
তিরুবনন্তপুরমের চৌকাঠে সিনেমা পা রাখে ডিসেম্বরে। ডিসেম্বর মাসে এখানে শীতলহরের প্রচ্ছায়াতেও আসে না শহর। মৌসুমী বৃষ্টির পরে সুতীব্র নীল আকাশ আর উষ্ণ সূর্যতাপে দিনগুলি ক্ষয়ে যায়। আবারও, এই ডিসেম্বরের মাঝামাঝি-ই, সিনেমার উৎসব আসে শহরে। এবারের বারোতম ইন্টারন্যাশানাল ফিল্ম ফেস্টিভাল অফ কেরালা'র নির্ধারিত দিনগুলি ছিলো সাত থেকে চোদ্দই ডিসেম্বর। ... ...

রঘুনাথ ভালো ছবি আঁকতো। ধূসর পাহাড়, আঁকাবাঁকা নদী, সবুজ মাঠ আর নীল আকাশ বানিয়ে সেখানে একদলা লালপানা সূর্য বসিয়ে দিতো। চায়ের দোকানের ফাইফরমাস খেটে, সময় পেলে ওকে একটু আধটু পড়াতো সোনাদা, দোকানের মালিক। পড়াশোনা কতদূর হয়েছিলো জানা যায় নি। পড়াশোনা করেও তো কতজন গরীব থেকে যায়! তাই রঘু দুবাই চলে গেছে। সেখানে অনেক, অ-নে-ক টাকা। দু-তিন বছর কেটে গেলেই সেখানে সবাই গাড়ি কিনে নেয়, তারপর দামী লেদার জ্যাকেট পরে শাহরুখের মত কায়দা করে হাঁটে। কেন বোকার মত এই ভাগাড়ে পড়ে থাকবে? ... ...

সেজকাকা চটে লাল। দোষের মধ্যে আমার বোনটি গুনগুন করছিল কলেজ-সোশ্যালে শোনা গান,-----"" যেখানেতে ঘটে যত অনিস্টি, সকলের মূলে কমিউনিস্টি,,। ব্যস, শুরু হয়ে গেল লেকচার। ---""না হয় দিনকাল কিছু পাল্টেছে, বাজার আজ ভগবান হয়েছে, তা'বলে নতুন জেনারেশান এইসব আজেবাজে গান গাইবে আর আমাদের শুনতে হবে! '' পুরনো দিনের পার্টি মেম্বার আমার কাকাকে বোঝানো মুশকিল যে এটা আসলে অন্নদাশংকর রায়ের বিখ্যাত ছড়া, আর সুর দিয়েছেন বিখ্যাত গণশিল্পী অজিত পান্ডে। বোন আমার দিকে করুণ চোখে তাকায়-- রেজিস্টার্ড বক্বক্ করনেওলা দাদাটির ওপর তার অনেক ভরসা। দাদা নিশ্চয় কিছু উল্টোপাল্টা যুক্তি-কুযুক্তি দিয়ে বাবাকে চুপ করাবে। ... ...

শখ বা হবি তো অনেকেরই অনেক রকমের থাকে, নিজের পড়াশোনা, চাকরি বাকরির বাইরে। লিস্টি করতে গেলে হেজে যাব, কিন্তু রাজনীতি কখনও কারুর হবি হয়, শুনেছেন কখনও? সেদিন আপিসের তরফে একটা ভাটের সফ্ট স্কিলের ট্রেনিং প্রোগ্রাম ছিল। কর্পোরেট আপিস তো, তাই ভেনুগুলো বড় বড় হোটেলে হয়। এটা ছিল দিল্লির পার্ক হোটেলে। ... ...

প্রেম করার, প্রেমে পড়ার আগে পড়ে ফেলুন এই বিশ্বপ্রেমের গাইডবুক। জেনে নিন, কি করবেন, কি করবেন না। সংযম অভ্যাস করুন - প্রেম করবেন পরে। আগে ইন্দ্রিয় জয় করুন, সংযমী হন। স্মরণে রাখবেন স্বয়ং কবিগুরু বৌকে ভাই (ছুটি) বলে ডেকে গেছেন। জাতির পিতা নেহাৎই এমনি-এমনি পিতা হওয়া যায়না বলে কষ্টেশিষ্টে একটু চুপচাপ ফুলে ছাপ দিয়েই আজীবন সংযম প্র্যাকটিস করেছেন। ভুলবেন না আমরা জাতির পিতার সন্তান, কবিগুরু আমাদের ধ্রুবতারা, ব্রহ্মচর্য আমাদের রক্তে। সতত: বিপ্লব বলতে বাতেলা বুঝবেন আর প্রেম বলতে ব্রহ্মচর্য। ... ...

সম্প্রতি হাতে এলো আফ্রিকার ছোটগল্পের একটি সংকলন। বেশ পুরোনো বই, ১৯৭১ সাল নাগাদ প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আগে বলে নেওয়া যাক কি কি নেই আকিনতোলা কোলের একাত্তর পাতার এই গল্প সংকলনে। গল্পগুলোর সঠিক রচনাকাল দেওয়া নেই, প্রকাশকের কোন বক্তব্য নেই, লেখকের নিজের লেখা যৎসামান্য ভূমিকা দিয়েই সংক্ষেপে কাজ সেরে ফেলা হয়েছে। শুরুটা যেমন হঠাৎ করে, শেষটাও সেরকম। গল্পের শেষে কোন টীকা নেই, বইয়ের শেষে নেই কোন সূচক বা লেখক পরিচিতি। প্রসঙ্গত:, অগোছালো এই বইটি প্রকাশিত হয় Vantage Press থেকে। ... ...

মানুষকে বেঁচে থাকতে গেলে, এমনকি মরতে হলেও দুটি শব্দ বলা বা না বলার নিয়ম শিখতে হয়- হ্যাঁ এবং না। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সেই একই নিয়ম। আমরা যে দুটি প্রতিষ্ঠানের সাথে সবথেকে বেশি পরিচিত, অর্থাৎ, রাষ্ট্র ও বাজার- উভয়ই স্বধর্ম বজায় রাখে কিছু কাজে "হ্যাঁ" করে ও কিছু কাজে "না" করে। কয়েক দশক হল এই দুই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বাইরে আরও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যার নাম সিভিল সোসাইটি। খুব বেশি না ঘেঁটে এইটুকু বলা যায় যে রাষ্ট্র ও বাজার মিলে মানবসমাজের সব জরুরী কাজগুলো সেরে ফেলতে পরছে না দেখে মানবসমাজ কিঞ্চিৎ স্বালম্বনের প্রতিজ্ঞা নিয়ে ঠিক করেছে যে কিছু কাজ নিজেরাই সেরে ফেলা যাক। ... ...

জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই ধারাবাহিকতা খুবই প্রশংসনীয় গুণ। রাহুল দ্রাবিড় যেমন ক্রিকেটদুনিয়ায় ধারাবাহিকতার জন্য বিখ্যাত, রাজনৈতিক নেতারা যেমন ডিগবাজী, দুর্নীতি ও আলটপকা মন্তব্যের জন্য, তেমনি আমরা, যারা এমনিতে সাদা ও সিধে (মানে কালো ও বাঁকাদের মোটেই পছন্দ করি না), শ্রমজীবী ( মানে কিনা, অন্যের শ্রমের ওপর নির্ভর করে থাকি), এবং অতীব সাধারণ ( বিনয়টা লক্ষ্য করুন) মানুষ ( বায়োলজিকালি) বলে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকি তাদেরও কিছু কিছু ব্যাপারে ধারাবাহিকতা অসাধারণ পর্যায়ে চলে যায়। ... ...

একটা ধারণা রয়েছে যে "ওপেন সোর্স কোডের প্রতিটা লাইন যেহেতু সকলের সামনে খোলা পাতা, তাই এই সফটওয়্যার ভেঙে ঢোকাও সহজ'। ধরা যাক ওপেন সোর্স ওয়ার্ড-প্রসেসর "ওপেন অফিস'-এ তৈরী করা একটা ডকুমেন্ট। ডকুমেন্টটা আপনি সুরক্ষিত করতে চান - অর্থাৎ অন্য কেউ যাতে খুলে পড়তে না পারে - হয়তো আপনার ইনকাম ট্যাক্সের গোপন কথা, বা গোপন ডায়েরী - তো, এর সহজ উপায় হল পাসওয়ার্ড প্রোটেকশন রাখা, আপনি তাই করলেন। ... ...

ট্যাংকের শৈশব কেটেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। একটা ট্যাংক বনাম ট্যাংক লড়াই ও হয়েছিলো কামব্রাইতে - কিন্তু সেটা নেহাৎই অ্যাকাডেমিক। যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের মহড়া। আর নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমন করে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের অফিসিয়াল খাতা খুলল ১৯৩৯ সালে। এই অন্তর্বর্তী একুশ বছরে ট্যাংক নিয়ে কিছুটা চিন্তা ভাবনা হয়েছিলো। ... ...

সমাজতন্ত্র সংকটে। আজ আর এই নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। একদিন ছিলো। কিন্ত অন্য একটা বিতর্ক আছে - আবার নেইও বটে। সংকটের শুরু কোথায়? বির্পযস্ত সমাজতন্ত্রের তলায় চাপা থাকা এই বিতর্ক খুঁড়ে আনা যাক। পুরোনো কাসুন্দি নেহাৎ খারাপ কিছু নয়। ... ...

কথায় বলে, "জলের মতন খরচ করা", অর্থাৎ কিনা মাত্রাহীন, আনলিমিটেড একটা ব্যপার। তো, আমাদের চেতনায় "জল" মানে একটা অফুরন্ত ব্যপার। আর কে না জানে পৃথিবীর তিনভাগ জল, একভাগ স্থল। এই স্থলেও মাটি খোঁড়ো, খোঁড়ো, কোথাও দশ ফুট, কোথাও দুশো ফুট, কোথাও বা আরো বেশী নীচে, জল পাবেই (আগামি বছর কুড়ি অন্তত পাবেই)। তা প্রচুর থাকলে লোকে যেমন "জলের মতন" খরচ করে, তেমনই জলও খরচ করতে করতে, আমরা প্রায় ফুরিয়ে এনেছি। অনিয়ন্ত্রিত ভাবে natural resourceগুলোর ব্যবহার আজ আমাদের্কে খুব বড় একটা সমস্যার মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। ... ...

যথেষ্ট হয়েছে। কথা বলার, পরিষ্কার করে, জোর দিয়ে কথা বলার সময় হয়েছে। কারণ একটাই। আমরা, জনতা, জানি, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে, ঠিক কোন ঘটনাক্রমের শেষ ধাপে গিয়ে, পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হল।আমরা কিন্তু জানি এই দায়িত্ত্ব কাদের। বেনজির ভুট্টোর হত্যা ঠিক একক বা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। এই জাতীয় ঘটনার আদলের সঙ্গে আমাদের বিশেষ পরিচিতি তৈরী হয়েছে। ... ...

ভারতে জাতিগত দাঙ্গা বা কম্যুনাল রায়ট নিয়ে কথা উঠলেই আমাদের মনে প্রথমেই আসে হিন্দু আর মুসলমানে লাঠালাঠি আর কাটাকাটি। তেইশ বছর আগের শিখ নিধনযজ্ঞ বা ঐ মাপের দু একটা ঘটনা বাদ দিলে ভারতের ইতিহাসে জাতিগত দাঙ্গার মূল ভিত্তি কিন্তু হিন্দু আর মুসলমানে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অসন্তোষ, এবং একের অন্যকে দাবিয়ে রাখার একটা সুপ্ত প্রচেষ্টাকে জাগিয়ে তোলা। ... ...

শেষ হতে চলেছে ২০০৭, এক রক্তাক্ত বছর। সাদ্দামের ফাঁসির ভিডিও আর নিঠারীর নালা থেকে পাওয়া শিশুদের হাড়গোড় দিয়ে শুরু হয়েহিল এই বছরটি। জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা তাপসী মালিকের আংরা হয়ে যাওয়া ছবিটাও তখনও বেশ টাটকা। তারপর শুধুই রক্ত আর লাশের মিছিল, ভালবেসে বিয়ে করে লাশ হয়ে যাওয়া, বিস্ফোরণে ছিন্নবিচ্ছিন্ন, মানবদেহের টুকরো; মক্কা মসজিদ থেকে সমঝোতা এক্সপ্রেস, মইনুদ্দিন চিস্তির দরগা থেকে চাট সেন্টার ---- এবং নন্দীগ্রাম, এবং নন্দীগ্রাম, এবং নন্দীগ্রাম। ... ...

দন্ডীর "দশ কুমার চরিত" : অনুবাদ প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর : প্রকাশক "রূপা"। কথাসরিৎসায়রের মতনই গল্পকথা। কোন দেবপ্রচার বা রাজার জীবনী নয়। মহৎ কাব্যও নয়। বেশ রগরগে গল্প। আর এই দন্ডী কে বা কবেকার এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। নানান পন্ডিতের নানান মত। তাও ধরে নিন ষষ্ঠ শতাব্দীর লেখক। ... ...

যেভাবে সোমের পরে মঙ্গল আসে, মঙ্গলের পরে বুধ, ঠিক সেইভাবেই রিজওয়ানুর পরে নন্দীগ্রাম, নন্দীগ্রামের পরে তসলিমা, তসলিমারে পরে সৌরভের শতরান এল। এল, চলেও গেল। থেকে গেল মূখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, সুশীল সমাজের গন্তব্য আর অবশ্যই তির্যকের মন্তব্য। প্রথম দুটি ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও শেষের ঘটনাটি রাজনীতি মুক্ত। সমাজনীতিই সেখানে একমাত্র আলোচ্য বিষয়। আর সমাজনীতির বিষয় আমি বাঁদরদের, খুবই নীতিবাগিশ বলে মনে করি। সংকট্ময় মূহুর্তে ওদের সাহায্যে আমি অনেক সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে পারি। সেদিনও এরকম হল। ভাবছেন তো, কোনদিনের কথা বলছি? দাঁড়ান একটু সবুর করুন, বলছি একে একে। ... ...

একটা মেয়ের কথা দিয়ে শুরু করি। উনিশ বছরের মেয়েটা, তার একুশ বছর বয়সী সঙ্গী। মেয়েটা সন্তানসম্ভবা। কিন্তু দেশের আইন অনুযায়ী এই শিশুটি অবৈধ, কারণ মেয়েটির বয়স কুড়ির কম। শিশুটি যদি জন্মায়, কোনো খাতায় তার নাম উঠবে না। তার কোনো পরিচয় নেই, নিয়ম অনুযায়ী শিশুটির কোনো অস্তিত্ব নেই। ডাক্তারী কারণে মেয়েটি গর্ভপাত করাতে পারে না, তাই এক দূর গ্রামে গিয়ে শিশুটির জন্ম দেয়, আর তারপর অল্প কিছু পয়সার বিনিময়ে বেচে দেয় অন্য কারো কাছে। ... ...

ঝাঁ চকচকে স্যাটেলাইট সিটি নয়ডা, আস্তে আস্তে জমজমাট হয়ে উঠে বড়বোন দিল্লীকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে তার আধুনিকতার গরিমায়। রিয়াল এস্টেটের দাম এখানে আকাশছোঁয়া। প্রবেশপথের ঝলমলে ফিল্ম সিটি, বড় বড় শপিং মল, নির্মীয়মান মেট্রো, বিশাল আধুনিক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক এসব শহরের শোভা হলেও, কোনোদিন নিউজ হেডলাইন হয়নি আজ অবধি - যা হয়েছে শহরের অভ্যন্তরের এক ছোট্ট গ্রাম নিঠারী। ... ...

বাংলা বা হিন্দি সিনেমা বা টিভি সিরিয়াল একটু-আধটুও যারা দেখে থাকেন তারা একমত হবেন যে মানুষের জীবনের একমাত্র সমস্যা হল বিবাহ বহির্ভূত সন্তান। গল্প যেমনই হোক তার কোনো এক পর্যায়ে শিক্ষিত, প্রাপ্তবয়স্ক এক মহিলা (সবকিছু জেনেশুনেও) স্রেফ আকাট মূর্খের মতো গর্ভবতী হয়ে পড়বেন, সেই সন্তানের পাষাণহৃদয় বাবা পারিবারিক সম্মান, লোকলজ্জা ইত্যাদির ভয়ে কাতর হয়ে গর্ভপাত করাতে চাইবেন আর মহিলাটি ছলোছলো চোখে বলবেন "বাচ্চাটার তো কোনো দোষ নেই!" তবেই না! তবেই না তাবৎ দর্শককূল ছলোছলো চোখে বলবেন "আহা মায়ের মন!" (আর সিরিয়ালের টিআরপি উঠবে চড়চড় করে! ) ... ...