
স্বাধীনতার ছয় দশক বাদে, গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা ওড়াতে ওড়াতে, আজ আমরা ঠিক কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? ভারত জন্ম থেকেই ছিল ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, আর পাকিস্তান, যার সৃষ্টি হয়েছিল ইসলামের নামে, ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানপ্রধান অংশগুলোকে কেটে নিয়ে, ১১ই আগস্ট ১৯৪৭-এ কায়েদ-এ আজম জিন্নার ভাষণ অনুযায়ী তারও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে চলার কথা হয়েছিল। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোনও বিরোধ নেই, মানুষ তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং পছন্দমত মন্দিরে, মসজিদে বা গির্জায় যাবে। তিনি আরও বলেছিলেন যে পাকিস্তানের পতাকায় সাদা রঙ সংখ্যালঘুদের জন্য উৎসর্গীকৃত। তবুও, ধর্মীয় ভেদাভেদের বীজ আগে থেকেই বোনা ছিল সে-দেশের সিস্টেমে। যতই সেকুলার ভাষণ দেওয়া হোক না কেন সমাজের অচলায়তন তাতে একচুলও নড়ে না। সাম্প্রদায়িকতা ধীরে ধীরে তাই ছড়িয়ে পড়ল পাকিস্তানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এবং সত্তরের দশকের শেষ দিকে, জিয়া-উল হক এবং মৌলানা মাউদুদির নেতৃত্বে ধর্মান্ধ মোল্লারা ক্ষমতার অলিন্দে আসতে শুরু করল। এই মোল্লা আর মিলিটারির আঁতাত, সঙ্গে আমেরিকার ইন্ধন, সমস্ত একসাথে লঙ্ঘন করতে লাগল জিন্নার সেই ধর্মীয় স্বাধীনতার বাণী, এতটাই লঙ্ঘন করল যে আজ মুসলিম ধর্মের মধ্যেই শিয়া বা আহমদীয়া গোষ্ঠীর মত সংখ্যালঘুরাও সাম্প্রদায়িক হিংসার শিকার হতে লাগল পাকিস্তানে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে থাকল পাকিস্তানের আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে। ... ...

না, আমার, আমাদের, মানে অফিসিয়ালি 'আসাম'এর বাঙালিদের, ব্যাঙ্গালোরে আপাতত বিপদ নেই। আমরা 'মিড্ল্ ক্লাস', আমরা টিঁকে যাবো। আমরা নিরাপদে বসে বড় বড় জাতীয় সংহতির বুলিও দেবো। ফ্ল্যাট্ করবো বেঙ্গালোর নইলে কলকাতায়। ...কিন্তু যারা তা নয়, যারা এই দেশের ৯৯ ভাগ, যারা অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত তারা বাঁচবে কীভাবে? আজ না হোক কাল টিঁকে থাকার জন্য হয় তাদের বলতে হবে 'আম্গো বাসা কইলকাত্তা' ... আর নাহলে আসামে থাকলে, মুখে কিংবা কায়দায় 'আম্গো ভাহা অহইম্মা' বলে, ভূপেন হাজারিকাকে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় বলে সালাম ঠুকে 'অহইম্মা' হয়ে। ... ...

আর এই "বেআইনী বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ" এর মিথকথা তৈরী হওয়ার আগের থেকেই শুরু হয়েছিলো আরেকটি শয়তানী গল্প - সেটি হচ্ছে "বহিরাগতদের" চাপে বিলীয়মান 'স্থানীয়' মানুষদের কথা। এর জন্য মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা নয়, অন্য প্রদেশের হিন্দু যারা অসমে বসবাস শুরু করেছিলেন তারাই ছিলেন সেই আক্রমণের শিকার। না, জমির দখল নিয়ে সেই আন্দোলন ছিল না। সেটি দাঁড়িয়ে ছিল যে ভুল ভাবনার উপর সেটি হচ্ছে এই বাঙালি মধ্যবিত্তদের চাপে অহমিয়ারা তাঁদের জাতি পরিচয় ভুলে যাচ্ছেন। তাঁরা সরকারি চাকরিতে সুযোগ পাচ্ছেন না এবং স্থানীয় লোকেদের জন্য যে সুযোগ বা উপকার ছিলো সেগুলিও তাঁরা ভোগ করতে পারছেন না। আর এর ফলে ১৯৬০ সালে যা বঙাল খেদা আন্দোলন হয় তা শুধু শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বানানো কাহানীর ফল। ... ...

সে গাছগুলো কিন্তু ভগবান যে কদিন জল দিলেন, সে কদিন বাঁচল। মানে, বড়জোর মাস দুই। আবার পরের বছর সিক্সথ জুন। ইতোমধ্যে দুজন ফোটোগ্রাফার টস্কে গেছেন। নতুন যাঁরা এলেন, তাঁদের একজন একটু ছটফটে। খুব মৃদুস্বরে তাঁর কানের গোড়ায় কেউ বলল, ভাই, কনুই মারবেন না, বুঝতে পারছি সার্কিটে নতুন। আমি অল্পেশ গোস্বামী, নামটা বোধহয় জানা আছে। সারা জীবনের মত পুটকি জ্যাম করে দেব। ফ্ল্যাশ, ক্লিক্, ঝাঁঝরি কাড়া, পাঞ্জাবী ভেজা, সাপলুডো, ইত্যাদি। রিওয়াইন্ড অ্যান্ড রিপ্লে।মায়া কেটে গেল এক নিমেষে। মায়া নাকি কাটে না? অরুণবাবু সামান্য মাইনের চাকরি করেন ইস্কুলে। একটা খুব দামি কলম নিয়ে এসেছেন। বকলাম, এটা কী করলেন, এত দামি – উনি বললেন, চুপ স্যার, একদম চুপ। এক ভদ্রলোক একটা বিশাল বড় বাতাবি লেবু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে কোনও দিন দেখেছি বলেই মনে পড়ছে না, কোনও উপকার করা তো দূরে থাক। বললেন, আমার বাগানের স্যার। আরও অনেকে ঘুরছেন খবরের কাগজে কিছু জড়িয়ে। আমার ব্যাগে একটা বিশাল সন্দেশের বাক্স কে যে ঢুকিয়ে দিল পেছন থেকে, বুঝতেই পারলামনা। বিমলি কাছে আসছেনা, দূরে গাছের আড়াল থেকে দেখছে। সুকুমার চোখ মুছল কবার। এ মায়া প্রপঞ্চময়। চলো মন নিজ নিকেতনে। ... ...

মাদ্রী এই খেলাতেই মেতেছিল একদিন। রোগগ্রস্ত পাণ্ডুকে নিয়ে কুন্তীর সঙ্গে সেই খেলাতে সে জিততে চেয়েছিল। পাণ্ডুকে বশ করে কুন্তী ক্রমাগত পুরুষসঙ্গ করে চলেছে। জন্ম দিয়ে চলেছে সন্তানের। কুন্তীর সন্তান জ্যেষ্ঠ। রাজ্যাধিকারের প্রশ্নটি মীমাংসিত। কিন্তু কেন? বারেবারে কেন হার হবে মাদ্রীর? ঋষি বা রাজন্যের আতিথ্য করা এক পালিতা রাজকুমারী তাঁর চেয়েও সুখী হবে? তিনি শল্যাধিপতির ভগ্নী, তাঁকে বিয়ে করতে রীতিমত পণ দিতে হয়েছিল পাণ্ডুকে, গাঙ্গেয় সে পণ মেনে নিয়েই বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন, সেই মাদ্রী, মদ্রসুন্দরী পরাজিত হবে কেন বারেবারে? শোধ নেবার খেলায় মেতেছিলেন তিনি। এক পুরুষের সাহচর্য্য পেয়েছিলেন। সেও কুন্তীই আয়োজন করেছিল পাণ্ডুর আদেশে। তাতে কি শরীর শান্ত হয়? কুন্তী বহু সংসর্গ করবে আর তিনি এক? ... ...

২০ বছরে কিছু পাল্টালো কি? সেদিন একটা বড় কাগজ জনমত নির্ধারণের চেষ্টা করত, আজ করে অনেকগুলো গণমাধ্যম। জনতা কি পুরোটাই এর পিছনে দৌড়ে বেড়ায়? না। একটুও কি প্রভাবিত হয় না? হয় নিশ্চয়। তবু, বয়স আমার, তোমার এবং সবার মুখের রেখায় ত্রিকোণমিতি শেখায়, এস, আমরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ত্রিকোণগুলোর কৌণিক পরিমাপগুলো করার চেষ্টা করি, পুরোটা সম্ভব হবে না জেনেও। চিনি আর বোঝার চেষ্টা করি মম চিত্তে শিলাদিত্যের স্রষ্টাকে.. হ্যাঁ, ওটাই আমার এখনকার রিং টোন। আজ বিশে আগস্ট, দুহাজার বারো। আঠারো বছর আগে, সুমনের জন্যে কোমরে রিভলভার তুলেছিলাম, ব্যস্ত মফস্বলের দিন দুপুরে, ওরা সুমনকে মারবে বলেছিলো, আমাদের অর্গানাইজ করা সুমনের প্রোগ্রামে। ছ ঘরা। দেশি। খুব রিস্কি। সুমন জানতেন না। আজও জানেন না। তখনো আমাদের স্বপ্ন দেখার কাল শেষ হয়নি, যদিও জেনে যাচ্ছি যে এ রাজনীতির গোলকধাঁধা থেকে বিপ্লব বেরবে না। কিন্তু তবু স্বপ্ন দেখছি, কেন না জেনে গেছি, ‘অন্ধকারের তবু আছে সীমানা’। ... ...

পাকিস্তানে ধনীলোকের অভাব নেই। একটা বিত্তবান সমাজই আছে যাদের কোনদিক দিয়ে কোনকিছুরই অভাব নেই। দেশের যাবতীয় সুযোগসুবিধা এঁরা স্রেফ কিনে ফেলতে পারেন। তার পরেও ফেলে ছড়িয়ে এঁদের পয়সার কমতি হয়না। দেখেছি চীনের মডেল মেনে চলার জন্য এঁরাই সবচেয়ে বেশি গলা ফাটান। এঁদের কাছে তো পড়াশোনা বা চিকিৎসা কিংবা অন্য সবরকম নাগরিক সুবিধা শুধু পয়সা দিয়ে কিনে আনা যায় এমনই কোন ব্যপার। যাদের পয়সা নেই তারা কীভাবে এই জিনিষগুলো পাবে সে নিয়ে এঁরা কোনদিন মাথা ঘামান না। পাকিস্তান যদি একটা সংগঠিত দেশ হিসেবে থাকতে চায় তাহলে কখনোই চীনের রাস্তায় হাঁটলে তার চলবে না। চীনের উদ্ধত পার্টি হয়তো মনে করেন যে তাঁরা যা ভালো বোঝেন দেশের জন্য সেটাই ঠিক। আমাদের মতো দেশের পক্ষে ঐ পন্থা কোনমতেই ঠিক নয়। আর যাতে ঐ ব্যবস্থা এদেশে না চালু হয় তার জন্য আমাদের সবার চেষ্টা করা উচিৎ। কোন রাজনৈতিক পার্টি ঠিক করে দেবে যে সারা দেশের জন্য কী ঠিক আর কী ভুল, এ কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায়না। আমি চাই আমাদের দেশে একটা স্থায়ী টেঁকসই অর্থনীতি থাকুক। কালই বিশাল বড়লোক হয়ে গিয়ে পরশুই আবার কাঙাল হয়ে যাবার অর্থনৈতিক মডেলের আমি সবরকম ভাবে বিরোধিতা করি। ... ...

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন তাঁর সন্তান। কিন্তু সেও বোধহয় মনে করে তিনি বহুকাল ধরেই এই বংশের বিষয়ে অযথা ব্যস্ত। কুরুকূলের সমস্যার সমাধান তাদের বা বিশেষ করে পুরুষদের হাতে ছেড়ে দেওয়াই উচিত ছিল। কখনো মুখে না বললেও তিনি বুঝেছেন। কোথাও তাঁর পুত্রও মনে করে যে নারীরা যেহেতু তিনিও জানেন যে মহারাজ শান্তনুকে ধরেও এই বংশ গাঙ্গেয়র মতন শাসক কখনো পায়নি। মহারাজ কুরু যেমন ধার্মিক, নিষ্ঠ শাসক, তেমনই একজন হতেন গাঙ্গেয়। কিন্তু তাঁর পিতা হতে দেননি, শান্তনু হতে দেননি, তিনিও হতে দেননি। বাকী দুজনেই এখন জাগতিক উত্তরের সীমার বাইরে। তিনি যে আছেন! তাই না এতকাল...। হায় রে, হায় রে! সুখের ছদ্মবেশে কখন যে দুঃখ এসে দাঁড়ায় মানুষ তা টেরও পায় না। সুখের মালা গলায় দুলিয়ে চলতে গিয়ে অকস্মাৎ অনুভব করে, এ মালা সুখের না, এ মালার বড় ভার। তিনিও ব্রাহ্মণ ঋষি পরাশরের সঙ্গিনী হতে না পারার দুঃখকে রাজরাণী হবার সুখ দিয়ে একদিন ঢাকতে গিয়েছিলেন। শান্তনুকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়েও মনে হয়েছিল সঙ্গোপনে, এও একরকম প্রতিশোধ হবে। পরাশর, দূরগামী পরাশরের বংশ যে বংশের কূলগুরু তাদেরই প্রাসাদে তিনি দাঁড়াবেন। রাজেন্দ্রাণী হয়ে পরাশরকেও বুঝিয়ে দেবেন তিনি এতটাও ফেলনা ছিলেন না। ... ...

কাউকে কুত্তা বললে, সে রেগে যাবে, মারতে পারে, গালাগাল তো দেবেই। অথচ কাউকে বেড়াল বললে আহ্লাদি আহ্লাদি মুখ করবে। এদিকে বেড়ালের মত হাড় হারামজাদা দুনিয়ায় নেই। ব্যাটাচ্ছেলে আদর খাবে, বিছানায় ঘুমোবে, শ্রেষ্ঠ খাবারটি খাবে, সামান্য বাসি হলে নাক সিঁটকে মুখ ঘোরাবে, কিন্তু কোনও উপকারে আসবেনা, কিচ্ছুটিনা। ওদিকে আন্দামানে সুনামিতে ভেসে যাওয়া সাত বছরের ছেলেকে কুকুর জলে ধাওয়া করে সারা দিন টেনে ভাসিয়ে রেখে পরের দিন স্রোত কমলে পাড়ে নিয়ে এল জ্যান্ত। তাও আবার নেড়ি কুকুর। তবু, তবু কত বদনাম। শুধু ভিলেন বা খারাপ লোকের নাম নয়, কুকুরের নাম প্রচন্ড কম্যুনালও বটে। যারা ওপার বাংলা থেকে ডিস্পপ্লেসড বা দাঙ্গায় অ্যাফেকটেড তাদের অনেকেরই ক্ষোভ ছিল। সঙ্গত কারণেই ছিল। ইন্দ্রজিতদের বাড়ির সাদা ভুটিয়াটার নাম ছিল ভুট্টো। প্রথমে ভাবতাম ভুটিয়া বলে মিলিয়ে নাম, পরে শুনলাম তা নয়। তখন অবশ্য আমরা কেন, আমাদের বাবারাও ভুট্টোর নাম শোনেনি। তিনি তো প্রথমে প্রেসিডেন্ট, পরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন সত্তরের দশকের গোড়ায়। আমাদের ছেলেবেলায় ভুট্টো কোথায়? ইন্দ্রজিতের দাদু অবশ্য বলতেন পাকিস্তানে ও-ই সব। লাইন অফ কন্ট্রোলের ওপারেও হয়তো কোনও জহরলাল চেনে বাঁধা থাকত, তবে আমার তা জানা নেই। সুনির্মল সাহার নেড়ি কুকুরটার নাম ছিল কাশেম। যেখান থেকে তাড়া খেয়ে ওরা পালিয়ে এসেছিল, সেই গ্রামে কোনও এক কাশেমের বাড়িতে সুনির্মল নামে পোষা কুকুর থাকলেও থাকতে পারে। সেটাও আমার জানা নেই। ... ...

লিঙ্গকে এস্সার মামলার একজন আসামী হিসেবে দেখায় পুলিশ, এ ছাড়াও তাকে অভদেশ গৌতম মামলাতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়(যদিও সেই ঘটানাটি ঘটেছিলো প্রায় এক বছর আগে)। চার্জশীট যখন দাখিল করা হল তখন বোঝা গেল যে সাক্ষ্য প্রমাণের উপর নির্ভর করে লিঙ্গের বিরুদ্ধে মামলা আনা হয়েছে সেটি একটি টাইপ করা কাগজ যেটাতে নাকি অভদেশ গৌতমের সই রয়েছে। তো ঐ বয়ানে লেখা আছে তার বাড়ীতে হামলা হবার কিছুদিন পরে তিনি নাকি "শুনতে" পান যে কিছু পার্টিকর্মী, যারা আরো দূরের গাঁয়ে থাকে, তারাও নাকি কোথাও শুনেছে যে ঐ হামলার মুল মাথা ছিলো লিঙ্গ। এবং এই লিঙ্গই নাকি হবে মাও পার্টীর ভবিষ্যত মুখপাত্র। শুধুমাত্র এই একটি ই "প্রমাণ" রয়েছে পুলিশের কাছে। একটি টাইপ করা কাগজ। এবং সেটি যদি জেনুইন বলেই ধরে নেওয়া যায়, তাহলেও একেবারেই কোনো মামলায় ফাঁসানোর জন্য গ্রাহ্য হতেই পারে না। কারন খালি একটা "গুজবে"র কথাই বলা হয়েছে এতে। ... ...

আমিও জানি, একদিন টোবা টেক সিং-এর মতন আমাকেও খসে পড়তে হবে নিজের পায়ের থেকে। প্রশ্ন করলে বলা হবে এজেন্ট প্রোভোকাটুর। আগেও বলেছে অন্য সরকার। অন্য দল। দরকারে জেলে দেবে, গুলি করবে, অসম্মান করবে নানা ভাবে। কিন্তু আমার নামও টোবা টেক সিং। সমস্ত দলের সীমানার বাইরের এক নো-ম্যানস ল্যান্ড-এ দাঁড়িয়ে আমি জানতে চাইছি আমার দেশটা ঠিক কোথায়? আপনাদের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আমার দেশটা কোথায়? কোথায় প্রশাসন মনে করবে না আমি তার কেনা গোলাম? মনে করবে না যে আমাকে বন্দুক আর ভয় দিয়েই শেষ করা যায়? কোথায় তার সময় থাকবে আমার প্রার্থনার উত্তর দেবার, আমার কথা শোনবার? আমার সঙ্গে কথা বলবার? কোথায় সে উন্মাদ ঈশ্বর সেজে থাকবে না আমারই সঙ্গে পাগলা গারদে? ... ...

যদি জিজ্ঞাসা করেন, আমার জাতীয়তা নিয়ে আমার মনোভাব কি, মুশকিলে পড়ে যাব। স্বাধীনতা সঙ্গ্রামীর নাতি হিসেবে এই দেশ নিয়ে হৃদয়ের খুব গভীরে একটা নরম কোণ আছে। আবার মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে- যে দেশে কার্টুন ফরওয়ার্ড করে জেলে যেতে হয় সেই দেশের মানুষ হওয়াটা আদৌ গর্বের কিনা। কখনো ইচ্ছে করে চতুর্থ বা পঞ্চম উদাহরণটির মত হতে। ছোটবেলায় চাকমা শরণার্থীদের দেখতাম তাড়া খাওয়া পশুর মত সীমান্তের এপার ওপার করতে বাধ্য হতে। সেই স্মৃতির দিকে তাকালে মনে হয় দেশ বা জাতীয়তা এগুলো সব অর্থহীন। এই লেখার শেষ প্যারাগ্রাফ লেখার আগে ভেবে চিনতে দেখছি, যে, দিনের শেষে আমার ভারতীয়ত্ব নিয়ে আমি মোটের ওপর গর্বিত। ... ...

সত্তরের দশকে কোলকাতার নকশালপন্থী আন্দোলন দমন করে এলিটবর্গের চোখে টাফ অফিসার হিসেবে খ্যাতিপ্রাপ্ত প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার রণ্জিৎ গুপ্ত নিজের মেমোয়ার্সে লিখেছেন যে সেই সময়ে মধ্যবর্গীয় নকশালপন্থী নেতারা ছিলেন রোম্যান্টিক স্বপ্নদর্শী। এঁদের সামরিক ব্যাপারে কোন সংগঠিত চিন্তাভাবনা ছিল না। ফলে দু'তিন বছরের মধ্যেই এদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু উনি খেয়াল করেছিলেন যে আশির দশকে অন্ধ্র প্রদেশে কোন্ডাপল্লী সীতারামৈয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতা বিস্তার করা পি ডব্লিউ জি বা পিপল্স্ ওয়ার গ্রুপ সামরিক ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক হয়ে প্রস্তুত হয়েছে। এরা অন্ধ্র প্রদেশের উপকূল এলাকা ধরে দক্ষিণবঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে আগের কায়দায় নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্র এর পক্ষে কঠিন হবে। আজকে তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রথম দশকের শেষে দেখা যাচ্ছে এটা অনেকখানি সত্যি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ... ...

এই ক্যাম্পের লোকেরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসেছে। মোটের উপর এটা কোনও গ্রাম নয় যেখানে যুগ যুগ ধরে গ্রামের প্রতিটা পরিবারের একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্যের সম্পর্ক; একটা গ্রাম যেটা জীবন্ত প্রতিজন গ্রামবাসীর নিঃশ্বাসে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দময় চলমান দিনের গতিবিধিময় প্রতিচ্ছবি; এটা একটা ক্যাম্প। শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য এই ক্যাম্প, এখানে মানুষ অপেক্ষা করে থাকে পুরাতন জীবনে ফিরে যাওয়ার, অথবা নতুন কোনও জীবন শুরু করার। এই সবের মাঝে দায়গ্রস্ত এরা শিখে নিয়েছে একে অপরের সাথে মিশে থাকার। ... ...

পুলিশ অফিসার, এস পি অঙ্কিত গর্গ আমাকে বললেন " শালী হারামী,কুত্তি। তুই তো একটা বেবুশ্যা। নকশাল লীডারদের কাছে তোর শরীর বেচিস তুই। ওরা আসেও তোর বাড়ীতে সারা দিনরাত ধরে। জানি,জানি, আমরা সব জানি।' আরো বল্লেন " তুই নিজেকে বলিস তুই একটা ভালো টিচার কিন্তু তুই তো দিল্লি গিয়েও তোর শরীর বেচে আসিস। তুই কি ভাবিস নিজেকে? তোর ধারনা তোর মতন একটা পাতি মেয়েছেলেকে বাঁচাতে কোনো হোমড়া চোমড়ারা ছুটে আসবে? " কোন অধিকারে কোনো পুলিশ অফিসার ঐ কথা বলতে পারে? আজকের দিনে ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যাবে সব দেশেই যুদ্ধের সময়ে সেই দেশের মেয়েরা স্বদেশের জন্য কতো আত্মত্যাগ করেছেন। ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মীবাইও তো বৃটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন - তিনি তো নিজেকে বিক্রি করেন নি। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন - তিনিও কি নিজেকে বিক্রি করেছিলেন? আর আজকের দুনিয়ায় যতো মহিলারা নিজের নিজের জায়গায় কাজ করছেন তারাও কি নিজেদের বেচে দিচ্ছেন? আমাদের সবারই তো একই সাথে থাকার কথা, কিন্তু আমাকে সাহায্য করতে কেন কেউ এগিয়ে আসছে না? আমি এর উত্তর চাই। ... ...

দ্রুত নোট প্যাড বের করে টুকে নেওয়া হয় নাম বিস্তৃত পাহাড়ির চাকমা ভাষার ভাষ্য। এনালগ ইয়াশিকা ক্যামেরায় তোলা হয় তার দু-একটি সাদাকালো ছবি। তিনি এই লেখককে জানান, তাদের গ্রামে আক্রমণ হতেই শিশুটিকে কোলে করে দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল ভেঙে প্রায় ৩০ কিলিমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি প্রথমে পৌঁছান জেলা সদরে। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নেতারা সার্কিট হাউজে আছেন — এই খবর শুনে তিনি আসেন সেখানে। অনর্গল চাকমা ভাষায় লোকটি শুধু একটা কথাই বলেন, বাবারা আমাকে একটু আশ্রয় দাও! চিদরেরা (সেনা বাহিনী) আমার কথা জানতে পারলে হয়তো আমাকেও মেরে ফেলবে! ... ...

এই যে মণিপুরের কথা বলছি এখানে রাতদিন লোকগুলোর ঘাড়ের ওপর শুধু বন্দুকের নিঃশ্বাস, যেকোনো লোক যেকোনো সময় গুলির সামনে পড়ে যেতে পারে। ওরা ভোট দিতে যায়, কিন্তু তার পেছনে কোনো রাজনৈতিক ভাবনা নেই। ওরা ভোট দেয় আঙুলে ঐ বেগুনী কালির দাগটুকু পাওয়ার জন্য। ঐ দাগ দেখলে সেনাচৌকি ওদের ছেড়ে দেবে, বিপ্লবী বলে সন্দেহ করবেনা। ঐ বেগুনী কালির দাগটুকু ওদের গুলি থেকে বাঁচাবে। এই লোকগুলোর গল্প সারা দেশের অন্য সবার গল্পের থেকে আলাদা। এবার সিনেমা বানানোর সময়ে এই গল্পটা,এর ভেতরের যত দ্বিধা, যত টানাপোড়েন তা আমরা তুলে ধরবো কেমন করে? একেক সময়ে মনে হয় যেভাবেই দেখাতে যাই না কেন, আসল ছবিটা কিছুতেই ফুটে ওঠেনা। মনে হয় আমাদের চেনা যত রকম পদ্ধতি আছে কোনটা দিয়েই ঐ ব্যথা-ভয়-কষ্ট গুলো তুলে ধরা যাচ্ছেনা। তখন নিজের ভেতরকার শিল্পী সত্বাটার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আমি একটাই উত্তর পাই -- এই আসল ছবি তুলে ধরতে গেলে অচিরাচরিতের রাস্তাতেই হাঁটতে হবে। সেটা যদি সাধারণের চোখে 'পলিটিকালি ইনকারেক্ট' হয় তো তাই সই। হলিউড বা বলিউডের আর পাঁচটা ছবির মতো করে এগোলে এ গল্পের সাথে অবিচার করা হবে। এই যে আমি এখানে রয়েছি, এত কাছ থেকে লোকগুলোকে দেখতে পাচ্ছি, এদের সুখ-দুঃখ-ভয়- ব্যথা চোখের সামনে রয়েছে, এই অঞ্চলের এই সত্যিগল্পকে সবার কাছে তুলে ধরতে গেলে আমাকে অন্যরকম ভাবেই ভাবতে হবে। আবার সাধারণ সিনেমা দর্শকরাও যাতে এ ছবি দেখতে উৎসাহ পান সেটাও মাথায় রাখা দরকার, সেইভাবে বানাবো কি করে তা বুঝতে পারছি না। সেটাই আমার কাছে চ্যালেঞ্জ। মেনস্ট্রীম ছবি হলে আমি জানি লোকে দেখবে, অর্থাৎ ছবি বিক্রী হবে ভালো, বাজারে কাটবে। এখন আমাকে এই পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সত্যিগল্পকে এমন একটা রূপ দিতে হবে যাতে লোকে দেখে। আমি বাজার নিয়ে চিন্তা করিনা, কিন্তু মানুষের এই ঘটনাগুলো দেখা দরকার। ... ...

স্টেটস্ম্যান পত্রিকায় উনসত্তর সালের গোড়ায় একটি ছোট্ট খবর বেরিয়েছিল --- বস্তারের সদর জগদলপুর শহরে মাওবাদী পোস্টার দেখা গেছে, পুলিশ সন্দেহ করছে বাইরে থেকে আসা কিছু যুবককে। শেষে ধরা পড়লেন ইস্পাতনগরী ভিলাইয়ের দুই বাঙালী। তাঁদের কিছুদিন জেলহাজতে রাখা হল। একজন অল্পদিনেই মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। অন্যজন কিছুদিন পরে জামিনে ছাড়া পেলেন। ইতিমধ্যে কোলকাতার মনুমেন্ট ময়দানে মে দিবসের জনসভায় কানু সান্যাল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) গঠনের ঘোষণা করেছেন। এবার রাজ্য কমিটিগুলো গঠনের পালা। তখন ছত্তিশগড় বিশাল মধ্যপ্রদেশের অন্তর্গত একটি অঞ্চল মাত্র। আর কেরালার চেয়ে সামান্য বড় বস্তার ছিল ছত্তিশগড়ের একটি জেলা। ... ...

ছত্তিসগড়ে হিংসামূলক কাজকর্মের জন্য উৎখাত হওয়া ১৬,০০০ জনেরও বেশী মানুষ অন্ধ্রপ্রদেশের খাম্মাম অঞ্চলে ২০৩ টে অস্থায়ী উপনিবেশে রয়েছেন। এইসব ক্যাম্পগুলির কিছু কিছু গ্রামের আশেপাশে। কিছুসংখ্যক এই ক্যাম্প মানবাধিকার সংস্থাগুলির দ্বারা নথিভুক্ত। তা সত্ত্বেও রাজ্য এই উপনিবেশগুলির অস্তিত্ব স্বীকার করতে নারাজ। বাস্তবিকই, রাজ্যের গন্ডীর মধ্যে এই ১৬,০০০ মানুষের বাঁচা বা মরা রাজ্যের দায় নয় – এটা বুঝিয়ে দিতে অন্ধ্রপ্রদেশ এই মানুষগুলির অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছে। এ যেন এমন এক অদৃশ্যকরণ জাদুকৌশল যেটা দক্ষতম জাদুকরেরও ক্ষমতার বাইরে। আপনি সরকারি নথিপত্র দেখতে পারেন, কিন্তু কোথাও এই মানুষগুলির উল্লেখ নেই। ... ...

ইঁদুর আমাদের সারা গাময় ঘুরে বেড়াত, পায়ের পাতার কাছে খুঁটে খুঁটে কামড় দিত। সকালে উঠে রক্ত পড়ে থাকতে দেখলে আমরা সবাই ভীত হয়ে যে যার নিজেদের পায়ের দিকে তাকাতাম। একদিন ১৬ ঘণ্টা ধরে হোসাঙ্গাবাদে লোডশেডিং ছিল, আমরা সেই অন্ধকারেই বসে খাচ্ছিলাম। সেই সুযোগে ইঁদুর এসে আমাদের রুটি নিয়ে চলে গেল।ও আমরা হাঁ করে বসে রইলাম। হরদা জেল ইঁদুরে ছেয়ে গিয়েছিল। আমাদের চাদর মুড়ি দিয়ে শুতে হতো তাতেও আমাদের চুলের কাছে এসে ইঁদুর গুলো জটলা পাকাত। আমি জেলারকে বলেছিলাম এই ইঁদুরের উপদ্রবের কথা। জেলার তার উত্তরে বলল, -এইটা জেল ম্যাডাম, ফাইভ স্টার হোটেল নয়। - তা বলে কি বন্দীরা এইভাবে ইঁদুরের কামড় খাবে, এইরকম কথা কোথাও লেখা আছে নাকি? দেখাতে পারলে আমারা আপনার কথা মেনে নেব। তা অন্ততপক্ষে আমাদের তো একটা মশারী দিতে পারেন? মশা না হোক ইঁদুরের থেকে তো আমরা রেহাই পেতে পারি। ... ...