• বুলবুলভাজা  পড়াবই  প্রথম পাঠ

  • বীরসিংহের সিংহশিশু বিদ্যাসাগর বীর: পাঠ-প্রতিক্রিয়া (৮)

    রঞ্জন রায়
    পড়াবই | প্রথম পাঠ | ০৮ আগস্ট ২০২১ | ৮৮৩ বার পঠিত

  • ১০.০  বিধবাবিবাহ আইন: বিদেশি প্রভুর দেশি সহচর (?)

    হ্যাঁ, এটিই বইটির দ্বিতীয়ভাগের তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম। আমরা চমকে উঠেছি বটে, কিন্তু ইতিহাসের পুনর্ম্যূল্যায়নে অনেক পূর্বাগ্রহ বা মিথের খোসা ছাড়ানোই তো দরকার। আসুন, আমরা প্রথমে লেখকের বক্তব্যকে বোঝার চেষ্টা করি ও তার সমর্থনে প্রদত্ত তথ্যগুলোকে ভাল করে খুঁটিয়ে দেখি।

    নিজের একমাত্র ছেলে নারায়ণের সঙ্গে এক বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর বিয়ে দেওয়ার চার দিন পরে বিদ্যাসাগর নিজের ভাই শম্ভুচন্দ্রকে লেখেন- ‘বিধবাবিবাহ আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম’।

    কিন্তু লেখকের বক্তব্য: “অথচ আমরা দেখতে পাব তাঁর জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম’টির  ‘সার্থক’ রূপায়ণের সঙ্গে পরতে পরতে জড়িয়ে থাকবে তাঁর অনৈতিকতা, দ্বিচারিতা, উৎকোচ প্রদান, ব্যক্তিগত ঋণ, দেশাচারের দাসত্ব ইত্যাদি অনেক অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ”।[1] (বড় হরফ আমার)।

    হ্যাঁ, আমাদের অস্বস্তি বাড়তে থাকে।

    প্রথমে, চতুর্থ অধ্যায়ের ১নং প্যারাগ্রাফটি-

    ‘যে বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের জন্য বিদ্যাসাগর আপামর বাঙালির কাছে নারীদের ‘পরিত্রাতা’ হিসেবে বিবেচিত হন, সেই বিষয়ে তাঁর প্রকৃত ভুমিকাটির উন্মোচন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।[2] (বড় হরফ আমার)।

    অস্যার্থ, লেখকের মতে বিধবাবিবাহ আইন পাশ করানো নিয়ে লেখালেখি এবং অপমানিত ও ঋণগ্রস্ত হওয়ার পেছনে প্রেরণা বিধবাদের দুঃখকষ্টে দ্রবিত হওয়া নয়, বরং অন্য তাঁর অন্য কোন হিডেন এজেন্ডা ছিল। কী সেই এজেন্ডা?

    ধর্মশাস্ত্রের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে কলোনিয়াল শাসকেরা হিন্দু বিধবাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিল। প্রথমে প্রায় ৬২ বছর আগে জোন্স মনুসংহিতার কথিত অনুবাদের মাধ্যমে যে হিন্দু আইন প্রণয়ন করেছিলেন তাতেই  বিধবাদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ব্যবস্থা হয়েছিল। তারপরে বিধবাবিবাহ আইনের মাধ্যমে তাদের মৃত স্বামীর সম্পত্তি ও স্ত্রীধন থেকেও বঞ্চিত করা হল। এবং তাতে বিদ্যাসাগরের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল। এবং তিনি তা কলোনিয়াল প্রভুদের স্পষ্ট আদেশ পেয়ে অনুপালন করেছেন মাত্র।[3]

    বিদ্যাসাগরের  “বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব শীর্ষক দ্বিতীয় পুস্তকে পুরুষদের কাছে যে ইমোশনাল অ্যাপীল করেন – ‘তোমরা মনে কর, পতিবিয়োগ হইলেই স্ত্রীজাতির শরীর পাষাণময় হইয়া যায়; দুঃখ আর দুঃখ বলিয়া বোধ হয়না’;  এবং শেষে “হা অবলাগণ! তোমরা কী পাপে  ভারতবর্ষে আসিয়া জন্মগ্রহণ কর, বলিতে পারি না” – এসব  লেখকের চোখে বিদ্যাসাগরের উচ্চকিত পুরুষতান্ত্রিক স্বর, এবং একই সঙ্গে বৃটিশ পুরুষদের ‘উদ্ধারকর্তা’ ভাবার মানসিকতাকেই স্পষ্ট করে।[4]

    এই প্রেক্ষিতের সমর্থনে লেখক বইটির তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ এনেছেন এবং তার সপক্ষে কিছু, লেখকের ভাষায়, ‘পাথুরে প্রমাণ’ও পেশ করেছেন।  অভিযোগগুলো নিম্নরূপ-

    ১ বিদ্যাসাগরকে বিধবাবিবাহের ‘প্রবর্তক’ বলা যায় কি?
    ২  বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রদ করার ব্যাপারের বিদ্যাসাগরের ভূমিকা নামমাত্র।
    ৩  বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহকে শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ করতে ইচ্ছাকৃত ভাবে শাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন।
    ৪ এই আইন পাশ করানোর পেছনে কলোনিয়াল শাসকদের উদ্দেশ্য ছিল বিধবাদের পরম্পরাগত সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, বিদ্যাসাগর এই চক্রান্তের সহায়ক।
    ৫ এই প্রথা ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য মহিলাদের ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক। অথচ এতে ক্ষতি হল সমাজের বৃহত্তর অংশের মহিলাদের বা নিম্নবর্ণের ও বর্গের মহিলাদের।
    ৬  বিদ্যাসাগর অর্থের ও পদোন্নতির টোপ দিয়ে বিধবাবিবাহে রাজি করাতেন। আইন পাশ হওয়ার পর প্রথম বিধবাবিবাহটিই তার  কলংকজনক উদাহরণ।

    আমরা ক্রমানুসারে সবগুলো অভিযোগ ও তার প্রমাণগুলো এক এক করে দেখব। সর্বপ্রথম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি।

    ১০.১ এই আইন পাশ করানোর পেছনে কলোনিয়াল শাসকদের উদ্দেশ্য ছিল বিধবাদের পরম্পরাগত সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, বিদ্যাসাগর এই চক্রান্তের সহায়ক।

    এই অভিযোগটিকে দু’ভাগে বিভক্ত করে দেখলে বুঝতে সুবিধে হবে।

    ক) বিধবাদের পরম্পরাগত সম্পত্তির অধিকার ঠিক কী কী ছিল? এবং  বিধবাবিবাহ আইনে তাদের কতটুকু বঞ্চিত করা হল?
    খ) এ’ব্যাপারে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা।

    ১০.১ বিধবাদের পরম্পরাগত সম্পত্তির অধিকার ও পরবর্তী বঞ্চনা -

    পূর্বপক্ষ


    • পিতা বা মাতার জীবিতকালে  পুত্রগণ পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী নয়। (মনু ৯/১০৪)। কিন্তু হ্যালহেড-জোন্সের হিন্দু আইনে জুড়ে দেয়া হল যে যদি মাতা অনুমতি দেন তাহলে পুত্রেরা  পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ করতে পারে।  এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটির ফলে যেমন বিধবা স্ত্রীকে তাঁর জীবদ্দশাতেই স্বামীর সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তেমনই অবিবাহিতা কন্যাদেরও পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।[5]
    • মাতার মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি সব ভ্রাতা ও  ভগিনীগণ সমান ভাগ করে নেবে, (মনু ৯/১৯২)। এ’ব্যাপারে ঔপনিবেশিক শাসকের তৈরি হিন্দু আইনে কিছু বলা হয় নি।
    • ধর্মশাস্ত্রে সম্পত্তির উত্তরাধিকার বিষয়ক সবচেয়ে বড় দুটো ব্যাখ্যা হল মিতাক্ষরা দায়ভাগ। কিন্তু হ্যালহেড ও জোন্সের জেন্টু ল  ও হিন্দু আইন প্রণয়নের সময় নিযুক্ত ১১ জন পণ্ডিত এবং পরে জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের মত পণ্ডিতও দায়ভাগে বিধবার মৃত স্বামীর সম্পত্তির অধিকার বিষয়ক বিধান এড়িয়ে গেছেন। এটা নিশ্চিত যে আইন প্রণয়নে তাঁদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল না। 
    • স্ত্রীলোকের ছয়প্রকার স্ত্রীধন— বিবাহকালে, পিতৃগৃহে, পিতা, ভ্রাতা-মাতা ও পতির থেকে উপহার স্বরূপ প্রাপ্ত ধন। এই ধনে তাঁর জীবিতকালে অন্য কারও অধিকার নেই, (মনু ৯/১৯৪, ১৯৫)।

    কিন্তু বিধবাবিবাহ আইনের প্রথম দুই ধারায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে বিধবা আবার বিয়ে করলে প্রথম স্বামীর (মৃত) সম্পত্তির উপর তাঁর সমস্ত অধিকার, খোরপোষের দাবি সব শেষ হয়ে যাবে। এবং  নতুন বিয়ের পর জন্মানো  সন্তান বৈধ অর্থাৎ লেজিটিমেট বলে গণ্য হবে। অথচ স্ত্রীধনের অধিকার নিয়ে কিছুই বলা হয় নি। এভাবে বিধবাকে তাঁর শেষ সম্বল স্ত্রীধন থেকে বঞ্চিত  ও কপর্দকহীন করে পুরুষের উপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হল। আর এই ঔপনিবেশিক ‘ঘৃণ্য’ চক্রান্তে সহযোগিতা করলেন বিদ্যাসাগর।

    উত্তরপক্ষ

    • প্রথম চারটে পয়েন্ট- এগুলো, মানে হ্যালহেডের জেন্টু ল ও উইলিয়ম জোন্সের হিন্দু আইন বিদ্যাসাগরের জন্মের আগে পাশ হয়েছে। তার দায় বিদ্যাসাগরকে বইতে হবে?
    • এছাড়া প্রথম পয়েন্টে, অর্থাৎ হ্যালহেড  এই  যে উপধারাটি ---মাতার অনুমতি দিলে পুত্র সন্তানেরা জীবিতকালে সম্পত্তি ভাগ করতে পারবেন এবং তাতে এক ভাগ মাতা রাখতে পারবেন – আইনে যুক্ত করলেন,  তাতে তো মায়ের ক্ষমতায়ন হোল, বিধবা মাতা নিজের সম্পত্তির ব্যাপারে স্বতন্ত্র নির্ণয় নেবার অধিকারী হলেন, এমনকি চাইলে পুত্র সন্তানের সমান একভাগ নিজে রাখতে পারেন। (জেন্টু ল)। এটাকে কোন ভাবেই ‘বিধবা স্ত্রীকে তাঁর জীবদ্দশাতেই স্বামীর সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা’ বলা যায় কি?
    •  ডঃ নন্দিনী ভট্টাচার্য্য পণ্ডা-- যাঁর কাছে লেখক বর্তমান প্রবন্ধটির জন্য ঋণ স্বীকার করেছেন -- দেখিয়েছেন, মিতাক্ষরাতে বিধবার মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার নেই, দায়ভাগ মতে আছে। উনি এও বলেছেন যে দায়ভাগ শুধু বঙ্গে প্রচলিত ছিল। বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে মিতাক্ষরার  কোন-না-কোন ব্যাখ্যা মানা হত, দায়ভাগ নয়। তাহলে দায়ভাগ অনুসরণ না করে জোন্স আদি সায়েবরা ঠিকই করেছেন। কারণ ওঁরা গোটা ভারতের জন্যে হিন্দু ল বানাচ্ছেন, খালি বঙ্গের জন্য নয়।
    • লেখকের একটি বক্তব্য ঠিক। নতুন হিন্দু আইনে অবিবাহিত মেয়ের অধিকার নিয়ে কিছু দেখতে পাইনি, বরং মেয়ের ছেলের বা দৌহিত্রের অধিকার নিয়ে ঠিক মনুস্মৃতির মত  স্পষ্ট বলা আছে। এবং বিধবাবিবাহ আইনে সন্তানের (পুত্র বা কন্যা) সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার নিয়ে কোন কথা বলা নেই, কারণ সেটা এই আইনে অপ্রাসংগিক। আর বিধবার স্ত্রীধন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ভুল, নিচে দেখুন।

    ১০.২ বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়নে কলোনিয়াল ষড়যন্ত্র ও বিদ্যাসাগর

    পূর্বপক্ষ - ১৮৫৫ সালের ৪ অক্টোবর বিদ্যাসাগর ভারতবর্ষের ‘লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ বা আইনসভার বিবেচনার জন্য ৯৮৭ জন ব্যক্তির স্বাক্ষরসহ একটি আবেদনপত্র পেশ করেন। তার মূল নিবেদনটি এ’রকম -

    “১১. আবেদনকারীদের বিনীত প্রার্থনা, আইনসভা হিন্দু বিধবাদের বিবাহের বিষয়টি বৈধ বলে স্বীকার করে যেন দ্রুত সম্ভব এক আইন প্রণয়ন করেন, যাতে বিধবাদের বিবাহজাত সন্তানেরা সমাজে বৈধ সন্তান বলে গৃহীত হয়”।[6]

    সরকার এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে গুরত্ব না দিয়ে  আইন পাশ করানোর উদ্যোগ নেন। ‘এই তথাকথিত সংস্কারের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসকদের মূল লক্ষ্য ছিল, নতুন আইনটির দোহাই দিয়ে অসহায় বিধবাদের আরও প্রান্তিক করে দেওয়া’।[7]

    ওই বছরের ১৭ নভেম্বর আইনসভার অন্যতম সদস্য গ্র্যান্ট যে খসড়া বিল প্রস্তুত করেন  তার প্রথম দুই ধারা অনুযায়ী বিধবার বিয়ে এবং সেই বিবাহজাত সন্তান উভয়েই বৈধ বলে গণ্য হবে; এবং মৃত  স্বামীর বিষয়সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারসূত্রে অথবা ভরণপোষণ সূত্রে যে কোনও দাবি দ্বিতীয় বিবাহে বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু স্বামী ভিন্ন অন্য উত্তরাধিকারসূত্রে কোনও বিধবার সম্পত্তি অথবা স্ত্রীধন কিংবা স্বোপার্জিত কোনও বিষয়সম্পত্তির দাবি অক্ষুণ্ণ থাকবে।[8] 

    অথচ ২৬ জুলাই যখন আইনটি পাশ হল, তখন গ্র্যান্টের প্রথম দুটি ধারা প্রায় অপরিবর্তিত রেখে দ্বিতীয় ধারায় ‘স্ত্রীধন’ রাখার বাক্যটি গায়েব করে দেওয়া হল ‘নিখাদ ঔপনিবেশিক কায়দায়’। বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রনির্ভরতার প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় সাহায্যে বিধবাবিবাহ আইন পাশ করে গ্র্যান্ট এই ‘ঘৃণ্য ঔপনিবেশিক চালটি’ পূর্ণ করলেন।

    উত্তরপক্ষ-

    বিধবাবিবাহ আইনে স্ত্রীধনের অধিকার বাতিল করা হয়েছে--এই বক্তব্যটি ভুল।

    বিধবাবিবাহ আইনের প্রথম দুই ধারায় অবশ্যই, লেখক যেমন বলেছেন, বিধবা বিবাহের পর ভূতপূর্ব স্বামীর সম্পত্তির ও খোরপোষ প্রাপ্তির অধিকার হারাবেন, কিন্তু নতুন স্বামীর কাছে এবং তার সম্পত্তিতে প্রথম বিয়ের মতই যতটুকু অধিকার ছিল তা পাবেন। 

    প্রথম দুই ধারার মুখ্য কাজ হচ্ছে বিধবা এবং তার দ্বিতীয় বিয়ের সন্তানকে বৈধ বলা, সম্মান দেয়া। এটি মনুতে ছিলনা। মনু অনুযায়ী বিধবার পুনর্বিবাহ অশাস্ত্রীয়, কাজেই সে বিয়ের সন্তান আদৌ ঔরসজাত বা বৈধ হবে না। বিধবাবিবাহ আইন সেই কাজটা করল,  দ্বিতীয়বার বিয়ে করা বিধবা ও তার গর্ভজাত সন্তানকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাল, এবং পূর্বের ন্যায় অধিকার দিল।

    কিন্তু এই আইনে বিধবার স্ত্রীধনের অধিকার কেড়ে নেওয়া? একেবারেই নয়। আইনটিতে আছে সাতটি ধারা।  লেখক প্রথম দুই ধারাতে থেমে গেছেন।  মনে হচ্ছে ধারা ৫ দেখেননি। তাতে স্পষ্ট বলা আছে কোন বিধবা পুনর্বিবাহের ফলে তার আগে থেকে প্রাপ্ত ও অর্জিত কোন সম্পত্তি বা অধিকার থেকে কোনমতেই বঞ্চিত হবেন না। ব্যতিক্রম মৃত প্রথম স্বামীর সম্পত্তি।

    আমি The Hindu Widows Re-marriage Act, 1856 এর ধারা ৫ হুবহু তুলে দিচ্ছি-

    Section 5. Except as in the preceding three sections is provided, a widow shall not, by reason of her re-marriage, forfeit any right or any property to which she would otherwise be entitled; and every widow who has re-married shall have same rights of inheritance, as she would have had, had such marriage been her first marriage.

    গ্র্যান্টের প্রাথমিক খসড়ায় এই ক্লজটি দ্বিতীয় ধারার ক্ষুদ্র অংশ ছিল। আইনে এটি একটি স্বতন্ত্র সেকশন (৫) হয়ে আরও জোরের সঙ্গে বিধবার স্ত্রীধনের অধিকারকে বজায় রাখছে।

    • মূল কথাটা তাহলে কী দাঁড়াল? আগেও মনুর সময় থেকেই স্ত্রীকে সম্পত্তি বা অধিকারের ব্যাপারে পুরুষের উপরই নির্ভর করতে হত। তখনও নারী শৈশবে পিতার, যৌবনে পতির এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীন ছিলেন। (মনু ৯/৩) এবং নিদান ছিল-স্বামী প্রভৃতি ব্যক্তিগণ স্ত্রীলোকদের দিনরাত পরাধীন রাখবেন।( মনু ৯/২);  কলোনিয়াল  যুগেও তাই। এমন নয় যে প্রাক কলোনিয়াল আইনে বিবাহিতা নারী পতির থেকে স্বতন্ত্র ছিল, তখন দুনিয়া জুড়ে কোথাও ছিল না। তাই কলোনিয়াল আইনের ফলে নারীকে পতির সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে পুরুষের উপর নির্ভরশীল করে দিল—এমনটা মনে হচ্ছে না। আগে বিধবার বিয়ের অধিকারই ছিলনা। এখন আবার বিয়ে করে নতুন স্বামীর সম্পত্তিতে ঠিক প্রথম বিয়ের মত অধিকার পেল। স্ত্রীধনের উপর অধিকার বজায় রইল। (ধারা-৫)।
    • এদিকে পুত্রের উত্তরাধিকার নিয়ে মনু বলছেন “একমাত্র ঔরসজাত পুত্র পৈতৃক ধনের অধিকারী”। (৯/১৬৪)। কিন্তু বিধবা স্বেচ্ছায় পুনরায় বিবাহ করলে যে পুত্র জন্মাবে তাকে বলে পৌনর্ভব। সে সম্পত্তির অধিকারী নয়। বিধবাবিবাহ আইন ১৮৫৬ ধারা ২ সেই বিবাহ থেকে জন্মানো পুত্রকে বৈধ ঘোষণা করে তাকে সম্পত্তির অধিকার দিল। এবং ধারা ৫ বিধবাকে স্ত্রীধনের এবং নতুন স্বামীর সম্পত্তির অধিকার দিল।
    • বঙ্গের জীমূতবাহনের দায়ভাগ টীকায় বিধবার মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার স্বীকৃত হলেও বঙ্গ ভিন্ন ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে দায়ভাগের বদলে মিতাক্ষরা প্রচলিত, যাতে বিধবার সম্পত্তির অধিকার স্বীকৃত নয়। তাহলে হ্যালহেড-জোন্সের হিন্দু অ্যাক্টে যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে তাতে গেল গেল রব বা কলোনিয়াল চক্রান্ত দেখার ভিত্তি কী? এই আইনের একশ’ বছর পরেও দেখা যাচ্ছে জানবাজারের রানি রাসমণি বিধবা হয়েও তাঁর স্বামীর বিশাল জমিদারি ভালভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
    • তাহলে চক্রান্ত কোথায়?  পিতৃতন্ত্র বা পুরুষের আধিপত্য? অবশ্যই। সে আগেও ছিল, পরেও রইল। আর চক্রান্তের অস্তিত্ব না থাকলে বিদ্যাসাগরের কলোনিয়াল প্রভুর ক্রীড়নক হিসেবে তাতে আদেশ পালনের কথা ওঠে কী করে? এই ষড়যন্ত্র ব্যাপারটা কিন্তু ঠিক স্পষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু লেখক কিছু ‘পাথুরে প্রমাণ’ দিয়েছেন যাতে এই ব্যাপারটা নিয়ে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। সেগুলো দেখা যাক।

    ১০.৩ পূর্বপক্ষ - বিদ্যাসাগরের শাসকের অনুপ্রেরণায় বিধবাবিবাহ আইনের আবেদন পেশ করার পাথুরে প্রমাণ -
    আরও পড়ুন
    রণছোড় - Chayan Samaddar



    • বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ আইন পাশ করার জন্যে আইনসভায় আবেদন করলে তার মাত্র দেড়মাস পরে ১৭ নভেম্বর, ১৮৫৫ তারিখে গ্র্যান্ট আইনের খসড়া পেশ করেন। শাসকের তরফে এত দ্রুত হস্তক্ষেপের ফলে বিষয়টি প্রথমেই সন্দেহের সৃষ্টি করে।
    • গ্র্যান্ট সরকারি ভাবে খসড়া রচনার দায়িত্ব পাওয়ার বহু আগে বিদ্যাসাগর আইন পাশের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে শলাপরামর্শ করেছিলেন।  এছাড়া বিদ্যাসাগর আইনসভার অন্য দু-তিনজন সদস্যের, যেমন লরেন্স পিল, কোলভিল, সঙ্গেও আগেই আলোচনা করেছিলেন। গ্র্যান্ট খসড়া পেশ করবার আগে জানতেন কার কার থেকে সমর্থন পাবেন।
    • বিদ্যাসাগরের সহোদর শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের দেওয়া ‘বিস্ফোরক তথ্য’

    ‘তিনি যে বিধবা নারীদের দুর্দশা থেকে উদ্ধার করার পরিবর্তে শাসকের অনুপ্রেরণায় আবেদনটি পেশ করেন, সেই বিষয়ক পাথুরে প্রমাণও আছে’।[9]

    শম্ভুচন্দ্র জানাচ্ছেন, “এই বিষয়ে তৎকালের হোমডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি  সার্‌ সিসিল বীডন, সুপ্রীম কৌন্সিলের মেম্বারগণ এবং লেপ্টেনেন্ট গবর্নর হেলিডে সাহেব প্রভৃতি আইন পাশের আবেদন জন্য, অগ্রজ মহাশয়কে উপদেশ প্রদান করেন। তদনুসারে প্রায় দুই সহস্র লোকের স্বাক্ষর করাইয়া, আবেদন-পত্র গবর্ণমেন্টে প্রেরিত হয়। গবর্নমেন্ট কৌন্সিলের বিচারে, হিন্দুশাস্ত্রানুসারে বিধবার পুনর্বার যখন বিবাহ হইতে পারে, তখন বিধবার গর্ভজাত পুত্র ঔরসজাত পুত্র বলিয়া, পৈতৃকসম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইবে, এই ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ হইল”।[10] (নজরটান লেখকের)।

    • “শম্ভুচন্দ্রের বয়ান থেকে পরিষ্কার, বিধবাবিবাহ আইনের জন্য খোদ ‘সুপ্রীম কৌন্সেলের মেম্বরগণ’ বিদ্যাসাগরকে ‘উপদেশ প্রদান করেন’। অসহায় বিধবার পরিবর্তে, তাদের এই উপদেশের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ‘বিধবার গর্ভজাত পুত্র’।”  ----- ঔপনিবেশিক প্রভুদের মনোবাসনা পূরণ করার ‘উপদেশ’ (আসলে নির্দেশ) অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য বিদ্যাসাগর অনেক বেশি মনোযোগী হন বিধবাদের পুনর্বিবাহ জাত পুত্রকে ‘ঔরসজাত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে। [11]
    • “তিনি যে আইনটি পাশ করার জন্য ঔপনিবেশিক প্রভুদের ‘উপদেশ’ নতমস্তকে পালন করেন, সেই বিষয়টিও আমরা দেখেছি। তবে বিধবাদের গর্ভজাত পুত্রকে নিছক ‘ঔরস’ পুত্র ঘোষণা করে শাসকদের সন্তুষ্ট করেননি তিনি’। --- বিধবাদের আর্থিক পরাধীনতার বিষয়টিকে তিনি নিঃশব্দে মেনে নেন।

    উত্তরপক্ষ

    • সব বুঝলাম। চক্রান্তটা কোথায়?  এই কন্সপিরেসি থিওরিটা একটা বিরাট ভুলের উপর দাঁড়িয়ে আছে।

    বিধবাবিবাহ আইনের খসড়ায় দ্বিতীয় ধারায়  বিধবার স্ত্রীধনের অধিকারকে অক্ষুণ্ণ রাখার যে কথা বলা হয়েছিল সেটি আইন পাশ হওয়ার পর তার দ্বিতীয় ধারায় দেখতে না পেয়ে লেখক ধরে নিয়েছেন ওটা গায়েব করে দেয়া হয়েছে। ফলে তার মধ্যে বিধবাদের বঞ্চিত করার ঔপনিবেশিক ঘৃণ্য চক্রান্ত এবং তার বশংবদ সহায়ক বিদ্যাসাগরের মুখোশ খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টায় পাতার পর পাতা ভরিয়েছেন।

    অথচ ধারা ৫ , অর্থাৎ এক স্বতন্ত্র ধারায় এই অধিকারটাই খুব জোর দিয়ে বলা হয়েছে যার অরিজিনাল ইংরেজি ভার্সন আমি উপরে উদ্ধৃত করেছি। পুরোটাই ছায়ার সঙ্গে কুস্তি হয়ে গেছে।

    • ষড়যন্ত্র প্রমাণ করতে তিনটে এলিমেন্ট দরকার। এক, ঘটনাটি ঘটা, দুই, উদ্দেশ্য বা মোটিভ, তিন, একাধিক ব্যক্তির বা কুশীলবের একত্র পরামর্শ। লেখকের ‘পাথুরে প্রমাণে’ তিননম্বর এলিমেন্ট আছে।  আইনের খসড়া তৈরির আগে থেকেই বিদ্যাসাগর কাউন্সিলের একাধিক মেম্বারদের সঙ্গে ওই আইন পাশের ব্যাপারে সলা-পরামর্শ, আলাপ-আলোচনা এবং লেখকের ভাষায় ‘নির্দেশ’ লাভ করছেন। কিন্তু আসল ঘটনাই ঘটেনি, বিধবাদের স্ত্রীধনের অধিকার নতুন আইনে হাপিশ হয়নি। ফলে তার জন্যে মোটিভ স্রেফ কল্পনার ফসল হয়ে গেছে।

    বরং শম্ভুচন্দ্রের পাথুরে প্রমাণ থেকে আমরা  দেখছি যে বিধবাবিবাহ আইন পাশে বিদ্যাসাগর কতটা আন্তরিক, কত আটঘাট বেঁধে অনেকদিন ধরে সর্বস্তরে চেষ্টা করেছেন। এই প্যাশন এবং পরে এরজন্য সর্বস্বান্ত, ঋণগ্রস্ত হওয়া বোধগম্য হয়।

    কিন্তু বোধগম্য হয় না যে কলোনিয়াল শাসকের ‘ঘৃণ্য’ ষড়যন্ত্রের সহকারী ব্যক্তিটি কেন ওই প্রোজেক্টের পেছনে নিজের জমাপুঁজি খরচ করে ঋণগ্রস্ত হলেন? কলোনিয়াল শাসকের বিশ্বস্ত ভৃত্যের ভুমিকা তো আইন পাশ হলেই শেষ হওয়ার কথা!

    • আমি উক্ত আইনের প্রথম ধারাটি হুবহু তুলে দিচ্ছি। কোথাও “বিধবাদের পুনর্বিবাহ জাত পুত্রকে ‘ঔরসজাত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার” বা পুত্রের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে কিছু বলা হয়নি। বরং বিধবার বিবাহ থেকে জন্মানো সন্তানদের ( পুত্র ও কন্যা) ‘বৈধ’ ঘোষণা করা হয়েছে। সাত ধারার বিধবাবিবাহ আইনের কোন ধারাতেই আলাদা করে ‘পুত্র’ সন্তান বা তার অধিকার নিয়ে একটি শব্দও নেই।

    “1. No marriage contracted between Hindus shall be invalid, and the issue of no such marriage shall be illegitimate, by reason of the woman having been previously married or betrothed to another person who was dead at the time of such marriage, any custom and any interpretation of Hindu law to the contrary notwithstanding”.[12]

    ১০.৪ বিদ্যাসাগর অর্থের ও পদোন্নতির টোপ দিয়ে বিধবাবিবাহে রাজি করাতেন। আইন পাশ হওয়ার পর প্রথম বিধবাবিবাহটিই তার  কলংকজনক উদাহরণ।

    পূর্বপক্ষ:

    • “আইন পাশ হওয়ার পরে, উচ্চবর্ণের হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহ প্রচলনের জন্য প্রবর্তনকারীদের সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য গৃহীত পদক্ষেপ ছিল বিবাহেচ্ছুক পাত্রদের মোটা আর্থিক অঙ্কের প্রলোভন প্রদর্শন।”  বিধবাবিবাহ আইন পাশ হয় ২৫ জুলাই ১৮৫৬।
    •  কালীপ্রসন্ন সিংহ  ২২ নভেম্বর, ১৮৫৬-তে  প্রত্যেক বিধবা বিবাহকারীকে একহাজার টাকা পুরস্কার দেবার কথা ঘোষণা করে সংবাদ প্রভাকরে বিজ্ঞাপন দেন। তখন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ বিদ্যাসাগরের বেতন ছিল মাসিক তিনশ’ টাকা। কোন পাত্র এগিয়ে এল না।
    •  অবশেষে প্রথম পাত্র পাওয়া গেল শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন, বিপত্নীক। পাত্রী ১০ বছরের বিধবা কন্যা কালীমতী দেবী। বিয়ে হল ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর তারিখে, বিদ্যাসাগরের বন্ধুর বাড়িতে ১২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটে। কিন্তু তার আগে কিছু ঘটনা ঘটে গেছল।
    • শ্রীশচন্দ্র প্রথমে বিয়েতে রাজি হয়ে শেষ মুহূর্তে মায়ের আপত্তি আছে বলে পিছিয়ে যাওয়ায় মেয়ের মা লক্ষ্মীমণি দেবী সুপ্রিম কোর্টে চল্লিশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মানহানির মামলা করলে পাত্র চটপট রাজি হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। বিয়ের কয়েকমাস পরে কালীমতী দেবী মারা গেলে শ্রীশচন্দ্র আবার এক কুমারী কন্যার পাণিগ্রহণ করেন।
    • পুরো ব্যাপারটাই ন্যক্কারজনক। কিন্তু বর খালি আদালতের ভয়ে বিয়ে করতে রাজি হলেন এমন নয়। “বরং বিদ্যাসাগর যে উচ্চপদে আসীন করার প্রলোভন দেখিয়ে বিবাহের অন্তিম মুহূর্তে তাঁর সম্মতি আদায় করেন, সে বিষয়ে অকাট্য প্রমাণও বর্তমান”।[13]
    • সেই প্রমাণটি হল, ১৮৫৫ সালের ১৮ই আগস্ট বিদ্যাসাগর মুর্শিদাবাদ দেওয়ানি আদালতের জজপণ্ডিতের শূন্য পদে শ্রীশচন্দ্রকে নিয়োগ করার সুপারিশ করেন।  তারপর ‘প্রথম বিধবাবিবাহের দিন অর্থাৎ ৭ ডিসেম্বর, বিদ্যাসাগর ইয়ং গর্ডনকে লেখেন যে শ্রীশচন্দ্র মুর্শিদাবাদ সার্কেলের ল’ অফিসার নিযুক্ত হয়েছেন। কোনও ভাবেই এই ঘটনাকে নিছক সমাপতন বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।[14]
    • ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন,

    ‘শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন--- ২২ জানুয়ারি ১৮৫১  তারিখ হইতে সাহিত্যের অধ্যাপক হন। এই পদে তিনি ১৮৫৫ সনের নবেম্বর মাস পর্য্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাহার পর তিনি মুর্শিদাবাদের জজ-পণ্ডিত হন’। (নজরটান লেখকের)।

    “অর্থাৎ, বিবাহের মাত্র এক সপ্তাহ আগে শ্রীশচন্দ্রকে উচ্চপদে আসীন করে তাঁকে কালীমতী দেবীকে বিবাহ করার বিষয়ে রাজি করানো হয়। প্রথম বিধবাবিবাহের সঙ্গে যদি এহেন অনৈতিক বিষয়গুলি জড়িয়ে থাকতে পারে---”।[15]

    উত্তরপক্ষ -

    এখানে লেখক দুটো ঘটনার সময়কাল গুলিয়ে ফেলেছেন। দুটো  ঘটনার তারিখ—শ্রীশচন্দ্রের বিবাহ ও বিদ্যাসাগরের পত্র—এক, কিন্তু সাল আলাদা; মাঝে এক বছরের ব্যবধান!

    • লেখকের উদ্ধৃত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উক্তি এবং ওঁর আগের বক্তব্য মিলিয়ে নিলে দেখা যাচ্ছে-


    1. শ্রীশচন্দ্র ১৮৫১ সাল থেকে নভেম্বর ১৮৫৫ পর্যন্ত সংস্কৃত কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক পদে কাজ করেছেন। ডিসেম্বর ১৮৫৫তে তিনি মুর্শিদাবাদের জজ-পণ্ডিত হন।
    2. বিদ্যাসাগর ১৮৫৫ সালের ১৮ই অগাস্ট তাঁকে মুর্শিদাবাদের জজ-পণ্ডিতের শূন্য পদে নিয়োগ করার সুপারিশ করেন।
    3.  বিদ্যাসাগর  ১৮৫৫ সালের ৭ই ডিসেম্বর ইয়ং গর্ডনকে পত্র লিখে শ্রীশচন্দ্রের জজ-পণ্ডিত হওয়ার পুষ্টি করেন।
    4. কিন্তু শ্রীশচন্দ্রের বিবাহ হয়  ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর, এক বছর পরে। ফলে বিয়ের মাত্র এক সপ্তাহ আগে চাকরির টোপের অভিযোগ আদৌ ধোপে টেঁকে না।
    5. বিধবাবিবাহ আইন পাশ হয়েছে ২৬শে জুলাই ১৮৫৬ সালে। বিদ্যাসাগর যখন ১৯৫৫ সালে  শ্রীশচন্দ্রের জন্যে সুপারিশ করছিলেন বা শ্রীশচন্দ্র যখন জজ-পণ্ডিত হলেন তখন কোথায় কালীমতী দেবীর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব ইত্যাদি। ফলে পদোন্নতির টোপের প্রমাণটি ‘অকাট্য’ হওয়া তো দুরস্থান, প্রমাণ হিসেবেই গণ্য নয়।


    • পদোন্নতির টোপের অভিযোগ না হয় ভুল, কিন্তু আর্থিক প্রলোভন? লেখক সঠিক বলেছেন যে ১৮২৯ সালে পাশ হওয়া সতীদাহ আইনটি ছিল নিবারণমূলক (coercive)

    আইন। মানে লঙ্ঘন করলে যে কোন হিন্দু দণ্ডিত হবে। তাই আইনটি সফল হয়েছিল। কিন্তু বিধবাবিবাহ আইন হল প্রবর্তনমূলক (permissive) আইন। বিধবাবিবাহ করা বাধ্যতামূলক বা অবশ্যপালনীয় নয়। আইন পাশ হওয়ার বহুবছর পরেও এটি দেশাচার সম্পর্কে প্রবল নিষ্ঠাবান সমাজে ‘নিন্দিত’ ছিল। তাই একে সফল করে তুলতে বিবাহেচ্ছুক পাত্রদের আর্থিক প্রলোভন দেখানো ছাড়া বিদ্যাসাগরের গত্যন্তর ছিলনা।[16]

    • আমার বিনীত নিবেদন সামাজিক ব্যবহারে এবং লোকের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে আর্থিক বা অন্য ইন্সেন্টিভ দেওয়া কি ভুল বা অনৈতিক? ধরুন, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী ইত্যাদি প্রোগ্রাম বা জন্ম নিয়ন্ত্রণে আর্থিক উৎসাহদান রাশি ও ইনক্রিমেন্ট ইত্যাদি? বা ফ্যক্টরির মধ্যে ধূমপান না করলে নগদ পুরষ্কার? মিড ডে মিল?

    এটা আলাদা কথা যে বিদ্যাসাগর ঋণগ্রস্ত হয়ে এবং বাস্তবে অপেক্ষার অনুরূপ সাফল্য না পেয়ে কিছুদিন পরে এটা বন্ধ করে দেবেন। বরং  “বিধবাবিবাহ সম্পাদনের আগে এক টাকার স্ট্যাম্প কাগজে চারজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে পাত্রকে দিয়ে তিনি একটি ‘একরারনামা বা অঙ্গীকারপত্র লিখিয়ে নেবেন”।[17]

    ১০.৫ এই আইনে ক্ষতি হোল সমাজের বৃহত্তর অংশের মহিলাদের বা নিম্নবর্ণের ও বর্গের মহিলাদের

    পূর্বপক্ষ -

    • অধিকাংশ ‘সদর আদালত’ (হাইকোর্ট) নিম্নবর্ণ সমাজে প্রচলিত বিধবাবিবাহের প্রথাকে উপেক্ষা করে এবং নতুন আইনটিকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সমস্ত বর্ণের বিধবাদের জন্য প্রযোজ্য বলে বিবেচনা করে।  উচ্চবর্ণের বিধবাদের মধে খুব কম মহিলা এই আইনের সুবিধে নিয়ে আবার বিয়ে করলেন। আবার নিম্নবর্ণের বিধবাদের--  যাঁরা এই আইন পাশের আগে প্রচলিত প্রথা অনুসারে পুনর্বিবাহ করতেন এবং “সেই সুবাদে তাঁদের প্রথম স্বামীর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন না”—সেই সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা শুরু হয়।[18]
    • এই আইনের পরিণতিতে শুরু হয় ‘সংস্কৃতায়ন’ প্রক্রিয়া যাকে ক্যারল চিহ্নিত করেছেন ‘the Brahminization of the low castes and the Hinduization of tribals’[19] রূপে।  “আইন সত্ত্বেও যেহেতু উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজে বিধবাবিবাহের প্রচলন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তাই নিম্নবর্ণের মানুষরাও ‘জাতে ওঠা’র জন্য বিধবাবিবাহকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রটিকেই ‘আদর্শ’ মনে করে।

    উত্তরপক্ষ

    উপরের দুটো পয়েন্ট মিলিয়ে দেখলে কী পাচ্ছি?

    • এই আইনের ফলে নিম্নবর্ণের বিধবারা আবার বিয়ে করলে আগের স্বামীর সম্পত্তির উপর অধিকার হারালেন।
    • আবার এই আইনের ফলে শুরু হয় ‘সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়া। নিম্নবর্ণের বিধবারা ‘সংস্কৃতায়ন’ বা ‘জাতে ওঠা’র জন্য উঁচু জাতের বিধবাদের নকলে বিধবাবিবাহ এড়িয়ে চললেন। ফলে বঙ্গে বিধবাদের সংখ্যা বেড়ে গেল।[20] মানে বিদ্যাসাগর ব্যর্থ।
    • দুটো মিলিয়ে কোন মানে হয় কি? যদি নতুন আইনের ফলে বিধবারা বিধবাবিবাহে ‘নিরুৎসাহ’ হন, তবে তো তাদের আগের স্বামীর সম্পত্তির উপর অধিকার আগের মতই কায়েম রইল।  বিধবাবিবাহ আইনের ফলে ওঁরা দলে দলে সম্পত্তি হারাবেন আবার ওই আইনের ফলেই জাতে ওঠার চেষ্টায় বিধবাবিবাহের বিরুদ্ধে গিয়ে সম্পত্তি হারাবেন না? একই আইনের একই সঙ্গে দুটো বিপরীত ফল?
    • ‘সংস্কৃতায়ন’ একটি সোশ্যাল ডায়নামিক্সের প্রক্রিয়া, নানান আর্থ-সামাজিক কারণে হয়ে থাকে, আজও ঘটছে। এটি স্থান-কাল-কমিউনিটি স্পেসিফিক। এটা বিধবাবিবাহ আইনের ফল? কেবল বিধবাবিবাহ আইনের ফলে নিম্নবর্ণের মানুষেরা ‘জাতে ওঠা’র চেষ্টা করছিল না। তাহলে তারা বিধবাবিবাহ আইনের সমর্থক হত।  বরং ‘জাতে ওঠা’র  প্রক্রিয়ায় তারা বিধবাবিবাহ আইনকে নিষিদ্ধ করা ‘আদর্শ’ মনে করল।  এখানে লেখক কার্য-কারণকে উলটে দিচ্ছেন। কিন্তু বিধবাবিবাহ আইনের পেছনে ‘কলোনিয়াল চক্রান্ত’ এখনও বুঝতে পারছি না।
    • একটা জিজ্ঞাসা- নিম্নবর্ণ, দলিত সমাজের বিধবা মহিলারা এই আইন পাশের আগে যখন তাঁদের নিজস্ব সামাজিক প্রথা অনুযায়ী দ্বিতীয়বার বিবাহ করতেন তখন নতুন স্বামীর ঘরে যাবার পরেও আগের মৃত স্বামীর সম্পত্তির উপর তাঁদের অধিকার বজায় থাকত? কী সেই সম্পত্তি? ঘরদোর? ক্ষেতখামার? এব্যাপারে কোন রেকর্ড পাওয়া যায়? সাহিত্যে তার ছবি? কোন স্টাডি? নাকি সবটাই বৌদ্ধিক নির্মাণ?

    আগামী কিস্তিতে আলোচিত হবে বিধবাবিবাহ সম্বন্ধিত বাকি পয়েন্ট এবং বহুবিবাহ ও সহবাস সম্মতি আইন প্রণয়নে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা। লেখক আশ্বস্ত করেছেন, “বহুবিবাহ নিবারণ সূত্রে লিখিত তাঁর প্রথম পুস্তকটি বিশ্লেষণ করা হলে, এই হিন্দু ‘সমাজসংস্কারক’ এর কদর্য মূর্তি আরও একবার উন্মোচিত হবে”।[21]

    (চলবে)


    [1] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৫৪।
    [2] ঐ; পৃঃ ২৪৯।
    [3] ঐ; পৃঃ  ২৫২।
    [4] ঐ; পৃঃ ২৭৮।
    [5] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২২৫।
    [6] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৪৩।
    [7] ঐ, পৃঃ ২৪৩।
    [8] ঐ; পৃঃ ২৪৪।
    [9] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৫১।
    [10] ঐ; পৃঃ ২৫১।
    [11] ঐ, পৃঃ  ২৫২।
    [12] The Hindu Widows Re-marriage Act, 1856; Section 1.
    [13] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৫৬।
    [14] ঐ; পৃঃ ২৫৬।
    [15] ঐ,  পৃঃ ২৫৭।
    [16] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৫৯।
    [17] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ  ২৬০।
    [18] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৮০।
    [19] ঐ; পৃঃ ২৮০।
    [20] ঐ; পৃঃ ২৮১।
    [21] ঐ; পৃঃ ২৯২।


  • বিভাগ : পড়াবই | ০৮ আগস্ট ২০২১ | ৮৮৩ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ০৮ আগস্ট ২০২১ ১৫:৪০496559
  • এই আইনের ধারা তুলে এনে দেওয়াটা খুবই কাজের হয়েছে। আমি হয়ত অত ঘেঁটে দেখতাম না। আমার আইনের ধারা উপধারার মধ্যে ঘোরার খুব একটা আগ্রহ এমনিতে নেই। এখানে একেবারে সোর্স উল্লেখ করে তুলে দেওয়াতে সত্যিই খুবই খুশী হলাম। 

  • এলেবেলে | ০৮ আগস্ট ২০২১ ২০:৫১496566
  • -কে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেই এখানে দু-চারটে কথা বলা জরুরি মনে করলাম। যেহেতু -দি এখানে আইনের বিষয়টি তুলেছেন এবং যেহেতু তিনিই আমাকে এই বিষয়ে আকর গ্রন্থটি দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, তাই তাঁর অন্যান্য পাঠকের সুবিধার্থে আগে বিধবাবিবাহ সম্পর্কিত বিদ্যাসাগরের আবেদন বিধবাবিবাহ আইনটি সম্পূর্ণ তুলে দেব এবং তার প্রেক্ষিতে কয়েকটি অতি সামান্য প্রাসঙ্গিক মন্তব্য করব।

     

    . ১৮৫৫ সালের অক্টোবর বিদ্যাসাগর তাঁর সমর্থকবৃন্দ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের কাছে যে আবেদনপত্র পেশ করেন তা হুবহু এইরকম

    To

    THE HONORABLE

    THE LEGISLATIVE COUNCIL OF INDIA.

    The Humble Petition of the undersigned Hindu Inhabitants of the Province of Bengal.

    RESPECTFULLY SHEWETH,

    That by long established custom the marriage of Widows among Hindus is prohibited.

    That in the opinion and firm belief of your Petitioners, this custom, cruel and unnatural in itself, is highly prejudicial to the interests of morality, and is otherwise fraught with the most mischievous consequences to society.

    That the evil of this custom is greatly aggravated by the practice among Hindus of marrying their sons and daughters at a very early age, and in many cases in their very infancyso that female children not unfrequently become widows before they can speak or walk.

    That in the opinion and firm belief of your Petitioners, this custom is not in accordance with the Shastras, or with a true interpretation of Hindu Law.

    That your Petitioners and many other Hindus have no objections of conscience to the marriage of widows, and are prepared to disregard all objections to such marriages, founded on social habit or on any scruple resulting from an erroneous interpretation of religion.

    That your Petitioners are advised that by the Hindu law, as at present administered and interpreted in the Courts of Her Majesty and the East India Company, such marriages are illegal, and the issue thereof would be deemed illegitimate.

    That Hindus, who entertain no objections of conscience to such marriages, and who are prepared to contract them notwithstanding social and religious prejudices, are by the aforesaid interpretation of Hindu law prevented therefrom.

    That in the humble opinion of your Petitioners, it is the duty of the Legislature to remove all legal obstacles to the escape from a social evil of such magnitude which, though sanctioned by custom, is felt by many Hindus to be a most injurious grievance, and to be contrary to a true interpretation of Hindu law.

    That the removal of the legal obstacles to the marriage of widows, would be in accordance with the wishes and feelings of a considerable section of pious and orthodox Hindus, and would in nowise affect the interests, though it might shock the prejudices, of those who conscientiously believe that the prohibition of the marriage of widows is sanctioned by the Shastras, or who uphold it on fancied grounds of social advantage.

    That such marriages are neither contrary to nature nor prohibited by law or custom in any other country or by any other people in the world.

    That your Petitioners, therefore, humbly pray that your Honorable Council will take into early consideration the propriety of passing a law to remove all legal obstacles to the marriage of Hindu widows, and to declare the issue of all such marriages to be legitimate. And your Petitioners, as in duty bound, shall ever pray.

    ISHVARCHANDAR VIDIASAGAR, and others,

    4th October 1855,

    [Pandit Narayan Keshav Vaidya (comp. & ed.), A Collection Containing the Proceedings which Led to the Passing of Act XV of 1856, pp. 1-2]

    এই আবেদনপত্রে দুটি জিনিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ) এই বিবাহ শাস্ত্রসম্মত ) বিধবার পুনর্বিবাহজাত সন্তানদের বৈধ সন্তান হিসেবে ঘোষণা করা।

    অথচসন্তাননয় কেবলপুত্রসন্তানদের বৈধ বিবেচনা করার জন্য বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন:

    এক্ষণে বিবেচনা করা আবশ্যক, [বিধবার গর্ভজাত] পুত্রকে ঔরস, দত্তক অথবা কৃত্রিম বলা যাইবেক। উহাকে দত্তক অথবা কৃত্রিম বলা যাইতে পারে না; কারণ যদি পরের পুত্রকে শাস্ত্রবিধানানুসারে পুত্র করা যায়, তবে বিধানের বৈলক্ষণ্য অনুসারে, তাহার নাম দত্তক অথবা কৃত্রিম হইয়া থাকে কিন্তু বিবাহিতা বিধবার গর্ভে স্বয়ং উৎপাদিত পুত্র পরের পুত্র নহে; এই নিমিত্ত, উহাকে দত্তক অথবা কৃত্রিম বলা যাইতে পারে না শাস্ত্রকারেরা দত্তক কৃত্রিম পুত্রের যে লক্ষণ নিরূপিত করিয়াছেন, তাহা বিবাহিতা বিধবার গর্ভে স্বয়ং উৎপাদিত পুত্রে ঘটিতেছে না কিন্তু ঔরস পুত্রের যে লক্ষণ নির্দিষ্ট করিয়াছেন, তাহা সম্পূর্ণ রূপে ঘটিতেছে

    এই যুক্তির কোথাও কি কন্যাসন্তানদের কথা উল্লিখিত হয়েছে? জোন্সের আইনে কি বিধবার গর্ভজাত কন্যাদের সম্পত্তিতে কোনও উত্তরাধিকার দেওয়া হয়েছিল?

    দ্বিতীয়ত, বিধবাবিবাহকেশাস্ত্রসম্মতপ্রমাণ করার জন্য বিদ্যাসাগর যে শাস্ত্রসমুদ্র মন্থন করেছিলেন, মূল আইনে আদৌ কি তাঁর শাস্ত্রীয় মারপ্যাঁচকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল? তাঁর বিরোধী পক্ষের সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের মূল বক্তব্য ছিল, পরাশরের বিধবাবিধায়ক বচনের প্রকৃত অর্থ হলবাগদত্ত পাত্রের সঙ্গেই কন্যার বিবাহ দিতে হবে, তবে বাগদত্ত পতির পঞ্চপ্রকার আপদে ওই কন্যাকে পাত্রান্তরে প্রদান শাস্ত্রবিহিত সেই বাগদত্তা কন্যার কি পুনর্বিবাহ আইনসম্মত হয়েছিল?

    এই বিষয়দুটির সমাধান হবে মূল আইনটির দিকে চোখ রাখলে। পাঠকদের সুবিধার্থে প্রথমে আইনের ইংরেজি অংশ পরে তার বঙ্গানুবাদ দেওয়া হবে।

     

    . বিধবাবিবাহ আইন:

    ACT No. XV. OF 1856.

    Preamble

    Where it is known that, by the law as administered in the Civil Courts established in the territories in the possession and under the government of the East India Company, Hindu Widows, with certain exceptions, are held to be, by reason of their having been once married, incapable of contracting a second valid marriage, and the offspring of such widows by any second marriage are held to be illegitimate and incapable of inheriting property; and whereas many Hindus believe that this imputed legal incapacity, although it is in accordance with established custom, is not in accordance with a true interpretation of the precepts of their religion, and desire that the Civil law administered by the Courts of Justice shall no longer prevent those Hindus who may be so minded from adopting a different custom, in accordance with the dictates of their own consciences; and whereas it is just to relieve all such Hindus from this legal incapacity of which they complain; and the removal of all legal obstacles to the marriage of Hindu widows will tend to the promotion of good morals and to the public welfare: It is enacted as follows:

    প্রস্তাবনা

    যেহেতু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিকৃত এবং শাসনাধীন দেশ সমূহের দেওয়ানি আদালতের প্রচলিত আইন অনুসারে সাধারণত হিন্দু বিধবাগণ একবার বিবাহ করেছে বলে পুনর্বিবাহ করতে অক্ষম এবং এই সকল বিধবার পুনর্বিবাহজাত সন্তান অবৈধ পৈতৃক সম্পত্তির অনধিকারী বলে পরিগণিত হয়; এবং যেহেতু অনেক অনেক হিন্দু বিশ্বাস করেন যে, চিরাগত আচারসম্মত হলেও এই কল্পিত বৈধ প্রতিবন্ধকতা তাদের ধর্মশাস্ত্র বিরুদ্ধ এবং নিজ ধারণার অনুকূল ভিন্নাচার অবলম্বনে ইচ্ছুক ব্যক্তিগণ ভবিষ্যতে আর ধর্মাধিকরণের দেওয়ানি আইন কর্তৃক কোনও বাধা না পান, এই তাদের ইচ্ছা এবং যেহেতু উক্ত হিন্দুগণকে তাদের আপত্তি অনুসারে আইনের এই প্রতিবন্ধকতা থেকে উদ্ধার করা ন্যায় অনুমোদিত এবং হিন্দুবিধবার বিবাহে সমস্ত বাধা দূর করলে সুনীতির বিস্তার জনসাধারণের হিতানুষ্ঠান হবে, সেই হিন্দু আইন নিম্নলিখিতরূপে বিধিবদ্ধ করা যাচ্ছে:

    1. No marriage contracted between Hindus shall be invalid, and the issue of no such marriage shall be illegitimate, by reason of the woman having been previously married or betrothed to another person who was dead at the time of such marriage, any custom and any interpretation of Hindu law to the contrary notwithstanding.

    . হিন্দু বিধবা কিংবা কোনও বাগদত্তা কন্যা যদি পুনর্বার বিবাহ করেন, তাহলে সেই বিবাহ বেআইনি বলে গণ্য হবে না এবং সেই বিবাহজাত সন্তানদের অবৈধ বলে মনে করা হবে না

    2. All rights and interests which any widow may have in her deceased husband’s property by way of maintenance, or by inheritance to her husband or to his lineal successors, or by virtue of any will or testamentary disposition conferring upon her, without express permission to remarry, only a limited interest in such property, with no power of alienating the same, shall, upon her re-marriage, cease and determine as if she had then died; and the next heirs of her deceased husband, or other persons entitled to the property on her death, shall thereupon succeed to the same.

    . মৃত স্বামীর বিষয়সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারসূত্রে অথবা ভরণপোষণসূত্রে যে কোনও দাবিদাওয়া দ্বিতীয় বিবাহে বাতিল হয়ে যাবে এবং সেই স্ত্রী [প্রথম স্বামীর দিক থেকে] মৃত বলে গণ্য হবেন। তার মৃত স্বামীর অবর্তমানে যিনি ন্যায্য উত্তরাধিকারী হবেন, তিনি ওই স্বামীর বিষয়সম্পত্তির মালিক হবেন

    3. On the re-marriage of a Hindu Widow, if neither the widow nor any other person has been expressly constituted by the will or testamentary disposition of the deceased husband, the guardian of his children, the father or paternal grand-father, or the mother or paternal grand-mother, of the deceased husband or any male relative of the deceased husband may petition the highest Court having original jurisdiction in civil cases in the place where the deceased husband was domiciled at the time of his death, for the appointment of some proper person to be guardian of the said children, and thereupon it shall be lawful for the said Court, if it shall think fit, to appoint such guardian, who, when appointed, shall be entitled to have the care and custody of the said children, or of any of them, during their minority, in the place of their mother; and in making such appointment the Court shall be guided, so far as may be, by the laws and rules in force touching the guardianship of children who have neither father nor mother,

    Provided that, when the said children have not property of their own sufficient for their support and proper education whilst minors, no such appointment shall be made otherwise than with the consent of the mother; unless the proposed guardian shall have given security for the support and proper education of the children whilst minors.

    . মৃত পতির উইল বা লিখিত বন্দোবস্ত দ্বারা যদি তার বিধবা স্ত্রী অথবা অন্য কোনও ব্যক্তি তার [মৃত পতির] সন্তানদের অভিভাবক নিযুক্ত না হয়ে থাকে, তাহলে হিন্দু বিধবার পুনর্বিবাহের পরে মৃত পতির পিতা বা পিতামহ, অথবা মৃত পতির কোনও আত্মীয়পুরুষ মৃত পতির মৃত্যুকালীন আইনসঙ্গত বাসস্থানের আদিম বিভাগসম্পন্ন উচ্চতম দেওয়ানি আদালতে ওই সন্তানদের ন্যায্য অভিভাবক নিযুক্ত করবার জন্য দরখাস্ত করতে পারেন, এইরকম স্থলে উক্ত আদালতের বিবেচনা অনুসারে অভিভাবক নিযুক্ত করা আইনসঙ্গত হবে; আর উক্ত অভিভাবক নিযুক্ত হলে ওই সন্তানদের অথবা তাদের মধ্যে কোনওটির নাবালক থাকা পর্যন্ত তাদের মায়ের পরিবর্তে রক্ষণাবেক্ষণের অধিকারী হবে অভিভাবক নিযুক্তিকল্পে এস্থলে আদালত পিতৃমাতৃহীন ছেলেমেয়েদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচলিত আইন অনুসারে চালিত হবেন

    কিন্তু ওই সন্তানদের নাবালক কাল পর্যন্ত ভরণপোষণ এবং ন্যায্য শিক্ষার উপযোগী সম্পত্তি না থাকলে মায়ের অনুমতি ভিন্ন উক্ত প্রকারের অভিভাবক নিযুক্ত হবে না তবে সন্তানদের নাবালকত্ব কাল পর্যন্ত ভরণপোষণ এবং ন্যায্য শিক্ষা নির্বাহ করবার প্রমাণ প্রস্তাবিত অভিভাবক কর্তৃক প্রদত্ত হলে অভিভাবক নিযুক্ত হবে

    4. Nothing in this Act contained shall be construed to render any widow, who, at the time of the death of any person leaving any property, is a childless widow capable of inheriting the whole or any share of such property if, before the passing of this Act, she would have been incapable of inheriting the same by reason of her being a childless widow.

    . এই আইন বিধিবদ্ধ হওয়ার পূর্বে কোনও ব্যক্তি সম্পত্তি রেখে মারা গেলে, কোনও নিঃসন্তান বিধবা ওই সম্পত্তির অনধিকারিণী বলে যেমন পরিগণিত হত এই আইনের কোনও মর্মানুসারে ওই ব্যক্তি সম্পত্তি রেখে মারা গেলে, ওই নিঃসন্তান বিধবা উক্ত সম্পত্তির অধিকারিণী বলে পরিগণিত হবে না

    5. Except as in the three preceding Sections is provided, a widow shall not, by reason of her re-marriage, forfeit any property or any right to which she would otherwise be entitled; and every widow who has remarried shall have the same rights of inheritance as she would have had, such marriage been her first marriage.

    . পূর্ব তিনটি ধারার নির্ধারিত বিষয় ভিন্ন অন্য কোনও সম্পত্তি বা স্বত্বে কোনও বিধবা অধিকারিণী হলে, সে পুনর্বিবাহ হেতু তা থেকে বঞ্চিত হবে না এবং পুনর্বিবাহকারিণী বিধবা প্রথম পরিণীতার ন্যায় উত্তরাধিকার স্বত্বের অধিকারিণী হবে

    6. Whatever words spoken, ceremonies performed, or engagements made, on the marriage of a Hindu female who has not been previously married, are sufficient to constitute a valid marriage, have the same effect, if spoken, performed, or made on the marriage of a Hindu Widow; and no marriage shall be declared invalid on the ground that such words, ceremonies, or engagements are inapplicable to the case of a widow.

    . আগে বিবাহিত নয়, এমন কোনো হিন্দু মেয়ের বিবাহে যে মন্ত্র উচ্চারিত হয় বা যে সব আচার-অনুষ্ঠান প্রতিপালিত হয়, যার ফলে বিবাহ অনুষ্ঠানটি আইনসিদ্ধ বলে গণ্য হয়, হিন্দু বিধবার বিবাহেও সেই সব মন্ত্র উচ্চারিত হলে বা আচার-অনুষ্ঠান প্রতিপালিত হলে একই ফল হবে। ওই সব মন্ত্র বা আচার-অনুষ্ঠান হিন্দু বিধবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, এই আপত্তিতে ওই বিবাহকে বে-আইনী বলা হবে না।

    7. If the widow remarrying is a minor whose marriage has not been consummated, she shall not remarry without the consent of her father, or, if she has no father, of her paternal grand-father, or, if she has no such grand-father, of her mother, or, failing all these, of her elder brother, or, failing also brothers, of her next male relative.

    All persons knowingly abetting a marriage made contrary to the provisions of this section shall be liable to imprisonment for any term not exceeding one year or, to five, or, to both.

    And all marriages made contrary to the provisions of this Section may be declared void by a Court of law.

    Provided that, in any question regarding the validity of a marriage made contrary to the provisions of this section, such consent as is aforesaid shall be presumed until the contrary is proved, and that no such marriage shall be declared void after it has been consummated.

    In the case of a widow who is of full age, or whose marriage has been consummated, her own consent shall be sufficient consent to constitute her re-marriage lawful and valid.

    . পুনর্বিবাহোদ্যতা বিধবা অপ্রাপ্তবয়স্কা অক্ষতযোনি হলে, পিতার অবর্তমানে পিতামহের, পিতামহের বর্তমানে মাতার, এদের অবর্তমানে জ্যেষ্ঠ সহোদর কিংবা তারও অবর্তমানে তৎপর নিকটাত্মীয় পুরুষের অনুমতিতে পুনর্বিবাহ করবে

    যে সমস্ত ব্যক্তি এই ধারার বিবাহে জ্ঞাতসারে অসহযোগিতা করবে, তারা এক বছরের অনতিরিক্তকাল কারাগার কিংবা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবে

    এবং এই ধারার বিরুদ্ধ বিবাহ আদালত কর্তৃক অবৈধ বলে অস্বীকৃত হতে পারে

    কিন্তু এই ধারার বিরুদ্ধ বিবাহে কোনও রকমের আপত্তি উত্থাপিত হলে, বিরুদ্ধে প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত পূর্বোক্তরূপ অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে এবং ওইরূপ বিবাহের পর পতিসহবাস হয়ে গেলে আর তা অবৈধ বলে অগ্রাহ্য হবে না

    প্রাপ্তবয়স্কা ক্ষতযোনি বিধবার পক্ষে তার আত্মসম্মতিমাত্র পুনর্বিবাহ আইসঙ্গত এবং গ্রাহ্য বলে স্বীকার করবার জন্য যথেষ্ট হবে [Pandit Narayan Keshav Vaidya (comp. & ed.), A Collection Containing the Proceedings which Led to the Passing of Act XV of 1856, pp. 80-82]

    কথা নিঃসন্দেহে সত্যি যে আইনের পঞ্চম ধারায় পুনর্বিবাহিতা নারী স্ত্রীধনের অধিকারী হতে পারে, কিন্তু এই আইন পাশ হওয়ার অনেক আগেই তো হ্যালহেড তাঁর আইনে স্ত্রীধন পাওয়া বা রক্ষা করার শর্ত হিসেবে বিধবাদেরসতীত্বরক্ষার অছিলাটি জুড়ে দিয়ে তাঁদের থেকে সে ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাহলে সব মিলিয়ে আইনে কী দাঁড়াল? ) বাগদত্তা কন্যার পুনর্বিবাহ বৈধ অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রব্যাখ্যা তার গুরুত্ব হারাল; ) মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে বিধবার উত্তরাধিকার থাকল না; ) সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণ করার অধিকার থাকল না; ) নিঃসন্তান বিধবা সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন ) স্ত্রীধনের অধিকার কেবলই আইনি কচকচিতে সীমাবদ্ধ থাকল।

    আর বিধবার গর্ভজাত কন্যাদের যদি আইনে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে মেনে নেওয়া হয় (যার উল্লেখ আইনের কোনও স্থানে নেই), তাহলে বিদ্যাসাগর-সহোদর শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন কিগবর্ণমেন্টের কৌন্সিলের বিচারে, হিন্দুশাস্ত্রানুসারে বিধবার পুনর্বার যখন বিবাহ হইতে পারে, তখন বিধবার গর্ভজাত পুত্র ঔরসজাত পুত্র বলিয়া, পৈতৃক-সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইবে, এই ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ হইল ইংরাজী ১৮৫৬ খৃঃ অব্দের ১৩ জুলাই, এই আইন পাশ হইল।কথাগুলো আইনের বিন্দুবিসর্গ না বুঝে লিখেছিলেন?

     

    শ্রীশচন্দ্রের আদালতের জজপণ্ডিতের বিষয়ে ভুলটির দিকে রঞ্জনবাবু যথাযথ দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমাকে কৃতজ্ঞ করেছেন। কিন্তু বিপত্নীক শ্রীশচন্দ্র যে দশ বছরের কালীমতীকে বিবাহ করলেন সে কথা উল্লেখ করেও এই বিবাহটি যে প্রকৃতপক্ষেএকাধারে বাল্যবিবাহ-বহুবিবাহ-বিধবাবিবাহের আশ্চর্যতম ত্রিবেণীসঙ্গম’ - সেটি উল্লেখ করতে ভুলে গেলেন কেন? তাঁর মতে, হিন্দু আইন সারা ভারতবর্ষের জন্য প্রযোজ্য, কেবল বাংলার জন্য নয়। ঠিক, কিন্তু কৌলীন্য প্রথার দৌলতে বাল্যবিবাহ বহুবিবাহ যে বাংলার বিধবাদের কষ্টের মূল কারণ, প্রথম বিধবাবিবাহটিই তো তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তাছাড়া আইন পাশ করার পরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঠিক কতগুলো বিধবাবিবাহ হয়েছিল, বহু চেষ্টা করেও সেই বিষয়ে কোনও তথ্য খুঁজে পাইনি। ফলে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ বাংলার বিধবাদের ক্ষেত্রেই দেওয়া হয়েছে।

  • Ranjan Roy | ০৮ আগস্ট ২০২১ ২৩:২৮496572
  • এই না হলে জমে?


    আমাদের আলোচ্য বিষয় কী? নিম্ন অভিযোগগুলো খুঁটিয়ে দেখা।


    এক, বিধবাবিবাহ আইনে বিধবাদের স্ত্রীধনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কলোনিয়াল চক্রান্ত;


    দুই, কলোনিয়াল প্রভুদের নির্দেশে সেই চক্রান্তে শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা করে বিদ্যাসাগরের সহায়তা


    তিন, বিধবাবিবাহের জন্য আর্থিক এবং চাকরির প্রলোভন দেওয়ার মত নোংরামি,


    চার, প্রথম বিধবাবিবাহ আসলে 'বাল্যবিবাহ-বহুবিবাহ-বিধবাবিবাহের' ত্রিবেণীসঙ্গম।


    আমার বক্তব্যঃ


    ১  বিধবাবিবাহ আইনে স্ত্রীধনের অধিকার থেকে বিধবাদের বঞ্চিত করা হয়নি, (লেখক উদ্ধৃত ধারা ৫)। মৃত স্বামীর সম্পত্তির অধিকার থেকে বিধবাদের নতুন করে বঞ্চিত করা হয়নি। বঙ্গ বাদে  বাকি সমগ্র ভারতে প্রচলিত ধর্মশাস্ত্রের "মিতাক্ষরা" ব্যাখ্যা রিপিট করা হয়েছে যাতে মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে বিধবার অধিকার স্বীকৃত ছিলনা।  যে অধিকার আগে ছিলনা তার থেকে কীকরে বঞ্চিত করা যায়?  বঙ্গে দায়ভাগে স্বীকৃত ছিল, কিন্তু  হ্যালহেডের  জেনটু ল এবং জোন্সের  হিন্দু কোড   ১১জন পণ্ডিতের কথা মেনে মিতাক্ষরা ব্যাখ্যা নিয়ে গোটা দেশের জন্যে আইন বানিয়েছেন।  তার উপর এসব  বিদ্যাসাগরের জন্মের আগে তৈরি হয়ে গেছে। তার  ঠিক বা ভুলের দায় বিদ্যাসাগরের? নাকি ওই কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ১১ জন খ্যাতিমান পণ্ডিতের? আর ওই আইন শুধু বাগদত্তার জন্যে তো নয়, বিধবা এবং বাগদত্তা উভয়ের জন্যে।


    [হিন্দু বিধবা কিংবা কোনও বাগদত্তা কন্যা যদি পুনর্বার বিবাহ করেনতাহলে সেই বিবাহ বেআইনি বলে গণ্য হবে না এবং সেই বিবাহজাত সন্তানদের অবৈধ বলে মনে করা হবে না।। লেখকের উদ্ধৃতি, আমার বড় হরফ।] লক্ষণীয় , ইংরেজি এবং বাংলা দুটি ভাষাতেই কমন জেন্ডার শব্দ 'সন্তান' এবং 'issue'  ব্যবহৃত হয়েছে। আইনের পরিভাষার নিয়ম " Interpretation of statutes" অনুযায়ী --'এখানে সন্তান অর্থে কেবল পুত্রসন্তান বুঝিতে হইবে' এমন বলা না থাকলে পুত্র ও কন্যা দুটোই বোঝাবে।


    ২  যদি লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রব্যাখাকে সাহেবরা পাত্তা না দিয়ে থাকেন এবং সেই ব্যাখ্যার কলোনিয়াল প্রভুদের তৈরি আইনে কোন প্রভাব না পড়ে থাকে তাহলে তো দ্বিতীয় অভিযোগ স্বতঃ খারিজ হয়ে গেল। নানান লোক ওই আইন প্রণয়নের সময় পক্ষে বিপক্ষে নানান কথা বলে থাকেন, বিদ্যাসাগরও বলেছেন। সাহেবরা সেটাকে পাত্তা নাদিয়ে নিজেদের মত করে আইন বানিয়েছে। তাহলে কলোনিয়াল চক্রান্তে বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রব্যাখ্যার মাধ্যমে সহায়তার থিওরি কীভাবে দাঁড়ায়?


    ৩ শ্রীশচন্দ্রের বিবাহ নিয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার মত উৎকোচের তথ্যগত ভুল লেখক স্বীকার করে নিয়েছেন, এ'নিয়ে আর আলোচনার দরকার নেই।


    ৪ শ্রীশচন্দ্র দশ বছরের বিধবা কন্যা কালীমতীকে বিবাহ করলেন। এটি বাল্যবিবাহ এবং বিধবাবিবাহের গঙ্গা-যমুনা সঙ্গম বটে। কিন্তু শ্রীশচন্দ্রের  এটি প্রথম বিবাহ। কয়েকমাস পরে কালীমতী মারা গেলে উনি দ্বিতীয়বিবাহ করলেন। এটি বহুবিবাহ কী ভাবে? এক স্ত্রী জীবিত থাকতে  অন্য স্ত্রী বিবাহ করলে সেটি বহুবিবাহ। আজও অনেকে এক স্ত্রীর মৃত্যুর পরে দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তাহলে? 


    বাল্যবিবাহই বা কেন? লক্ষণীয়, এখানে কোন বালিকা কুমারী কন্যাকে বিয়ের কথা বলা হয়নি, বাল্যবিবাহ বিরোধী আইন তখনও পাশ হয়নি। দশ বছর তখনকার আইনে ন্যায্য বয়েস, আট বছরের গৌরীদান নয়। প্রশ্ন হোল ওই বালিকা আগে বিবাহ হয়ে বিধবা হয়েছে, বিধবা বিবাহ প্রচলন করতে গিয়ে বিধবা কীনা সেই কঠিন সময়ে সেটাই প্রথম বিবেচনীয়। অবশ্যই আদর্শ স্থিতি হত যদি বয়স্কা কোন বিধবা বিবাহে রাজি হতেন।


    ৫ কোন আইনের প্রয়োগ  যখন হবে বা তার অধীনের কোন নাগরিক যদি কোন রিলিফ বা সাহায্য চাইবে, তখন একমাত্র আইনে শব্দশঃ কী বলা হয়েছে তাই আদালতে বিবেচ্য হবে, বিদ্যাসাগরের ভাই শম্ভুচন্দ্র বা স্বয়ং বিদ্যাসাগর কী মনে করেন সেটা নয়।

  • এলেবেলে | ০৯ আগস্ট ২০২১ ০০:২৮496575
  • ওফ রঞ্জনবাবু, আমার জমানোর একটুও ইচ্ছে নেই! বস্তুতপক্ষে ধারাবাহিকভাবে আপনি যে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাতে আপনাকে অপার শ্রদ্ধা করা ছাড়া আমার দ্বিতীয় উপায় নেই। 


    ১. দেখুন আইন এবং তার ব্যবহারিক প্রয়োগে দুস্তর ব্যবধান। কাজেই আইনে স্ত্রীধনের নাম কা ওয়াস্তে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেটি বহু আগেই খ্যাঁচাং হয়ে গিয়েছিল। এমনকি আইনে 'স্ত্রীধন' বলে কোনও শব্দ পঞ্চম ধারাটিতে নেই। বরং বিষয়টিকে অনাবশ্যকভাবে জটিল করে তুলে 'অন্য কোনও সম্পত্তি বা স্বত্বে' মার্কা গোল গোল একটা অ্যা-ও হয় আবার ও-ও হয় মার্কা শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে।


    ২. সন্তানদের বৈধতা নিয়ে কোনও প্রশ্নই নেই। আইনে খোলাখুলিভাবে সেটা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পিতার সম্পত্তিতে কন্যাসন্তানের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে একটি অক্ষরও ব্যয় করা হয়নি। বিদ্যাসাগরের নিজস্ব পোলেমিক্স সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।


    ৩. শাসকরা এমন শাস্ত্রবচনের অপেক্ষা করছিল যাতে সাপও মরে অথচ লাঠিও না ভাঙ্গে। বিদ্যাসাগর প্রথমে দত্তকমীমাংসা থেকে চার ধরণের পুত্রের উদাহরণ তুলে ধরেন ও পরে মনুসংহিতা ভায়া পরাশর সংহিতা দিয়ে সেটাকে সাবস্ট্যানশিয়েট করেন। অর্থাৎ পিতার মৃত্যুর পরে তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাওয়ার প্রশ্নে তাঁর ও শাসকদের মনোভঙ্গিতে কোনও পার্থক্য দেখা যায় না। তিনি কেবল শাসকদের প্রার্থিত শ্লোক সরবরাহকারী মাত্র। 


    ৪. কলোনিয়াল হিন্দু আইনে না ছিল মিতাক্ষরা, না ছিল দায়ভাগ নিয়ে কোনও পৃথক উল্লেখ। দুটোকেই ঘেঁটে ঘ করে দেওয়া হয়েছিল। আশ্চর্যের কথা এই যে দুটি আইনের সঙ্গেই বাঙালি পণ্ডিতরা যুক্ত থাকলেও এবং বাংলায় দায়ভাগ প্রথা প্রচলিত থাকলেও ওই পণ্ডিতদের শাসকদের বিধান বা মনোবাসনা মেনে নিতে হয়েছিল। তাই কলোনিয়াল হিন্দু আইনে আলাদা করে মিতাক্ষরার উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক ও অবান্তর।


    ৫. হ্যাঁ, দশ বছর হলেও এবং তদানীন্তন সময়ে তা আইনসম্মত হলেও সেটি বাল্যবিবাহই বটে এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল কালীমতী অক্ষতযোনী। বিদ্যাসাগর কতজন ক্ষতযোনী বিধবার বিবাহ দিয়েছিলেন সে সম্পর্কিত কোনও তথ্য আমি পাইনি।


    ৫. আপনি নিজেই লিখেছেন শ্রীশচন্দ্র বিপত্নীক অথচ এখন লিখলেন এটি তাঁর প্রথম বিবাহ। কিন্তু তা তো নয়। বিপত্নীক অবস্থাতে আরেকটি বিবাহ করার বিষয়ে বিদ্যাসাগর পক্ষপাতী ছিলেন কি? কাজেই আদতে এটি বহুবিবাহই। এবং যাঁরা বিধবাবিবাহ করেছিলেন তাঁদের অধিকাংশই একাধিক বিবাহ করেছিলেন।


    আসলে প্রথম পর্বের প্রত্যেকটি অধ্যায় গুরুতে প্রকাশিত হলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব এখানে প্রকাশিত না হওয়ায় বিশেষত গুরুর পাঠকদের কাছে কিছুটা হলেও ভুল বার্তা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, আগের পর্বে আপনি মনুর যে একাধিক দণ্ডবিধির উল্লেখ করেছেন সেসব নিজামত আদালতে (মুঘল আমল বা ব্রিটিশ আমল নির্বিশেষে) কোনও গুরুত্বই পেত না। 


    আপনার অসামান্য পাঠ পর্যালোচনাটি বহু পাঠক পড়ছেন। তাই পাঠকদের সামান্য ধরতাই দিতে চাওয়া। তবে আর মুখ খুলছি না বাপু!!!

  • π | ০৯ আগস্ট ২০২১ ০০:৩৯496576
  • একটা খুচরো প্রশ্ন।  পূর্ব উত্তর পক্ষ যেমন চলছে চলুন, উত্তরোত্তর বাড়তে থাকুক।


    প্রশ্ন হল, বিপত্নীক আবার বিয়ে করলে সেটা বহুবিবাহ?   আর এতে সমস্যা কী?  মানে এর মধ্যে নিন্দনীয় কী আছে? 

  • এলেবেলে | ০৯ আগস্ট ২০২১ ০০:৫৪496577
  • না, খ-কে কথা দিয়ে ফেলেছি। একবার ঠিক আছে, কিন্তু আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে চাই না। 


    নিন্দনীয় এটাই যে বাল্যবিবাহ আর বহুবিবাহ সমাজে প্রচলিত থাকার কারণেই বিধবাবিবাহ সফল হতে পারেনি। মানে গোটাটাই গোড়া কেটে আগায় জল ঢালার প্রকল্পে পর্যবসিত হয়।


    বাল্যবিবাহ নিয়ে সারা জীবনে মাত্র একটি প্রবন্ধ লিখে বিদ্যাসাগর কেন চুপ করে যান, তার ব্যাখ্যা বইতে দেওয়া হয়েছে। আশা করি রঞ্জননবাবু সেটা পরবর্তী আলোচনায় আনবেন। একই ভাবে বহুবিবাহের গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়ে বিদ্যাসাগর কীভাবে ও কী ভাষায় শ্রদ্ধেয় তারানাথ তর্কবাচস্পতিকে ব্যক্তি আক্রমণ হানেন, সেটিও দুটি অধ্যায় জুড়ে বিস্তারিরভাবে আলোচিত হয়েছে। রঞ্জনবাবু সেই প্রসঙ্গটিও নিশ্চয়ই আলোচনায় আনবেন।

  • ইয়ে | 23.106.56.52 | ০৯ আগস্ট ২০২১ ০২:১২496578
  • সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপকের কাজ নিজে না নিয়ে বন্ধু তারানাথ তর্কবাচস্পতিকে দিতে হেঁটে কালনা গেছিলেন বিদ্যাসাগর।


    https://www.bongodorshon.com/home/story_detail/friendship-between-ishwarchandra-vidyasagar-and-taranath-tarkabachaspati


    "ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপনা করার সময় বিদ্যাসাগরের কাছে সুযোগ আসে সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করার। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তাঁর বেতন ছিল পঞ্চাশ টাকা। আর সংস্কৃত কলেজ তাঁকে দিতে চেয়েছিল ৯০ টাকা। কিন্তু বিদ্যাসাগর নিলেন না সে চাকরি। অধ্যক্ষ মার্শেল সাহেবকে বললেন, তাঁর চেয়ে ঢের বেশি জ্ঞানী পণ্ডিত ‘সর্ববিদ্যাবিশারদ এবং অদ্বিতীয় বৈয়াকরণিক’ তারানাথ তর্কবাচস্পতি মহাশয়। ওই পদ তাঁরই পাওয়া উচিত। কিন্তু হাতে সময় মাত্র একদিন। বিদ্যাসাগর এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে পড়লেন কালনার পথে৷ ডিসেম্বরের প্রবল শীত। দিনটি ছিল শনিবার। পদব্রজে কালনা পৌঁছালেন বিদ্যাসাগর। সেখানে তারানাথ তখন চতুষ্পঠীতে ছাত্রদের পাঠদানে ব্যস্ত। কিন্তু ঈশ্বরের অনুরোধ ফেরাতে পারলেন না। ছ-মাসের জন্য সংস্কৃত কলেজে পড়াতে রাজি হলেন।"


    তাহলে বন্ধুত্ত্বে চিড় ধরল কেন? কেন লিখে বসলেন -


    “এত কাল পরে সব ভেঙ্গে গেল ভূর।
     হতদর্প হৈলে বাচস্পতি বাহাদুর।।
    সকলের বড় আমি মম সম নাই।
    কীসে এই দর্প কর ভেবে নাহি পাই।।
    অতি দর্পে লঙ্কাপতি সবংশে নিপাত।
    অতি দর্পে বাচস্পতি তব অধঃপাত”।।


    "কিন্তু এই নিবিড় বন্ধুতায় হঠাৎ একদিন চির ধরে। বহুবিবাহ বন্ধ করার উদ্যোগ করছেন তখন বিদ্যাসাগর। হঠাৎ একদিন দেখলেন, যেসব পণ্ডিত মানুষ তাঁর এই কাজের বিরোধী তাদের মধ্যে অন্যতম তারানাথ তর্কবাচস্পতি মহাশয়। বহুবিবাহের পক্ষে এবং বিদ্যাসাগরের বিপক্ষে প্রথম পাঁচটির একটি স্বাক্ষর তারানাথের। প্রকাশ্য সভায় তারানাথ তখন বিদ্যাসাগর-বিরোধী বক্তব্য রাখছেন। আর বলছেন, বহুবিবাহ শাস্ত্রসম্মত। ক্ষুব্ধ বিদ্যাসাগরও লিখে ফেলছেন ব্যঙ্গাত্মক লেখা। এতদিনের চেনা মানুষের পাণ্ডিত্য ও বুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এতদিনের বন্ধুত্বের তাপ নিভে আসছে ক্রমশ।


    নারীশিক্ষা প্রচলনের সময়ও বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বিদ্যাসাগরকে। কিন্তু বহুবিবাহ রদের ক্ষেত্রে যেন অনেকবেশি আক্রমণাত্মক তিনি। শুধু যুক্তি না। শুধু শাস্ত্রীয় বচন নয়। ব্যক্তি-আক্রমণও প্রবল হয়েছিল তাঁর লেখায়।


    ক্রমশ দেখা যায় তাঁদের বন্ধুতার আখ্যানগুলি ফিকে হয়ে আসতে থাকে। স্ত্রীশিক্ষা প্রচলনের সময় যে বন্ধুতার কারণে লড়াইয়ে অনেক জোর পেয়েছিলেন তিনি, বহুবিবাহে তাঁর সঙ্গেই বিরোধিতায় জড়াতে হয়। লড়াই যেন আরো কঠিন হয়ে ওঠে বিদ্যাসাগরের কাছে। তাই কি এত ব্যঙ্গ?

    ইতিহাসে বন্ধুবিচ্ছেদ বিরল নয়। তবে এই বন্ধুবিচ্ছেদ যেন সময়েরই এক আখ্যান। ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে যে সময়টা এগোচ্ছিল, যে সমাজটা এগোচ্ছিল- তারই দলিল এই বন্ধুবিচ্ছেদটিও।"
  • সে | 2001:171b:c9a7:d3d1:7133:71a5:6465:bb48 | ০৯ আগস্ট ২০২১ ০৩:১১496579
  • রঞ্জনদা খুব সুন্দর করে আইনের রেফারেন্স এনে বুঝিয়েছেন জিনিসগুলো। 


    সন্তানের বৈধতা অবৈধতা নিয়ে যে কচকচি চলেছে সেটা গৌন। বিধবা নিজে একজন মানুষ, সেটাই প্রাথমিক ব্যাপার। বিদ্যাসাগর যে উদ্দেশ্যেই বিধবাবিবাহ আইন পাশের ব্যবস্থা করে থাকুন না কেন, তাঁকে সাধুবাদ জানাই। 

  • সে | 2001:171b:c9a7:d3d1:7133:71a5:6465:bb48 | ০৯ আগস্ট ২০২১ ০৩:১৪496580
  • এই লেখাগুলো পড়বার পরে মূল বইটি পড়বার আর এতটুকুও আগ্রহ রইল না।

  • Amit | 121.200.237.26 | ০৯ আগস্ট ২০২১ ০৩:২৬496581
  • "বাল্যবিবাহ আর বহুবিবাহ সমাজে প্রচলিত থাকার কারণেই বিধবাবিবাহ সফল হতে পারেনি"- এলেবেলা-দা র এই ​​​​​​​স্টেটমেন্ট ​​​​​​​টা ​​​​​​​যদি মেনে ​​​​​​​নিতেও চাই , তাহলেও কিন্তু ​​​​​​​বলতে ​​​​​​​হয় ​​​​​​​অন্তত একটা মেজর প্রথম স্টেপ বিদ্যাসাগর নিয়েছিলেন। হিন্দু ​​​​​​​বা ভারতীয় সমাজে বা প্রথায় যে পরিমান ডিসক্রিমিনেশন  মিশে আছে ইভেন আজকের দিনেও, তখনকার কথা ছেড়ে দ্যান , তাতে একটা লোকের পক্ষে সব জমা জঞ্জাল সাফ করা সম্ভব -? বরং এটাই লজ্জার যে সেই সময় তার পাশে দাঁড়িয়ে আরো অনেকে সেই বাকি কাজগুলো এগোতে চেষ্টা করেননি। 


    আজকের দিনে র প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তখনকার কালের যেকোনো কিছুর পোস্ট মর্টেম করা সহজ যে আরো কি কি করলে আরো ঠিক ঠিক হতে পারতো সব  কিছু।  কিন্তু তখনকার সেই ডার্ক এজে দাঁড়িয়ে আর ওরকম এডভার্সিটি র সামনে রুখে সেই কাজটা করে ফেলা অতটা সোজা নয়। গ্লাস হাফ খালি দেখলেও সেটা কিন্তু অর্ধেক ভর্তি। 


    ভাবছি একদিকে রঞ্জনদা আর অন্যদিকে এলেবেলেদা -এনাদেরকে আদালতে এই সাবজেক্টের ওপর বাদী বিবাদী পক্ষের উকিল সাজিয়ে একটা ওয়েব সিরিজ বানালে কিরকম এক্সসাইটিং হবে ব্যাপারটা :) পুরো সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি দুদিকেই তীক্ষ্ণ যুক্তি আর অবসেরভেশনস। তবে সত্যের খাতিরে বলে ফেলি আমার বায়াস টা একটু হলেও রঞ্জনদার লেখাটার প্রতি। কারণটা অলরেডি বলেছি ওপরে। 

  • এলেবেলে | ০৯ আগস্ট ২০২১ ০৭:১৪496582
  • ওরে বাবা অমিত, আমাকে রক্ষা করুন। রঞ্জনবাবু দুঁদে উকিল, নিজের কেস নিজেই লড়েছেন। সেখানে আমি ডাঁহা হেরে যাব। আপনার ওয়েব সিরিজ ফ্লপ করবে! তবে কি না Lucy Carrolজানিয়েছেন, নিম্নবর্ণ বিশেষত শূদ্র তথাকথিত অস্পৃশ্যসমাজেযাঁরা হিন্দু জনসংখ্যার প্রায় ৮০% – বাল্যবিবাহও প্রচলিত ছিল না, বিধবাদের পুনর্বিবাহ প্রথাও নিষিদ্ধ ছিল না। এই আইনে তাঁদের কী হাল হয়েছিল সেই বিষয়ে রঞ্জনবাবু যদি আলোচনা করেন কিংবা গুরুচরণ মহলানবিশের বিধবা স্ত্রী বা মুচিরাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধবা স্ত্রী বিধবা সর্বোপরি একজন মা-নু-ষ ছিলেন কি না, সেই নিয়ে যদি দু-চার কথা লেখেন, তাহলে গোটা চিত্রটা স্পষ্ট হলেও হতে পারে। 

  • Ranjan Roy | ০৯ আগস্ট ২০২১ ১০:০৩496589
  • না , কোন নারদ নারদ খেলায় আমার আগ্রহ নেই। আমি কাউকে হারিয়ে বা কোন ব্রাউনি পয়েন্ট স্কোর করতে চাইনে। আমি চাইছি এনগেজমেন্ট, ডায়লাগ। যার মধ্য দিয়ে আমার সীমাবদ্ধতা দেখতে পাব, ফলে ঋদ্ধ হব। 


    ইন  এ লাইটার ভেন,  আমি ও এলেবেলে  আদৌ বিদ্যাসাগর/তারানাথ তর্কবাচস্পতি নই। কাজেই আমাদের মতান্তর হলেও মনান্তর হবে না। পারস্পরিক প্রীতির সম্পর্ক অটুট থাকবে ও নিবিড় হবে।


    @ সে,


    এই বিতর্কের ফলে বইটি না পড়লে মস্ত ভুল করবেন। বইটি একটি আকর গ্রন্থ। যেমন প্রতিভা সরকার বলেছেন-একজায়গায় এত তথ্য  সহজে পাবেননা।  একটি ঐতিহাসিক সময়ের প্রেক্ষিত জানতে বুঝতে বারবার এই বইটির পাতা ওল্টাতে হবে। কারণ ইতিহাসের বিচার অত সহজে হ্যাঁ/না বাইনারিতে হয় না। ফলে চাইব সবাই যদি বইটি পড়েন। লেখকের কনক্লুশনের সঙ্গে একমত হোন বা না হোন।


    একটি সুন্দর বাগানবাড়ি নতুন তৈরি হয়েছে। আমি খালি খুঁজে খুঁজে দেখছি কোথায় লীক করছে, জল আটকাচ্ছে, প্লাস্টিক পেইন্টের কোটিং  এর দাগ মিলছেনা ব্যস্‌।এর  থেকে গোটা বাড়ির সৌন্দর্য্যের বিচার হবেনা।

  • Ranjan Roy | ০৯ আগস্ট ২০২১ ১০:২৫496592
  • বাল্যবিবাহ /বহুবিবাহ নিয়ে   আমার বক্তব্যঃ


    ১  ইতিহাসপুরুষদের মূল্যায়ন দু'ভাবে হওয়া উচিত।


      ক) বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের কতখানি আজ গ্রহণযোগ্য? তাঁদের কোন কোন আচরণ বা মূল্যবোধ আজকে আমরা নিজের জীবনে নেব অথবা নেব না? এলেবেলে এই জায়গাটা ভালই ধরেছেন।


      খ) বেশি গুরুত্বপূর্ণ হোল তাঁরা তাঁদের সময়ের প্রেক্ষিতে সমাজকে এগিয়ে দিলেন অথবা পিছিয়ে দিলেন? এবং কীভাবে?


    -- এই জায়গাটা এলেবেলে অগ্রাহ্য করছেন।


    যেমনঃ  সে যুগের শ্রেষ্ঠ বাঙালী চরিত্র রবীন্দ্রনাথ যখন বিয়ে করলেন ( ৯ই ডিসেম্বর, ১৮৮৩) তখন তাঁর বয়েস ২২ এবং স্ত্রী মৃণালিনীর( ভবতারিণী দেবী) ৯। উনি বিদ্যাসাগরের চেয়ে ৪১ বছরের ছোট। আর তখন, মানে প্রায় ২০ বছর আগে ভারতীয় দন্ডবিধি অনুযায়ী  ১০ বছরের ছোট মেয়েকে বিয়ে করলে রেপ ধরা হবে--এমন আইন পাশ হয়ে গেছে।


      সেখানে কালীমতী দেবীর (প্রথম বিধবাবিবাহ) দশ বছরে বিধবাবিবাহকে (১৮৫৬) বাল্যবিবাহের দায়ে বিদ্যাসাগরের অপরাধ ধরতে হবে? 


    বহুবিবাহ মানে এক স্বামীর একই সঙ্গে একাধিক জীবিত পত্নী, যা আপনি কুলীন প্রথার আলোচনায় ভাল ভাবে দেখিয়েছেন। কিন্তু শ্রীশচন্দ্র ও কালীমতীর বিবাহ কোন হিসেবে বহুবিবাহ?


    "বাল্যবিবাহ আর বহুবিবাহ সমাজে প্রচলিত থাকার কারণেই বিধবাবিবাহ সফল হতে পারেনি"-- সুইপিং জেনারাইলিজেশন!


    নইলে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিরোধক আইন প্রণয়নের পর বিধবাবিবাহের হিড়িক পড়ে যেত।


    যাকগে, এসব নিয়ে বিস্তারিত দুইপক্ষ হবে পরের কিস্তিতে।

  • সে | 193.192.231.218 | ০৯ আগস্ট ২০২১ ১১:২৪496593
  • বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহ আজও সমাজে প্রচলিত। এসবের বিরুদ্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও দিব্যি হয়ে চলেছে। বিধবাবিবাহ ও হয়। কাজেই বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ যেমন আজও পুরোপুরি রোধ করা যায় নি, তার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে দোষ দেওয়াটা মূর্খামি। 


    বাল্যবিবাহ দেওয়া ও বহুবিবাহ করা কোনও কোনও ক্ষেত্রে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, আইনের ধারায় সেসবের জন্য শাস্তি আছে। তবুও তা হয়ে চলেছে। যে রেটে বাল্যবিবাহ হয়, সেই রেটে কি বিধবাবিবাহ হচ্ছে? 


    কুলীনরা সেকালে বাচ্চা মেয়েদের বিয়ে করত শোনা যায়, একটা বুড়ো কুলীন মরলে অনেকগুলো শিশু বিধবা হয়ে কষ্টে অর্ধাহারে জীবন কাটাতে বাধ্য হতো। সেটার হাত থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য তিনি বিধবাবিবাহের পক্ষে কাজ করেছিলেন— সেটা খারাপ? ঐ বাচ্চা বাচ্চা বিধবা মেয়েগুলোর স্ত্রীধন বা মৃতস্বামীর সম্পত্তি কটা কেসে তারা হাতে পেতো? অর্ধাহারে বা অনাহারে থাকা কুলীন বিধবাদের কি ভালভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নেই? বিধবা বিবাহের আইন পাশ করিয়ে সে পথ খুলে দেওয়ার মধ্যে দোষটা কোথায়? কলোনিয়াল প্রভুর সাহায্য নিয়েছেন, বেশ করেছেন। তবে সমাজে আইন বদলানো গেলেও মানুষ বদলানো যায় না। তাই আজও বিধবা বিবাহ তেমন হেশি হয় না। 


    মৃত স্বামীর প্রপার্টি পাওয়া না পাওয়ে নিয়েও ক্যাচাল আছে। ঐটে করতে গেলে তখনকার দিনে বাচ্চা বিধবাকে পুনর্বিবাহের আগেই হয়ত মেরে ফেলতে পারত শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। নারীহত্যার ট্র্যাক রেকর্ড তো মন্দ নয় বঙ্গদেশে।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন