বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • সীমানা - ৫

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৪ মে ২০২২ | ১১৭৬ বার পঠিত
  • শুরু হলো শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের নতুন পাক্ষিক ধারাবাহিক উপন্যাস - 'সীমানা'।
    বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশক এই উপন্যাসের সময়কাল। রাজনৈতিক আন্দোলন ছাড়াও সমাজ শিল্প এবং সাহিত্যের নানা আন্দোলনের কারণে গত একশো বছরের ভারতীয় ইতিহাসে এই সময়কাল বিশিষ্ট। উপন্যাসটির নায়ক এই সময়কালই।
    এই রচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন কাজি নজরুল ইসলাম। নজরুলের কর্মজীবনও এই দুই দশকেই ব্যাপ্ত।
    ছবি: সুনন্দ পাত্র





    ঝকঝকে পরিষ্কার ধাঙড় বস্তি

    ট্রেন থেকে হাওড়া স্টেশনে বেরিয়ে যতবারই পন্টুন ব্রিজ পেরিয়ে কলকাতায় গেছে নজরুল, ওর মনে হয়েছে ব্রিজটা পেরোলেই পৃথিবীর শুরু। নদী পেরোলেই সভ্য জগৎ, কলকাতা তার নাম। নদীর পেছনেও যে শহর আছে একটা, রাস্তাঘাট দোকানবাজার গাড়িঘোড়া মানুষজন সব নিয়ে পরিপূর্ণ একটা শহর – এ যেন কখনও চিন্তাতেই আসেনি নজরুলের। আজ শ্রাবণের ভোরে বেশ জোর এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল, তার মধ্যেই একটা ট্রামে পিংলা আর ও এসে পৌঁছল বড়বাজারের ঠিক মুখটায়, যেখান থেকে ট্রামটা স্ট্র্যান্ড রোড ধরে চলে যাবে দক্ষিণে। ব্রিজটা এতক্ষণ বন্ধ ছিল, সদ্য খুলেছে। এ পারে এই সকালবেলাতেই জমে থাকা গাড়ি আর মানুষের ভিড় দেখে পিংলা প্রস্তাব দিল ওরা ব্রিজ ধরে পায়ে হেঁটে নদী পেরোবে। বৃষ্টি এখন নেই, আকাশ ভরা কালো মেঘ আর নদীর উত্তাল ঢেউ দেখতে দেখতে জোলো হাওয়ার আরাম সর্বাঙ্গে মেখে ওরা পৌঁছল হাওড়া স্টেশনে। সেখান থেকে আর একটা ট্রামে হাওড়া ময়দান। তারপর টিকিয়াপাড়ার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রেল লাইন পেরিয়ে পিংলাদের বস্তির দিকে যাওয়ার ঠিক মুখটাতে দেখা গেল একটা মিষ্টির দোকানে ভাজা চলছে জিলিপি আর সিঙাড়া।

    খিদে পায়নি? – জিজ্ঞেস করে নজরুল।

    পেয়েছে তো, জবাব পিংলার।

    পিংলা নিজে ছাড়া ওর বাড়িতে ওর মা আর ভাই। হিসেব করে কেনা হয় জিলিপি-সিঙাড়া। বাঁশের বাঁকানো কঞ্চি দিয়ে তৈরি চ্যাঙারিতে শালপাতা ঢাকা গরম জিলিপি-সিঙাড়া নিয়ে পিংলাদের বাড়ির দিকে এগোয় ওরা। পিংলা আগেই বলে দিয়েছিল ওর মাকে পাওয়া যাবে না এত সকালে। ভোর থেকেই খাটা-পায়খানার মেথরদের কাজ শুরু হয়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে দশটা-এগারোটা তো অন্তত বাজবেই।

    পিংলার বাসস্থানে পৌঁছিয়ে বিস্মিত নজরুল। দারিদ্রের চেহারা তো তার অজানা নয়। দারিদ্র যে মানুষের স্বাভাবিক মনুষ্যত্বকে কীভাবে প্রভাবিত করে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে নজরুলের। একেবারে ছেলেবেলায় পিতৃহারা হয়ে কত রকমের কাজই না করেছে সে। মসজিদের খাদিমগিরি থেকে লোটোর দলে গান গাওয়া। রুটির কারখানায় খাওয়া-শোয়া-মাসিক পাঁচ টাকার মজুরি থেকে রেলের গার্ডসাহেবের বাড়ির গৃহভৃত্যের কাজ। এরই ফাঁকে ফাঁকে কখনও-কখনও নিজের বুদ্ধির জোর আর স্নেহপরবশ কোন মানুষের দয়ায় কোন একটা ইশকুলে পড়া আর নিঃশুল্ক বোর্ডিংয়ে থাকার সুযোগ কিছুদিন। থেকেছে-ঘুমিয়েছে কত রকমের জায়গায়! সিঁড়ির নিচে এক ফালি অস্থায়ী বিছানা কখনও, কখনও বা কোন গ্রাম্যকুটিরের মেঝেতে লোটোর দলের সহশিল্পীর বিছানার ছোট একটা ভাগ। তবুও, কোন ধাঙড়-মেথরের বাড়িতে কাটাতে হয়নি কখনও। পিংলাকে সে ভালই জানে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, পিংলা যখন হাওড়ায় ওদের বস্তিতে গান শোনাবার আমন্ত্রণ জানাল ওকে, এক মুহূর্তের জন্যে অস্বস্তি কি বোধ করেনি নজরুল? ধাঙড় বস্তিতে? পিংলাকে দেখে কিছু বোঝা যায় না সত্যিই, কিন্তু সত্যি সত্যিই সকালে গিয়ে সন্ধেবেলাতেই ফিরে যদি না আসা যায়, তাহলে ধাঙড় বস্তিতে রাত কাটাতে পারবে ও? সেই উদারতা আর সেই মনের জোর আছে ওর?

    খাপরার চালের প্লাস্টারহীন বাড়িটায় ঢুকে অবাক হল নজরুল। দরজা পেরিয়ে একটা উঠোন গোছের। ঝকঝক তকতক করছে উঠোনটা। উঠোনে দাঁড়িয়ে সোজা তাকালে একটা খোলা বারান্দা। সামনে, বাঁয়ে, ডাইনে। বারান্দায় বেশ কয়েকটা তোলা-উনুন। আর বারান্দার শেষে অনেকগুলো দরজা। খোলা কোনোটা, কোনোটা ভেজানো, আধ-খোলা কোনোটা বা। কোনও কোনও দরজার পাশের দেওয়ালে এমনকি হাতে-আঁকা আলপনা গোছের ছবিও দেখতে পাওয়া যায়। নজরুল বুঝল, একই সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বারান্দা পেরিয়ে প্রত্যেকটা দরজা এক-একটা পরিবারের আলাদা আলাদা ঘরের। খোলা দরজা দিয়ে একটা ঘরের ভেতর চোখ গেল নজরুলের। মেঝেতে বঁটি পেতে সবজি কুটছে একটা মেয়ে।

    নিজেদের ঘরে নজরুলকে নিয়ে ঢুকে যায় পিংলা। ছোট ঘর, বিশেষ আসবাবপত্র নেই। একটা মাদুরে বসে খাতায় কিছু লিখছে একটা ছেলে, বছর বার-তের হবে। ওদের দিকে চেয়ে একটু হাসল।

    ওরাও বসে। ভাই, নজরুল কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই পরিচয় দেয় পিংলা।

    সে তো আগেই বুঝেছি, নজরুল বলে। তারপর ছেলেটার দিকে তাকায়, আমি নজরুল ইসলাম, তোর নাম কী?

    আপনার নাম জানি। দাদা আগেই বলেছে আপনি গান করেন আর কবিতা লেখেন। আমার নাম টুংলু।

    টুংলু, বাঃ! পিংলার ভাই টুংলু। কী লিখছিলি?

    অঙ্ক করছিলুম, অ্যালজেব্রা। এটা স্কুলের হোমওয়র্ক।

    হোমওয়র্ক? অ্যালজেব্রা? কোন ক্লাসে পড়িস তুই?

    ফোর্থ ক্লাস, এ বছরেই অ্যালজেব্রা শুরু হল।

    তাই বুঝি? কিছু খেয়েছিস সকালে? স্কুল শুরু কখন?

    স্কুল এগারটায়। সকালে ব্যায়াম করি, তারপর ভেজানো ছোলা খেয়েছি।

    পিংলার হাতে খাবারের চ্যাঙারিটা ছিল। চ্যাঙারিটা ভাইকে দিয়ে বলে, এগুলো গরম আছে, এক্‌খুনি তিনটে ভাগ করে দে, আমরা খাই। মা’র জন্যে তুলে রাখিস খানিকটা। মা এলে গরম করে দিতে হবে।

    টুংলু কিন্তু ওঠে না সঙ্গে সঙ্গেই। আধ-কষা অঙ্কটা শেষ করে আগে, তারপর ওঠে। ঘরের কোনার দিকে কাপড়-চাপা একটা জলচৌকি ছিল, সেখানে গিয়ে কাপড়টা সরিয়ে দিতেই জলচৌকির ওপর কিছু বাসনপত্র দেখা যায়। চ্যাঙারির থেকে সিঙাড়া-জিলিপি তুলে তিনটে বাটিতে রাখে টুংলু। অবশিষ্ট অংশটা আর একটা বাটিতে ভরে জলচৌকিতেই রেখে, চাপা দেয় বড় একটা বাটি দিয়ে। পাশেই ছিল একটা খালি বোতল। সেটা নিয়ে, কাপড়টা আবার চাপা দিয়ে, একটা করে বাটি পিংলা আর নজরুলকে দিয়ে, খুব দ্রুত চলে যায় বাইরে। ফিরে আসে একটু পর বোতলটায় জল ভর্তি করে। নজরুল আর পিংলার মাঝখানে বোতলটা রেখে, নিজের বাটিটাও হাতে তুলে নেয়।

    এই খাবারটা শেষ করে আমি উনুন ধরাব, টুংলু বলে দাদাকে, উনুন ধরে গেলে চান করতে যাব আমি, তুই ভাতটা চড়িয়ে দিস দাদা। ঘরের আর এক কোনে একটা কেরোসিনের বোতল ছিল, সেটা নিয়ে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় টুংলু।

    পিংলা বলে, একটু বোসো কাজীদা। ভাতটা চড়িয়েই দিই, না হলে কিছু না খেয়েই স্কুলে চলে যাবে ভাইটা। জলচৌকিতেই অনেক কিছুর মধ্যে থেকে একটা কৌটো খুলে অ্যালুমিনিয়মের একটা হাঁড়িতে খানিকটা চাল ঢালে পিংলা। ভেজানো দরজাটা খুলে বাইরে যায়। খোলা দরজা দিয়ে বাইরে চোখ যায় নজরুলের। ওদের ঘরের সামনেই একটা তোলা উনুন থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। এটা টুংলুরই কাজ। আর সেই ধোঁয়ার পর্দা ভেদ করে দেখা গেল চালের বাটি হাতে বাড়িটার একেবারে বাইরের যে সদর দরজা দিয়ে ওরা ঢুকেছিল, সেটা পেরিয়ে বাইরে চলে গেল পিংলা।

    নজরুলের কিছু করার নেই, ওর সঙ্গে একটা ব্যাগ ছিল, সেটা খুলে একটা খাতা বের করে উলটোতে থাকে। একটু পর একটা আওয়াজ কানে ঢোকে ওর – পিংলা রে।

    একটু ঘড়ঘড়ে, মহিলাকণ্ঠ, কিন্তু খানিকটা কেমন যেন পুরুষালিই শব্দটা। বাইরে চোখ যায় নজরুলের, দেখে এক বৃদ্ধা, মলিন শাড়িতে উঠোনটায় দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতর তাকাচ্ছে। নজরুলের সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ায় একটু যেন হাসির আভাস মুখে। নজরুল উঠে দাঁড়াতে যায়, কিন্তু তার আগেই চাল-জলে ভর্তি হাঁড়িটা হাতে পিংলাকে ঢুকতে দেখা যায় সদর দরজা ঠেলে। হে মাইয়া – চিৎকার করে ডাকে পিংলা। বৃদ্ধা পিছন ফেরে, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পিংলার পিছনে ভিজে গায়ে ভিজে গামছা পরা সদ্যস্নাত টুংলুও হাজির।

    বোস্‌ মাইয়া, বোস্‌, আমি চা করে দিচ্ছি, বলতে বলতে দৌড়িয়ে ঘরে ঢুকে আসে পিংলা, আর তার পিছনেই টুংলু। মাইয়া ঘর পর্যন্ত ওঠে না, উঠোন আর বারান্দার সংযোগকারী সিঁড়িতে বসে পড়ে। নজরুলের সামনে যে বোতলটা রেখে টুংলু বেরিয়ে গিয়েছিল সেটার থেকে খানিকটা জল ঢালে পিংলা একটা স্যসপ্যানে। জলটা উনুনে বসিয়ে ঘরে ঢুকে খানিকটা চা-পাতা আর একটা কলাই করা গেলাস নিয়ে উনুনটার সামনে উবু হয়ে বসে চায়ের পাতাগুলো স্যসপ্যানে ঢেলে দেয়। আবার ঘরে ঢুকে নিয়ে যায় খানিকটা চিনি আর গুঁড়ো দুধ। দু-মিনিটেই তৈরি হয়ে যায় গেলাস-ভর্তি চা। মাইয়ার সামনে চায়ের গেলাসটা রাখে পিংলা। চুমুক দিয়ে আরামের একটা আঃ শব্দ করে নজরুলের দিকে তাকিয়ে হাসে মাইয়া। হাসে নজরুলও।

    পিংলা এর মধ্যে ভাতের হাঁড়িটা বসিয়ে দিয়েছে টুংলুর জন্যে। গামছা ছেড়ে পোশাক বদলিয়ে স্কুলে যাবার জন্যে প্রায় তৈরি হয়ে ঘরের দেয়ালে টাঙানো দড়ি থেকে একটা শুকনো গামছা আর শাড়ি-টাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল টুংলু, কিছুক্ষণ পর ফিরে এল খালি হাতে। চা শেষ করে মাইয়াও চলে গেল বাইরে। টুংলুকে বলে পিংলা, কাজীদাকে নিয়ে একটু বাইরে যাচ্ছি আমি। তোর ভাত বসিয়ে দিয়েছি। স্কুলে কিন্তু না খেয়ে যাবি না।

    বাইরে বেরিয়ে পিংলা বলে, আজ তোমার অনারে মা ফিরে এসেছে তাড়াতাড়ি। অন্য দিন আরও এক ঘণ্টা অন্তত দেরি হয়।

    তুই মাকে মাইয়া বলিস? – নজরুল জিজ্ঞেস করে।

    হ্যাঁ, আমি তো পুরোপুরি বাঙালি নই। মাকে মাইয়া ডাকতে আমাকে বাবাই শিখিয়েছিল। কবে শিখিয়েছিল তা অবিশ্যি আমার মনে নেই। কিন্তু শিখিয়েছিল। মাইয়াই বলেছে আমাকে। ভাই কিন্তু মা-ই বলে।

    তোদের দুজনকে ভদ্রলোক বানাতে গিয়ে তোর মা এই বুড়ো বয়েসেও এই কাজ করছে, তোদের খারাপ লাগে না?

    আমাদের কেমন লাগে সেটা কোন ব্যাপার না কাজীদা, মা’র খারাপ লাগে না। মা বলে, এটা আমার জাত-ব্যবসা, তোদের নয়, তোদের বাবা তো সাহেবই হয়ে গিয়েছিল। তোরা সাহেবের ছেলে, সাহেবের মতো থাকবি। দেখো না, মায়ের কি সব দাঁত পড়ে যাবার বয়েস হয়েছে? হয়নি। কিন্তু এই মেথরের কাজ লোককে বুড়ো করে দেয় অকালেই। কিন্তু সে যতই হোক, এনার্জি কোন কিছুতেই কমে না মাইয়ার। বাইরের কাজ সেরে এসে ঘরে ঢুকবে না। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে। বড় জোর ওই বারান্দার সিঁড়িটায় বসবে। ভাই বা আমি চা করে দেব। চা খেয়েই মা চনমনে হয়ে যায়, কিন্তু নোংরা শরীরে জামাকাপড় ছোঁবে না। মায়ের ছেলেরা যে সাহেব! মেয়েদের চান করার যে জায়গাটা আছে সেখানে আমরা কেউ পরিষ্কার শুকনো কাপড় রেখে আসি। চান করে মাইয়া পরে সেগুলো। তারপর কিছু খাওয়া, রান্নাবান্না, ঘরের কাজ। খুঁটিয়ে তন্ন তন্ন করে ঘরের আনাচে-কানাচে কোন ময়লা আছে কিনা দেখবে মাইয়া রোজ। নিজে নোংরা কাজ করে বলেই তার ঘর নোংরা থাকবে নাকি? ছেলেরা না সাহেব? এই যে দেখলে কেরোসিনের বোতল নিয়ে টুংলু বেরোল আর উনুনে আঁচ ধরে গেল এক মুহূর্তেই, ওটাও মাইয়ারই অবদান। রোজ রাত্তিরে ঘুমোতে যাবার আগে তোলা উনুনে কয়লা কাঠ আর ঘুঁটে সাজিয়ে রাখে। পরের দিন সকালবেলায় সাহেব ছেলেদের একজন শুধু একটু কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেবে। কাজ থেকে ফিরে মাইয়া যে চা খাবে আর চান করবে ঘরে ঢোকার আগে!

    এই সব কথা বলতে বলতে মিষ্টির দোকানটার সামনে পৌঁছিয়ে গিয়েছিল ওরা। নজরুল বলল, তোর মাইয়ার জন্যে রসগোল্লা কিনব।

    রসগোল্লা কেনা হয়ে গেলে পিংলা বলে, তুমি কি আজ রাত্তিরে ফিরে যাবে কাজীদা? যেখানে আমরা থাকি সেই বাড়িটায় একটা ঘর খালি আছে। মা সেই ঘরটা কাল পরিষ্কার করে রেখেছে। সেখানেই আজ তোমার গান হবে। তুমি চাইলে সেখানে রাত্তিরে থাকতেও পারো আজ। মনে হয় না তোমার খুব কষ্ট হবে।

    সে দেখা যাবে, বলে নজরুল। এখন চল্‌, রসগোল্লাগুলো তোর মাকে দিয়ে আমরা বেরোব। হাওড়া স্টেশনে দুবে আসবে বেলা বারটায়। তোকে যে একটা সাইকেল জোগাড় করতে বলেছিলুম, হয়েছে জোগাড়?

    হয়েছে, কিন্তু হাতে আসেনি এখনো। শিবপুরে খবরের কাগজের হকারি করে একটা ছেলে, সে বলেছে, ওদের পাড়ার একটা সাইকেল সারাবার দোকানের মালিক পুরোনো একটা সাইকেল নতুনের মতো করে সারিয়ে আমাকে দেবে। কাগজ বিক্রি করে মাসে মাসে তাকে টাকা দিয়ে দিলেই হবে।

    শিবপুর? শিবপুর কোথায়? কাছাকাছি?

    খুব কাছে নয়, মাইল চারেক হবে এখান থেকে।

    চার মাইল দূরের হকারকে তুই চিনলি কী করে?

    শচী নামের একজনকে আমি চিনি। হাওড়া ময়দানে আমার সঙ্গে আলাপ। ওখানে কংগ্রেস-টংগ্রেসের মিটিং হলেই আসে। তারই চেনা। শচীকে আমি আজ তোমার গান শুনতে আসতে বলেছি। তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।

    শোন্‌। তোকে যখন আমি খবরের কাগজ বিক্রি করার কথা বলেছিলুম, তখন আমার নিজেরও কাজটার সম্বন্ধে কোন ধারণা ছিল না। কাল যখন দুবেকে পঞ্চাশ টাকা দিতে গেলুম তোর হয়ে, তখন তুই যে এ ব্যবসার কিছুই জানিস না, সে কথা শুনে ও একটু ঘাবড়ে গেল। আজ ও নিজে হাওড়া স্টেশনে বারটার সময় আসবে। ওখানে নগুয়া নামে বিহারি একটা ছেলে আছে ওর চেনা, ও অনেকগুলো কাগজের এজেন্ট। নগুয়া যাতে তোকে গাইড করে সে ব্যবস্থা ও করে দেবে। আমি তোকে একটা সাইকেল জোগাড় করতে বলেছি শুনে ও বলল, সে তো খুবই ভাল কথা। তুই যে অঞ্চলে থাকিস সেখানে তুই নিজেই কাগজ বেচবি, ‘নবযুগ’ ছাড়া অন্য কাগজও, আর যেখানে তুই নিজে যাবি না সেখানে অন্য হকাররা তোর কাছ থেকে ‘নবযুগ’ নিয়ে বেচবে। কাজেই তোদের বাড়ি গিয়ে তোর মাকে – সরি, মাইয়াকে – রসগোল্লাটা দিয়েই আমরা বেরিয়ে যাব।

    পিংলার মা রসগোল্লাটা পেয়ে খুশি ঠিকই, কিন্তু একটু লজ্জাও পেয়েছে মনে হল। বলল, তোমার দেওয়া সিঙাড়া আর জিলিপি তো খেলাম, আবার এসব কেন? চা খেয়ে চানটান করে শাড়ি বদলিয়ে তার বয়েস একটু কমেই গেছে মনে হল নজরুলের। বলল, খালার বাড়ি এসেছি, খালি হাতে আসব নাকি? নজরুলের খালা ডাকে খুবই খুশি মাইয়া, বলে চানটান করে নাও, আমি রান্না চড়াচ্ছি। চান খাওয়া এসবের জন্যে নজরুল অপেক্ষা করতে রাজি নয়, বললো, এ সব ওবেলা হবে, এখন কাজ আছে।

    কাজ আবার কী, বলে খালা, তুমি তো গান শোনাতে এসেছ। এখন খাওয়া-দাওয়া করে একটু ঘুমিয়ে নাও। তোমার জন্যে ঘর পরিষ্কার করে রেখেছি। তারপর ঘুম থেকে উঠে আসর হবে।

    নজরুল হাসে। সেসব ওবেলা, বলে ও। এখন তোমার সাহেব ছেলের জন্যে একটা সাহেবি কাজের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। আল্লাহর নাম নাও, দোয়া মাগো, যেন হয়ে যায় কাজটা।

    হাওড়া স্টেশনের রেলিঙের বাইরে খোঁজ করলেই নগুয়ার দোকান পাওয়া যাবে, বলেছিল দুবে। ওরা যখন পৌঁছল তখনও দুবে আসেনি। কিন্তু নগুয়ার কাছে খবর ছিল দুবে আসবে। সে ওদের চা-বিস্কুট খাওয়াল।

    শুধু খবরের কাগজ নয়, নগুয়া নানারকমের পত্রপত্রিকা আর বইও বিক্রি করে। স্কুলপাঠ্য বই, ছোটদের জন্যে বিদ্যাসাগর মশায়ের বর্ণপরিচয় প্রথম আর দ্বিতীয় ভাগ, মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা, ধারাপাত, মানসাঙ্কের দুয়েকখানা বই, এমনকি পঞ্জিকা-টঞ্জিকাও। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, বেলা একটা নাগাদ দুবে এল। তার সঙ্গে পঞ্চাশখানা ‘নবযুগ’-এর একটা প্যাকেট। ‘নবযুগ’ এক পাতার সান্ধ্য দৈনিক, ২৪ ইঞ্চি লম্বা আর উনিশ ইঞ্চি চওড়া কাগজ, সঙ্গে করে নিয়ে আসতে দুবের কোনই অসুবিধে হয়নি।

    মাত্র পঞ্চাশখানা? – নজরুল বিস্ময়াহত।

    নগুয়া হাসে। দুবে বোঝায়, কোন প্রস্তুতি নেই, আজ পঞ্চাশের বেশি কোনোমতেই বিক্রি হবে না। হকাররা সব জানুক, প্রত্যেক দিন বিক্রি বাড়বে।

    নগুয়ার কাছ থেকে সকালে যারা কাগজ নিয়েছে তারা যে সবাই দু’বেলাই কাজ করে এমনটা নয়। যারা বিকেলের কাগজ বিক্রি করে তাদের সবাইকেই তো আর এরই মধ্যে খবর দেওয়া যায়নি, দেখা যাক, আজ কতজন হকার ‘নবযুগ’ নেয়। এখন নগুয়াই সবাইকে কাগজ ‘পুশ’ করবে, পিংলা তো কাউকেই চেনে না এখন। তবে যতগুলো কাগজ বিক্রি হবে, তার কমিশন হিসেব করে নগুয়া পিংলাকে পয়সা দিয়ে দেবে। যতদিন না অন্তত দুশো কপি বিক্রি হয়, ততদিন এমনই চলবে, এক পয়সাও লাভ নেবে না নগুয়া। আপাতত দুবে কাগজ ডেলিভারি দেবে নগুয়ার কাছেই, ওরই দোকানের এক পাশে ও রেখে দেবে ‘নবযুগ’। এক পয়সাও লাগবে না পিংলার। দুবেজি ওর দেশের লোক, বড় ভাইয়ের মতো। আর তা ছাড়া, পিংলা এডিটর সাহেবের নিজের লোক, তার জন্যে এটুকু নিশ্চয়ই করবে নগুয়া। আর সাইকেল পেয়ে গেলে যখন সকাল-সন্ধ্যে কাজ করবে পিংলা, নগুয়া তখন ওকে ‘নবযুগ’ ছাড়াও অন্য সব কাগজই দেবে। সব মিলে ভালই কাজ হবে পিংলার, নগুয়া আশ্বস্ত করে নজরুল আর পিংলাকে।

    একটা কথা নগুয়া বলে দিল ওদের। হাওড়া স্টেশনের রেলিঙে যারা দোকান বসায়, তারা কার ভাড়াটে? এটা সরকারি কোন বাজার নয় যে রোজকার তোলা তোলবার বাবু আছে। রেলের আর পুলিশের বাবুদের পয়সা দিয়ে ওরা দোকানদারি করে। সে পয়সার কোন রসিদ নেই। আসল লোককে বলে রাখবে নগুয়া, ওর নিজের দোকানের আশপাশেই যেন পিংলা একটা রেলিঙের অংশ পায়। যতদিন না পাচ্ছে, নগুয়া ওর নিজের ভাই। কোন চিন্তা নেই পিংলার।

    আজকের দিনটায় বৃষ্টি ছিল না, তিনটের মধ্যেই ফিরে এসেছে ওরা। মাইয়ার জোরাজুরিতে খাওয়ার আগে চানও করতে হল নজরুলকে। বস্তির বাইরে মিউনিসিপ্যালিটির একটা জলের পাইপের পাশেই শান-বাঁধানো জায়গা একটা, বস্তির পুরুষরা চান করে সেখানে। পাশেই আর একটা জায়গা আছে টিন দিয়ে ঘেরা, সেটা মেয়েদের। শান-বাঁধানো জায়গাটা পরিষ্কার, একটা বালতিতে জল ধরে মগ দিয়ে চান করল নজরুল, ওর খারাপ লাগল না। সকাল থেকে এই ব্যাপারটাই বারবার লক্ষ করছে নজরুল। সমাজের সবার চাইতে নোংরা কাজটা যারা করে, তারা নিজেদের এত পরিষ্কার রাখে! ঝকঝকে তকতকে তাদের ঘর, উঠোন, বাসনপত্র। শান-বাঁধানো চান করার জায়গাটায় শ্যাওলা তো থাকতেই পারত। কিন্তু, অবাক হয়ে নজরুল দেখে এতটুকু নোংরা নেই কোত্থাও!

    নজরুলের জন্যে আগে থেকে পরিষ্কার করা যে ঘরটার কথা সকালে বলেছিল পিংলা, সেখানে একটা দড়ির খাটিয়ায় চাদর পাতা একটা। মাইয়া বললো, এখন খেয়ে নাও, তারপর এই বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নাও একটু। পাঁচটার সময় খেলাওনজি আসবে হারমোনি আর ঢোল নিয়ে, তখন গান হবে।

    হারমোনি আর ঢোলের মালিক খেলাওনজির সঙ্গে আলাপ হবার আগেই এসে গেল শচী। ধুতি আর শার্ট পরে এসেছে। দেখে মনে হল পিংলার চেয়ে বয়েসে একটু ছোটই সে, বছর দুয়েকের ছোট তো নিশ্চয়ই। ভারী সুন্দর কথা বলার ভঙ্গি তার, প্রতিটি বাক্যের শেষ শব্দটা কেমন যেন টেনে দেয়। তার পুরো নাম শচীনন্দন চট্টোপাধ্যায়। এসেই, বসে পড়ল মেঝেতে, দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে। বলল, সে থাকে শিবপুরে। হেঁটেই এসেছে পুরোটা।

    হেঁটে না এলে আর কীভাবে আসা যেত? – জিজ্ঞেস করে নজরুল।

    ট্রাম আছে। শিবপুরে ট্রামের টার্মিনাস। সেখান থেকে আসা যেত হাওড়া ময়দান অবধি, বাকিটা হাঁটা।

    সাইকেল নেই? পিংলা যে বলল, আপনি ওকে একটা সাইকেল জোগাড় করে দিচ্ছেন; নতুনের মতো, কিন্তু আসলে পুরোনো। আপনার নিজের নেই সাইকেল?

    পিংলা ওখানে ছিল না। সে গেছে খেলাওনজির সঙ্গে তার বন্ধুর বাড়িতে, হারমোনিয়ম আনতে। খেলাওনজি নিজে ঢোল বাজায়, ঢোল আছে তার, হারমোনিয়মটা আনবে অন্য একজনের কাছ থেকে।

    প্রথমেই বলি, বলে শচী, আমাকে আপনি সম্বোধন করার দরকার নেই। শচী বলেই আমাকে ডাকে সবাই, তুমি বা তুই যা হোক একটা বলতে পারেন। পিংলার মতই আমিও আপনাকে কাজীদা বলেই ডাকব। পিংলাকে সাইকেলটা আমি জোগাড় করে দেব বলিনি। আমার চেনা একটা ছেলে – তার নাম ফান্টুস – শিবপুরেই থাকে খবরের কাগজ বিক্রি করে, জোগাড় করে দেবে সে। আমার তো সাইকেলের প্রয়োজন নেই, আমি গ্রামের ছেলে হাঁটতে পারি খুবই, আর আমার তো মন্থর জীবন, কোন তাড়াহুড়ো নেই জীবনে, সাইকেল কিনতে যাব কেন?

    খানিকটা অবাক হয়েই নজরুল তাকায় শচীর দিকে। এই বয়েসের ছেলে – বয়স কত আর, আঠের-উনিশ হবে – দিব্যি বলে দিল তার এমন মন্থর জীবন যে সাইকেলের প্রয়োজনই নেই! তবুও সে ব্যাপারে না গিয়ে বলল, কিন্তু আমি তো শুনেছি শিবপুর অনেক পুরোনো জায়গা, গ্রাম বলতে আমরা যা বুঝি ঠিক সেরকম নয়।

    ঠিকই শুনেছেন, শিবপুর একেবারেই গ্রাম নয়। আমি শিবপুরে থাকি বটে কিন্তু আসলে আমি শিবপুরের ছেলে নই, আমার বাড়ি যশোর জেলায়, নড়াল সাব-ডিভিশনে, এখন শিবপুরে থাকি।

    কেন? এখানে কলেজ-টলেজে পড় নাকি? শিবপুরেই তো শুনেছি সেই বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।

    ঠিকই শুনেছেন, কিন্তু আমি এখানে পালিয়ে এসেছি। বাবার ভয়ে।

    অ্যাঁ? বাবার ভয়ে? নড়েচড়ে বসে কাজী, একটা গল্পের গন্ধ পাওয়া গেল।

    গল্পটা কিন্তু শোনা হল না সেদিন। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল পিংলা। দু’হাতে দুটো আংটার সাহায্যে একটা হারমোনিয়ম প্রায় পেটের সঙ্গে লাগিয়ে ঈষৎ পিছনের দিকে হেলে ‘হারমোনিয়ম হাজির’ ঘোষণা করল সে। তার জামাটা অর্ধসিক্ত, ঘাম অথবা বৃষ্টি অথবা দুটোই হতে পারে, হারমোনিয়মের ওপরেও কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জল।

    হারমোনিয়মটা মেঝেতে রেখে পকেট থেকে রুমাল বের করে সেটা মুছতে মুছতে হাঁক পাড়ে পিংলা, মাইয়া, একটা মাদুর। হ্যাঁ-সূচক একটা শব্দ ভেসে আসে পিংলাদের ঘর থেকে, আর প্রায় একই সঙ্গে খাটিয়া থেকে নিচে নেমে হারমোনিয়মের সামনে বসে পড়ে নজরুল। একটু পরেই এক হাতে একটা কেটলি আর অন্য হাতে একটা থালার ওপর বসানো গোটাকয়েক কাপ নিয়ে ঢোকে টুংলু, তার পিছনেই মাইয়া একটা মাদুর হাতে নিয়ে।

    বৃষ্টি পড়ছে নাকি? – জিজ্ঞেস করে নজরুল।

    তেমন জোরে এখনও নয়, পিংলা বলে, কিন্তু আকাশে ঘন মেঘ, হাওয়াও আছে, মনে হয় জোর বৃষ্টি নামবে, মাইয়ার পেতে দেওয়া মাদুরে হারমোনিয়মটা তুলে বসিয়ে দেয় পিংলা। নজরুল ততক্ষণে কাপগুলো ভরে ফেলেছে টুংলুর হাত থেকে নিয়ে। প্রথম কাপটা পিংলাকে দিয়ে বলে, খেয়ে নে, ভিজে গেছিস। এবার মেঝে থেকে উঠে মাদুরে বসে নজরুল, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই খুব দ্রুত বেলোজ চালনা করে, আর উপস্থিত সবাইকে সচকিত করে গেয়ে ওঠে: “আজ বাদরি বরিখেরে ঝমঝম”।

    ইয়াল্লাহ, আপনি শুরু করে দিলেন, সাহেব? – বলতে বলতে গলায় ঝোলানো একটা ঢোল, পাকা চুলের একজন লোক প্রায় দৌড়িয়ে ঘরে ঢুকে এসেই মেঝেতে বসে পড়ে। ধাতস্থ হতে একটু সময় নেয় সে, তারপর আস্তে আস্তে ঠেকা দিতে থাকে তার ঢোলে।

    প্রথম লাইনে বারবার ফিরে আসে নজরুল, আর চোখ বুজে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ মিনিট গায় এই গান। চোখ যখন খোলে সে, ছোট ঘরটা মানুষে ঠাসা, ঘরের সামনে বারান্দাটাতেও বসে অনেকে। নানা বয়েসের মেয়ে-পুরুষ, কচি কাঁচাও দুয়েকজন। মাইয়া বসে আছে নজরুলের ঠিক মুখোমুখি, পাশেই টুংলু। একটু হেসে মাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলে নজরুল, খালা, চা চাই ঘণ্টায় ঘণ্টায়, যত কাপ চা তত ঘণ্টা গান। পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে টুংলাকে দেয়, টুংলা, পান কিনে আন। জর্দা দিয়ে বড় খিলি।

    সমবেত শ্রোতাদের দিকে একটু চোখ বোলায় নজরুল হারমোনিয়মের রিডে চলতে থাকা আঙুলগুলোকে না থামিয়ে, তারপর একটু মুচকি হেসে গেয়ে ওঠে, “ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে”। গায়, আর ওর চোখ ঘুরে ঘুরে যায় এক শ্রোতা থেকে আরেক জনে। দুষ্টুমির হাসিটা লেগেই থাকে ঠোঁটে। এরপর “ঝরঝর বরিষে বারিধারা” শুরু করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঢোলের সঙ্গত বলিষ্ঠ হয়ে উঠল। বোঝা গেল খেলাওনজি ঢুকে পড়েছেন নজরুলের জগতে। আর ঠেকা দেওয়া নয় শুধু, কণ্ঠের সঙ্গে ঢোলের দ্বৈত সঙ্গীত এখন!

    গুণী ঢুলি, নজরুল বোঝে। তার নিজেরও উৎসাহ বাড়ে। সবাইয়ের দিক থেকে ঘুরতে ঘুরতে ওর চোখ এসে পড়ে শচীর দিকে এবার। শচীর পাশেই বসে পিংলা। পিংলার চোখ-মুখে জয়ের হাসি। শচীর সঙ্গে চোখাচোখি হয় নজরুলের, বিস্ময়ে বিস্ফারিত শচীর চোখ। এ-ও কি সম্ভব! এই শ্রোতার দল! অশিক্ষিত, নিরক্ষর, পৃথিবীর ঘৃণ্যতম কাজ করে পেট চলে যাদের, তারা এভাবে রবীন্দ্রনাথের গান শুনছে! অবিশ্বাস্য! হাসে নজরুল, বোধ হয় মজাই পায়, তারপর ধরে “গহন ঘন ছাইল গগন ঘনঘটা”। আজীবন রবীন্দ্রনাথের গানেই যেন অভ্যস্ত, এমনভাবে ঢোলে আওয়াজ তোলে খেলাওনজি, শ্রোতার দল নিঃশব্দ।

    বাইরের বারান্দায় যারা বসে আছে, তাদের মধ্যে অস্ফূট কিন্তু ভীত কোলাহল শোনা যায় হঠাৎ। গুটিয়ে খাটো করে লুঙ্গি পরা একটা লোক সবাইকে ঠেলে-মাড়িয়ে হঠাৎ একেবারে হাজির নজরুলের সামনে, আমাকে মাপ করে দিও বাবুজি, বলতে বলতে দু’খানা হাত জুড়ে দাঁড়ায় সে। লোকটার ঊর্ধ্বাঙ্গের গেঞ্জিটা কাদায় মাখামাখি, পরিচিত তীব্র দেশি মদের গন্ধে কারো বুঝতে বাকি থাকে না সে কী অবস্থায় আছে। প্রথমে উঠে দাঁড়ায় শচী, তারপর পিংলা, পুরুষদের মধ্যে আরও কয়েকজন। পাঁজাকোলা করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় লোকটাকে, সে হাত-পা ছুঁড়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকে, জানাতেই থাকে; বাবুজি তাকে মাপ করল কিনা জানতে না পারায় সে রাগান্বিত, যারা বাবুজির গান তাকে শুনতে দিল না তাদের সে দেখে নেবে বলে শাসাতেই থাকে।

    নিথর সমবেত শ্রোতাদের মধ্যে থেকে খালার ঠিক পিছনে বসে-থাকা অবগুণ্ঠিত একটি মেয়ে ধীর পায়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়।


    ক্রমশ...
  • ধারাবাহিক | ১৪ মে ২০২২ | ১১৭৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ১৪ মে ২০২২ ১৭:৫৩507628
  • খুব ভালো লাগছে; পড়ছি ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন