• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • নেফার নেশায়

    I লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০২ নভেম্বর ২০১৩ | ৭২৮ বার পঠিত
  • বেশ নেশায় পড়ে গেছি। কেবল পাখির কথা মনে হচ্ছে। চেম্বারে রোগী বলছে বুক ধুপধাপ করছে-আমার মাথায় ঘুরছে অ্যাশি প্রিনিয়া। রেড স্কেলড মুনিয়া। ইকো করতে করতে মনে পড়ছে ওরিয়েন্টাল হোয়াইট আই। যদি আর একটু সময় নিয়ে ছবি নিতাম। যদি আর একটু কেয়ারফুল থাকতাম! অত হন্তদন্ত ভাব কোনো পাখিই পছন্দ করে না।সার্কল অফ ফিয়ার বলে একটা ব্যাপার আছে না ! আহা, যদি সেন্টার ওয়েটেড মিটারিং রাখতাম! কেন যে ম্যাট্রিক্স মিটারিং ব্যাভার করতে গেলাম! আহা, যদি ৮০-৪০০ থাকতো ! আর একটু সময় পেলে পাইড কিংফিশারের ছবি হত। ওটা কী ঈগল-লং লেগড না কমন বাজার্ড!

    তবে আমাকে সব চেয়ে কাত করে দিয়েছে একটি দৃশ্য। পাখিও নয়, তাওয়াংয়ের সাতাশ ফিট উঁচু বৌদ্ধমূর্তি নয়, মাধুরী লেক নয়-অরুনাচলই নয়। অরুনাচলে ঢোকার আগে আসামের সীমান্তের এক ছবি। ভালুকপংয়ের আগে। আমরা তখন নামেরি ছাড়িয়ে সবে ভালুকপংয়ের দিকে এগোচ্ছি। আকাশ ক্রমেই গাঢ় কালচে ছাই বর্ণ হয়ে আসছে। দু এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়তে শুরু করল। তারপর ক্রমেই আরো বড় ফোঁটায়। একপাশে বন, অন্যপাশে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, এদিক-ওদিক ঝোপঝাড় তাতে। মাঝখান দিয়ে ইস্পাতের মত কালচে নীল মসৃণ রাস্তা চলে গেছে। দূরে অরুনাচলের নীল নীল পাহাড়। আর বাঁদিকে ছড়ানো আদিগন্ত ভেজা সবুজ। ডানদিকের জঙ্গলে বড় বড় ফুলন্ত গাছ, তাতে সাদা সাদা ফুল ফুটে আছে। ফুল ঝরে আছে রাস্তার ওপর। ফুল ঝরে পড়ছে রাস্তার ওপর, ইতস্ততঃ, ভেজা ফুলদল(পরে বুঝেছিলাম ওরা একজাতের কাঞ্চন, বুনো কাঞ্চন কোনো)। আর সেই রাস্তার ওপর দিয়ে বোড়ো মেয়েরা ভিজতে ভিজতে মাথায় -পিঠে কাঠকুটো নিয়ে ফিরছে। পরনে তাদের ট্রাডিশনাল পোষাক। ঐ অতবড় আকাশ, ঐ বৃষ্টিভেজা সবুজ,ভেজা সাদা ফুলেরা, মসৃণ রাস্তা, কাঠের মালা পরা বিচিত্র পোষাকের মঙ্গোলয়েড মেয়েরা- মনেই হচ্ছিল না ভারতবর্ষে আছি। চোখ বুজলে এখনো দেখতে পাই। হায়, গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলে রাখিনি। মুহূর্তের দ্বিধায় সব বরবাদ।
    বোড়ো মেয়েরা http://www.traveljournals.net/pictures/276883.html
    https://plus.google.com/photos/117647207273434308408/albums/5941698756340697521/5941698760478900466?banner=pwa&pid=5941698760478900466&oid=117647207273434308408
    ভালুকপং পৌঁছলাম যখন, তখন অসময়ের সন্ধ্যা। ঘড়িতে বলছে বেলা তিনটে। এদিকে আকাশ মেঘে মেঘাকার, টিপ টিপ বৃষ্টি চলছে। মনে হল, এই বুঝি মেঘের রাজ্যে ঢুকে পড়লাম। আর ত্রাণ নেই বেড়ানোর বাকি ক'টা দিন। কপাল ভালো নয়। তখনো জানিনি পিলিনের পর আবার একটি আখাম্বা নিম্নচাপ বঙ্গোপসাগরে বাড়ছে, কয়েকঘন্টার মধ্যেই সে ঢেকে ফেলবে বাংলা-ওড়িশা-অন্ধ্রের পোড়া কপাল; তার ল্যাজের ঝাপটা লেগে আসামও মেঘালয়। এবং ভাগ্যিস, তার দাপট পৌঁছবে না অরুনাচলের আকাশে-পাহাড়ে, এবং আমাদের সফর এযাত্রা অন্ততঃ বেঁচে যাবে মেঘমণ্ডনের হাত থেকে।

    ভালুকপং একটি ছোট্ট সীমান্ত শহর, তাকে ইংরেজি ভাষায় টাউন বললেই বরং মানানসই হয়। তার কিছুটা আসামে, অনেকটাই অরুনাচলে। কিংবদন্তী আছে, অসুররাজ বাণের নাতি ভালুকের গড় ছিল এই শহরে, সেই থেকেই নাম ভালুকপং। আকা উপজাতির বাস এই অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে। খাজনা নেওয়া ছাড়া আর কোনো ভাবে অহোম রাজারা তাদের কখনো ব্যতিব্যস্ত করে নি। অরুনাচল থেকে পাহাড়ী নদী কামেং বর্ডার পেরিয়ে আসামের সমতলে যেই নেমে এসেছে,অমনি তার নাম হয়ে গেছে জিয়া ভরেলি। নদী তো অবাক ! এইভাবে নাম বদলে যায় নাকি কারো হঠাৎ করে ! আসামের মানুষজন বলেছে-কেন ! তোমার স্বভাবও বদলে গেল যে কেমন টপ করে! একটু আগেই ছিলে লাফঝাঁপ করা টমবয়, এখন কেমন লাজুক নববধুটির মত শান্ত বয়ে যাচ্ছো! তবে খুব একটা শান্ত সে মোটেই নয়, সে কথা সফর শেষের নামেরিপর্বে র‌্যাফটিং করতে গিয়ে টের পেয়েছি। বেশ স্রোত সেই ভারভারিক্কি গর্ভবতীপ্রতিম নদীতে, এখানে -ওখানে চোরা ঘুর্ণির চক্কর।

    ঠিক যেখানে সীমান্ত শুরু হচ্ছে, রাস্তার পাশে পুলিশ চেকপোস্ট, আর দড়ি-লাগানো লম্বা বাঁশ তেরচা করে নেমে এসে রাস্তাকে আটকে দিয়েছে, লোকজনের মুখে মঙ্গোলয়েড ভাব অনেক বেশী স্পষ্ট, রাস্তা একটু খাড়াই হতে শুরু করেছে, আর কুঁকড়ো হাতে উপজাতি মহিলা হেঁটে যাচ্ছেন, রাস্তার পাশে দাদা-বৌদির বাঙ্গালী খাবারের দোকান, তার মিনিটখানেক আগে আমাদের রাস্তা বেঁকে গেল ডানদিকে একটা এবড়োখেবড়ো উঁচুনিচু পথে। তার মুখে একখানা সাইনবোর্ডে লেখা-প্রশান্তি লজ, আসাম ট্যুরিজম।

    প্রশান্তি লজে ঢুকে দিল বড় তর্‌ হয়ে গেল। যদিও বৃষ্টির ভ্রুকুটি, আর বিকেলটা মাঠে মারা গেল, তাও। লোকজন যে প্রশান্তি লজের বড় সুখ্যেত করে, সে তাহলে এমনি নয়। বেশ বিশাল একটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো-ছেটানো অনেকগুলি হাট, সামনে সুন্দর করে ছাঁটা ঘাসের লন, মধ্যে মধ্যে ফুলগাছ ও অন্যান্য বাহারী গাছের শোভা। লনের মাঝখান দিয়ে বাঁধানো রাস্তা চলে গেছে সবক`টি হাট ও রেস্তোরাঁকে কানেক্ট করে। গোটা এলাকাটি জিয়া ভরেলি নদীর পাড়েই; তবে জায়গাটা কিঞ্চিৎ পাহাড়ী হওয়ায় নদী এখানে অনেক নীচে। নদীর পারে বিস্তীর্ণ ঘাসজমি, অজস্র কাশফুল ফুটে আছে সেখানে , এই শরতে। অবশ্য তারা বাংলার কাশফুলের মত হৃষ্টপুষ্ট নয় যে বাংলাদেশের যমুনাচরের সেই বিশাল কাশবনের সঙ্গে কোনো তুলনা টানতে হবে। মাঝেমধ্যে নদী পেরিয়ে ওপাড়ের জঙ্গল থেকে হাতি বেরিয়ে আসে এই ঘাসজমিতে, কপাল ভালো থাকলে ওয়াচ টাওয়ারে বসে দেখতে পাওয়া যায়। সত্যি বলতে পরদিন ভোরবেলা তেমন একটা সুযোগ চলেও এসেছিল দৈবাৎ, আমি তখন আধো আলোয় লজের এদিক-সেদিকের ছবি তুলছিলাম বলে সে দৃশ্য মিস করি। দুই প্রাতঃভ্রমণকারী ভদ্রলোক উঁকিঝুঁকি দিয়ে কি একটা দেখছিলেন বলে সন্দেহ হল কোনো রেয়ার পাখি বুঝি। পরে জানলাম হাতি।

    ট্যুরিস্ট হাটগুলি বড় ভালো। দুটো বড় বড় ঘর, একটি ড্রয়িং রুম, অন্যটি শয্যালয়। বাথরুম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তবে সরকারী ব্যবস্থাপনার ছাপ টুকটাক এদিক-সেদিক , কাঠের আসবাবে ঘুণ ধরেছে, লোহার কব্জা মরচেজব্দ। নদীপাড়ের হাটগুলি নিশ্চয় আরো সুন্দর, জানলা খুললেই নদী-পাহাড়। আমাদের এক চেনা দম্পতি তো যদ্দিন না নদীপাড়ের কটেজ পেয়েছে, তদ্দিন ভালুকপং মায় অরুনাচল বেড়াতেই আসে নি। অধ্যবসায়ের জন্য পুরস্কৃতও হয়েছে, জানলা দিয়ে দেখতে পেয়েছে দুষ্টু হাতির বাচ্চার নদীতে নেমে এসে ইচ্ছেখুশি স্নান; মা-হাতি তাকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে-লেজে পেঁচিয়ে ফেরত নিয়ে যেতে চায়, তার কোনো হুঁশ নেই।
    তবে আমার সবচেয়ে ভালো লাগল কিন্তু রেস্তোরাঁটি। কাঠ আর বাঁশের তৈরী দোতলা রেস্তোরাঁ, অনেকগুলো গোল গোল ঘর আর তাদের মাথায় লাল লাল শঙ্কু আকৃতির ছাদ। কাঠের রেলিংয়ে ঘেরা দোতলায় বসে চা-পকোড়া খেতে খেতে নদী দেখা যায় দিব্য, আর ঘন-নীল, কাজল-নীল মেঘের মধ্যে একটুখানি কমলা আর লালের ছোঁয়া লাগতে না লাগতেই সত্যিকারের সন্ধ্যা নামে। এখানে সন্ধে হয় একটু তাড়াতাড়ি, বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই ঘনঘোর অন্ধকার। অজস্র ঝিঁঝিঁর ডাক, আর দূরে জিয়া ভরেলি নদীর কুলকুল শব্দ সমস্তক্ষণ। মাঝেমধ্যে রাতপাখী ডেকে উঠছে। চুপচাপ বসে আছি কি গপ্পোগাছা করছি, মোবাইল বাজছে না। সারা শরীর একটাই মস্ত বড় সেন্স অরগ্যান হয়ে তারিয়ে তারিয়ে শুষে নিচ্ছে এই সব শব্দ আর শব্দের অভাব। একটু পরে সিঁড়ি বেয়ে নজরমিনারে উঠে গিয়ে চেয়ার নিয়ে বসি। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে একটা হলদে ব্যাঙ্গও উঠে এসেছে, সে ব্যাটা নট নড়ন-চড়ন। ঘুটঘুটে মেঘ কেটে গিয়ে একটু একটু চাঁদ উঁকি দিচ্ছে মাঝেমধ্যে। সগ্গে গেলে মানুষ এর বেশী আর কী বা পায় !
    পর দিন সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়া। সাড়ে সাতটার মধ্যে পোস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে, চায়ে চুমুক দিয়ে (অত সকালে সরকারী লজে ছোট হাজরি হয় না-চাকর পোয়োচো? এ রাজাগজাদের দেশ !) গাড়িতে উঠে বসা। আমাদের গাড়িটি একটি স্কর্পিও, কিন্তু তার ছাদে ক্যারিয়ার নেই, তাই মাল বোঝাই করবার উপায় নেই, অগত্যা পিছনের সিটেই সব মাল তোলা হয়েছে, ফলতঃ একজন লোক অতি কষ্টেসৃষ্টে সেই লটবহরের মধ্যে গুটিসুটি হয়ে বসেছে; পরে দেখা গেল ব্যবস্থাটা মোটেও সুবিধাজনক নয়। লোক আমরা কাচ্চাবাচ্চা মিলিয়ে ছ-জন, এদিকে এফেক্টিভ সিট মাঝে তিন আর সামনে এক-চার, বড়জোড় টেনেটুনে পাঁচ।তাই গোটা সফরেই সামনে একজন গোদা একটি বাচ্চার সঙ্গে শেয়ার করে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসল-কখনো দেবর্ষি-রোদ্দুর, কখনো আমি-টুংকাই, সেঁজুতি-রোদ্দুর কিম্বা রাত্তির-টুংকাই। হেল্প ট্যুরিজমের শিশিরবাবু অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা কল্লেন, গাড়ির ছাদে মালপত্তর রাখলে , পাহাড়ী পথ, হেঁ হেঁ, পড়ে যেতে পারে। তাছাড়া বৃষ্টি-কুয়াশা রয়েছে, মাল ভিজতে কতক্ষণ ! বটেই তো স্যাঙাৎ, আমরা এই প্রথম পাহাড়ে এলেম কিনা ! হেল্প ট্যুরিজমকে গালি দেওয়ার সেই সবে শুরু। সেযাত্রা অবিশ্যি মনে মনেই।

    ভালুকপংয়ের কাছেই টিপি অর্কিড স্যাংচুয়ারি, রাস্তায় ওটা দেখে যাওয়া হবে ঠিক ছিল। কিন্তু বিধি বাম, সেদিন রোববার-আর রোববারে অর্কিড স্যাংচুয়ারি বন্ধ থাকে। বেরোনোর সময় এত তিথি-নক্ষত্র-অশ্লেষা-মঘা দেখে বেরোনো হয় নি, আমাদেরই দোষ। ট্যুরিস্ট স্পট যে রবিবারে বন্ধ থাকবে আর উইকডে-তে খোলা থাকবে এই সহজ স্বাভাবিক যুক্তিটা আমাদের মাথাতেই ছিল না।
    ভালুকপং থেকে টেঙ্গা অবধি রাস্তা ভালো, কিন্তু তারপরেই রাস্তার হাল বেশ বাজে-ড্রাইভার জানালেন। আমাদের ড্রাইভার রামা অসমীয়া, নওগাঁ বাড়ি, আপাততঃ থাকেন গুয়াহাটিতেই। অতি স্বল্পবাক। আমি এমনিতে কম কথা বলা মানুষই পছন্দ করি, কিন্তু সাতটি প্রশ্ন করলে একটির উত্তর দেবেন-কম-কথা বলা মানে আমি আবার এইটা বুঝি না। যাহোক , মোদ্দা কথা হল, এইবার আমরা অরুনাচলের অতি অখাদ্য রাস্তায় যাত্রা শুরু করলেম; বস্তুতঃ তাকে রাস্তা বলাই ভুল, মাঝেমধ্যে ক্কচিৎ-কদাচিত এবরো-খেবড়ো মাটি-পাথরের মধ্যে কবেকার পিচপ্রলেপের টুকরোটাকরা ভগ্নাবশেষ। ফলে দূরত্ব খুব বেশী না হলেও প্রতিদিনই আমাদের প্রচুর ট্রাভেল করতে হয়েছে, কমপক্ষে ছ-ঘন্টা রোজ। বমডিলা থেকে তাওয়াং যাবার দিনে সেটাই চূড়ান্ত হয়, দশ ঘন্টা সময় লেগেছিল সেদিন। এদিকে নবনীতাদিদি শুনে এসেছিলেন, '৬২তে চীনেরা যখন বমডিলা অবধি দখল করে নিয়েছিল, মাত্র দশদিনে লাসা-তাওয়াং রোড তৈরী হয়, সে রাস্তা এখনো অক্ষত ( অন্ততঃ "ট্রাকবাহনে ম্যাকমাহনে' লেখার সময় অবধি, এখনকার কথা জানি না)।নেতৃত্বে ছিলেন লালফৌজের এক মহিলা ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু আমাদের বি আর ও-র লোকেরাও তো দেখলাম এখানে সেখানে ধুনি জ্বালিয়ে বসে রয়েছেন, তাহলে সেই ক্কবে থেকে অরুনাচলের রাস্তার কুখ্যাতি শুনে আসছি কেন? এঁয়ারা কি তাহলে ইউলিসিস-পত্নী পেনেলপি'র সেই বিখ্যাত কায়দার অনুসরণে দিনে যতটুকু সারাই করেন, রাতে ততটাই ভেঙে দ্যান? কে দিবে উত্তর !
    কিছুদূর এগোতেই পাহাড়ী পথে সতর্কবার্তা ঃ সাবধান ! সামনে কুয়াশাপ্রবণ এলাকা! এবং কী আশ্চর্য কী আশ্চর্য! সত্যি কিছুদূর এগোতেই পাহাড়ের মাথায় ঝুলে থাকা কুয়াশা আর মেঘের জটা নেমে এসে আমাদের গপ করে গিলে নিল। অথচ খুব একটা অলটিচ্যুড গেইন করিনি তখনো। রাস্তা চলছে সেসা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির মধ্য দিয়ে। আরো ওপরে উঠলে একসময় কেটেও যাবে সে কুয়াশা ! কেন এমন হয়, জানেন গুরুর কোনো আবহবিদ ?

    বাচ্চারা কিন্তু খুব খুশি কুয়াশা পেয়ে। এক সময় তাদের মধ্যে সন্দেহ উপস্থিত হয়-এটা মেঘ না কুয়াশা ! উত্তর দিতে নাজেহাল আমরা। ইংরেজি ভাষায় ব্যাপারটাকে আরো গুলিয়ে দিয়েছে-কোনটা ফগ, কোনটা মিস্ট, কেনই বা এই উচ্চতায় এত ভারি ফগকে ( নাকি মিস্ট?)ক্লাউড বলা হবে না( নাকি বলা হবে?) তার উত্তর সরলমতি নাদান বুড়োমানুষ আমরা কি দিতে পারি?
    রাস্তার আশেপাশে অজস্র ছোট-বড় ঝোরা। বর্ষার জল পেয়ে বেশ ভরাট শরীর তাদের, শরীল বললেও হয়, বেশ আমিষগন্ধ আসে। কোনোটারই নাম বলতে অক্ষম ড্রাইভার; আসলে এগুলো নাম-না-জানা ঝোরা। এদের মধ্যে বেশ বড়োসড়ো একজনের পাশে গাড়ি দাঁড় করানো হল , একপ্রস্থ ফটোসেশন হল। বেশ ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করেছে এতক্ষণে, মোটকা মোটকা জ্যাকেটরা বেরিয়ে আসছে ব্যাগের মধ্য থেকে। সামনে দিয়ে একটি ওয়াটার রেডস্টার্ট উড়ে গেলো চিকন চিপ-চিপ আওয়াজ করে।ক্যামেরা তাক করি না, এ আমার চেনা পাখি, বিন্দুতে জলঢাকা নদীর ওপরে অনেকক্ষণ ধরে এ আমায় ফটোসেশন দিয়েছিল, যেবার ডুয়ার্স গেলাম।

    আমাদের সামনে সামনে চলেছেন ছ'জনের একটি মহিলাদল, তাঁদের সর্বকনিষ্ঠাটি সেঁজুতির ছাত্রী ছিল বি এস সি-তে, বাকিদের মধ্যে রয়েছেন তার মা ও মায়ের বন্ধুরা। পঞ্চাশের আশেপাশে বয়স তাঁদের, বাত ইত্যাদি বয়সোচিত ব্যধিও সঙ্গী, কিন্তু মনের জোর টগবগে। মেয়েটি, নাম মনস্বিনী, কাল রাতে প্রশান্তি লজে সেঁজুতিকে দেখতে পেয়ে -ম্যাডাম ! বলে এগিয়ে আসে ও ওঁরাও আমাদের পরিচিত হয়ে যান। ওঁদের মধ্যে একজন আবার সঙ্গীতা'র একদা সহকর্মী কমার্শিয়াল ট্যাক্সে-বেড়াতে এসে বহুদিন বাদে দেখা হয়ে গেল। পৃথিবীটা সত্যি বড়ই ছোট।

    মাঝদূরত্বে পৌঁছে দেখি একটি চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে ওঁরা মহানন্দে চা আর মোমো খাচ্ছেন। আমাদের দেখতে পেয়েই কলকল করে উঠলেন-"আসুন আসুন, চা খেয়ে যান ! এখানকার মোমোটা খুব ভালো। " তিব্বতী দোকানদারনী খদ্দেরদের মধ্যে এত দক্ষ ও স্বতঃস্ফুর্ত বিজ্ঞাপনদাতা আশা করেন নি, তিনি কিঞ্চিৎ হকচকিয়ে যান আমাদের আগমনে। দোকানের কর্মীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়( এঁরা সকলেই মহিলা), আমাদের দেখাদেখি আরো কয়েকটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। আবার চা বসানো হয়, মোমো রচিত হতে থাকে। নাঃ, মোমোটা সত্যি ভালো, যদিও ভেজ মোমো শুনে নাক ভেটকেছিলাম; গরম গরম খেতে কিন্তু বেড়ে লাগল।তবে চা-টি অপেয়, চিনি'র সরবত যাকে বলে। মনকে বলি-ওরে মন, তাও তো তুই তিব্বতী মাখন -চা খাচ্ছিস নে, সে বস্তু আবার যতই বমিবন্ত হোক না কেন, তিন পেয়ালা খেতেই হয়, না হলে গৃহস্বামী-র অপমান হয়। মনপা'রা শান্ত বলে কিছু বলে না বোধ হয়, খাম্পা তিব্বতী হলে নির্ঘাত নাকটি কচাৎ!

    বেলা তিনটের সময় ট্যাঙোস ট্যাঙোস করে আমরা বমডিলা এসে পৌঁছই।
    বমডিলা শহরে তেমন কিছু দর্শনীয়-করণীয় নেই, একটি কেজো অগোছালো পাহাড়ী আধা-শহর যেমন হয়। আসলে তাওয়াং যাওয়ার পথে স্টপ ওভার । তবে কিনা পশ্চিম কামেং জেলার সদর দপ্তর। আমাদের হোটেলটির নাম শিপিয়াং পং (মানে জানা হয় নি), তার সামনেই একটি স্টেডিয়াম, সেখানে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। রেলিংয়ে ব্যানার ঝুলছে -Welcome to Tawang festival, Oct 20th -22nd। আমি তো আহ্লাদে আটখানা, একটুর জন্য তাওয়াং ট্যুরিজম মার্ট( সে কী জিনিষ, খায় না মাথায় দেয় জানিনা যদিও-জেনেছিলাম অবশ্য পরে) মিস হয়ে গেছে, এবার ফেস্টিভ্যালকে আর মিস হতে দেওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই মুখোশ-টুখোশ সমেত লামাদের নৃত্য, নানা জনজাতির নানা এক্সোটিক নাচ-গান- খাবারদাবার -আমাদের আর পায় কে !

    বাচ্চাদেরই বা আর পায় কে ! আজ রাত্তিরে টিভিতে শাহরুখ-দীপিকা অভিনীত চেন্নাই এক্সপ্রেস আছে, দেখতে দিতেই হবে-এই বলে বলে তারা কানের পোকা নড়িয়ে দিচ্ছে। আমার ছেলে যে তলায় তলায় এত, সে জেনে তো আমি হাঁ! গড়গড় করে লুঙ্গি ড্যান্স গানটা পুরো গেয়ে শুনিয়ে দিল দুই বাচ্চা। এসব পায় কোত্থেকে ! বাড়িতে তো কই দেখেছে বলে শুনিনি ! সবই কি তাহলে স্কুল-সাপ্লাই ?
    তবে অবাক হওয়ার সে তো সব শুরু ! আসল অবাক তো হলাম তখন যখন ডিনার শেষ করে রাত্তির এসে বলে গেল-দেখে যাও, তোমাদের পুত্ররা কী করছে! আটটা থেকে ফিলিম শুরু হয়েছে, ছেলেরা কিছুতেই টিভির সামনে থেকে নড়বে না; অনেক বলে-কয়ে তাদের ডাইনিং রুমে এনে খাওয়ানো হল। কোনোমতে নাকে-মুখে গুঁজেই তারা রিসেপশনে দৌড়, সেখানে একটি টিভি সেট রয়েছে এবং তাতে অন্য কোনো শো চললেই বা কী,শিশু ভোলানাথের আব্দারের জোর কি কম! বৌয়ের কথা শুনে রিসেপশনে গিয়ে দেখি টিভিতে সেই আসমুদ্রহিমাচলবিস্তৃত যৌবনতরঙ্গ তুমুল হট্টরোলে অট্ট অট্ট নাদিত হচ্ছে-লুঙ্গি ড্যান্স লুঙ্গি ড্যান্স, আর তার তালে তালে ভুটানি হোটেল বয়দের সঙ্গে আমাদের ছেলেদুটোও নেচে-কুঁদে একশা। খুব নিখুঁত কী স্টেপসমূহ ? আমি নাচ-নভিস, জানি না। সেঁজুতি বলল-তোদের ছেলেটা তো ইনোসেন্ট, পাগলা -পাগলা নাচছে, আমার ছেলেটা একদম ঝুনো, কেমন নোংরা ভাসানের নাচ নাচছে দ্যাখ!

    আর শুধু তো আসল নাচা-গানা নয় ! মুখে মুখে আধা হিন্দি আধা তামিল গানকে বাংলায় অনুবাদ করা ও তাৎক্ষণিক গেয়ে শোনানো( তামিল অংশগুলি অবশ্য বাদ পড়ছিল সন্দেহ করি) ! দেশের রাজা যদি সেই বিশ্রুত "ধামাকা'র এক্ষটেম্পোর বঙ্গীকরণ শুনিতেন !

    বিকেলের ঝোঁকে ( অবিশ্যি বিকেল কি আর কিছু বাকি রেখেছে ততক্ষণে!) শহরটাকে দেখতে বেরোনো হয়েছিল। দেখা বলতে মার্কেটে একটু উঁকিঝুঁকি মারা (ঘোষিত উদ্দেশ্য তাই থাকলেও মা-জননীদের কৃপায় সেটি একটি এক্সটেণ্ডেড উইন্ডো শপিংয়ে দাঁড়িয়ে গেল; তবে কিনা মিছে বলবো কেন, সেঁজুতির একজোড়া স্নিকারও কেনা হয়েছিল, বেচারা কেন যে কলকাতা থেকে এই সাত হাজার ফুট উঁচু পাহাড়দেশে স্নিকারহীন অবস্থায় এসেছিল, তা একমাত্র ও-ই বলতে পারবে।তবে স্নিকারটি কেনা হয়েছিল যাঁর দোকান থেকে , তিনি একজন রাজস্থানী,এবং তেরো নদী পেরিয়ে এই অরুনাচলে তিনি কেন ব্যবসা করতে এসেছেন, সে প্রশ্নটিও সহজ এবং উত্তরও জানা)।
    আমি দেখলাম ঢেলে শুকনো ফল, শুঁটকি মাছ আর প্যাকেট করা কিউই বিক্কিরি হচ্ছে। কিউই এখানে রীতিমত চাষ হয়, বমডিলা ও দিরাংয়ে। কিন্তু তার সাথে জাফরানের ফুল বোঁটাশুদ্ধু শুকনো অবস্থায় কেন যে এত ঢালাও বিক্কিরি হচ্ছিল, তার অর্থ বোঝা গেল না, কেননা দোকানী ভদ্রমহিলা জানালেন-জাফরান এখানে চাষ হয় না মোটেও। ভুল কি ঠিক , জানি না।

    মার্কেটের এক জায়গায় জনা চার-পাঁচেক দোকানদারনী মিলে তাস খেলায় সবিশেষ মগ্ন, খদ্দের আসছে কি যাচ্ছে, তা নিয়ে তাঁদের মাথা কদাচ ঘর্মাক্ত হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া গেল না। আলী সায়েব বৃথাই বাঙালীর নামে দোষ দিয়ে গেলেন, এই সুদূর অরুনাচলে এলে প্রমাণ পেতেন- ও জিনিষ বেচার না-এমন কথা বলার হক শুধু বাঙালী দোকানদারের একচেটে নয়। এমন নয় যে বমডিলা কিছু ব্যতিক্রম অরুনাচলের অন্য জায়গার তুলনায়, বরং উল্টোটাই। তাওয়াং ফেস্টিভ্যালে রেস্তোরাঁয় ঢুকেছি, সুবেশা মেয়েরা একবারের জন্যেও এসে জানতে চায় নি-কী চাই। চিকেন আছে কিনা জিগ্গেস করাতে মুখ ভেটকে চলে গেছে, কী খাবার মিলবে তবে- প্রশ্ন করায় বলেছে-লোক্যাল খাবারদাবার রয়েছে, ওসব তোমাদের পছন্দ হবে না। বস্তুত ঃ সমস্ত অরুনাচলই ট্যুরিস্টের প্রতি বেশ উদাসীন-রাস্তাঘাটের হাল থেকে শুরু করে মানুষজনের কথাবার্তা ও বডি ল্যাঙ্গোয়েজে সেকথা স্পষ্ট।

    বমডিলা শহরের মনাস্টারিরাই বা পিছিয়ে থাকে কেন! লোয়ার মনাস্টারিটি মার্কেটের প্রায় মাঝখানে লোকেটেড। এরকম একটি একঘেয়ে বিবর্ণ গুম্ফা আজ পর্যন্ত দেখি নি। ভেতরে কোনো ভক্ত-দর্শনার্থী-লামা-কেউ নেই, কোনো আলো জ্বলছে না। ছোট ছোট অজস্র দেবমূর্তি কাচের শোকেসে বন্দী। এ দেখে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। আপার মনাস্টারির খ্যাতি শুনেছিলাম, সেটি মূল শহর থেকে একটু দূরে ও উঁচুতে অবস্থিত। গাড়িতে চেপে ঘোরানো রাস্তা দিয়ে যখন সেখানে পৌঁছলাম, তখন আকাশের আলো নিবে এসেছে, কুয়াশায় মুড়ে যাচ্ছে শহর। আলো থাকলেও অবশ্য লাভ কিছু হত না, কেননা গুম্ফাটি মেরামতির কাজ চলছে, বাঁশের কাঠামো দিয়ে মোড়া। তবে চত্বরটি সুন্দর, এখান থেকে আলোয় অথবা মেঘ-কুয়াশায় শহরটাকে পাইনবনের ফাঁক দিয়ে দেখতে ভালোই লাগবে মনে হয়। কিছু পাখীও পাওয়া গেলে যেতে পারে। কিন্তু তখন ভিজিবিলিটি শূন্যের কাছাকাছি। কয়েকজন কিশোর লামা ওরই মধ্যে গুলি খেলছে। মনে হল ডেকে বলি-হ্যাঁ রে, তোদের বাপ-মা'র জন্য মন কেমন করে না !
    পরদিন সক্কাল সক্কাল তাওয়াংয়ের উদ্দেশ্যে সেই মহাযাত্রা। গুগল ম্যাপ বলেছেন দূরত্ব ২৩৭ কিমি , যাওয়া যাবে সাড়ে চার ঘন্টাতেই। আমাদের ড্রাইভার বললেন আট ঘন্টা লাগবে, সেটা বেড়ে দশ ঘন্টাতেও গিয়ে দাঁড়াতে পারে। রাস্তা অতীব বাজে। হোটেলের লোক বলল ছ ঘন্টা। খুব আশাবাদী এস্টিমেটও যদি ধরি, সাড়ে চার ঘন্টা কিছুতেই নয়। পরে অবশ্য দেখা গিয়েছিল ড্রাইভারের কথাই ঠিক, দশ ঘন্টার প্রায় কাছাকাছি লেগেছিল। কারা যে বসে বসে গুগল ম্যাপের ঐ সব উদভুট্টি হিসেবনিকেশ কষে! তারা কী কাক্কেশ্বর কুচকুচের বড়মেসো ? যেই হোক, তাদের ন্যাজ ধরে আচ্ছাসে পেঁচিয়ে দেওয়া উচিৎ।
    রাস্তাতেই নাস্তা সারা হল। দিরাং বাজারে, বমডিলা ছাড়ার ঘন্টা দেড়েক পর। নাস্তা কোথায় পাওয়া যাবে শুধোনোয় এক দোকানদার পরপর দোকান দেখিয়ে দিলেন। সব দোকানই একই ঘুপচিমত, রান বাই বিহারী অথবা উত্তর ভারতীয়, সর্বত্রই কটকটে কমলা রঙ্গের জিলিপি রাখা আছে চাঙারীতে, টগবগ করে বাদামী রংয়ের গজ চা ফুটছে কেটলিতে।ওরই মধ্যে চোখ বুঁজে ইনি মিনি মাইনি মো বলতে বলতে ধাঁ করে একটা কোনো ঘুপচিতে ঢুকে পড়লাম। বাচ্চাগণের (এবং বড়দেরও) খাবার ব্যাপারে সচেতন দেবর্ষি কিছুতেই অখাদ্য-কুখাদ্য খেতে দেবে না, পাহাড়ী রাস্তায় যে কোনো সময় মোশন সিকনেস হতে পারে এবং তার পেছনে কুখাদ্য যে বহুলাংশে দায়ী, এ তার দৃঢ় বিশ্বাস। দেবর্ষি'র এ কী ট্রান্সফর্মেশন! এ কি সেই একই মানুষ, আন্দামান-ভ্রমণে গিয়ে যে নানা জাতি-প্রজাতির কঁতিনতাল-চীনা-মোগলাই খানা গাণ্ডেপিণ্ডে ধ্বংস করেছে, খাবার শেষে দু-হাত তুলে ঘোষণা করেছে-"আইসক্রীম আমি কিন্তু দুটো খাবো!' এবং সবশেষে ফলারভোজী তৃপ্ত ব্রাহ্মণবটুর মত ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলেছে-আ!! বড় ভালো খেলাম !
    যা হোক, ফুড ম্যানেজারের মান রেখে অর্ডার করা হল প্রত্যেকের জন্য একটা করে তেল-ছাড়া পরোটা ও ঘুগনি ( আমার আবার সেই বরিশাল লঞ্চ-ঘাটের কথা মনে পড়ে গেল !) রাত্তির আবার আর এক কাঠি বাড়া, ঘুগনিতে সে আনহাইজিনিক ধনে পাতা-কাঁচালঙ্কা ও পেঁয়াজকুচি দিতে দেবে না। আমি ও সেঁজুতি করুণ গলায় ঘুগনি তা হলে "কী দা খামু " বলেটলে তাকে রাজী করালাম।
    সে খাদ্য খেয়ে ম্যানেজারসাহেব তো তরর্‌! অহো ! কী খাইলাম, জন্মজন্মান্তরেও খাইব না, আরো দুইটা দ্যাও দিনি ! বলে চেয়ে চেয়ে আরো দুখানা ত্যাল-ছাড়া পরোটা খেল। অঙ্গার শতধৌতেন ইত্যাদি। খেয়েদেয়ে ভুঁড়িতে হাত বুলিয়ে বৌকে ডেকে এনে তারা দুটি সুখের প্যাঁচা ও প্যাঁচানী মদের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পোজ দিয়ে ছবি তুলল।

    হে মহাজীবন, আর কোনো পদ্য অথবা খাদ্য নয়। এবার কেবল কঠিন কঠোর গদ্য, কেবল চাকায় চাকায় দুর্মর ঘর্ষণ। এই মহাপ্রস্থানের পথে আমরা পাণ্ডবগণের তুলনায় একটু বেশী ভারী ও জনবহুল। তবে কিনা,আমাদের কোনো কুকুর নাই; তাই হে কুত্তাভীত, আপনিও স্বচ্ছন্দে আমাদের সঙ্গী হতে পারেন; শুধু জায়গার অভাবে কারো একটা কোলে বসতে হবে। আমাদের আরোহণ চলবে সে লা অবধি, তারপর থেকে খানিক অবরোহণ।

    সে লা ( "সেলা পাস" বলাটা বাহুল্যমাত্র, কেননা লা অর্থে পাস , সে তো আপনারা সকলেই জানেন) নাকি পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোটরেবল পাস; এর উচ্চতা ১৩৭০০ ফিট। এটি তাওয়াংকে ভরতবর্ষের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। এই পাস আটকে যাওয়া মানে তাওয়াং ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কাজেই এর সামরিক ও অসামরিক গুরুত্ব অসীম। বরফ পড়ে এখানে বারো মাস, কাজেই বহিরাক্রমণ ছাড়াও প্রাকৃতিক কারণেও সেলা তথা তাওয়াং যে কোনো সময় অবরুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শীতে।

    '৬২র চীন-ভারত যুদ্ধের সময় এই সেলা পাসে গাড়ওয়াল রাইফল্‌সের রাইফল্‌ম্যান যশবন্ত সিং রাওয়াতের বীরত্বের কথা অনেকেই জানেন। এই বীরগাথার নানা ভার্সন রয়েছে, জনপ্রিয় ভার্সন হচ্ছে-যুদ্ধের শেষ দিকে যখন ভারতীয় সেনাদের রিট্রিট করতে বলা হয়েছে, তখনো যশবন্ত সিং রয়ে যান এবং স্থানীয় দুই মনপা মহিলা সেলা ( কোথাও বলা আছে , এঁরই নামে পাসটির নামকরণ হয়েছে)ও নুরার সাহায্যে (এঁর নামে কি নুরানাং জলপ্রপাতের নাম দেওয়া হয়েছে? ) লাগাতার তিন দিন চীনা সেনাকে আটকে রাখেন। বেশ কয়েকটি আলাদা আলাদা জায়গা থেকে এরা তিনজন (মতান্তরে দুজন-যশবন্ত ও সেলা) কামান-বন্দুক থেকে গুলি চালিয়ে চীনাদের বিভ্রান্ত করে ; চীনারা ভাবে বুঝি একটি বড়সড় ভারতীয় ট্রুপ ওখানে মোতায়েন রয়েছে। অবশেষে যশবন্তদের র‌্যাশন সাপ্লায়ারকে চীনাবাহিনী আটক করে, তার কাছ থেকে আসল তথ্য জানতে পারে ও যশবন্তদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রেনেড বিস্ফোরণে সেলা মারা যান, নুরা ধরা পড়েন,ও আত্মসমর্পণ ছাড়া উপায় নেই দেখে যশবন্ত বন্দুকের শেষ গুলিটি নিজের শরীরে বিঁধিয়ে আত্মহত্যা করেন। চীনারা নাকি যশবন্তের মুণ্ডচ্ছেদ করে মুণ্ডটি নিয়ে যায়; তবে সিজফায়ারের পর চীনা কম্যাণ্ডার যশবন্তের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে মুণ্ডটি ফেরৎ দেন, এমন কি যশবন্তের একটি ব্রাসের আবক্ষমূর্তি বানিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে উপহার দেন। সেই মূর্তিটিই নাকি সেলা থেকে কিছুদূরে যশবন্তগড়ের ওয়ার মেমোরিয়ালে রয়েছে।
    দেড়টা-দুটো নাগাদ সেলাতে পৌঁছনো গেল। কে যেন বলেছিল-সেলাতে বেশী সময় কাটাস নি, মাউন্টেন সিকনেস হবে, তাড়াতাড়ি নেমে যাস; তাছাড়া যত বেলা বাড়ে সেলার আবহাওয়া তত খারাপ হয়, বরফ পড়ার আশংকা। তাই বলে সেলাতে নামব না , তা তো আর হয় না! চারদিক রোদ ঝলমল করছে, কিন্তু মাঝেমধ্যে এক একটা ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ঐ মোটা জ্যাকেট ভেদ করে পাঁজঞ্জুরিতে তিড়িতঙ্ক লাগিয়ে দিচ্ছে। আমার একটু একটু গা গুলোচ্ছিল, পা-ও টলমল করছিল; কিন্তু সেটি মাউন্টেন সিকনেসজনিত নাকি অল্টিচ্যুড সিকনেস না অন্য আর কোনো কল্পিত সিকনেসের কারণে ( মর্নিং সিকনেস ব্যতীত অন্য যে কোনো সিকনেসের প্রতি চির-অনুগত দাসের আনুগত্যবশতঃ), ঠিক জানি না।পরে অবশ্য শুনলাম সেঁজুতিরও নাকি ওরকম হয়েছে। তখন সবাই মিলে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করা হল- বেঁড়ে ব্যাটা মাউন্টেন সিকনেসকেই ধর। অবিশ্যি ব্যাগে আমার ডায়ামক্স ও দেবর্ষি'র কোকো ছিল-সেগুলো ইনট্যাক্ট অবস্থাতেই কলকাতায় ফেরত যায়। কেন কে জানে। হয়তো আমার এই ভুল ধারণার কারণে যে ষোলো হাজার ফিটের নিচে মাউন্টেন সিকনেস হয় না। দেবর্ষি যে কেন কোকো বিতরণ করেনি , সেও এক রহস্য। আবার নিয়ম করে হাই অল্টিচ্যুড ট্রেক করা হয়!
    যাহোক , চাদ্দিকে বেশ ফুরফুরে উৎসবের মেজাজ। আরো বেশ কিছু গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। জনগণ তারিয়ে তারিয়ে বৃক্ষহীন রুক্ষ পাথর ও বরফময় নজরে উপভোগ কচ্ছেন ও গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছেন ( ভারতীয় আর্মি এখানে বিনি পয়সায় গরম চা বিতরণ করে থাকে)। বুভুক্ষু বাঙালীর চাট্টি বরফ পেলেই হল, নোংরা বরফে গড়াগড়ি- বরফের পিণ্ডি একে-তাকে ছুঁড়ে মারা- ঘাড়ে-গর্দানে ভর দিয়ে পোজ মেরে ছবি তোলা ইত্যকার নানাবিধ কৃতকর্মাদি পালন করা চলছে। আমরাও গুট গুট করে নেমে প্যারাডাইস লেকের ধারে গিয়ে ছবি তোলার রিচুয়াল পালন করলাম। শিশুগণ ঐ ঠাণ্ডা ও উচ্চতা উপেক্ষা করে দৌড়াদৌড়ি করছে। ওরে, অত দৌড়স নি , ঘোগে ধরবে। ঘোগের নাম অল্টিচ্যুড সিকনেস।

    খানিক দূরেই যশবন্তগড়, যার কথা আগেই বললাম। যেটা বলা হয় নি তা হল, যশবন্ত সিং রাওয়াত এখানে সন্তের সম্মান পেয়ে থাকেন, জওয়ানরা ভক্তিভরে বলেন-বাবা যশবন্ত সিং। বাবা আপদে-বিপদে সকলকে রক্ষা করেন। সিকিমের বাবা মন্দিরের কথা মনে আসবেই। এখন কথা হল, এই জনবিরল উচ্চতায় মেঘ-কুয়াশা-বরফের মধ্যে সারাক্ষণ স্ট্র্যান্ডেড হয়ে থাকতে থাকতে কি ভক্তিভাব মনে আপনা হতেই আসে, নাকি শহীদে এই দেবত্ম-আরোপ কর্তাদের কোনো ইন্টেনশন্যাল প্রক্রিয়া?

    যশবন্তগড় অবশ্য আপাততঃ রহস্যময় কুয়াশায় মোড়া; যদিও একটু আগেই সেলাতে ঝলমলে রোদ্দুর দেখে এলাম। কুয়াশা ফেঁড়ে দু-এক পা হেঁটেছি কি হাঁটি নি, অমনি সমবেত জওয়ানরা বলে উঠলেন -তফাৎ যাও ! তফাৎ যাও ! কী অন্যায় করলেম রে বাবা/মনে কি ভক্তিভাব যথেষ্ট জাগ্রত হয় নি বলে এঁরা টের পেয়ে গেছেন-ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে ভ্যাবাচাকামত খেয়ে গিয়ে সরে এলাম অনেকখানি। অমনি বোঁ বোঁ করে সাইরেন বাজাতে বাজাতে সামনে গাড়ি-পেছনে গাড়ি সেনাবাহিনীর কোনো উচ্চপদস্থ কর্তা এসে সেথায় নামলেন। বা বলা ভালো, কর্তার অত্যুচ্চপদস্থ গিন্নিটি কর্তাকে ট্যাঁকে পুরে গাড়ি থেকে রাঙা চরণ দুখানি বাড়িয়ে নামলেন। সঙ্গে সঙ্গে খটাস খটাস করে বন্দুকবাজগণের স্যালুট। গিন্নির উদ্দেশ্যে নিবেদিত বলেই মনে হল। এই গিন্নিটির আবার ফটো তোলার বাই, ইদিক-উদিক ঘুরে ঘুরে খিচিক খিচিক করে ছবি তুলে বেড়াচ্ছেন। এই কনভয়টিকে আমরা রাস্তায় আগেও পেয়েছি, নানা সময়ে অসামরিক গাড়িটাড়ি দাঁড় করিয়ে এঁদের পাস করিয়ে দিচ্ছিল জওয়ানরা। মাঝে মাঝেই আবার কনভয় থেমে যাচ্ছিল, কখনো গিন্নি নিজে, কখনো জনৈক জওয়ান গিন্নির নির্দেশে ক্যামেরা হাতে নিয়ে ছুটে ছুটে দুটি পাথর-চারটি গাছ-খানিকটা কুয়াশা ইত্যাদির ছবি তুলে আনছিলেন।

    যশবন্তগড় মূল মেমোরিয়ালের পাশে একটা উঁচু জায়গা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা, তার মধ্যে একটি হোর্ডিং-জনৈক চীনা সৈনিকের ছবি লাগানো; নিচে লেখা -They also died for their country। আর একটি পৃথক হোর্ডিংয়ে লেখা- Graveyard of Chinese soldiers। মৃত প্রতিপক্ষর প্রতি এই সম্মান দেখানোটুকু ভালো লাগলো। বিশেষ করে এই জাতীয়তাবাদী জিংগোয়িজমের সময়ে। এইখানে , এই কাঁটাতারে মোড়া বিতর্কিত ভূখণ্ডে কুয়াশা এসে ঢেকে দিয়েছে মৃত প্রতিপক্ষের গোরস্থান। বেঁচে থাকতে এরা আগুন হাতে ছুটে গিয়েছিল একে-অন্যের দিকে, মৃত্যুর পর নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে পাশাপাশি। তারপর বাকি যা করবার প্রকৃতি করুক। পৃথিবীর মাটি-পাথর-শ্যাওলা-মৃতভুক জীবাণু-গাছের মূল আর পাখিরা করুক।

    বেলা তিনটে নাগাদ জং শহরে পৌঁছনো গেল।আমাদের আগে আগে সেই আর্মি গাড়ির কনভয়, দেখি মূল রাস্তা থেকে অন্য দিকে বেঁকে গেল। এবং পেছন পেছন , আমরাও ! ড্রাইভার তো সাত চড়ে রা কাড়েন না, তাঁকে অজস্রবার জিগ্গেস করায় বললেন-ওয়াটার ফলস।
    এবং, আহ ! ওয়াটার ফলস-ই বটে ! এই সেই নুরানাং ওয়াটার ফলস্‌, তাওয়াং আসা-যাওয়ার পথে যার দর্শন বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিত। আমি অবশ্য এমনিতে বড়সড় জলপ্রপাত বিশেষ দেখি নি, তাই একটুতেই মুহ্যমান হয়ে পড়ি। শিলংয়ে নোহ্‌কালিকাই ফলস্‌ দেখেছি, মন বিশেষ ভরে নি; এবং এলিফ্যান্ট ফলস্‌, সে বেশ সুন্দরী, হয়তো বর্ষায় আরো রূপ খোলে। তাও নুরানাং! মিনিট পাঁচ-সাত দূর থেকেই তাঁর গর্জন শোনা যাচ্ছিল। তাকে দেখতে পেলাম একটি হাইডেল পাওয়ার প্রজেক্টের প্রাঙ্গনে। আসল প্রপাত থেকে সে এলাকাটি তা কিছুটা দূরে। তেরচাভাবে তার দর্শন পাওয়া যাচ্ছিল। অনেকখানি উচ্চতা থেকে সে ঝাঁপ দিচ্ছে তাওয়াং চু নদীতে। তার ওপর আকাশ মেঘলা, সন্ধে হয় হয়। অনেক লোক জমে গেছে, ভালো ভিউ আসছে না। জলপ্রপাতটিকে সামনাসামনি দেখবার বাসনা হচ্ছে মনে। বেশ নীচে একটা সবুজ উপত্যকা, যেখানে তাওয়াং নদীতে প্রপাতটি এসে মিশেছে। হঠাৎ দেখি একটি মেটে চড়াই ভেঙে হাঁচোড় পাঁচোড় করে কিছু জওয়ান উঠে আসছে। এবং নীচে ঐ জলধারার কাছে , খুব কাছে দাঁড়িয়ে বড়কর্তার সুন্দরী স্ত্রী জওয়ানদের স্ন্যাপ নিচ্ছে। পথ আছে তাহলে, পথ আছে! আমি আর সব কিছু ভুলে, আমরা যে লাঞ্চ খাইনি সে কথা ভুলে, বাচ্চাগুলো অভুক্ত, কষ্ট পাচ্ছে ভুলে স্বার্থপরের মত সরসরিয়ে সে রাস্তা দিয়ে নেমে গেলাম। কেননা ড্রাইভার বলেছে ,আর মিনিট পঁয়তাল্লিশেই তাওয়াং পৌঁছে যাওয়া যাবে।
    এবং গিয়ে একদম হাম্বলড্‌ হয়ে গেলাম। ছবি তুলবো কি, সে শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাই একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার। অনেক দূর থেকে জলের রেণু গায়ে এসে লাগছে। জলে জল এসে পড়ছে, তার প্রবল গর্জন। ফেনা ভেসে যাচ্ছে তাওয়াং চু বেয়ে বহুদূর। পায়ের তলার ঘাসমাটি ঈষৎ ভেজা। আর দূরে পাহাড় , পাহাড়, সবুজ ও নীল। মাথায় ঠেকে আছে ইস্পাত রং মেঘ। অত কথায় কাজ কি, একখানা ছবি দিয়ে দিলেই তো হয়-




    গিন্নিমা জিন্দাবাদ। এই একটিবার তিনি আমার বড় উপকার করেছেন। একটু বেশীই সময় নিয়ে ফেললাম। অপরাধবোধ জাগছিল। সেইটে আরো বেশী করে জাগলো, যখন নির্ধারিত পয়ঁতাল্লিশ মিনিট বাদেও তাওয়াং এসে পৌঁছলাম না। ড্রাইভারকে সে কথা বলায় সে অম্লান বদনে জানালো -আরো ঘন্টাখানেক। পৃথিবীর এই প্রান্তে পয়ঁতাল্লিশ মিনিটের মাপ আমাদের তুলনায় একটু আলাদা, সে কথা বোঝা গেল। সময় এখানে বেশ রাবারের মত, তাকে নিয়ে আচ্ছাসে টানাটানি কল্লেও সে কিছু মনে করে না। কিন্তু আমরা মনে করি, খুব মনে করি। এদিকে ঝুপ করে সন্ধে নেমে পড়েছে, বাইরে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। যদিও ঘড়িতে তখন সবে সাড়ে চারটে। আরো বেশ খানিকক্ষণ পরে আলো ক্রমেই আসিতেছে বলে মনে হল। রাস্তার এধারে ওধারে , কাছে -দূরে মিটমিটে সব আলোর পশরা।মনে আশা জাগলো -ঐ বুঝি তাওয়াং জনপদ। ড্রাইভারকে সে কথা বলায় সেও ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। কিন্তু ধন্য আশা কুহকিনী! সেই সব আলো অথবা আলেয়ারা আবার যথাসময়ে মিলিয়েও গেল।আবার ঘুরঘুট্টি। ড্রাইভারকে আর কিচ্ছু জিগ্গেস করি না। রীতিমত ক্লান্ত ও ক্ষুৎপীড়িত লাগছে। এইবার হঠাৎ করে সুররিয়েল ছবির মত শূন্যে ভেসে উঠল একটি আলোকময় বোর্ড-ওয়েলকাম টু তাওয়াং।তারপরে জমজমাট শহরের আভাস, দোকানপাট, কেনাবেচা ইত্যাদি। কিন্তু এবার আর না আঁচালে বিশ্বাস নেই। আর ঠিক তাই! কিছুক্ষণ বাদেই আবার আঁধার। ড্রাইভারকে সারকাজম মিশিয়ে বলি-আমরা নিশ্চয় তাওয়াং ছাড়িয়ে চলে এসছি ! সে হাঁ-ও বলে না, হুঁ-ও বলে না।

    এমনি হয়েছিল আন্দামান বেড়ানোর সময় আমাদের বারাটাং যাত্রায়।সেদিন শুরু থেকে শেষ অবধি ভিজেছি। বিশাল জার্নি, গায়ের জামা-প্যান্ট গায়েই রয়েছে, শুকিয়েছে বললে মিথ্যে বলা হবে। বাচ্চাদুটো বাসের মধ্যে খালিগায়েই এ ওর গায়ে ঢুলে পড়েছে। আর ফেরার সময় কিছুতেই পোর্ট ব্লেয়ার আসছে না। পোর্ট ব্লেয়ার শহরে ঢুকে গেছি, তারপরেও আধ ঘন্টা-পয়ঁতাল্লিশ মিনিট বাস ঘুরেই যাচ্ছে। আমাদের হোটেল আর আসছে না।

    এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ড্রাইভার ঘ্যাঁচ করে গাড়ি ঘুরিয়ে একটি হোটেলের পার্কিং লটে ঢুকিয়ে দিল। আমরা ঘাড় ঘুরিয়ে জুলজুল করে চেয়ে দেখলাম-বোর্ড ঝুলছে -Hotel Gakyi Khang Jhang । ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা। বাইরে ঘনঘোর রাত। পাক্কা দশ ঘন্টার জার্নি।

    এবারের বেড়ানোয় এই প্রথম যাকে বলে কোথাও খুঁটি গেড়ে বসা হলো। তাওয়াংয়ে আমরা থাকবো তিন রাত। অন্য সব জায়গায় তো বুড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসা, এক এক রাত্তিরের মামলা।তাও আবার পৌঁছতে পৌঁছতেই বেলা তিনটে বেজে যায়। তাওয়াংয়ে অন্ততঃ আনপ্যাক করার সঙ্গে সঙ্গেই প্যাক করবার হাঙ্গামা শুরু করতে হবে না।

    খিদে মিটবার পরেই প্রথম যে বোধটা হল, সেটা শীতভাব। তাওয়াং কিছু না হোক ১০০০০ফিট উঁচু, দার্জিলিংকে সে যখন-তখন হেসেখেলে খোকা বলে ডাকতে পারে। হোটেলের রুমে জমজমাট রুম হীটার রয়েছে দেখে আশ্বস্ত হলাম। এই হোটেলটি নাকি তাওয়াংয়ের অন্যতম সেরা হোটেল। হবেও বা। ট্যুরিজম মার্টের সময় সায়েব-মেমগণ এসে এই হোটেলেই ছিলেন। এমনিতে বন্দোবস্ত ভালোই। চার-পাঁচতলা উঁচু। রিসেপশনটি রাস্তার লেভেলে হলেও আসলে সবচেয়ে উঁচুতলায় ( না, ঠিক বলা হল না, এর ওপরেও একটি তলা আছে, সেখানে মনে হয় হোটেলের কর্মীরা থাকেন), আমাদের সেখান থেকে দুটো তলা নেমে যেতে হল। পাহাড়ের বাড়িঘর যেমন হয়। পাহাড়ের ঢালে তৈরী, তাই এমন বন্দোবস্ত। সেসব ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের ঘরগুলো মনাস্ট্রি-ফেসিং নয়। ফলে জানালা খুললেই তাওয়াং ভ্যালি ও তাওয়াং মনাস্ট্রির ঝলমলে ছবির বদলে পাশের হোটেলের পশ্চাদ্দেশ ও আবর্জনার স্তূপ দেখতে পাওয়া যাবে। ঘরটা তার ওপর খুব খোলামেলাও নয়। যদিও হেল্প ট্যুরিজম হোটেলের ঘর বাবদ প্রতিদিন প্রতি ঘরপিছু চারহাজার টাকার বেশী নিয়েছে (গোটা ট্যুর জুড়েই), এবং সর্বত্রই আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেছি সেসব ঘরের ভাড়া তার আদ্ধেক বা আদ্ধেকেরও কম। এবং গোটা ট্যুরে, হিসেব করে দেখেছিলাম ছ'জনের জন্য হেল্প ট্যুরিজম কমপক্ষে চল্লিশ হাজার টাকা শুধু লাভই রেখেছেন। এ দিয়ে আরেকটা ছোটখাটো ট্যুর অনায়াসে সেরে ফেলা যায়। আমাদেরই দোষ ! সময়ের অভাবে ঠিকঠাক খোঁজখবর নিই নি, বিল ব্রেক আপ চাই নি, ঘরের ছবিটবি দেখিনি, কিরকম কী ঘর, তার খোঁজখবর চাইনি। তো বন্ধুগণ, ভবিষ্যতে হেল্প ট্যুরিজম হইতে সাবধান! হোটেলগুলো অবিশ্যি ভালোই ছিল।

    কাল আমরা যাবো তাওয়াং মনাস্ট্রি এবং তাওয়াং ফেস্টিভ্যাল দেখতে। সেই বহু আকাঙ্খিত তাওয়াং ফেস্টিভ্যাল-লামানৃত্য, এক্সোটিক জনজাতি নাচ, এক্সোটিক ক্যুইজিন ! তাও তো ট্যুরিজম মার্ট মিস করে গেলাম। সেটি কি বস্তু ছিল এবং ফেস্টিভ্যালে ঠিক কি কি আমরা দেখতে পাবো, রিসেপশনের চন্দ্রবদনাদের কাল জিগ্গেস করতে হবে, এই বাসনা মনে নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে গেলাম।
    পরের দিন ঝকঝকে সকাল। হোটেলের লবির বাইরে এসে চোখ জুড়িয়ে গেল।রোদে ঝলমল করছে তাওয়াং ভ্যালি, আর তার ওপরে চকচকে তাজের মত তাওয়াং মনাস্ট্রি। মনাস্ট্রি নাকি হোটেল থেকে বেশী দূরে নয়, আপলোগ পয়দল যা সকতে হেঁ- ড্রাইভার জানালেন। কতক্ষণ লাগবে বাবা পয়দল গেলে? রিসেপশনিস্ট বলেন-পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তবে কাজ নেই পয়দল গিয়ে, গাড়িতেই যাবো। গাড়িতে ওঠার আগে রিসেপশনিস্টকে জিগ্গেস করতে ভুলি না- আচ্ছা, এই ট্যুরিজম মার্টটা কি ছিল? মানে কী হল-টল এতে?
    -"ট্যুরিজম মার্ট, স্যার? ওতে তো কনফারেন্স হল, স্পিচ-টিচ হল..."
    - "ওঃ, আচ্ছা ,আচ্ছা( বেশ বেশ, কিছুই মিস করিনি তাহলে !)!! আর তাওয়াং ফেস্টিভ্যাল? এতে তো মাস্ক ড্যান্স-ট্যান্স হবে, নাকি? লোকাল খাবারদাবার পাওয়া যাবে?"
    -" মাস্ক ড্যান্স? "-মেয়েটি ভ্রু কোঁচকায়-"মাস্ক ড্যান্স, মানে... তবে হিন্দি গানা খুব হবে, ধামাকেদার, মুম্বাই থেকে আর্টিস্ট আসছে যে ..."-এইবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার মুখ।

    -"ও-ও। আ-চ্ছা। থ্যাংকিউ ।"-কথা বাড়াই না আর।
    ----
    মনাস্ট্রির সামনের রাস্তায় এসে গাড়ি দাঁড়ায়। হেঁটে যেখানে পৌঁছতে সময় লাগে পঁয়তাল্লিশ মিনিট, গাড়িতে সেটুকু মিনিট পাঁচ -সাতেকে পৌঁছে যাওয়া যায়। উঁচু হয়ে যাওয়া রাস্তা পাইনের ছায়ায় ঢাকা। একদিকে তাওয়াং শহরসহ তাওয়াং ভ্যালি নেমে গেছে নীচে, অন্যদিকে উপরে উঠে গেছে জঙ্গুলে পাহাড়। অনেক পাখি ডাকছে। মনাস্ট্রিতে ঢোকার মুখেই বড় বড় পাইন গাছ, তার ডালে ডালে চোখ চালাই। পাখীরা ইচ্ছেখুশীমত উড়ে বেড়াচ্ছে, কাছে আসছে-যাচ্ছে, কিন্তু ক্যামেরা বার করলেই সব ভোঁ ভাঁ। এখান থেকে ছবি বের করে আনতে গেলে অনেক সময় ও ধৈর্য লাগবে। দ্বিতীয়টা থাকলেও প্রথমটার অভাব বিলক্ষণ, কেননা এই বিশাল তাওয়াং মনাস্ট্রি ঘুরে দেখতে হবে, তারপর হ্যান্ডিক্র্যাফট্স সেন্টার, সেখানে নিশ্চয়ই অনেক কেনা-কাটা আছে, তারপর তাওয়াং ফেস্টিভ্যাল, যদি কপালে কিছু থাকে ... ! এদিকে আবার চারটে বাজতে না বাজতেই ঘোর সন্ধ্যে।

    বড় শান্তি চারদিকে। পোকারা ঘুন ঘুন করে ঘুরছে, পাখির ডাক, পাইনের ডালে আলোছায়া। নিচের তাওয়াং শহর দেখাচ্ছে বড় সুন্দর। আকাশে মাঝেমধ্যেই বড়সড় ফড়িংয়ের মত হেলিকপ্টার ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে, যেন কানের কাছেই তার ডানার গুঞ্জন, আর হাত বাড়ালেই ছোঁয়াও যাবে তাকে। একটা লাল-কমলা হেলিকপ্টার তো পুরো বড় একটা লাল ফড়িংয়ের মত দেখতে লাগলো। হোই দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়চুড়ো,ওরই মধ্যে হয়তো গোরিচেন পীকও রয়েছে-অরুনাচলের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ।



    তাওয়াং মনাস্ট্রি- হোটেল থেকে।


    মনাস্ট্রি থেকে দূরের পাহাড়।



    টিকেল'স ফ্লাওয়ারপেকার,মনাস্ট্রির সামনের পাইনগাছে।

    তাওয়াং মনাস্ট্রি। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মনাস্ট্রি, লাসার পরেই। ভারতের বৃহত্তম। এটি শুধু একটাই মনাস্ট্রি নয়, আসলে এক বিশাল মনাস্ট্রি কমপ্লেক্স। ৬৫খানা বাড়ি রয়েছে এই কমপ্লেক্সের মধ্যে। রয়েছে একটি তিনতলা উঁচু লাইব্রেরি, প্রচুর দামী পুঁথি আর সূত্র রয়েছে তাতে, তার অনেকগুলোই সোনার জলে লেখা। রয়েছে একটি মিউজিয়াম। ১৬৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মনাস্ট্রি পঞ্চম দলাই লামার আমলের । তাঁরই ইচ্ছায় মিরাগ লামা এই মনাস্ট্রির প্রতিষ্ঠা করেন। তাওয়াং শব্দের মানে Horse chosen(তা= Horse, ওয়াং =chosen)। কথিত আছে মিরাগ লামা নাকি মনস্থির করতে পারছিলেন না, কোথায় মনাস্ট্রি তৈরী করা হবে। একদিন গুহার মধ্যে উপাসনার পর বেরিয়ে এসে আর নিজের ঘোড়াটিকে খুঁজে পান না। খুঁজতে খুঁজতে এক পর্বতচূড়ায় এসে ঘোড়াটিকে পেলেন, শান্তভাবে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানে। একে দৈবনির্দেশ ধরে নিয়ে সেখানেই মনাস্ট্রি স্থাপন করেন তিনি, আর তাই নাম দেওয়া হয় তাওয়াং।
    তাওয়াং বলতে গেলে তিব্বতের বর্ডারেই। ১৯১৪ সালে যখন ম্যাকমাহন লাইন টানা হয়, তখন শিমলা চুক্তি অনুযায়ী তিব্বত তাওয়াং সমেত বেশ কয়েকশো কিলোমিটার এলাকা ব্রিটিশের হাতে ছেড়ে দেয়; যদিও এ নিয়ে সেসময় চীনের যথেষ্ট আপত্তি ছিল। এবং বলা হয় চীনকে অন্ধকারে রেখেই ম্যাকমাহন সাহেব ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের সীমানা নির্ধারণ করেন। সীমানা একটা থাকলেও শুরুর দিকে অত মানামানি ছিল না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অবধি তিব্বতী অফিসিয়ালরাই তাওয়াং শাসন করতেন।কিন্তু তারপর থেকেই জাপানী ও চীনা আগ্রাসনের ভয়ে বৃটিশ শাসন কড়া হাতে তাওয়াং নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর উত্তরাধিকার সূত্রেই তাওয়াং সহ অরুনাচল প্রদেশ ইন্ডিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। চতুর্দশ অর্থাৎ বর্তমান দলাই লামার এ নিয়ে আপত্তি ছিল , তিনি তাওয়াংকে তিব্বতের অংশ বলেই মনে করতেন,যদিও পরবর্তীকালে অর্থাৎ কিনা চীনের তিব্বত দখলের পরে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মত বদলায়। ভারত স্বাধীন হওয়ার দু বছর পর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জন্ম হয়। শুরুর দিকে নেহরু চীনের সঙ্গে বেশ উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন , তাঁর মনে বড় সাধ ছিল ভারত ও চীন হাতে-হাত মিলিয়ে এশিয়ার শক্তিকেন্দ্র হিসেবে বিশ্বরাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করা; সেই মধুচন্দ্রিমাকালে এমনকি ঝৌ এন লাই এ কথাও বলেন যে ভারত শাসিত টেরিটরির ওপরে চীনের কোনো লোভ নেই। কিন্তু আস্তে আস্তে সম্পর্ক বিষিয়ে উঠতে থাকে। সাড়ে সর্বনাশ ঘটে যখন ১৯৫৯ সালে চীন তিব্বত দখল করে এবং চতুর্দশ দলাই লামা সীমানা পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে আসেন। পালিয়ে এসে এই তাওয়াং মনাস্ট্রিতেই তিনি ক'দিন বিশ্রাম নেন, যদ্দিন না তেজপুর থেকে ভারতের অন্য প্রান্তে ধরমশালার দিকে রওনা হচ্ছেন। সম্ভবতঃ তখন থেকেই তাঁর মনে হতে থাকে, তাওয়াং ভারতেরই অংশ বটে।
    চীন এই ঘটনাকে একেবারেই ভালো চোখে নেয় নি। কিন্তু নেহরু গলা ফুলিয়ে বলেন-দলাই লামা ভারতের অতিথি; তাঁকে আশ্রয় দেওয়া ভারতের কর্তব্য। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার জন্য এটা একটা বড়সড় ইন্ধন জোগায়, সন্দেহ নেই।
    এইবার মনাস্ট্রির ভেতর। অনেক তোরণ, বারবাড়ি , অলি-গলি এসব পেরিয়ে তবে পৌঁছতে হয় মনাস্ট্রির সেন্ট্রাল বিল্ডিং আর তার সামনের চওড়া চত্বরের কাছে। পুরো কমপ্লেক্স ঘুরে দেখতে গেলে অনেক সময় লাগে, সর্বত্র যেতে দেয় কিম্বা যাওয়া উচিত কিনা তাও জানি না। কেননা বেশ কিছু বাড়ি হল লামাদের বাসস্থান, হুটহাট করে গিয়ে তাঁদের প্রাইভেসিতে হানা দেওয়াটা কাজের কাজ বলে মনে হল না। লাইব্রেরির ভেতরেও আমরা ঢুকলাম না আর, কাটিয়ে দিলাম। টিবেটোলজি কিম্বা বৌদ্ধ দর্শনের পণ্ডিত তো আর নই, বই দেখে কিছু বুঝব বলে মনেও হয় না। লাইব্রেরির নিচে একটা ছোট দোকান আবার , স্টেশনারিমত, তাতে মিনারেল ওয়াটার থেকে শুরু করে, চিপস্‌ ইত্যাদি অনেক কিছু ট্যুরিস্টকাম্য জিনিষপত্তর রাখে। লাইব্রেরি পেরিয়ে এসে আমরা ঢুকলাম মূল চত্বরটিতে, তার একপাশে তিনতলা গুম্ফা, উল্টোদিকে মিউজিয়াম, এপাশে-ওপাশে কিসব বিল্ডিং সমূহ। ঢোকা হল গুম্ফায়। বেশ ম্যাজেস্টিক ব্যাপার। বিশেষ করে ২৭ ফুট উঁচু ঐ গোল্ডেন বুদ্ধমূর্তি (সত্যি সোনা দিয়ে মোড়া কিনা জানি না) নবনীতা দেবসেন যে লিখেছিলেন, একসঙ্গে পুরো মূর্তিটি দেখা যায় না, একতলা-দোতলা-তিনতলা উঠতে উঠতে ধাপে ধাপে দেখতে হয়, সেটা কেন বুঝলাম না। হয়তো সেসময় মূর্তির সংস্কার হচ্ছিল কোনো, তাই সাময়িক ভাবে বন্ধ ছিল সামনে থেকে দর্শন-এমনটা হয়ে থাকতে পারে। আমরা তো দিব্যি হাঁ করে সামনে থেকে একসঙ্গে গোটা মূর্তি দেখলাম। বেশ গ্র্যান্ড এবং ইমপোজিং । গোটা ফ্লোর জুড়ে লাইন দিয়ে সমান্তরাল ভাবে রাখা রয়েছে অজস্র সূত্র। উপাসনার সময় এইগুলি নিশ্চয় পাঠ হয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে কোনো পূজাপাঠ চলছিল না,কোনো লামাকেও গুম্ফার ভেতরে দেখলাম না। বৌদ্ধ গুম্ফার ঐ অ্যাম্বিয়েন্সটা আমার দারুন লাগে-সেই নিচু গলায়, একটু একঘেঁয়ে সুরে সমবেত মন্ত্রোচ্চারন, মাঝেমধ্যেই ঢং করে বিশাল একটা পারকাশন ইনস্ট্রুমেন্টে ঘা দেওয়া, কিম্বা শিঙ্গার মত একটা যন্ত্রে ফুঁ দেওয়া, চারিদিকে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে-তার হাল্কা কটু গন্ধ ! এখানে পেলাম না, কী আর করা!

    তাওয়াং মনাস্ট্রি মহামান্য পঞ্চম দলাই লামার আশীর্বাদধন্য-ইনি টিবেটান লামাতন্ত্রের একজন শক্তপোক্ত হেড ছিলেন, যুদ্ধে ভাঙাচোরা সেন্ট্রাল টিবেটকে এক করেছিলেন; পঞ্চম লামার দেওয়া বেশ কিছু সূত্র এখনো এই মনাস্ট্রিতে রয়েছে। এছাড়া তাওয়াংয়ের কাছেই উরগেলিংয়ে ষষ্ঠ দলাই লামা জন্মেছিলেন, এইসব কারণটারণ মিলিয়ে এই মনাস্ট্রি বৌদ্ধদের কাছে খুব পবিত্র। অজস্র স্থানীয় অল্পবয়সী যুবক-যুবতী গুম্ফায় ঢুকছেন, শাক্যমুনি বুদ্ধকে প্রণাম জানাচ্ছেন, ধূপকাঠি জ্বালছেন তারপর হাসতে হাসতে পোজ দিয়ে ছবি তুলছেন; সম্ভবতঃ এঁরা প্রেমিক-প্রেমিকা। ছবি তোলায় কোনো কড়াকড়ি নেই। সে অবশ্য আজ পর্যন্ত যত মনাস্ট্রিতে গেছি, কোথাওই দেখি নি; শুধু মনে আছে পারো'র কাইচু লাখাং মনাস্ট্রিতে ঢোকার আগে নম্রভাবে কাকে যেন ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা অ্যালাউড কিনা জিগ্গেস করায় এক যুবক দৃঢ় গলায় বলেছিলেন-ভুটানের কোনো মনাস্ট্রিতেই ছবি তোলা অ্যালাউড নয়; কক্ষণো ক্যামেরা নিয়ে ঢুকবেন না। যদিও বাহ্যত বারণ ছিল না, কোথাও অন্ততঃ লেখা ছিল না সেরকম নির্দেশাবলী এবং অনেকেই মনের আনন্দে ছবি তুলেও বেড়াচ্ছিলেন।
    শাক্যমুনির মূর্তির দুপাশেই দেখলাম ব্যালকনি রয়েছে, সেখানে থেকেও যুবক-যুবতীরা উঁকিঝুঁকি মারছে, ছবি তুলছে। ওপরে ওঠার ব্যবস্থা নিশ্চয় রয়েছে, সিঁড়িটা দেখতে পাচ্ছি না , এই যা। স্থানীয় এক ভদ্রলোককে জিগ্গেস করায় দেখিয়ে দিলেন, বললেন-যান , যান, ওপর থেকে অনেক ভালো করে বুদ্ধের মুখ দেখতে পাবেন। সত্যি বটে। তিনতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় বুদ্ধের নিমীলিত চক্ষুদ্বয়। কী অপূর্ব এইসব শিল্পকর্ম, এই মূর্তি, তার আশপাশের অলঙ্করণ, এই পুরো মনাস্ট্রির আর্কিটেকচার, কাঠের কাজ, থাংকা, পেইন্টিং, ম্যুরাল ! জীবনের মত আধো-অন্ধকার রহস্যময় গুম্ফার মধ্যে ভেজানো কাচের জানলা থেকে সোনার আলো এসে পড়ছে, সেই রশ্মি নিজেও দৃশ্যমান, তার মধ্যে অজস্র ধূলিকণা, অজস্র আণুবীক্ষনীক বিচিত্র জীবন । দেয়ালে ঝোলানো জাতক পেন্টিংয়ে সে আলো এসে পড়ছে। জন্মের পর জন্ম কেটে যায়,- কীট জন্ম, পশুজন্ম, পক্ষীজন্ম, অন্ত্যজ জন্ম-হয়তো পরজন্মে বুদ্ধত্ব লাভ হবে।









    মূল মনাস্ট্রি থেকে বেরিয়ে এসে আমরা উল্টোদিকের মিউজিয়ামে ঢুকি। তিব্বতী পোষাক-আষাক, অস্ত্রশস্ত্র, গেরস্থালির জিনিষপত্তর, বাদ্যযন্ত্র এইসবের একটা বড়সড় কালেকশন রয়েছে এখানে। আর রয়েছে বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য ফোটোগ্রাফ। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি যতজন রাষ্ট্রনায়ক তাওয়াং এসেছেন, তাঁদের সকলের তাওয়াং ভ্রমণের ছবি রয়েছে এখানে। চতুর্দশ দলাই লামার চীন থেকে পালিয়ে আসার পরবর্তী ছবি রয়েছে, নেহরুর ছবি রয়েছে অজস্র, রাজীব ও ইন্দিরা, লালবাহাদুর শাস্ত্রী, মোরারজি দেশাই, ভিন্ন ভিন্ন সময়ের রাষ্ট্রপতিবৃন্দ, সেনাপ্রধানেরা-সে এক বিশাল লিস্টি। শুধু ভি পি সিং ও অটলবিহারী বাজপেয়ীর ছবি দেখলাম কিনা মনে করতে পারছি না। আর অবশ্যই নেই চীন যুদ্ধের সময়কার কোনো ছবি, যেন অমন কিছু কখনো ঘটেই নি তাওয়াংয়ে। যদিও চীনের অধিকারে থাকার সময় তাওয়াং মনাস্ট্রির বেশ খানিকটা নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন অবশ্য সেসব ক্ষতির চিহ্নমাত্র নেই।
    সবচেয়ে বেশী ছবি অবশ্য দলাই লামা এবং নেহরুর। দলাই লামা তো বেশ কয়েকবার এখানে এসেছেন, চীনের আপত্তি সত্বেও। এবং নেহরুও তাওয়াং এসেছেন একাধিকবার। একটা গপ্পো মনে পড়ছে নেহরু'র প্রথম তাওয়াং ভ্রমণ নিয়ে, কার বইতে পড়েছি ঠিক মনে করতে পারছি না; সম্ভবতঃ মার্ক টালি।
    তো, নেহরু প্রথম তাওয়াং সফরে এসেছেন, বেশ কিছু জনজাতির মানুষকে সাজিয়েগুজিয়ে তাঁর সামনে হাজির করা হয়েছে। তাওয়াংয়ের এক ট্রাইবাল সর্দারও রয়েছেন। নেহরু সেবার ইন্দিরাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন, ইন্দিরার তখনো বে হয় নি। এদিকে যুবতী ইন্দিরাকে দেখে সর্দারের মাথা ঘুরে গেছে। সর্দার ফিসফিসিয়ে লোক্যাল কোনো অফিসারকে জিগ্গেস করেছেন- হ্যাঁ গা, এ কাদের মেয়ে? অফিসার যথাসাধ্য বুঝিয়ে বলেছেন-ইনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মেয়ে ইন্দিরা নেহরু।
    বংশমর্যাদায় খাটো নয় দেখে সর্দারের তো মনে বল এসেছে। সর্দার গিয়ে সটান নেহরুকে বলে বসেছেন- হ্যাদে ভারতের সর্দার, আমি হলুম গে তাওয়াংয়ের অমুক গোষ্ঠীর সর্দার। তা তোমার মেয়ে তো দেখতে-শুনতে বেশ, মেয়েটিকে আমায় দেবে? আমার ছ'নম্বর বৌ করে রাখবো ! ভালোই খাওয়াবো-পড়াবো, তাছাড়া দেব-থোবও ভালো।

    শুনে তো নেহরু'র প্রায় বিষম লাগার যোগাড়। কিন্তু সামলে উঠে নিজের সহজাত উইট বজায় রেখে ভারতগোষ্ঠীর সর্দার নাকি বলেছিলেন- তা আমায় কেন? আমি কি আর বে করবো? মেয়ে নিজে রাজী আছে কিনা দেখো !

    তারপর কী হইল, তাওয়াং সর্দার তাঁর আঁকুবাঁকু প্রেমপ্রস্তাব হলেও-হতে-পারে প্রণয়িনী'র কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন কিনা, তাতে ইন্দিরা লাজুক বুঁচকী-র মত ঈষৎ রক্তিমাভ "যা! " বলেছিলেন কিনা, সমবেত আফসরগণের চাকরি ঘচাং ফুঃ হয়েছিল কিনা, নাকি সর্দারের উচ্চতা ছ ইঞ্চি ছোট হয়ে গেছিল কিম্বা পাঁচ বৌয়ের মাখন-চা ঘোটার ডান্ডার মৃদু প্রলেপনে তাঁর দুরারোগ্য হাড় মড়মড়ি রোগ ধরেছিল সেসব জানে শুধু শ্যামলাল।

    আমি শুধু মনের গালে হাত দিয়ে ভাবি, সত্যি যদি এমনতরো হত, ইন্দিরা যদি তারপর থেকে সেমিজ আর জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে অহোরাত্র মাখন চা ঘুঁটতেন আর বাকহুইট প্যানকেক বানাতেন, তাহলে ভারত উপমহাদেশটার চেহারা কেমনধারা হত ! বাংলাদেশ যুদ্ধের বা কী অবস্থা হতো আর চারুবাবুর হাঁপানির চিকিচ্ছেরই বা কোনো চীনা দাওয়াই মিলত কিনা। এমার্জেন্সি হত কিনা সন্দেহ, ওটি নাহলে জয়প্রকাশজীরও নাম ফাটত না, তাঁর চ্যালাব্যালাদেরো না। লালুজিরও আর চারা খাওয়া হত না, নীতিশ কোথায় যেতেন কে জানে। পঃ বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, এই নিয়ে কাকা আর আজিজুল হকের মধ্যে কি কোনো অন্তঃপার্টিদ্বন্দ্ব উপস্থিত হত, যা সামলাতে কানুবাবুকে সুদূর দিল্লীর চেয়ারম্যান-ভবন থেকে ছুটে আসতে হতো ! সবচেয়ে বড় কথা রাজীব-সঞ্জয় জন্মাতেন না, বা বলা ভালো -এই নামে জন্মাতেন না।তাঁরা তখন চীনা মিডিয়াম ইস্কুলে পড়াশোনা করে হয়তো নগ্নপদ ডাক্তার ইত্যাদি হতেন, নিরীহ চীনা রোগীদের ধরে ধরে টিকটিকি-আরশোলার স্যুপ গেলাতেন, অনুপান হিসেবে ব্ল্যাক পাণ্ডার হিসিটিসিও খাইয়ে দিয়ে থাকতে পারতেন,কেননা তাওয়াং নিশ্চয়ই ভ্রাতৃপ্রতিম জনপ্রজাতন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী পিপলস্‌ রিপাবলিক অফ চায়নাকে উপহার দিত।
    এখন যাবো তাওয়াং ফেস্টিভ্যালে। মনাস্ট্রিতেই খোঁজ নিয়ে নিয়েছি, নাচ-গান শুরু হয় চারটের দিকে। মানে সাঁঝের ঝোঁকে। অতএব এখন যদি যাই-দুপুর দুপুর রয়েছে-স্টলে টলে ঘুরে কেনাকাটা করে হোটেলে লাঞ্চ সেরে যথেষ্ট সময় থাকবে ফিরে এসে ক্যামেরা তাগ করে বসবার। নাহয় তেমন হলে ওখানেই কোনো খাবার দোকানে খেয়ে নেবো-এক্সোটিক ক্যুইজিন। এক্সোটিক নাচ-গান। কিছুই ছাড়া যাবে না, বাবা!
    ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে কিছুটা নীচে, আর্মি ক্যাম্পাসের মধ্যে আর্মি গ্রাউন্ডে। খানিকটা অবধি গাড়ি যাবে, বাকিটা পদব্রজে। তাই চলো। দেখি পিলপিল করে লোক চলেছে, বাচ্চা-বুড়ো-ছোঁড়াছুঁড়ী(তারাই বেশী)-ছানা বোঁচকায় ঝোলানো মায়েরা। তা, হেঁটে যেতে ভালোই সময় লাগলো। হাঁপ ধরে গেল। গাড়িও তো যাচ্ছে আশপাশ থেকে হুসহাস করে। তারা কী করে ছাড় পেল কে জানে।
    পাহাড়ের ঢালে ফেস্টিভ্যালের আয়োজন। কিছুটা দূর থেকেই মাইকের আওয়াজে মালুম পাওয়া যায়। কিন্তু সে সবই হায়, মসালা হিন্দি গানের সুর। চত্বরটা বেশ বড়। ঘাসহীন লাল মাটির মেলাস্থল। মাঝখানে বড়সড় মঞ্চ। তাকে ঘিরে গোল করে পরপর অজস্র সব স্টল। একটু ছানবিন করতেই ভুলটা ভাঙল। এখানে কোনো আঞ্চলিক নাচ-গানের ব্যবস্থা করা হয় নি। কোনো মুখোশ-নৃত্য, লামা-নৃত্য হবে না। অরুনাচলের অগুন্তি জনজাতির অজস্র ভ্যারিড সংস্কৃতির খোঁজ নিতে হলে এর চেয়ে ভুল জায়গা আর কিছু হয় না। এখানে মুম্বাই বাজারের ছাঁট ও গাদ, ব্যবহৃত হতে হতে শুয়োরের মাংস হয়ে যাওয়া নাচা-গানার আয়োজন বসেছে। আসবেন গুয়াহাটি -ডিব্রুগড় থেকে কিছু ব্রাকেটে বম্বে এবং খুদ মুম্বাইয়ের হাতে গোনা কিছু উঠতি ব্যাঙাচি-ল্যাজ খসে যাওয়ার অপেক্ষায় আপাততঃ যাঁরা দেশের এই সব ফ্রিঞ্জে নেচে-গেয়ে বেড়াচ্ছেন; একবার পুরোদস্তুর ব্যাঙ হয়ে গেলে পর আর এ তল্লাট মাড়াবেন না। তাওয়াংবাসীরা হাঁ করে চেয়ে থাকেন সম্বচ্ছরের এই বিনোদনের জন্য। এই ফেস্টিভ্যাল অতএব, তাওয়াংয়ের লোকেদের নিজেদের দেখার ও শোনার জন্য, অন্যকে দেখানোর ও শোনানোর নয়।
    তিন দফা প্রোগ্রামের প্রধান দফা কাজেই বাদের খাতায়। সুতরাং তাড়াও নেই। ঘুরে-ফিরে হ্যান্ডিক্র্যাফটসের জম্পেশ মার্কেটিং করে ( আমার লোভ মুখোশের ওপরে) , স্থানীয় খানা খেয়ে ধীরেসুস্থে ফিরলেই হলো। কিন্তু সে গুড়েও যে বালি, তা কে জানত ! নাকি পুরো হ্যান্ডিক্র্যাফ্টস সেন্টারই উঠে চলে এসেছে মেলা চত্বরে। এই যদি তার নমুনা হয়, তাহলে তাওয়াং হ্যান্ডিক্র্যাফটসের ওপরে ভক্তি জন্মানোর তেমন কোনো কারণ নেই। ইন ফ্যাক্ট হ্যান্ডিক্র্যাফটস বলতে প্রায় কিছু নেইই। অল্প দু-চারটে স্টলে টিমটিম করছে কিছু পোষাক-আশাক, স্থানীয় টুপি, বাঁশ ও বেতের কিছু ফার্নিচার। কাঠের , পেতলের, পাথরের কাগজের মণ্ডের যে বিপুল ও সুন্দর তিব্বতী শিল্পকর্মের ভাঁড়ার দেখতে পাবো ভেবে গেছিলাম, সেসব কিচ্ছু নেই। তারই মধ্যে বেছেবুছে টুকটাক কিছু গিফট আইটেম, সেঁজুতির একটা সুন্দর স্টোল কেনা হল।
    ঘুরে ঘুরে দেখি। অধিকাংশই খাবার দোকান। লোক্যাল খাবার পাওয়া যায় বটে। নিশি, আপাং, মনপা- বিভিন্ন জনজাতির নিজ নিজ খাবার স্টল। কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারে আমাদের দলের বাকি বড়রা তেমন অ্যাডভেঞ্চারাস নয়। পর্ক তারা খাবে না, যদি মাথায় কেঁচো গজায়! আর লোক্যাল খাবার যদি ধাতে না সয় ! অগত্যা সেই পুরাতন ভেজ মোমো ও এগ চাউমিন, ভাবা যায় ! আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল। একটা সাধও মিটল না। তিনটের একটাও না।
    মেলার মাঠে ঘুরঘুর করছে একটি টিভি চ্যানেলের লোকজন। শিলচর/ ডিব্রুগর বেসড একটি অহমীয়া চ্যানেল, এঁরা নর্থ ইস্টের খবরই পরিবেশন করে থাকেন। একজন কৃষ্ণকলি সুন্দরী ( আহা, বড় মিষ্টি মুখখানি!) মাইক্রোফোন হাতে ঘুরে ঘুরে বাইট নিচ্চেন, পেছনে তাঁর কৃষ্ণতর ক্যামেরাম্যান-গোঁপদাড়ির জঙ্গল-ক্যামেরা তাগ করে রয়েছেন। (এঁদের সঙ্গে আবার ফেরার প্লেনে দেখা হবে গুয়াহাটিতে)। কোনো একটি ট্রাইব্যাল স্টলে দেখলাম খাবারের আস্ত একটি থালি ডিসপ্লে করা আছে,স্টলের স্মার্ট মালিক হেসে হেসে তরুণী সাংবাদিককে অসমিয়া ভাষায় বোঝাচ্ছেন কোনটা কী -ছোট ছোট কলাপাতায় মোড়া ভাতের পিঠা ( মালিক হেসে বললেন, যেমন আপনাদের আসামে পাওয়া যায়, তফাত বিশেষ নাই), বেশ কিছু শ্রাব সহযোগে রান্না মাছের প্রেপারেশন, পর্কের প্রেপারেশন, আর একধরনের মোয়া, দেখে আমাদের জয়নগরের মোয়ার মত লাগলো। কিন্তু সেসব তো বাবু-বিবিরা খাবেন না, যদি বাচ্চাদের সহ্য না হয় !

    একজায়গায় মেলাপ্রাঙ্গনের থেকে একটা গলতামত বেড়িয়ে গেছে, একটু কাদা-জল ময়। সেদিকে আমাদের গিন্নিরা আকৃষ্ট হলেন। এখানে স্টলটল নেই, মাটিতেই প্লাস্টিক বিছিয়ে ঢেলে বিক্কিরি হচ্ছে গয়নাপত্তর, শীতের পোষাক, কম্বল-বালিশ, জুয়া খেলছে লোকজন, ডার্ট বোর্ডে তাক করছে উৎসাহীরা, আর পাহাড়ের খোলা ঢালে কনকনে হাওয়া উপেক্ষা করে বেসনে ডোবানো আলু, পেঁয়াজ, ফুলুরি আর ক্যাপসিকাম ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ে ফেলে ছেঁকে তুলছেন চপের দোকানী ও তাঁর স্ত্রী। এঁরা অনেকে বিহারী। আমরা আলুর চপ আর ক্যাপসিকাম ভাজা খেলাম; এইমাত্র ভেজে তোলা হয়েছে, কিন্তু কনকনে তিব্বতী হাওয়ায় মনে হচ্ছে যেন ফ্রিজে রাখা তেলেভাজা। আমাদের দেখেই দুজন দোকানী চিক্কুর পাড়লেন- আসেন , আসেন, মাল ফুরিয়ে গেলে আর পাবেন না! এঁরা শিলচরের বাঙ্গাল, মেলায় ঝুটো গয়না বিক্কিরি করতে আসেন। বললেন-ডিসেম্বরে আইস্যেন, অ্যাক্কেরে সুইজারল্যাণ্ড।

    মেলায় জুয়ার প্রতাপই বেশী। নানান জায়গায় বোর্ড বসে গেছে জুয়ার, জুয়ারীরা ভনভনে মাছির মত ঘিরে ফেলেছে বোর্ড, , বনবন করে ঘুরছে চাকতি , আর তাদের চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। মালিক চীৎকার করছে তারস্বরে-আসেন আসেন, কুবেরের সম্পদ লুট হয়ে গেল গো , ওঃ-বুক চাপড়ে নিশ্চয় এই কথাই বলছে সে-ভাষা না বুঝলেও দিব্য আন্দাজ করতে পারি। কোথাও ট্রাডিশনাল জুয়া, পাশার মত ছক ফেলে বসে আছে চারজন মানুষ কড়া রোদ্দুরে, বিশাল বড় ডাইস একটি কৌটোর মধ্যে ঝাঁকিয়ে দান ফেলা হচ্ছে। হাবেভাবে বুঝতে পারি এরই মধ্যে বেশ কয়েক পাঁইট চালান হয়ে গেছে পেটে। একটি মেয়ে কাকে ধরে খুব সাধাসাধি করছে কোথায় যেন যাবার জন্য, সে-ও যাবে না- আমাকে দেখে তাকে ছেড়ে খপ করে আমার হাত চেপে ধরে বলল-স্যার, আইয়ে না ! ইকি! কোথায় নিয়ে যেতে চায় সুন্দরী ! হাত ছাড়িয়ে পালাই। একজনকে ছবি তুলতে দেওয়ার অনুরোধ করলে সে এক মনপা বৃদ্ধকে দেখিয়ে দেয়-উও আঙ্কেলকা ফটো খিঁচিয়ে। ট্রাডিশনাল মনপা সাজে সজ্জিত বৃদ্ধ একবার বলতেই রাজি হয়ে যান, হাসিমুখে পোজ দেন যত খুশী।

    মেলা চত্বর


    মনপা দাদু


    রেস্তোরাঁর সামনে মনপা মেয়েরা। এরাই আমাকে পাত্তা না দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছিল।
    পরদিন সকাল সকাল বেরোনো হল সাইট সিইংয়ে , তাওয়াং শহরের বাইরে। তাওয়াং থেকে বেশ দূরে, দুটি লেক দর্শনে-পি টি সো এবং সাঙ্গেসার । ড্রাইভার লিস্ট বের করে দেখালেন, বুম লা যাওয়ার কথা তাঁর লিস্টিতে লেখা আছে, সাঙ্গেসার নেই। আমাদের অবশ্য এমন কোনো লিস্টি হেল্প ট্যুরিজম দেয় নি। বস্তুতঃ এমন একটি লিস্টি যে আছে, তাই জানা ছিল না। কিন্তু আমরা বুম লা যেতে রাজী নই, কেননা ভারত -চীন বর্ডারের এই পাস ১৬৫০০ ফিট উঁচু, সেখানে সাধ করে ভুতের কিল খেতে যেতে ইচ্ছে করে না বাচ্চাদের নিয়ে; তদুপরি সেঁজুতির ১৩০০০ ফিটের সে লা তেই অল্টিচ্যুড সিকনেস হচ্ছিল, বুম লা গেলে না জানি কী হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বুম লা-র রাস্তা অরুনাচলের স্ট্যান্ডার্ডেও খারাপ, অস্যার্থ কোনো রাস্তাই নেই, কেবল বোল্ডার, ফোর-হুইল ড্রাইভ ছাড়া যাওয়া উচিত না এমন কথা ভালুকপং থাকতেই শুনে এসেছি। আর সাঙ্গেসার লেক বুম লা-রই রাস্তায় পড়ে, একটাই রাস্তা যেতে যেতে একটি পয়েন্টে এসে দুভাগ হয়ে দুদিকে চলে যায়, একটি বুম-লা'র দিকে, অন্যটি সাঙ্গেসারের দিকে-সেই পয়েন্টটিকে বলে ওয়াই জাংশন। ও হ্যাঁ, আরো আছে, বুম লা যেতে গেলে আর্মির স্পেশাল পারমিট লাগে, সে আবার সম্পূর্ণ উল্টোদিক যশোবন্তগড় গিয়ে করিয়ে আনতে হয়, তাতে আধবেলা পাক্কা নষ্ট। এইসব সাত-পাঁচ কথায় ড্রাইভার নিমরাজি হলেন।

    একটিই রাস্তা, আবার সে তাওয়াং থেকে ওপরের দিকে চলেছে এবং আশপাশ ক্রমেই বৃক্ষশূন্য হচ্ছে। শুধু যত ওপরে যাচ্ছি রডোডেনড্রনের ঝোপ তত বাড়ছে, বিবর্ণ সবুজ পাতা, এখন ফুল আসার কথা নয়। উচ্চতাজনিত কারণে রডোডেনড্রন এখানে বেঁটে হতে হতে গুল্ম। ছোটবেলায় পড়া রাস্কিন বণ্ডের "গাছের কথা" মনে পড়ছে-তাতে রডোডেনড্রনের এই চেহারা বদলের কথা পড়ে বেশ উত্তেজিত লেগেছিল। পাহাড় ভালোবাসবার সেই বোধ হয় শুরু। রডোডেনড্রনের নামও কি সেই প্রথম জেনেছিলাম? না তার আগেই শেষের কবিতা পড়া হয়ে গিয়েছিল আমার?

    এই রাস্তার আশেপাশে প্রায়ই দেখা মিলবে সেনাছাউনির; আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র, অজস্র বাঙ্কার। পুরো এলাকাটিই ভারতীয় সেনা দিয়ে মোড়া, '৬২র যুদ্ধে অনেক দাম দিয়ে অর্জিত সতর্কতা। রাস্তার দুপাশে দেখতে পাবো একের পর এক লেকও। খয়েরী-কালচে বর্ণ পাথর, লালচে-ছাই রঙা একধরণের ঝোপ, আর রডোডেনড্রনের জঙ্গল। এপ্রিলে দুরন্ত লাগবে বোঝাই যাচ্ছে। এক সময় এসে পৌঁছলাম পি টি সো লেক। পুরো নাম Panga Teng So , লোকের মুখে মুখে ছোট হয়ে পি টি সো হয়ে গেছে। একটি বিস্তৃত সবুজ মিডোর মধ্যে বেশ লম্বা এক লেক। রাস্তা থেকে অনেকটা নীচে নেমে যেতে হয়। আপনি মিডোর মধ্যে দিয়ে ঘাস-জঙ্গল মাড়িয়ে নামতে পারেন, পায়ে ঘাসের ডগায় লেগে থাকা ফ্রস্ট, অচেনা ফুলের রেণু ও সেইসঙ্গে ভাঙা মদের বোতল ও পট্যাটো চিপসের প্যাকেট ঠেকবে। কিম্বা আপনি নির্ঝঞ্জাট বাঁধানো রাস্তা দিয়েও ধাপে ধাপে নেমে আসতে পারেন লেকের কাছে, পসন্দ আপনা আপনা।লেকের পাড়ে একটি ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা রয়েছে। সম্ভবতঃ বোটিয়েংরও বন্দোবস্ত রয়েছে, প্যাডলবোট রয়েছে দেখলাম। কিন্তু আমাদের সময় নেই। যেতে হবে সাঙ্গেসার। এই অসম্ভব নীরবতা ফেলে উঠে আসি। লেকের জল ঘন নীল , তার কোনো হেলদোল নেই। উচ্চতা ১২০০০ ফিট, তাই রোদ্দুরেও শীতবোধ। হাওয়া বয় শনশন, তারারা নিশ্চয়ই কাঁপে রাত্তিরে।উঁচু কোনো এলিফ্যান্ট ঘাসের জঙ্গল নেই যে, সে হাওয়ার ঝমরঝম আওয়াজ শুনতে পাবো। নীরবতা, নীরবতা। মনুষ্যহীন নীরবতা।


    পি টি সো লেক।
    এবার চলেছি লেক সাঙ্গেসারের দিকে। এই জায়গাটা এককালে ছিল চারণভূমি, পাশের গ্রামের লোকেরা গরুবাছুর চরাতে আসত পাইনে ছাওয়া এই সবুজ মিডোতে, যাকে আমরা এখন সাঙ্গেসার লেক বলে চিনি। ১৯৭৩ সালের এক ভূমিকম্পের পর এক বিশাল পাহাড়ী ধস নেমে এসে এই মিডোর মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ঝর্নার পথ আটকে দেয়-পাইনবনের মধ্যে রাতারাতি গজিয়ে ওঠে একটি লেক। পাইন গাছেদের পাতা ঝরে যায়, রস মরে যায়, কিন্তু তাদের কঙ্কালেরা জেগে থাকে এখানে-ওখানে-গোটা লেক জুড়ে। এখনো তারা সেভাবেই জেগে আছে তিনদিক পাহাড়ে ঢাকা এই নীল জলরাশির মধ্যে; পাইনবনের আত্মা পাহারা দিচ্ছে এই জলপ্রকৃতিকে, তার গাছপালা,মাছ-কাঁকড়া, পাখ-পাখালিকে।
    অনেক ওপরের রাস্তা থেকে দেখতে পাওয়া যায় পাইনকঙ্কালশোভিত এই অনুপম লেকটিকে। বেশ খানিকটা খাড়া নেমে যেতে হয় গাড়িকে, সাঙ্গেসার লেকের কাছে পৌঁছনোর জন্য। সে পথের সৌন্দর্য লিখে বোঝানো মুশকিল। এলাকাটি আর্মিশাসিত, আর্মি ব্যারাক রয়েছে সাঙ্গেসার লেকের কাছে। একটি কফিশপ রয়েছে লেকের পাশেই। রয়েছে একটি লগকেবিন।এবং লেকের মধ্যে খানিকটা অবধি এগিয়ে গেছে দড়িতে বাঁধা ঈষৎ নড়বড়ে একটি কাঠের সাঁকো, আরোহীকে কিছুটা রোমাঞ্চে দুলিয়ে সে নিয়ে যাবে ছাউনি দেওয়া একটি কাঠের প্ল্যাটফর্মে। এখানে দাঁড়িয়ে পায়ের নীচে জল, চারিদিকে জল। নীরবতা। নিষ্পত্র মৃত পাইনবনের সশাখ বিস্তার, ভুতুড়ে কাকতাড়ুয়ার মত,ইয়েরি।

    প্রচুর পাখি রয়েছে এখানে। বার্ডারের সুখস্বপ্ন। গাড়ি থেকে নামতেই সেঁজুতি বলল-ঐ দ্যাখ, দুটো বড় পাখি-বলে লেকের পাড়ে দুটো হলদেটে পাথরের দিকে আঙুল দেখালো। ধ্যাত,পাখী না আরো কিছু , পাথর!-বলতে না বলতেই তারা হেলেদুলে রওনা দিল জলের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরাধারী যে যেখানে ছিল, ছুটল তাদের পেছনে। আর কি পাখি থাকে? তাদের চ্যাটালো পা ফেলে থপ থপ করতে করতে তারা ততক্ষণে জলে নেমে পড়েছে, খুব মসৃণ তাদের জল কেটে চলা। রাডি শেলডাক বা ব্রাহ্মিনি শেলডাক, বাংলায় এদেরই চখা-চখী বলে। জলের ধারে আরো ঘোরাফেরা করছে হোয়াইট ওয়াগটেল বা খঞ্জনা-গেঁড়ি-গুগলি, পোকামাকড়ের খোঁজে রয়েছে নিশ্চয়। পাড় ধরে ধরে বেশ কিছুটা দূর এগিয়ে গিয়েও তাদের তেমন প্রেজেন্টেবল ছবি পাওয়া গেল না। হাঁটতে গিয়ে দেখা গেল লেকের পাড়ে যে জঙ্গল, তার তলায় মাটি যেমন mossy , তেমনই জোলো, ভুসভুসে স্পঞ্জের মত-মাঝেমধ্যেই গোড়ালি অবধি জলে ডুবে যাচ্ছে, সাবধানে এদিকওদিক দেখে আশপাশের পাথর কিম্বা গাছের গুঁড়িতে পা রেখে চলতে হচ্ছে।

    ছোটখাটো একটা জঙ্গল লেকের ধারে। উঁচু উঁচু গাছ যেমন, তেমনি অজস্র ঝোপঝাড়।গাছেদের ডাল থেকে ঝুলছে বুড়োর দাড়ি লাইকেন। এখান থেকে , ওখান থেকে পাখীদের ডাক ভেসে আসছে, তারা আমার কানে অচেনা। কিন্তু অনেকক্ষণ তাক করে থেকেও তাদের ধরা যাচ্ছে না ক্যামেরায়। ঘাড় গুঁজে বসে থেকে থেকে যখন ঘাড়ে-কোমরে ব্যথা, উঠতে গিয়েই দেখি, হাতের কাছেই এক অচিন পাখী। এতক্ষণ আচ্ছাসে স্নান সেরে এখন সে ডানার জল ঝাড়তে ও মাথার পালক শুকোতে ব্যস্ত, আমাকে সে কেন জানিনা পাত্তাই দিল না মোটে। দিব্য ছবি তোলা হল তার, অনেকক্ষণ ধরে পোজ দিল সে। পরে কলকাতা ফিরে ইমরানের দাদার সাহায্যে তার আইডি উদ্ধার কারা গেছিল-হোয়াইট থ্রোটেড/ইউরোপীয়ান ডিপার। নরওয়ের জাতীয় পাখী এরা।
    আরো দেখলাম অজস্র গ্রীন ব্যাকড টিট, ঝুঁটিওলা ইয়েলো টিট ( আহা, ছবি তোলা গেল না), রেড ভেন্টেড ও রেড হুইস্কার্ড বুলবুল, আর কিসব নাম-না-জানা পক্ষী। একটু বুড়ো-হয়ে যাওয়া সকালের রোদ্দুর, পাখীর ডাক, ঝর্নার ঝরঝর-এই সবকিছুর জন্য, সাঙ্গেসার লেকের জন্য তাওয়াং আসা সার্থক হল আমার। অনেকখানি পরমায়ু বেড়ে গেল।

    সময় থাকলে আরো খানিকক্ষণ বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো যেত, ধৈর্যের পুরস্কার হিসেবে আর কয়েকটা ছবি আসত-কিন্তু ফেরার তাড়া। সাথীরা সব ডাকাডাকি করছে। অগত্যা কফিশপের কাছে ফিরে যাওয়া, কফি ও মোমো খাওয়ার রিচুয়াল পালন। বলতে ভুলেছি, মনস্বিনীরাও এ যাত্রায় আমাদের সঙ্গী, তাদের গাড়ি আমাদের পেছন পেছন এসেছে আজকে। তাদের ড্রাইভার একেবারেই তালকানা, তাওয়াং সে আগে আসে নি কক্ষণো, এখানকার রাস্তাঘাট কিচ্ছু সে চেনে না, আসার দিন হোটেল চিনতে না পেরে বেচারা মনস্বিনীদের পাক্কা দুটি ঘন্টা বাড়তি ঘুরিয়ে মেরেছে। দশ ঘন্টার ওপর আরো দু ঘন্টা! খিদে-তেষ্টায় ওদের মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

    এখানে একটা গোটা দিন কাটাতে পারলে খুব খুশী হতাম। কিন্তু সাঙ্গেসার লেকের কাছে থাকার কোনো বন্দোবস্ত নেই, হায়! ভালো কথা, এই লেকের অরেক নাম মাধুরী লেক। কোয়লা ফিল্মের শ্যুটিং হয়েছিল এখানে, যাঁরা ফিল্মটি দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয় জানেন এই লেকের পাড়ে মাধুরী দীক্ষিত মহাশয়ার একটি নাচের সিকোয়েন্স আছে। আমি দেখি নি, অগত্যা জানিও না। কিন্তু এত ভালো একটা নাম থাকতে খামোখা একে মাধুরী লেক বলে ডাকতে আমার বিলক্ষণ আপত্তি আছে, সেকথা এখানে জানিয়ে গেলাম।






    হোয়াইট থ্রোটেড ডিপার


    গ্রীন-ব্যাকড টিট। এ যাত্রায় নয়, সিল্ক রোড ভ্রমণের সময় তোলা। ২০১৩র মার্চে।

    তাওয়াং শহরে ফিরে মনস্বিনীরা ড্যাং ড্যাং করে অ্যানি গুম্ফা দেখতে চলে গেল। আমাদের পোড়া কপাল, আমাদের ড্রাইভার রাজী হলেন, না, তাঁর তেলের বরাদ্দ বাঁধা, তার বাইরে তিনি এক চাকাও নড়বেন না। অ্যানি বলা হয় মেয়ে লামাদের; খুব অল্প বয়স থেকেই, কখনো শিশুবেলা থেকেই মেয়েরা লামা হতে চলে আসে বিভিন্ন অ্যানি গুম্ফায়। কারণটা ছেলেদের বেলায় যেমন, মেয়েদের বেলাতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাই। দারিদ্র। তাওয়াংয়ের আশপাশে অনেকগুলি এরকম অ্যানি গুম্ফা রয়েছে, ওঁরা গেলেন শহরের সবচেয়ে কাছাকাছি গুম্ফাটিতে। নবনীতা দেবসেনও সম্ভবতঃ এটিতেই গিয়েছিলেন এবং সেখানে এক অনিন্দ্যসুন্দরী অ্যানির সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছিল, যে, যদ্দূর মনে পড়ছে ধর্মের টানেই অ্যানি হয়েছিল, পেটের টানে নয়। মেয়েদের এইসব মনাস্টারিগুলোর অবস্থা শুনেছি বেশ করুণ, ভিক্ষা ও দানে চলে, পুরুষদের মনাস্ট্রির মত নয়। তবে যাই হোক, দুবেলা খেতে পায়, সে খাবার যেমনই হোক না কেন। বাড়িতে থাকলে তাও পেত না। মনস্বিনী বেশ ভালো ভালো ছবি তুলে এনেছিল এই গুম্ফা ও তার অ্যানিদের।
    আমরা বরং খেতে গেলাম ওল্ড মার্কেটের একটি রেস্তোরাঁয়, ড্রাইভার বললেন এটি এখানকার সবচেয়ে ভালো রেস্তোরাঁ ।এখানেও সেই কনভেনশনাল খাবার, একটু বৈচিত্র বাড়াতে আমি ও সেঁজুতি চপ-সুয়ের অর্ডার দিলাম। মাংসর পদ যা যা এল, সকলি গোলাপী রংয়ের , মনে হল দুধে-আলতায় মিলিয়ে রান্না করা হয়েছে। গ্রেভিহীন মাংসেও ওপরের কোটিংটি গোলাপী, খেতে একটু দানা-দানা, টক-ঝাল-মিষ্টি-নোনতা,খারাপ নয়। কিন্তু বৈচিত্রের এই ধাক্কার জন্য রেডি ছিলাম না, বলাই বাহুল্য। মনে হচ্ছিল আধ কাঁচা মুরগী চিবিয়ে খাচ্ছি, তার অল্টার্ড রক্ত মুখ বেয়ে পড়ছে। খেতে খারাপ না হলেও একটু ঘেন্না ঘেন্না মতম লাগছিল। জিগ্গেস করাতে বলল-ওটা একটা বিশেষ মিক্স মশালা দিয়ে রান্না বলে ঐরকম রং; তবে আমরা চাইলে ওটা বাদ দিয়েও রেঁধে দিতে পারে। সেই তো ভালো ছিল, পাশের টেবিলের জওয়ানরা তো দিব্যি ঐসব বাদ দিয়েই খাচ্ছিল, তাদের খাবার দেখে জিভে জলও এসে গেছিল; তবে এ বিড়ম্বনা, বিধি, কেন হে আমারে ! চীনদেশী মিক্স বলে মনে হয়, আর কয়েক পা এগোলেই তো চীনে গিয়ে পড়ব!

    খানাদানার পরে একটু মার্কেটিং, সেঁজুতিরা বেশ কিছু গিফট আইটেম কিনল; আমাদের ওসব বালাই নেই, টুংকাইয়ের জ্যাকেটের বোতাম ছিঁড়ে গেছে, ওর জন্য একটা জ্যাকেট কেনা হল। বিস্তর দরাদরি করে ১৮০০ টাকায় রফা হল, গজকুমারে এর অনেক কম দামে আরো ভালো জ্যাকেট কেনা যেত বলে বিশ্বাস। কিন্তু এও নাকি চীনা মাল, অনেক পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে গাধার পিঠে চড়িয়ে আনতে হয় বলে দাম বেশী; নাকি বেশীও নয়, দোকানদার ছেলেটি দোকান বেচে দিয়ে সুইটজারল্যান্ড চলে যাবে বলে আমাদের এত সস্তায় দিয়ে দিল।
    এবার চলেছি দিরাং। আসার সময় এই রাস্তা দিয়েই এসেছি, আমাদের হোটেলটাও দেখে নিয়েছি। রাস্তার ধারেই, দিরাং শহর থেকে বাইরে, ওপর থেকে দিরাং নদী দেখতে পাওয়া যায়। পাশেই জঙ্গলমত রয়েছে, কাজেই পাখী পাওয়া উচিত।

    হোটেলের নাম পেমালিং। গিয়ে পৌঁছলাম দুপুর পেরিয়ে। মূল রাস্তা থেকে আর একটা এলিভেশন, তার ওপরে হোটেল। পৌঁছে দিল একদম তর হয়ে গেল। অনেককাল আগে কাজিরঙ্গায় আসাম ট্যুরিজমের প্রশান্তি কটেজে ঢুকে মনে এইরকম স্নিগ্ধতা জেগেছিল। দু-জায়গাতেই অনেকটা ট্রাভেল করে গিয়ে হোটেলে পৌঁছে এইরকম শান্তিময় অ্যাম্বিয়েন্স পেয়েছিলাম। হোটেলের সামনে ঘাসে মোড়া লন, সেখান থেকে নীচের দিরাং নদী অনেক দূর অবধি দেখা যাচ্ছে। দুপাশে মেলা রয়েছে দিরাং শহর। ঘরবাড়ি, সরু সরু ফিতের মত রাস্তা, সেই রাস্তা দিয়ে পিঁপড়ের মত গাড়ি যাচ্ছে। আয়েস করে এইসব দেখছি লনে চেয়ার পেতে বসে। ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। চায়ের অর্ডার দিয়ে এলে শ্রীময়ী এক কন্যা এসে আমাদের খুঁজেপেতে চা দিয়ে যায়। তাকে কেউ বলে নি, আমরা লনে বসে আছি। মেয়েটির মুখে মঙ্গোলয়েড ভাব কম, সম্ভবতঃ সে তিব্বতী নয়, অসমীয়া হতে পারে। পরে দেখলাম সে-ই রান্নাঘরের রাণী; যেমন চটপটে , তেমনি কুশলী, কাজে কোনো ভুল নেই। তার আতিথ্য ভালো লাগে।
    চারতলা এই হোটেল, এর কিচেন কাম ডাইনিং হলটি বিশাল বড়। সেটি ওপরে , দোতলা কি তিনতলায় ; কিন্তু পাহাড়ী বাড়ি হওয়ার সুবাদে ডাইনিং হলের ঠিক পেছনেই আর একটি সুন্দর তকতকে ঘাসের লন, তাতে রকমারি ফুলের ঝাড়।চোর্তেনের আকারের একটি ছোট আগুন -জ্বালবার জায়গা, তাতে পোড়া-আধপোড়া ঝাউয়ের ডাল গোঁজা আছে, হালকা সুগন্ধ আসছে সেখান থেকে। লনের ঠিক পেছনে কাঁটাতারের বেড়া, ওপাশে আরো ওপরে উঠে গেছে পাহাড়, তার ঢালে আপেল গাছ, পাইন গাছ; গাছপালার ফাঁকে একটি সাজানো বাড়ি উঁকি দিচ্ছে। জানা গেল , সেটি একটি মনাস্টারি। হোক, আমার যাওয়ার আগ্রহ নেই। ডাইনিং হলে জানলার ধারে চেয়ার টেনে নিয়ে বসে থাকতে ভালো লাগে, কাচের আড়াল থেকে দেখি রোদ পড়ে আসছে, ছায়া ঘনিয়ে আসছে দিরাং নদীর বুকে। নীচে নেমে আসি, তাজা হাওয়া লাগুক , ঘাসে পা মেলে দিই। বেশীক্ষণ থাকা যায় না, কী এক ধরণের পোকা অনেকগুলো একসঙ্গে হিংস্রভাবে পায়ে ছেঁকে ধরে কামড়ায়। হোটেলের লোক বলে , এদের কী যেন একটা নাম-ডামডিমা না কী। নাকি কিছু হয়টয় না, রাত হলে এরা চলেও যায়। জানিনা কিছু হয় কিনা, কিন্তু কামড়ের দাগ আমার আর রাত্তিরের পায়ে এখনো অবধি রয়েছে; গোটাগুলো এই সবে মিলিয়েছে,কিছুদিন আগে অবধিও খুব চুলকোতো।

    রাত নেমে এলে দিরাং শহরের আলো জ্বলে ওঠে কালো নদীর দুপাশে মণি-মুক্তার মত। খুব বড় পাহাড়ী শহর নয়, তাই গ্যাংটক কিম্বা শিলংয়ের মত অত ঝলমল করে না। ঠাণ্ডা পড়ছে, আমরা হোটেলের মধ্যে ঢুকে আসি। লাউঞ্জে বসে আড্ডা চলছে। ঘুম পায়, হাই ওঠে। হোটেলের ছোট লাইব্রেরির ছোটখাটো বইয়ের কালেকশন। বইয়ের পাতা ওল্টানোর চেষ্টা করি, চোখ জড়িয়ে আসে।

    দিরাং নদী ও দিরাং শহর।


    হোটেল পেমালিং।
    খুব ভোরভোর উঠে যাই। সাড়ে-সাতটা-আটটার মধ্যে বেরোতে হবে। এইটুকুই আমার পাখী শিকারের সময়। হোটেলের মুখটা কোনদিকে জানি না। যদি পূবদিক হয় তাহলে দুর্দান্ত সূর্যোদয়ের ছবি হয় বিশাল আকাশ, দুদিকে মেলে দেওয়া পাহাড় আর নীচের নদী ও শহর নিয়ে। কিন্তু সে গুড়ে বালি দিয়ে সূর্য ওঠে আমার ডানদিকে। ভোরের নীলচে ছায়া-ছায়া ঠাণ্ডার মধ্যে কমলা হয়ে ওঠে ডানদিকের আকাশ। নীরবতা কমলাময়, ধীরে ধীরে সে উষ্ণ হয়ে উঠছে। হাসপাতালের রোগীর বিছানার পাশে টিনের কাবার্ডে রাখা শুকিয়ে হিম কমলালেবু নয়, শীতের দুপুরে আলসে মেয়েলী কোল থেকে গড়িয়ে পড়া কমলা রংয়ের উলের বল। তাকে নিয়ে খেলছে একটি নীলচে বেড়াল।

    পাখীরা জেগে উঠছে গাছে -গাছে, ঝোপে-ঝাড়ে। আমার ঠিক সামনেই নীচের রাস্তার ওপাশে একটি ফলন্ত গাছ, তাতে প্রচুর ছোট ছোট পাখী। ভোরে উঠেই খাবারের খোঁজ শুরু হয়ে গেছে। আর একটু কাছে গিয়ে তাদের ক্যামেরার পাল্লায় আনার আমার মানবিক সাধ কেমন করে যেন জেনে যায় পাখীরা, দল বেঁধে উড়ে যায় অন্য গাছে, অন্য অন্য ঝোপে। খুব ধীরে ধীরে, যেন কিছুই জানি না এমনি মুখ করে প্রাতঃভ্রমণের ছলে তাদের ধরতে যাই, বারে বারে তারা বুঝে ফেলে। বারে বারে উড়ে যায়। রাস্তায় অল্প কিছু প্রাতঃভ্রমণকারী। গাড়ি চলাচল শুরু হয়ে গেছে। অনেক ক্ষণের চেষ্টায় কিছু ছবি ওঠে। তেমন ভালো কিছু নয়। ওরিয়েন্টাল হোয়াইট আইয়ের একটা ঝাঁক। কিছুক্ষণ পরেই ক্যাংক ক্যাংক আওয়াজ করে কর্কশকণ্ঠী একটি কাকের মত পক্ষী ঝাউগাছের মগডালে উড়ে এসে বসে। রোদ্দুর পড়ে তাকে কালো দেখাচ্ছে। গ্রে ট্রিপাই। বাংলায় অবশ্য এর জন্য কোনো আলাদা নাম বরাদ্দ নেই, সকল ট্রিপাইকেই হাঁড়িচাঁচা বলে ডাকা হয়।
    এবার ফিরতে হবে। নাস্তা খেয়ে বেরোতে হয়। হোটেলের সামনে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। একজন সাহেব গাড়ি গোছাচ্ছেন, র‌্যাফটিং করতে এসেছেন। গাড়ির পেছনে তাঁর র‌্যাফটটিকে বাঁধাছাঁদা করা হচ্ছে। আরো দুয়েকটি দল আজ বেরিয়ে যাবে। এই ভোরবেলাকে ছেড়ে যেতে মায়া হয়। দিরাংকে ভালো লেগেছে। আবার কবে এখানে ফিরবো জানি না; আদৌ ফিরব কি? অনেকদিন বাদে হয়তো ফিরে আসতেও পারি। তবে তখন নিশ্চিত এইসব পাখীরা অনেকেই থাকবে না। শহর বাড়বে, নতুন হাইডেল পাওয়ার প্রজেক্ট হবে; জনপদ আরো ঘিঞ্জি হয়ে উঠবে। কাঞ্চনজঙ্ঘার পাহাড়ী সান্যাল মনে পড়ে যান-"এই যে tests হচ্ছে- nuclear tests -আকাশ সব বিন্দু বিন্দু বিষাক্ত radiation -এ ভরে যাচ্ছে ..... একবার হয়তো গিয়ে দেখব পাখিগুলো আর আসেনি।'আসেনি কেননা হয়তো মাথার গোলমালে তারা পথ ভুলে গেছে, কিংবা " what's even worse হয়তো মাঝরাস্তায় মরে গিয়ে টুপটুপ করে বৃষ্টির ফোঁটার মত ....."

    এই সাতসকালে পাহাড়ী সান্যাল ফিরে ফিরে আসতে থাকেন। এই হোয়াইট আইদের ঝাঁকের মধ্যে তাঁকে বসে থাকতে দেখি আরামকেদারায়। শুক্লকেশ প্রশান্ত এক বৃদ্ধ। আনমনে গাইছেন- "সে ডাকে আমারে/ বিনা সে সখারে, রহিতে মন নারে"। আর পাখীরা তাঁর মাথায়, কাঁধে, কোলে উড়ে উড়ে এসে বসছে। রাগ ভৈরবীর নিরাময় ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ে পাহাড়ে-'প্রভাতে যারে দেখিবে বলি / দ্বার খোলে কুসুমকলি/কুঞ্জে ফুকারে অলি / যাহারে বারেবারে"। মৃত্যু তাঁকে ছুঁতে পারে না, বিচ্ছেদ ও অপমান ছুঁতে পারে না। এই আলোময় সকাল পাখীদের। মধ্যরাত দামাল অশ্বের, মাতাল সান্তাল ট্যুইস্টের। কিন্তু সকালটি পাখীদের। দিরাং নদীর। ভবানী দয়ানি গানের। সে ডাকে আমারে। সব কাজ ফেলে তার পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। তখন আর কোনো কনফেশনের দরকার পড়ে না। মুখ ফুটে বলতে হয় না- আজ আমার মন ভালো নেই। তার প্রেমের ধারা বহিছে শতধারে। সে সখা। সখা ও সুশ্রুষা।

    দিরাংয়ের ভোর।

    ওরিয়েন্টাল হোয়াইট আই।

    গ্রে ট্রিপাই।
    অরুনাচলকে টা টা বলবার সময় এসে গেল। ভ্রমণের শেষপর্বে একটি দিন আমরা থাকবো নামেরিতে। নামেরি আসামের একটি ন্যাশনাল পার্ক, আসাম-অরুনাচল বর্ডারের কাছে; ভালুকপং থেকে ঘন্টাখানেকের দূরত্ব। এই জঙ্গল বিখ্যাত তার পাখিদের জন্য। জন্তু-জানোয়ারও আছে, বাঘ পর্যন্ত, যদিও তাদের দেখা পাওয়া দুষ্কর। তবে হাতি ও নানা প্রজাতির হরিণের দেখা পাওয়া যায় মাঝে-সাঝে। নামেরির মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে জিয়া ভরেলি নদী। নামেরিতে গিয়ে আমরা থাকবো ইকো ক্যাম্পে। কপাল ভালো থাকলে শীতের পরিযায়ী পাখিদের দেখা মিললেও মিলতে পারে। নামেরির আইবিস বিল কিম্বা হোয়াইট উইঙ্গড উড ডাক।

    বেরোতে দেরী হয়ে গেল। পৌঁছতে পৌঁছতে আলো মরে গেলেই ব্যাস, আজকের দিনের খেল খতম। জঙ্গলে আর যাওয়া হবে না। পড়ে থাকবে শুধু পরদিন ভোর বেলা। আমি তাই বেশ বিমর্ষ। ড্রাইভার সায়েবকে মনে মনে গালাগাল দিচ্ছি।
    টেঙ্গা অবধি জঘন্য রাস্তা। টেঙ্গায় নেমে চা-টা খাওয়া হল। সামনের সিটের শিশু-দামড়া কম্বো বদলাবদলি হল। টেঙ্গার পর থেকে রাস্তা চলেবল। এবং রাস্তার আশপাশ ঘন সবুজ হয়ে উঠছে ক্রমেই। আমরা ঢুকে পড়েছি সেসা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির মধ্যে। ভালুকপম -বমডিলা হাইওয়ে চলেছে ঘন বাঁশবন-রাক্ষুসে ফার্ণ-বার্চ-ফার এবং আরো অজস্র নাম-না-জানা গাছপালার দঙ্গলের মধ্য দিয়ে। অনেক নীচে বয়ে চলেছে টিপি নদী, সে-ও গিয়ে মিশবে জিয়া ভরেলিতে। যদিও এই সেই স্থান , মেঘ-কুয়াশার জন্য প্রখ্যাত, কিন্তু এবার আর আমাদের মাথার ওপর মেঘ -কুয়াশা ঝুলে নেই।জঙ্গলকে এবার তাই আরো ভালো করে দেখতে পাচ্ছি, আসার সময় আলো-আঁধারিতে ঢাকা ছিল। এই জায়গাটির সৌন্দর্য অদ্ভুত। শুধু এই জায়গার জন্যই অরুনাচল আসা সার্থক। হায় , সেসাতে থাকা হল না। সেসার বিখ্যাত অর্কিড দেখা হল না। রাস্তায় পড়বে ঈগল নেস্ট স্যাংচুয়ারি, সেটি আসলে একই জঙ্গলের কন্টিন্যুশন। সে-ও খুব বিখ্যাত তার পাখীর জন্য। সেখানেও আমরা থাকবো না। এক যাত্রায় আর কতই বা ঘোরা যায় !
    ঈগল নেস্টের কথায় বুগুন লিওচিচলার কথা আসবেই। গত ৬০ বছরের মধ্যে ভারত থেকে একমাত্র এই একটি প্রজাতির পাখিই আবিষ্কৃত হয়েছে। আবিষ্কার করেছেন রামানা আত্রেয়, ২০০৬ সালে ; ইনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পাখী দেখা এঁর শখ। এই এলাকাটি বুগুন জনজাতির মানুষেরা দেখাশোনা করেন, তাই তাদের নামেই পাখীটির নাম দেওয়া হয়েছে। আজ পর্যন্ত মাত্র তিনজোড়া লিওচিচলা নাকি দেখা গেছে।

    যেতে যেতে হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ শুনে চমকে উঠি। ড্রাইভার সামনের দিকে আঙুল দেখান । একটি হুডখোলা জিপ যাচ্ছে, তাতে বেশ কিছু যুবক। এদের একজনের হাতে বন্দুক, সম্ভবতঃ দেশী। অন্য একজনের হাতে লম্বা কাটারি ধরণের একটা কোনো অস্ত্র। এরা শিকারে চলেছে। গুলি ছোঁড়ার পর থেমে দাঁড়িয়ে দেখছে , গুলি লেগেছে কিনা। কী শিকার করছে ওরা? গুলি লাগলেও শিকার -হওয়া জন্তু কিম্বা পাখীকে উদ্ধার করবে কী করে? জঙ্গল তো অনেক নীচে নেমে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে, সেখানে পৌঁছবে কী করে? আদিবাসী জীবনধারায় শিকার তাহলে এখনো বেশ খোলামেলা ভাবেই রয়েছে ! সরকার কেমন চোখে এ ব্যাপারটা দেখে কে জানে ! বাচ্চারা খুব উত্তেজিত ও দুঃখিত-জন্তুজানোয়ারদের কথা ভেবে।

    আগে আগে চলেছে জিপটা, অনেকক্ষণ ধরে। বেশ স্পীডে। হঠাৎ আমার চোখ পড়ে যায় রাস্তার বাঁদিকে। জঙ্গলের মধ্যে রাস্তার ঠিক পাশেই এক বিশালকায় গাছ। তার গুঁড়ি বেয়ে লাফ দিয়ে উঠে এল এক ঝাঁপালো লেজওলা বাদামী রংয়ের জন্তু। মালাবার জায়েন্ট স্কুইরেল ! এতক্ষণ নিশ্চয় লুকিয়েছিল শিকারীদের ভয়ে। এবার বের হয়েছে জিপ চলে যেতেই। ড্রাইভার বলেন-ওদের চোখে পড়লে মেরে পুড়িয়ে খেয়ে নিত।
    যাক, অন্ততঃ একখানা জন্তু দেখা হল জঙ্গলের।


    নামেরিতে আসার রাস্তায় টুংকাই জিগ্গেস করছিল-আমরা কি টেন্টে থাকবো? টেন্টে থাকার ব্যাপারে ওর অসীম উৎসাহ। বেচারা কোনোদিন টেন্টে থাকেনি। (ওর বাবা-মা-ও অবশ্য থাকে নি। একবার মানালি থেকে মনিকরণ যাওয়ার পথে ভুন্টার পেরিয়ে পার্বতী নদীর পাড়ে ক'টি টেন্ট দেখে প্রবল থাকার ইচ্ছে হয়েছিল।) আমি বললাম-না না, টেন্ট নয়, আমরা থাকবো কাঠের ঘরে। অ্যাপোলোর অনিরুদ্ধদা'র ছবি দেখে সেইরকমই ইমপ্রেশন হয়েছিল।
    পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ দেরী হয়ে গেল। ৩টে বেজে গেল। কিন্তু যেটা আরো চিন্তার, আকাশ বেশ মেঘলা হয়ে এসেছে আসাম পৌঁছনোর পরেই। তখনো যে বাংলা-ওড়িশা জুড়ে নিম্নচাপের তাণ্ডব চলছে সে খবর পেয়েছি । কিন্তু তা যে এখনও আসামে জাঁকিয়ে আছে , সেটা আঁচ করতে পারি নি। অতএব একটা মিনিট পঁয়তাল্লিশের জঙ্গল ভ্রমণ ম্যানেজ করতে পারলেও খুব একটা যে পাখপাখালি দেখতে পাবো সেরকম আশা হল না। মনটা সেই ভার হয়েই থাকলো।
    কিন্তু নামেরি ইকো ক্যাম্প দেখে একটুখানি মন ভালো হল। হাইওয়ে ছেড়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বেশ খানিকটা যেতে হল গাড়িকে। জঙ্গলের এপাশে ধানের ক্ষেত, গ্রাম। মাটির বাড়ি, ধান শুকোতে দেওয়া, শান্ত মুখের মেয়েরা, জবা গাছ। বাংলার গ্রামের থেকে কোথায় আলাদা খুঁজে পেলাম না। অসমীয়াদের সাথে বাংলার কত যে মিল ! তবু কেন যে এত ঈর্ষা, জাতিবৈর, খুনোখুনি।
    কিছুদূর যেতে জঙ্গল পাতলা হয়ে আসে। খেলার মাঠ, বাড়িঘর বাড়তে থাকে। জঙ্গলের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ জাগে। তারপর একসময় আবার কিছু গাছপালা ঘন হয়। একটি সরু মেটে পথ দিয়ে গাড়ি এসে ইকো ক্যাম্পের সামনে দাঁড়ায়। এইখান থেকে জঙ্গলের শুরু। এ হল জঙ্গলের সীমানা, এর অন্য পাশে মানুষের বসতি।যেমনটা দেখেছিলাম গরুমারাতে, এলিফ্যান্ট ক্যাম্পে যখন ছিলাম। ভারতবর্ষের সব জঙ্গলেই যেমন।

    নামেরি ইকো ক্যাম্প আসাম ভরেলি অ্যাঙ্গলার'স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পত্তি। একটা ছোটখাটো সবুজ মাঠের চারপাশ ঘিরে অ্যাকোমোডেশনের ব্যবস্থা। পিছনে জঙ্গল, প্রাঙ্গনটিও বড় বড় গাছে ভর্তি। মাঠের মাঝখানেও রয়েছে বেশ কিছু গাছ। তার নিচে কাঠ-কুটোর ভস্মাবশেষ, ক্যাম্প ফায়ারের ব্যবস্থা। তার পাশে কাঠের বসার জায়গা। চেয়ার, মসৃণ করে কাটা গুঁড়ি। উঁচু গাছের ডালে কাঠ দিয়ে বানানো পাখীর ঘর। ব্যবস্থা দেখে বেশ চমৎকৃত হলাম।অল্প কিছু কটেজ আছে বটে, কিন্তু অধিকাংশই থ্যাচড টেন্ট। সামনেটা টেন্ট, পেছনে সিমেন্টের একটা স্ট্রাকচার, তাতে একটা ঘর, জিনিষপত্তর রাখবার, পোষাক বদলানোর; সঙ্গে অ্যাটাচড বাথ।বেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। তবে যে নেটে এদের নামে বেশ নিন্দেমন্দ পড়ে এলাম? যারা লিখেছে, তারা অবশ্য বিদেশী, ভারতীয় মানের পরিচ্ছন্নতা দিয়ে এদের খুশী করা কঠিন।
    টেন্টেই থাকা হচ্ছে তাহলে! টুংকাই-রোদ্দুর খুব খুশী, তাদের বাবা-মা'রাও। দেবর্ষি যদিও প্রায়ই টেন্টে থাকে, হাই অল্টিচ্যুড ট্রেক করতে গিয়ে। ওর কাছে নতুন অভিজ্ঞতা কিছু নয়। এদের রিসেপশন আর রেস্তোরাঁও বেশ মনের মত হল আমার। রেস্তোরাঁর মেঝেটি মাটির, তকতকে করে নিকোনো। ওপরে শনের ছাউনি, বাঁশ ও কাঠের পিলার। বেতের ডাইনিং টেবিল-চেয়ার, বেতের ল্যাম্পশেড। দেয়ালে জন্তুজানোয়ারের ছবি ঝুলন্ত, কিছু ফটোগ্রাফ, কিছু হাতে -আঁকা।আর রয়েছে গ্রামীণ সমাজের রোজকার ব্যবহারের নানান টুকিটাকি -বেতের ধামা, নানা ধরণের জাল, পাখী -ধরা ফাঁদ। রিসেপশনটিও শনের ছাউনি দেওয়া ঘর, তার সামনে বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের হাড়, নানা বিরল প্রজাতির পাখী-ব্যাং-সাপ-জন্তু-জানোয়ারের ছবি-সমগ্র উত্তর পূর্বের, শুধু আসামের নয়। রয়েছে এদের সম্পর্কে নানা তথ্য। রয়েছে উত্তর-পূর্বের নানা জনজাতির পুরুষ-মহিলার ছবি।
    রিসেপশনের ঠিক পাশেই কেতকী নামের একটি এন জি ও পরিচালিত স্থানীয় মহিলাদের হস্তশিল্প বিক্কিরি হচ্ছে। মেখলা চাদর, অসমিয়া শাড়ি, র‌্যাপ অ্যারাউন্ড ইত্যাদি, তার সঙ্গে বেতের-বাঁশের হ্যাঙ্গিং ফুলের টব(অর্কিড ইত্যাদি রাখবার), ফুলদানি ইত্যাদি। আমাদের মহিলারা এসেই সেখানে মজে গেলেন। আমি তাড়াতাড়ি কোনোমতে একটু চান সেরেই ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরোতে পারলে বাঁচি। বাচ্চারা মহা উৎসাহে আমার হাত ধরে চলল। বাকি বড়রাও আমায় দেখে হুড়মুড় করে রেডি হয়ে পেছন পেছন চলল।

    নামেরির জঙ্গুলে রাস্তা।

    ইকো ক্যাম্পের প্রবেশপথ।


    রেস্তোরাঁ


    রিসেপশন

    আলো কমে আসছে। আমরা জঙ্গলের সীমানা বরাবর মেটে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। আধা ঘন্টা হাঁটা রাস্তায় জিয়া ভরেলি নদী পৌঁছনো যায়। এদিক-ওদিক পাখীরা ডাকছে বটে, কিন্তু তারা বনের ভেতরে। অনেক উঁচু গাছের ডালে । সেখানে চোখ চলে চলে না, ক্যামেরা তো কোন ছার! বেশ কিছু প্রজাপতির অবশ্য দেখা মেলে। আসার পথে কিছু বাঁদর দেখেছি। এইমাত্র। বাচ্চারা অবশ্য খুব উৎসাহী। অতি উৎসাহ তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে ফুটে উঠছে, গলার স্বরেও। এইসব আওয়াজে পাখী আর থাকে?

    জিয়া ভরেলি নদী এখানে খুব চওড়া। পাড়ে জঙ্গল ফিকে হয়ে এসেছে। কিছু ছেলেমেয়ে পিকনিক করছে। ট্যাঁশ ছেলেমেয়ে; অসমীয়া, কিন্তু স্থানীয় নয়। এখানে হাত-পা ছড়িয়ে ঘাসের ওপর বসে থাকা যায়। শুয়ে পড়লেই বা আটকাচ্ছে কে? বাচ্চারা জলে নামতে চায়। নুড়ি-ছড়ানো পাড়। হাত ধরে একজন -একজনকে নামানো হয়। একটুখানি জল ছুঁয়ে, জলে-ডোবা নুড়ি ধরেই ওদের আনন্দ। মানুষ কত অল্পে খুশী হয়। শিশুরা ।
    পাড় ধরে জঙ্গলের মধ্যে বেশ খানিকটা ঢুকে যাই। বৃথা খোঁজ। একটি শিমূল গাছের নীচে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমাকে দেখে অসমীয়া ভাষায় প্রশ্ন করেন। আমাকে অসমীয়া ভেবেছেন। দূরে হৈ-হল্লা শুনি। হাতি! ওপাড়ে হাতি নেমেছে কাশের জঙ্গলে ! তক্ষুণি ভুল ভাঙে। জংলী নয়, এ হাতি পোষা। হেলতে দুলতে হাতি চলেছে, তার পাশে পাশে মানুষজন। ও পাড়টিও জঙ্গলের অংশ।

    ফিরে আসতে প্রায় অন্ধকার হয়ে যায়। বাকিরা আমার আগে ফিরে গেছে। টিয়ার ঝাঁক চেঁচামেচি করে ইকো ক্যাম্পে ফিরছে। এখানকারই কোনো গাছে এরা থাকে। আলো জ্বলে উঠছে ইকো ক্যাম্পের ঘরে ঘরে।

    চা নিয়ে বসেছি মাঠের মধ্যে । একটু আগে একজন কর্মী এসে কাঠের ওপর কাঠ সাজিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা ভেবেছিলাম বিশেষ বিশেষ দিন ছাড়া ক্যাম্প ফায়ার হয় না বুঝি। ছেলেটি মৃদু হেসে বলল- রোজই আগুন জ্বালানো হয়।
    বাচ্চারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। রাতের খাবারের অর্ডার দেওয়া হল-ভাত-ডাল-মাংসের সঙ্গে জিয়াভরেলি নদী থেকে ধরা টাটকা মাছ-ভাজা( ওরা অবশ্য ফিশ ফ্রাই বলেছিল-আসলে যে মাছ ভাজা মিন করেছে সে কথা খাবার আসার আগে অবধি বুঝি নি।) খাবার যে জম্পেশ হয়েছিল সে আর বলতে ! তবে তার চেয়েও ভালো ব্যাপার হল পরদিন ভোরবেলা জিয়া ভরেলি নদীতে র‌্যাফটিংয়ের বুকিং করে ফেলা গেছে। সাড়ে ছ'টার সময় আমরা বেরোব।
    ছুটি ফুরিয়ে এল। আজ শেষদিন। ভোর ভোর উঠে বসে আছি, রিভার র্যাফটিংয়ে বেরোবো। রেস্তোরাঁ খোলে নি যে এক কাপ চা পাবো। রিসেপশনে এক ভদ্রলোক এলেন কিছু পরে। পুরো বাঙালী মুখচ্ছাপ। কাকে ফোন-টোন করে র‌্যাফট রেডি করতে বললেন। ফোনে হল না, তারপর ডাকাডাকি শুরু করলেন; র‌্যাফটাররা ক্যাম্পাসের পেছনেই থাকে মনে হল। বললেন-আসছে, আপনাদের লোক। র‌্যাফট নিয়ে আসছে। এবার পাম্প করে ফোলানো হবে র‌্যাফট। বেশী সময় লাগবে না।

    একথা-সেকথা হতে থাকল। ভদ্রলোক অন্যতম ম্যানেজার, ঝরঝরে ইংরেজী বলেন। বললেন-"আপনারা তো ঠিক সময়ে আসেন নি। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আমরা একটি জাঙ্গল ট্যুর অপারেট করি, গাইড সহ। পায়ে হেঁটে পাখী দেখা। ভারতের আর কোনো ন্যাশনাল পার্কে পায়ে হেঁটে ট্যুরের বন্দোবস্ত নেই। সাহেবরা জানে। প্রতি বছর এই সময় প্রচুর সাহেব-মেম,- ইউ কে থেকেই বেশী- বিশাল বিশাল লেন্সওয়ালা সব ক্যামেরা নিয়ে এসে হাজির হয়। ট্যুর আড়াই তিন ঘন্টার , কিন্তু কেউ কেউ নিজের ইচ্ছেমত সারাদিন জঙ্গলে থাকে। ছবি তোলে। আমরা ক্যাম্প থেকে খাবার প্যাক করে দিয়ে দিই। এই তো নভেম্বর আসছে, আমাদের ট্যুর শুরু হবে; আপনারা একটুর জন্য মিস করে গেলেন। তবে"- আকাশের দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বললেন-"আকাশের যা অবস্থা দেখছি, ঢালবে। আজ না হলে কাল। এমন ওয়েদার থাকলে তো বার্ডিং হবে না!"

    আমি বলি- " কিন্তু নেটে কোত্থাও তো এই তথ্যের উল্লেখ নেই !"

    ভদ্রলোক হাসেন- "থাকা উচিৎ ছিল। আসলে কী জানেন, আমরা একটু লো প্রোফাইল মেইন্টেন করে চলি। হার্ডকোর বার্ডাররা সবাই জানে। তাদের নিয়েই আমরা খুশী আছি। উল্টোপাল্টা লোকজন এলে পিকনিকের মেজাজে হই-হুল্লোড় করে, চড়া গান চালায়, মাতলামো করে। আমরা এসব পছন্দ করি না। এলাকার শান্তি নষ্ট হয়। আমাদের পাখীরাও এসব পছন্দ করে না। পালিয়ে যায়। পরের বার এলে ফেব্রুয়ারিতে আসবেন। ফেব্রুয়ারি ইজ দ্য বেস্ট বার্ডিং সীজন। না গরম- না ঠাণ্ডা। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এলে শীতে কষ্ট পাবেন। ফেব্রুয়ারীতে সব মাইগ্রেটরি বার্ডরাও পৌঁছে যায়। এখন তো আপনি আইবিস বিলেরই দেখা পাবেন না!"

    ওঁর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করি। উনি একটি কার্ড দেন অ্যাসোসিয়েশনের। বিশাল মহাশীর মাছের ছবি আঁকা। জিয়া ভরেলি এই গেম ফিশের জন্য বিখ্যাত। " জলের বাঘ" বলে ডাকে লোকে, এই মাছকে। ইংরেজরা বলে ইন্ডিয়ান স্যামন। এরা , বিশেষ করে গোল্ডেন মহাশীর ওজনে চল্লিশ-পঞ্চাশ কেজি অবধি হয়।



    র‌্যাফটিং শুরুর পয়েন্টটি ইকো ক্যাম্প থেকে কুড়ি কিলোমিটার মত দূর। একটি পিক আপ জিপে উঠে বসি আমরা। ড্রাইভারের পাশে একজন, আর পিছনে র‌্যাফটটি সঙ্গে বাকিরা; সাথে আমাদের দুই গাইড কাম র‌্যাফটচালক। তেজপুর-বমডিলা হাইওয়ে ধরে অরুনাচল বর্ডারের দিকে উজিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাস্তার দুপাশ জুড়ে লাইন করে বসে আছে লালমুখো বাঁদরের দল। ছোট-বড়-বুড়োবুড়ী নানান সাইজের। শাল বনের ফাঁক দিয়ে রোদ্দুর এসে পড়ে। বন জেগে উঠছে। ঘুঘুর ডানা ঝটপট শুনে দেবর্ষি সচকিত- কী পাখি, ওটা কী পাখী? আগে তো দেখিনি ! আমি হেসে খুন।
    গন্তব্যে পৌঁছে গাড়ি ডানদিকে ঘোরে। রাস্তা ছেড়ে মাঠের মধ্যে উঠে যায় গাড়ি। সেখানে কাশ ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে নদী। হৃদয়হরণ জল। হৃদয় ভরানো জল। জিয়া ভরলি। ইংরেজদের মুখে মুখে ভরেলি। কাশবনের মুখে এসে পড়ছে তরুণ রোদ্দুর। আর পিক আপ জিপ থেকেও নামছে রোদ্দুর। ও তার বন্ধু উজান। জলে নামবে বলে তাদের ছটফটানি। র‌্যাফটতিকে ভাসানো হয় নদীতে। একে একে হাত ধরে পিছল নদীপাড় বেয়ে সকলে নামি । লাইফ জ্যাকেট পরি।

    আকাশে মেঘ ও রোদ্দুরের লুকোচুরি। বিশাল নদী বিছিয়ে আছে। ভালো স্রোত। জলে না নামলে বোঝা যায় না। র‌্যাফটটি আস্তে আস্তে নদীপাড় থেকে সরে আসে। নদীর মাঝখান দিয়ে বয়ে যায় সে। দুই পাড়ে হালকা ঝোপঝাড়; ইতস্ততঃ বড় গাছ। মড়া গাছের গুঁড়ি। মঝেমধ্যে বড় বড় ঘুর্ণি। সেখানে র‌্যাফট বড় টাল মাটাল। জলের ফেনা উছলে ওঠে। কিন্তু পাখীর দেখা নাই।

    হঠাৎ নৈঃশব্দ ভেঙে দিয়ে আমাদের গাইডরা বলে ওঠেন- ঐ , ঐ যে ! দেখি আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে একটি সাদা -কালো চক্করওলা পাইড কিং ফিশার উড়ে গেল। ছবি তোলার সুযোগই দিল না ।

    ছবি তোলা বেশ কঠিনও। টলমল করছে র্যাফট। জলে ভরা নদী। বর্ষার জল পেয়ে ভালো ফুলেফেঁপে আছে। শীতকাল এলে আরেকটু শান্ত হবে। আপাততঃ মনে হচ্ছে যেন হাতির পিঠে বসে আছি। এই দুলুনিতে ক্যামেরা নড়ে যায়। তার ওপরে আকাশ। এই খুব মেঘলা তো পরক্ষণেই চড়া রোদ।ঈ আর শাটার স্পীড ঠিক করতে না করতেই পাখী উড়ে যায়।

    আমাদের গাইডদের চোখও বটে। আর তেমনি পাখী চেনে। দেখে মনে হয় খুব একটা পড়াশোনা জানে না, কিন্তু অনায়াসে সব পাখীদের ইংরেজী নাম বলে যাচ্ছে।" এই যে রিভার ল্যাপউইং", "এই দেখুন তার পাশে গ্রেট থিক নী"- বলতে বলতে যায়। শুধু হজসন'স রেডস্টার্ট তারা চিনতে পারে নি, বলল- মনে পড়ছে না। আর এক ধরণের পাখী, হাউজ মার্টিনের মত, ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে নদীর পাড় ধরে, তাদেরও নাম বলতে পারে নি। খাড়া উঁচু নদী পাড়ে গর্ত করে তাদের বাসা। গর্ত থেকে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে আসছে।

    এক জায়গায় এসে নুড়ি-ভেজানো অল্প জলে তারা র‌্যাফটটিকে নিয়ে আসে। ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে-"শব্দ কোরো না; ঐ দ্যাখো!" দেখি, মড়া গাছের গুঁড়িতে একটি বাজার্ড বসে। কী বার্জাড, আমার অল্পবিদ্যায় কুলোয় না। সম্ভবতঃ কোনো ফিশিং ঈগল। আরো কাছ থেকে ছবি তোলার লোভে আমি প্যান্ট গুটিয়ে জলে নামি। অল্প বলতে খুব একটা অল্প নয় জল। আমার হাঁটুর কিছুটা নীচ অবধি ভিজে যায়। মোজা ও স্নিকার ভিজে যায়। ফেরার পথে এদের আবার বয়ে নিয়ে যেতে হবে, যাগ্গে!
    কিন্তু পাখী আমায় সময় দেয় না বেশী। একটি ডিসেন্ট শট নেওয়ার আগেই সে ডানা মেলে দেয় আকাশে। বাজার্ডের চোখ! আমি না হয় ভাবছিলাম ও আমাকে দেখতে পাচ্ছে না।

    ফুরিয়ে আসে আমাদের ভ্রমণকাল। আড়াই ঘন্টার নদী-ভ্রমণ শেষে র‌্যাফট আবার ফিরে এসেছে ইকো ক্যাম্পের কাছাকাছি নদী পাড়ে। এখানেই আমরা কাল বিকেলে এসেছিলাম। সেখানে জিপ দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের জন্য। গাইডদের কিছু বখশিস দিই; তারা হাত জোর করে নমস্কারের ভঙ্গিতে গ্রহণ করে। বলে-" শীতকালে এসো। আর ছবি তুলতে হলে একলা এসো। এত লোক থাকলে যখন-তখন মাঝনদীতে র‌্যাফট দাঁড় করানো যায় না। উল্টে যায়"।

    ভাবি-আসতে তো হবেই। আইবিস বিল, লং নেকড প্লোভার, হোয়াইট উইংড ডাক, নানাজাতের হর্নবিল আর মাছরাঙা দেখতে ফিরে আসতে হবে। নদীর বুকে-নদীর সোঁতায় মাছমারাদের গান শুনতে আসতে হবে। বুদ্ধপূর্ণিমার জ্যোৎস্নারাতে তাওয়াং মনাস্ট্রির চত্বরে লামাদের নাচ দেখতে আসতে হবে। সেসার অর্কিড দেখতে ফিরে আসতে হবে। ঈগল নেস্ট স্যাংচুয়ারিতে লিওচিচলার ডানার বিরল রং দেখতে আসতে হবে। আমুর ফ্যালকনরা প্রতিবছর শীতের আগে ট্রান্সবৈকাল, আমুরল্যান্ড আর উত্তর মঙ্গোলিয়া থেকে নাগাল্যান্ডে উড়ে আসে; সেখানে কয়েক হপ্তা জিরিয়ে তারা পাড়ি দেয় দূর আফ্রিকা। সেই পাখীর ঝাঁক দেখতে আসতে হবে নাগাল্যাণ্ড। ত্রিপুরার সিপাহীজলায় দেখতে যেতে হবে চশমা বাঁদর। বিরল সব জন্তুজানোয়ার-পাখী-ব্যাং-সরীসৃপ-গাছপালা- অনেকে হয়তো নামই পায় নি এখনো- তাদের দেখতে আসতে হবে আসাম- অরুনাচল-নাগাল্যান্ড-মিজোরাম-মেঘালয়-ত্রিপুরা-মণিপুর। আর মানুষ, কত রংয়ের মানুষ-আকা-আপাতানি-নিশি-মনপা-বোড়ো-কুকি-আঙামী নাগা- কত্ত কত্ত মানুষ দেখতে আসতেই হবে ভারত দেশের ফ্রিঞ্জে থাকা এই উত্তর পূবে।

    বারবার ফিরে আসতে হবে। আনন্দের মধ্যে। মা প্রকৃতি আর তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে।

    ফিরে যেতে আমার তাই দুঃখ হয় না কোনো।

    শেষ করি ইকো ক্যাম্পের প্রদর্শনীঘরে টাঙানো এই কথকতাখানি দিয়ে।

    Lobjek, my dear friend, this is about you, the “bushman of the Bhorelli”. Your forte was not restricted to the river but went beyond. A vanishing handful of your tribe, you not just gave us joy and excitement but taught us so much about ourselves. In return, all you wanted was to sit around a log fire with a glass of lom (rum) and exchange stories of the day gone by! Your footprints on the sand may have gone with you, but not the impressions you have left in our hearts and souls. For as long as the breeze blows and creates a rustle in the trees and a ripple on the river, a Mahaseer leaps. You live. You are Nature.

    শুরুর আগে


    এই তো আমি রেডি


    রিভার ল্যাপউইঙ


    গ্রেট থিক নী


    হজসন'স রেডস্টার্ট


    মরা গাছের ডালে বাজার্ড


    ডানা মেলা বাজার্ড

     

  • বিভাগ : ব্লগ | ০২ নভেম্বর ২০১৩ | ৭২৮ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • kk | 81.236.62.176 (*) | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৩ ০৪:২৮45746
  • কী সুন্দর !
  • Atoz | 161.141.84.239 (*) | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৩ ১০:৪৬45747
  • পাখিটার শীত লেগেছে, কেমন পালক টালক ফুলিয়ে বসে আছে। ঃ-)
  • san | 133.63.112.87 (*) | ১৭ ডিসেম্বর ২০১৩ ০১:৪১45748
  • ছবিও খাসা , লেখাও খাসা !
  • kk | 81.236.62.176 (*) | ১৭ ডিসেম্বর ২০১৩ ০৬:২১45749
  • আরো কই?
  • শ্রাবণী | 233.30.109.205 (*) | ১৮ ডিসেম্বর ২০১৩ ১০:০৮45750
  • জিয়া ভরেলি.......নাম শুনলেই পাড়ে পা ঝুলিয়ে তিরতির জলে পায়ের পাতা ভিজিয়ে বসে থাকতে মন চায়, সবজে গাছগাছালি আর পাখপাখালির ডাক জড়ানো!
  • kk | 81.236.62.176 (*) | ২২ ডিসেম্বর ২০১৩ ০৪:০২45751
  • যাঃ, শেষ হয়ে গেলো? :-(

    ম্যানেজার ভদ্রলোককে আমার খুব পছন্দ হলো। কী ভালো মানসিকতা।
  • sosen | 111.63.135.36 (*) | ২২ ডিসেম্বর ২০১৩ ০৪:১৮45752
  • তালমিছরি দিলুম
  • | 24.97.250.203 (*) | ২২ ডিসেম্বর ২০১৩ ০৪:৫১45753
  • আহ! তাও বাপু আমি আগে সিকিম শেষ করে তবেই অরুণাচলের দিকে পা বাড়াব।
  • kumu | 132.161.161.171 (*) | ২২ ডিসেম্বর ২০১৩ ০৫:৫০45754
  • মনোহরণ লেখা
  • সিকি | 132.177.152.240 (*) | ২৩ ডিসেম্বর ২০১৩ ০২:২৮45755
  • হুমম। ইন্দোদাদা এই বয়েসে তা হলে বার্ড ওয়াচিং কত্তে বেরিয়েছিল।
  • পাতা :
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন