এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • সীমানা - ১৯

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১০ ডিসেম্বর ২০২২ | ৪৪৮ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • ছবি: সুনন্দ পাত্র


    ১৯

    পাগল-পথিক




    এবারের কুমিল্লায় আসাটা একটু অন্যরকমেরই হল। পকেটে চারশো টাকা, ওরিয়েন্টাল প্রিন্টিং অ্যাণ্ড পাবলিশিং কম্পানী দু-কিস্তিতে কড়কড়ে ক্যাশ দিয়ে দিল। পুজো এবার এগিয়ে এসেছে; আশ্বিনের মাঝামাঝি, ইংরিজি অক্টোবর মাসের গোড়াতেই। সুভাষবাবু একজনকে দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির বাড়িতে। আঠা দিয়ে জোড়া খামে দুজন প্রাপকের নাম, কাজি নজরুল ইসলাম আর পবিত্র গাঙ্গুলি। পবিত্রর হাতেই পড়েছিল চিঠিখানা, সে-ই খুলেছে। পুজোর আগে আর দেখা করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন সুভাষ। আবার দেখা হবার আগেই যদি কুমিল্লায় চলে যায় নজরুল, সেই কথা ভেবে নজরুলের জন্যে বিশেষ একটা অনুরোধ। বৃটিশ যুবরাজ এ-বছরের নভেম্বরে ভারতে আসছেন। সতেরই নভেম্বর তিনি বোম্বাইয়ের সমুদ্র বন্দরে পদার্পণ করবেন। ভারতীয় সেনাদল এবং নানা-ভাগে ভারতের এবং নানা দেশীয় রাজ্যের নানা ধরণের প্রজাদের দিয়ে স্বাগত-অভ্যর্থনা জানাবার পরিকল্পনা ভারত সরকারের। কংগ্রেস মনে করে, অভ্যর্থনার কোন প্রশ্নই নেই, ভারতীয় নাগরিক এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ তো করবেই না, সেদিন সারা ভারতে হরতাল পালন করা হবে। নজরুল যদি কুমিল্লায় থাকেন তাহলে কুমিল্লায় এই হরতালের প্রস্তুতি থেকে সর্বাত্মক সাফল্যের দায়িত্ব অন্যান্য কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে নজরুলকেই নিতে হবে। কান্দিরপাড়ের বসন্ত মজুমদার নজরুলকে সাহায্য করবেন, তাঁকে বলা আছে। সুভাষবাবুর চিঠিতে একটা ঠিকানা দেওয়া ছিল। নজরুল যথাসাধ্য করবে বলে পবিত্র সুভাষের চিঠির জবাব নজরুলকে না-জানিয়েই দিয়ে দিয়েছে। হেসে বলেছে, তোর সেক্রেটারির কাজটা আমিই করলুম।

    যা কখনও করেনি, নজরুল এবার তা-ই করল। জটুর জন্যে কিনল ভারি সুন্দর একখানা ফ্রক, কমলার জন্যে কমলা রঙের ড্রেস যা মেমসাহেবরা পরে, বীরেনের ছেলে রাখালের জন্যে গ্যালিস লাগানো ট্রাউজার্স আর শার্ট, আর তার সঙ্গে মানানসই সোলার হ্যাট একখানা, আর দুলির জন্যে লালপেড়ে হলুদ-রঙা লাল-ডুরে শাড়ি, সঙ্গে পুরোহাতা ঝালর দেওয়া লাল ব্লাউস। ও লক্ষ্য করেছে বিরজাসুন্দরী শাড়ি পরেন, আর গিরিবালা সাদা থান। একটা চওড়া-পাড়ের সাদা শাড়ি কিনেছে বিরজাসুন্দরীর জন্যে। গিরিবালার থানে অবিশ্যি তেমন কিছু বৈশিষ্ট নেই। তবে সবচেয়ে বড় কথা, এবার আগের থেকে চিঠি দিয়ে কবে আসছে জানিয়ে দিয়েছে কাজি!

    ষষ্ঠীর দিন সকালেই পৌঁছল সে। স্বভাবতই ছোটরা উচ্ছ্বসিত। নজরুলকে গল্প করে সময় নষ্ট না করতে দিয়ে বিরজাসুন্দরী বললেন, যা, তাড়াতাড়ি চান-টান সেরে নে, আমাদের ব্রাহ্ম বাড়িতে পুতুল পুজো হবে না ঠিকই, কিন্তু ষষ্ঠীর দিন আমরা ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় পরিয়ে মিষ্টিমুখ না করিয়ে খাই না। পুকুরে যেতে হবে না আজ, যা, কলঘরে চান সেরে নে।

    এইরকম পারিবারিক পরিবেশে এর আগে কখনো পুজো কাটায়নি কাজি, বিনাবাক্যব্যয়ে প্রাতঃকৃত্য সারতে চলে গেল সে। ফিরে এসে দেখে জটু থেকে বীরেন পর্যন্ত সবাই নতুন জামাকাপড় পরে তারই জন্যে যেন অপেক্ষা করছে। তাকে ডেকে একটা কাগজের বাক্স দিলেন বিরজাসুন্দরী। সেই বাক্সে ধুতি একটা, আর সাদা পাঞ্জাবি। নজরুলকে বললেন, যা, নতুন কাপড়-জামা পরে তৈরি হয়ে আয়, সবাই তোর জন্যে অপেক্ষা করছে।

    যাবার আগে তোমায় একটা প্রণাম করি মা, বলে নজরুল।
    ভিজে কাপড়ে প্রণাম নয়, ঠাণ্ডা লেগে যাবে তোর, কাপড় বদলিয়ে আয়, তারপর প্রণাম হবে।

    কড়া মাড় দেওয়া নতুন ধুতি-পাঞ্জাবিতে নজরুলকে অন্যরকম দেখায়; কেমন যেন আড়ষ্ট, ওর পদক্ষেপের স্বাভাবিক দৃঢ়তার বদলে মনে হয় ও খুব ধীরে, যথাসম্ভব আস্তে আস্তে, প্রায় দু-পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর করে গুটি গুটি আসছে। সকলেই অবাক একটু, এরই মাঝে জটু হঠাৎ হাততালি দিয়ে হেসে জোর-গলায় বলে ওঠে, এ মা, দেখ দেখ সবাই দেখ এত বড় ছেলে কাঁদছে।

    সবাই খেয়াল করে নজরুলের চোখে জল। ছেলেমানুষ জটুর মতো উচ্ছ্বাস দেখায় না কেউই, নজরুলও কোন কথা বলে না। হাতের পেছন দিয়ে চোখদুটো চট করে মুছে হাসে সে, বলে, মিথ্যে কথা মিথ্যে কথা, কাঁদছি কোথায় হাসছি তো – বলতে বলতেই গলা ধরে আসে তার। ন' বছর বয়েসেই তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল, তারও এক বছর আগে থেকেই মসজিদে ইমামতি করতে হত তাকে, ছোট বেলার ছোট ছোট ভালোলাগা পারিবারিক স্মৃতি তার নেই বললেই চলে। এমন ভাবে পরম আদরে নতুন জামাকাপড় পরিয়ে লুচি-হালুয়া-মালপোয়া কেউ তাকে খাওয়ায়নি কখনো। শুধু ভালো-লাগা নয়, এক ধরণের কৃতজ্ঞতা বোধে আচ্ছন্ন হয় নজরুল। খাওয়ার শেষে স্বতঃস্ফূর্ত প্রণাম করে সে বিরজাসুন্দরী আর গিরিবালাকে, এমনকি এই প্রথম বার, ইন্দ্রকুমারেরও পায়ের ধুলো নেয়।

    আর তখনই উচ্চ কণ্ঠে ভাইরে ভাই কাজি ভাই ডাক শোনা গেল বাইরে থেকে। বীরেন দরজা খোলে, বাইরে দাঁড়িয়ে অতীন্দ্র, অতীন্দ্র রায়চৌধুরি। বলেন, কাজি এল নাকি? শুনলাম, আজই ওর আসবার কথা।

    ঠিকই শুনেছেন, এসেছে তো, আসুন না ভেতরে। অতীন্দ্র ভেতরে এসে বসেন, খবর পেয়ে কাজিও আসে। অতীন্দ্র বলেন, সুভাষবাবু খবর পাঠিয়েছেন কলকাতা থেকে, তুমি নাকি আসছ। তারপর সেদিন রাস্তায় দেখা আফতাবুল ইসলামের সঙ্গে। বলল, শুনেছেন নাকি নজরুল ইসলাম আসছে পুজোর সময়? বললুম, তাই নাকি? আপনি শুনলেন কোথায়? বলল, খিলাফৎ কমিটির মীটিং ছিল একটা, সেখানে বসন্তদার সঙ্গে দেখা, উনিই বললেন। সুভাষবাবুর খবরটা আমিও বসন্তদার কাছেই শুনেছিলাম, তবে ঠিক কবে আসছ শুনিনি। আফতাবুলের খবরটা শুনে বসন্তদাকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি বললেন, হ্যাঁ, ষষ্ঠীর দিনই আসবে বলে খবর পাঠিয়েছে। তাই ভাবলাম, একবার ঘুরেই আসি, ষষ্ঠীর দিনে এলে এতক্ষণে এসে যাবারই কথা।

    এইটুকু কথা হতে হতেই আবার বাইরে ডাক। গলা শুনেই অতীন্দ্র বলেন, বসন্তদার গলা মনে হচ্ছে।
    হ্যাঁ, বসন্তদা-ই, বাইরে থেকে আবার শোনা যায়।

    ততক্ষণে দরজা খুলে দিয়েছে বীরেন। বসন্ত হাসতে হাসতে বলেন, এই সব বিপ্লবীদের চালাকিগুলো সব সেমসাইড, একটা বুদ্ধিও ইংরেজের বিরুদ্ধে কাজে লাগে না!
    কীরকম?– জিজ্ঞেস করে নজরুল।
    আরে, আমার কাছ থেকেই শুনল তুমি আসছ ষষ্ঠীর দিন, বলেন বসন্ত, আমি থাকি পাশের বাড়িতেই, আর আমাকেই টেক্কা মেরে কিনা পৌঁছে গেল আমার আগে।
    ঘাট হয়েছে দাদা, হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন অতীন্দ্র, বসন্তদাদাকে টপকে যাবে কুমিল্লায় এমন বুকের পাটা আছেটা কার? একাধারে বিপ্লবী আর কংগ্রেসি, জোরটা দেখতে হবে না?

    অতীন্দ্রর হাঁটু-গেড়ে বসার রেশ বোধ হয় পৌঁছিয়ে যায় অন্দরমহলেও, হাসতে হাসতে চলে আসেন ইন্দ্রকুমার আর বিরজাসুন্দরীও, তারপর হাত জোর করে বিরজাসুন্দরী বলেন, মহাষষ্টীর দিন সকালেই এসেছেন, কুমিল্লার––

    দুই মহা মহাবিপ্লবী, বিরজার মুখ থেকে কথা প্রায় কেড়ে নিয়ে বাক্যটা নিজের মতো করেই সম্পূর্ণ করেন ইন্দ্রকুমার, বিরজা কী বলতে চেয়েছিলেন সে বিষয়ে কোন ভ্রূক্ষেপই নেই তাঁর – গরীবের কুটিরে কয়েকখানা লুচি আর হালুয়ার ভোগ গ্রহণ করলে কৃতার্থ হতাম, বলে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন তিনি।

    লুচি? লুচি বললেন কাকাবাবু? আরে, চলুন চলুন। কোথায় দেবেন?– বলে অন্দরের দিকে পা বাড়ান অতীন্দ্র, পেছন পেছন বসন্ত বীরেন আর কাজি। বিশেষ উৎসবের দিন, তাই বুঝি রূপোর রেকাবি বেরিয়েছে আজ। দু-জায়গায় আসন পাতা, সামনে তিনখানা করে রেকাবি সাজানোই ছিল। বসন্ত আর অতীন্দ্রকে বসিয়ে রান্নাঘর থেকে গরম লুচি, খানিকটা করে সুজির হালুয়া আর একটা রেকাবিতে দুখানা করে মালপোয়া পরিবেশন করেন গিরিবালা আর বিরজাসুন্দরী। লুচি আর হালুয়া বলেছিলেন কাকাবাবু, মালপোয়াটা বুঝি ফাউ?– বলেই একটা মালপোয়া তুলে নিয়ে একটা কামড় বসিয়ে দেন অতীন্দ্র। হালুয়া কারে কন, এ যে দেহি মোহনভোগ, ঘি চপচপ করতে আছে, বলতে বলতে এক টুকরো লুচি আর হালুয়া মুখে পোরেন বসন্ত।

    এক ঢোক জল খেয়ে কাজির দিকে ফিরে অতীন্দ্র বলেন, আগের বারে যখন তুমি এসেছিলে কাজি, প্রবোধের সঙ্গে তোমার দেখা হয়নি, প্রবোধচন্দ্র সেন। প্রবোধ আমাদের অনুশীলনের ছেলে, কবিতা গান এসবে ভারি ঝোঁক ওর, রবীন্দ্রনাথ তো প্রায় সবই কণ্ঠস্থ! আঠের সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নজরবন্দী ছিল তখন। ওকে সেবার প্রভাত-ফেরীতে আমরাই তাই আসতে দিইনি। কিন্তু তাহলে কী হয়, তোমার গান আর কবিতা, যা এখানকার ছেলেরা শিখেছিল তোমার কাছে, সে-সবই ওর মুখস্থ। এখন ও মুক্তি পেয়েছে, পেয়েই সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজে পড়তে গেছে বি-এ। ওর এক খুদে-চেলা আছে উমেশ। সেই উমেশ, আর তার বন্ধু হেমেন আর শৈলেশ এসেছিল আমার কাছে। তোমার সঙ্গেও ওরা দেখা করবে। প্রবোধ বলে পাঠিয়েছে, নভেম্বরে যে হরতাল হবে, সেই উপলক্ষে তুমি যেন বিশেষ একটা গান তৈরি কোরো। ও চলে আসবে সিলেট থেকে সেই সময়। এবারের প্রভাত-ফেরীতেও থাকবে ও।

    সে তো ভালো কথা, বলে কাজি, তবে, হরতাল যদি একশো ভাগ সফল করতে হয়, আমার মনে হয় অন্তত এক মাস ধরে তার জন্যে প্রচার করতে হবে। প্রভাত-ফেরীর সঙ্গে সঙ্গে। আর প্রভাত-ফেরীও এক দিন করলেই চলবে না, মাসখানেক ধরে প্রত্যেক দিন করা দরকার। আমি গান লিখে ফেলব, সবাইকে শিখিয়েও দেব, কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুত হওয়া চাই।

    বসন্ত বলেন, সেই কথা বলবার জন্যেই আমি আজ সকালেই এসেছিলাম। এসে বৌদির আতিথেয়তাটা এক্সট্রা লাভ হল। আমি বলি কি, আজ বিকেলে আমার বাড়িতে এস তোমরা সবাই, আমি ইন্দ্রদা আর দু বৌদিকেও বলছি, বীরেন তো আছেই, অন্য ছেলেমেয়েদেরও আসতে হবে, এবং অতীন্দ্র তার দলবল নিয়ে। আফতাবুলদেরও আমি খবর পাঠাব। প্রতিটি ডিটেইল আমাদের আলোচনা করা দরকার।

    অতীন্দ্র বলেন, পুজোটা হয়ে-যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে ভালো হত না?

    পুজো তো কাল শুরু, বলেন বসন্ত, আমি আজ আলোচনাটা শুধু ইনিশিয়েট করতে চাই। সবাই এখন থেকেই ভাবতে শুরু করুক – এটা তো ঠিক এক দিনের ভাবনার কথা নয়, পুজোর ছুটির মধ্যে সবাই ভাবনাচিন্তা করুক, পুজোর পর আমরা ফাইনাল করব। ...কী, তাহলে এই কথাই রইল, চারদিকে তাকিয়ে কথা শেষ করেন বসন্ত।

    বিকেলের মধ্যেই গান লিখে ফেলে কাজি, আট স্তবকের বেশ লম্বা গান, জাগরণী গান নাম দিয়েছে ও, ও মনে করে প্রভাত-ফেরীর জন্যে লম্বা গানই ভালো। এর আগের বার এখানে এসে 'এস এস ওগো মরণ' গানটা ও শিখিয়েছিল সবাইকে, ওই গানটা প্রভাত-ফেরীর মুখ্য গান হয়ে উঠেছিল সেবার; এবার কিন্তু প্রভাত-ফেরীর গানে একটা বিশেষ বক্তব্য তুলে ধরতে হবে, মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে হবে স্বতঃস্ফুর্ত হরতালে; সূর্যও যে-সাম্রাজ্যে অস্ত যেতে সাহস পায় না, সেই সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত-সম্রাটকে একটা বার্তা দিতে হবে – নগরের পর নগরে সড়ক জনমানবহীন, বিপনী রুদ্ধদ্বার, শিক্ষায়তন কলকণ্ঠ ছাত্রহীন, যানবাহন রুদ্ধগতি, আদালত-কাছারি জনশূন্য – যেন একই বার্তা দেয় যুবরাজকে: তোমার জন্যে স্বাধীনচেতা ভারতবাসীর দ্বার রুদ্ধ! সব দ্বার!

    সভায় আট স্তবকের গানটা পুরোটাই দুবার পড়তে হল নজরুলকে। এই আট স্তবক ছাড়াও শুরুতে একটা স্তবক থাকবে, যেটা কোরাস হিসেবে গাওয়া হবে। প্রথমে এই কোরাসেই শুরু, তার পর প্রতিটি স্তবকের পর কোরাসটা বারবার ফিরে আসবে:



    ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!
    ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,
    সন্তান দ্বারে উপবাসী,
    দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!
    জাগো গো, জাগো গো,
    তন্দ্রা-অলস জাগো গো।
    জাগো রে! জাগো রে!



    কোরাস অংশটার সুর দেওয়া হয়ে গেছে, নজরুল গেয়ে শোনাল। সহজ সুর, সবাই সহজেই গাইতে পারবে। সত্যেনবাবুর সঙ্গে ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্ররা যারা এসেছিল – ওদের মধ্যে এবার চর্থা রাজবাড়ির শচীনও আছে – দুয়েকবার শুনেই শিখে নিল সুরটা। আট স্তবকের সম্পূর্ণ গানটাও লিখে নিল কেউ কেউ। অতীন বললেন, আগের বারে যেটা কুমিল্লায় প্রায় সবারই শেখা হয়ে গিয়েছিল সে গানটা এবার বাদ দেবে নাকি?

    কাজির বদলে জবাব দেন সত্যেনবাবু, বাদ দেবে কেন? সব গানই তৈরি থাকবে। এবার এতদিন ধরে প্রভাত-ফেরী চলবে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সব গানই গাইতে হবে। তবে আমি কাজিকে বলব দু-চারখানা রবি ঠাকুরের গানও শিখিয়ে দিক সবাইকে।

    রবীন্দ্রনাথের গান তো থাকবেই, জবাব দেয় নজরুল, স্বদেশ পর্যায়ের খান পাঁচেক গান আমি ভেবে রেখেছি, এক-এক করে সবই শেখাব।

    গানের ব্যাপারে সবাই উৎসাহী, প্রায় সবাই একটু-আধটু অংশগ্রহণ করল সভায়। দেখেশুনে বসন্ত মজুমদার বললেন, প্রভাত-ফেরীতে সকলেরই উৎসাহ দেখে খুশি হলাম। কিন্তু এত বড় একটা দেশব্যাপী হরতাল তো শুধু প্রভাত-ফেরীতেই সফল হবে না, আমাদের একটা ভালো ভলান্টিয়ার বাহিনী তৈরি করা দরকার, এবং তাদের কাজ কী হবে সে ব্যাপারেও একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। সুভাষবাবু চিঠিতে বলেছেন, পুরো আন্দোলনটাই অহিংস হতে হবে, কোন মারামারি ধরাধরি পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি নয়। পুলিশের দিক থেকে যথেষ্ট প্রোভোকেশন থাকবে, তারই মধ্যে আমাদের ভলান্টিয়ারদের মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে হরতাল সর্বাত্মক হওয়া চাই।

    আফতাবুল বললেন, বসন্তদা যা বললেন, সেই কথাটা আমিও বলতে চাইছিলাম। ধরুন, একটা বাচ্চা ছেলেকে একটু মিষ্টি-ফিষ্টি ঘুষ দিয়ে পুলিশ একটা ঢিল ছুঁড়িয়ে দিল থানার দিকে। তারপর তারই সুযোগে দমাদ্দম লাঠি-চার্জ করিয়ে দিল একটা প্রভাত-ফেরীর মিছিলে। তখন আমরা কী করব?

    অতীন্দ্র হাসতে হাসতে বলেন, চূড়ান্ত গান্ধীবাদী হয়ে আমরা তখন রাস্তাতেই বসে পড়ব, আর গানও থামাব না। দুচারজন যদি আহতও হয় তবুও না, ঠিক বলেছি না বসন্তদা?– গান আমাদের চলতেই থাকবে।

    এগ্‌জ্যাক্টলি, বলেন বসন্ত, আমাদের যুগান্তর-অনুশীলনের ছেলেদের অনেকেরই হয়তো এ-কথা শুনতে ভালো লাগছে না, অল্পবয়েসী বন্ধুরা যারা এখানে আছ, তারাও হয়তো অনেকেই মনে মনে মেনে নিতে পারছ না কথাটা। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিকল্পনাটা একটা সার্থক সর্বাত্মক শান্তিপূর্ণ হরতালের। একটু-আধটু মারধোর খাওয়ার বদলেও যদি হরতালটা শান্তিপূর্ণ এবং সর্বাত্মক হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুখে তাইতেই চূণকালি পড়বে, লাঠির বদলে লাঠিতে নয়।

    মহিলারা এতক্ষণ কেউ কথা বলেননি, এবার হেমপ্রভা বললেন, আমি একটা কথা বলতে চাই।

    সত্যেনবাবু বলেন, বলুন না।

    এই যে ব্রিটিশ যুবরাজের ভারত ভ্রমণের বিরুদ্ধে সারা ভারতে হরতালের প্রস্তাব, এ প্রস্তাব প্রধানত গান্ধীজির কাছ থেকে এসেছে। হরতালটা, নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ভারতীয় জনসাধারণের প্রতিবাদের একটা প্রকাশ। সে প্রতিবাদ তো আমরা করবই। কিন্তু, মনে রাখব, প্রতিবাদের এই শান্তিপূর্ণ রূপটা মূলত আমরা শিখেছি মহাত্মাজীর কাছ থেকে। আমার মনে হয় আমাদের প্রভাত-ফেরীর নানা গানের মধ্যে গান্ধীজির বিষয়ে একটা গান যদি থাকে, তাহলে ব্রিটিশ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানটা পরিষ্কার করে বলা হয়। বলা হয়, আমাদের প্রতিবাদের ভাষা অশান্তির ভাষা না হয়েও দৃঢ়তার ভাষা।

    ঠিকই তো, বলেন সত্যেনবাবু, সে ক্ষেত্রে দায়িত্বটা নিতে হয় কাজিকে।

    সেই রাত্তিরেই গান্ধীর কথা ভেবে একটা গান লিখে ফেলে কাজি। আর পরের দিন পাশের বাড়িতে হেমপ্রভার সামনে আবৃত্তি করে শুনিয়েও আসে গানটা:



    এ কোন পাগল পথিক ছুটে এল বন্দিনী মা'র আঙিনায়।
    ত্রিশ কোটি ভাই মরণ-হরণ গান গেয়ে তাঁর সঙ্গে যায়।
    অধীন দেশের বাঁধন-বেদন
    কে এল রে করতে ছেদন?
    শিকল দেবীর বেদির বুকে মুক্তিশঙ্খ কে বাজায়?

    মরা মায়ের লাশ কাঁধে ওই অভিমানী ভায়ে ভায়ে
    বুক-ভরা আজ কাঁদন কেঁদে আনল মরণ-পারের মায়ে।
    পণ করেছে এবার সবাই
    পর-দ্বারে আর যাব না ভাই।
    মুক্তি সে তো নিজের প্রাণে, নাই ভিখারির প্রার্থনায়।।



    পুজোর ক'দিন হৈ হৈ করে এ-বাড়ি ও-বাড়ি নেমন্তন্ন খেয়ে কেটে গেল কাজির। এর মধ্যে একদিন দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার শেষে সবাই যখন একটু ঘুমিয়েছে – দিবানিদ্রার অভ্যেস নেই, তাই কাজি কান্দির পাড়ের এই বাড়ির সামনের খোলা জায়গাটায় একটু বসতে এসেছে – কচি-গলার কণ্ঠস্বর শুনে ডানপাশের পাঁচিলটার সামনের মাটিতে জটুকে সে বসে থাকতে দেখল। জটু কিছু বলছে। কাকে? একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখে পাঁচিলের পেছনে-গজানো একটা পেয়ারা গাছের সপত্র একটা ডাল পাঁচিলটার গায়ে এসে পড়েছে। আর পাতাগুলোর মাঝখান থেকে উঁকি মারছে একটা কাঁচা পেয়ারা। পেয়ারাটা কিন্তু তখনও ডাল এবং পাতার থেকে আলাদা হয়নি, সঙ্গে লেগে আছে । দেখে প্রথমে মনে হল আপন মনে জটু কিছু বলছে। নিঃশব্দে গুটি গুটি জটুর পেছনে তার থেকে খানিকটা দূরত্বে দাঁড়াল কাজি। হঠাৎ একটা কাঠবেড়ালী পাঁচিলের ওপর দিয়ে দৌড়িয়ে এসে পেয়ারাটায় সামনের পা দিয়ে ঠোকর দিল একটা। হি হি করে হেসে দাঁড়িয়ে উঠল জটু। একটু বোধ হয় হকচকিয়ে কাঠবেড়ালীটা পালাল পাঁচিল ধরেই – উল্টোদিকে!

    পেছনে দাঁড়িয়ে কাজি লক্ষ্য করে জটুকে। প্রায় দক্ষ শিকারীর মতো নিঃশব্দ পদক্ষেপে একটু ডানদিকে সরে আসে জটু। কাঠবেড়ালীটা এই দিক দিয়েই চলে গেল কোথায়? গাছের ছোট ডালটা কাঠবেড়ালীর ওই ছোট্ট লাফিয়ে-পড়া ওজনেই একটু বোধ হয় আরও নুইয়ে গেছে, পেয়ারাটার নীচের দিকটা এখন পাঁচিলের গায়ে লেগে। আবার ফিরে আসবে নিশ্চয়ই কাঠবেড়ালীটা, অপেক্ষায় আছে জটু। হ্যাঁ ঠিক, এল সে, আর, আগের বারের মতো বোকামি করল না এবার। সামনের পা-দুটো দিয়ে – এবার আর ঠোক্কর নয় – এবার চেপেই ধরল পেয়ারাটা, আর মুখটা যেই না লাগিয়েছে পেয়ারায়, জটু আর পারল না হাসিটা চেপে রাখতে, হি হি করে হাসি আর হাততালি!

    কিন্তু পরে আফশোষই হল জটুর। কাঠবেড়ালীটা সোজা লাফ দিয়ে পড়ল পাঁচিল থেকে, আর কোনদিকে যে দৌড়ে পালাল বুঝতেই পারল না জটু।

    নাঃ, আজ আর আসবে মনে হয় না, বলে কাজি।
    জটু পিছন ফিরে কাজিকে দেখে অবাক, ও মা তুমি!
    হ্যাঁ, আমিই তো। দিলি তো কাঠবেড়ালীটাকে তাড়িয়ে।
    আমি তাড়াতে যাব কেন, ও তো নিজে নিজেই চলে গেল।
    নিজেই গেছে, কিন্তু গেছে তোর ওই হাততালির আওয়াজ আর হি হি হাসির শব্দে।
    সে তো আমি রোজই হাসি, রোজই হাততালি দিই।
    তাই রোজই পালিয়ে যায়।
    মোটেও যায় না। কালই তো ওই বাতাবি লেবু গাছটার নীচে বাতাবি লেবু পড়েছিল একটা, সেটা ও কেমন ফুটো করে করে খেল। আমি তো তখনও হাততালি দিয়েছিলাম; কই, পালায়নি তো, জিজ্ঞেস করো না রাঙাদিকে।
    সে কাঠবেড়ালীটা ও ছিল না, ওর বাবা ছিল।
    সত্যি তুমি কী বোকা গো কাজীদাদা, কাঠবেড়ালীর বাবা থাকে?
    থাকে না?
    বাবা থাকে না, মা থাকে না, ছোড়দি-রাঙাদি-বৌদি কেউ থাকে না। কাজিদাদাও থাকে না।
    ও, জানতুম না তো।

    সেদিনই রাতের খাওয়ার সময় জটু একেবারে প্রমাণ করে দিল যে কাজীদাদা একেবারেই হদ্দ বোকা। বাবা মা জ্যাঠাইমা থেকে শুরু করে বৌদি ছোড়দি রাঙাদি এমনকি দাদাভাইও সবাই সাক্ষী দিল যে কাঠবেড়ালীর কোন আত্মীয়-স্বজন থাকেই না, থাকতে পারেই না। শুধু রাখাল একবার বলেছিল, ভাই থাকে কাঠবেড়ালীর। ও নিজের চোখে দেখেছে দুটো কাঠবেড়ালী পাঁচিলের উপর দিয়ে একসঙ্গে দৌড়োদৌড়ি করছে। কিন্তু ওর বাবাই বলল, অন্য কাঠবেড়ালীটা ওই কাঠবেড়ালীর ভাই নয়, বন্ধু। পাশের বাড়িতে থাকে। পাছে ও-ও কাজীদাদার মতো বোকা প্রমাণিত হয়ে যায়, রাখাল তাই তাড়াতাড়ি বলল, হ্যাঁ, আমি জানি তো।

    পরের দিন আবার কাজি দুপুরবেলা এসেছে ওই খোলা জায়গাটায়। জটুও হাজির। কাজিকে দেখে ঠোঁটের উপর ডান হাতের তর্জনীটা রেখে ইঙ্গিতে কাজিকে চুপ করে থাকতে বলে এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করে জটু। কী ব্যাপার! আজ কাঠবেড়ালীটা গেল কোথায়! কাজি ফিসফিস করে বলে, একটু চুপ করে বসে থাক, এসে যাবে ঠিক।
    আসে না কিন্তু কাঠবেড়ালীটা, ওদিকে পেয়ারাটা উধাও।

    চুপচাপ বসে থাকে ওরা দুজন, তাহলে কি কাঠবেড়ালীটা রাগ করেছে ওদের উপর? নাকি, অসুখ-বিসুখ করল!
    এমন সময় ঘটনাস্থলে হাজির দুলি, মানে রাঙাদি।
    রাঙাদি, ছুটে এসে বলে জটু, কাঠবেড়ালীটা কি মরে গেল নাকি? কাজিদা আর আমি কতক্ষণ ধরে বসে আছি, দেখতেই পাচ্ছি না।
    দেখ্‌, অসুখ করে শুয়ে আছে নাকি, জবাব দেয় দুলি, যা পেটুক ওটা, কী ছাইভস্ম খেয়েছে দেখ্‌।
    ছাইভস্মই খেয়ে থাক আর মরেই যাক, বসে থাকে ওরা তিনজন।

    এমন সময় দুলি বলে কাজিকে, চুপচাপ অমন মুখ গোমড়া করে বসে না থেকে একটা কবিতা লেখ না। কবিতা একটা, কাঠবেড়ালীটাকে মনে করে।
    সে তো পারিই, বলে কাজি, কিন্তু আঙুলে আমার ব্যথা, তুমি যদি লিখতে পার, আমি বলে দিতে পারি।
    সে আর কী আছে, দুলি বলে, তোমরা বোস একটু, আমি খাতা-পেনসিল নিয়ে আসি। খাতা-পেনসিল আনতে বাড়ির ভেতরে চলে যায় দুলি।

    খাতা-পেনসিল নিয়ে রেডী হয়ে বসে দুলি। কাজি বলে, কিন্তু একটা কথা, বানান ভুল করা চলবে না।

    দেখ, রেগে বলে দুলি, ফয়জুন্নিসা স্কুল ছেড়ে দেবার আগে প্রতি ক্লাসে আমি বাংলায় ফার্স্ট হতাম। তুমি কি ইংরাজিতে লিখবে?
    নাঃ বাংলাতেই, তবে লিখব তো না। বলব। লিখবে তুমি। যখনই আমার মনে হবে বানানটা হয়তো ভুল করেছ তুমি, তখনই আমি চেক করব। ঠিক আছে?
    ঠিক আছে, বকবক না করে এবার বলতে শুরু কর।

    কাজি বলে, ফার্স্ট লাইন, লেখ, 'কাঠবেড়ালী, কাঠবেড়ালী, পেয়ারা তুমি খাও' – খাওয়ের পর জিজ্ঞাসার চিহ্ণ। এরপর দ্বিতীয় লাইন, 'গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবিলেবু? লাউ?' – ঠিক আছে? গুড় আর মুড়ির মধ্যে হাইফেন, দুধ আর ভাতের মধ্যে হাইফেন। জিজ্ঞাসার চিহ্ণগুলো আর বলছি না, আমার উচ্চারণ থেকেই বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই। আচ্ছা, এবার তৃতীয় লাইনে এস, 'বেড়ালবাচ্চা? কুকুরছানা? তা-ও?' তা আর ও-এর মধ্যে একটা হাইফেন হবে।

    ঠিক আছে?– কাজি বলে, এবার তাহলে পরের স্তবক। লেখ, 'ডাইনী তুমি হোঁৎকা পেটুক,' কমা, পরের লাইন, 'খাও একা পাও যেথায় যেটুক!' এবার দাঁড়ি নয়, একটা বিস্ময়বোধক চিহ্ণ দাও, ঠিক আছে? পরের লাইন, 'বাতাবিলেবু সকলগুলো,' তার পরের লাইন, 'একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো!' নুলোর পর বিস্ময়বোধক চিহ্ণ, লাইন শেষ। পরের লাইন, 'তবে যে ভারি ল্যাজ উঁচিয়ে পুটুস-পাটুস চাও?' লাইন শেষ, শেষে জিজ্ঞাসার চিহ্ণ দেবে, পুটুস আর পাটুসের মাঝে একটা হাইফেন। তারপর এই স্তবকের শেষ লাইন, 'ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!'

    জটু এতক্ষণ বসেই ছিল। এবার প্রায় লেখাপড়াই হচ্ছে বুঝে আস্তে আস্তে উঠে পাঁচিলের ধার ঘেঁসে বোধ হয় আবার কাঠবেড়ালীই খুঁজতে শুরু করল।

    কাজি বলল, শেষ লাইনে তিনটে বিস্ময়বোধক চিহ্ণ বুঝতে পেরেছ নিশ্চয়ই।

    গম্ভীর হয়ে দুলি বলে, হুঁ। কাজি বলে, পড়তো একটু, কেমন দাঁড়াচ্ছে শুনি। দুলি পড়ে,



    কাঠবেড়ালী, কাঠবেড়ালী, পেয়ারা তুমি খাও?
    গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবিলেবু? লাউ?
    বেড়ালবাচ্চা? কুকুরছানা? তা-ও?

    ডাইনী তুমি হোঁতকা পেটুক,
    খাও একা পাও যেথায় যেটুক!
    বাতাবিলেবু সকলগুলো
    একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো!
    তবে যে ভারি ল্যাজ উঁচিয়ে পুটুস-পাটুস চাও?
    ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!



    গূড, বলে কাজি, আর একটা স্তবক হবে। লেখো, 'ইস্‌ খেয়োনা মস্তপানা ওই সে পাকাটাও!' বিস্ময়বোধক চিহ্ণ, পরের লাইন, 'আমিও খুবই পেয়ারা খাই যে!'

    খাও বুঝি?– বলে দুলি, পেলে তো খাবে, বিস্ময়বোধক দিই? হ্যাঁ, বিস্ময়বোধক, বলে কাজি, তবে লাইন শেষ কোরোনা, তারপর লিখবে 'একটি আমায় দাও।' আমায় দাও লিখে দাঁড়ি আর তারপর এই লাইন শেষ। পরের লাইন, 'কাঠবেড়ালী!' বিস্ময়বোধক, 'তুমি আমার ছোড়দি হবে?' জিজ্ঞাসার চিহ্ন, 'বৌদি হবে?' আবার জিজ্ঞাসার চিহ্ন, তারপর শুধু একটা 'হুঁ' দিয়ে লাইন শেষ করে দাও।

    হুঁ-এর পর?

    হুঁ-এর পর লাইন শেষ করে দাও, কিন্তু কোন চিহ্ন নয়। মানে, পরের লাইনে এই 'হুঁ'-এর কন্টিন্যুয়েশন চলবে। তারপর, পরের লাইনে, 'রাঙাদিদি?' জিজ্ঞাসার চিহ্ণ। তার মানে, পড়ার সময় 'হুঁ রাঙাদিদি?' এবার রাঙাদিদির পর, 'তবে একটা পেয়ারা দাও না!' বিস্ময়বোধক চিহ্ণ আর, তারপর একটা 'উঃ' দিয়ে আবার বিস্ময়বোধক। তার মানে লাইনটা দাঁড়াল, 'রাঙাদিদি? তবে একটা পেয়ারা দাওনা! উঃ!'

    লেখা শেষ করে দুলি বলে, এই স্তবকটা পড়ব? তারপর কাজির জবাবের তোয়াক্কা না করেই পড়তে শুরু করে,



    ইস খেয়োনা মস্তপানা ওই সে পাকাটাও।
    আমিও খুবই পেয়ারা খাই যে! একটি আমায় দাও!
    কাঠবেড়ালী! তুমি আমার ছোড়দি হবে? বৌদি হবে? হুঁ
    রাঙাদিদি? তবে একটা পেয়ারা দাও না! উঃ!



    পড়া হয়ে গেলে কাগজটা খাতা থেকে আলাদা করে ছিঁড়ে নেয় দুলি, তারপর কাগজখানা ভাঁজ করতে করতে বলে, মন্দ হয়নি কবিতাটা, আমি নিলাম এটা।

    তুমি? কিন্তু এই কবিতার 'আমি'টা তো জটু। তুমি কী করে নেবে?
    'আমি'টা কে সে তো বোঝাই যাচ্ছে। যে কেউই বুঝবে। কিন্তু শ্রুতিলিখনটা তো আমিই করলাম। তাই আমিই নেব।
    নেবে? তাহলে দেখি, বানান-টানানগুলো দেখে দিই একটু।

    কাগজখানা হাতে নিয়েই কাজি বলে, এ কী! প্রথমেই তো বানান ভুল।
    কেন, কোন্‌ বানানটা?
    এই যে, কাঠবেড়ালী।
    ঠিকই তো আছে; ক-য় আ-কারে কা আর ঠ কাঠ, ব-য় এ-কারে বে র-য় আ-কারে রা আর ল-য় দীর্ঘ ঈ, লী। কাঠবেরালী।
    আরে, এ তো বাঙালদের বানান হল, ভুল।
    তুমি কি তাহলে ইংরাজি বানান চাও?
    ইংরাজি নয়, ইংরিজি। কিন্তু সেটাই বা চাইব কেন? বিশুদ্ধ বাংলা বানান, কাঠবেড়ালী। ব-য়ে শূন্য র নয়, ড-য়ে শূন্য ড়-য়ে আ-কার, ড়া। বেড়ালী, কাঠবেড়ালী।
    তু্মি কোন্‌ বিলেতের বাঙালি বুঝলাম না বাপু, আমরা তো কাঠবেরালীই বলি।
    ভুল বল, আমাদের মতো খাঁটি বাঙালিরা – রাঢ় বাংলার বাঙালিরা – মানে রবীন্দ্রনাথ সত্যেন দত্ত শহীদুল্লাহ্‌ সুনীতি চাটুজ্জে কাজি নজরুল ইসলামরা সব্বাই বলি কাঠবেড়ালী, কাঠবেরালী নয় – ড়, র নয় – মুখটা ঈষৎ তুলে মুখের মধ্যে জিভের অবস্থানটা দেখিয়ে বলে কাজি।
    যাঃও! মিথ্যে বানান-ভুলের দোষ দিচ্ছ, বলে ভাঁজ করা কবিতা-লেখা কাগজটা ওর খাতার মধ্যে ভরে নিয়ে পায়ে
    দুপ-দাপ শব্দ তুলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে যায় দুলি।

    একা বসে হো হো করে হেসে ওঠে কাজি।

    আশপাশেই ছিল কোথাও, জটু এসে বলে, এত হাসছ কেন কাজিদাদা? আমার তো কান্না পাচ্ছে, কী যে হল কাঠবেড়ালীটার!

    পরের দিন কলেজের প্রিন্সিপাল সত্যেনবাবুর বাড়িতে ভলান্টিয়ারদের মীটিং ছিল, তার সঙ্গে বিজয়া সম্মেলনও। সত্যেনবাবু বোঝাচ্ছিলেন পুলিশ কীভাবে সতেরই নভেম্বরের হরতালের আন্দোলনটা বানচাল করার চেষ্টা করতে পারে। পুলিশের হাতে দুটো উপায়, বললেন সত্যেনবাবু; এক, আমাদের ভলান্টিয়ারদের ভয় দেখানো, আর দুই, হরতাল পণ্ড করায় উৎসাহ দেওয়া। ভয় দেখানো মানে কী? মারধোর করা, জরিমানা আদায় করা আর ভলান্টিয়ারদের গ্রেপ্তার করে জেল-এ ভরে দেওয়া। কিন্তু আমার মনে হয়, এবার পুলিশ সেটা করবে না।

    করবে না কেন? জিজ্ঞেস করে কলেজের একটা ছেলে।

    ভলান্টিয়ারদের মধ্যেই একজন উত্তর দেয়, আমরা শুনেছি ভারত সরকার যুবরাজকে বোঝাতে চায় যে তাঁর আগমনে ভারতবাসী অত্যন্ত খুশি। মানুষকে যদি জেলেই ভরে রাখে পুলিশ, ভয়ে যদি রাস্তাঘাট এড়িয়েই চলে সাধারণ মানুষ, দেশের মধ্যে যদি একটা থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে যুবরাজকে বোকা বানানো সহজ হবে না। কাজেই, পুলিশকে এবার নতুন কিছু ভাবতে হবে।

    ঠিকই বলেছ, সত্যেনবাবু বলেন, ওই 'নতুন কিছু'-র মানেই হল সাধারণ সরল মানুষকে অন্যভাবে প্রভাবিত এবং প্রতারিত করা। পুলিশের পক্ষে এ কাজটা সহজ নয়, কারণ এ-পর্যন্ত মানুষ পুলিশকে ভয় করতেই শিখেছে, পুলিশের কাছ থেকে নতুন কিছু শিখতে শেখেনি।

    নজরুল বলে, আমার মনে হয় পুলিশকে যদি শান্তিভঙ্গ না করে যুবরাজকে “ভুল বোঝাবার” কাজ করতে হয়, তাহলে আমাদের ভলান্টিয়ার-বাহিনীর একটা বিপক্ষ ভলান্টিয়ার-বাহিনী তাদের তৈরি করতে হবে। কাজটা একেবারেই সহজ নয়, কারণ স্যর যেরকম বললেন, মানুষ পুলিশকে এতদিন ভয়ই করে এসেছে। হয়তো লোভ-টোভ দেখিয়ে দু-চারজনকে হাত করা যায়, কিন্তু আমাদের এই বিপুল ভলান্টিয়ার-বাহিনীর বিপক্ষ তাদের পক্ষে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। আমাদের হাতে এখনো অনেকটা সময় আছে, আমরা যদি আমাদের ভলান্টিয়ার-বাহিনীকে শহরের নানা মহল্লা অনুযায়ী ভাগ করে প্রতিটি মহল্লায় প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি, মনে হয় পুলিশ আমাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না। তবে একটা কথা আমার মনে হয়, কারো যেন মনে না হয় আমরা মানুষের উপর একটা কিছু চাপিয়ে দিতে চাইছি। মানুষের যদি অসুবিধে হয় তারা আমাদের কথা শুনবে কেন?

    বসন্ত বলেন, এই কথাটা জরুরি: মানুষের যদি অসুবিধে হয় তারা আমাদের কথা শুনবে কেন? এই যে আমরা সবাইকে বলব সতের তারিখে রাস্তায় না বেরোতে, দোকান-বাজারে না-যেতে, তাহলে যে-সব পরিবারে বৃদ্ধ অথবা মহিলা ছাড়া কেউ নেই, তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাজার কি আমাদের ভলান্টিয়ারদের সতের তারিখের আগেই করে দেওয়া উচিত নয়? এই কাজটা যদি আমরা করতে পারি, তাহলে বাজারের দোকানদারদেরও আমরা বোঝাতে পারব যে হরতালের দিন তাদের দোকান খুলে রাখার কোন মানেই নেই, কারণ খোলা থাকলেও সেদিন বিক্কিরি-টিক্কিরি হবার সম্ভাবনা খুবই কম।

    অতীন একটা নতুন খবর দিলেন। তিনি শুনেছেন, পুলিশ নাকি বাড়ি-বাড়ি নোটিশ পাঠাচ্ছে একটা। সব পরিবারকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, বাড়ির প্রধান দরজার সামনেটা জল-ভরা মঙ্গলঘট আর কলাগাছের ডাল দিয়ে সাজাতে হবে। প্রদীপও জ্বালাতে হবে নাকি!

    কলেজের একটি ছেলে বলল, প্রদীপ কেউ জ্বালাবে বলে মনে হয় না। তবে জ্বালায় যদি কেউ, আমরা নিভিয়ে দেব। নজরুল যেখানে বসেছিল সেখান থেকে উঠে গিয়ে সত্যেনবাবুকে খুব নিম্নস্বরে একটা কিছু বলল, সত্যেনবাবু ছাড়া আর কারো কানে সে-কথা পৌঁছল বলে মনে হল না। সত্যেনবাবু শুধু বললেন, আমার মনে হয় ঠিকই প্রস্তাব।

    সভাশেষে সকলের জন্যে এক-এক ভাঁড় কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই এল, এটা সত্যেনবাবু স্যরের ব্যবস্থা, উনি সবাইকে বলেছিলেন ওঁর বাড়িতে বিজয়া সম্মেলন হবে। মীটিঙে সারাক্ষণ চুপ করে বসেছিল বীরেন, এবার কথা বলল ও। বলল, আগের বার আমাদের প্রভাত-ফেরীতে মেয়েরা একেবারেই আসেননি, মহিলা বলতে ছিলেন শুধু কাকিমা, শ্রীমতি হেমপ্রভা মজুমদার। এবার কিন্তু আমি সবাইকে অনুরোধ করব বাড়ির ছোট থেকে বড়, সব মেয়েদের পাঠিয়ে দিতে। মিছিলের গোড়াতেই থাকবেন মহিলারা। আমাদের বাড়ির তিনটি মেয়ে, অঞ্জলি, কমলা আর আশালতা বা দুলি থাকবেই, মা আর জ্যাঠাইমাকেও আমি অনুরোধ করব থাকতে। হেমপ্রভা বললেন, আমার মেয়েরাও, শান্তিলতা আর অরুণা, ওরাও থাকবে। এইভাবে একে একে অনেকেই তাঁদের বাড়ির মেয়েদের নাম করে করে তাদের পাঠিয়ে দেবার অঙ্গীকার করলেন। বিজয়া সম্মেলনের হৈ হৈ যেন বেড়ে গেল আরও কয়েক গুণ।

    মিষ্টান্ন ভোজনের সেই আনন্দোৎসবের মধ্যেই এবার কাজি হাততালি দিয়ে চু্প করালো সবাইকে, আর তারপর বলল, সবাই নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছে আমি স্যরের সঙ্গে একান্তে একটা কথা বললুম; আসলে আমি স্যরের অনুমতি নিচ্ছিলুম, এখন কী বলেছি সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই। এ-কথাটা খুবই গোপন কথা, কিন্তু নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস থাকলে কোন বড় কাজ করা যায় না, তাই কথাটা আমি বলেই দিচ্ছি। সাবধান বন্ধুরা, কথাটা যেন কিছুতেই বাইরে না যায়। প্রতিটি মহল্লায় আমাদের ভলান্টিয়ার বাহিনীর যিনি নেতা, পনের তারিখের সকালবেলায় প্রভাত-ফেরীর শুরুতেই তাঁর কাছে আমরা কিছু ছবি দেব – মহাত্মা গান্ধীর আর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের ছবি। যদি কোন বাড়িতে মঙ্গলদীপ জ্বালানো হয়, আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে সেই দীপ আমরা নিভিয়ে দেব। আর কলাগাছ যদি বাড়ির দরজার সামনে পুঁতে রাখে কেউ, সেই গাছে আমরা মহাত্মা গান্ধী আর দেশবন্ধুর ছবি লাগিয়ে দেব।

    আর, সতেরই নভেম্বর প্রভাত-ফেরীর মিছিল থেকে এই মহাত্মা গান্ধী আর দেশবন্ধুর ছবিই কাজির গ্রেপ্তারের কারণ হল। থানা থেকে মিনিট পাঁচেকের দূরত্বে একটা বাড়িতে, একটাই বাড়িতে – পরে জানা গেল এ-বাড়িতে যে থাকে সে বাইরের লোক, ভাড়াটে, এখানকার থানার এক দারোগা – মঙ্গলদীপ জ্বালিয়েছিল আর কলাগাছও পুঁতেছিল। দীপ নিভিয়ে মিছিলের থেকে যখন গাওয়া হচ্ছিল



    কার তরে জ্বালো উৎসব-দীপ।
    দীপ নেভাও। দীপ নেভাও।
    মঙ্গলঘট ভেঙে ফেল,
    সব গেল মা গো সব গেল।
    অন্ধকার! অন্ধকার!
    ঢাকুক এ মুখ অন্ধকার
    দীপ নেভাও। দীপ নেভাও।–



    কাজি তখন দু-দিকের দুই কলাগাছে দেশবন্ধু আর মহাত্মা গান্ধীর ছবি লাগিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ কোথা থেকে খাকি পোশাকের এক পুলিশ এসে কাজির হাত চেপে ধরে বাঁশি বাজিয়ে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে এল এক দঙ্গল পুলিশ – য়্যু আর আণ্ডার অ্যারেস্ট!

    কাজির হাতে হাতকড়া দিয়ে পুলিশ চলেছে হেঁটে থানার দিকে, আর কয়েকশো মানুষের মিছিল তার পিছন পিছন গাইতে গাইতে চলেছে



    ছি-ছি-ছি-ছি
    এ কী দেখি
    গাহিস তাদেরই বন্দনা-গান,
    দাস সম নিস হাত পেতে দান!
    ছি-ছি-ছি-ছি-ছি-ছি
    ওরে তরুণ ওরে অরুণ!
    নরসুত তুমি দাসত্বের এ ঘৃণ্য চিহ্ণ
    মুছিয়া দাও।
    ভাঙিয়া দাও,
    এ-কারা এ-বেড়ি ভাঙিয়া দাও।



    থানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই থানার বড়বাবু হেঁকে বলেন, লক-আপ!

    জনাচারেক কনস্টেব্‌ল্‌ গোছের লোক টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে যায় কাজিকে। থানার ভিতরে ঢুকে পড়ে পঞ্চাশ-ষাটজন, মিছিলের সামনের দিকে যারা ছিল, সব মেয়েরা, এবং নেতাগোছের প্রায় সবাই। মিছিলে-থাকা আরও শ'য়ে শ'য়ে মানুষ বাইরে থানাকে ঘিরে গান গাইতে গাইতে দাঁড়িয়ে থাকে।

    ওকে ধরলেন কেন?– জিজ্ঞেস করেন হেমপ্রভা মজুমদার।
    আইন ভাঙার অপরাধে, জবাব আসে।
    কোন্‌ আইন?
    আপনাকে বলতে বাধ্য নই।

    নিশ্চয়ই বাধ্য, বলেন হেমপ্রভা, ও আমাদের সঙ্গে আছে। ও যদি আইন ভেঙে থাকে তাহলে আমরাও ভেঙেছি। সে ক্ষেত্রে আপনারা আমাদেরও ধরবেন। ধরবেন, তবে কোন্‌ আইনে ধরছেন জানিয়ে ধরবেন। পুলিশের লোক যারা যেখানে বসেছিল বসেই থাকে। থানায় মিছিলের মানুষ যারা ঢুকেছিল তারা বসে পড়ে মাটিতেই। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ, তারপর বসন্ত হঠাৎ বলে ওঠেন, এ কী, সবাই চুপ কেন? ধর জাগরণী গান। সবাই মিলে একসঙ্গে গেয়ে ওঠে,



    ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!
    ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,
    সন্তান দ্বারে উপবাসী,
    দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!



    সমবেত কণ্ঠস্বর মনে হয় শহরময় ছড়িয়ে পড়ল। থানার বাইরে যে শ'য়ে শ'য়ে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, যারা কিছুক্ষণ আগেও গান গাইছিল কিন্তু থানার ভিতরে কী হচ্ছে বুঝতে না হঠাৎ চুপ করে গেছে, তারাও গানের শব্দ পেয়ে আবার গলা মেলায়। প্রায় আধ-ঘন্টার মতো পুলিশ হতভম্ব হয়ে বসে থাকে, তারপর বড়বাবু হাতের ইঙ্গিতে ওদের থামতে বলেন। একটু পর শব্দ যখন কমে যায় বড়বাবু তখন উঠে দাঁড়িয়ে কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব উঁচু পর্দায় তুলে বলেন, এবার আমরা বাধ্য হব চার্জ করতে।

    কী চার্জ করার কথা বড়বাবু বলছেন – লাঠি না বন্দুক – তা বোঝা না গেলেও আবার হেমপ্রভা বলেন, করুন না, সময় নষ্ট করছেন কেন?

    কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে যান বড়বাবু এবং আবার নিজের চেয়ারে বসে পড়েন। হেমপ্রভা হাতের ইঙ্গিতে আবার গান ধরতে বলেন। ঠিক যেখানে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল গান সেখান থেকেই আবার শুরু হয়:



    পরাধীন বলে নাই তোমাদের
    সত্য-তেজের নিষ্ঠা কি!
    অপমান সয়ে মুখ পেতে নেবে বিষ্ঠা! ছি!
    মরি লাজে, লাজে মরি!
    এক হাতে তোরে পয়জার মারে
    আর হাতে ক্ষীর সর ধরি!
    অপমান সে যে অপমান!
    জাগো জাগো ওরে হতমান!
    কেটে ফেল লোভী লুব্ধ রসনা
    আঁধারে এ হীন মুখ লুকাও!



    এর মধ্যে তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় থানায়। বড়বাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে ভেতরের দিকে – যেখানে সম্ভবত কাজিকে রাখা হয়েছে লক-আপে – চলে যান, তাঁর পিছনেই যায় কয়েকজন দারোগা-পুলিশ। কিছুক্ষণ পর হাতকড়া-পরানো কাজিকে নিয়ে আসা হয় সবায়ের মধ্যে। হেমপ্রভাকে বলেন বড়বাবু, আপনার অনুরোধে আমরা আসামীকে ছেড়ে দিতে রাজি আছি, তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে আসামীর চালচলন-ব্যবহারের দায়িত্ব নিতে হবে।

    আসামী মানে? হেমপ্রভা প্রতিবাদ করেন, এই ভদ্রলোকের নাম কাজি নজরুল ইসলাম, ইনি একজন খ্যাতিমান কবি, আসামী ন'ন; আমি আশা করব আপনি কবির সম্বন্ধে এই অশোভন বিবরণ দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।

    আমি কোন অশোভন বিবরণ দিইনি, বড়বাবু বলেন, যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাকে পুলিশের লোকরা আসামীই বলে; সে যাই হোক, কথা হচ্ছে, এই কবি, মানে এই কাজি ইসলাম, কোথায় থাকেন?
    আমাদের বাড়িতে, কান্দিরপাড়ে, বলে বীরেন।
    পার্মানেন্টলি?
    না, পার্মানেন্টলি নয়। কুমিল্লায় এলে থাকেন, পার্মানেন্টলি উনি থাকেন কলকাতায়।

    বড়বাবু বলেন, আমরা ওনাকে কোন চার্জ দিচ্ছি না, আমরা ঠিক করেছি ওনাকে ছেড়েই দেব। কিন্তু আপনাদের কোঅপারেট করতে হবে। কুমিল্লার স্থায়ী বাসিন্দা পাঁচজনকে ওনার পরিচিত হিসেবে সার্টিফিকেট দিতে হবে।

    সত্যেনবাবুও এসেছিলেন, এতক্ষণ কথা বলেননি, এবার তিনি বললেন, সার্টিফিকেটটার কোন একটা স্ট্যাণ্ডার্ড ফরম্যাট নিশ্চয়ই আছে, সেটা একটু দেখান।

    ফাইল খুলে একটা কাগজ বের করেন বড়বাবু, সত্যেনবাবু নিজে পড়েন, তারপর হাতে হাতে কাগজটা ঘুরতে থাকে কিছুক্ষণ। অবশেষে, সেই কাগজের লেখাটার একটা নকল লিখে দেন থানার একজন দারোগা। সত্যেনবাবু, হেমপ্রভা, বিরজাসুন্দরী, আফতাবুল ইসলাম আর অতীন্দ্র সই করেন কাগজটায়।

    নজরুল ছাড়া পায়। এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন গাইতে গাইতে মিছিলের পুরোভাগে দাঁড়ায় সে। আরও এক ঘন্টা শহরের নানা রাস্তায় হাঁটে মিছিল। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে কুমিল্লার মানুষ অভিনন্দন জানায় মিছিলের মানুষদের, কেউ কেউ মিছিলে যোগও দেয়। সর্বত্র শান্তিপূর্ণ হরতাল।

    দু-তিনদিন আগে পবিত্রর একটা চিঠি এসেছে। লিখেছে, কলকাতায় জোর গুজব, সুভাষবাবুকে যে কোন দিনই গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ। তুই সুভাষবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলি। যদি সত্যিই কথা বলতে চাস, কুমিল্লার কাজ শেষ করে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফিরে আয়।

    আগামীকাল, আঠের তারিখ, সকালের ট্রেনেই ফিরবে নজরুল। আজ রাতে একটু ভালো খাওয়াদাওয়া হবে, বাড়ির সবাই একসঙ্গে বসে খাবে। কাজি বলল, আমি একটু আমার জিনিষপত্র গুছিয়ে রাখি, ঘরে ঢুকে যায় সে। কিছুক্ষণ পর ঘরে আসে দুলি, কাজি তখন হোল্ড-অলটার বক্‌ল্‌স্‌ জোর করে টাইট করছে। কোন কথা না বলে একখানা কাগজ দেয় দুলি কাজির হাতে। কাগজটায় কাঠবেড়ালী কবিতাটা নতুন করে পরিষ্কার করে লেখা হয়েছে। ওপরে লেখা, কাঠবেড়ালী, তার নীচে কাজি নজরুল ইসলাম, তারপর কবিতাটা, তিনটি স্তবকে। কাজি খেয়াল করে কাঠবেড়ালী বানানটা শুদ্ধ করে লেখা।

    দুলির দিকে তাকায় সে। মৃদু হাসি। তারপর কাগজটা রেখে দেবার জন্যে নিজের ব্যাগটা খোলে। হঠাৎ দুম দুম দুম। পিঠে তিনটে কিল। পেছন ফিরে দেখে কাজি, ঘরে কেউ নেই।


    ক্রমশ...
  • ধারাবাহিক | ১০ ডিসেম্বর ২০২২ | ৪৪৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ১৩ ডিসেম্বর ২০২২ ২৩:২৪514537
  • দারুণ হচ্ছে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন