• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • আমার মা সিরাজী বিটি~

    বিপ্লব রহমান
    বিভাগ : ব্লগ | ২৪ আগস্ট ২০১৬ | ৪২ বার পঠিত
  • সেদিন ছুটির দিনে সকালে আমার ৭৪ বছর বয়সী মা’র ঘরটা গুছিয়ে দিচ্ছিলাম। বাসার সকলে যে যার কাজে ব্যস্ত। বিছানার চাদর-বালিশের কাভার বদলে দেয়া, ঘরের মেঝে পরিস্কার ইত্যাদি।

    মা তখন বাথরুমে। দরজা ভেড়ানো। আটকা পড়তে পারেন, এমন আশঙ্কায় তার দরজায় ছিটকিনি তোলা নিষেধ। সেখান থেকেই কথা হলো দু-একটি। জানালেন স্নান করবেন না। আজ নাকি শরীরটা তেমন ভালো নেই। ইত্যাদি। এরপর ঘন্টা দুয়েক পর আমি চা করে নিয়ে ডাকতে গিয়ে দেখি তখনো তিনি বাথরুমে। স্নান করারও কোনো শব্দ নেই।

    আমি যতোবারই ডাকি ওনাকে, উনি সাড়া দেন, এই এখনই বেরুচ্ছি। বেরুচ্ছি তো। এমনি করে আরো ১০-১২ মিনিট কাটলো। শেষে আমি থাকতে না পেরে লজ্জা-শরম বাদ দিয়েই বাথরুমে ঢুকে পড়লাম। দেখি হাই কমোড থেকে ওঠার চেষ্টা করেও বুড়ি আর উঠতে পারছেন না। খানিকটা ভর দিয়ে উঁচু করে উঠে আবার বসে পড়ছেন। শরীরে হাল্কা জ্বর। আমি তাকে ধরে ধরে বিছানায় এনে শুইয়ে দেই।

    ডাক্তারের পরামর্শে তাকে জ্বরের অষুধ দেই। মাথাটা পানি দিয়ে মুছে দেই। রান্নার খালাও ওনার পরিচর্যা করেন। ডাক্তারের পরামর্শে তার জন্য পঙ্গু হাসপাতালের সামনে থেকে হাল্কা পাইপের একটি লাঠি কিনে আনি। সেই থেকে আমার মা’র লাঠি এখন সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আর প্রায়ই সময়ই জ্বর থাকে তার। সব সময় ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকেন। গৃহকর্মে আর আগের মতো মন নেই।

    অথচ এই কিছুদিন আগেও এই বয়সে সব কাজ এক হাতে সামলেছেন। কাজ না করলে নাকি তার ‘ভাল লাগে না’ এমন কথা সব সময় বলতেন। ছিলেন হিন্দি-বাংলা টিভি সিরিয়াল দেখার পোকা। এখন সব পাট বুঝি চুকেছে। কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছেন। অনেক তল্লাসী করেও ডাক্তার তার তেমন অসুখও খুঁজে পান না। অরুচিটুকু ছাড়া। সেই থেকে বুকের ভেতর কাঁটা বিঁধে আছে। অষ্টপ্রহর চিনচিনে এক ব্যাথা। দুঃস্বপ্ন দেখে বার বার জেগে ওঠা। কোনো বছরই মা দিবস আমার কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। এবারও তাই। তবু এবার ফেসবুকে বন্ধুজনের মা’কে নিয়ে করা নানান পোষ্ট আমাকে বিষন্ন করে।

    অথচ সেই ছোটবেলায় দেখছি, আমার রেডিও অফিসের কেরানী মা সৈয়দা আসগারী সিরাজী খুব ভোরে উঠে পাঁচটি ছেলেমেয়ের নাশতা, দুপুরের খাবার-- সব তৈরি করে ছুট লাগাতেন কর্মস্থলে। এরপর বিকেলে এসে আবার সবার জন্য দুই চুলায় বড় বড় হাঁড়িতে রান্নাবান্না। বালতি ভর্তি কাপড় ধোয়া। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা ইত্যাদি। জ্ঞান হওয়া পরে বুঝেছি, আমার মা বাস ভাড়ার সামান্য পয়সা বাঁচানোর জন্য খর রোদের ভেতর হেঁটেই অফিস যাতায়ত করতেন। বাসায় ফেরার সময় বাজার করেও ফিরতেন। সে এক কঠিন লড়াই হে।

    আমার মা’র পরিবারটি শিক্ষা-দীক্ষা, গান-বাজনায় খুব অগ্রসর। নানু সৈয়দ ইসাহাক সিরাজী ছিলেন সিরাজগঞ্জের নামকরা স্কুল মাস্টার। তার বড়ভাই-- কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। তিনি ছিলেন কাজী নজরুলের বন্ধু। আর আমার নানু বাড়ির নাম ‘বাণীকুঞ্জ’ নামটিও নজরুলের দেয়া। দুজনেই তুরস্ক যুদ্ধে একসাথে লড়েছিলেন। আর ইসমাইল সিরাজীর ছেলে, মা’র চাচাতো ভাই আসাদুল্লাহ সিরাজীও ছিলেন কবি, গীতিকার। অনেক সুন্দর গজল লিখেছেন তিনি।

    একসময় আমার মা ছিলেন ডাক সাইটের সুন্দরী। তখনকার সিনেমা নায়িকা মধুমালা’র সঙ্গে মিলিয়ে মা’র নাম রাখা হয় ‘মধু’। আমার নানি আদর করে মা’কে ‘সিরাজী বিটি’ (সিরাজীর মেয়ে) বলে ডাকতেন। নানু’র উৎসাহে আমার মা স্কুল-কলেজে পড়ার সময় গান-বাজনা করতেন। পাকিস্তান আমলে মঞ্চ নাটকও করেছেন। এই করতে গিয়েই আমার বাবার সঙ্গে তার পরিচয়। আমার বাবা বিয়ের পর কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে মা’কে মডেল করে অনেক সাদাকালো ছবি তুলেছিলেন।

    আমার বাবা আজিজ মেহের (৮৪) সব সময় কৃষক রাজনীতি নিয়ে কাটিয়েছেন ব্যস্ত সময়। বহু বছর জেল খেটেছেন। এক সময় বিখ্যাত নকশাল নেতা ছিলেন। সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। সংসারে কখনো মন দেননি। আর পুরো সংসারের ঘানি টেনেছেন মা একাই। বাবা এখন সারাক্ষণ বই পড়ে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। এই বয়সেও তার মাথাটি খুব পরিস্কার।

    ছোটবেলায় দুষ্টুমীর জন্য, পড়ায় ফাঁকি দেয়ার জন্য, এমনই সব বিবিধ কারণে মা’র কাছে অনেক বেতের বাড়ি খেয়েছি। কখনো হাত পাখার বাড়ি। আবার কখনো ভাত রান্নার কাঠের হাতা’র বাড়িও (স্থানীয় ভাষায় – নাকড়)। সেই সব কথা মনে করলে এখনো চোখ ভিজে যায়।

    আমার মা তার জীবন উৎসর্গ করেছেন ছেলেমেয়েদের জন্য। বিনিময়ে পাননি কিছুই। আমরা সকলেই কেমন নিখুঁত স্বার্থপর, যন্ত্র মানুষ। আসলে মায়েরা বোধহয় এমনই হন। আর যুগ যুগ ধরে তার ছেলেমেয়েরাও।…

    ---
    মূল লেখাটি এখানে: http://biplobcht.blogspot.com/2016/05/blog-post_11.html
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৪ আগস্ট ২০১৬ | ৪২ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • প্রতিভা | 37.63.155.217 (*) | ২৭ আগস্ট ২০১৬ ০২:৩৯55774
  • লেখাটি আমাকে নিজের কাছেই বড় লজ্জিত করলো। মা একদম পঙ্গু। এই কঠিন ব্যস্ততার জীবনে কিছু অবহেলা নিশ্চয়ই হয়।
  • বিপ্লব রহমান | 129.30.38.7 (*) | ২৮ আগস্ট ২০১৬ ১০:৩৭55775
  • লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনার মাকে বিনম্র শ্রদ্ধা
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত