• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • চার রঙের উপপাদ্য - বসন্ত-৪

    ইন্দ্রাণী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৭ নভেম্বর ২০২১ | ৭৮১ বার পঠিত
  • ছবি - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক


    বসন্ত-৪

    ইদানিং ঘন ঘনই অফিস ফেরত মিঠুদের বাড়ির দিকে যাচ্ছিল সনৎ। ছুটির দিনে মিঠু বাড়ি থেকে বেরোয় না সচরাচর, সোমবার ওর অফ ডে ; ফলে সনৎ একরকম নিশ্চিত ছিল যে সপ্তাহের মাঝামাঝি মিঠুর সঙ্গে ওর দেখা হয়ে যাবে বাস স্টপে কিম্বা রিক্সা স্ট্যান্ডে, অথবা গলির মুখেই। অথচ তা ঘটছিল না। দিন ও সময়ের অঙ্কে কোথাও যে ভুল হচ্ছে- সনৎ বুঝতে পারছিল। চাঁদের দক্ষিণ গোলার্দ্ধে বিক্রম নেমে পড়লেই মিঠু ফিরে আসবে সনতের কাছে- তার এই নিজস্ব ধারণা সে মিঠুকে জানাতে উদগ্রীব ছিল, মিঠুর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ফিরে আসার কথা বলতে আকুল হয়ে ছিল বস্তুত। অথচ মিঠুর বাড়ি বা কলেজে সটান পৌঁছে যাবার সাহস তার ছিল না। মিঠুর ফোনও বন্ধ সর্বক্ষণ। সনতের মাথার মধ্যে যে গ্রহ তারা ছায়াপথ ঘুরে বেড়ায়, আশেপাশের মানুষজন তার হদিশ পায় না; সনৎ তাদের সন্তর্পণে লুকিয়ে অফিস যায়, বাজার করে, মন্টুর মা কে মাইনের টাকা গুণে দেয়। বিয়ের পরে মিঠুর সামনে নিজের সমস্ত আবরণ খুলে ফেলেছিল সনৎ। ফলে অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সি তার সমস্ত নক্ষত্র নিয়ে ফুলশয্যার খাটের ওপর আছাড় খায়। বিশাল এত সামনে এসে দাঁড়ালে মানুষ তো ভয় পাবেই। মিঠুও পেয়েছিল। মারাত্মক ভয় পেতে শুরু করেছি সনৎকে। ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আর সব মানুষের মতই মিঠুও চাঁদ তারা আকাশকে দূর থেকেই দেখতে চায়- শোবার ঘরের ছাদ ফুটো করে চাঁদ সূর্য নেমে আসুক- কেউ তো চায় না। সনৎ এ'কথা বুঝতে পেরেছিল। চন্দ্রযানের লঞ্চিং, ল্যান্ডিং নিয়ে নিজস্ব উত্তেজনার সঙ্গে মিঠুকে যুক্ত করতে চাইছিল সনৎ। মনে হচ্ছিল, কানেকশনের এটাই লাস্ট চান্স।

    সনতের ঘরের জানলা দিয়ে জল দেখা যায়। একলা, মলিন পুকুর। সনৎ দের বাড়ির পাশে ভাঙা পাঁচিল, ঝোপ ঝাড়, তারপর পুকুর। জানলা দিয়ে সনৎ পুকুর দেখে। শ্যাওলায় শ্যাওলায় পুকুরের জল সবজেটে ; জলের আশেপাশেও বিস্তর সবুজ - ঝোপঝাড়, আগাছা পেরিয়ে চোখে পড়ে কচুপাতার নিচে হলুদ ব্যাং; ধূসর রঙ বলতে দুটো ঘুঘু, গোসাপ; মাঝে মধ্যে একটা দুটো হলুদ কালো জলঢোঁড়া, কালচে দাঁড়াশ, আর এদিকের জানলায় সনৎ - প্রাণ বলতে এই। ঠাকুমা বলত, পুষ্করিণী। সনতের মনে মনে দীঘি বলতে ভালো লাগে। জানলা থেকেই দেখছিল, দীঘির পাশের কচুগাছ, আগাছা, জংলা লতাপাতা পরিষ্কার করছে ক্ষিতীশ, কার্বলিক অ্যাসিড ঢালছে। এই পাড়ার লোকজনের টুকটাক কাজ করে দেয় ক্ষিতীশ- দুধ এনে দেয়, বাজার করে, ঘাস কাটে।

    বাড়িটা পোড়ো মত ছিল অনেকদিন- একতলায় আলো জ্বলত, দোতলা অন্ধকার। সনতের জানলা দিয়ে পুকুর পেরিয়ে দোতলার জানলা দেখা যায় ও বাড়ির। এক দুই তিন চার পাঁচ ছয়- পরপর ছটা জানলা বন্ধ ছিল এতকাল। ইদানিং খোলা থাকে। আজ অফিস থেকে ফিরে ও'বাড়ির জানলার আলো জ্বলতে দেখেছিল সনৎ। এতদিনের অন্ধকার পুকুরপাড়ে জানলা দিয়ে আসা আলোটুকুকে ভালো লাগছিল তার। নিজের ঘরের বাতি জ্বালালো সনৎ। তারপর চন্দ্রযানের আপডেট পেতে ইসরোর ওয়েবসাইট খুলল ওর ডেস্কটপে। আজ সাইটে সনৎ দেখছিল, লঞ্চিংএর ডেট আরো মাস তিন পরে, তার এক মাসের মাথায় চাঁদের অর্বিটে ঢুকবে চন্দ্রযান, তারপরে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামবে বিক্রম। এই সমস্ত তথ্য সে তৎক্ষণাৎ মিঠুকে জানাবার জন্য আকুল হয়ে উঠছিল। সাউথ পোল, সেভেন্টি ডিগ্রী ল্যাটিচিউড, সফট ল্যান্ডিং- উফ- মিঠু মিঠু মিঠু- সফট ল্যান্ডিং মিঠু-সফট ল্যান্ডিং- আ-ছট্ফট কোরো না এত- সেভেন্টি ডিগ্রী ল্যাটিচিউডে নামতে হবে- ওঃ। অবশ হয়ে যাচ্ছিল ঊরু, ফেটে যাচ্ছিল ওর পুরুষাঙ্গ। পাজামা টেনে নামানোর আগে আলো নিভিয়ে দিল সনৎ।





    সকালে জেম্মার মশারির খুঁট খুলছিল পায়েল। রাতে ঘুম হয় নি জেম্মার- ছটফট করছিল। স্মিতা প্রেশার মেপেছিল, অক্সিজেন স্যাচুরেশন চেক করল; তারপর কনসেন্ট্রেটর থেকে জেম্মার নাক অবধি নল টেনে অক্সিজেন চালু করেছিল। পায়েল আর ধনঞ্জয় বলেছিল- "দিদি, তুমি শুয়ে পড়, আমরা আছি তো।" শেষ রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল জেম্মা। তারপর স্মিতা শুতে গেছে- এখনো ওঠে নি। ধনঞ্জয় চা বসিয়ে টিভি খুলে দিল -খবর শুনবে। এনারসি নিয়ে ধনঞ্জয় ভয় পাচ্ছে ইদানিং। স্মিতার কাছে ছুটি চাইছিল কাল- দেশের বাড়ি গিয়ে সব কাগজপত্র খুঁজবে।

    নিম্নচাপের মেঘ শহরের ওপর জমা হয়েছে গত দুদিন; রাত থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল জোরে। আজ খিচুড়ি করবে - পায়েল ভাবছিল। জেম্মার জন্য আলাদা রান্না করে আগে নামিয়ে নেবে, তারপরে ওদের সবার জন্য রাঁধবে। ডিম আছে কী না দেখার জন্য ধনঞ্জয়কে চেঁচিয়ে ডাকল পায়েল। টিভির আওয়াজে এ ঘরের কথা ও ঘরে পৌঁছচ্ছিল না- মশারি ভাঁজ করে রেখে নিজেই রান্নাঘরে গেল। এই সময় জেম্মার জানলায় একটা পাখির ছানা এসে বসেছিল-তার ছোট্টো মাথা জলে ভিজে কদম ফুলের মত; ব্যাঁকা ঠোঁট দিয়ে জেম্মার জানলায় টোকা দিল দুবার। যেন জেম্মাকে ও একলা পেতে চেয়েছিল, কোন গোপন কথা বলবে বলে, অথবা এমন একটা ভাষায় সে পাখির ছানা কথা বলবে, যা কেবল জেম্মাই বুঝবে তাই যেন পায়েল ছিল বলে আসে নি এতক্ষণ। জেম্মা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিল পাখিকে। হাসল তারপর।

    ডিম নেই বাড়িতে- ধনঞ্জয়কে ডিম আনতে বলে, এ ঘরে ফিরে এসে পায়েল দেখেছিল, জেম্মার মাথা বালিশ থেকে হেলে গেছে, জানলার দিকে ঘাড় ঘোরানো- কপাল, হাত, পা ঠান্ডা হতে শুরু করেছে। ধনঞ্জয়কে ডেকে, স্মিতাকে ডেকে তুলে ডাক্তারবাবুকে ফোন করল পায়েল। সার্টিফিকেট, মালা, গাড়ি জোগাড় করে রওনা হতে হতে দুপুর হয়ে গিয়েছিল। বাবলুদা, বৌদি, ঝিমলি, এমনকি পল্টনও এসে পৌঁছোলো বৃষ্টিতে।
    - তুই তো অনেক করেছিস। শেষটুকু আমরাই করি।
    জেম্মার কপালে চন্দনের ফোঁটা আঁকল স্মিতা; তারপর মাথা হেলাল - 'আচ্ছা'।

    বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল দুপুরের পরেই। রোদ উঠে গিয়েছিল। এখন সূর্য পাটে বসছিল। স্মিতা বিকেল থেকেই পুকুরের পাশে বসে আছে। বাবলুদারা এখনও ফেরে নি। একটা মানুষের পুড়ে যেতে কতক্ষণ লাগে স্মিতা জানে না। অস্থিরতা কমাতে সে জলের কাছে বসেছিল। রোদ কমে আসায় জলের রঙ ঘন সবুজ এখন।পাখির ছানা টুই টুই টুই টুই করে ডাকছিল- সকালের সে কী না কে বলবে? ভাঙাচোরা ইঁটের গাঁথনির ওপর কালো পিঁপড়ের সারি- স্মিতা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে এ যাত্রার শুরু বা শেষ কিছুই দেখা যায় না, যেন এক অনন্ত ক্যারাভ্যান। স্মিতার পায়ের কাছে দু চারটে ফাটা নিমফল- পিঁপড়ের সারি নিমফলের পাশ কাটাতে সামান্য বেঁকে যাচ্ছিল যেখানে, স্মিতার চটি পরা পায়ের পাতা তার খুব কাছে। স্মিতা ওর পায়ের পাতা পিঁপড়ের লাইনের একদম ওপরে নিয়ে আসছিল, সরিয়ে নিচ্ছিল পর মুহূর্তে- অনিত্যতাকে স্পর্শ করতে চাইছিল এইভাবে, সম্ভবত।





    সনৎ আজ সমস্তদিন ধুলো ঘেঁটেছে। ডেস্কটপ সারানোর কথা প্রদীপকে বলে রেখেছিল অনেকদিন। এই শনিবার না পরের রবিবার, এখন ব্যস্ত-পরের মাসে আসব- এই চলছিল। অবশেষে, কাল রাতে প্রদীপ এসে কম্পিউটার নিয়ে গেছে; ছুটির দিন সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে সনতের মনে হচ্ছে যেন সমস্ত ঘর খাঁ খাঁ করছে। দেওয়ালের প্লাগ পয়েন্ট থেকে কালো মোটা তার টেবিলের ওপর মরা সাপের মত পড়ে - তাদের ওপর এযাবৎ জমা ধুলো শুঁয়োর মত দেখাচ্ছে, সেখানে সকালের রোদ এসে পড়ায় একটা মাকড়শাকে সন্তর্পণে হেঁটে যেতে দেখল সনৎ। চা খেতে খেতে একবার ভাবল-মন্টুর মাকে ডেকে পরিষ্কার করতে বলে। তারপর নিজেই ছেঁড়া কাপড় খুঁজে আনল সিঁড়ির ঘর থেকে -যত্ন করে মুছল মলিন প্লাগপয়েন্ট, অ্যাডাপটার, প্যাঁচানো তার; পালকের ঝাড়ু দিয়ে টেবিল ঝাড়ল। ধুলো উড়ছিল ঘরময়। ক্রমান্বয়ে চারবার হেঁচে, পঞ্চমবারে নাক সুড়সুড় করে উঠতেই ফ্যান বন্ধ করল সনৎ তারপর হাতে ঝাড়ন নিয়ে সমস্ত ঘরে চোখ বোলাল - সে দেখছিল, ঘরময় রোদ আর ধুলোর ডোরা কাটা, জানলার পাল্লায়, গ্রীলে ধুলোর পরত, বন্ধ ফ্যানের ব্লেড কালো হয়ে আছে- সনৎ কাজ শুরু করল। মন্টুর মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে "আমি করে দেব" বলেছিল- দৃকপাত করে নি সনৎ। নাকে মাথায় গামছা জড়িয়ে নিয়েছে, কাঁধে ঝাড়ন, হাতে লম্বা ঝুলঝাড়ু, চোখ মুখ জেদী অথচ শান্ত - যেন এমন এক অভিযানে নেমেছে সে, যার শেষে কোনো প্রাপ্তি থাকে না। খ্যাপার মত কাজ করছিল সনৎ- এ ঘরের ধুলো ঝেড়ে, পাশের ঘরে গেল। সবশেষে চিলে কোঠায়। সেখানে ডাঁই করা পুরোনো খবরের কাগজের স্তূপ- তিন মাস অন্তর মন্টুর মা নিয়ে যায়, পার্ট টাইম বিড়ি বাঁধায় কাজে আসে; এছাড়া, দেওয়াল ঘেঁষে ফাটা বালতি, পুরোনো দেওয়ালঘড়ি, ফ্রেমে বাঁধানো কাচফাটা ফাঙ্গাস ধরা ছবি দেওয়ালের দিকে ঘুরিয়ে রাখা। তার পাশে পুরোনো সুটকেশে সনতের বালক বয়েসের স্ক্র্যাপবুক, ডাকটিকিট জমানোর খাতা- যা সে মামাবাড়ি থেকে এ বাড়িতে নিয়ে আসে। সনৎ চিলেকোঠার মেঝেয় থেবড়ে বসে সুটকেশের ডালা খুলে কাগজপত্র দেখছিল- পুরোনো খাতার পাতায় পাতায় বিনোদ কাম্বলির ছবির কোলাজ - কোথাও বাঁ হাঁটু মাটিতে রেখে মিড উইকেটের ওপর দিয়ে বল ওড়াচ্ছে কাম্বলি, কোথাও পুল শট অথবা কভার ড্রাইভ, অন্য খাতায় দিব্যা ভারতী -মামাবাড়িতে বালক সনৎ যাদের ওপর বাজি ধরেছিল। সনতের মনে হল, যেন সমস্তজীবন ও কোনো সুন্দরকে চেয়ে পথের ধারে বসে আছে- সে সুন্দর কখনও কাম্বলি কখনও দিব্যাভারতী, অথবা চাঁদের মাটিতে নিখুঁত সফট ল্যান্ডিং ; এ যাবৎ সুন্দরের অপেক্ষায় হাঁ করে চেয়ে থেকেছে সনৎ, বাজি ধরেছে আগমনের, আর সে সুন্দরের রথের চাকা মাটিতে বসে গিয়েছে বারবার; সনৎ হেরে গিয়ে বিদ্রূপ শুনতে শুনতে মুখ কালো করে দরজা বন্ধ করেছে। আবার কপাট খুলেছে, অপেক্ষা করেছে- আবার হেরেছে। ধুলোমাখা হাতে স্ক্র্যাপবুক ওল্টাচ্ছিল সনৎ। সে যে নিজের অজান্তেই আবার দুয়ার খুলে অপেক্ষা করছে- এ'ভাবনা তাকে যুগপৎ বিস্মিত ও সুখী করছিল।





    সন্ধ্যের মুখে জেম্মার ছোটো রেডিও চালিয়ে রাখে পায়েল। রান্নাঘরে আটা মাখে, রুটি করে। ধনঞ্জয় বাজার নিয়ে ফিরলে টিভি চালায় তারপর। স্মিতা তখন দোতলায় নিজের ঘরে মেল টেল করে, সময় মিলিয়ে বুল্টি আর পঙ্কজের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলে। আজ বিকেলে এফ এমে আমি যামিনী তুমি শশী হে বাজছিল। কবেকার গান কানেক্ট করছিল স্মিতার ছোটোবেলাকে- এ’বাড়ির বড় ঘরে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে, সাদা কালো টিভির স্ক্রীনে উত্তম আর তনুজা- জেম্মা এক হাতা ভাত এনে স্মিতার থালায় দিল, মা ঐ টেবিলে বসে খাতা দেখছে, বাবা যেন টিভির ভলিউম বাড়িয়ে দিল টুক করে-

    সকলের মত এতদিন সেও জানত মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যুর দিকে যায়, যেন ডাউনের গাড়িতে উঠে পড়া, গাড়ি বদলে, আপের ট্রেন ধরার আর কোনো উপায় নেই; অথচ ইদানিং তার মনে হয়, এই যে তার মাঝবয়স- এই অবধি সে কেবল ডাউনের গাড়িতে ছিল, আর এই যে এখন সে এখানে এসেছিল জেম্মার কাছে, সে যেন এই সুযোগে ট্রেন বদল করে নিয়েছে। ডাউনের ট্রেন থেকে নেমে আপের গাড়ি ধরেছে- এখান থেকে ডাউন এর রুট অলীক দেখাচ্ছে আর আপের পথ সে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ পাচ্ছে- পঙ্কজ আর তার সম্পর্কের মধ্যে একটা কুয়াশা ছিল বরাবর- পঙ্কজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তেও তার মনে হয়েছে এই মানুষের একটা বেদনার জায়গা রয়েছে- যা সে আড়াল করে রেখেছে তার থেকে। অথচ হাসি খুশি মৃদুভাষী পঙ্কজ তাকে অসুখী রাখে নি কোনোভাবে। স্মিতার মত সংসারী মানুষের এই সব নিয়ে ভাবালুতার সময় থাকে না। এত বছর সে তার ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে, পঙ্কজের বেদনার জায়গা খুঁজে দেখতে দ্বিধায় থেকেছে; হয়ত অজানা কিছু আবিষ্কারের ভয়ও পেয়েছিল সে।

    দূর প্রবাসে স্মিতা পঙ্কজকে দ্রুত চিনে নিতে চেয়েছিল। মানুষকে চিনতে গেলে তার ছোটোবেলা জানতে হয়- একথা তার মনে হত। বিয়ের পরে পঙ্কজের সঙ্গে তার কথায় নিজের ছোটোবেলা ভরে ছিল- জেঠু, জেম্মা, মা, বাবা, বাগান, পুকুর আর পুকুরের তলার আস্ত শহর। পঙ্কজও বলেছে গল্প- কলেজ, ইউনিভার্সিটির র‌্যাগিং, ক্লাস বাঙ্ক, বন্ধুরা, প্রথম নেশা করে নাজেহাল হওয়া- এসবই খুব মামুলি গল্প যা সব ছেলেদের ঝুলিতেই থাকে- সব গল্প এক ছাঁচের, এক রংএর- অন্যের গল্প নিজের বলে চালিয়ে দিলে তা ধরাও যায় না, মিথ্যে বলাও হয় না বস্তুত।

    সব মানুষের একদম নিজের একটা গল্প থাকে যা আঙুলের ছাপ কিম্বা জেব্রার ডোরার মত-ইউনিক; স্মিতার পুকুরের গল্প যেমন। পঙ্কজের নিজস্ব একটা গল্প স্মিতা এক্সপেক্ট করেছিল বিয়ের পরে। অপেক্ষা করেছিল। অতঃপর নিজের মত করে চেষ্টা চালায় স্মিতা - যেন এ’ গল্প তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। শ্বশুর শাশুড়ি, শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীস্বজনের সঙ্গে হাজার গন্ডা ঘরোয়া কথা চালিয়ে গিয়েও সে পঙ্কজের নিজস্ব গল্পের সন্ধান পায় নি। এর থেকে তার দুটো কথা মনে হয়েছিল- হয় পঙ্কজের কোনো গল্প নেই কিম্বা পঙ্কজের গল্প স্মিতার পুকুরের নিচের শহরের মতো কোথাও ডুবে আছে- সে গহীন পুকুরে জল, বেদনা এমনকি রক্তের সম্ভাবনাও সে দেখেছিল।

    পঙ্কজ কোনোদিন স্মিতার কাছে সাহেবগলির কথা বলে নি। ও’ দেশে পঙ্কজের বন্ধুদের কেউ তাকে আবাল্য চেনে- তাদের সঙ্গে ছোটোবেলার সামান্য যেটুকু কথা হত, সেখান থেকেই স্মিতা সাহেবগলির নাম পায়। পঙ্কজকে জিগ্যেস করলে- ' ঐ এইট টেইট অবধি পড়েছিলাম ওখানকার স্কুলে, ভুলে গেছি সব।' বলে চুপ করে যায়। এই অদ্ভূত ভুলে যাওয়া স্মিতাকে ভাবিয়েছিল। স্মিতার মনে হয়েছিল, পঙ্কজের গল্প সম্ভবত সাহেবগলির কোথাও লুকিয়ে যদিও এ'ধারণার কোনো যৌক্তিকতা সে নিজের মনকেও বুঝিয়ে উঠতে পারে নি।
    স্মিতা সন্দেহপ্রবণ নয়, সে শুধু মনে করত- এই সব নিজস্ব গল্প দুটো মানুষকে কানেক্ট করে পুরোপুরি। কানেকশান তৈরি করতে সে নিজেকে ব্যর্থ ভাবত ইদানিং, দুজনের সম্পর্কে শৈত্য এনে দিয়েছিল সেই ভাবনা। জেম্মার অসুখের খবর পেয়ে প্রথম সুযোগেই সে ফিরে আসে- তার মনে হয়েছিল জেম্মার চিকিৎসা করানো ছাড়াও তার উল্টো পথে হাঁটা জরুরী। আপের পথে পঙ্কজের গল্প খুঁজে পেয়ে গেলে আবার ট্রেন বদলাবে সে?

    রেডিওর গান বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ।স্মিতা ভাঙা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে জল দেখছিল। শৈশবে যেখানে সে এক প্রাচীন নগরীকে হেঁটমুন্ড ঝুলে থাকতে দেখেছিল, এই গোধূলিতে একটি জলঢোঁড়াকে দেখছিল সেখানে। কখনও মনে হচ্ছিল, সাপ একই জায়গায়, নিরাবলম্ব, ভাসমান, পরক্ষণেই মনে হচ্ছিল এগোচ্ছে; ঠিক সেই সময় হাওয়া উঠেছিল- উপরের তল ভেঙে ভেঙে ছোটো ছোটো তরঙ্গ উঠছিল জলে, তখন জলের তলায় ঠাহর হচ্ছিল না। স্মিতার ছায়া লম্বা হয়ে জলে পড়ছিল যখন, সাপকে ভাঙা ডালের মত লাগছিল, আরো অন্ধকার ঘনিয়ে এলে সব ছায়া জমাট বেঁধে যাচ্ছিল- আলাদা করার যো থাকছিল না। শীতের সেই সকালের কথা ভাবতে চাইছিল স্মিতা। সে কুয়াশার সকালের স্মৃতি সংশ্লিষ্ট আর কেউই রইল না- স্মিতা ছাড়া- এই ভাবনা মনে আসতেই ওর ছোটোবেলা, বিয়েবাড়ির সকাল, কুয়াশা, বনময়ূর, জেম্মা সব মিলেমিশে জট পাকিয়ে দুঃখের জমাট পিণ্ড হয়ে জলের তলায় ডুবে গেল যেন - বিষাদ, স্মৃতি, মৃত্যুশোক সে পিণ্ডকে এত ভারি করে তুলছিল যে স্মিতা তাকে ভাসিয়ে রাখতেই পারছিল না। নিজের অবিচ্ছেদ্য সে দুঃখের ড্যালা কালচে জলের তলায় ঠাহর হচ্ছিল না এই মুহূর্তে। বস্তুত জলের তলায় সত্যতা বলে কিছু হয় না- এইরকম মনে হচ্ছিল স্মিতার।


    (ক্রমশঃ)

     

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৭ নভেম্বর ২০২১ | ৭৮১ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য | 43.251.179.219 | ২৭ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২৩501479
  • এই পর্বটির বিশেষত্ব হলো, আটপৌরেভাবে অসামান্য কিছু বোধ - উপলব্ধির কথা, যা এই উপন্যাসকে একটা অন্যতর মাত্রা দিল যেন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন