• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ঘোলের শরবত

    একক লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৮ নভেম্বর ২০১৬ | ২৬৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • সকাল ছটা থেকে আটটা এই সময়টুকু অবিনাশ ফোন ধরেন না । নেবুতলা মাঠে পাঁচ চক্কর , হালকা ব্যয়াম তারপর বাচ্চাদের ফুটবল পেটানো দেখা । ফেরার পথে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কাঁচা বাজার । বাজারটুকু রোজ না করলেও হয় তবে পুরোনো অভ্যেস । চারপাশ এতো দ্রুত বদলায় যে বোঝা যায় আজকাল । আগে যেতোনা , লোটাকম্বল নিয়ে গ্রাম থেকে এসে যে মেসবাড়িতে উঠেছিলেন সেটা বছরের পর বছর কীভাবে ভূতের বাড়ি হয়ে উঠলো , শরিকি মামলা সবই দেখেছেন একটু একটু করে অনেক বছর ধরে । চাকরি পেয়ে পাশের পাড়াতেই সংসার পাতলে যা হয় । সে ছিল ঢিমে তাল । গত তিন বছরে সেখানে হুহু বহুতল হয়ে সামনে একটা স্পেনসার শপ দাঁড়িয়ে গেলো । যেতে আসতে দেখেন । তুচ্ছ -অকাজের জিনিস -চা ওয়ালার সঙ্গে দুটো বাজে কথা ,বাড়ি ফিরে তবে আবার কাজের ফোন -ফাইল পত্র ঘাঁটা শুরু ।

    রুটিনের বাইরে গিয়ে ফোনটা ধরলেন । কিছু কথা জানা জরুরি ।

    :: হ্যা , বিকাশ বলো !
    :: স্যার , আপনি যেটা জানতে চেয়েছিলেন যে গিরিন চাকলাদারের ফাইলটা কেন আটকালো ।
    :: আমি জানি আমি কী জানতে চেয়েছিলুম । উত্তরটা দাও ।
    :: স্যার , সেদিন মিটিং এর পর , মানে পরেরদিন ....
    :: হু ?
    :: পরেরদিন উমাপদ স্যার এসেছিলেন । গিরিনবাবুর নামে কিছু অবজেকশন রিপোর্ট করেন । বলেছিলেন কাওকে না জানাতে ।
    :: আমাকে জানানো কী তোমার ওয়ার্ক এথিক্স এর বাইরে , বিকাশ ? নাহলে বলে ফ্যালো ।
    :: না স্যার , একেবারেই না । তবু বোঝেন তো । আমরা ছোট মানুষ । উমাপদ স্যারের কানে গেলে আবার .....
    :: ঠিক আছে । তুমি ফোন রাখো ।

    এইটুকুই । একটা পুরনো এসিবিহীন অল্টো তায় আবার মার্চের সকাল । বাড়ি অবধি আসতেই ঘাম বেড়িয়ে যায় । চুপচাপ ঘরে ঢোকেন । ছেলেটা অপগন্ড হয়েছে । নিশ্চই ঘুমুচ্ছে এখনো । যদিও, না ঘুমুলেও, চাকরীজীবি বত্রিশ বছুরে সন্তানকে সর্বদা অপগন্ড ভাবাই অবিনাশবাবুর অভ্যেস । বৌমা বরং পছন্দের । কম কথার বুদ্ধিমতী মেয়ে । শোনা যায় কাজের জায়গায় খুব জেদি । অবিনাশবাবু তাই মুখে আশংকা প্রকাশ করেন ও আদতে প্রশ্রয় দেন । সিভিল সার্ভিসে তিরিশ বছর হলো । সব ডিপার্টমেন্টের খবর ভেসে আসে ।নিজে অসাধু অফিসারদের ত্রাস হলেও সকলে সে পথে হাঁটবে আশা করেন নি কোনোদিন । হলে খুশি হন ,এই পর্যন্ত । প্রতিমাকে ঘিরে সেই সম্ভ্রমমিশ্রিত গল্পগুলো কানে এলে ভালোই লাগে ।

    যেমন কিনা উমাপদ । রিটায়ারমেন্ট আর পাঁচ বছর বাকি । শ্বশুরের কলিগ বলে নয় , প্রতিমা জানে এই উমাপদ মানুষটির এক বিশেষ জায়গা আছে তার শ্বশুরমশাই এর কাছে । সকালবেলা অনেকেই দেখা করতে আসেন অফিস যাওয়ার আগে । প্রতিমার নিজেরও তৈরী হওয়ার তাড়া থাকে । তার মধ্যেই শ্বশুরের জন্যে এক গেলাস ঘোল বানিয়ে দেয় । এই কাজটুকু নিজের ইচ্ছেতেই নিয়েছে । উমাপদ এলে এই ঘোলের শরবতের আরেকজন গ্রাহক হয় । বাকি সকলের জন্যে চা অতসীদি বানাবে । উমাপদ গোঁফ ভিজিয়ে ঘোল খান ও তারপর বেদ-উপনিষদ -দেশ -বিদেশ -চারপাশের অন্যায় ও দুর্নীতি এই নিয়ে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে যান । অবিনাশ ওই একটা দুটো হ্যাঁ হুঁ । মাঝে মাঝে কাগজ থেকে কোনো একটা খবর দেখিয়ে উমাপদর মত চান , শুরু হয় আরেক দফা দেশের কথা ,দশের কথা ।অসততায় দেশ ছেয়ে গ্যালো , এইসব ।

    আজকেও উমাপদ এসে বসে কাগজ ঘাঁটছিলেন । কীসব শ্লোক বলে গেলেন খান দুই । প্রতিমা বুঝলোনা তার প্রেক্ষিত কী । ঘরে পাতা টক দই টুকু পরীক্ষা করায় ব্যস্ত ছিল । বেশি ঝাঁঝ হয়ে যায়নি তো, যা গরম ! অবিনাশের গলা ভেসে এলো :

    :: তা উমা , চাকরিতে তোমার কবছর হলো ?

    :: কী কান্ড হে অবিনাশ ! অবিনাশত্ব প্রাপ্ত হলে নাকি ? দুজনে একসঙ্গে ভারত দর্শনে গেসলুম , ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্যাডার ! ভুলে গেলে ?

    অবিনাশ হাসেন না আস্বস্ত হন, তা রান্নাঘর থেকে বোঝা যায়না । শুধু বাক্যালাপ শোনা যায় ।

    :: চাকলাদারকে আমিই পোস্টিং এপ্রুভ করেছিলুম । তোমার সামনেই । তুমি মিটিঙে ছিলে । চাকলাদার ঘুষ খায় তুমিও জানো আমিও জানি । পরিবর্তে যে যাবে সেও খায় ।

    :: তাতো বটেই তাতো বটেই ।

    উমাপদর গলা একটু অন্যরকম শোনায় ।

    :: ঘুষখোর দেশ ভরে গেছে অবিনাশ , ঠাকুর পরমহংস বলেছিলেন ....

    :: আহা , ওনাকে আবার সকালবেলা ডাকাডাকি কেন ।

    অবিনাশের গলা একটু চড়ে । প্রতিমা অবাক হয় । এই মানুষটিকে কোনোদিন গলা চড়িয়ে কথা বলতে শোনেনি ।

    হাতের চামচ ধীর হয়ে আসে , ঘোল বানানোর শব্দ থেমে যায় । আবার নিজেই সতর্ক হয়ে চামচ ঘোরাতে থাকে যদ্দুর সম্ভব কম শব্দ করে ।

    অবিনাশের গলা পুনরায় স্বাভাবিক ।

    :: তোমার যা বলার তুমি সবার সামনে বললে না কেন ? পরেরদিন আলাদা করে গিয়ে বলতে হলো ? লোকের পেছনে । শুধু হাত পেতে টাকা নেওয়াটাই অসততা , নাকী । উমাপদ ?

    আর কোনো শব্দ শোনা যায়না । অবিনাশ ফাইল পত্র দেখছেন । প্রতিমা দু গেলাস ঘোলের শরবত বানিয়ে শাড়ি জামা ঠিক করে ঘরে ঢোকে । টেবিলে রাখার আগে অবিনাশ ডান হাত তোলেন । প্রতিমা অবাক হয় । শরবত এনেছি যে !

    ::উমাপদকে চা দাও প্রতিমা । অতসীকে বলে দাও , তোমার আবার অফিস বেরোতে দেরি হয়ে যাবে ।

    ফাইলের মধ্যে ডুবে যান অবিনাশ । প্রতিমা কিছুক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে । উমাপদ তোতলাতে তোতলাতে বলেন , হ্যাঁ হ্যাঁ ঘোল টোল তো কতই খাওয়া হয় , আজ বরং চা হোক বরং !

    অবিনাশ কিছু বলেন না । কিছু নোটস দেওয়া বাকি । অফিসে বেরোনোর সময় হলো ।
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৮ নভেম্বর ২০১৬ | ২৬৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
সিপাহী - একক
আরও পড়ুন
প্রহাস - একক
আরও পড়ুন
স্বাদ - একক
আরও পড়ুন
অন্নময় - একক
আরও পড়ুন
গুলাবো - একক
আরও পড়ুন
বইনী - একক
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • একক | 53.224.129.52 (*) | ২৮ নভেম্বর ২০১৬ ০৮:১৬54818
  • #
  • d | 144.159.168.72 (*) | ২৯ নভেম্বর ২০১৬ ১০:২২54819
  • বাঃ চমৎকার মিনিমালিস্টিক।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন