বলে থাকতে পারতেন না, তেমনি।
    এখন উনি চ্যালাদের আনা দোসা আর কফি সাঁটিয়ে ঘড়ি দেখছেন। সাড়ে দশটার মধ্যে পৌঁছতে হবে। এগারটার মধ্যে ওরিয়েন্টেশন সেশন শুরু। এখন বাজে ন'টা। একটা বোলেরো ভাড়া করে রওনা দিলে এইটুকু দূরত্ব দশটার মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা।
    স্টেশনের বাইরের গাড়ির আড্ডা থেকে পাঁচশ' টাকায় বোলেরো পাকড়ে ওরা চড়ে বসলেন। টাকাটা একটু বেশি নয় কি?
    ড্রাইভার বললো -- এটাই সবাই দেয়।
    --এই টুকু, মানে মাত্র পঁয়তিরিশ কিলোমিটার দূরে ""প্রদান'' ট্রেনিং সেন্টার যেতে? একঘন্টার জন্যে!
    -- শুনুন স্যার, জায়গাটা কে আমরা বলি পোলট্র ফার্ম। ওই প্রদান না কি নাম যে এনজিও , ওরা ওখানে বিশাল পোলট্র ফার্ম করেছে আর স্থানীয় লোকজনকে ওখানে নামমাত্র খরচে
    মুরগীপালনের ট্রেনিং দেয়।
    আর একঘন্টায় পৌঁছনো? ভুলে যান। কপাল ভালো থাকলে দু'ঘন্টা, নইলে আরো বেশি।
    -- কেন?
    -- রাস্তা খুব খারাপ। নামেই হাইওয়ে। শহরের থেকে দশ কিমি দূরে গেলেই সিঙ্গল লেন। পাশাপাশি দুটো গাড়ি যেতে পারে না। এইসময় হরদম ট্রাকের লাইন লেগে যায়। তারপর কোন ব্রেক ডাউন হয়ে রাস্তা আটকালে তো রাম নাম সৎ হ্যায়।
    গাড়ি চলতে শুরু করলো।
    হরিদাস চ্যালাদের শোনায় ইটার্সি নিয়ে দাড়িদাদুর ছড়া।
    "" যোগীনদাদার জন্ম ছিল ডেরাইস্মাইল খাঁয়ে।
    পশ্চিমেতে অনেক শহর, অনেক দূরের গাঁয়ে।''
    তারপরে ""ইটার্সিতে'' র সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে
    "" দেয় কারা সব জয়ধ্বনি উর্দূতে, ফার্সিতে।''

    ছোট শহর ইটার্সি, কিন্তু মস্ত বড় জংশন; খানিকটা খড়গপুর স্টেশনের মত। সারা ভারতের প্রায় সমস্ত রেলওয়ের লাইন এই স্টেশনে মিশেছে।
    কিন্তু শহরের বাইরে দশ কিলোমিটার ছাড়াতেই শুরু হল সিঙ্গল রোড, ট্রাকের সারি আর ধূলো।চারদিকে আদিম অরণ্য। সবার কথা বন্ধ, শুধু শুঁয়োপোকার মত ট্রাকের কনভয় আর তাদের গোঙানি। এখান থেকে বেতুল হয়ে রাস্তা যাবে নাগপুর। কিন্তু আমাদের তো যেতে হবে মাত্র ৩৫ কিমি দূর কেশলায়।
    হরিদাস পাল ঘড়ি দেখে মোবাইল লাগায় তার মেন্টরকে। নাঃ, মেন্টরের মোবাইল নেট ওয়ার্কের বাইরে। এবারে ফোন দিল্লিতে, নিজের এন জি ও'র ডায়রেক্টর মহিলাকে।
    -- উঁহু, ওরিয়েন্টেশন সেশন আধাঘন্টা পিছিয়ে দেয়া হবে, তার বেশি নয়। দেখ, এগারোটার মধ্যে পৌঁছুতে পার কি না!
    কুড়ি কিলোমিটার পেরিয়ে হটাৎ আশার আলো। রাস্তা রিপেয়ার হয়ে গেছে। খানিকটা দূর ডাবল্‌। কিছু মেক আপ করা যাবে।
    এগারোটা প্রায় বাজে, এখনো পাঁচ কিমি বাকি। সোয়া এগারোটা নাগাদ পৌঁছনো যাবে।
    হরিদাস পাল ভাবতে থাকে ওর ছ'মাস আগের বেসিক সেশনের ফেসিলিটেটর নিধি'র কথা। এবার যদিও নিধি থাকছেন আর এই ট্রেনিং ক্যাম্পের লজিস্টিক প্রবন্ধন এর দায়িত্ব উনিই নিয়েছেন,
    তবু নিয়ম অনুযায়ী হরিদাস পালের হিউম্যান ল্যাব এ ফেসিলিটেটর অন্য কাউকে হতে হবে, রিপিটেশন চলবে না।
    গত বার শেষদিনে ফেসিলিটেটররা জানতে চেয়েছিলেন ওনাদের সম্বন্ধে হেরে অন্দ নো প্রিন্সিপল প্রয়োগ করে অংশগ্রহণকারীরা কী দেখলো?
    সেইসব পারস্পরিক ফিডব্যাকের আলো-আঁধারি থেকে বেরিয়ে এল জেদি, অসুখী কিন্তু জীবনের কাছে হার -না-মানা এক নারীর সিল্যুয়েট্।
    বাবাকে হারিয়ে মেয়েটি , তিনবোন ও এক ভাই, আশ্রয় নিয়েছিল মামাবাড়িতে। মামারা উদার, কিন্তু উদাসীন। দিদিমা ভালোবাসেন কিন্তু অদ্ভুত পজেসিভ। আর ভীষণ কর্তৃত্বপরায়ণ।
    মা মানসিক রোগী,, ম্যানিক ডিপ্রেসিভ। ফলে কখনো কখনো বেঁধে রাখতে হয়। স্নেহের ছিঁটেফোঁটা পাওয়ার সম্ভাব্য জায়গা শুধু দিদিমার কোল।

    কিন্তু দিদিমার আছে পারিবারিক সম্পদ ও সম্পত্তির মলকিন হওয়ার অহংকার। মেয়েটির কপালে জোটে উঠতে-বসতে খোঁটা। মেয়ে-জামাইয়ের দুর্ভাগ্যের জন্যে দিদিমা দোষী সাব্যস্ত করেন নাতনীকে।
    ও হাসলে দোষ-- ভদ্দরঘরের মেয়েরা এমন করে হাসে না। একটু সহবৎ শেখেনি।
    কাঁদলে-- ন্যাকা!
    মারপিট করলে-- ঝগড়ুটে, খান্ডারনী!
    ছেলেদের সঙ্গে ভাব করলে---নখরেওয়ালি, ছিনাল!
    প্রায় প্রতিদিনই শুনতে হয় ওদের জন্যে মামাবাড়ির কত পয়সা খরচ হয়ে যাচ্ছে।
    মাঝে মাঝে মা ভাল থাকে। আগ্রার পাগলাগারদ থেকে তাকে বাড়িতে এনে রাখা হয়। মেয়েটার মনটা হয়ে যায় শরৎকালের আকাশ। দিদিমা ও যেন বদলে যান, ওনার নির্দেশে কাজের মেয়েছেলে লছমনিয়ারা বানায় গুলাবজামুন, মগজ কী লাড্ডু।

    তারপর একদিন আকাশ ছেয়ে যায় মেঘে।
    মাঝরাত্তিরে চিৎকার- চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায় মেয়েটার। দোতলার বারান্দায় আলো জ্বলছে। কারা যেন দৌড়চ্ছে। আরে , ওর মাকে পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে বারান্দায় থামের সঙ্গে। দিদিমা একটি বাখারি তুলে শপাং করে বসিয়ে দিলেন মায়ের পিঠে। মায়ের গলা থেকে বেরিয়ে আসছে আর্তনাদ আর অশ্রাব্য গালাগালি। কিন্তু মায়ের গলার স্বর একদম অচেনা। এমন ভারি মোটা আওয়াজ তো সিনেমায় কাউকে প্রেতাত্মা ভর করলে বেরোয়!
    ইতিমধ্যে ইতওয়ারি আর মঙ্গলুর চোখ পড়েছে ওর দিকে। ওরা তাড়াতাড়ি ওকে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে শেকল তুলে দেয়।

    --- আমি মার কাছে যাবো। মাকে খুলে দাও।
    -- বিটিয়া, অভি মৎ যাও। মা বিমার হ্যায়।
    -- বেঁধে রেখেছ কেন? নানী মাকে মারছে কেন?
    -- তোমার মা যে লছমনিয়াকে সব্জিকাটার ছুরি নিয়ে তাড়া করেছিল! না বাঁধলে মেরেই ফেলতো।
    ওর ঘুম আসে না। জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখে পাড়ার বুড়ো ডাক্তার কালোব্যাগ নিয়ে এসে একটা সুঁই বার করলেন, তাতে কি যেন ভরে নিয়ে মায়ের দিকে এগুলেন। মায়ের গালাগাল চরমে উঠলো। এবার মায়ের হাতে তুলো দিয়ে একটু ঘষে পট করে সেটা বিঁধিয়ে দিলেন। মা ডাক্তারবাবুকে ঘাড় বাঁকিয়ে কামড়াতে চেষ্টা করলো। পারলো না। মায়ের গালাগাল আস্তে আস্তে মৃদু গোঙানিতে নেমে এল। তারপর মায়ের মাথা সামনের দিকে ঢলে পড়লো।
    এবার ও বেরিয়ে এসে আস্তে আস্তে মায়ের দিকে এগোয়। আরে, মায়ের যে নাক ডাছে, একটু ফুরুৎ ফুরুৎ আওয়াজ হছে।
    কিন্তু ও আর এগোতে পারলো না।
    নানীজি! উনি বসেছেন মায়ের ঠিক পাশটিতে। পরম মমতায় পিঠের কাপড় তুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন যেখানে তাঁর হাতের ছড়ির আঘাত দাগড়া দাগড়া হয়ে ফুলে উঠেছে।
    মুন্নি! ও মুন্নিরে! বহোত দর্দ হুই হ্যায় ক্যা?

    ২)
    এসব কথা নিধি অবশ্যি ক্লাসরুমে এতটা খুলে বলেন নি। শুধু বলেছিলেন যে ওনার মা ম্যানিক ডিপ্রেসনের রোগী ছিলেন। তাই উনি তিওয়ারির স্ত্রীর ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন, ওরকম পেশেন্ট- মা'র ওপর বাচ্চা মানুষ করার দায়িত্ব দেয়া যায় না। তাই উনি আজকের মেয়ে হয়েও তিওয়ারির দ্বিতীয় বিয়ে করা কে ঠিক কড়া ভাবে নিতে পারছেন না। আর জীবন এত স্পষ্ট সাদা কালো নয়।
    এটাও বলেছিলেন যে জীবনের এক মোড়ে উনি কারো দেখা পান, যিনি নিধির মনের কোণে লুকিয়ে থাকা বহু জিজ্ঞাসার সমাধান করে দিয়েছেন। তাঁকে গুরু মেনে নিধির মনে শান্তি এসেছে।
    কথা হয়েছিল হরিদাস পালের সঙ্গে সেবার ফেরার পথে দেরাদুন রেল স্টেশনের ওয়েটিংরুমে।
    কফি এবং হালকা স্ন্যাক্স্‌ নিয়ে ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে আড্ডা জমে গিয়েছিল।
    -- কী বই পড়ছেন? ও, সমার্সেট মমের অ্যাশেন্ডেনের গল্পগুলো। বেশ জমাটি, নয়? আচ্ছা, দর্শনের বই পড়ায় আগ্রহ নেই? ও, আপনি তো আবার স্বঘোষিত নাস্তিক।
    --- হ্যাঁ, তবে নাস্তিক বলে দর্শনের বই পড়ব না কেন?আর দর্শন মানেই তো খালি অধ্যাত্মবাদ নয়। ওটা সামগ্রিক দর্শনশাস্ত্রের সাবসেট মাত্র।
    -- উপনিষদ নিশ্চয়ই পড়েন নি? পড়লে আপনার বস্তুবাদের পুরনো ব্যাগেজ কাঁধ থেকে নেমে যাবে।
    -- সরি ম্যাডাম, পড়েছি। আপনাদের হরিদ্বারের শ্রীরাম শর্মা আচার্যের অনুবাদ গুলো, রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী গম্ভীরানন্দের এডিশন , সবই একটু নেড়েচেড়ে দেখেছি।কিন্তু আমার কোন উদ্ধার হয় নি।
    -- হবে কি করে? এগুলো গুরুমুখী বিদ্যা, খালি ছাপার অক্ষরে পড়লেই হল? আগে প্রবোধচন্দ্রোদয় পড়ুন, বেদান্তদর্শনের অন্ততঃ প্রথম দুটো খন্ড পড়ুন। তারপর আবার উপনিষদ পড়ুন; অন্যরকম লাগবে।
    -- আপনি বলছেন যখন নিশ্চয়ই পড়বো।
    -- শুধু আমি বলছি বলে?
    চল্লিশোর্ধ নিধির চোখে একটু হাসির ঝিলিক। হরিদাস পাল ও একটু হাসে। তারপর আড্ডার জোয়ারে একটু একটু করে বালির বাঁধগুলো ভাঙতে থাকে। উঠে আসে ব্যক্তিগত
    জীবনের নানা গল্প।
    --- জানেন, ওই যে মিঃ শোলাংকি, যিনি আপনাদের সেশনে আমার সঙ্গে সিনিয়র ফেসিলিটেটর ছিলেন , উনি কিন্তু বিহেভিয়ারিয়াল সায়েন্সের ট্রেনৈং এ আমারও একসময়ের গুরু।
    একবার গোয়াতে আমাদের ট্রেনিং ক্যাম্প। আমি ট্রেনার হওয়ার ফাইনাল ল্যাপের ওয়ার্কশপে গেছি। শোলাংকি আমাদের মেন্টর। একদিন বিকেলে আমরা ক'জন গেছি সমুদ্র নাইতে।
    আমি তো শুরু থেকেই একটু বেহায়া টাইপ। আমার আস্কারায় সঙ্গী দুই মেয়েও গেছে সুইমিং কস্টিউম পড়ে। আমরা স্নান সেরে ফিরছি আর শোলাংকি স্নানে যাচ্ছেন। মাঝরাস্তায় মোলাকাত হতেই ওনার কাহিল অবস্থা! উনি মুখ ঘুরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন যেন আমাদের দেখতে পান নি।
    আমিও নাছোড়বান্দা, সোজা সামনে গিয়ে বলেছি-- শুভ সন্ধ্যা, মহাশয়!
    উনি কি করবেন বুঝতে না পেরে ওনার বারমুডা টেনে নামিয়ে খোলা হাঁটু ঢাকতে চেষ্টা করলেন। বারমুডা নীচে নামে না, শেষে নিজের ছোট টি-শার্ট টেনে টুনে যেন নিজেরই বুক ঢাকছেন, এমনি অবস্থা। আমরা তো হেসে আকুল।
    দুজনের হাসির আওয়াজে পাশের আরামকেদারায় বসা ভদ্রলোক বিরক্ত চোখে তাকালেন।
    ইতিমধ্যে গাড়ি এসে গেছে। নিধি চাকাওলা ব্যাগ টানতে টানতে বলে্‌ল্‌লন-- বাকি অসমাপ্ত গল্পগোলো পড়ে হবে, মেইলে বা ফোনে।

    হ্যাঁ, নিধি কথা রেখেছিলেন; মা-দিদিমার গল্পটা সম্পূর্ণ করেছিলেন।
    মায়ের ডিপ্রেসনের মাত্রা বাড়তে লাগলো। আগ্রার মানসিক চিকিৎসালয়েই থাকে হচ্ছিল।
    ছোট্ট নিধির সব রাগ গিয়ে পড়ল নানীর ওপর। তার বিদ্রোহ প্রকাশ পেল স্কুল পালানোয়, আবোলতাবোল পোষাক পরায়, মেথর পট্টীর ছেলেদের সঙ্গে কাবাড্ডি, লেংড়ি খেলা, নদীতে ঝাঁপানো এসবের মধ্যে দিয়ে।
    জানেন, ইচ্ছে করে ফেল হতাম। যাতে পাড়ার মধ্যে , কায়স্থ মহিলা সমাজের সদস্যদের মধ্যে আমাদের মামাবাড়ির বদনাম হয়, নানীর নাক কাটা যায়।
    গজব হল ম্যাট্রিকের টেস্ট পরীক্ষায়। সব বিষয়ে ফেল। কিন্তু অন্য একটি প্রোফেশনাল সংস্থার আয়োজিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর।
    দেখিয়ে দিলাম আমি বোকা নই, ইচ্ছে করলে এসব পরীক্ষা আমার কাছে কিছু নয়।
    এবার নানীজি ভেঙে পড়লেন, বল্লেন-- গুড়িয়া! তুই যা ইচ্ছে কর, আমার মুখে চুনকালি লেপে দে! আমি আর কিছু বলবো না।
    আমার ভেতরে কিছু একটা হল। আমি ভালভাবে পরের বছর হায়ার সেকন্ডারি দিলাম। আর আমার জীবনে বদল এল। সেই শুরু।
    আমিও জীবনের শুরুতে পাঁড় নাস্তিক ছিলাম। সমস্ত অথরিটিকে চ্যালেঞ্জ করতাম। আজ বুঝি আমার নাস্তিকতা তারই অঙ্গ ছিল। কোথায় আমার নানীজি আর অন্যায়কে প্রশ্রয়দাতা ভাগ্যবিধাতা এক হয়ে গেছিলেন। বিয়ে করিনি, পরিবারকে সামলেছি। নানীজির শেষজীবনে মামারা মুখ ফেরালেন। আমি আমার কাছে এনে সেবাযত্ন করেছি। বোনভাইদের দাঁড় করিয়েছি।
    -- আপনিও ভগবান হতে চাইতেন?
    -- হয়তো তাই।

    গর্তে পড়ে বোলেরো ঝাঁকুনি খেল। চটকা ভেঙে হরিদাসবাবু দেখলেন এক্‌গাদা শাল-তাল-তমালের হরিয়ালীর মাঝে একটি লাল মোরাম বিছানো রাস্তা, পাশে সবজে রঙের সাইনবোর্ড।-- ""প্রদান ট্রেনিং সেন্টার'', ৫০০ মিটার।
    ৩)
    মুরগীর ফার্ম কেন বলে? হরিদাস বাবু কোথাও কোন মুরগী দেখতে পেলেন না। জিগ্যেস করে জানলেন যে এখন আর এখানে মুরগী পোষা হয় না, আগে হত। ইদানীং শুধু ডেমনস্ট্রেশন সেন্টার আর ট্রেনিং হয়। চারপাশের বিশটা গাঁয়ে দশ বছরের চেষ্টায় চেইন অফ পোÏÒট্র শুরু হয়ে গেছে। এখানে উৎসাহী কৃষকদের মুরগীর চিকিৎসা ছাড়াও পোÏÒট্র প্রোডাক্ট এর মার্কেটিং এর ঘাঁতঘোঁত শেখানো হয়। কিন্তু এছাড়া এই জায়গাটাকে ""প্রদান'' বেশ বড় রেসিডেনশিয়াল ট্রেনিং সেন্টার বানিয়েছে। একটা উইংয়ে এক্সক্লুসিভলি ওদের নিজস্ব প্রোজেক্টের ট্রেনিং দেয়া হয়। আর অন্য দুটো দোতলা উইংয়ে অন্য এন জি ও দের বেশ রিজনেবল্‌ চার্জ নিয়ে ট্রেনিং এর জন্যে ব্যবহার করতে দেয়া হয়।
    হরিদাসপালর হটাৎ মনে পড়লো যে পনের বছর আগে এর ডিজাইন আর্কিটেক্ট কবীর বাজপেয়ী করেছিল।ভোপালের ভারত ভবনের স্বর্ণিম দিনে ওখানকার হর্তাকর্তা আই এ এস কবি অশোক বাজপেয়ীর ছেলে।
    বিলাসপুরে এক ওয়ার্কশপে হরিদাস পালর সঙ্গে পরিচয়।
    -- আচ্ছা, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর সঙ্গে তোমাদের আর্কিটেকচারের সম্পর্ক বা ফারাকটা কি, একটু বুঝিয়ে বলবে?
    কবীর হাসে,-- আরে এইব্যাপারটাই লোককে বোঝাতে আমি টাইমস্‌ অফ ইন্ডিয়াতে আর্টিকল্‌ লিখি।
    -- বেশ, আমার মত গাম্বাটকে বোঝাও দেখি!
    --- ধরুন, আর্কিটেকচার= সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং+ অ্যাস্থেটিকস্।
    --আরেকটু খোলসা কর, একটু উদাহরণ দিয়ে। আমি বেশ গাম্বাট, মনে রেখ।
    -- আমরা স্বপ্ন বেচি। না, ভুল বল্লাম , আমরা মানুষের স্বপ্নকে সাকার করি, মূর্ত রূপ দিই।
    --যেমন?
    -- যেমন, এক বয়স্ক লোক এসেছেন। সারাজীবনের স্বল্প সঞ্চয় নিয়ে বাড়ি করছেন, ছোটমত। কাকু, আপনি বাড়িটাতে কি চান? উনি বল্লেন, ভোরে উঠে বাগানে পূবের হাওয়া চান। কিন্তু ওনার বাগান খুলছে দক্ষিণে। আর পূবের দিকে আছে সরকারি এঁদো নালা।
    আমি লাগাই কিছু পিলার; পূবের দিকে এমন করে লাগাই যে ভোরের হাওয়া ওই পিলার গুলোতে ধাক্কা খেয়ে দক্ষিণে ধেয়ে আসবে। কিন্তু পূবে যে আবার নোংরা নালা। তাহলে তো সেই প্রভাত হাওয়া বয়ে আনবে
    দুর্গন্ধ! সমাধান হল নালার পাশে কিছু পিলারের কাছে ঘন করে এমন সব গন্ধফুলের গাছ লাগিয়ে দেব যে উনি ভোরে দক্ষিণের বাগানে পায়চারি করতে করতে পাবেন সুগন্ধিত পূবের হাওয়া। ওনার দক্ষুণকে ই আমি পূব বানিয়ে দেব।
    তারপর ধর, এক দাদু বাড়ি বানাবেন, বলছেন যে ওনার ডুপ্লেক্স চাই। বল্লাম, সঙ্গে কে কে আছেন? কেন, ছেলে-ছেলেবৌ-নাতি-নাতনি।তাহলে ডুপ্লেক্স বানাবেন না, প্লীজ। হাঁটুর জন্যে আপনি একতলায় থাকবেন, নাতি/নাতনি দোতলায়। ওরা স্কুল থেকে এসে দৌড়ে দোতলায় গিয়ে বইয়ের ব্যাগ বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে ল্যাপি বা টিভি খুলবে, আপনি ওদের দেখা পাবেন সেই খাবার টেবিলে।
    কবীরের উৎসাহ বেড়ে চলেছে।
    -- "'একটা বড় কাজের বরাত পেয়েছি, কুষ্ঠরোগীদের জন্যে আশ্রম বানানোর। জানেন তো, ওরা ছুঁচ ফোটালেও ব্যথা পায় না। তাই ওদের বাড়িতে সিঁড়ি, দেয়াল কোথাও কৌণিক কিছু থাকলে চলবে না। সব সার্কুলার বা কার্ভড্‌ হতে হবে। নইলে খোঁচা লেগে রক্ত পড়বে, ওরা টেরটি পাবে না।
    --"ব্যস্‌,ব্যস্‌, বুঝে গিয়েছি'। মানব ও ভৌতিক বিজ্ঞানের এমত মহতী সমন্বয়ে আমার মাথা নুয়ে প্রায় বুকে ঠেকে আর কি!
    কথা ঘোরাই, ওই দেখ দীক্ষিত সভাগার। বিলাসপুরে ভাল সব নাটক এখানেই হয়। ছেলেটি নাটক ও স্টেজ ক্র্যাফটে বেশ উৎসাহী। কথায় কথায় নাটকের কুলীন হিন্দি ম্যাগাজিন দিল্লি থেকে বেরোনো বিখ্যাত "" নটরঙ্গ'' পত্রিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ও হাসে, হোটেলে ওর ঘরে নিয়ে গিয়ে স্যুটকেস খুলে পত্রিকাটির নবীনতম সংখ্যা বের করে আমার হাতে দেয়। বলে-- এতে আমার নাম আছে, পাল্টে দেখুন কোথায়।
    অবাক হয়ে দেখি-- প্রচ্ছদঃ কবীর বাজপেয়ী। আমার জিজ্ঞাসু চোখ দেখে বলে এটা তো আমার দাদুর পত্রিকা।
    আমার চোখ এবার ছানাবড়া। ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার সংস্থাপক নির্দেশক ইব্রাহিম আলকাজীর সহযোগী নেমিচান্দ জৈন তোমার দাদু? আর শিশুনাট্য নিয়ে নিবেদিত প্রাণ শান্তি জৈন-- দিদিমা? বেশ। আচ্ছা, ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা'র বর্তমান ডিরেক্টর কীর্তি জৈন ম্যাডাম? যাঁর ছাদের ওপর বসে শম্ভু মিত্র মশায়ের সঙ্গে আলাপচারিতার বৃত্তচিত্র প্রায়ই দূরদর্শনে দেখানো হয়?
    -- উনি আমার ছোটমাসী।
    -- তা কি করে হবে? তোমার মা তো কত্থকশিল্পী দক্ষা বাজপেয়ী, আর এঁরা তো জৈন।
    কবীর হাসে, আর প্রায় নান্দীকারের "" তিন পয়সার পালা''র কবিতাটি শুনিয়ে দেয়।
    "" মোহিনীমোহন দেব, আর মোহিনীবালা দেবী,
    পুরুত বসে মন্ত্র পড়ায় অং-বং-চং-কং।
    আমরা বলি, হোলো কিসে?
    যদুর মামা মধুর পিসে?
    শুনে তারা বল্লে হেসে-- বিবাহং,বিবাহং।''
    আহা , সেই কবীরের বানানো এই সেন্টার। কৌতূহল চরমে।
    ৪)
    কিন্তু কোথায় ঘন্টা বেজে ওঠে। বেশ জোরে। শ্রুতিমধুর নয়, মেশিনগানের র্যা ট্‌ট্যাটের মত তেতো।
    গাড়ি থেকে তিনজন মিলে মালপত্তর নামাতে নামাতে দেখে একটু দূরে যেন মেলা লেগেছে। লালরঙা ইঁটের দেয়ালে খড়ের চাল দেয়া কয়েকটি গোলঘর। তার মাঝে বৃত্তাকার তিনফুট উঁচু খোলা জায়গা। পাশে পলাশ গাছের গায়ে ঠেকনো দেয়া একটি সাদা বোর্ড। জনা তিরিশেক ছেলেমেয়ে, যুবক-যুবতী ও মাঝবয়েসীর ভিড়।হরিদাস পালর মত বুড়ো বা বুড়ি একজনও নয়। তবে মহুয়া গাছের নীচে জটলার মধ্যে চশমা চোখে ধারালো চেহারার একজন মহিলাকে দেখা যাচ্ছে, উনি মেরে কেটে পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই।দেশি নাভ্রাতিলোভা?
    হায় হরিদাস পাল! কপাল খারাপ। তুমি যে স্কুল জীবন হইতেই সমবয়সী বা বয়সে বড় মহিলার প্রতি আকৃষ্ট হও। উহাই তোমার নিয়তি।
    পুরুষকুল কিভাবে "' প্যাডোফিলিয়া'' নামক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয় ইহা তোমার কাছে আজও রহস্য বটে।
    মনের স্ক্যানার বন্ধ করতে হল।
    একজন ইনস্ট্রাক্টর এসে জানালেন-- আমরা স্কেডিউল থেকে আধঘন্টা পিছিয়ে আছি। প্লীজ, দেরি না করে অ্যাম্ফিথিয়েটরে সমবেত হোন। মালপত্তর রিসেপশনে জামা করে দিন। লাঞ্চ ব্রেকের সময় নিধি ম্যাডামের থেকে রুম অ্যালটমেন্ট এবং নিজেদের ফাইল নিয়ে নেবেন। এখন শিগ্গির অ্যাম্ফিথিয়েটরে চলুন।
    অ্যাম্ফিথিয়েটর! সে আবার কোথায়?
    কেন, ওই যে তিনফুট উঁচু বৃত্তাকার খোলা জায়গা। হরি, হরি! এ যে নামে তালপুকুর, তাতে ঘটি ডোবে না। হ্যাঁ, পাশের গাছে একটা ওই নামের বোর্ড লাগানো আছে বটে।
    নিধি এসে সবাইকে স্বেচ্ছায় নানান ছোট গ্রুপে ভাগ করিয়ে কিছু বালসুলভ কাজকম্ম করালেন। চোখ বন্ধ করে হাঁটো; একপায়ে চল। পেছন দিকে যাও। দুজন-দুজন করে এক্‌জন চোখ খুলে আর একজন বন্ধ করে একে অন্যের ভরসায় হাঁটো দিকি!হরিদাস পালর মনে হল পার্কসার্কাসের সংযুক্ত পরিবারে সদ্যোজাত ছেলে আর রান্নাঘরের দায়িত্বে ব্যতিবস্ত বড়কাকিমা যেন বলছেন,--
    তুমি অরে খেলা দাও, আমি একটু আসি। দেইখো, যেন পইড়্যা না যায়।
    এর মধ্যে কে যেন হরিদাসবাবুর নাম ধরে ডাকছে। আরে, এ যে আবদুল্লা আর কৈলাশ। সেবার মুসৌরির পিচ্ছিল পাহাড়ি পথে যারা ওর হাত ধরে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়েছিল। এসেই জড়িয়ে ধরে একে অপরকে।
    -প্রথম থেকেই ভাবছি আপনি আছেন কি না এবার! যখন গাড়ি থেকে স্যুটকেস নামাচ্ছিলেন তখনই দেখতে পেয়ে আওয়াজ দিলাম, আপনি যে কোন দিকে তাকিয়ে ছিলেন!
    নিধি এগিয়ে এলেন।
    -- সরি! আপনারা পুরনো লোক, নিয়মগুলো জানেন। চেনাদের মধ্যে গ্রুপ ফর্ম করলে চলবে না। প্রত্যেক বার নতুন দের নিয়ে গ্রুপ বানাতে হবে।
    আর দৌড়-ঝাঁপ নয়।এবার নিজেদের মধ্যে পরিচয়। একবার নিজের নিজের একস্পেক্টেশন একে অপরকে জানান। অন্যবারে নিজের জীবনের সবচেয়ে দুঃখের বা সুখের ঘটনাটি পাশে দাঁড়ানো সঙ্গীকে বলুন।
    শালা! সেই ট্র্যাডিশন এবারেও চালাবে ওরা! ইয়াংকি মাম্বো-জাম্বো!
    এইভাবে হরিদাস পালর পরিচয় হয় ঝাঁকড়াচুলো বেশ মোটা অল্পবয়সী স্মৃতি ম্যাডামের সঙ্গে। কথা বলে তো ওর হয়ে গেল। এই মেয়েটি সবগুলো কোর্স করে এবারে এসেছে ট্রেনার হবার অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে। অবজার্ভার পার্টিসিপেটর! মানে এবার ভালো গ্রেড পেলে আগামীবারের থেকে ঈআ এর সার্টিফায়েড ফেসিলিটেটর হবে! ক্ষী ক্কান্ড!
    দেখ, ওই বাচ্চা মেয়েটিকে দেখ। আর তুমি ষাটবছুরে বুড়ো ভাম! রয়ে গেলে আজীবন হরিদাস পাল হয়ে। কি যে শালার জীবন হইল!

    ওরিয়েন্টেশন সেশনে দেখা গেল চারটে গ্রুপে জনাচল্লিশেক ছেলেমেয়ে নিয়ে হচ্ছে বেসিক হিউম্যান ল্যাব, আর জনাছয়েক কে নিয়ে অ্যাডভান্স ল্যাব।
    লাঞ্চ ব্রেকের সময় ঘরের ঠিকানা পাওয়া গেল। প্রায় পঞ্চাশ একর জুড়ে এই সেন্টার।
    চারদিকে মানুষের তৈরি এক ঘন জঙ্গল; নানারকম গাছপালা, মাঝে খালি জায়গা জুড়ে ছোট ছোট সার্কুলার ক্লাসরুম।লাল ইঁটের দেয়াল। জানলার জায়গায় পর্দা ঢাকা খালি জায়গা। খড় ও টালির ছাদ, দেয়াল ও ছাদের মাঝে বাঁশের পাতলা টুকরো ও বেতের তৈরি নকশা। হাওয়া আসছে ভালই। কিন্তু এত গাছপালার ফলে বেশ মশা, খানিকক্ষণ কছুয়াছাপ আগরবাতি জ্বালাতে হয়। অ্যাম্ফিথিয়েটারের পাশে রয়েছে ওপেন এয়ার এরিনা থিয়েটার। নীচে মাঝখানে গোলাকার সিমেন্ট বাঁধানো অভিনয়ের জায়গা। আর চারদিক ঘিরে ধাপে ধাপে উঠে গেছে সার্কুলার গ্যালারি।
    সামনের দিকে খালি জায়গায় আছে একটি বাগান, ফোয়ারা ও বাঁধানো জায়গা।
    কিন্তু এই শান্তিনিকেতনী পরিবেশের মধ্যে ঘর গুলো বেশ আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন। বাথরুম ও ল্যাবে গ্লেজেড টাইলস্‌, কমোড ইত্যাদি। হরিদাস পালের ওই একটি দুর্বলতা, কমোড।
    খাবার সময়ে ছোট ছোট গ্রুপ। এর মধ্যে ডাইনিং হলে কোণের টেবিল থেকে চশমা পরা গাঁট্টাগোট্টা একজন আচমকা পা বাড়িয়ে দেয়, ল্যাং খেয়ে হরিদাস মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছিল, তার আগেই দুজোড়া হাত ওকে সামলিয়ে নেয়।
    হতভম্ব হরিদাস পালর মুখ দিয়ে খালি বেরোয়-- ইয়ে ক্যা বদতমীজি!
    কোন সন্দেহ নেই যে ল্যাং ইচ্ছে করে মারা হয়েছে।
    একজোড়া হাসিমুখ ওর দিকে এগিয়ে আসে। চশমাপরা গালে দু'দিনের দাড়ি বলে-- ক্যা দাদা! ভুল গয়ে? ইতনী জলদি! আরে আমি রামজীবন তিওয়ারি। গতবার মুসৌরিতে আপনাদের সঙ্গে একই গ্রুপে ছিলাম। সেই যে ক্যাম্প ফায়ারের সময় ""নজর লাগি রাজা তোরি বাংলো পর'' গানের সঙ্গে নেচেছিলাম।
    হরিদাস পাল হাসে। -হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েচে, কিন্তু তা বলে ওরকম ল্যাং মারা?
    -- তা আপনি সারাক্ষণ ওরকম আকাশের দিকে তাকিয়ে চললে হোঁচট খেতেই হবে। একটু জমিন পে নজর রাখকর চলা কীজিয়ে জনাব।
    চারপাশে ঘিরে ধরেছে নতুন কিছু ইয়ং ছেলেমেয়ে,ওদের চেহারায় উত্তেজনা।
    -- স্যার, আপনারা তো আগের বার ছিলেন। কি হয় ওই ল্যাবে? খুব কঠিন কিছু? ওই রোডিজ্‌ রিয়েলিটি শো' গোছের কিছু?
    -- আমরা কেন বলবো? নিজেরাই জানতে পারবে।
    -- বলুন না স্যার, আমরা রাজস্থান থেকে এসেছি। আবদুল্লা আর কৈলাশ স্যারের সঙ্গে।
    -- ওদের জিগ্যেস কর না?
    -- ওরা খালি বলছেন-- মেলডি খাও, খুদ জান যাও।
    -- রয় স্যার, আপনি তি সিনিয়র, আপনি নিশ্চয়ই আমাদের হেল্প করবেন। বলুন না, কি হয়?
    হরিদাস পালর ফক্কুড়ি স্বভাব ।
    -- হ্যারি পটার দেখেছ? এটাও হগওয়ার্‌ট্‌স্‌ জাদু কলেজের কম নয়। এখানে বন্ধ কামরায় হয় কালাজাদু। পলিগ্রাফ টেস্ট। আরো কত কি! আমরা ক'জন সেই আগ কী দরিয়া সাঁতরে পার হয়ে এসেছি। তাই অ্যাডভান্‌স্‌ড ল্যাবে সুযোগ পেয়েছি। অন্যেরা ডুবে গেছে।
    মেয়েটি কি শিউরে উঠলো?
    কিন্তু কৈলাশ ও আবদুল্লার চেহারায় বিরক্তি ফুটে উঠেছে।
    -- তাড়াতাড়ি থালাবাটি ধুয়ে নিয়ে সাজিয়ে রেখে অ্যাসেমব্লিতে চল। এর পর প্রথম সেশন শুরু হবে।

    ৫)

    অ্যাসেমব্লিতে জানা গেল যে বেসিক কোর্সের চারটি ব্যাচ, ওদের জন্যে গড়ে দুজন করে দশ জন ফেসিলিটেটর; পুরুষ ও মহিলা। হরিদাস পাল চিনতে পারে ওদের মধ্যে একজন মিসেস রেহানা বজাহত, দিল্লির বিখ্যাত হিন্দি নাট্যকার ও অভিনেতা অসগর বজাহতের স্ত্রী, পাঠানি স্যুট পরা বেশ লম্বা-চওড়া মহিলা। আচ্ছা, উনি কি অ্যাডভান্সড্‌ গ্রুপের একজন ফেসিলিটেটর হতে পারেন না?
    যদিও হরিদাস পাল ভগবান মানে না, কিন্তু এমনি সময় ও অদৃশ্য ভগবানের সঙ্গে বাজি ধরে।
    -- ভগবান! তুমি যদি সত্যি আছ, ( জানি তুমি নেই, ফালতু চু-কিৎ-কিৎ খেলার কি মানে!) তাহলে তোমার বিভূতি দেখাও! ওই মহিলাকে আমার গ্রুপের মেন্টর করে দাও, তাহলে মেনে নেব তুমি আছ।
    -নইলে?
    -- নইলে আবার কি! তুমি নেই। সেই যে ওমর খৈয়াম বলে গেছেনঃ
    উপুড় করা পাত্রটা ওই আকাশ মোরা বলছি যাকে,
    ----------------------
    ওর কাছে ভাই হাতটি পেতে থেকো না আর রাত্রিদিন,
    তোমার-আমার মতই ওটা অক্ষমতায় ক্লান্তিহীন!

    তা কখনো কখনো ইচ্ছাপূরণ হয় বইকি! তখন হরিদাস পাল ভগবানকে কাঁচকলা দেখিয়ে বলে-- এসব কাকতালীয়। ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে।
    এমনি সাকসেসের প্রোব্যাবিলিটি কত? ফেভারেবল ইভেন্টের পার্সেন্টেজ? খুব কম। ডেসিমেলে গুনতে হবে।
    তবে অধিকাংশ সময়ই হরিদাস পাল যখন প্রার্থনা করে তখন ভগবান ভদ্রলোক বাথরুম-পায়খানায় থাকেন। সেখানে তো ইন্দ্রিয়ের দ্বার বন্ধ করেই বসতে হয়। সবগুলো নয়, মানে নাক-কান-মুখ আর কি! ফলে হতাশ হরিদাস ভগবানের অনস্তিত্ব নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে মুদি দোকান থেকে তেল আনতে যায়। গুনগুন করে ইদানীং জনপ্রিয় একটি হিন্দি র্যাোপ গান।
    "" অ্যাশ তু কর ভাই, অ্যাশ তু কর!
    দেশ যায়ে তেল লেনে অ্যাশ তু কর ।।''

    এবারেও ব্যতিক্রম হল না। শ্রীমতী বজাহত জুনিয়র একটি গ্রুপের সংযুক্ত মেন্টরের দায়িত্ব পেলেন। হরিদাস ছক কষছিল যে ওনার পরিচয়ের সূত্র ধরে যদি ওনার বাড়ি গিয়ে অসগর স্যারের সঙ্গে পরিচয় জমিয়ে একটা -দুটো স্ট্রীট-প্লে'র স্ক্রিপ্ট হাতানো যায়!
    যাকগে মরুকগে!
    অ্যাডভান্সড্‌ কোর্সের মাত্র একটিই ব্যাচ, ছয়জনের। তার একজন মাত্র ফেসিটেটর-- ফর্সা, বেঁটে, টাকমাথা ,কড়াচাউনি সুরেশ ওয়ালিয়া। উনি আবার এবারের গোটা প্রোজেক্টের ডীন বটেন! আর আছে এথিক্স কমিটি,-- তাতে নিধি মূল দায়িত্বে।
    সেশন শুরু হল। ছোট গোল মত এক ইঁটের দেয়াল ঘেরা মজার ক্লাসরুম। আধেক খোলা আধেক ঢাকা। দরজা জানলার বদলে ছোট ছোট পর্দা। টালির চালের নীচে বাঁশের বুনুনি। বসার জায়গায় স্টেজের ওপর যেমন আয়তাকার টুকরো টুকরো বেদি থাকে তেমনি।
    সুরেশ এসে নিজের একটি বেদিতে পাশ ফিরে আধশোয়া হয়ে রইলেন। কি অসভ্য লোক রে বাবা! এ আমাদের কি শেখাবে? অগুলো কি অহংকারের বডি ল্যাংগোয়েজ নয়! হুঁ, শালুক চিনেছেন গোপাল ঠাকুর!
    ছয়জনের দলটি অস্বস্তি কাটাতে একে অন্যের পরিচয় নিয়ে কথা শুরু করে।
    কৈলাস-আবদুল্লা-রামজীবন- হরিদাস আগের ট্রেনিংয়ে বন্ধু হয়ে গেছল। ওদের একসঙ্গে ট্রেনিং হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এবারের অ্যাডভান্সড্‌ কোর্সে বেশি লোক আসেনি, অগত্যা!
    পঞ্চম জনও যে অল্প চেনা। বুক অব্দি লম্বা দাড়ি চোখে পাওয়ারফুল চশমা জয়ন্তকে কে না চেনে ভোপালে!
    এডুকেশনের লাইনে পেডাগগি নিয়ে লম্বা সময় ধরে নীরবে কাজ করে যাওয়া নীচু গলায় কথা বলা সুভদ্র ব্যক্তিত্ব।
    এবার ছ'নম্বর? দিল্লিতে মহিলা অধিকার ও যৌনশোষণের বিরুদ্ধে ডকুমেন্টেশনের কাজ করা একটি নামজাদা এনজিও'র এইচ আর!
    কিন্তু হরিদাস দেখছিল শুভা মুদগলকে। তেমনি মোটা কিন্তু লাবণ্যে ভরা চেহারায় স্মিত হাসি।
    আমি বিনীতা ।

    কথা চলছে,-- আশ কথা, পাশ কথা।
    কিন্তু এমনিতো বেসিক ল্যাবেও হয়েছিল। এরা কথা বলছিল আর মেন্টররা একেবারে মাদাম তুসোর মিউজিয়মের স্ট্যাচু হয়ে ছিলেন। রা টি কাড়েন নি।
    আস্তে আস্তে দিন দুই পরে ওরা বুঝলো যে পুরনো হিস্ট্রি চলবে না। একেবারে ঘটমান বর্তমান নিয়ে কথা বলতে হবে। র্যা শনালাইজ করা চলবে না, যুক্তির জায়গায় অনেস্টলি ভেতরের ফিলিংটা সবাইকে কমিউনিকেট করতে হবে।
    কিন্তু অ্যাডভান্সড ল্যাবে অন্য কিছু হওয়া উচিত নয় কি?
    সেটা কে ঠিক করে দেবে? সুরেশ ওয়ালিয়া? সে মহাপ্রভূ তো মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আহা রে! কত কষ্ট করে কাল রাত্তিরে এখানে পৌঁছেচেন। ঘুমোক! ঘুমোক!
    কিন্তু ঘন্টাখানেক কেটে গেল , কিছুই ঘটছে না যে!
    কত আশা করে এসেছে , ও সাইকোঅ্যানালিসিসের কিছু উন্নত গুরুমন্ত্র শিখে যাবে, আগামী বছর এর পরের ইনস্ট্রাক্টর হওয়ার কোর্স করবে। তারপর আর এক ধাপ। শেষে আর একবছর ইন্টার্নশিপ, এবারের স্মৃতি ম্যামের মত।
    তারপর?---- তখন স্বর্গের দ্বার খুলিয়া গেল! লোকের মনের চোরকুঠুরি খোলার চাবিকাঠি থাকবে ওর হাতের নাগালে। ও এখন একজন আধুনিক প্রস্পেরো!
    ও আর হরিদাস পাল থাকবে না, ও হবে ঈআ এর সার্টিফায়েড্‌ বিহেভিয়ারিয়াল অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সের ইনস্ট্রাক্টর।
    বছরে কয়েক বার সুন্দর সুন্দর জায়গায় ট্রেনিং ক্যাম্পে সিলেক্টেড গ্রুপের সঙ্গে এসে ট্রেনিং দেবে। কিন্তু পাঁচদিন ক্যাম্পের একদিন প্রায় শেষ, কিছু ঘটছে না কেন?
    -- নাথিং ইজ হ্যাপেনিং ইয়ার!
    হরিদাস পাল কি বেশ জোরে বললো ? নইলে ওই বেঁটে বক্কেশ্বর সুরেশ ওয়ালিয়ার ঘুম ভেঙে গেল কেন? আরে, ও যে এদিকে পাশ ফিরছে!
    -- ডোন্ট বদার অ্যাবাউট হ্যাপেনিংস! মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড! ট্রাই টু বি ইন পীস উইথ য়োর ওন বিইং ।

    ৬)
    -মানে?
    -- মানে আর কি? তখন থেকে তোমাদের কথাবার্তা-গল্পগাছা শুনছি। তোমরা নাকি সিনিয়র! বেসিক হিউম্যান ল্যাব ভালো ভাবে উৎরেছ। তাহলে তো তোমাদের কথাবার্তা সব এরে অন্দ ণো পরিপ্রেক্ষিতে হত। কোথায়? অধিকাংশই তো থেরে অন্দ থেন ।
    আবার উনি পাশ ফিরে কাত হয়ে শুলেন।
    এদের গলার আওয়াজ ফিসফিসানিতে নেমে এসেছিল। আচমকা যেন ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে ওয়ালিয়া বল্লেন-- ভয় পাওয়ার কি আছে? এখানে মানুষ নির্ভয় হতে শেখে।

    ওরে আমার চোটের হাবিলদার রে! এসব জ্ঞানের কথা অনেক শোনা আছে।
    কি করা যায়! মেয়েটি প্রস্তাব দিল-- এস, আমরা সবাই কে কোন জায়গায় বেসিক ল্যাব শেষ করেছিলাম, আর কি আশা নিয়ে এই অ্যাডভান্সড ল্যাবে এসেছি সেটা বলি।

    প্রথমে আজানুলম্বিত দাড়ি জয়ন্তর পালা।
    -- আমি সবাইকে জায়গা ছেড়ে দিই, দিয়ে আনন্দ পাই। কিন্তু এতে করে কখন যে আমার নিজের জায়গাটাও ছেড়ে দিই, খেয়াল থাকে না। এটা ঠিক করতে হবে।
    -- আর?
    -- আর কাউকে উচিৎ কথা বলতে খারাপ লাগে।
    --কেন খারাপ লাগে? ( এটা শুভা মুদগল ওরফে বিনীতার তরফ থেকে)।
    -- না মানে কেউ যদি কষ্ট পায়!
    সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে। ওলে! ওলে! অন্যের কষ্টে গেছেন গলে!
    কৈলাস বলে,-- আচ্ছা, আমরা আপনার এই আজানুলম্বিত দাড়ি রাখার কারণ জানতে পারি কি? বউ রাগ করে না?
    আবদুল্লা বাধা দেয়,-- এটা একটু ব্যক্তিগত হয়ে গেল না?
    হরিদাস পাল আম্পায়ারের ভঙ্গিতে বলে-- তা কেন? এখানে আমরা নিজেদের পরিবারের, বন্ধুবান্ধবের, পাড়াপড়শীদের আড়ালে এক মানব পরীক্ষাগারে নিজেদের মিউচুয়ালি কাঁটাছেড়া করতেই তো এসেছি। তবে ব্যাপারটা স্বেচ্ছায় হতে হবে। জয়ন্ত চাইলে উত্তর না ও দিতে পারে।
    জয়ন্ত চোখ পিটপিট করে, বারবার চশমার কাঁচ মোছে, বলে একটু জল খেয়ে নিয়ে বলবে।
    বিনীতা জলের বোতল এগিয়ে দেয়।
    হরিদাসর মুখে একটা ফিচেল হাসি খেলা করছে। ওর মাথায় ঘুরছে ছোটবেলার একটি ছড়ার লাইন-- জামাইবাবু কমলালেবু একলা খেও না। জানলা দিয়ে বউ পালাবে দেখতে পাবে না!
    এই বাংলা ছড়াটার লাইন এইসময় কেন মনে পড়ছে? এইজন্যে কি যে জয়ন্ত'র বউ বাঙালী ?
    বুলবুলি সেন এখন ওই এনজিও'র ইডি, সবাই চেনে। আসলে এই মুখচোরা পর্দার পেছনে থেকে কাজ করতে থাকা জয়ন্তকে সবাই বলে-- ও? বুলবুলির হাজব্যান্ড?

    জয়ন্ত গলা খাঁকারি দেয়। শুরু করবে। হরিদাস পাল জানলার কাছে ঘুরঘুর করতে থাকা বোলতার থেকে চোখ সরাতে গিয়ে দেখতে পেল ওয়ালিয়াজী উঠে বসেছেন এবং
    স্মিত মুখে তাকিয়ে আছেন সোজা ওর দিকে। চোখে কি একটু ব্যঙ্গের আভাস? উনি চোখ সরাচ্ছেন না। অগত্যা হরিদাস পাল চোখ ফিরিয়ে জয়ন্ত'র দিকে তাকাল।
    -- দিনটা বোধহয় ছিল ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২। বাবরি মসজিদ দুপুরের মধ্যে ভাঙা হয়ে গেল।
    সুপ্রীম কোর্ট, ভারত সরকার , বিরোধী দলগুলো সব কেমন শিখন্ডীর মত দাঁড়িয়ে রইল। আমি তখন ভোপালে থাকতে শুরু করেছি। দাঙ্গা দেখলাম, পরিচিতদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা উন্মাদ দেখলাম। নিজের ওপর ঘেন্না ধরে গেল। ঠিক করলাম নিজেকে কোন ধর্মের বলে পরিচয় দেব না। তাই দাড়ি রাখলাম।
    দাড়িটা এমন রেখেছি যে এটা শিখদের জ্ঞানীজী -মুসলিমদের মৌলবি- বা পাদ্রীবাবা, সবার সঙ্গে মানিয়ে যায়। কেউ আমার ধর্ম জিগ্যেস করলে হাসি, উত্তর দিই না। আমার স্ত্রী সব জানেন।
    সবাই খানিকক্ষণ মৌনব্রত ধারণ করল।

    হরিদাস পালের জিগাইলেন যে জয়ন্তর কোন রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না!
    ( অমর্ত্য সেন কি সহজে পেছন ছাড়বে না?)
    -- না, তবে আমি মার্কেট ক্যাপিটালিজম, মানে লেসেজ ফেয়রের স্ট্রং ক্রিটিক।

    ওয়ালিয়া বল্লেন,-- সে না হয় হল। কিন্তু তারপর গঙ্গা ও গোমতী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। আঠেরো বছর। এখন তো দেশে অনেক কিছু বদলে গিয়েছে, আবার বদলায়ও নি। এই পরিস্থিতিতে তুমি ভেবে দেখতে পার যে তোমার মেসেজটি সবাইকে দিতে দাড়িই সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম কি না!
    জয়ন্ত হামি ভরে,-- হ্যাঁ, ভেবে দেখব।
    বিনীতা উঠে গিয়ে ওর হাত জড়িয়ে বসে থাকে। রামজীবন বলে-- দাড়ি কাটলে দেখতে পাবে যে তুমি কী ভীষণ হ্যান্ডসাম!
    এই সময় চায়ের ঘন্টা বেজে ওঠে, ওয়ালিয়া উঠে পরেন।

    ৭)
    ইগলু'র মত দেখতে লালা ইঁটের ক্লাসরুম গুলো। আধুনিক ইকো-ফ্রেন্ডলি লো-কস্ট আর্কিটেকচারের নমুনা। ওগুলোর বাইরে দু'পা ফেললেই টেবিলের ওপর চা-কফি-বিস্কুট রাখা।
    -- আবদুল্লার কি মাথা ধরেছে? তাহলে আমার কাছে বাম্‌ আছে, একটু লাগিয়ে দেব কি?
    বিনীতার গলায় উৎকন্ঠা। কিন্তু আবদুল্লা কেমন ভেবড়ে মাথা নেড়ে একদল জুনিয়র ব্যাচের কফির মগ হাতে গুলতানির ভীড়ে মিশে গেল।
    বিনীতা অপ্রস্তুত ভাব ঝেড়ে ফেলে হাসে, হরিদাস পালকে বলে-- দেখলে তোমার বন্ধুর অ্যাটিচুড? যাকগে, মরুকগে।
    সেকন্ড সেশন শুরু হবে বলে সবাই বসে বকবকম শুরু করেছে কিন্তু ফেসিলিটেটর ওয়ালিয়ার দেখা নেই।
    নিজেকে কি ভাবে লোকটা? ও এই প্রোগ্রামের ডীন বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে? নিজে নিয়ম বানিয়েছে , তো নিজেকে কি নিয়মের উর্দ্ধে ভাবছে নাকি? কি আত্মকেন্দ্রিক অহং সর্বস্ব লোক রে বাবা!
    হাসিঠাট্টা ও কিছু পুওর জোকস্‌ এর মাঝখানে ওয়ালিয়া ঢুকলেন। হাতে মশা তাড়ানোর ধূপের প্যাকেট ও তিনটে জলের বোতল।
    দেশলাই চেয়ে নিয়ে ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট ভঙ্গিতে উনি ধূপ জ্বালিয়ে জান্‌লায় পর্দাগুলো টেনে নামাতে বল্লেন। তারপর আবার শেষনাগের শয্যায় ভগবান বিষ্ণুর ভঙ্গিতে কাত হলেন।
    -এবার কার কনফেশনের পালা?
    সবাই উশখুশ করে। বিনীতা একটু ফিচেল হাসি হেসে বলে-- আমি এবারের হট সীটে বসার জন্যে হরিদাস পালের নাম প্রোপোজ করছি।
    হরিদাস একটু হকচকিয়ে যায়। মেয়েটা লেগ পুল করছে নাকি?
    শুভা মুদগলের তো সাহস কম নয়! দেবে নাকি কড়কে?
    -- আপনাকে ফোঁপর-দালালি করতে কে বলেছে?
    --নিজের চরখায় তেল দিন ম্যাম!
    নাঃ, ওপরের কোনটাই ঠিক জমছে না।
    -- কেন, বাবুমশায়ের কোন আপত্তি আচে?
    -- আপত্তি? না, নেই।
    ধৈর্য্য ধর, ধৈর্য্য ধর,গর্বে বাঁধো বুক।-- না,যা থাকে কপালে, এবার দূর্গা বলে ঝুলে পড়লেই হয়।
    হরিদাস বলতে শুরু করে।

    - গতবার যখন বেসিক হিউম্যান ল্যাবে এসেছিলাম সেই মুসৌরির কাছে হিমালয়ের কোলে কেমটি গ্রামে, তখন ল্যাব শেষে আমাকে বলা হয়েছিল গায়ে পড়ে সবাইকে ঝোলার থেকে বিপত্তারিণী বটিকা-বিশল্যকরণীর শেকড় দেয়া বন্ধ কর। বড় বড় সমাজবাদী-নারীবাদী বুকনি ঝাড়া বন্ধ করে বাড়িতে নিজের নব্বই ছোঁয়া মাকে, খেটে যাওয়া বউকে একটু সহমর্মিতা দেখাও। আর কথায় কথায় নিজের অভিজ্ঞতার গল্প শোনানোর অভ্যেসটি ছাড়। ওসব তোমার ওই কি বলে ""গুরুচন্ডালি''র পাতাতেই ছাড়তে থাক, রিয়েল লাইফে একটু অব্জেক্টিভ, একটু প্র্যাকটিক্যাল হও। নিজেকে বদলাও।
    -- তা আপনি হয়েচেন? বদলেছেন?
    হরিদাসবাবু আমতা আমতা করে, মাথা চুলকোয়। এত বড় মিথ্যে কথা বলা? ধম্মে সইবে?
    -- না মানে, চেষ্টা করছি, কিছুটা হয়েচে।
    -- তা কি কি করেন শুনি?
    বিনীতা-শুভামুদগলের চোখ হাসছে।
    -- মানে তখন তো রিটায়ার করিনি, এখন রিটায়ার্ড লাইফ। মার সঙ্গে সকালে চা খাই, হিন্দি-বাংলা নিউজপেপার ভাগাভাগি করে পড়ি, একসঙ্গে টিভিতে ক্রিকেট দেখি। বউয়ের সঙ্গে বাজারে যাই। ওয়াশিং মেশিন চালাই। কখনো কখনো চা করি। রোজ আড্ডা মারি।
    -- ব্যস্?
    -- আপাততঃ, চেষ্টা করছি তো।
    ( ছাড় না ভাই, একটা অসহায় বুড়ো হাবড়াকে কতক্ষণ জ্বালাবি? অন্য ছোঁড়াগুলোকে দেখ না!)
    ওয়ালিয়া এবার সাইড রোল করে আধশোয়া অবস্থান থেকে মাথা বের করে খাঁড়ির ফাঁক-ফোকর থেকে বেরিয়ে আসা অ্যানাকোন্ডার ভঙ্গিতে বল্লেন-এসব থেরে & থেন সিন্ড্রোম।
    এসব অদেখা হিস্ট্রি, আপনার নিজের মুখে ঝাল খাওয়া, আপনি বাড়িতে কি করছেন কে দেখচে?
    রামজীবন বল্লেন,-- আচ্ছা, আপনার বদলে যাওয়া নিয়ে পরে কথা হবে।
    এখন বলুন আপনি এই অ্যাডভান্সড্‌ বেসিক ল্যাবে কি এক্সপেক্টেশন নিয়ে এসেছেন?

    -- আমি গ্রামীণ ব্যাংকের চাকরি থেকে রিটায়ার করে মহানন্দে আছি। সোশ্যাল সেক্টরে এনজিওদের বা গ্রামের সেল্ফ হেল্প গ্রুপের সদস্যদের ট্রেনিং দিই। ইন্সিডেন্টালি, দিল্লির একটি কন্সালটেন্সি-কাম- ট্রেনিং সংস্থার আমি অ্যাসোসিয়েটেড মেম্বার। বর্তমান ট্রেনিং প্রোগ্রামটিতে আইস্যাব এর একজন অর্গানাইজার এসেছেন না? মিঃ তেজিন্দর ভোগল! উনি আমার মেন্টর। আমাকে তৈরি করছেন ছত্তিশগড়ের Rএর একজন ভবিষ্যত স্পেশালিস্ট হিসেবে। আমি ছত্তিশগড়ের একটি এনজিওর বোর্ড মেম্বার এবং কন্সাল্ট্যান্ট ও বটি!
    (হরিদাস পালের গলায় আত্মপ্রসাদের সুর আর লুকনো নেই।)
    -- বুঝলাম, কিন্তু আপনার এক্সপেক্টেশন কি এখনো জানলাম না। ঝেড়ে কাশবেন।
    কৈলাশের গলায় কি একটু বিরক্তির ভাঁজ?
    -- আমি স্বপ্ন দেখি অ্যাপ্লায়েড বিহেভিয়ার্যা ল সায়েন্সের একজন ডাকসাইটে ট্রেনার হওয়ার। আমি জানি যে এই ট্রেনিং এর পর আরো দুটো ধাপ আছে সেগুলো আগামী একবছরে ক্লিয়ার করে তার পর একবছর প্রোবেশন, তারপর ফুল-ফ্লেজেড্‌ রেজিস্টার ট্রেনার অব আইস্যাব্‌স্‌! তখন সারা ভারতে এই ট্রেনিং শিবিরগুলোতে ট্রেনার বা ফেসিলিটেটর হিসেবে আসবো।
    (হরিদাস পালের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি!)
    -- ট্রেনার কেন হতে চান?
    ( উঃ, অ্যানাকোন্ডা আমাকে তাগ করে রয়েছে।)
    -- মানে, আমার চোখে ট্রেনার মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন ঘটান, প্রায় ভগবানের মত। ধরুন, একজন ডি-মোটিভেটেড স্টাফকে চারপাশটা নতুন করে দেখতে শেখান , ভাবতে শেখান, এইভাবে ওকে সক্রিয়, মোটিভেটেড করে তোলেন।
    আমার চোখে উনি একজন ক্রিয়েটিভ আর্টিস্টের মত, জাদুকরী ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি।
    -- ওঃ, ক্ষমতা! পাওয়ার?
    ( অ্যানাকোন্ডা আবার খাঁড়ির গর্তে মাথা ঢুকিয়ে ফেলেছে, বাঁচা গেল!)
    --পালদাদা! আপনি আমাদের থেকে বয়সে বড়, আপনাকে শ্রদ্ধা করি, ভালোও বাসি। অন্যভাবে নেবেন না, এখানে আমাকে কিছু অপ্রিয় কথা বলতেই হচ্ছে।
    আপনি বাড়িতে কি করেন সত্যিই জানি না, কোন নিরপেক্ষ এভিডেন্স নেই। কিন্তু এখানে এই দুদিনে যা দেখলাম তা ভালো লাগচেনা। প্রথম দিন যখন কিছু জুনিয়র ছেলেমেয়ে বেসিক হিউম্যান ল্যাব নিয়ে আপনার কাছে জানতে চাইলো আপনি এমন ভাব দেখালেন যে --হুঁ হুঁ বাবা! ও প্রায় বজরঙ্গবলীর লংকা পৌঁছনোর মতন দারুণ ব্যাপার! তবে আপনি খুব তালেবর, এক চান্সেই পেরিয়ে গেছেন।
    আপনার অ্যাটিচুড দেখবার মত! আমি কো-অর্ডিনেটরের সঙ্গে ঝগড়া করে আমার রুম বদলে আপনার পাশের বেডে এলাম-- শুধু আপনার সঙ্গে ক'টা দিন কাটাব বলে। এখন ভাবছি ভুল করলাম কি না!
    ( এসব কে বলছে? আবদুল্লা? যে গতবার হিমালয়ের বৃষ্টিবেজা পাথরের ওপর রঞ্জনের হাত ধরে গোটা রাস্তাটা নিয়ে গেছল! এর চেয়ে আর একবার ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দিল না কেন?)
    -- আরে কি মুশকিল! সেতো আমি বাচ্চা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মজা করছিলাম। একটু মস্তির মুডে ছিলাম।
    -- না, মজাটাও হিয়ার অ্যান্ড নাউয়ের মধ্যে পড়ে। কে কি মজা করে কি জোকস্‌ শোনায় তার থেকে শুধু তার রুচি নয়, তার জেন্ডার বায়াস, রিলিজিয়ন বা কাস্ট বায়াস ইত্যাদিও ফুটে ওঠে। এসব তো আপনার অজানা নয়, বাবুমশায়!
    ( অ্যানাকোন্ডার হাঁ-মুখ, চেরা জিভ, দাঁত সব দেখা যাচ্চে।
    হরিদাস পাল এবার দেয়ালে হেলান দিয়ে সবার কথা শুনতে থাকে। অল্প রানে আউট হয়ে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকা দামী প্লেয়ার।)
    কখন অন্যমনস্ক হয়ে গেছল, সবার মিলিত হাসি ও পাশের থেকে কৈলাশের ঠেলায় চটকা ভাঙে।

    - হরিদাস, আপনাকে বলা হচ্ছে। কোথায় আছেন?
    উঠে দাঁড়ান, বলছি।
    রামজীবনের কথা মাথায় ঢোকে না। দেখে উল্টো দিক থেকে জয়ন্ত এগিয়ে এসেছে, কৈলাশ ও আবদুল্লার সঙ্গে কোলাকুলি করছে, সবাই তালি বাজাচ্ছে।
    কি, হয়েছেটা কি?
    রামজীবন বুঝিয়ে বলে। -- লাজুক বুদ্ধিজীবি টাইপ জয়ন্তের আবদুল্লার সঙ্গে আগে পরিচয় ছিল না। এখন হওয়ায় আবদুল্লা বল্ল-- জয়ন্ত!আপ মুঝে বহুত পসন্দ হো। আপসে গলে মিলনেকা দিল চাহতা হ্যায়!
    কৈলাশ বলে- লজ্জা কিসের! এখানে আমরা বন্ধু, সাথী, দাদার ভাষায় কমরেডস্‌! তাহলে?
    হরিদাসদা, আপনার পালা। আপনি কাকে কাকে বন্ধু, সাথী এইসব মনে করেন?
    --সবাইকে!
    -- বহুত আচ্ছা! তাহলে সবার সাথে এগিয়ে এসে কোলাকুলি করুন, নইলে বুঝব আপনার ওসব ঢপের চপ! কথার কথা। রাত গয়ী, তো বাত গয়ী।
    -- কোলাকুলি করতেই হবে?
    -- কোন আপত্তি?
    -- না, না! আসলে আমি ঠিক অভ্যস্ত নই তো!
    -- সে কি! ঈদ বা বিজয়াদশমীতে ? তখন কি করেন ? লোকে তো অপরিচিত লোককেও গলে লাগা লেতে! কাম অন্ দাদা! কাম্ অন!
    বার খেয়ে বিপন্ন হরিদাস এক এক করে কোলাকুলি করে, জয়ন্ত,আবদুল্লা, কৈলাশ, রামজীবন সবার সঙ্গে।
    মুচকি হাসে বিনীতা।
    -- কি হল হরিদাস? আমি কি আপনার বন্ধু নই? না কি আমাকে আপনার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না?
    -- তা- তা কেন? আপনিও বন্ধু। আর আপনাকে অপছন্দ করবে এমন সাধ্যি কার!
    হরিদাস কষ্ট করে স্মার্ট হবার অভিনয় করে।
    --মিথ্যে কথা! না হলে কোলাকুলি প্রোগ্রামে আমি বাদ পড়লাম কেন?
    হটাৎ আসা ইয়র্কারে মিডলস্টাম্প ছিটকে গেছে, ব্যাট নামানোর সময় পাওয়া গেল না।
    -- ধরা পড়ে গেলেন তো! কিসের মশাই আপনার জেন্ডার সেন্সিটাইজেশন! কিসের ইকুয়ালিটি! সব কথার কথা, ফক্কিকারি।
    হরিদাস উঠে দাঁড়ায়, পা-পা করে এগোয় মোটাসোটা হাসিখুশি পাঞ্জাবী মেয়েটির দিকে। সেই স্কুলজীবনে হোস্টেলে একবার আর্শোলাকে ভয় পায় না এই মিথ্যে কথাটা প্রমাণ করতে একটার শুঁড় ধরে তুলে চোখ বুঁজেছিল। বুড়ো বয়সে আর একবার--।
    নাঃ, এত ফাঁসিকাঠের দিকে এগিয়ে যাওয়া। যাকগে , মরে যাওয়ার পর কোন ভয় থাকে না।
    কোন মন্ত্র পড়তে পড়তে যেতে হবে। কি মন্ত্র!
    কোত্থেকে মাথায় ঘুরছে মণীশ ঘটকের কবিতার একটি লাইন---
    "" দেবী তো নহ, বলতো তোমায় কেমনে পূজা করি?
    তোমার মুখে দিব্যবিভা বৃথাই খুঁজে মরি।
    আছে তোমার ললিত বাহু নিটোল দুই স্তন--''
    একি? এসব কি মনে আসছে? নিদানকালে মার্ক্সকে ফ্রয়েড হারিয়ে দিচ্ছেন?
    অবশেষে----।
    না, ফাঁসি হয়ে গেছে। এখন কোন জ্বালা-যন্ত্রণা-উৎকান্ঠা নেই। ওসব অতীতের বস্তু, অন্য রঞ্জন জন্ম নিচ্ছে।

    না, আবার ভুল হল। ফাঁসির পরেও কিছু থাকে; নাড়ি দেখা, ঘাড়ের অপেক্ষিত নমনীয় পেশি এবং নরম হাড়টি ভেঙেছে কি না দেখা। অর্ডার যে বলছে -- তো বে হঙ্গেদ তিল্ল দেঅথ।
    হেসে উঠেছে শুভা মুদগল।
    -- দেখুন! আপনারা সবাই দেখুন! এটা কেমন কোলাকুলি? ক্যায়সা গলে মিলনা? বুকে বুক না ঠেকালে কেমন
    কোলাকুলি! ও তো তেরচা হয়ে দাঁড়িয়ে কোন রকমে আমার দিকে ওর একটা কাঁধ ঠেকিয়ে রেখেছে! অ্যাত্তো ন্যাকামি!
    অগত্যা হরিদাস ঠিকমত ফাঁসিতে ঝোলে। যাক, সব চুকেবুকে যাক।
    -- এই তবে শেষ বেলা!
    হে ভূমিশায়িনী শিউলি,
    আর কি কোনই সান্ত্বনা নেই?

    হরিদাস নিজের জায়গায় ফিরে এসে বসেছে, বোকা-বোকা হাসছে।
    বিনীতা উবাচ,"" তুমি কেমন মানুষ হে? নিজের ইমোশন ভাললাগা লুকিয়ে রাখ? প্রকাশ করতে লজ্জা পাও। আমি তো ভাবতেই পারিনা। আমার সঙ্গে কোন পুরনো বন্ধুর দেখা হলে , ছেলে-মেয়ে যাই হোক, বা বহুত দিন বাদ ভাইয়া বাড়ি এলে, আমি হাগ না করে, খানিকক্ষণ হাত না ধরে থাকতে পারি নে। তুমি হাত ধর না, হাগ কর না, তো কেমন করে ভাললাগা, ইমোশন, খুশি কমিউনিকেট কর?''
    -- আমি কোলকাতায় বড় হয়েছি। আমাদের একটু হাসি, একটু চাউনিই যথেষ্ট। তাতেই আমাদের ভালোলাগা, প্রেম-বিরহ সবই ফুটে ওঠে। গায়ে জড়ানোর দরকার পরে না। এটা টাইম বা কালচারাল ডিফারেন্স, আমি যেটায় কমফোর্টেবল তাই তো করবো। মেয়েটি ভুল বুঝতে পারে সে ভয়ও থাকে।

    বিনীতার ফিচেল হাসি আরও চওড়া হয়।
    -একটা কথা বলি? তুই কিন্তু চাইছিলি আমাকে জড়িয়ে ধরতে। তোর মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম। খালি তোর সংকোচ কাটছিল না। অন্যদের আমার সঙ্গে কোলাকুলি করতে দেখে তোরও ইচ্ছে করছিল। আমরা মেয়েরা ঠিক বুঝতে পারি। এতে দোষের কিছু নেই। তাই তোকে অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিলাম। যা, আজকে রাত্তিরে ভাল করে ঘুমুতে পারবি।

    হরিদাস পালের ডেডবডির শ্মশানক্রিয়া সম্পন্ন হল।

    ৮)
    সন্ধ্যে হয়ে গেছে। চা-বিস্কুট খেয়ে সব ছেলেমেয়ের দল ফিরে যাচ্ছে নিজ নিজ কামরায়। বাবু হরিদাস পালের সব সময় অন্য কিছু করা চাই। উনি জয়ন্তের থেকে ভোপালের "" একলব্য'' নামের একটি এনজিও'র সম্বন্ধে বিশদ জ্ঞান আহরণ করতে লাগলেন।
    ওরা নাকি গত বিশবছর ধরে গাঁয়ের ছেলেদের স্কুলশিক্ষার পেডাগগি নিয়ে লাগাতার ভালো কাজ করে যাচ্ছে।
    এবার ফিরতে হয়। উনি জয়ন্তকে জিগাইলেন যে লাউঞ্জটি কোন দিকে। এখন টি-২০'র ইংল্যান্ডের সঙ্গের ম্যাচটি দেখতে হবে।
    জয়ন্ত বিষণ্ন হেসে জানালো যে ওর ক্রিকেট নিয়ে কোন কৌতূহল নেই। তবে সামনের লনটি পেরিয়ে সাদা বাড়িটার ডানদিকের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলেই দেখা যাবে টিভি চলছে আর অ্যানিমেটর ট্রেনি সবাই চেঁচাচ্ছে।
    হরিদাস পাল বিড়বিড় করতে করতে লন পেরোলেন।
    -- ক্রিকেট দেখি না! কি দেখ? বিশ্বনাথন আনন্দের চেসবোর্ড? যত্ত পাতি আঁতলেমি!
    এবার দশ কদম গেলেই সামনের সাদা বাড়ি। কিন্তু বিজলীখাম্বার নীচে জটলা কিসের? কাছে গিয়ে দেখা গেল জনাপাঁচেক মেয়ে, ফিসফিস করছে।
    -- কি হল? আমি কি আপনাদের কোন সাহায্য করতে পারি? একাজন কৃষ্ণাঙ্গী কলিঙ্গ কন্যা চোখ বড় বড় করে বলল-- ভূত!
    হরিদাস থতমত খেলেন। -- কি? কি বল্লে?
    জটলার থেকে বেরিয়ে এসেছে বিনীতা।
    -- হরিদাস, এই মেয়েটি তুলসী। আমার এনজিওর স্টাফ, এখানে বেসিক ল্যাবে আছে। ও বাগানে কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে।
    তুলসী বলতে থাকে---- বাগানের ওপারে ওই ফোয়ারার নীচে এলোচুলে অন্ধকারে কেউ বসে আছে, নড়ছে না। আর তার চারপাশে নীল আলোর ফুলকি, মাঝে জ্বলে উঠে নিবে যাচ্ছে।
    -- তাতে কি হল? কেউ বসে থাকতেই পারে, আর তার চারপাশে জোনাকিরা জ্বলতেই পারে।
    মেয়ের দল সবেগে মাথা নাড়ে।
    -- বাইরে এসে দেখুন। ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে রাত্তিরে একা কে বসে থাকবে? অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে, কোন হেলদোল নেই। মানুষ হতে পারে না।

    হরিদাস দেখে কৃষ্ণপক্ষের নিকষকালো রাত। কোন হাওয়া বইছে না। বড় বড় আম-জাম-সেগুন-রাধাচূড়ার পাতা নড়ছে না। তারার আলোয় মনে হচ্ছে প্রায় তিনশ' মিটার দূরে ফোয়ারার কাছে আবছা ছায়াশরীর, নারী না পুরুষ বোঝা দায়।
    -- ভূত বলে কিছু নেই। আমি কাছে গিয়ে দেখে আসছি। মিনিট দশেক লাগবে গিয়ে দেখে আসতে। তোমরা এখান থেকেই আমাকে দেখতে থাক।

    ফোয়ারার কাছাকাছি আসতেই নারীশরীরের অবয়ব স্পষ্ট হল। কিন্তু এমন এলোচুলে ? এই রাতে একা অন্ধকারে? হরিদাস এক পা' দু পা' করে কাছে এগিয়ে যায়। তখনই মেয়েটির খুব কাছে জ্বলে ওঠে নীল আলো।
    চমকে ওঠে হরিদাস পাল। পেছন ফিরে তাকায়। মেয়ের দল তিনশ' মিটার পেছনে অস্পষ্ট।

    না, ভয় পেলে চলবে না। আরো কাছে যায়। তার পরেই চিনতে পারে।
    হবু ফেসিলিটেটর স্মৃতি ম্যাডাম। এখানে বসে একা একা মোবাইলের বোতাম টিপে চলেছেন। তারই আলো বার বার ছিটকে উঠছে।
    হোস্টেল ছেড়ে এই অন্ধকার বাগানে কেন এসেছেন? কার সঙ্গে একান্তে গোপন কথা বলতে চান!

    -- স্মৃতি ম্যাম আপ? আপহী হো না?
    বেঁটে মোটা বাচ্চা মেয়ে এলোচুলে ঝাঁকুনি দিয়ে যেন ঘুমের ঘোরে তাকাল, কোন জবাব দিল না।
    -- ম্যাম, সেন্টারসে জ্যামার লাগা দিয়ে হ্যায়। আট বাজে কে বাদ বাত হো পায়েগা। ইঁহা ওস্‌ গির রহী হ্যায়। চলিয়ে মেরে সাথ, ওয়াপস্।
    ওদিকে মেয়ের দল আপনাকে অন্ধকারে এমন একা বসে থাকতে ভয় পেয়ে গেছে।
    স্মৃতি কোন উত্তর দিলেন না। ভূতে পাওয়া লোকের মত হরিদাসবাবুর পেছন পেছন ফিরে চললেন।
    মেয়েগুলো সব শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু তুলসী বলে-- রায়জী, কি দরকার ছিল এটা বলার যে মেয়েরা অন্ধকারে এলোচুলে আপনাকে বসে থাকতে দেখে ভয় পেয়েছে! উনি আধা ফেলিসিটেটর, যদি আমাদের ওপর রেগে যান!
    এবার হরিদাস রেগে যায়। এমনিতেই আগ বাড়িয়ে এসব ছেলেমানুষী ব্যাপারে নাক গলিয়ে ভুল হয়েছে। টুয়েন্টি-টুয়েন্টি শেষ হয়ে যাচ্ছে, তারপর যত বাজে কথা!
    -- রেগে গেলে কি করবে? রাত্তিরে দুটো রুটি বেশি খাবে !
    ওর গজগজানি দেখে বিনীতা ভূতের অস্তিত্ব, বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে গল্প জুড়ে দেয়। আর হরিদাস পাল ক্রিকেট ভুলে মেয়েগুলোকে সত্যজিত রায়ের ভূতের গল্প শোনাতে থাকে।
    ওদের চোখ বড় বড় , সিটি বাজার মত করে শ্বাস টানার আওয়াজ। এই প্রীতিকর কাঙ্ক্ষিত ভয়ের ছোঁয়া পেয়ে ওরা খুশি হয়। কথা আদায় করে যে রোজ খেতে যাবার আগে এদের দলকে অমনি সব ভূতের গল্প শোনাতে হবে।
    এসব কথা কেউ রাখে না। তবু হরিদাস পাল ওদের গোটা পাঁচেক গল্প শুনিয়েছিল।
    সেই খাড়া বাবার গল্প-- সাপের ভাষা সাপের বিষ, ফিস্‌ফিস্‌ ফিস্‌ফিস্‌। সেই বাজি ধরে ভুতুড়ে বাগানবাড়িতে একা রাত কাটনো ইত্যাদি ইত্যাদি।
    কিন্তু ভোরে ঘুম ভেঙে নিজের বিছানায় উঠে বসে রঞ্জন ভাবতে লাগলো-- কেন ক্রিকেট ছেড়ে ও মেয়েগুলোর ভুতের ভয়ের চক্করে গায়ে পড়ে ভিড়ে গেল? শুধু অন্ধবিশ্বাস দূর করার চেষ্টা? শুধুই অন্ধজনে দেহ আলো? হ্যাঁ, নাস্তিক হরিদাসবাবুর অমনি একটু বাই আছে বটে। কোথাও ভূত-ভগবান নিয়ে কথা উঠলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।
    পরশুরামের গল্পের গণিতের অধ্যাপকের মত ভূত=০, আর ভগবান= স্কোয়ার রুট অফ ০, গোছের বিতর্কে মেতে ওঠে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে এসব তো অনেক কমে গেছল। তবে?
    মেয়েগুলোর মধ্যে আদ্দেক তো ওর মেয়েদের বয়সী। তবে?
    এই তবের ঠ্যালায় পড়ে ভাবলো এখানে হিউম্যান ল্যাবের সাইকো অ্যানালিসিস পদ্ধতি গুলো কাজে লাগিয়ে নিজের অন্তর্মনের মোটিভ খুঁজে দেখা যাক।
    খানিকক্ষণ পরে যা দেখতে পেল তাতে ওর মনটা বিস্বাদ হয়ে গেল।
    নাঃ, আমি এখনো ঠিক করে শিখি নি তো, কোথাও ভুল হচ্ছে, এইসব বলে প্যান্ডোরার ঝাঁপিটি বন্ধ করে ও ঘুমিয়ে পড়ল।

    -- ও দাদা! উঠুন। চা দিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ব্রেকফাস্টের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। সবাই চান করে ফেলেছে আর আপনি অসময়ে ঘুমোচ্ছেন?

    ৯)
    পরের দিন সকালে হরিদাস অনেকটা স্বাভাবিক। রাত্তিরে ওর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলছিল আবদুল্লা।
    রাজস্থান দিল্লি বর্ডারের একটি গ্রামের ছেলে। একটা মাঝারি গোছের এনজিওতে কাজ করে। বয়স প্রায় চল্লিশ, ছ'টি সন্তান, সবকটাই ছেলে। হাসিখুশি আবদুল্লা খুব পরিশ্রমী। রোজ রাত্তিরে ল্যাপটপে এϾট্র করে, নোটস্‌ নেয়। অজানা ইংরেজি শব্দ শুনলে মানে জিগ্যেস করে লিখে নেয়। একটি বছর কুড়ির ছেলেকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো-- এই ছেলেটি রাজস্থানের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের, খুবই দুঃস্থ পরিবার। পয়সার আভাবে
    গ্র্যাজুয়েশন করা হয় নি। আমি এখন যে নতুন এনজিও তে জয়েন করেছি, তার ক্যাডার। আমিই তুলেছি, ওদের গাঁয়ে কাজ করতে গিয়ে। ছেলেটি ট্যালেন্টেড; তাই রিক্রুট করলাম। একবছরেই নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে একধাপ ওপরে উঠেছে। ভাল এক্সপোজার পাবে ভেবে এখানে বেসিক হিউম্যান ল্যাবে নিয়ে এসেছি।
    ও মবিলাইজেশন, টি ও টি, সেল্ফ হেল্প গ্রুপ ফর্মেশন, বেস লাইন সার্ভে আর হিন্দিতে রিপোর্ট তৈরি করা--- সবই পারে।
    নানান কথার পর আবদুল্লা বলে -- দাদা, আমি আপনাকে একটা অনুরোধ করতে চাই। আমাকে আপনার এনজিও তে নিয়ে নিন। আপনি তো ওর বোর্ডে আছেন বল্লেন। প্লীজ, দাদা! আমি আর পারছি না।
    -- সেকি! তুমি না দেড়বছর হল বর্তমান সংস্থাটিতে কাজ করছ, বদলাতে চাও কেন? আর আমার তো অনেক দূরে, ছত্তিশগড়ে। মাসে-দুমাসে একবার বাড়ি যেতে পারবে।
    -- দাদা, সত্যি কথা বলি ? এই এনজিও অত্যন্ত করাপ্ট, পয়সার লুট চলছে। আমি পারলে কালকেই ছেড়ে দিই।
    হরিদাস পাল চমকে ওঠে। এমন অনেক এনজিও আছে শুনেছে বটে! তাবলে এইরকম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা?
    খোলাখুলি চার্জ!
    -- একটু খুলে বল। আগেরটা ছাড়লে কেন? সেটাও করাপ্ট?
    -- না দাদা! আগেরটা ""প্রদান'' সংস্থার স্পিন অফ , মিঃ সৈয়দ জাঈদী'র অর্গানাইজেশন। খুব কোয়ালিটি এনজিও। সাত বছর কাজ করেছি।
    -- ছাড়লে কেন?
    -- ছাড়লাম আমার রাগের জন্যে, চন্ডাল রাগ। আসলে মিঃ জাঈদী একটু কানপাতলা, ওনার কোটারির পরামর্শে চলেন, ব্যস্ত ভদ্রলোক, সব সরেজমিনে দেখতে পারেন না। ওনার চেলার চুগলি শুনে আমাকে অন্যায় ভাবে বকেছিলেন। আমার মাথায় রাগ চড়ে গেছল,-- অ্যাদ্দিন ইমানদারীতে কাজ করে শেষে এই পুরস্কার! তৎক্ষণাৎ রেজিগনেশন লেটার টাইপ করে ওনাকে ধরিয়ে দিয়ে বল্লাম-- যখন আমার ওপর আপনার বিশ্বাস উঠে গেছে তখন আর আপনার সংস্থায় কাজ করব না। চলে এলাম বাড়ি।
    -- তারপর?
    --তারপর সাতদিনের মাথায় জাঈদী সাহেবের মেইল এল। আমার রেজিগনেশন এখনো পেন্ডিং রাখা আছে, চাইলে কালই ফিরে যেতে পারি। কিন্তু আমার রাগ কমে নি, সোজা মেইল করলাম-- অনেক ধন্যবাদ, কিন্তু আমি থুতু চেটে খাই না।
    এখন বুঝি, মনের মধ্যে অহংকার জমে ছিল। আমি খুব ভাল কাজ জানি। যেকোন ডেভেলপমেন্টাল এনজিও'র জন্যে আমি অ্যাসেট,আমি বসে থাকব না। কিন্তু দু'মাস কেটে গেল-- কোথাও জায়গা খালি নেই। আমার ঘরে আটজন প্রাণী, বড় ছেলে দুটো হায়ার সেকন্ডারি আর ম্যাট্রিক পড়ছে। ওদের ফীস, কোচিং, জামাকাপড়, ঈদ-মহরম সবই তো আছে। জমা পুঁজি নেই। হাজার বিশেক মাইনে পাই। নিজের জন্যে কোন শক-আহ্লাদ করিনে।
    হলে গিয়ে সিনেমা দেখা কবেই ছেড়ে দিয়েছি। হেডকোয়ার্টারে শস্তা সে শস্তা একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি, একবেলা রেঁধে খাই। অন্য বেলা চানা বা ছাতু। জামাকাপড় নিজে ধুয়ে ইস্ত্রি করে নিই। মাসে একবার মাইনে পেয়ে টাকা দিতে বাড়ি যাই দিন তিনেক থেকে আবার চলে আসি।
    কিন্তু কোথাও কেউ ডাকছে না। তখন ত্যাগীকে বল্লাম। আপনার তো ওর সঙ্গে পরিচয় আছে। রাজস্থানে ""প্রিয়া''র এইচ আর? ও আমাকে এখানে মধ্যপ্রদেশের নিমাড় জেলায় লাগিয়েছে। কিন্তু এখানে অর্গানাইজেশনের প্রোমোটার মহাচোর। দশজায়গা থেকে গ্র্যান্ট নিয়ে ইভেন্ট বেসড্‌ কাজ করে। কাজ যা হয়! খালি চুরি! ও চায় ওর স্টাফও চুরির ভাগ নিক আর কোন প্রশ্ন না করুক। কিন্তু আমার দিল
    গবাহী দেয় না। তাই দেখুন না আপনাদের ওখানে,কুড়িহাজার পেলেই চলবে। আসলে ভোগল সায়েবকে জানি, আর আপনাকেও দেখছি। আমি ইমানদারির রোটি খেতে চাই, আল্লাতালা জানেন। এখানে মুখবুজে করে যাচ্ছি, কিন্তু বেশিদিন পারবো না। প্লীজ দাদা! একটু দেখবেন।

    ইতিমধ্যে ওর মোবাইল বেজে ওঠে।
    ও বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বেশ উচ্চগ্রামে কথা বলতে থাকে। রুমের সবাই তাকিয়ে আছে দেখে বাইরে গিয়ে কথা বলতে থাকে। কিন্তু গলার আওয়াজ চড়ছে সেটা ঘরের ভেতর থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
    খানিকক্ষণ পরে ও আবার উত্তেজিত হয়ে হ্যালো-হ্যালো বলতে বলতে ঘরে ঢোকে, তারপর মাথা নেড়ে মোবাঅইলটা দেয়ালে আছড়ে মারে। মোবাইলটি ককিয়ে উঠে টুকরো হয়ে মেজেতে পড়ে যায়। গোটা কামরা নিঃস্তব্ধ।
    কৈলাশ গিয়ে ভাঙা মোবাইলের টুকরো গুলো তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। নাঃ, ব্যাটারি আর সিমকার্ডদুটো মনে হয় অক্ষত রয়েছে। নিজের হ্যান্ডসেটে লাগিয়ে দেখে- হ্যাঁ, কাজ করছে বটেক। সন্ধ্যেয় দশ কিলোমিটার দূরের ছোট টাউনে গিয়ে একটি শস্তা হ্যান্ডসেট কিনে আনলেই আবার রাত্তিরে বউয়ের সঙ্গে কথা বলা যাবে। কেউ কোন কথা বলে না। আবদুল্লা দেয়ালের দিকে সরে গেছে। আস্তে আস্তে ঘর খালি হয়ে যায়। হরিদাস এগিয়ে গিয়ে আবদুল্লার কাঁধে হাত রাখে। আবদুল্লা আস্তে করে সরিয়ে দেয়। একটু পেছন ফিরে দাঁড়ায়।
    --- মোবাইল ছুঁড়ে ফেললে কেন?
    কোন জবাব নেই।
    -- এত রাগ কার ওপরে? এভাবে একটি চাকরি খুইয়েছ, ছেলেদের পড়াশুনো শেষ হয় নি। তারপর?
    -- কী করব? আমি ছেলেকে জিগ্যেস করছি, কেন কোচিংয়ে যাচ্ছে না, তো ও লাইন কেটে দিল!
    --তুমি কি করে জানলে যে ও লাইন কেটে দিয়েছে?
    -- আমি জানি, ও শালার ছেলে বহুত নচ্ছার টাইপ। আমি খেটে মরছি, ওদের জন্যে সব কিছু করছি। আপনি দেখছেন খুব সাদাসিদে ভাবে থাকি, কোন সাধ-আহ্লাদ করি নে। নিজের হাতে জামা কেচে ইস্ত্রি করে ব্যবহার করি। ওদের পাড়ার খরচা দিতে, খাতাবই দিতে কোন কার্পণ্য করি নে। তবে কেন শালার ছেলে পড়বে না? জিগ্যেস করেছি তো লাইন কাটবে!
    -- ধেত্তেরি! সেই এক কথা! আরে এই গহন জঙ্গলে হরদম নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, তারপর ট্রেনিং সেন্টার থেকে শুনেছি দিনের বেলায় জ্যামার লাগিয়ে রাখে। আমার ও তো বউয়ের সঙ্গে কথা কইতে দশবার লাইন কাটছে, তার মানে কি গিন্নি ইচ্ছে করে?
    -- কী যে বলেন! কোথায় বৌদি আর কোথায় ওই উনপাঁজুরে লক্ষ্মীছাড়া ছেলে!
    -- তুমি তোমার ছেলেদের সাথে একটুও বন্ধু হতে পার না? খালি শাসন কর?
    (কখন রামজীবন ফিরে এসেছে, হরিদাস স্বস্তি বোধ করে। )
    -- দেখুন, আমি ভাবি আমার বাড়িতে আমার কথাই ফাইনাল। আমি জানি সবার ভাল কিসে হবে। আর আমার অন্য কোন স্বার্থ তো নেই। তাই যখন দেখি আমি যা যা নির্দেশ দিয়ে এসেছি সেগুলো ঠিকমত মানছে না, তখন মাথায় রক্ত চড়ে যায়।
    মানছি, মোবাইল আছড়ে ফেলা বোকামি। আমি যে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারিনা। বড় দুটো বাঁদর। কিন্তু ছোট চারটে আমার সঙ্গে খেলে, আমার গায়ের ওপর ওঠে।
    ইতিমধ্যে ঘন্টা বেজে ওঠায় ওরা ক্লাসে চলে যায়।

    ১০)
    আজকের ক্লাসে গিয়ে দেখা গেল জলের বোতল নেই, মসকুইটো কয়েল ও নেই। ওই অ্যানাকোন্ডা মিঃ ওয়ালিয়া নিশ্চয়ই এইসব দেখে নিজের হাতে বোতলে জল ভরে আনবেন। মনে মনে আমাদের কী ভাববেন কে জানে! বাবু হরিদাস পাল দুটো খালি বোতল হাতে নিয়ে জল আনতে চললেন। উনি মানেন যে ভালো লীডর হুকুম না দিয়ে বাই এগ্‌জাম্পল লীড্‌ করে।
    কিন্তু ক্লাসরুমের বাইরে দু'পা এগিয়েছে কি অ্যানাকোন্ডা!
    মাপা পায়ে ক্লাসরুমের দিকে প্রায় নিঃশব্দে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। হরিদাস পাল থতমত খেয়ে বলে ওঠে-- স্যার, জল নিয়ে আসছি।
    অ্যানাকোন্ডা কোন কথা না বলে ক্লাসে ঢুকে পড়ল। কি অসভ্য লোক রে বাবা! প্রোগ্রামের ডীন হয়েছে তো মাথা কিনে নিয়েছে। জল-টল নিয়ে ফিরে এসে রঞ্জন দেখতে পেল ধুন্ধুমার বেধে গেছে।

    বিনীতার মুখ রাগের চোটে লাল টকটকে, পারলে চোখের আগুনে আবদুল্লাকে ভস্ম করে ফেলে।
    -- তাহলে আপনি আমাকে বন্ধু মনে করেন না! বেশ, কারণটা কি জানতে পারি?
    আবদুল্লার চেহারায় একটা কাঠিন্য, চোয়াল যেন বেশি শক্ত। ও কোন উত্তর না দিয়ে স্বীকৃতিসূচক মাথা হেলায়।
    বিনীতার ক্রোধের পারা কয়েক ডিগ্রি চড়ে যায়। গলার পিচ তার সপ্তক ছুঁয়ে ফেলে।
    -- এখানে বাকি চারজন আপনার বন্ধু, শুধু আমি বাদ। আমার অপরাধ? আমি মেয়ে, তাই না?
    আবারো আবদুল্লার মাথা নড়ে ওঠে।
    -- শুধু মেয়ে বলে আমি আপনার বন্ধুত্বের যোগ্য নই? মেল-শভিনিস্ট- পিগ কথাটা শুধু শুনেছি, আজ প্রথম কাউকে প্রত্যক্ষ করলাম।
    "পিগ' শব্দটি কি আবদুল্লার মুসলিম সত্তায় আঘাত করল? মনে পড়ল বঙ্কিমের কোন উপন্যাসের একটি এপিসোড্‌। এক ব্রাহ্মণ মাছ-ভাত খাচ্ছিল, তাই দেখে এক মুসলিম প্রতিবেশি ইয়ার্কি করে জিগাইল-- আপনাদের অবতার ভক্ষণ করছেন নাকি?
    চট্‌ জলদি জবাব এল-- হ্যাঁ, আমাদের তৃতীয় অবতার!
    মুসলিম ভদ্রজনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল-- তওবা! তওবা!
    আবদুল্লার অন্তর্মনও কি শভিনিস্ট- পিগ অভিধায় ভুষিত হয়ে তওবা-তওবা করে উঠেছে?
    যেন চিন্তার প্রতিধ্বনি করে আবদুল্লা বলে উঠলো-- আমাকে যা খুশি গাল দিন গে, সে আপনার শিক্ষা ও রুচির ব্যাপার। কিন্তু আমার জন্যে কোন মেয়ে বন্ধু হতে পারে না। আমার ধর্মে যে শিক্ষা পেয়েছি তাতে মেয়েরা আমাদের সমান নয়, বন্ধু হবে কি করে?
    ঘরের মধ্যে ব্যারোমিটারের পারা আরো নেমে গেল। সবাই চুপ।
    হরিদাস বলে-- আবদুল্লা ভাই! মেয়েদের ব্যাপারে এমনি চিন্তা নিয়ে আপনি মেয়েদের সেল্ফ-হেল্প-গ্রুপ চালান কী করে? ওদের মবিলাইজ করেন কী করে?
    -- তাতে কি হয়েছে? আমি দুর্বল, পীড়িত মহিলাদের সংগঠিত করি, ওদের বন্ধু ভাবি না তো? এর মধ্যে কোন স্ববিরোধ নেই।

    বিনীতার মুখের রেখা বঙ্কিম হয়ে ওঠে।
    --ওহো, মেয়েরা আপনার দয়ার পাত্র। আপনি দুর্বল, অসহায় মেয়েদের করুণা করেন। বেশ, বেশ!
    -- আপনি হয়তো ব্যতিক্রম, কিন্তু অধিকাংশ মেয়ে এই সমাজে অবশ্যই দুর্বল, সাহায্যপ্রার্থী। আপনাদেরই
    মনুসংহিতায় আছে না যে নারী স্বাধীন স্বতন্ত্র নয়। অল্পবয়সে বাবার, যৌবনে স্বামীর এবং বার্ধক্যে পুত্রের প্রটেক্‌শনে থাকে?
    এবার হরিদাস উত্তেজিত হয়।
    -- এটাও জেনে বসে আছ, আবদুল্লা ভাই? আরো অনেক আছে। তুলসীদাস বলেছেন-
    চোর, ঢোর, শুদ্র অউ নারী,
    এ চার হ্যায় তাড়ন অধিকারী।
    অর্থাৎ, চোর, পশু, শুদ্র এবং মেয়েদের পিটিয়ে ঠিক লাইনে রাখতে হয়। এটা পড়নি?
    রবীন্দ্রনাথের "স্ত্রীর পত্র'' পড়েছ? তাতে উনি সতী অনুসূয়ার কুষ্ঠরোগগ্রস্ত স্বামীকে পিঠে করে বেশ্যালয়ে পৌঁছে দেবার বহুপ্রচারিত গল্পটিকে পুরুষদের কাপুরুষতার চরম বলেছেন। পড়নি? যত্তসব গারবেজ মনে রেখেছ শুধু!
    -- ওটা আপনাদের ধর্মের ব্যাপার, আপনারা ভাল বুঝবেন। আমি শুধু আমার ধর্মের অনুশাসন মানতে বাধ্য।
    কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায়।
    বিনীতা উঠে পড়ে।-- আমি একটু বাইরে খোলা হাওয়ায় ঘুরে আসছি।
    ঘরের মধ্যে অস্বস্তিকর নীরবতা। গুমোট বাড়ছে। অ্যানিমেটর ওয়ালিয়া বোধহয় পাশ ফিরে ঘুমুচ্ছিলেন। রামজীবন বোতল থেকে জল খায়। জয়ন্ত জায়গা বদলে কৈলাশের পাশে গিয়ে বসে। রঞ্জন জানলার পর্দার গায়ে বারবার একটি বোলতার আছড়ে পড়া দেখতে থাকে। তার মধ্যে কোন প্যাটার্ন আছে কিনা ভাবতে থাকে।
    -- মানুষ কিভাবে আর মুক্ত হবে? নিজেই নিজের হাতে পায়ে শেকল বেঁধে রেখেছে। নানারকম শেকল। কোনটা ধর্মের, কোনটা ভাষার, কোনটা রাজনীতির।
    ওরে বাবা, অ্যানাকোন্ডার ঘুম ভেঙেছে। অ্যানাকোন্ডার চ্যাটালো মাথা বিবর থেকে বেরিয়ে এসেছে, হলদেটে চোখ গুলো আবদুল্লাকে একদৃষ্টে দেখছে।

    ইতিমধ্যে বাইরের খোলা হাওয়া খেয়ে বিনীতা শুভা মুদগল ফিরে এসেছে। কিন্তু এখন সবার চোখ অ্যানাকোন্ডা- অ্যানিমেটর ওয়ালিয়ার দিকে। শিকার ধরতে উদগ্র সরীসৃপ, চেরা জিভ বেরিয়ে এসেছে।
    -- কি যেন আগে বলছিলেন , আবদুল্লা? আপনার বড়ছেলে দুটো অবাধ্য, কথা শোনে না, ঠিকমত পড়াশুনো করে না? কোচিংয়ের ফি নিয়েও সেখানে যায় না? যাবে কি করে! আপনার ওই মাই-ওয়ে- অর-হাইওয়ে অ্যাটিচুড তো ক্ষমতার ভাষা, স্নেহশীল বাপের ভাষা নয়! ওদের বোধহয় ঘরে থাকতেই ভালো লাগে না। আপনি যখন রাগের চোটে মোবাইল ভেঙে ফেলতে পারেন তখন সামনে পেলে নিশ্চয়ই ওদের গায়ে হাত তোলেন?
    --- তা অবাধ্য ছেলেদের শাসন করতে একটু-আধটু ওরকম হয়ে যায়। কিন্তু আপনি যেরকম ভাবছেন তা নয়। বাকি চারটে বাচ্চারা আমার সংগে খেলে, পিঠে-ঘাড়ে ওঠে।
    বাঃ, আবদুল্লা অ্যানাকোন্ডার হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে।
    -- এটা বেশিদিন থাকবে না। আপনার যা অ্যাটিচুড ওরাও শীগ্গির বারমুখো হবে।
    এই বলে ওয়ালিয়া আবার পাশ ফিরে শুলেন।
    যাকগে, এযাত্রা বোধহয় ওনার শিকার ফসকে গেল। দমবন্ধ ভাবটা কাটাতে হরিদাস পাল একটু জল খায়, বোতল যথাস্থানে রাখে। আড়চোখে ঘড়ি দেখে নিশ্চিন্ত হয় যে চায়ের ঘন্টা বাজতে বেশি দেরি নেই।
    --- মাফ কীজিয়েগা, আপনি শেষবার কবে বৌয়ের গায়ে হাত তুলেছেন বলবেন কি?
    আচমকা সরীসৃপের হামলা। অ্যানাকোন্ডা শিকারকে বুঝতেই দেয়নি। টপ করে গিলে নিয়েছে। বাকি পাঁচজন দর্শক উত্তেজনায় টানটান। ঘরের মধ্যে অক্সিজেন কমে গিয়েছে।
    এমন প্রশ্ন কাউকে করা যায় নাকি? এতো নেহাৎ ব্যক্তিগত, অপমানকর; তাও আবদুল্লাকে? ও যদি অ্যানিমেটর ওয়ালিয়ার বিরুদ্ধে এথিক্স কমিটিতে যায়? ও যদি এমন ওয়ার্কশপ বয়কট করে? ওয়ালিয়া এমন লুজ নো-বল করলেন? সেটা আবার ওয়াইড হয়ে বাউন্ডারির দিকে চলে যাচ্ছে!
    -- প্রায় পাঁচবছর আগে।
    আবদুল্লার খাদে নামা গম্ভীর স্বর শোনা যায়।
    জয়ন্ত অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে,"" তারমানে বছর পাঁচ আগে আপনি বৌকে পেটাতেন? কেন?""
    --- আমার কথা না শুনলে, আমি চাই আমার বাড়িতে যেমন বলব তেমনটি করতে হবে। ব্যতিক্রম হলে ভীষণ রাগ হত।
    -- ""কেমন মারতেন? জোরে? বাচ্চাদের সামনে?'', রামজীবনের প্রশ্ন।
    -- হ্যাঁ, বাচ্চাদের সামনে। হাত দিয়েই, বেশ জোরেই হয়ে যেত। ওই যে বল্লাম, আমার বাড়িতে ডিসিপ্লিন ব্রেক আমি বরদাস্ত করি না। তাহলে বাচ্চারা কি শিখবে?
    হতভম্ব হরিদাস পাল শুধোয়,-- আর এখন?
    -- এখন আমি আর রোজকার ব্যাপারে মাথা গলাই না। ওর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। বলি- তুই যা ভাল বুঝছিস তাই হবে।
    ক্রি-রি-রিং করে বেল বেজে ওঠে।
    হরিদাস বাইরে গিয়ে চা-বিস্কুট নিয়ে এদিক-ওদিক থেকে ওয়ালিয়াকে খুঁজে বের করে। ওনাকে একটু কোণার দিকে নিয়ে যায়। বড় বড় শ্বাস ফেলে জিগ্যেস করে--একটা কথা জানতে চাইছি, আপনি আবদুল্লাকে অমন প্রশ্ন কি করে করলেন? এত ব্যক্তিগত এবং অপমানজনক প্রশ্ন? ও যদি অন্য ভাবে নিত?
    ওয়ালিয়ার চোখে একটা দুষ্টু ফিচেল হাসি।
    -- হ্যাঁ, আমি অনেক ভেবে এই প্রশ্নটা করেছি। এটা একটা লোডেড কোশ্চেন বটে! রিস্ক ছিল, নিয়েছি। ক্যালকুলেটেড রিস্ক, আমাদের পেশায় নিতে হয়। শচীন- সৌরভ যখন স্টেপ-আপ করে ছয় মারে তখন কি রিস্ক থাকে না? স্টাম্প হওয়ার রিস্ক? বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডারের হাতে ধরা পড়ার রিস্ক? তবু নিতে হয়, ওরা নেয়, দশবারের মধ্যে সাতবার সফল হয় আর তিনবার হেলমেট হাতে করে হেঁটে প্যাভিলিয়নে ফিরে আসে।
    -- তবু? কিছু একটা--?
    --হ্যাঁ, ছেলেটা অসম্ভব সৎ। দেখলে তো? ও বলতেই পারতো যে এরকম কিছু হয় নি, আমি কক্ষণো বউয়ের গায়ে হাত তুলিনি। অনেক সাহস লাগে সবার সামনে স্বীকার করতে!আর এখান থেকেই হয়তো ছেলেটা ঘুরে দাঁড়াবে।
    হরিদাস পাল অন্যমনস্ক হয়ে কিছু ভাবতে ভাবতে ক্লাসে ফেরে।
    ক্লাসে ঢুকে থমকে দাঁড়ায় ও। যেন বিজয়াদশমীর কোলাকুলি চলছে। রামজীবন জয়ন্তের আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে কিছু ফিসফিস করে বলে চলেছে।
    ( শালা! আঠা দেখ, যেন কোন গে-দম্পতি। হরিদাস পালের জিভের স্বাদ কেমন তেতো হয়ে যায়।)
    কিন্তু নেপালী চেহারার ছয়ফুটিয়া কৈলাশ আবদুল্লার হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে আসে,--কোথায় গিয়েছিলেন দাদা? সেবার হিমালয়ের কোলে কেমপ্টি ভিলেজের ওয়ার্কশপে আপনার সঙ্গে কত কথা হত, এবার আপনার নাগালই পাচ্ছিনা। আজ রাত্তিরে আপনার সঙ্গে এক রাউন্ড হয়ে যাক। ওই টি-টুয়েন্টি আজ বাদ দিন। অনেক কথা বলার আছে।
    হরিদাস পালের পাঁজরা নিয়মিত জিমে যাওয়া ছেলেটির চাপে ককিয়ে ওঠে।
    চোখের কোণ দিয়ে দেখে বিনীতার হাত ধরে রয়েছে আবদুল্লা, বলছে-- আমি চেষ্টা করব, আজ থেকেই, একটু তোমার সাহায্য চাই।
    শুভা মুদগলের চেহারা ঝলমলিয়ে ওঠে।
    --তুমি ঠিক পারবে, আবদুল্লা। আমি তো আছিই।
    হরিদাস পালের কোথাও একটু হিংসের খোঁচা লাগছে, নাকি মনের ভুল?
    ১১)
    সকালে খাওয়ার টেবিলে আজ আবদুল্লা আর ওর পাশে বসেনি।স্নান করতে দেরি হল নাকি? নাকি এখনো বৌ আর ছেলেদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলছে? থালায় হালুয়া-পুরি আর দই নিয়ে হাসি মুখে বিনীতা এসে পাশে বসলো।
    আজাকে ওর পরনে গাঢ় চকোলেট রঙের ঢোলা কুর্তা আর সালোয়ার, কপালে একই রঙের টিপ আর হেয়ার ব্যান্ড।আর নেল পলিশ? কি হল ওর? মেয়েদের ব্যাপারে উদাসীন বল্লে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু হেয়ার ব্যান্ড? নেল পলিশ? কালে কালে হল কি? এর পর কি ওদের অন্তর্বাসের রং নিয়েও ভাবনা-চিন্তা শুরু হবে!
    নাঃ, এগুলিই কি বুড়ো বয়সের ইয়ে? তবে কি প্রস্টেট বেড়েছে? এইবয়সে সম্ভাবনা থাকে আর তখন এইধরণের উড়ু উড়ু ভাব হয়।
    রায়পুরে ফিরে গিয়ে বৌকে না জানিয়ে প্রস্টেট চেক করাবে কি?
    -- আছ কোথায়, শ্রীমানজী? এখানে? নাকি দিল্লিতে? নাকি রায়পুরে বৌয়ের সামনে অ্যাটেনশান হয়ে রিপোর্টিং করছ?
    চমকে উঠে দেখে বিনীতা ওর মুখের সামনে হাত নাড়ছে।
    -- কী? ঠিক বলেছি না? তোমার মত বাঙালীপুরুষদের বিলক্ষণ চিনি। এরা ভীষণ ভীতু আর বৌ-ন্যাওটা হয়।
    -- আচ্ছা! বিয়ে না করেই এত কিছু জেনে বসে আছ?
    এটা কি বলল হরিদাস পাল! না বললেই ভাল হত, কেন যে একটু ভেবে মুখ খোলে না?
    বিনীতার চেহারায় কি একটু মুখের-ওপরে-মেঘ-ভেসে-যায়?
    ও হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গী করে তারপর উত্তেজিত হয়ে ডাইনিং হলের বিপরীত কোণায় আঙুল তুলে ইশারা করে।
    -- ওদিকে দেখ? কি, আজকের হিরোকে চিনতে পারছ? একেই বলে মেটামরফোসিস। কিন্তু রিভার্স প্রসেস। মানুষ থেকে গুবরেপোকা না হয়ে পোকা থেকে মানুষ!

    হরিদাস অবাক হয়ে তাকিয়েই থাকে। হলঘরের নৈঋতকোণে এক লম্বা টেবিল। সেখানে একগাদা জুনিয়র ব্যাচের মেয়ে বসে খাচ্ছে। খাচ্ছে কম, হল্লা করছে বেশি। ওদের মধ্যে মাত্র দুজন ছেলে। কিন্তু পিংক টি-শার্ট পরা মানুষটি যে বড্ড চেনা। ও বোধহয় কোন শের শোনাচ্ছে বা জোকস্‌। হাসির হর্‌রা উঠছে, মেয়েগুলো টেবিল চাপড়াচ্ছে। আওয়াজ উঠছে -- এনকোর! এনকোর! ইরশাদ! ইরশাদ!

    হ্যাঁ, চেষ্টা করছে, আবদুল্লা অপরিচিত মেয়েদের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করছে।

    আজকের হট সীটে কৈলাশ। লম্বা ছেলেটির টোন আপ পেশি। গতবছর মুসৌরির কাছে কেম্পটি গ্রামের ওয়ার্কশপে এর সঙ্গে ওর দোস্তি হয়। বৃষ্টিভেজা হিমালয়ের পাকদন্ডী অজানা পথে এই ছেলেটিই ওর ভারি স্যুটকেস অনায়াসে বয়ে নিয়ে ওকে বাঁচিয়েছিল।
    কিন্তু কথা হচ্ছে দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে, এর যে কোন হেলদোল নেই। বয়সে সবচেয়ে ছোট , হ্যান্ডসাম, তায় মুখে একটি টুথপেস্ট হাসি---সবাই একে একটু প্রশ্রয়ের চোখে দেখে।
    কিন্তু আজ ও হট সীটে?

    নিশ্চয়ই অ্যানাকোন্ডা চুপিসাড়ে কাউকে উসকেছে; ওয়ালিয়া মহা চালু, একদম চলতা-পূর্জা আদমী!

    সবাই চাইছে কৈলাশ কিছু বলুক। নিজের সম্বন্ধে, এই ওয়ার্কশপ সম্বন্ধে, হিয়ার অ্যান্ড নাউ প্রিন্সিপল্‌ সম্বন্ধে।

    কিন্তু ও কিছু বলছে না, শুধু মুখে একটি মোনালিসা হাসি কপি-পেস্ট করে রেখেছে। আরে বল্‌ না রে বাবা! এত্তগুলো লোক রিকোয়েস্ট করছে! এদের কোন দাম নেই!

    হরিদাস যেন শুনতে পাচ্ছে অনেকগুলো পুরনো বাংলা গানের কলি।
    জয়ন্তঃ "বল,বল তোমার কুশল শুনি, তোমার কুশলে কুশল মানি।'
    বিনীতাঃ " বল্‌, গোলাপ মোরে বল্‌, তুই ফুটিবি সখি কবে?'
    রামজীবনঃ " বল সখি সে নাম আমার কানে কানে'।
    আবদুল্লাঃ "বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও'।
    হরিদাস এই সব দেখে গেয়ে ওঠে --বল্‌ মা তারা দাঁড়াই কোথা।

    কি আশ্চর্য্য! এত সাধাসাধিতেও যে কাজ হল না হরিদাস পালের ভাঙা গলার ইয়েতে ছেলেটা চমকে উঠে হাসিমুখে তাকাল। তারপর চড়া স্কেলে একটু নাকিসুরে গেয়ে উঠলো- মন রে, কৃষিকাজ জান না!

    সবাই অবাক। সেকি তুমি বাঙালী নাকি?
    -- আমি শিলচরের ছেলে। নেপালী হলেও বাংলা জানি। আমার ছেলেবেলার বেশির ভাগ বন্ধুই বাঙালী।
    -- বেশ, কিন্তু এখানে আমরাও তো বন্ধু। কিন্তু তুমি এমন করছ যেন এখানে থেকেও নেই। সবাই চেষ্টা করছে আত্মমন্থনের, চেষ্টা করছে "হিয়ার অ্যান্ড নাউ' প্রিন্সিপলের বা টেকনিকের ভিত্তিতে ডেটাভিত্তিক ফিড্‌ব্যাক নিয়ে নিজের আসল চেহারা চেনার। কিন্তু তুমি নিজের ইমোশন, ফিলিং কিছুই শেয়ার করছ না। লুকিয়ে রাখছ, কেন? এত সংকোচ কিসের! আমরা তোমাকে এবং পরস্পরকে হেল্প করতে চাই।

    খানিকক্ষণ চুপচাপ। ছেলেটা মাথা নীচু করে কিছু ভাবছে, বড় বড় শ্বাস টানছে, নিজের হাত দুটো উল্টেপাল্টে দেখছে।
    এবার হরিদাস পাল জিগ্যেস করতে শুরু করল।
    --আচ্ছা, এটা বল। তুমি নেপালী, শিলচরের ছেলে। এখন রাজস্থানের একটি বড় এনজিওতে কাজ করছ। আমার
    কৌতূহল শিলচর থেকে রাজস্থানে কেমন করে এলে?
    কৈলাশ হাসে। হাসলে ওর গালে বেশ টোল খায়। হরিদাস পালের মনে হয়-- আচ্ছা, ওর ক"টা গার্লফ্রেন্ড আছে?
    -- শিলচর থেকে রাজস্থানের গঙ্গানগরে আসিনি তো? আমি পেশায় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। শিলচরের রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে করেছি। বেঙ্গালুরুতে তিন বছর একটি মাল্টিন্যাশনালে কাজ করেছি। তারপর চাকরি ছেড়ে ওখান থেকে পাওয়া যোগাযোগে রাজস্থানে এনজিওর কাজ করছি।

    জয়ন্ত বলে ওঠে--" আরে , এতো প্রায় বুদ্ধদেবের রাজপাট ছেড়ে সন্ন্যাসী হওয়ার গল্প।'
    বিনীতা--" তুমি তো দেখছি ছুপা রুস্তম!'
    " সে নিয়ে কোন সন্দেহ নেই', রামজীবন বলে," কিন্তু এই বৈরাগ্যের কারণটা কি বলবে না? কোন কলজেতে তীর বেঁধার গল্প'?
    কৈলাশ লাজুক হেসে মাথা নাড়ে।
    তারপর বলে,"" দেখুন, সব চিকিচ্ছে সবার জন্যে নয়। কারো কারো হোমিওপ্যাথি কাজ করে না।আবার কারো কারো জন্যে হোমিওপ্যাথিই ঠিক। আমার মনে হচ্ছিল যে এইসব টি-গ্রুপ মেথড আমার জন্যে নয়।'
    -- তাহলে এলে কেন?
    -- আমার অর্গানাইজেশন পাঠিয়েছে তাই। একটু
    কৌতূহলও ছিল। আমি আর আবদুল্লাজি একই সংস্থার। ওনাকে শ্রদ্ধা করি। এতদূর একা আসবেন, তাই ওনার সঙ্গী হয়েছি। আগের বারের মত।'

    -- ""আমার মায়ের মৃত্যুটি আমি ঠিক মেনে নিতে পারিনি। না, না, কোন অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক নয়, আত্মহত্যাও নয়। কিন্তু অকালমৃত্যু। আমার বয়স সাত, মা চলে গেলেন। সেই অল্পবয়সেই কেমন মনে হত এর জন্যে দায়ী বাবার অবহেলা। মা চলে গেলেন অভিমানে।
    বাবা আবার বিয়ে করলেন।
    এল একটি বোন, ছোট ভাই। নতুন মা ভাল।
    ঘরে খাওয়া পরার কোন কষ্ট নেই। কাছের চা বাগানে বাবার ভাল চাকরি। কিন্তু বাবা আর আমার মধ্যে দুরত্ব বেড়ে গেল।
    ওনাকে ঠিক সহ্য করতে পারতাম না। বাবা আমার খেয়াল রাখতেন, চেষ্টা করতেন, সেটাই অসহ্য লাগত।তাই সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকার চেষ্টা করতাম। খেলে বেড়াতাম কাছের লেবার বস্তির বন্ধুদের সঙ্গে। বাড়ি ফিরতাম সন্ধ্যের পরে।
    বাড়িতে আমার ভালবাসার সম্পর্ক শুধু দিদিমার সঙ্গে। আমাদের সঙ্গেই থাকতেন। রাত্তিরে কথা বলতাম। যেন সব ব্যথা উপে যেত।
    দিদিমা চলে গেলেন। ঘর আরও অসহ্য হয়ে উঠল। চার-পাঁচদিন পরে পরে বাড়ি ফিরতাম। এখন বন্ধুদের বাড়িই আমার বাড়ি।
    একদিন বাবার মুখোমুখি হলাম। না, বরং বাবাই আমার মুখোমুখি হলেন। যা নয় তাই বল্লাম। বাবা হতবাক। কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল।''
    জয়ন্ত জলের বোতল এগিয়ে দিল।
    ঢকঢক করে খানিকটা জল খেল কৈলাশ। পা দুটো লম্বা করে ছড়িয়ে দিল। একবার আঙুল মটাকালো, তারপর আবার বলতে শুরু করলো।
    --"" পড়াশুনোয় ভালই ছিলাম, তাই ভাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চান্স পেলাম। কিন্তু ছুটিতে বাড়ি এসে বন্ধুদের বাড়িতে গেলে একটা জিনিস বুকে ধাক্কা মারত,-- গরীবি।

    ছোটবেলায় অনায়াসে দৌড়ে ঢুকে গেছি বন্ধুদের টিনের বা খাপরার চালের ঘরে।
    ওদের মা-কাকিমা আমারও ঘনিষ্ঠ। ওদের বাড়ির খাবার খেয়েছি। সব কিছু আমার বাড়ির থেকে আলাদা। কিন্তু কত আলাদা তা নিয়ে কখনো ভাবিনি। সেই বয়সে এসব মনে দাগ কাটেনি।
    এখন হোস্টেল থেকে ফেরার পর এগুলো চোখে খোঁচা মারতে লাগল। বস্তির বন্ধুদের মধ্যে অনেকে পড়াশুনোয় ভাল ছিল। কিন্তু ওদের বাবা-মার স্কুলের বেশি পড়াশুনোর সামর্থ্য নেই।
    কেন এমন হবে? বাবার ওপর রাগ বেড়ে গেল।

    আরেকটা ব্যাপার হল জিমে যাওয়া। কলেজে বেধড়ক ঠ্যাঙানি খেতাম। রোগাপটকা দেখে যে সে মারত। কলেজে মেয়েবন্ধু জুটল। সে নিয়ে একবার বাওয়াল হল। মার খেলাম। আশ্চর্য্য! মেয়েটি ব্যঙ্গের হাসি হেসে চলে গেল। ঠিক করলাম জিমে যাব। নিয়মিত যেতাম। মাসল টোনড্‌ আপ হল। ট্রেকিং ক্লাবে যোগ দিলাম। সে এক নেশা।
    ছুটিতে বাড়ি এসে বস্তির বন্ধুদের নিয়ে ট্রেকিং ক্লাব করলাম।
    বাবা এসে বস্তির বন্ধুদের বাড়িতে খোঁজ নিতেন আমি ছুটিতে শিলচরে ফিরেছি কি না। কারণ হোস্টেল থেকে ফিরে বাড়ি না গিয়ে সোজা বন্ধুর বাড়িতে উঠতে লাগলাম।
    লুরুতে ভাল চাকরি হল। বছর দুই কেটে গেল।
    মন মানে না। মনে হয় এ আমার কাজ নয়। ঘরের কাছের আঁখো দেখা গরীবি-বঞ্চনা অসহ্য হয়ে উঠল। পথ কোথায়? আমার জন্যে কোন বকরূপী ধর্ম বসে নেই। উগ্রবাদে আমার আস্থা নেই। চাকরি ছাড়লাম। একটি যোগাযোগে চলে গেলাম রাজস্থানের এই মাঝারি এনজিওতে। গ্রামের মানুশদের মধ্যে কাজ করি। মন্দ নেই। কয়েক মাসে একবার বাড়ি যাই। এখন বাবাকে যেন খানিকটা বুঝতে পারি। কথা বলার চেষ্টা করি। দুজনেই। পারি না।
    এ'ব্যাপারে আপনাদের এই ওয়ার্কশপ, এই টি-গ্রুপ মেথড আমার খুব কাজে আসবে মনে হয় না।''
    সভা হল নিস্তব্ধ। অ্যানাকোন্ডা-ওয়ালিয়া যেন কিছু বলবেন। আমরা তাকিয়ে আছি। এমন সময় ঘন্টা বাজল। উনি চুপচাপ উঠে চলে গেলেন।

    ১২)
    আজকের সেকন্ড সেশনে সবাই একটু আড্ডা মারার মুডে, তিব্বতীয় বৌদ্ধমঠের গুরুগম্ভীর ধ্যানমগ্ন ভাবটা একেবারে নেই। জয়ন্ত, বিনীতা আর হরিদাস কথা বলতে থাকে আবদুল্লার নিজের ওপর পরীক্ষানিরীক্ষার সাহস নিয়ে।
    আবদুল্লা আজকাল অনেক বেশি হাসিখুশি। ও কাল শুতে যাবার আগে হরিদাসকে বলেছে-- "' সুবহ্‌ কা ভুলা অগর শাম তক ঘর লৌট আয়ে তো উসে ভুলা নহীঁ কহা জাতা।'' মানে, প্রথম জীবনের ভুল যদি জীবন সায়াহ্নেও শুধরে নেয়া যায় তাহলে সেটা আর ভুল থাকে না। আর বলেছে- বিনীতা কে দেখ, এক আশ্চর্য মেয়ে। সারাজীবন বন্ধু হিসেবে ধরে রাখবার মত।
    এরপর কথা ওঠে কোলাকুলি বা হাগ্‌ করার ব্যাপারে পূর্বাগ্রহ নিয়ে। হরিদাসবাবু এটাকে ওনার প্রেজুডিস বলে মানতে চাইছেন না। ওনার মতে এটা পশ্চিম থেকে ধার করা কালচারবিহীন নকলনবিশী। আজকের ছেলেমেয়েরা করছে, করুক। ওরা তো ভ্যালেন্টাইন ডে পালন করে, তাই বলে আমরাও! এতো বাঙালভাষায় যাকে বলে "" দেহাদেহি ভেকায় নাচে!''
    তুমূল তর্ক বেঁধে যায়।
    হটাৎ শেষনাগের শয্যা থেকে অ্যানাকোন্ডার হিস্‌ ভেসে আসে,--- এতে কোন অসুবিধা হওয়ার কি আছে, আমরা সেক্সুয়াল হাগিং আর নন্‌ -সেক্সুয়াল হাগিং এর তফাৎ বুঝতে পারলেই হল।
    ওরা ওয়ালিয়ার অস্তিত্ব প্রায় ভুলেই বসে ছিল।
    হরিদাস পাল চটে ওঠে। হতভাগা অ্যানাকোন্ডা যখন তখন গুহা থেকে মাথা বের করে কেন!
    ও ঝাঁঝিয়ে ওঠে -- খুব বুঝতে পারি, কেন পারব না?
    -- কি করে বুঝতে পারেন একটু জানতে পারি কি?
    -- কেন, যে হাগিংয়ে শরীরে সেক্সুয়াল ট্রিগার পয়দা হয়?

    এমন সময় অফিস থেকে একজন স্টাফ রেজিস্টারের সঙ্গে একটি নোটিস নিয়ে ক্লাসরুমে ঢোকে। ওয়ালিয়া উঠে বসে রেজিস্টারে সই করে নোটিস রিসিভ করেন। তারপর, ক্লাস ছেড়ে চলে যান।এ'রকম আগে আরো দু'একবার হয়েছে। ফলে বাকিরা সবাই নিজেদের আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে।
    হরিদাস বলে, " দেখলে? ওয়ালিয়া পর্য্যন্ত হাগিংয়ে সেক্সুয়াল ট্রিগারের কথা স্বীকার করেন। কাজেই আমি--'।
    জয়ন্ত বলে ওঠে," তো ক্যা?'
    আর আশ্চর্য, শুভা মুদ্‌গলও হামিসূচক মাথা নাড়ে।
    এরা বোধহয় বক্তব্যটি ঠিকমত বোঝেনি।
    -- "আমি বলছিলাম কি এর ভালো মন্দ দুটো দিকই আছে।'
    চশমা পোঁছতে পোঁছতে জয়ন্ত বলে--" এর মধ্যে খারাপটা কি দেখলে'?
    --" কেন ওই যে হাগিংয়ে সেক্স্যুয়াল ট্রিগারের সম্ভাবনা?'
    --" ধ্যেৎ! হোক গে সেক্স্যুয়াল ট্রিগার! হতেই পারে। একটা ফিজিক্যাল ফেনমেনন। তাতে গুড/ব্যাড কি আছে?'
    হরিদাস সহজে জমি ছাড়বে না।
    -- হয়তো এই ট্রিগার মেয়েটির বা ছেলেটির অভিপ্রেত নয়। তাহলে?
    --- মেরী মাঁ! গুড/ব্যাড এক ভ্যালু জাজমেন্ট হ্যায়। ইসে এক ফিজিক্যাল ফেনমেনন কে সাথ কিউঁ জোড় রহে হো হরিদাস? দ্যাট টু, উইদাউট কন্টেকস্ট? কিশোরকুমার কা উয়ো গানা নহীঁ শুনে হো? ওহি " না কোঈ তেরী বস্‌ মেঁ জুলি, না কোঈ মেরী বস্‌ মেঁ'।
    হরিদাস পালের হাঁ-মুখ বন্ধ হয় না। আর সেদিনের বেলাশেষের ঘন্টা বেজে ওঠে।

    ওয়ার্কশপের সপ্তাহ দেখতে দেখতে ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু এই অ্যাডভান্সড্‌ বেসিক ল্যাবের ছ'জনের অ্যানিমেটর বা ফেসিলিটেটর শ্রীল শ্রীযুক্ত সুরেশ ওয়ালিয়া কেন যেন ঠিক খুশি ন'ন। বলছেন না কিছু, কিন্তু কোথাও একটু উত্তাপের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।
    --" আরে, এত ভাবার কিছু নেই, ওটা অ্যানাকোন্ডার স্বভাব।" বাবু হরিদাস ফোড়ন কাটেন।
    ওয়ালিয়া এলেন দশ মিনিট দেরিতে, বল্লেন একটি ইম্পর্ট্যান্ট শর্ট মিটিং ছিল। তারপরই অন্যদিনের মত অনন্তনাগের শয্যাগ্রহণ না করে সোজাসুজি মুখোমুখি হলেন বিনীতা শুভা মুদগলের।
    -- ম্যাডাম, তুমি এই কদিনের ওয়ার্কশপে ইন্টেন্সিভলি পার্টিসিপেট করেছ। আই শ্যুড সে অনেককে হেল্প করেছ ওপেন হতে। তোমার কিছু ইন্টুইটিভ ক্ষমতা আছে মানুষের বাহ্যিক ব্যবহার থেকে তার আন্তরিক ইমোশনকে চিনে নেয়ার।
    কিন্তু এই ওয়ার্কশপে তুমি কোথায়?
    আমরা শুভা মুদগলকে দেখছি। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, ভালো সাথী, চমৎকার কামেরাদারি। কিন্তু এইসবের মাঝখানে কোথায় হারিয়ে গেছে বিনীতা সায়গল। আমি তাকে খুঁজছি, এটা আমার দায়িত্ব। তার জন্যে কি পত্রিকায় হারানো-প্রাপ্তি-নিরুদ্দেশ কলামে বিজ্ঞাপন দিতে হবে? মনে হয় তাতেও কোন লাভ হবে না। কেউ যদি হারিয়ে না গিয়ে আসলে ইচ্ছে করে লুকিয়ে থাকে তাহলে কি করে পাওয়া যাবে!
    কেন বিনীতা, কেন? তোমার ই¾ট্রস্পেক্‌শনের ডেটা কোথায়? নিজেকে কেন লুকিয়ে রেখেছ?
    --বলতেই হবে? একেবারে ব্যক্তিগত ব্যাপার।
    -- সেটা জেনেই তো এই ওয়ার্কশপের ফর্ম ভরেছ। এখন সংকোচ করলে চলবে?
    হরিদাস পালের উসখুশ করা বেড়ে যায়।
    -- " এটা কি টিভি চ্যানেলের " সচ্‌ কা সামনা' গোছের রিয়েলিটি শো হয়ে যাচ্ছে না?'
    -- না, ওইসব শো কথা বলে "দেয়ার অ্যান্ড দেন' নিয়ে,বিগত সময়ে যা ঘটে গিয়েছে তা নিয়ে কনফেশনের মত। কিন্তু আমরা করছি টি-গ্রুপ মেথড, আমাদের বেসিস " হিয়ার অ্যান্ড নাউ' ম্যাক্সিম।
    শিলচরের নেপালী ছেলে কৈলাশ ফিসফিস করে গোদা বাংলায় বলে--"" হল তো! বাঙালীর লোহা দেখলেই গুয়া চুলকোয়।''
    বিনীতা কথা বলে। একটু অপ্রস্তুত হেসে কপালের ওপর এসে পড়া চুর্ণ কুন্তল সরিয়ে দিয়ে কথা বলে। ওর ঠোঁটের ওপর , ওর কপালে এই গুলাবী-জাড়া বা হালকা শীতের দিনেও বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমে ওঠে। কিন্তু আস্তে আস্তে শুভা মুদগলের খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে পুরুষদের দুনিয়ায় একটি বিপন্ন অপ্রস্তুত ভ্যাবাচাকা খাওয়া মেয়ে--বিনীতা সায়গল।
    -" এখানে তো আমরা সবাই বন্ধু, একে অপরকে ট্রাস্ট করি। তাই না? আমি জানি খেলার নিয়ম অনুযায়ী এখানে যা বলব তা এই চারদেয়ালের মধ্যেই থেকে যাবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? এথিকস্‌ কমিটির সার্কুলার তাই বলে বটে, কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা কি অত এথিক্স্‌ মেনে চলি? তাই ভয় করে, আমার বড় ভয় করে।
    আমি জানি আমি খুব মোটা, কলেজ জীবন থেকেই জানি সবাই আমাকে নিয়ে হাসে, রাস্তায় ঘুরে তাকিয়ে দেখে। আমি সুন্দর বলে নই, মোটা বলে। পাড়ায়,শপিং মলে, বাস টার্মিনাসে পেছন থেকে মন্তব্য উড়ে আসে--- এ মোটি! বাপ-মা বচপন সে ক্যা খিলাকর বড়া কিয়া?
    ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে রাস্তা দিয়ে কোন হ্যান্ডসাম ক্লাসমেটের সঙ্গে হাঁটতে সংকোচ বোধ করি। মনে হয় সবাই আমাকে দেখছে আর ভাবছে এই মোটি কি করে এমন ছেলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে!
    নেপালী ছেলেটি বলে ওঠে-- " এটা কি কথা হল? খামোকা তিল কে তাল করছো? মোটা তো কি হয়েছে, এটা তো লাইফ স্টাইলের ব্যাপার। জিম যাও, সাঁতার কাটো, খাওয়ার থেকে ডালডা-ঘি-চিনি বাদ দাও। ব্যস্"
    -" বলা সহজ!" আবদুল্লা ফুট কাটে।
    কিন্তু রামজীবন তিওয়ারি বলে--" কৈলাশ তো নিজে জিম গিয়ে ওর মেয়েলি হাত-পা পেশিবহুল করে দেখিয়েছে। তাহলে উল্টোটা কেন হবে না? আর বা ঐ ধরণের কোন হেল্থ-ক্লাবে গেলে ওরা রিয়েলি খুব হেল্প করে। বিনীতা গেলে পারে। ইন ফ্যাক্ট, ওখানে আমার চেনা একজন---"।
    বিনীতা হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দেয়।
    --" আমি দিল্লির মেয়ে, আমি কি ওসব জানিনা , না চিনি না? সব করে দেখেছি। আমার ওজন, পৃথুলাবপু -- এসব আর বদলাবে না।"
    --কারণ?
    --" কারণ আমার মোটা হওয়ার কারণ শারীরিক নয়, ফুড হ্যাবিট নয়, ওটা সাইক্মোলজিক্যাল।"
    " তুমি কি আগে ডিপ্রেসনে ভুগতে?" হরিদাস পালের পাকামি।
    (তুই ডিপ্রেসনের কি জানিস রে শালা! খালি টেকনিক্যাল টার্ম বলে ইম্প্রেশন জমাঅনোর চেষ্টা!)

    -- আমি নয়, দাদা! বহুদিন ভুগেছে। আসলে ছোটবেলায় বাবা মারা গেলে মা অথৈ জলে পড়ে যায়। মামারা সাহায্য করেছিলেন। আমি স্কুলের ডিঙ্গি পেরিয়ে গ্র্যাজুয়েট হলাম। ভাইয়া পড়ল আমাদের শহরের অনামা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, তাতেই মার কিছু চুড়ি-হার বেচে দিতে হল। ওগুলো নাকি আমার বিয়ে দিলে কাজে আসতো। আমি টিউশনের টাকায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করলাম।
    কিন্তু ভাইয়ার মন ভেঙ্গে গেল। ও চেয়েছিল আই আই টিতে ভর্তি হবে। তার জন্যে কোচিং নিতে রাজস্থানের কোটা শহরে যাবে। মামারা রাজি হলেন না। ওনাদের দোষ দিইনে, আমাদের জন্যে অনেক করেছেন। ওদেরও তো ছেলেমেয়ে আছে! কিন্তু কোথাও সুর কেটে গেল।
    ভাইয়ার মনে হল ওর উপরে আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি। অনেকবার বলেছে --একবার সুজোগ পেলে করে দেখাব, তারপর ভালো চাকরি পেয়ে পাই-পাই চুকিয়ে দেব।
    কিন্তু হল না। ভাইয়া এনটিপিসিতে চাকরি পেল। সিংরৌলি প্ল্যান্টে পোস্টিং। কিন্তু ওর বন্ধুরা তো সব বাইরে গেছে। ভাইয়া হরদম ছুটি নিয়ে বাড়ি আসতে লাগলো। বলত ভালো লাগছে না। তারপর শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে সিংরৌলি যাওয়া ছেড়ে ঘরে বসে থাকতো। ল্যাপটপে কাকে কাকে কিসব মেইল করত। চাকরি গেল। ভাইয়া ঘর থেকে বেরোন বন্ধ করে দিল। বাতি জ্বালাত না। বলত বিল- পে হয় নি তাই লাইন কেটে দিয়েছে।
    মা সারাদিন কাঁদত। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি, ভাইয়াকে যে বড্ড ভালোবাসি। ডাক্তার দেখালাম, চিকিৎসা করালাম। সাইকিয়াট্রিস্ট, উনি আমার বন্ধুর দাদা। খরচ কিছু কম পড়ল।
    ভাইয়াকে ভালো করলাম। ও নতুন কোম্পানিতে যোগ দিল। এখন আমরা ভালো আছি।
    -- ধ্যেৎ, এসবের সঙ্গে তোমার মোটা হওয়ার সমস্যার কি সম্পক্কো? কেন সারবে না বলছ?
    হরিদাস ঝাঁঝিয়ে ওঠে।
    --বলতেই হবে? তাহলে শোন।
    এই বলে বিনীতা চুপ করে যায়। কেউ কোন কথা বলছে না।
    এবার ও বোতল থেকে ঢকঢক করে খানিকটা জল খায়।

    তারপর ও যেন আনমনে নিজের সঙ্গে কথা বলছে এমনি ভাবে নীচুগলায় এক অদ্ভূত সিং-সং ভয়েসে বলতে শুরু করে," আমার সমস্যাটা সাইকোলজিক্যাল বলেছিলাম, কিন্তু এর উৎস ফিজিক্যাল।
    ছোটবেলায় আমার সঙ্গে একটা যা-তা ঘটনা ঘটেছিল। আজকাল যাকে বলে চাইল্ড অ্যাবিউজ। ঘরের মধ্যেই, আমার ছোটমামা। পন্ডিত মানুষ। বেশ নামকরা লেখক। প্রতিষ্ঠিত হিন্দি ম্যাগাজিনে ওনার গল্প-প্রবন্ধ বেরোয়। আমাকে খুব আদর করতেন, চকোলেট দিতেন। আমি একটু গাবলু-গুবলুগোছের ছিলাম। অনেক গল্প বলতেন, বেড়াতে নিয়ে যেতেন। আমার স্কুলের ফীসও দিয়েছিলেন। আমি অনেকদিন কিছু মনে করিনি। আসলে মনে করার মতন কোন কারণও ঘটেনি। ঠিক অস্বাভাবিক বলা যায় এমন কিছু ঘটেও নি।
    তারপর একদিন। দিনটা ছিল শনিবারের বিকেল। আমি তখন ক্লাস সেভেনে। মা গেছেন হনুমান মন্দিরে, ভাইয়া ক্রিকেট মাঠে। আমার শরীরটা ভাল লাগছিল না বলে ঘরে শুয়ে ছিলাম। ছোটমামা এলেন। শরীর খারাপের কথা শুনে আদা দিয়ে চা করে দিলেন। তারপর একথা-সেকথা। হটাৎ কেমন একরকম করে তাকালেন। হেসে বল্লেন-- আরে, তুই তো বড় হয়ে গেছিস রে! দেখি তো কত বড়?
    উনি খেলার ছলে আমার বুকের মাপ নিলেন। বড় হতে চাস? আমার কথা শোন, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাবি।
    তারপর উনি আমার জামা খুলে বুক চুষতে লাগলেন। বল্লেন-ভয় পাস্‌ না। তুই বড় হচ্ছিস। বড় হতে গেলে অনেক সহ্য করতে হয়।
    এই খেলা চলল বছর দুই। আমার কখনো কখনো ব্যথা করত। দাঁতের দাগ বসে যেত। বলতাম, ছেড়ে দিন, বলতাম মাকে বলে দেব। উনি হাসতেন-- বলে দ্যাখ, দিদি কার কথা বিশ্বাস করে।
    তারপর যখন ক্লাস নাইনে ওঠার সময় আমার প্রথম মাসিক হল, তখন মা আমাকে অনেক আদর করল। আর ব্যাটাছেলেদের সংস্রব নিয়ে অনেক সাবধানবাণী ঝাড়ল। তখন আমি বল্লাম-- ছোটমামার কথা। মা ফ্যাকাশে হয়ে গেল আর বল্লো-- মুন্নি, আগে কেন বলিসনি।
    -- ভরসা পাইনি তুমি কাকে বিশ্বাস করবে। আর মামা যে আমার স্কুলের ফীস দেয়। যদি পড়া বন্ধ হয়ে যায়? আমি যে পড়তে চাই, মা!
    --- আগ লাগে অ্যায়সি পড়াই মেঁ; ওরে বেটি! এসব কথা তুই কেন ভাববি? তুই যে অনেক ছোট, এসব তো আমি ভাববো। মা কথা রেখেছিল। ছোটমামার এবাড়িতে আসা বন্ধ হয়ে গেল।কিন্তু আমাকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ছেড়ে মিউনিসিপ্যালিটির হিন্দি মিডিয়াম স্কুলে ভরতি হতে হল, ওটা যে ফ্রি!
    তখন থেকেই আমার নিজের মধ্যে দুখে গেল যে আমি এর জন্যে দায়ী।

    --- যত্ত বাজে যুক্তি! এমন দুর্ঘটনা ছোটবেলায় ঘটতেই পারে। কিন্তু তার জন্যে তুমি নিজেকে দোশী ভাববে আর মোটা হতে থাকবে? এসব তোমার নিজের তৈরি করা ভ্রম। তোমার মানসিক চাপের শারীরিক প্রভাব পড়তে পারে, তাবলে এতটা?
    চশমার ফাঁকে জয়ন্তর চোখে রাগ গরগর করতে থাকে।
    -- মনের চাপ আর শরীরের পরিবর্তন-- এ'নিয়ে কতটুকু জান তোমরা? আমার মাস্টার্স সাইকোলজি নিয়েই। আর আমি নিজে ভুক্তভোগী। বলতে বাধ্য হচ্ছি ঘটনাটি ছোটমামার আসা বন্ধ হওয়ায় শেষ হয় নি এর রেশ রয়ে গিয়েছিল । বছর আঠের-উনিশ হতেই আমার একটা অদ্ভুত শারীরিক উপসর্গ দেখা দিল। মাসে-দুমাসে আমার ব্রেস্টের মধ্যে একটা চুলকুনি, তারপর অস্বস্তি , তারপর টনটনে ব্যথা শুরু হত। আমি ছটফট করতাম। একদিন ঘটনাচক্রে আবিষ্কার করলাম কেউ একজন মিনিটখানেক চুষে দিলে ব্যথাটা ম্যাজিকের মত চলে যায়। এটা কখন হবে কেউ বলতে পারেনা।
    নিজেই এর সমাধান বের করলাম। আমার ঘনিষ্ঠ পাঁচজন বন্ধুর গ্রুপ ছিল কলেজে। তিনজন মেয়ে, দুটি ছেলে। ওরা সাক্‌ করে দিত। যে কাছাকাছি থাকত সেই, বাইটার্ন। ওরা আমাকে সবাই "মাম্মি" বলে ডাকতো। এই গোপন চক্রের সবকটি বন্ধু আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছে। কেউ এই অসুখ নিয়ে আমাকে মিসইউজ্‌ করেনি।
    সভা হল নিস্তব্ধ। কেউ বুঝে উঠতে পারছে না কি করা উচিৎ।
    হরিদাসবাবুর গলায় থুতু শুকিয়ে গেছে। মনে মনে কয়েকবার রিহার্সাল দিয়ে উনি বল্লেন," বিনীতা, কেউ তোমাকে বলেছে তুমি কত সুন্দর দেখতে?"
    বিনীতা চমকে উঠে মেঘেঢাকা চাঁদের মত হাসে, দুদিকে মাথা নাড়ে।
    -- " আমি তোমাকে বলছি-- তুমি খুব সুন্দর, অতুলনীয়া। সবার সামনেই বলছি।"
    বিনীতার হাসিতে লজ্জার অরুণিমা।

    ১৩)
    আর মাত্র দেড় দিন। আজকের সেকন্ড সেশন, আর কালকের গোটা দিন। এর পর সবাই ফিরে যাবে নিজের নিজের আস্তানায়, দৈনন্দিন জীবনে, রুটি-রোজির ধান্ধায়। সেখানে গিয়ে কতজন এই ওয়ার্কশপের শিক্ষাগুলোকে আত্তীকরণ করে নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারবে? বলা মুশকিল। আজ দিনের শুরুতেই অ্যাডমিন থেকে কিছু হ্যান্ড আউট আর একটি বই দেয়া হয়েছে।
    একটি প্রবন্ধে সাবধান করে দেয়া আছে যে সবাই বাড়ি গিয়ে যেন তক্ষুণি নিজের বৌ-বাচ্চাকে ধরে- বেঁধে " হিয়র এন্ড নাউ " প্রিন্সিপল শেখাতে না বসে!
    এও বলা হয়েছে যে ছোটবাচ্চা নতুন নতুন দাঁত উঠলে সব কিছুকে কামড়াতে চায়। তেমনি একসপ্তাহের ওয়ার্কশপ করে সবাই ভাবে টি-গ্রুপ মেথড শিকে গেছে।
    কিন্তু সাধু সাবধান,
    ফির কহি কর অবধান।
    শহরের বাইরে হাইওয়েতে গাড়ি চলে ৮০-৯০ এর স্পীডে, কিন্তু শহরে ঢুকলেই সাইনবোর্ড চোখে পড়ে-- স্পীড ২৫ বা ৩০ এর বেশি নয়।
    তেমনি এখানে প্রাত্যহিক জীবনের বাইরে আইসোলেটেড ল্যাবরেটরি কন্ডিশনে প্রত্যেককে অবসার্ভ করা হচ্ছে। সেটা রিয়েল লাইফে সম্ভব নয়। কাজেই তাড়াহুড়ো করে ডেটা নিলে ভুল হওয়ার চান্স বেশি। এটা আসলে গোটা জীবন রোজ অভ্যেস করার প্রশ্ন, যেন অবচেতনে বসে যায়! যেমন রোজ ঘর ঝাঁট দিতে হয়।
    আজ শুরুটা ভাল হয় নি। সবাই কেমন রোম্যান ক্যাথলিক হয়ে পাপ-স্বীকারের মুডে আছে।
    রামজীবন তিওয়ারি বিড়বিড় করছে-- সারাজীবন এক ভুলভুলাইয়ায় ( গোলকধাঁধায়) কেটে গেল। মাকড়সার মত নিজেই নিজের চারদিকে জাল বুনে চলেছি। কে বলেছিল এসব করতে? তাহলে কেন?হরিদাস পালের এসব একটু বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে। ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল--
    তাই অসহ্য লাগে ও আত্মরতি,
    অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
    -- এটা কি?
    -- কিছু না; বাংলা কবিতা।
    -- গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের লেখা?
    ( ধুস্‌ শালা! দাড়িদাদু ছাড়া বাংলায় কেউ পদ্য লেখেনি নাকি?)
    ও ভাবল, সুধীন দত্ত ও বিষ্ণু দে নিয়ে কিছু ডায়লাগবাজি করবে, কিন্তু কৈলাশ ইশারায় চুপ করাল। ঘরের ওপাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে জয়ন্ত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চশমার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল। অবাক হরিদাস ওকে রুমাল এগিয়ে দিল, পিঠে হাত রাখল, আরে! হয়েছেটা কী?
    ভাঙা গলায় জয়ন্ত বলে--- আমি আমার সংগঠনের সব জুনিয়র মেয়েদের বলেছিলাম যে আবদুল্লা নিজের ওপর কঠিন এক্সপেরিমেন্ট করছে। ও মেয়েদের ব্যাপারে ধার্মিক ও সামাজিক প্রেজুডিস কাটিয়ে সমান ভাবে মেশার চেষ্টা করছে। কিন্তু সহজ হওয়া সহজ নয়। তোমরা ওকে একটু সাহায্য কর। কনশাসলি হেল্প কর।
    -- তাতে কী হয়েছে?
    -- আমার কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে আমি কেন আবদুল্লাকে আমার চেয়ে কমজোর দুর্বল ভাবলাম? কেন ভাবলাম যে ও নিজে এই প্রবলেম হ্যান্ডল করতে পারবে না? আমি কেন অহংকারের চোটে বন্ধুকে অসম্মান করলাম?
    ( বাবা! এতো সুপার-ন্যাকামি, অতি- দার্শনিকতা! বুদ্ধিজীবি জয়ন্তের কি টি-মেথডের বদহজম হল?)
    বিনীতা গিয়ে জয়ন্তের হাত ধরে খানিকক্ষণ বসে রইল। এই মেলোড্রামা শেষ হল আবদুল্লা ও জয়ন্তের কোলাকুলি দিয়ে, তারপর চায়ের ঘন্টি বেজে উঠল ঠিক সিনেমা হলের ইন্টার্ভ্যালের মত।
    চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার ফাঁকে হরিদাস দেড়েল জয়ন্তের থেকে জানার চেষ্টা করছিল যে ও কোন বিশেষ রাজনৈতিক দর্শনের ভক্ত কি না! কিন্তু জয়ন্তের কেমন নিরাসক্ত হাবভাব, যেন রঞ্জনকে ও আগে থেকেই মেপে নিয়েছে। ও দুদিকে প্রবল মাথা নেড়ে বলল যে ও খালি মার্কেট ক্যাপিটালিজম ও তার অঙ্গ গ্লোবালাইজেশনের প্রবল সমালোচক।
    ও কি বেশি সাবধানী? ও কি ভয় পায়? কোন শালা পায় না!
    এঁটো কাপ রাখতে রাখতে ওর চোখে পড়ল যে মেয়েদের একটি ছোট দঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আবদুল্লা অঙ্গভঙ্গী করে কিছু বলছে আর সবাই হেসে উঠছে।
    হরিদাস পালের মাথায় কিলবিল করছে কিছু বেয়াড়া কবিতার লাইন, সম্ভবতঃ আশা দেবীর কোন হাসির গল্পের কোথাও ছিল ফুলশয্যার রাতে বৌয়ের নকল চুলের খোঁপা দেখে নায়কের মনের আকুলি-বিকুলিঃ
    " তোমার কালো চুলের মাঝে,
    কি যে আছে, কি যে আছে,"
    তারপরই গল্পের নায়কের মাথায় এসেছিল
    " চড়ব আমি আমড়া গাছে।"
    ও ক্লাসে দিকে এগিয়ে যায়। জয়ন্ত নিজের রাজনৈতিক পরিচয় কেন লুকোতে চাইছে? নাকি সবটাই হরিদাস পালের কল্পনা? মার্কেট ক্যাপিটালিজমের সমালোচক, কিন্তু কোন রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত নয়? হ্যাঃ, কাঁঠালের আমসত্ত্ব! ল্যাঙ্গটের বুকপকেট? কি হচ্ছে কি! এসব কি ভাবছে ও? তোমার অহংকারে বা কনফিডেন্সে আলপিন ফুটিয়েছে কেউ, তোমাকে হিন্দিতে যাকে বলে ' নাপ দিয়ে হ্যায়!'

    তবু আকাশের ময়লা কাটছে না।
    এবার কোত্থেকে মনে আসছে ছোটবেলার শোনা একটা শস্তা চুটকি।
    শেয়ালদা প্ল্যাটফর্মের পাশের ঝুপড়িতে একটি বাঙাল মেয়েকে লাইন দিচ্ছেন শহরের ধনীঘরের বখাটে ছোকরা।
    ছেলেঃ করুণা, একটু ভাব তো! আকাশে ওই রূপোর থালার মত চাঁদ, আর নীচে তুমি আর আমি!"
    বাঙাল মেয়েটিঃ " হ, হ! বুঝসি, বুঝসি, তুমি আমার লগে শুইতে চাও, তাই পটাইবারে লাগঝ-অ!"
    এটা কেন মনে এল? জয়ন্তও কি ওই চুটকির প্রতাড়িত অভিজ্ঞ মেয়েটির মতো পূর্ব অনুভব থেকেই সাবধানী হয়েছে?

    কিন্তু ওর তেতো অনুভবের আরও বাকি ছিল।
    আজকের বিকেলের সেশনে ফেসিলিটেটর ওয়ালিয়া একটু আগে এসেছেন। বসে বসে কিছু ফাইল নাড়াচাড়া করার ফাঁকে খুটুর খুটুর নোটস্‌ নিচ্ছেন। একবারও কাত হয়ে গুহায় ঢুকতে থাকা অ্যানাকোন্ডার পোজ মারেন নি। ওনার অন্যমনস্ক চোখ মাঝে মাঝে আড্ডারত ট্রেনিদের ওপর দিয়ে সার্কাসের তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসা সার্চলাইটের মত ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। ফলে হরিদাস পাল এন্ড কোং একটু অসহজ।
    এবার উনি কাগজপত্তর গুছিয়ে নিয়ে চশমাটা ঠিক করে গলা খাঁকারি দিলেন। ক্লাসরুম জুড়ে সন্নাটা, সন্নাটা।
    ---আগামী কাল সন্ধ্যেনাগাদ আমাদের এবারের ওয়ার্ক্শপ শেষ হবে। তোমরা এই ফীডব্যাক ফর্মগুলো নিয়ে আজ রাত্তির থেকেই ফিল আপ করা শুরু করে দাও। বলা বাহুল্য, নির্ভয়ে লিখবে। ফেসিলিটেটর থেকে টোটাল কোর্স ডিজাইন, লজিস্টিক প্রবলেম্স-- সব ব্যাপারে খোলাখুলি লিখবে। তাতে আমাদের সুবিধে হবে। এই টি-গ্রুপ মেথডে তোমরা ভাল ভাবে পার্টিসিপেট করেছ। চেষ্টা করেছ নিজেকে মেলে ধরার, অন্যদের চোখে নিজেকে দেখার, অন্যদের দেয়া ডেটা সিরিয়াসলি নিয়ে সমীক্ষা করার। আমি বিশেষ ভাবে বলব আবদুল্লার কথা। গত কয়েকদিনে ও যেভাবে মেয়েদের ব্যাপারে নিজের প্রেজুডিস কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে, নিজের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছে--- আমরা অবাক হয়ে গেছি।

    হ্যাঁ, আমরা ; মানে "আইস্যাব্স্‌" এর সমস্ত ফ্যাকাল্টি মেম্বার। আমরা নিজেদের মধ্যে রোজ রাতে আলোচনা করি কঠিন কেসগুলো নিয়ে। সবাই মিলে নজর রাখি "অবজেক্ট" এর ওপরে। ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে। কারণ আমরা মনে করি -- মানুষ ক্লাসরুমের ভেতরে ও বাইরে একই থাকে। তাই। এটা গোয়েন্দাগিরি নয়। তোমরা " বেসিক হিউম্যান ল্যাব" কমপ্লিট করে "অ্যাডভান্স হিউম্যান ল্যাব(আ) অ্যাটেন্ড করতে এখানে এসেছ। ফ্যামিলি ও ওয়ার্কপ্লেসের পরিচিত এনভায়রনমেন্ট ছেড়ে এই পান্ডববর্জিত জায়গায় । এখানে গোটাটাই ল্যাবরেটরি। ক্লাসরুম, রিক্রিয়েশন রুম, বাগান, ডাইনিং হল-- সব মিলে একটাই ইউনিট।
    কিন্তু একজনকে নিয়ে আমরা চিন্তিত। প্রথম দু'দিন সে ঠিক ছিল। তারপর থেকেই তার অন্য চেহারা আমরা দেখতে পেলাম। সে গিরগিটি। রং বদলায়।
    সে একজন সেল্ফ- অবসেসড্‌ পুরুষ। সে বলে গ্রুপ-ফিলিং এর কথা, কিন্তু ব্যবহারে সব সময় নিজেকে প্রোজেক্ট করতে চায়। নিজের প্রতিবাদী চরিত্র নিয়ে বড়াই করে, আসলে সবসময় ক্ষমতার সঙ্গে সুনজরে থাকতে চায়। অন্যদের সাহায্য করে, উদ্দেশ্য সবাইকে বশ করা, ওর স্তাবক বা চামচা বানানো। বলে সবাইকে স্পেস দেয়ার কথা, বলে "শত-পুষ্প বিকসিত হোক"। কিন্তু ওর প্রতিবাদ করে দেখ, দেখবে কেমন লেজের ওপর ভর দিয়ে ফণা তুলে দাঁড়ায়!
    তাই আমার বিশ্লেষণে সে একজন স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক এবং হীনমন্যতায় ভোগা লোক। সেশনগুলোর মাঝে আমি ওকে কিছু সিগন্যাল দিয়ে্ছিলাম। ও সেগুলো না দেখার ভান করে। ও সিগন্যালগুলো বোঝেনি তা নয়। ও বোকাহাঁদা নয়, বরং ইন্টেলেকচুয়ালি শার্প। এটা ওর শক্তি, আবার এটাই ওর কাল হয়েছে।
    আবদুল্লা যে ওর ছোটবেলা থেকে ধর্মের মোড়কে সযত্নে লালিত সেক্সিস্ট পুরুষবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে পেরেছে তার কারণ ও বেসিক্যালি সরল, অকপট খোলামনের মানুষ। এটাই দরকার। আমি গর্বিত যে আমি আবদুল্লার মত মানুষের মেন্টর।
    কিন্তু আমাদের 'উনি' নিজের সঙ্গেও লুকোচুরি খেলেন, অভিনয় করতে করতে সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করেন। তাই ওনার উদ্ধার নেই। এই টি-গ্রুপ মেথড ওঁর মত মানুষের জন্যে নয়।
    ওনার নাম হরিদাস পাল।

    ১৪)
    ঘুমুতে পারছে না হরিদাস পাল। মার্চের শেষ, ঘরের বাইরে ক্যাম্পাসের গাছগুলোয় মৃদুমন্দ হাওয়া। ক্যাম্পাসের বাগানটা খুব বড়, প্রায় সংরক্ষিত জঙ্গলের মত। কোথাও একটা দুটো পাখি ডাকছে, ভোর হচ্ছে কি? মোবাইলের আলোয় দেখা গেল সাড়ে তিনটে। এই পশ্চিম প্রদেশে মালব উপত্যকায় মার্চের ভোর হতে হতে ছ'টা বাজবে। এখনো সাড়ে তিন ঘন্টা। ঘরের নীল আলোয় চোখে পড়ছে চারটে খাট, তাতে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছে তিনজন। পাশের খাটে আবদুল্লার নাক ডাকছে ফুরুর-ফোঁৎ, ফুরুর-ফোঁৎ।
    জলের বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেল, বাথরুম থেকে ঘুরে এল। তারপর ডায়রি নিয়ে দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে আলোর নীচে বসল।

    অ্যানাকোন্ডাটা ভেবেছে কি? যাখুশি বল্লেই হল! হরিদাস পাল ডিজঅনেস্ট? হিপোক্রিট? পাওয়ারের সঙ্গে সমঝোতা করতে চায়, তেল দিয়ে ইম্প্রেস করতে চায়?
    আরো কত কি বলেছে, ওয়ালিয়া। হরিদাস যখন মেয়েটিকে হাগ্‌ করে তখন তখন ওর হাতের তেলো ওর পিঠের ওপর আস্তে আস্তে পিঠ চাপড়ানোর ভঙ্গিতে ঘোরাফেরা করে, অর্থাৎ নিজের অজান্তে ওর নিজেকে বড় ভাবার মানসিকতা প্রকট হয়ে যায়। ও যখন জয়ন্তকে কাঁদতে দেখে, তখন গায়ে পড়ে পকেট থেকে চোখ মোছার জন্যে রুমাল দেয়। অর্থাৎ নিজেকে দলের মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল, মানবিক দেখাতে চায়। কি যেন বলেছিলেন উনি? হ্যাঁ, বাবু হরিদাস পাল হলেন সংযুক্ত হিন্দু পরিব্ভারের কর্তা।
    শালা নিজেকে ভাবে কি? বিহেভিয়ারিয়াল সায়েন্সের জাদুকর?
    দেখাচ্ছি, কাল প্রথম সেশনেই দেখাচ্ছি। অ্যানাকোন্ডার হিমশীতল চোখের চাউনির ম্যাজিক কাল উপে যাবে।

    --ও দাদা! উঠুন, চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সারারাত কি যে বিড়বিড় করছিলেন, ঠিক করে ঘুমোন নি?হরিদাস পাল ধড়মড় করে উঠে বসে। চায়ে চুমুক দেয়। বিছানা সকালের রোদে ভেসে যাচ্ছে। ও ঘড়ি দেখে। চটপট চানের জন্যে তৈরি হয়, দাড়ি কামায়। পেটের মতে একটা গুড়গুড় , একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি। এটা হরিদাস পালের চেনা। প্রত্যেকবার স্টেজে ওঠার আগে মেকাপ নিয়ে উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে ওর এমনি লাগে।
    আচ্ছা, একবার পার্টটা ঝালিয়ে নিলে কেমন হয়? যাতে কোন ভুলচুক না হয়?
    -- আচ্ছা, আবদুল্লা! তোর কি মনে হয় আমি এতটাই খারাপ?
    -- মানে?
    -- মানে ওই ওয়ালিয়া কাল যেমন বললো। আমি কি খুদগর্জ, স্বার্থী? দুসরোঁ কে সর পর পাও রাখকর উপর চড়নেওয়ালে? তোর কি মনে হয়? সত্যি কথা বলবি।
    -- না দাদা! ওসব ভাববেন না। তাহলে কি আর আমি ম্যাডামের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে আপনার রুমে শিফ্ট করতাম? চলুন, ব্রেকফাস্টের সময় হয়ে গেছে। আজই শেষ দিন।
    -- দাঁড়া, আজ ওই শালা অ্যানাকোন্ডাকে ঝাড়বো। মনে হয় ও ইচ্ছে করে কাল ওইসব বলেছে, আমাকে প্রোভোক করতে চায়। তোকে একটু ডেমো দিই? দ্যাখ, চলবে কি না?

    ডেমো দেখে আবদুল্লা কেমন একরকম করে হরিদাস পালের দিকে তাকায়। চলুন দাদা! দেরি হয়ে যাচ্ছে।

    ১৫)

    শেষ দিন।অদ্যই শেষ রজনী। রাত্রে ক্যাম্প ফায়ার। কালকে শুধু ইন্টারফে্স- ভ্যালেডিকশন, বিদায় নেয়া, ফিরে চলো আজ আপন ঘরে-- ইত্যাদি।
    সবাই সময়মত এসেছে। ওয়ালিয়া , থুড়ি অ্যানাকোন্ডা, আজ আবার আধশোয়া হয়ে শেষনাগের শয্যায়। ও কি বুঝতে পেরেছে যে বাবু হরিদাস পাল আজ ওকে ঝাড়বে বলে কোমর কষে এসেচে?
    সবাই উশখুশ করচে, জয়ন্ত সবার ফর্মগুলো নিয়ে দেখচে যে কোন ডেটা বাদ পড়েছে কি না!
    হরিদাস পালের গলা শুকিয়ে গেছে। পেটের মধ্যে এক ডজন ইঁদুরের ছুটোছুটি। পর্দা ওঠার আগে মেক আপ নিয়ে উইংসের মধ্যে দাঁড়িয়ে যেমন মনে হয় আর কি! আর কত দেরি করবে হরিদাস পাল?---- গুরু, হো যা শুরু! কোন স্টার্টার নেই, নিজেই নিজেকে স্টার্ট দাও।
    রেডি, অন ইয়োর মার্ক, সেট তো অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, এবার--গো! আরে, কি হল? গো- ইন্ডিগো-গো!
    ---" দোস্তোঁ, আমার কিছু বলার ছিল। সময় বেশি নেই, আপনাদের সবার মনোযোগ আশা করতে পারি কি? বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না। বেশ।
    গতকাল আমাদের মেন্টর ওয়ালিয়া সাহেব এই ক্লাসরুমে আমার সম্বন্ধে কিছু উক্তি, কিছু বক্তব্য রেখেছেন। সেটা ওনার প্রেরোগেটিভ। কিন্তু সেগুলি সত্যি হলে বলার কিছু ছিল না। আমি কাল সারারাত ওনার বক্তব্য, তথ্য, যুক্তি নিয়ে অনেক ভেবেছি। না, আমার মনে হয় নি উনি যা যা বলছিলেন সেগুলো নির্বিবাদ তথ্যের শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে।
    "দেখুন, যিনি আমার ভগ্নিপতি তিনি আমাকে শ্যালক সম্বোধনে আপ্যায়িত করতেই পারেন, আমি আহ্লাদে গলে যাবো। কিন্তু তিনি যদি আমার বোনকে বিয়ে না করে থাকেন তাহলে আমি কথাটাকে গালাগাল অর্থেই নেব।
    উনি এই টি-মেথডের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন যে কারো সম্বন্ধে কিছু ফিডব্যাক দিতে হলে তা ইম্প্রেসনিস্টিক না হয়ে ডেটা বেসড হতে হবে। কিন্তু উনি কি করেছেন? আমি দেখাচ্ছি যে আমার সম্বন্ধে ওনার অভিযোগগুলো সব মিথ্যে, আদৌ এ কদিনের ডেটা ওনার বক্তব্যকে সাপোর্ট করে না।
    "প্রথম,
    আমি সবসময় নিজেকে ফোকাসে রাখার চেষ্টা করি। তাই সেদিন ওনাকে দেখিয়ে জলের বোতলগুলো ভরে রাখছিলাম। আশ্চর্য্য? আমি গ্রুপ-ফিলিং থেকে ওই কাজটা করলাম তাতেও দোষ? আপনারাই বিচার করুন।
    "দ্বিতীয়,
    আমি জয়ন্তকে চোখের জল ফেলতে দেখে রুমাল এগিয়ে দিলাম তাতেও উনি আমার ভন্ডামি দেখতে পেলেন! আমি মশাই রুমাল-টুমাল বেশি ব্যবহার করিনা। গতবার বেসিক ল্যাবের কোর্স করার সময় মেন্টর শিবশংকর সিং কে দেখেছিলাম একটি মেয়ের চোখ মোছার জন্যে রুমাল এগিয়ে দিতে। আমি ভেবেছি সেটাই পলিটিক্যালি করেক্ট বিহেভিয়ার। এখন আমার মেন্টর, যিনি গোটা ওয়ার্কশপের ডীন বটেন, বলছেন সেটা ভুল!
    আমি সবাইকে আমার তুলনায় দুর্বল ভাবি? যাচ্চলে!
    "তৃতীয়,
    আমার বিনীতাকে হাগ্‌ করার বডিল্যাংগোয়েজে নাকি আমার মেয়েদের প্রতি পেট্রোনাইজেশন প্রকাশ পেয়েছে! আমি নাকি সেই সময় ওর পিঠে যেভাবে হাত বোলাচ্ছিলাম---! মাইরি,এমন গাঁজাখুরি অ্যানালিসিস বাপের জন্মে শুনি নি।
    হতে পারে উনি ভারতবর্ষের নামকরা বিহেভিয়ার স্পেশালিস্ট, কিন্তু আমিও নাটকের সঙ্গে যুক্ত। হ্যান্ড সিগন্যাল, ফুট সিগন্যাল-- আমরাও কিছু কিছু শিখেছি। আমাকে একটু ডেমো দিতে অনুমতি দিন।
    ( অ্যানাকোন্ডার চ্যাটালো মাথা থেকে দুটো কুতকুতে চোখ নির্নিমিষে আমাকে দেখতে থাকে।)
    বিনীতা, তুমি গোটা ওয়ার্কশপে আমাকে অনেকবার সাহায্য করেছ, আজ শেষবারের মত একটু সাহায্য কর। উঠে দাঁড়াও।"
    বিনীতা শুভা মুদগল ভূতগ্রস্তের মত উঠে দাঁড়ায়। হরিদাস পাল মাপা পায়ে ওর দিকে এগিয়ে যায়, ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ওর উন্নত পাঞ্জাবী পুষ্ট বুক হরিদাস পালের বুকে পিষ্ট হয়। কিন্তু হরিদাস কিছুই অনুভব করে না।

    বিনীতার গলা দিয়ে কি চাপা গোঙানির আওয়াজ বেরোল? না বোধহয়। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে হরিদাস পালের ক্যাম্পেন, যেন দৈনন্দিন রেলযাত্রীদের মাঝে লজেন্স বেচছে কোন ক্যানভাসার।
    ---" দেখুন, আপনারা সবাই দেখুন, আমার হাত বিনীতার পিঠে সমান্তরাল রেখায় ঘোরাফেরা করছে। এর ভাষা বন্ধুত্বের, সিগন্যাল ভরসা দেয়ার। আই গেট য়ু ফ্রেন্ড-বলার। যদি পেট্রনাইজিং হত? তাহলে এইরকম মুভমেন্ট হত, ভার্টিক্যাল, নট হরাইজন্টাল।"
    এই বলে ও আবদুল্লাকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে ওর পিঠ ব্র্যাভো বলার ভঙ্গিতে থাবড়ে দেয়।
    --" কাজেই আমার বক্তব্য, ওনার শেখানো মেথড অনুযায়ী খতিয়ে দেখলে , আমি আদৌ আত্মকেন্দ্রিক, ক্ষমতার ধামাধরা, স্কীমার নই। হয় উনি বিশ্লেষণে ভুল করেছেন, নয় অন্য কোন মোটিভের বশবর্তী হয়ে আমাকে অপমান করেছেন। আমি এথিক্স কমিটিতে যাব না। আপনারাই বিচার করুন।"
    দশ মিনিট কেউ কোন কথা বলে না।অ্যানাকোন্ডার ভাবলেশহীন মুখ।
    হটাৎ বিনীতা মুখ খুলল।
    --" হরিদাস, আমি কিছুই বুঝছি না।খালি এটুকু বুঝেছি যে এই মুহুর্তে তোর মনের স্থায়ী ভাব বা ইমোশন হল ক্রোধ, অ্যাংগার! আর তোর ডেমো নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই। এটা আদৌ সিন্সিয়ার বিশ্লেষণ নয়। বরং একটি ওয়েল-রিহার্সড স্কিট, কলেজের সোশ্যালে যেমন হয়, বা বড়জোর টিভির রিয়েলিটি শো।"
    জয়ন্ত চশমা সাফ করতে থাকে।---আপনি একটু কনফিউজড, হরিদাস । নিজের বেলায় হিয়ার-অ্যান্ড-নাউ মেথডকে ঠিক করে প্রয়োগ করতে পারেন নি। শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে দেখছেন। গাছ দেখছেন, জঙ্গলকে নয়।
    রামজীবন--" আমার খুব খারাপ লাগছে আপনার গতবারের মেন্টরকে টেনে আনায়। উনি তো আজকে সামনে নেই। ওটা তো দেয়ার -অ্যান্ড-দেন হল, হিয়ার -অ্যান্ড-নাউ নয়।"
    হরিদাস পালের সাজানো বাগান শুকিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক ব্যাটসম্যান হেলায় উইকেট দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাচ্ছে।
    খুব ধীরে ধীরে নীচু গলায় আবদুল্লা কথা বলছে--" দাদা, আমি শকড্‌; এ কোন চেহারা দেখছি আপনার! আপনি বিনীতাকে আপনার নাটকের প্রপস্ এর মত ব্যবহার করলেন? আপনি কি গিরগিটি? এই দাদার জন্যে আমি ম্যাডামের সঙ্গে ঝগড়া করে নিয়ম ভেঙে রুম বদলে পাশের খাট দখল করলাম? হায় আল্লা!"
    এবার হাতে বল নিয়েছেন ওয়ালিয়া। না, টেল-এন্ডারকে কেউ দয়া করে না। সোজা বডি লাইন লক্ষ্য করে শর্ট পিচ বল উড়ে আসছে।
    ---- আমার পাল্টা জবাব দেয়ার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার অবজেক্টিভ ডিবেট জেতা নয়। মনের দরজা-জানালা-গিঁট খোলা। তাই কিছু বলছি।
    এক, আমার কলিগ শিবশংকর যদি কোন সেশনে কোন পার্টিসিপেন্টকে কাঁদতে দেখে রুমাল এগিয়ে দিয়ে থাকেন তবে তিনি ভুল করেছেন। একটু কাঁদলে কোন ক্ষতি হয় না। যদিও আমি ঠিক বিশ্বাস করিনা যে ও এমন করেছে। হরিদাস পাল আউট অফ কন্টেক্স্ট অনেক কথা বলে থাকে। তবু আমি ওকে জিগ্যেস করব। কাউকে দুর্বল মনে করা উচিৎ নয়। মেয়ে বলে তো আরো নয়, তাহলে জেন্ডার বায়াসের প্রশ্ন উঠবে।
    দুই,আমাদের রায়মহাশয় শুধু বুদ্ধিমান নয়, অত্যন্ত ধূর্ত এবং শাতির দিমাগের লোক। সে আমার শিক্ষাকে আমারই বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ভাল গুরুদক্ষিণা দিয়েছে। আমার থরিটি, ইন্টিগ্রিটিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আমার বিরুদ্ধে গোটা ব্যাচকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছে। এমনকি অপ্রত্যক্ষ ভাবে এথিকস কমিটিতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে।
    এত অহংকারী লোকের উদ্ধারের আশা নেই। এই ওয়ার্কশপে ও কিছুই শেখেনি, কারণ ও সহজ সরল নয়। আমারই ব্যর্থতা!

    সবাই কথা বলছে। অনেক কথা। হাসি , ঠাট্টা, ছোট ছোট চুটকি।কিন্তু হরিদাস পালের কানে কিছু ঢুকছে না।শব্দ , শুধু শব্দ। যার কোন অর্থ হয় না, আওয়াজ মাত্র। এর মধ্যে কেউ কাউকে চাঁটি মারার কথা বলল, কেউ জল নিয়ে এল। কেউ হেসে উঠল।
    কিন্তু ও কেন কিছু বুঝতে পারছে না? এরা কোন ভাষায় কথা বলছে? এসবই কি ওয়ালিয়ার নির্দেশ? এরা কারা? এদের চেহারা অচেনা লাগছে কেন? মাথার মধ্যে বড্ড যন্ত্রণা, কেউ যেন চোখে লংকাবাটা দিয়েছে। জলের বোতলটা কোথায় গেল? কেউ সরিয়ে নিয়েছে?
    চোখে বেশ খানিকটা জলের ছিটে আর মাথায় জলের ঝাপটা পেয়ে হরিদাস পাল যখন উঠে বসল তখন ওয়ালিয়া ওকে চেপে আবার শুইয়ে দিলেন। ভিজে জামা, অস্বস্তি লাগছে, কিন্তু ওয়ালিয়া নাড়ি ধরে রয়েছেন।
    এবার বল্লেন-- ভয়ের কিছু নেই। কেউ ক্যান্টিনে গিয়ে আমার নাম বলে এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে এস। তোমরা এবার গল্প কর , আমি চললাম।
    ঘন্টাখানেক কেটে গেছে। সবাই হরিদাস পালকে ঘিরে বসে আছে। জয়ন্ত ওকে জড়িয়ে ধরে আছে।
    --- আমরা তোমার বন্ধু, আমরা চাই তুমি নিজেকে বুঝতে চেষ্টা কর। নিজের ওপর ওয়ার্ক কর। খালি ডুয়িং-ডুয়িং নয়, বিয়িং এর সাথে একাত্ম হও, নিজে জীবনে কি চাও ভাব, আর কি করচ তাও।
    -- এমন কেন হল? তোমরা সবাই যেটা বুঝতে পারছ, যেটা দেখতে পারছ, আমি কেন পারছি না? একি সেই এইচ জি ওয়েলসের গল্প? আমি দৃষ্টিহীনের দেশে এসেছি? নাকি আমারই চোখ গেছে?
    শুভা মুদগল হাসে।
    --- হরিদাস, সবাই বইকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে বইয়ের সাচ্চা-ঝুটা খতিয়ে দেখে। আর তুমি এমন আজব প্রাণী যে জীবনকে বইয়ের ফর্মূলার সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা কর।
    নেপালী ছেলেটি প্রস্তাব করে যে আজকের সন্ধ্যায় ক্যাম্প ফায়ারে আমাদের গ্রুপের তরফ থেকে কালচারাল প্রেজেন্টেশন হবে দাদার মোনো-অ্যাক্টিং।
    সবাই হেসে ওঠে। এর পরে আরও?
    কৈলাশ বলে-- আমি কিন্তু সিরিয়াস। তবে আমার একটা শর্ত আছে।
    --- কি শর্ত?
    ---- দাদা কথা দিন যে আজ রাত্তির আপনি নিজের ওপর ওয়ার্ক করবেন। তারপর কালকের প্রথম সেশনে আপনার মুখ থেকে মেঘ কেটে যাবে। যদি আমার সাহায্য চান তো আমি আপনার সঙ্গে রাত জাগতে রাজি, লাল চা করে খাওয়াতে, সিগ্রেট এনে দিতে রাজি। কি হল?
    চোখে কিছু একটা পড়েছে, বড্ড জ্বালা করছে। ও কৈলাশের হাত ধরে।
    দুপুর একটা। লাঞ্চের আগে বিদায়-সম্ভাষণ। বিশাল কমিউনিটি হলে সবগুলো গ্রুপ মিলে জনাচল্লিশেক ছেলেমেয়ে আর দশজন ফেসিলিটেটর। সবাই মাটিতে বসে। সবাইকে একটি করে চিরকুটে লিখতে হবে ও এখান থেকে কি নিয়ে যাচ্ছে, আর এখানে কি ছেড়ে যাচ্ছে। সেটা বাই টার্ন সবার সামনে পড়ে শুনিয়ে তারপর বিরাট বাক্সটাতে ফেলে দিতে হবে। ফেসিলিটেটররাও এর হাত থেকে ছাড় পাবেন না।
    ওয়ালিয়ার পালা এলে উনি উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন--- আমি এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি আমার টি-গ্রুপ মেথডের ওপর পুরনো আস্থা, এ অসাধ্য সাধন করতে পারে। আর ছেড়ে যাচ্ছি আমার খামখেয়ালিপনা।

    হরিদাস পালের পালা এল। ও উঠে দাঁড়িয়ে দেখল ওর দিকে তাকিয়ে আছে ওয়ালিয়া, শিবশংকর ও আর একজন মহিলার চোখ , যার সঙ্গে ইচ্ছে থাকলেও আলাপ করা হয়ে ওঠেনি।
    --- আমি ছেড়ে যাচ্ছি আমার ঔদ্ধত্য , যার কারণ আমি সাথী মহিলার সঙ্গে অসভ্য ব্যবহার করেছিলাম। আর এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি নিজের মনের অন্ধকার দিকটাকে ভাল করে দেখার সাহস।
    এবার কোলাকুলির পালা। ওয়ালিয়া নিজেই এগিয়ে এলেন।
    -- কাল সন্ধ্যে থেকে তোমাকে দেখছি। কালচারাল প্রোগ্রামের আসরে তুমি নিজের টিমকে এগিয়ে দিয়েছ, নিজেকে নয়। আরও কাজ করতে হবে নিজের ওপর। জীবনে কি চাও? অনেক নাম? খ্যাতি? নামকরা এইচ আর ট্রেনার?
    --- না স্যার! ওসব যা হবার হবে। না হলেও কোন দুঃখ নেই। জীবন শেষ হয়ে যাবে না। আমি চাই নিজের কাছে সৎ থাকতে।
    ---- বেশ তো, লোককে ভাল বাসো, কিন্তু দয়া করবে না। অযাচিত সাহায্যও নয়। এসব দুপক্ষকেই হ্হোট করে। আর কখনো দরকার মনে করলে আমাকে ই-মেইলে যোগাযোগ করতে পারো। আমি তোমাদের জন্যে আছি।

    একের পর এক গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। কোনটা ইটার্সি রেল স্টেশন, কোনটি বেরাগড় এয়ারপোর্ট। শোনা যাচ্ছে টুকরো গানের কলি, হাসি, ঠিকানার আদান-প্রদান। আবার দেখা করার শপথ। হরিদাস হাসে। ও জানে যে দুবার একই নদীতে স্নান করা যায় না।
    গাড়িতে উঠতে উঠতে বিনীতাকে ডাকে।
    -- অ্যাই, এদিকে আয়। তোর সঙ্গে আলাদা করে কথা আছে।
    সবাই হাসে।
    -- কি রে বল্?
    -- একটা কথা কাউকে বলবি না? একটু আগে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলি না, আমি কিন্তু আজ চান করিনি।
    --- দাঁত মেজেছিলি তো? তাহলেই হল। আমি না হয় দিল্লি পৌঁছে আবার চান করে নেব।
    (সমাপ্ত)
  • বিভাগ : ব্লগ | ১০ আগস্ট ২০১৬ | ৪৬৬ বার পঠিত
আরও পড়ুন
ranjan roy - Ranjan Roy
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • করোনা ভাইরাস

  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত