• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  রাজনীতি

  • ছত্তিশগড়ে মাওবাদঃ এক বিহঙ্গম দৃষ্টি -- দ্বিতীয় পর্ব

    রঞ্জন রায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | রাজনীতি | ১৬ আগস্ট ২০১২ | ৩০৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  •  সত্তরের দশকে কোলকাতার নকশালপন্থী আন্দোলন দমন করে এলিটবর্গের চোখে টাফ  অফিসার হিসেবে খ্যাতিপ্রাপ্ত প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার রণ্‌জিৎ গুপ্ত নিজের মেমোয়ার্সে লিখেছেন যে সেই সময়ে মধ্যবর্গীয় নকশালপন্থী নেতারা ছিলেন রোম্যান্টিক স্বপ্নদর্শী। এঁদের সামরিক ব্যাপারে কোন সংগঠিত চিন্তাভাবনা ছিল না। ফলে দু'তিন বছরের মধ্যেই এদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু উনি খেয়াল করেছিলেন যে আশির দশকে অন্ধ্র প্রদেশে কোন্ডাপল্লী সীতারামৈয়ার নেতৃত্বে  ক্ষমতা বিস্তার করা পি ডব্লিউ জি বা পিপল্‌স্‌ ওয়ার গ্রুপ সামরিক ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক হয়ে প্রস্তুত হয়েছে। এরা অন্ধ্র প্রদেশের উপকূল এলাকা ধরে দক্ষিণবঙ্গে  ছড়িয়ে পড়লে আগের কায়দায় নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্র এর পক্ষে কঠিন হবে। আজকে তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রথম দশকের শেষে দেখা যাচ্ছে এটা অনেকখানি সত্যি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।  বিশেষ করে সীতারমৈয়ার দলত্যাগ, ধরা পড়া ও মৃত্যুর পরে মুপল্লা লক্ষ্মণ রাও বা গণপতির নেতৃত্বে পুরনো সিপিআই (এম-এল) ও পিপলস্‌ ওয়ার গ্রুপের  সমন্বয়ে আজকের সিপিআই(মাওবাদী) প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের কথায় সবচেয়ে বড় আভ্যন্তরীণ বিপদ। অন্ধ্র-উড়িষ্যা-ঝাড়খন্ড-বস্তার-বিহার ও রাঢ়বাংলায় এদের দমন করতে তৈরি হয়েছে সংযুক্ত কম্যান্ড। অপারেশনে লাগানো হয়েছে সিআরপি, ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস্‌, ইন্ডো- টিবেটান বর্ডার ফোর্স ইত্যাদির সঙ্গে লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে ভারতের  সামরিক বাহিনী। বস্তারের জঙ্গলে খুলতে হয়েছে জাঙ্গল-ওয়ারফেয়ারের ট্রেনিং কলেজ। আর নকশালপন্থী-থুড়ি আজকের মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ সদস্যের ডাগ আউট হল ছত্তিশগড়ের বস্তার এলাকার অবুঝমাড় । সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে আজকের সংলগ্ন রাজ্যগুলিতে ওদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের লড়াই।

            কোন সন্দেহ নেই যে সামরিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক হাতিয়ার ব্যবহার করার ব্যাপারে বর্তমান মাওবাদীরা প্রাক্তন নকশালপন্থীদের থেকে একযুগ এগিয়ে আছে। 'তীব্র শ্রেণীঘৃণা থাকলে আদিম হাতিয়ার দিয়েও লড়াই করা যায়' গোছের চারদশক আগের নীতিতে এদের আস্থা নেই। একে ৪৭ স্তরের আধুনিক স্বয়ংক্রিয় হাতিয়ার, ল্যান্ডমাইন ইত্যাদির প্রয়োগে এরা দক্ষতা  অর্জন করেছে। অ্যামুনিশনের সাপ্লাই এতটাই যে বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকারের সামরিক শক্তির সঙ্গে এনকাউন্টারে এরা কয়েকঘন্টা ধরে গোলাগুলি চালিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি চোখ টানে এদের রণকৌশল। যেভাবে প্রশিক্ষিত কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশের সার্চপার্টিকে এরা প্রলুব্ধ করে নিজেদের পছন্দমত জায়গায় এনে ঘেরাও করে মোক্ষম হামলা করেছে তা শুধু ছত্তিশগড়ের  সরকার ও পুলিশবিভাগকে নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহমন্ত্রালয়কেও চিন্তায় ফেলেছে।

           উপদেষ্টা হিসেবে পাঞ্জাবে খালিস্তানি দমনের সামরিক ব্লু-প্রিন্ট বানানোর জন্যে খ্যাতিপ্রাপ্ত কে এস গিলকে আনা হয়েছিল। একবছর পর তিনি ফিরে গেছেন। হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় প্যালেস্তাইনে অ্যান্টি-গেরিলা ওয়ারের অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত ইজরায়েলি অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্যে আনা হবে কি না!

        কোয়লিবেড়া, কোরাবোড় ও  দক্ষিণ বস্তারের বিভিন্ন এলাকায় বুবি ট্র্যাপ দিয়ে সাঁজোয়া গাড়ি উড়িয়ে দেয়া ও তারপর হতভম্ব সরকারি বাহিনীর ওপর সুবিধাজনক অবস্থান থেকে গুলি চালিয়ে শেষ করে দিয়ে হাতিয়ার ও গোলাবারুদ লুঠ করে ফিরে যাওয়া-- মোটামুটি এই হল মাওবাদী আক্রমণের রণকৌশল।একেকটি হামলায় সরকারি বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা দশ-বিশ-পঁচিশ-পঁচাশ থেকে পঁচাত্তর অব্দি দাঁড়িয়েছে। বস্তারের সংলগ্ন ওড়িষ্যার কোরাপুটে  কয়েকশ' মাওবাদী গেরিলার শহরে ঢুকে জেল ভেঙে বন্দীদের ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মত দুঃসাহসিক ঘটনাও ঘটেছে। গত মাসে ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুর থেকে প্রায় দেড়শ' কিলোমিটার দূরে মৈনপুরের কাছে কৃষকদের জমির পাট্টা ও লোন বিতরণের জন্যে আয়োজিত জনসভার থেকে ফেরার সময় মন্ত্রীর কনভয়ের ওপর হামলা হয়। অল্পের জন্যে মন্ত্রী বেঁচে যান, মারা যায় ওনার বডিগার্ড ও কিছু সরকারি কর্মচারি। জানা যায় যে হামলার পর মাওবাদী গেরিলারা যখন কাছে এসে দেখে যে পেছনের কিছু জীপে আরোহীরা সাদাপোষাকের পুলিশ নয়, সাধারণ কৃষক মাত্র, তখন ক্ষমা চেয়ে ওদের প্রাথমিক চিকিৎসা করে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

          নিঃসন্দেহে এইসব ঘটনার প্রভাব পড়েছে সরকারি বাহিনীর মনোবলের ওপর। রাজ্যপুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব প্রকট হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জোয়ানেরা অভিযোগ করেছেন জঙ্গলে ঠিকমত রসদ, মশারি ও অ্যান্টি মসকুইটো ক্রিম না পাওয়া নিয়ে। সরগুজা জেলায় একটি কিশোরীকে গেরিলা সমর্থক অজুহাতে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার পর গ্রামবাসীরা সরকারি বাহিনীর ক্যাম্প ঘিরে বিক্ষোভ জানায়। তদন্তে পুলিশের গল্পটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় সরিয়ে দেয়া হয়েছে ছত্তিশগড়ের ডায়রেক্টর জেনারেল অফ পোলিস বিশ্বরঞ্জনকে।

              কিন্তু ছবিটি এতটা একরঙা নয়। ভারত সরকারের গৃহমন্ত্রালয়ের তৈরি ব্লু-প্রিন্টে গত দু'বছর ধরে চলছে অপারেশন গ্রীন হান্ট।
         
               দন্ডকারণ্যের অন্তর্গত বস্তারের অধিকাংশ এলাকা আদিম ঘন জঙ্গলে ঢাকা। আর আছে কেশকাল ঘাঁটি ইত্যাদি পাহাড়। প্রতি বর্ষায় ইন্দ্রাবতী নদী প্লাবিত হয়ে বস্তারকে কার্যতঃ দুভাগে ভাগ করে। ইতিহাসবিদ ও পুরাতত্ত্ববিদ প্রয়াত ডঃ সংকালিয়া সত্তরের দশকের শুরুতে রামচন্দ্রের লংকা আসলে  দক্ষিণ বস্তার, সমুদ্র মানে বর্ষার ইন্দ্রাবতী নদী, আর রাক্ষস মানে উত্তর ভারতীয়দের চোখে বস্তারের জঙ্গলের আদিবাসী -- এইসব বলে ব্যাপক বিতর্ক শুরু করেছিলেন।
    অপারেশন গ্রীন হান্ট মানে এই ঘনসবুজ এলাকাকে মাওবাদীদের হাত থেকে মুক্ত করা।
          
        তার জন্যে স্ট্র্যাটেজি হল এক, গ্রামগুলো যাতে মাওবাদীদের সাপ্লাই বেস না হয় তার জন্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে মার্কিন সেনার ব্যবহার করা কায়দায় স্ট্র্যাটেজিক হ্যামলেট বানিয়ে তাতে গ্রামবাসীদের আলাদা করে রেখে স্পেশাল পুলিশ ফোর্স বা স্থানীয় যুবকদের হাতে বন্দুক দিয়ে ওদের দিয়ে নজরদারি করানো। দুই, মাওবাদীদের শহুরে নেটওয়ার্ককে নষ্ট করা; সিমপ্যাথাইজারদের চিহ্নিত করে ব্যাপক জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিষ্ক্রিয় করা। তিন, মাওবাদীদের হিংসা, সন্দেহের বশে আদিবাসীদের নির্বিচারে মেরে ফেলার ঘটনাকে প্রচারের আলোয় এনে মাওবাদীদের 'গরীবের ভগবান' জাতীয় ভাবমূর্তিটিকে মিথ প্রতিপন্ন করা। চার, যে সব ব্যবসায়ীরা বা বড় শিল্পপতিরা মাওবাদী এলাকায় নিজেদের ব্যবসা- বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার জন্যে মাওবাদীদের সমানান্তর প্রশাসনকে প্রোটেকশন মানি বা ট্যাক্স দিচ্ছে তাদের কোণঠাসা করে মাওবাদী আন্দোলনের আর্থিক সাহায্য বন্ধ করিয়ে দেয়া।

          অনেক বুদ্ধিজীবি অভিযোগ করেছেন অপারেশন গ্রীন্‌হান্টের আসল উদ্দেশ্য ভারতের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের ও বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনালদের জন্যে বস্তারের খনিজ সম্পদ লুঠের দরজা খুলে দেয়া। ওনাদের কথা অনুযায়ী মাওবাদী আন্দোলন আসলে এই মাল্টিন্যাশনালদের রাক্ষসী আগ্রাসন থেকে বস্তারের বনজ ও খনিজ সম্পদ রক্ষার জন্যে আদিবাসী মারিয়া-মুরিয়া জনজাতির প্রতিরোধ। এই অভিযোগপত্রে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আছেন লেখিকা অরুন্ধতী রায়, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী গৌতম নওলাখা, অর্থনীতিবিদ অমিত ভাদুড়ি, দিল্লির অধ্যাপক ও মানবাধিকার কর্মী নন্দিনী সুন্দর, পরিবেশবাদী মেধা পাটকর ও অনেক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবি। আপাত দৃষ্টিতে কথাটা সত্যি মনে হয়। বস্তারের জঙ্গলে ইস্পাত শিল্পের জন্যে বিশাল জমি অধিগ্রহণ করেছে টাটা ও পাওয়ার-জায়ান্ট এস্‌সার গ্রুপ। শোনা যায় সলওয়া জুড়ুম , যার স্থানীয় হাল্বী ভাষায় অর্থ 'সার্বজনীন শান্তি', নামের  মাওবাদী-প্রতিরোধী আন্দোলনের পেছনে এদের আর্থিক সাহায্য কাজ করছে।

           টাকার উল্টোপিঠটি দেখা যাক। সিপিআই(মাওবাদী) দলের রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো , যা কি না অন্তরজালের পাতায় সহজলভ্য, বলছে ওরা ক্ষমতায় আসলে পরে ভারতকে শত্তিশালী শিল্পোন্নত দেশ বানাবে। এর সঙ্গে  তৃতীয় বিশ্বের যেকোন ওয়েলফেয়ার স্টেটের পক্ষে সওয়াল করা যেকোন রাজনৈতিক দলের ম্যানিফেস্টোর কিছু পলিটিক্যাল জার্গন ছাড়া মৌলিক তফাৎ কোথায়! আর প্রাকৃতিক সম্পদকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার না করার কথা কোথাও বলা নেই। তাহলে? আবার এদিকে ঘটেছে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এস্‌সার কোম্পানী থেকে মাওবাদীদের নিয়মিত টাকা পৌঁছানোর এজেন্ট ঠিকাদার বি কে লালাকে পুলিশ মাওবাদী প্রতিনিধির হাতে ১৫লাখ দেয়ার সময় বামাল গ্রেফতার করেছে।তারপর পুলিশ দন্তেওয়াড়া জেলার কিরন্দুলে এস্‌সার কোম্পানীর হেডকোয়ার্টারে গিয়ে ওদের জেনারেল ম্যানেজার ডি এস সি বি বর্মাকে ইন্টারোগেট করেছে। বিগতস্থানীয় স্টেট ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের লেনদেন পরীক্ষা করে দেখেছে।

     বিগত ১৩ সেপ্টেম্বরে মাওবাদী আন্দোলন প্রভাবিত ৬০ জেলার কলেক্টরদের নিয়ে এক ওয়ার্কশপে কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী চিদাম্বরম জানাচ্ছেন যে মাওবাদী হামলায় মারা গেছে ২৯৭ জন, আর অন্য টেররিস্ট হামলায় ২৭ জন এবং উগ্রবাদী হামলায়  ৪৬ জন। তাই একদিকে চিদাম্বরম মাওবাদীদের অস্ত্রসমর্পণ বা রাজনৈতিক বিচারধারা বর্জনের মত পূর্বশর্ত ছাড়াই আলোচনার টেবিলে বসতে আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাজধানী রায়পুরের মানা বিমানবন্দরের কাছে ৪০০ একড় জমি নিয়ে তৈরি হবে এয়ারফোর্সের বেস স্টেশন। আরেকটি হবে ভিলাইয়ের কাছে নন্দিনীতে।  ইতিমধ্যেই লজিস্টিক সাপোর্টের নামে রায়পুরে স্থাপিত হয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর  ১) ছত্তিশগড়-ওড়িষ্যা সাব-এরিয়া হেডকোয়ার্টার,২) টেরিটোরিয়াল আর্মি বেস্‌, ৩)ইন্ডিয়ান মিলিটারি স্কুল, ৪) জাঙ্গল ওয়ারফেয়ার ট্রেনিং সেন্টর(নারায়ণপুর, বস্তার), ৫) ২১০০ একর জমি নিয়ে কাউন্টার  ইন্সার্জেন্সি ট্রেনিং সেন্টর, সরাইপালী।

             বর্ষা চলে যাচ্ছে। নতুন ডিজি নবানীর সঙ্গে প্রথম সমীক্ষা বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী রমণ সিং বলছেন--   জঙ্গল মেঁ ঘুসকর মারো নকসলিয়োঁ কো। রাজ্যের গৃহমন্ত্রী ননকীরাম বলছেন যে সরগুজা জেলায় মাওবাদীদের নিকেশ করার কাজ সম্পূর্ণ। এবার বস্তারের পালা।

              এবার মাওবাদীদের ক্ষয়ক্ষতির দিকটা দেখা যাক। কেন্দ্রীয় কমিটির তাত্ত্বিক নেতা কোবাড গান্ধী জেলে, নাগপুরের দলিত বস্তিতে দীর্ঘদিন কাজ করা ওনার স্ত্রী অরুন্ধতী গান্ধী বস্তারের জঙ্গলে অপুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে যক্ষ্মায় মারা গেছেন। ভারত সরকারের সঙ্গে  আলোচনায় রাস্তা তৈরি করতে ভারপ্রাপ্ত চেরকুরি রাজকুমার 'আজাদ'কে কথিত এনকাউন্টারে মেরে ফেলা হয়েছে। কোলকাতার নারায়ণ সান্যাল বা 'বিজয়' সত্তর বছর বয়সে ছত্তিশগড়ের জেলে আজীবন কারাবাসের দণ্ডভোগ করছেন। যদিও সুপ্রীম কোর্ট সলওয়া জুড়ুম আন্দোলন এবং নিয়মকানুনের বাইরে আইন শৃংখলা রক্ষার জন্যে আদিবাসীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়াকে বে-আইনী ঘোষণা করেছে, কিন্তু ছত্তিশগড় সরকার পুরোনো এসপিও দের নতুন বাহিনীর নামে নিয়োগপত্র দিয়ে বৈধতা দিচ্ছে।

        সবচেয়ে লোকসান বোধহয় এই যে ব্যাপক ছত্তিশগড়ের সমতলে জনসাধারণের মধ্যে, বিশেষত: কৃষকদের মধ্যে মাওবাদী আন্দোলনের কোন সমর্থন নেই। বিশ বছর আগে বস্তারের তেন্দুপাতা ঠিকেদারদের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের মজুরি বাড়ানোর আন্দোলন, আদিবাসী মহিলাদের ওপর বহিরাগতদের যৌনশোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ ইত্যাদির মাধ্যমে মাওবাদীরা আপামর জনসাধারণের মনে একটি শ্রদ্ধার আসন পেয়েছিল। আজকে নির্বিচারে গাঁয়ের লোকদের সন্দেহের বশে হত্যা, পুলিশের চর অভিযোগে বিরোধী রাজনীতির লোকদের গলাকাটা সমতলের লোকদের কাছে মাওবাদীদের ভয় ও ঘৃণার পাত্র করে তুলেছে।
     
        সমতলের কৃষকদের জন্যে কোন আন্দোলন মাওবাদীরা করছে না, ওদের কোন সংগঠন নেই। তাই এতদিন গরীবের জন্যে কাজ করেও মানবাধিকার কার্যকর্তা ডঃ বিনায়ক সেন সুপ্রীম কোর্টে জামিন পেলেও রায়পুর শহরে থাকতে পারছেন না। রাজদ্রোহের অপরাধী নকশাল নেতা নারায়ণ সান্যালের চিকিৎসার জন্যে ওনার জেলের মধ্যে তিরিশবার দেখা করা সাধারণ লোক মেনে নিতে পারছে না। ব্যাপারটা এখন দুদিক থেকেই 'আমরা-ওরা'য় দাঁড়িয়ে গেছে। মাওবাদীরা বস্তারে ইন্সট্যান্ট জাস্টিস (খানিকটা দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ গোছের) দিয়ে জনতার রক্ষক হয়েছিল। আজ ওদের ক্যাঙ্গারু কোর্ট (অরুন্ধতী রায় যাই বলুন) ছত্তিশগড়ে বিবমিষা তৈরি করেছে। ফলশ্রুতি- সমতলে জন আন্দোলনের স্পেস ভীষণভাবে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এখানে এখন মানবাধিকারের কথা বলা অপরাধ। অধিকাংশ এনজিও সন্দেহের তালিকায়।
        
        আর বস্তারের জনগোষ্ঠি মারিয়া-মুরিয়া-বাইসন মারিয়ারা বিস্তীর্ণ ছত্তিশগড়ের ওরাঁও-গোঁড়-কঁওয়র-বিঁঝওয়ার ইত্যাদি আদিবাসীদের থেকে মূলত: আলাদা। বস্তারের উপভাষাও ছত্তিশগড়ি নয়, হল্বী। ওটা অন্ধ্র এলাকার তেলেগু ভাষার সঙ্গে মেলে। তাই শংকর গুহনিয়োগী ও যোগী রায়েরা সত্তরের দশকে বস্তারে ঘাঁটি বানাতে ব্যর্থ। একই কারণে নব্বইয়ের দশকে অন্ধ্র প্রদেশে গ্রে-হাউন্ডের তাড়ায় পুরনো নকশাল আন্দোলনের ঘাঁটি শ্রীকাকুলাম,খাম্মাম আদি থেকে লং মার্চ করে দক্ষিণ বস্তারে ঘাঁটি গড়ে তুলতে পেরেছেন গণপতি-কিষেণজীরা। আজ ওদের সর্বভারতীয় হেডকোয়ার্টার হল বস্তারের অবুঝমাড়, যেখানে কয়েকদশক আগে আদিবাসীদের ঘোটুল প্রথা বা কিশোর-কিশোরীদের একসঙ্গে একধরণের কমিউনে থেকে সাবালক হয়ে ওঠার প্রথা নিয়ে ফিলিম বানাতে বিবিসির লোকজন এসেছিল।
         
        সব মিলিয়ে ছত্তিশগড়ে বর্তমান মাওবাদী আন্দোলনের ছবিটা কী? কিইবা এর ভবিষ্যত?  ব্যাপক ও উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গেছে। অন্ধ্র প্রদেশের ভারভারা রাও বা গদ্দারের মত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের লোক এখানে সামিল হন নি। ওদের আন্দোলন বস্তারের দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলের টেরেন ছেড়ে সমতলে ছড়াতে পারছে  না। কেমন যেন শ্রীলংকার লিট্টে আন্দোলনের শেষ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সমুদ্র দিয়ে ঘেরা জাফনা আর সমতল ও শিল্পাঞ্চলের বিস্তার দিয়ে ঘেরা বস্তারের পরিণতি একই। চিদাম্বরমরা ভেতরে তলোয়ার শানাচ্ছেন আর বারবার নিঃশর্ত আলোচনার কথা বলে যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য সরকারের তুলনায় মাওবাদীদের একগুঁয়ে, অমানবিক প্রতিপন্ন করা। যাতে আগামী মিলিটারি অপারেশনের সময় মাওবাদীরা কোথাও কোন সহানুভূতি না পায়। আজকের বস্তারে একদিকে সরকারি বাহিনী ও এসপিও, অন্যদিকে মাওবাদী গেরিলারা। মাঝখানে জাঁতা কলে পিষছে আদিবাসীরা।
          স্থানীয় কবি শাকির আলীর ভাষায়ঃ
           তুমি কোন দলে -- মাওবাদীদের?
           -- না।
            তবে কি সরকারের ?
           -- তাও নয়।

           আমি হচ্ছি সেই আদিবাসী বুড়ো,
           যে বসে আছে পুড়ে যাওয়া কুঁড়ে ঘরের সামনে।
           যার একছেলে গেছে পুলিশের গুলিতে, আরেকটি মাওবাদীদের।
           যে ভুলে গেছে নিজের অতীত,
           যার ছানিপড়া চোখে ধরা দেয় না ভবিষ্যৎ।

     

    (পরের পর্বে সমাপ্য)

    পূর্বপ্রকাশ ঃ 'আজকের দিন' 


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৬ আগস্ট ২০১২ | ৩০৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • রূপঙ্কর সরকার | 126.202.195.203 (*) | ১৭ আগস্ট ২০১২ ০৩:০০90117
  • লেখা,টা সত্যি দারুণ। আগের বার মেদবর্জিত বলেছিলা্‌ম, এত জটিল পরিস্থিতির এত সহজ সিনপ্টিক ভিউ চট করে বের করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। মতামতের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে কিছু কোনওদিনই বলিনা, আজও বলবনা। একমত না হওয়ার বাঙলির পুরুষানুক্রমিক জাতধম্মে দখলআন্দাজি করবনা। লেখার স্টাইলটা নিয়ে বলব, এক মিলিমিটারও মেদ নেই, ঝরঝরে।
  • ananyo | 127.201.113.32 (*) | ১৭ আগস্ট ২০১২ ০৪:৪২90118
  • তো শেষমেশ পুজিবাদের মানবিক সংস্করণ ও ''গণতন্ত্রের মধ্যবিত্ত'' চলন ,এই তো?
  • শুদ্ধ | 127.194.242.116 (*) | ১৭ আগস্ট ২০১২ ১১:৪৯90116
  • পড়ে চলেছি। শেষ পর্বের পরে লিখবো। এখন শুধু এটাই বলি যে কথাটা সত্যি, সব পক্ষের গোলা-বারুদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে জনসাধারণ। এর একটা বড় দায় হল সংসদীয় দলগুলোর, যারা সত্যি সত্যি কখনোই বিরোধী হয়নি। শাসক হবার দিকেই যাদের প্রাণপণ নজর থেকেছে। না হলে মাওবাদীরা তো হাওয়ায় বাড়তে পারে না! বনবাসী জনজাতির মানুষের দিকে যদি স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর সত্যি নজর থাকতো তাহলে তাদের বঞ্চনার অবসান হয়নি কেন? কেন তাদের এখনো এমন ভয়ঙ্কর জীবন? কেন কেউ হাতে অস্ত্র নেওয়ার পরে মিটিং হয়, কমিশন হয়, নানা প্রকল্প হয় উন্নয়নের। আগে হতে পারতো না? আর সেই উন্নয়নের প্রকল্পের মধ্যেও আগে থাকে রাস্তাঘাট পাকা করা, সশস্ত্র সরকারের গাড়ি ছুটবে বলে? জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, জীবিকার মতন বুনিয়াদী সমস্যা রাস্তাঘাট হয়ে গেলেও যে তিমিরে প্রায় সে তিমিরেই থাকে কেন? মানুষ যদি মানুষের ন্যূনতম সম্মানীয় জীবন পায় মাওবাদীরা থাকতে পারে নাকি?

    মানুষ শান্তি প্রিয়। সে অযথা রক্তপাত-হানাহানি চায় না। তাই তার দায় নেওয়ার কথা বলে যখন মাওবাদীরা লড়াইটাকে শুধু অস্ত্রের লড়াইতে নিয়ে যাচ্ছে, কিছুটা সরকারের চালে পা দিয়েই- তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেবেই। নিচ্ছেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে। আবার সরকার, বিরোধী স্পেসটায় মাওবাদীদের প্রবেশের বিষয়টা সামনে রেখে মানুষের কথাগুলোকে গুলিয়ে দিচ্ছে, বিরোধী মানেই মাওবাদী তকমা দিয়ে। তাতে তারও সুবিধে। দাঁত-নখ বের করে সে তার নিজের নাগরিকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সংবিধান যতটুকু মানবাধিকার বা নাগরিক অধিকার দিয়েছে তাকেও হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছে। কেন না মাওবাদী বলে দিলেই আর সংবিধানের মান্যতার দায় তার থাকে না।

    সত্যিই কি তাই? একদমই নয়। যাঁরা সংবিধান বানিয়েছিলেন তাঁরা নাগরিকের জন্য যে সব রক্ষাকবচগুলো, বিরোধী স্পেসের জন্য যা রেখেছিলেন তাকে এখন সরকার নানা এক্সট্রাজুডিসিয়াল আইনের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। মিডিয়ার একাংশের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এই যে বিনায়ক সেন কাজ করতে পারছেন না নারায়ণ স্যান্যালের সঙ্গে তিরিশবার দেখা করেছেন বলে, এখানে দেখছি রঞ্জনদা বলছেন রায়পুরের মানুষ এটাকে মেনে নিতে পারছেন না বলে এমন হচ্ছে। এটার পিছনে তথ্য কি? উল্টো দিকের কথা হল, রমন সিং-এর সরকার ওনাকে থাকতে দিচ্ছে না। সাধারণ মানুষের কথা মিডিয়ায় সামনে আসছে যখন তখন সে তার ভয়ে বলা কথা। কে ঠিক এবারে কে বলবে?

    এই যে সাধারণ মানুষের বিনায়ককে না মানার তত্ত্ব এমন কত তত্ত্ব তো সব পক্ষই দিয়ে চলেছে। কে জানলো সাধারণ মানুষ কি চাইছেন? সরকার? মিডিয়া? মাওবাদী? যেখানে ওপিনিয়ন ম্যানুফ্যাকচারড এবং সেন্সরড সেখানে সত্যি-মিথ্যে কে জানে? যেখানে সোনি সোরির বাবাকে মাওবাদীরা গুলি করে পুলিশের চর বলে, আর ভুয়ো কাগজ দিয়ে তাকেই জেলে রাখে সরকার, সেখানে সত্যি-মিথ্যের বিচার হয় কি ভাবে? ভারতের যে কোনো আদালতে কোনো বন্দী মাওবাদী জাতীয় তকমা পেলে তার কথা শুনে কি বিচারকরা তাকে জেল-হাজতে পাঠান বা পুলিশি হেপাজতে? নাকি ওটাই কনভেনশন বলে পাঠিয়ে দিচ্ছেন? কত কত মানুষ স্রেফ মিথ্যে মাওবাদী তকমায় বন্দী? সত্যি মাওবাদী বন্দী যারা তাদের বিচারও এত অস্পষ্ট কেন? কেন বিনা বিচারে একটা মানুষও জেলে থাকে এ দেশে? সত্যি-মিথ্যের সীমানাটা এতটাই দুর্বল যে তার অজুহাতে যার হাতে ক্ষমতা সে যা খুশী করে চলে, বলে চলে।

    বনের গ্রামগঞ্জ থেকে তুলে এনে ঘেরাটোপে শুধু মাওবাদীদের থেকে পৃথক করতে সরকার রাখছে নাকি মানুষগুলোকে? এই সুযোগে সে বড় বড় শিল্পমালিকদের জন্য গ্রাস করে নিচ্ছে সম্পদ, যার প্রাথমিক অধিকার হল বনবাসীদের। তার বিনিময়ে সেই বনবাসী কি পাচ্ছে? যার সঠিক প্রয়োগে গোটা দেশ উপকৃত হতে পারে, সেই খনিজ চলে যাচ্ছে অশোধিত কাঁচামাল হয়েই বিদেশে। আর দেশের শিল্প শুধু সেই ব্রিটিশের পাটের দালালের মতন কাঁচামাল, বড়জোর শোধিত হলে ইস্পাত ইত্যাদির ফর্মেই চালান দিয়ে সন্তুষ্ট। এই যে যাচ্ছে এই ভাঁড়ার এ শেষ হয়ে যাবে কদিন পরেই। তখন কি হবে? বৃহৎ শিল্পের শ্রম নিবিড় চেহারা এখন কতটা সম্ভব? মানুষ তাহলে কাজ পাবে কোথায়? ক্ষুদ্র শিল্পকে ধীরে ধীরে হত্যা করা হল কেন গোটা ভারত জুড়ে? বৃহৎ শিল্পই কি শুধু পারে, তার বিকল্প কিছু আছে? এসব আলোচনা কই হয়েছে? সরকার করেছে সিরিয়াসলি? শিল্পের যে প্রয়োজন তার জন্য সত্যি কি সঠিক কোনো সরকারী পরিকল্পনা আছে? খুব অপরিস্কার এর উত্তরগুলো। মঙ্গল বা বৃহষ্পতির থেকে ভবিষ্যতের খনিজ সংগ্রহ করার প্রথম পদক্ষেপ নাসার অভিযান, তাই ভারতও সে কাজ করবে- এমন সব নানাবিধ হাওয়াগাড়ি পরিকল্পনা রাজধানীর অলিন্দে ঘোরে-ফেরে। তার বেশী?

    মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বিধানসভায় যখন বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতির কথা বলছেন তখন তাঁর এই প্রতিক্রিয়ার তাৎক্ষণিক কারণগুলো কি কি নিয়ে অনেকেই সরব দেখছি। সে ঠিক-ভুল বাদ দিয়েই বলছি (মমতা যা বলেন সব ভুল এমন মনে হয় না আমার, আগেও যেমন যা বাম করছে সব ভুল মনে হয়নি) , কথাটা কি খুব অন্যায্য? বিচার ব্যবস্থা কি প্রশ্নের উর্ধে নাকি? আদালত অবমাননার একটা বিধি আছে বলে, যা সাদা চোখে দেখা যায় তার কথা কেউ বলতে পারবে না? যদি বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালী না হয় তাহলে রমন সিং-এর ছত্তিশগড়ের মতন গুন্ডা স্টেট-এর বিরুদ্ধে মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

    দেখাই তো যাচ্ছে সংসদীয় বাকী দলগুলো মাঝেসাঝে দূর থেকে হাত-পা নেড়েই ক্ষান্ত, মানুষের দায় তারা নিচ্ছে না। নিলে রমন সিং থাকে কি করে এত কিছুর পরেও? কি করে চিদাম্বরম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল? কি করে মাওবাদীরাই শুধু এই সব অঞ্চলে প্রধান বিরোধী হয়ে দাঁড়ালো? কি করে স্বাধীনতার পরে সুস্থ শ্বাস নেবার ইচ্ছে থাকা মানুষোগুলো আজ প্রায় শ্মশানে দাঁড়ালো? অনেক প্রশ্ন, আর উত্তর মোটেও সহজ কিছু না।
  • বিপ্লব রহমান | 127.18.231.14 (*) | ১৮ আগস্ট ২০১২ ১০:৪৬90119
  • রঞ্জন রায়,

    এই পর্ব থেকেও অনেক কিছু জানলাম। দৃশ্যতই জনবিচ্ছিন্ন অস্ত্র নির্ভর রাজনীতিতে [কথিত মাওবাদে] শেষ পর্যন্ত সমাজ বিপ্লব সম্ভব নয়, অহেতুক রক্তপাতের পর এর ভবিষ্যত নকশালবাদী তথা আত্নঘাতিতার চোরাবালিতে; ইতিহাসের লীলা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না এবং আরেক লীলা যে, ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি ঘটায় [আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র/বুবি ট্রাপ/এনকাউন্টার স্বত্ত্বেও]। এই পোড়া দেশ [এবং এপার বাংলা] শেষশেষ টাইগাম বামই পেলো, ঝান্টু/মিল্লাত বাম তো অজস্র, কিন্তু কাঙ্খিত দিন বদল আর হলো কই?

    আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। চলুক।
  • Biplob Rahman | 190.234.212.49 (*) | ২৮ অক্টোবর ২০১৩ ০২:০৮90120
  • *টাইগার বাম
  • আরিফুজ্জামান তুহিন | 124.130.66.19 (*) | ২৮ অক্টোবর ২০১৩ ০৪:৩০90121
  • রঞ্জনের কথা শুনে মনে হচ্ছে বিপ্লবের শিক্ষা নিতে স্বামী বিবেকানন্দের কাছেই তাইলে যেতে হবে। অথবা নগর কীর্ত্তন গাইতে গাইতে সাধুরা যাবেন, আর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল হয়ে যাবে। আর মার্কস ব্যাটা একটা ঢ্যামনা ছিলো অবধারিতভাবে। কারণ সেই যে তিনি কহিলেন, ইতিহাস পরিবর্তন হয় রক্তাত্ব শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। নিম্চয় শ্রেণী সংগ্রাম বলতে মমতা বনাম সিপিএম এর গুন্ডামি বুঝে থাকেন ওপারের মার্কসবাদী দাদারা।
    ভাগ্যিস মার্কস বেচে নেই। থাকলে নিশ্চিত গঙ্গার নোংরা জলে গলায় কলসি বেধে আত্মহত্যা করতেন।
    এ কারণে আপাততো লালন ফকিরেই থাকি, ‘’এতো দেখি কানার হাট বাজার’।
    জয় মা কালি।
  • aranya | 154.160.5.25 (*) | ২৮ অক্টোবর ২০১৩ ০৬:৫৩90122
  • মুশকিল হচ্ছে যে 'রক্তাত্ব শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে' যেসব দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল হয়েছিল - যেমন রাশিয়া, চীন ইঃ, সেই সব দেশে তো মানুষ ইভেনচুয়ালি খুব ভাল থাকে নি। প্রচুর সাধারণ মানুষ-কে খুন করা হয়েছে,বন্দী করে রাখা হয়েছে সারাজীবন, একনায়কত্ব এসেছে, করাপশন এসেছে, পার্টির নেতারা আরাম, বিলাসে থেকেছেন, আম জনতা খাবারের দোকানে লাইন দিয়েছে, হিউম্যান রাইটস-এর মা-মাসি করা হয়েছে..
    শ্রেষ্ঠ পথ কি জানা নেই, কিন্তু মার্ক্স বলেছেন বলেই তো আর কোন পথ 'সত্য, কারণ ইহা বিজ্ঞান' হয়ে যায় না।
  • মনিরুজ্জামান | 124.130.67.19 (*) | ২৮ অক্টোবর ২০১৩ ০৭:৩৯90123
  • বিজ্ঞানের বিষয়টি কি আপনারা আলাদা ডিপার্টসেন্ট মনে হয়? যেমন আজকের যুগের করপোরেটতন্ত্রে গোপন কেশ (পড়ুন বাল অের্থে) গোনার জন্যও আলাদা কেরানি নিয়োগ দেয়া হয়?
    আর বিজ্ঞান বলতে আপনার বোঝ বিবেচনাটাও পরিস্কার বুঝে নিতে চাই। সেটা কি আরেক ধর্ম বিশ্বাস?
    মার্কস কি কহিয়াছেন? আর কি ভুল প্রলাপ বকিয়াছেন তার কি পার্থক্য করতে পারেন? আপনার বক্তব্য পড়ে সটান যে সরল পাঠ দাড়াবে তাহলো আপনি মার্কসের কিতাবের কোন আয়াত পড়েননি। আর যদি পড়েও থাকেন তাহলে তা বোঝার মত এলেম আপনার নেই। যদি থাকে তাহলে মার্কসের ভুল কোথায় বললেন সেটা জানাবেন।
  • aranya | 154.160.5.25 (*) | ২৮ অক্টোবর ২০১৩ ০৭:৫১90124
  • মার্কস পড়েছি কিছু, বোঝার মত এলেম নেই, তা হতেই পারে, নিজেকে বোকা ভাবতে আপত্তি নেই।
    মার্ক্স কি বলেছেন, বিজ্ঞানের সংজ্ঞা কি ইত্যাকার বিষয়ে আগ্রহী নই।
    'রক্তাত্ব শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে' রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর কোন কোন দেশের মানুষ ভাল অছে, এইটা জানতে আগ্রহী। পারলে কিছু উদাহরণ দেবেন
  • দেব | 111.210.44.247 (*) | ২৯ অক্টোবর ২০১৩ ০৪:৫৮90125
  • মনিরুজ্জামানবাবু, একটু কনটেক্সট দিয়ে দি তাহলে অরণ্যদার কথাটা বুঝতে সুবিধা হবে। এপার বাঙ্গলায় দীর্ঘদিন একটা কথা প্রচলিত ছিল - "মার্ক্সবাদ সত্য/সঠিক কারণ ইহা বিজ্ঞান"। বিজ্ঞান বলতে ন্যাচারাল সায়েন্স ফিজিক্স, কেমিষ্ট্রি এগুলো বোঝানো হচ্ছে। শুধু বিশেষ জ্ঞান নয়।

    মার্ক্সের থিসিসটা ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, দর্শনের মিলে তৈরী। সেটার ঠিক ভুল নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু এটাকে বিজ্ঞানের (টেকনিক্যাল সেন্সে) মর্যাদা দিয়ে বিপক্ষকে তর্কে চুপ করিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা এপারে ছিল। তাই অরণ্যদার কমেন্ট।
  • Ranjan Roy | 132.175.179.110 (*) | ২৯ অক্টোবর ২০১৩ ০৭:৩৩90126
  • মনিরুজ্জমানবাবু,
    স্পষ্টত: আপনি মার্ক্সসায়েবের অনেক আয়াত পড়েছেন। তাই এই হাবাগোবার কিছু প্রশ্ন:
    এক, মার্ক্স শুধু হিংসার পথে বিপ্লবের কথাই বলেছেন? কোন আয়াতেই বিশেষ কংক্রিট পরিস্থিতিতে ‘শােন্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে্ উত্তরণের সম্ভাবনার’ কথে বলেন নি?
    দুই,
    মার্ক্স– এংগেলস নিজেদের আদৌ ত্রিকালজ্ঞ ঋষিমুনি ভাবতেন না, কংক্রিট সিচুয়েশনের বিশ্লেষণের কথা বলতেন। আর বিশ্লেষণের হাতিয়ার হল দ্বন্দ্বমূলক বস্তবাদ সংক্ষেপে যার মূলকথা হল –১) প্রত্যেক বস্তুর অস্তিত্বের শর্ত হল দুই বিপরীতের ঐক্য,২) বিকাশের শর্ত হল দুই বিপরীতের পারস্পরিক সংঘাত,৩) পরিবর্তনের শর্ত হল বিকাশের এক নিশ্চিত মাত্রায় পৌঁছে পুরানো ঐক্যের ধ্বংসের মাধ্যমে গুণগত পরিবর্তন।
    তিন,
    আর ডায়লেক্টিসের হিসেবে কোন জিনিসই হয় হ্যাঁ, নয় না,–এমন হয় না। একই জিনিস একই সঙ্গে বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে হ্যাঁ এবং না, দুটোই হয়। শুধু সাদা–কালো করে দেখাটা, (হয় বামনা নয় ঢ্যামনা) আদৌ ডায়লেক্টিস নয়, পিওর মেটাফিজিক্স।
    কিন্তু আপনাদের চোখে তো উনি পীর–পয়গম্বর, শুধু প্রশ্নহীন আনুগত্য।একটা কথা বলি, উনি তো মানুষ ছিলেন, আর মানুষমাত্রেই জীবনে কিছু না কিছু ভুল করে। আপনাদের চোখে কোনটা ওনার ভুল যদি একটু বলেন!(এই প্রশ্নটা প্রয়াত জোয়ান রবিনসন রুশী সায়েন্স অফ অ্যাকাদেমিতে করেছিলেন, আর উনি মার্ক্সের লেবার থিওরি অফ ভ্যালুর সমালোচনা করলেও সারপ্লাস ভ্যালু ও শো্ষণের তত্ত্বকে ঠিক মনে করতেন।)।
    চার,
    নীচের প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার জানা নেই, আলোকপাত করলে বাধিত হব।
    ১) যে দেশগুলোতে পুঁজিবাদের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির সর্বোচ্চ বিকাশ হয়েছে সেখানে বিপ্লব দূরস্থান, কোন শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন নেই কেন?
    ২) প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশে হল?
    ৩) কেন ‘শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব’ কার্যত: সবদেশেই একটি গোষ্ঠির একনায়কত্ব হয়ে যায়? বা স্বেচ্ছাচারি পরিবারতন্ত্রে বদলে যায়? যেমন রুমানিয়া, কোরিয়া, কিউবা, আলবেনিয়া?
    ৪) কেন পুঁজিবাদী দেশের তুলনায় উন্নত গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও রুশ–চিনের জনগণ সাম্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে পথে নামে? তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে নিরস্ত্র ছাত্রদের ট্যাংক পিষে দেয়?
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন