• বুলবুলভাজা  পড়াবই  প্রথম পাঠ

  • বীরসিংহের সিংহশিশু বিদ্যাসাগর বীর: পাঠ-প্রতিক্রিয়া (৯)

    রঞ্জন রায়
    পড়াবই | প্রথম পাঠ | ২৯ আগস্ট ২০২১ | ৫২৬ বার পঠিত

  • ১১.০ বাকি সমালোচনাগুলো

    বিদ্যাসাগর ১২৭৭ বঙ্গাব্দের ২৭শে শ্রাবণ নিজের একমাত্র পুত্র নারায়ণের সঙ্গে জনৈক বিধবা কন্যার বিয়ে দিলেন। ছোটভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নকে লিখলেন-

    “বিধবাবিবাহ-প্রবর্তন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম। ----- এ বিষয়ের জন্য সর্বস্বান্ত হইয়াছি এবং আবশ্যক হইলে প্রাণান্ত স্বীকারেও পরাঙ্মুখ নহি”।[1]

    এখানে লেখক বলছেন যে বিদ্যাসাগর বইয়ের ব্যবসায় লেখক, মুদ্রক ও প্রকাশক হিসেবে যে অর্থ উপার্জন করেছিলেন তা  বিলাসব্যসনের বদলে বিধবাবিবাহের জন্য ব্যয় করার পরেও জীবনের একটা পর্বে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু “তিনি যখন নিজেকে ‘বিধবাবিবাহের প্রবর্তক’ বলেন, তখন সামান্য সংশয় জাগে”।[2]

    ১১.১  বিধবাবিবাহের প্রবর্তক কে?

    পূর্বপক্ষ


    • বিদ্যাসাগরের  প্রচেষ্টার প্রায় একশ’ বছর আগের একটি ঘটনা। রাজা রাজবল্লভ  তখন ঢাকার নবাব ও প্রভূত -ক্ষমতাশালী । নিজের মেয়ের অকালবৈধব্যে ব্যথিত হয়ে  তিনি তার বিয়ে দিতে চাইলেন। বিভিন্ন রাজ্যের পণ্ডিতদের থেকে অভিমত পেলেন যে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত। নবদ্বীপের প্রধান পণ্ডিতেরা গোপনে বললেন ‘এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ শাস্ত্রসম্মত’।[3] কিন্তু ব্রাহ্মণ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের চাতুরিতে তাঁরা প্রকাশ্যে সম্মতি দিলেন না। ফলে রাজার বিধবা মেয়ের বিবাহ হল না।
    •   ‘পণ্ডিতেরা যে বিধবাবিবাহকে শাস্ত্রসম্মত বলে বহু আগেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন রাজবল্লভের ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়’। কাজেই বিদ্যাসাগরকে বিধবাবিবাহের ‘প্রবর্তক’ বলা কতদূর যুক্তি সংগত?
    • রাজা রাজবল্লভ তাঁর বিধবা কন্যার পুনর্বিবাহের জন্যে বিভিন্ন রাজ্যের এমনকি বারাণসীর পণ্ডিতবর্গের পক্ষ থেকে যে শাস্ত্রপ্রমাণটি—‘নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে—” ইত্যাদি সংগ্রহ করেছিলেন, তার উল্লেখ রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ ডিরোজিওর শিষ্যদের ১৮৪২ সাল থেকে প্রকাশিত বেঙ্গল স্পেক্টেটর-এই প্রথম করা হয়। শিবনাথ শাস্ত্রী জানিয়েছেন।[4]
    • অথচ বিদ্যাসাগরের “বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব” পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে।

    উত্তরপক্ষ

    এটা বড্ড ছেলেমানুষি হয়ে গেছে।

    • একশ’ বছর আগে একজনের প্রয়াস সত্ত্বেও বিবাহ হল না। পণ্ডিতেরাও প্রকাশ্য সভায় বিধবাবিবাহকে শাস্ত্রসম্মত বলতে রাজি হলেন না।
    • দ্বিতীয়জন একশ’ বছর পরে , যখন পক্ষে বিপক্ষে তর্কের ঝড় বইছিল,তখন শাস্ত্রসম্মত যুক্তি দিয়ে পণ্ডিতদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হলেন। দেশব্যাপী বিতর্ক তুললেন, বই লিখলেন। পাঁচ হাজার কপি ছাপিয়ে জনসাধারণের মধ্যে প্রচারে লিপ্ত হলেন এবং লেজিস্লেটিভ কাউন্সিলের ওজনদার সদস্যদের  সঙ্গে আলোচনা করে অনুকূলে মতামত তৈরির প্রয়াস চালিয়ে গেলেন। শেষে সরকার আইন পাশ করল, নিজের একমাত্র ছেলের বিয়ে দিলেন একটি বিধবা কন্যার সাথে এবং অনেকগুলো বিধবাবিবাহের আয়োজনে এবং পাত্রদের ইন্সেন্টিভ দিয়ে আর্থিক রূপে ঋণগ্রস্ত হলেন। তিনি বিধবাবিবাহের প্রবর্তক নন, প্রথমজন প্রবর্তক?
    • লেখক নিজে বলছেন, ‘এবিষয়ে বিদ্যাসাগরের উদ্যমী হওয়ার বহু আগে, বহু জনের বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মূলত হিন্দু উচ্চবর্ণের ক্ষুদ্র অথচ প্রচণ্ড প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আপত্তিতেই যে বিধবাবিবাহ প্রচলন করা যায়নি, তা পরিষ্কার বোঝা যায়’।[5] তাহলে যিনি আইন প্রণয়নে সহায়তা, এবং একমাত্র পুত্রের বিধবাবিবাহ করানোর সাহস দেখালেন তিনি প্রবর্তক নন? স্বপন বসুর ‘সমকালে বিদ্যাসাগর’ বইয়ে সমসাময়িক পত্রিকার সাক্ষ্য থেকে জানা যাচ্ছে ৬০ টি বিধবাবিবাহে খরচ হয়েছিল ৮২,০০০ টাকা, কিন্তু বাস্তবে চাঁদা উঠল ৪৭,০০০ টাকা। বাকি ৩৫,০০০ টাকা বিদ্যাসাগরকে কিস্তিতে কিস্তিতে শোধ করতে হয়, সুদের টাকা ৫,০০০ অতিরিক্ত।[6]

    খেয়াল করার বিষয়-- বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনের পেছনে কোন ব্যক্তিগত দায় বা মোটিভ, যেমন রাজা রাজবল্লভের মত নিজের কন্যার অকালবৈধব্য দূরীকরণ, ছিল না।

    ১১.২    বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রপ্রমাণে ভুল ব্যাখ্যা?

    পূর্বপক্ষ

    বিধবাবিবাহ যে শাস্ত্রসম্মত সেটা প্রমাণ করতে বিদ্যাসাগর আশ্রয় নিয়েছিলেন যে বচনের সেটা হল পরাশরসংহিতার চতুর্থ অধ্যায়ের শ্লোক (৪.২৭-২৯)-

    নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।

      পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্যো বিধীয়তে”।।

    বিদ্যাসাগরের অনুবাদে “স্বামী অনুদ্দেশ হইলে, মরিলে, ক্লীব হইলে, সংসারধর্ম পরিত্যাগ করিলে, অথবা পতিত হইলে, স্ত্রীদিগের পুনর্বার বিবাহ করা শাস্ত্রবিহিত”।

    কিন্তু স্মৃতিশাস্ত্রে অগাধ পণ্ডিত অধ্যাপক অর্জুনদেব সেনশর্মা সঠিক ভাবেই দেখিয়েছেন যে বিদ্যাসাগর তাঁর অনুবাদে এই ‘শ্লোকের কুঞ্চিকা বা চাবি’ শব্দবন্ধ পঞ্চস্বাপৎসু শব্দটি এড়িয়ে গেছেন।[7]

    অর্থাৎ, কোন নারীর পুনর্বিবাহ কেবল উক্ত পাঁচটি আপদ বা অপবাদের ক্ষেত্রেই বিধেয়। এটি সাধারণ নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম মাত্র।

    উত্তরপক্ষ

    আমি লেখকের এই আপত্তিটি বিধবাবিবাহের সন্দর্ভে বুঝতে অপারগ। ধর্মশাস্ত্র (পরাশর সংহিতা) অনুযায়ী নারীর দ্বিতীয় বিবাহ নিঃসন্দেহে  সাধারণ নিয়ম নয়, অপবাদ স্বরূপ। তাতে কী? স্বামীর মৃত্যু বা নিরুদ্দেশ বা ক্লীব হওয়াই কি সাধারণ নিয়ম? সেও তো অপবাদ স্বরূপ।

    বিদ্যাসাগর পঞ্চস্বাপৎসু শব্দের  আলাদা করে অর্থ করেননি, কিন্তু ওই পাঁচটি শর্তের স্পষ্ট নাম নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে এটি সাধারণ নিয়ম নয়। প্রশ্ন একটাই—ওই পাঁচটি শর্তের মধ্যে বিধবা হওয়া বা পতির মৃত্যু (মৃতে) শর্তটি আছে না নেই?

    ১১.৪ বাল্যবিবাহ নিবারক আইন  ও বিদ্যাসাগর

    স্বপন বসু তাঁর “সমকালে বিদ্যাসাগর” বইয়ে জানাচ্ছেন যে  বিধবাবিবাহ প্রবর্তন ও বহুবিবাহ নিবারণের জন্য তাঁর প্রয়াস তাঁর সমকালীন সমাজে প্রচণ্ড আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু  এদু’টি ছাড়াও উনিশ শতকের বহু সমাজসংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে বিদ্যাসাগর কোন না কোন ভাবে যুক্ত ছিলেন।

    তাঁর সমাজসংস্কারমূলক প্রথম লেখা ১৮৫০ সালে ‘সর্বশুভকরী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ প্রবন্ধ। ‘পরবর্তী কালে সমাজসংস্কারের ইস্যুতে বারবার শাস্ত্রের দোহাই দিলেও এই লেখাটিতে বাল্যবিবাহ যে ‘অতিশয় নির্দয় ও নৃশংসের কর্ম’ তা প্রমাণ করতে তাঁকে শাস্ত্রের মুখ চাইতে হয়নি। এই বিষয়ে তাঁর আরও লেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পরবর্তী ৪১ বছর জীবিত থাকার সময় একবারও এই নিয়ে কিছু লেখেননি। উনি নিজের মেয়ের বাল্যবিবাহ দেননি। ছেলের বিধবাবিবাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ৪১ বছর জীবিত থাকার সময় একবারও এই নিয়ে কিছু লেখেননি।

    লেখক বলছেন, “সুতরাং ১৯২৯ সালে পাশ হওয়া বাল্যবিবাহ নিবারক আইনের ক্ষেত্রে তাঁর কোনও ভূমিকাই নেই”।[8]

    কিন্তু কেন লেখেননি? স্বপন বসুর লেখা থেকে অনুমান -এক, ওঁর এই লেখাটি সমসাময়িক সমাজে কোন আলোড়ন তোলেনি, পক্ষে-বিপক্ষে কোন বাদ-প্রতিবাদ হয়নি। দুই, সেই সময় বাল্যবিবাহের নিন্দা করে প্রচুর লেখা, পত্রিকা প্রকাশ, সভা এবং সমিতি গঠন হচ্ছিল। তাতে অনেক গোঁড়াপন্থীরাও যুক্ত। এই ইস্যুতে তেমন বিরোধও হয়নি।[9]

    কিন্তু উনি একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিলেন না সেটা কয়েক দশক পরে  সহবাস সম্মতি আইন, ১৮৯১ প্রণয়নে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা খেয়াল করলেই বোঝা যায়। বাস্তবে সহবাস সম্মতি আইন বাল্যবিবাহ বন্ধ করার প্রথম ধাপ। এ’বিষয়ে আমরা প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক মীরা কোসাম্বির বক্তব্যটি একটু পরেই দেখব।

    ১১.৫ সহবাস সম্মতি আইন ও “তোমার মানবতা নাই বিদ্যাসাগর”?

    লেখক দ্বিতীয় ভাগের অষ্টম অধ্যায়ের শীর্ষক হল “বাল্যবিবাহ ও সহবাস সম্মতি আইন, শাস্ত্র! শাস্ত্র! তোমার মানবতা নাই বিদ্যাসাগর”? বেশ ক্রুদ্ধ সম্ভাষণ! হতেই পারে। দেখা যাক ক্রোধ কতটা যুক্তিযুক্ত। এটা খেয়াল করার ব্যাপার যে বাল্যবিবাহ, সহবাসে সম্মতি ও বিধবাবিবাহ সবই এক সূত্রে গাঁথা; সবই নারীর নিজদেহের উপর নিজের অধিকারের প্রশ্ন, যা কিছুদিন আগেও ভারতীয় পিতৃতান্ত্রির সমাজে স্বীকৃত ছিল না। আজও ‘নো মিনস নো’ ম্যাক্সিম আইনে স্বীকৃত হয়নি। তাই ডোমেস্টিক রেপ বা বিবাহিত নারীর স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ-- ভারতীয় আইনে স্বীকৃত নয়, বিয়ে মানেই সহবাসে সম্মতি! এবং রেস্টোরেশন অফ কনজুগাল রাইটের ধারা অনুযায়ী দম্পতির কোন একজন অপরজনকে আদালত থেকে সহবাসের নির্দেশ দেওয়াতে পারে। আইনে দু’জনেরই এই অধিকার আছে, কিন্তু বাস্তবে শুধু স্বামীরাই এই অধিকার প্রয়োগ করে থাকে।

    উপরোক্ত পৃষ্ঠভূমিতে আমরা আগে সেই সময়ের আইনগুলো একনজরে দেখে নিই। তখন ভারতে বাল্যবিবাহ নিয়ে কোন আইন বা প্রথা কেমন ছিল?

    বাল্যবিবাহ, সহবাসের সম্মতির বয়স ও বহুবিবাহ নিয়ে আইন এবং প্রথা

    দেড় বা দুশো বছর আগের ইংল্যান্ড হোক কী ভারত, মেয়েদের নিজের শরীরের উপর কোন অধিকার ছিল না। বিশ্বের সর্বত্র সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রচলিত ছিল। মেয়ে বিয়ের আগে পিতার সম্পত্তি, বিয়ের পর স্বামীর। তাই ইংল্যান্ডে যেমন দশ বছরে শাস্ত্র মেনে বিয়ে হত, তেমনি ভারতে এবং বঙ্গে, বিশেষ করে কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে ছিল গৌরীদানের ঘটা, মানে আট বছরের বালিকাকে কন্যাদান করে পুণ্য অর্জন। পরাশর, মনু ,কাশ্যপ সবাই মনে করেন কন্যা রজঃস্বলা হবার আগে বিয়ে না দিলে পাপ হবে। আর বারো বছরের মেয়ে ঘরে অবিবাহিত রাখলে  মাতা-পিতা ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নরকে যাবেন। (পরাশর, ৭.৬.৯)।

    মহামহোপাধ্যায় পি ভি কাণে জানাচ্ছেন যে ইংল্যান্ডে বিবাহযোগ্য পাত্র ও পাত্রীর বয়স যথাক্রমে ১৪ এবং ১২  থেকে বাড়িয়ে উভয়ের জন্যে ১৬ করা হল ১৯২৯ সালে, তার আগে নয়।[10]

    ভারতে প্রথম বাল্যবিবাহ নিবারণ আইন পাশ হল ১৯২৯ সালের ১ অক্টোবরে। তাতে মেয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৪ ও ছেলের ১৮ ঠিক করা হল। এই আইন ১৯৪৯ সালে সংশোধিত হয়ে মেয়ের বয়স বাড়িয়ে ১৫ করে দিল। তারপর ১৯৭৮ সালে বড় পরিবর্তন করে মেয়ের ১৬ এবং ছেলের ২১ করা হল। গত ২০০৬ সালে আগের আইনটি পুরোপুরি বাতিল করে প্রণয়ন করা হল নতুন আইন দ্য প্রহিবিশন অফ চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট, যাতে মেয়ের বিবাহযোগ্য ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং ছেলের ২১ করা হল।

    কিন্তু এখনও প্রতিবছর গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে গৌরীদানের পুণ্যার্জনের লোভে বাপ-মা বালিকার বিবাহ দেয়। তাই ২০০৬-এর আইনে বিশেষ ধারা রয়েছে, যাতে কীভাবে ল অফিসার ও কালেক্টরদের এইসব আয়োজনের আগে থেকেই সতর্ক থেকে এ’ধরনের বিয়ে আটকাতে হবে, যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে তার উল্লেখ রয়েছে। যেমন এক্ষেত্রে মেয়েটির কোন শাস্তি হবে না। কিন্তু বালিকা বধূর স্বামী, দু’পক্ষের বাপ-মা ও যারাই জেনে শুনে এই বিয়েতে সহায়তা করবে সবাই শাস্তিযোগ্য, অন্তত দু’বছর জেলের ঘানি টানতে হবে। আবার জনতার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রচার চালাতে হবে।

    সহবাস নিয়েও শাস্ত্রের বিধান ছিল রজঃস্বলা হলে স্বামীকে ‘গর্ভাধান’ করতে হবে। তখন প্রচলিত ছিল বাল্যবিবাহ। লেখক সঠিকভাবেই তুলে ধরেছেন মনুর বিধানে তিরিশ বছরের মুশকো জোয়ান বারো বছরের বালিকাকে বিয়ে করবে এবং চব্বিশ বছরের যুবক আট বছরের বাচ্চা মেয়েকে(মনু, ৯/৯৪)। তাই পুরুষের পশুপ্রবৃত্তির ফলে বালিকা বধূর শারীরিক নিগ্রহ এবং প্রাণনাশ অস্বাভাবিক ছিল না।

    এ’নিয়ে  প্রথম আইন হয় ১৮২৮ সালে, যাতে আট বছরের কম বয়সী স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসংসর্গকে ফৌজদারি আইনের আওতায় আনা হয় এবং অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেওয়া হয়।  এরপর ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রথম ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বা ফৌজদারি আইন প্রণয়ন করা হয়। তার ৩৭৫(৫) ধারা অনুযায়ী দশ বছরের কম বয়সের স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক ( স্ত্রীর সম্মতি/অসম্মতি ব্যতিরেকে) বলাৎকার বলে বিবেচিত হবে।[11]

    কিন্তু ১৮৯০ পর্যন্ত বেশ কিছু ঘটনা আদালতে এলেও বিচারকেরা লঘু শাস্তি দিয়েছিলেন।[12]  এরপর ১৮৯০ সালের ১৫ জুন ৩৫ বছর বয়সী স্বামীর সহবাসের ফলে তাঁর দশ বছরের বেশি বয়সের বালিকা স্ত্রী ফুলমণি মারা যায়। কিন্তু মেয়েটির বয়স দশের বেশি হওয়ায় স্বামী হরিমোহনকে বলাৎকারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায়নি।[13] এই ঘটনায় বঙ্গে বিশাল আলোড়নের সৃষ্টি হয়। ১৯ মার্চ ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ইন্ডিয়ান পেনাল কোড ১৮৬০ এবং ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড ১৮৮২র সংশোধন হিসেবে সহবাস সম্মতি আইন প্রণয়ন হয়। তাতে দশের জায়গায় বারো বছরের কম বয়সের মেয়ের (বিবাহিত বা কুমারী)সঙ্গে সহবাস ধর্ষণ গণ্য করা হবে বলা হল। অর্থাৎ বারোবছরের কম বয়সের বালিকার সহবাসে সম্মতির অধিকার নেই। এই আইন খারিজ হল ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি, অর্থাৎ স্বাধীন ভারতের সংবিধানের সঙ্গে।

    ১৮৫০ সালে বিদ্যাসাগর লেখেন সমাজসংস্কার নিয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ- ‘বাল্যবিবাহের দোষ’। তাতে বিদ্যাসাগরের অবস্থান কী ছিল?

    লেখক বলছেন, “বাল্যবিবাহের করুণ পরিণতির জন্য মানুষের শাস্ত্রের প্রতি অগাধ বিশ্বাসকে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ করে শুরুতেই বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন-

    অষ্টমবর্ষীয় কন্যা দান করিলে পিতা-মাতার গৌরীদানজন্য পুণ্যোদয় হয়, নবম বর্ষীয়াকে দান করিলে------ ইত্যাদি স্মৃতিশাস্ত্র প্রতিপাদিত কল্পিত ফলমৃগতৃষ্ণায় মুগ্ধ হইয়া পরিণাম-বিবেচনা-পরিশূন্য চিত্তে অস্মদ্দেশীয় মনুষ্যমাত্রেই বাল্যকালে পাণিপীড়নের প্রথা প্রচলিত করিয়াছেন।[14]
    এবং
    “যে সময়ে লালন পালন শরীর সংস্কারাদি দ্বারা পিতা-মাতার সন্তানদিগকে পরিরক্ষণ করা উচিত, তৎকালে পরিণয় দ্বারা পরগৃহে বিসর্জন দিয়া এতাদৃশ অসীম দুঃখসাগরে নিক্ষেপ করা নিতান্ত অন্যায় কর্ম”।[15]
    এবং
    “এইরূপ লোকাচার ও শাস্ত্রব্যবহারপাশে বদ্ধ হইয়া দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা চিরকাল বাল্যবিবাহনিবন্ধন অশেষ ক্লেশ ও দুরপনেয় দুর্দশা ভোগ করিতেছি।”[16]

    আরও পড়ুন
    রণছোড় - Chayan Samaddar


    পূর্বপক্ষ

    • যে বিদ্যাসাগর  ১৯৫০ সালে তাঁর সমাজসংস্কার বিষয়ক প্রথম প্রবন্ধে বাল্যবিবাহের দোষ নিয়ে বলতে গিয়ে ধর্মশাস্ত্র ও লোকাচারকে তিন তুড়ি মেরেছিলেন, তিনিই বাকি জীবন এ’নিয়ে আর কিছু লিখলেন না, চুপ করে রইলেন?
    • আবার তিনিই ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে সহবাস সম্মতি বিল পেশ করার আগে সরকার বিদ্যাসাগরের মতামত জানতে তাঁর কাছে মিঃ স্কোবল ও মিঃ হাচিন্সকে পাঠায়।  কিন্তু তাঁদের হতাশ করে বিদ্যাসাগর বিলটিকে ‘আনকন্ডিশনাল সাপোর্ট’ দিতে অস্বীকার করেন। প্রাচীনপন্থীরা আপত্তি করছিলেন যে বয়স বারো বেঁধে দিলে হিন্দুস্বামীর ‘গর্ভাধানে’র মত ধর্মীয় সংস্কার বাধাপ্রাপ্ত হবে। বিদ্যাসাগর মধ্যপন্থা অবলম্বন করে কন্ডিশনাল সাপোর্ট দিলেন।
    • এর কারণ বিধবাবিবাহ আইন পাশ করাতে তাঁর অতিরিক্ত শাস্ত্রনির্ভরতা। কখনও বলেছেন কলিতে মনু নয় পরাশর মান্য, আবার কখনও মনুকেই আঁকড়ে ধরেছেন। এইভাবে উনি নিজেই নিজের টানা ধর্মীয় গণ্ডিতে বাঁধা পড়লেন।

    উত্তরপক্ষ

    •  আগেই দেখিয়েছি যে বাল্যবিবাহ, সহবাস সম্মতি, বহুবিবাহ ও বিধবাবিবাহ একই মালায় গাঁথা, নারীর নিজের শরীরে নিজের অধিকার। এগুলোকে আলাদা করা যায় না। বিদ্যাসাগর একটি বাল্যবিবাহের দোষ লিখে হাল ছেড়ে দেননি। পরবর্তী পর্যায়ে উনি বিধবাবিবাহ প্রবর্তন ও বহুবিবাহ নিবারণ নিয়ে আন্দোলনে জড়িয়ে দুটো বিষয়েই দুই দুই ভাগে মোট চারটি পুস্তিকা লিখেছেন, প্রচার করেছেন। আইন পাশ করানোর চেষ্টা করেছেন; বিধবাবিবাহ আইন পাশ হয়েছে বহুবিবাহ নিবারণ আইন হয়নি।
    • একটা কারণ, বিধবাবিবাহ আইন , লেখক যেমন বলেছেন প্রবর্তনমূলক (permissive), বিধবাবিবাহ করা বাধ্যতামূলক নয়, না করলে শাস্তি নেই। পাশ হল ১৯৫৬ সালে। কিন্তু বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ নিবারণ হল coercive, না মানলে শাস্তি পেতে হবে।  তাই এগুলো নিয়ে বাস্তবিক আইন পাশ হোল ১৯২৯ ও ১৯৫৫ সালে।
    •   সহবাস সম্মতি আইন অবশ্যই  coercive, তাই মেপেজুকে বারো বছর ,যা তখন ইংল্যান্ডে প্রচলিত ততটুকুই । এমনকি আজও ‘ডোমেস্টিক রেপ ‘কে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া যায়নি। ভারতে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৭ সালে এক ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট দিয়ে বালিকা স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসংসর্গ অপরাধ বলে দেগে দিয়েছেন। মানে ১২ বছরের চেয়ে বড় কিন্তু ১৮ বছরের চেয়ে ছোট স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক এতদিন অপরাধ ছিল না। কারণ বাল্যবিবাহ হলেও যদি একবছরের মধ্যে রিপোর্ট না হয়, ধরা না পড়ে তাহলে সেটার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া যায়না।
    •    ধার্মিক মানসিকতার ভারতবর্ষে এখনও প্রতিবছর গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে গৌরীদানের পূণ্যার্জনের লোভে বাপ-মা বালিকার বিবাহ দেয়। ২০০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ১.৫ মিলিয়ন মেয়ের ১৫ বছরের কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল। উপরোক্ত পরিস্থিতিতে আজ থেকে ১৭০ বছর আগে বিদ্যাসাগরদের মানবিকতার আবেদন (যা বিদ্যাসাগরের দুটি পুস্তিকাতেই স্পষ্ট চোখে পড়ে) ধার্মিক অনুশাসনের জমিতেও লড়া ভিন্ন কোন বিকল্প ছিল কি? লেখক ইয়ং বেঙ্গল ও সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্টের কথা বলেছেন, কিন্তু আজ একবিংশ শতাব্দীর ভারতেও অধিকাংশ বিয়ে হয় হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ সমাজের ধার্মিক নিয়মে। যাকে আমরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ বলি তা সংখ্যায় নগণ্য।
    •    এখনও রেস্টিট্যুশন অফ কনজুগাল রাইটের ভিত্তিতে কোন কোন স্বামী অনিচ্ছুক স্ত্রীকে আদালতে ডেকে তার সঙ্গে থাকতে আদেশ দেয়।  বিয়ের পর কন্সিডারেশন অফ স্পেসিফিক পারফরম্যান্স গ্রাউন্ডে। এই কলোনিয়াল আইনটি ১৯৭০ সালে ইংল্যান্ডে খারিজ হয়ে গেছে। ভারতে হয়নি, তবে ২০১৭ সালে খারিজের দাবিতে পেশ করা একটি পিটিশন সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ আগামী সপ্তাহের মধ্যেই  শুনবে বলে শোনা যাচ্ছে।
    •        মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বির কন্যা সমাজতত্ত্ববিদ মীরা কোসাম্বি মনে করেন যে ওই ১৮৯১ সালের সহবাস সম্মতি আইন উনবিংশ শতাব্দীর নারীমুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

    “The Age of Consent Bill, enacted in 1891 formed a vital link in the movement for women’s emancipation in the 19th century. The major women’s issues of the time were abolition of child marriage, more humane treatment of widows and their right to remarry and education of women. The age of consent issue was integral to the child marriage question and the technical distinction between the two was often blurred in the actual controversy. The Age of Consent Bill aimed to set a reasonable age limit below which a girl was considered to be incapable of giving consent to cohabitation and thus to ensure that her childhood was protected from physical coercion”.[17]

    • এই প্রশ্নে অর্থাৎ সহবাস সম্মতি আইনের প্রশ্নে বিদ্যাসাগরের অবস্থান ছিল নিম্নরূপ-[18]

    ‘আমি চাই ব্যবস্থাটি এমনভাবে করাহোক যাতে কোন ধর্মীয় প্রথার সঙ্গে বিরোধে না গিয়েও অল্পবয়স্কা স্ত্রীদের (child-wives) যথেষ্ট সুরক্ষা দেওয়ার মতো কিছু থাকে।  আমি প্রস্তাব করি, স্ত্রীর প্রথম ঋতুর আগে পুরুষের পক্ষে স্ত্রী সহবাস অপরাধ বলে গণ্য হবে। যেহেতু অধিকাংশ মেয়েরই তেরো, চোদ্দ বা পনেরো বছর বয়স হওয়ার আগে ওই লক্ষণ দেখা যায় না, তাই আমি যে পরামর্শ দিচ্ছি তা ওই বিলের চেয়ে আরও বিস্তৃত, আরও ব্যাপক সুরক্ষা দেবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় আচার পালনে হস্তক্ষেপের বিরোধী বলে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপত্তি করা যাবে না’।

    • হ্যাঁ, আইনে শুধু ১২ বছরে দাঁড়ি টানা হয়েছে। এখন উপরোক্ত প্রেক্ষিত এবং আজ অব্দি সহবাস সম্মতির কী অবস্থা দেখে লেখকের উক্তিটি “শাস্ত্র! শাস্ত্র! তোমার মানবতা নাই বিদ্যাসাগর’? আদৌ যুক্তিযুক্ত মনে হয় কি?

    ১১.৬ বহুবিবাহ নিরোধক আইন ও বিদ্যাসাগর

    ষষ্ঠ অধ্যায়ে লেখক আশ্বস্ত করেছেন, “বহুবিবাহ নিবারণ সূত্রে লিখিত তাঁর (বিদ্যাসাগরের) প্রথম পুস্তকটি বিশ্লেষণ করা হলে, এই হিন্দু ‘সমাজসংস্কারক’ এর কদর্য মূর্তি আরও একবার উন্মোচিত হবে”।[19] (বড় হরফ আমার)

    লেখকের বক্তব্যটি এবং সম্পর্কিত সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো একবার মন দিয়ে দেখা যাক।

    বহুবিবাহের পৃষ্ঠভুমি-

    লক্ষণ সেনের সময় থেকে কৌলীন্যপ্রথা গুণদোষের ভিত্তিতে নির্ধারণ হওয়ার বদলে বংশানুক্রমিক হয়ে গেল। তারপর দেবীবর ঘটক কুলীন ব্রাহ্মণদের ৩৬ ঘরে ভাগ করে দিয়ে সমমেলের বাইরে বিবাহ নিষিদ্ধ করে দিলেন। ফলে কুলীনদের ঘরে অবিবাহিত কন্যার সংখ্যা বেড়ে গেলে কুলরক্ষার্থে এক পাত্রে অনেক কন্যাদান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই সুবাদে কুলীন পাত্রের দল বহুবিবাহে প্রবৃত্ত হয়ে বিবাহ ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত হয়। অনেক কুলীনকন্যা বিয়ের রাতেই প্রথম ও শেষবারের মতো স্বামীর মুখ দেখতেন। ফলে সমাজে ব্যাভিচার অস্বাভাবিক হারে  বৃদ্ধি পেতে থাকে। অনেক কুলীন কন্যা কুলত্যাগে বাধ্য হন। কলকাতার বিভিন্ন বেশ্যাপল্লী হয়ে ওঠে তাঁদের শেষ আশ্রয়।

    এই কু-প্রথা নিয়ে কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলে এবং বিভিন্ন সমাচার পত্রে সমালোচনা শুরু হয় প্রায় তিনের দশক থেকেই। ডিরোজিওর ছাত্ররা ছিলেন অন্যতম কঠোর সমালোচক। রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় Polygamy among Hindoos প্রবন্ধে এর কঠোর সমালোচনা করেন। ১৮৪২ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্যাদর্শন’ মাসিক পত্রে ‘বহুবিবাহ নিবারণের জন্য রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়নের কথা প্রথম বলা হয়’।[20]

    • ‘বিদ্যাদর্শন’ মাসিক পত্র ‘বহুবিবাহ’ প্রথাকে শাস্ত্রসম্মত বা শাস্ত্রবিরুদ্ধ প্রমাণের বিব্দুমাত্র চেষ্টা না করে প্রচলিত প্রথাটি রদের জন্য ‘সরাসরি সরকারের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করে’।[21] ১৮৫১ সালে পূর্ণচন্দ্রোদয় নামের দৈনিক পত্রিকাটিতেও বহুদার পরিগ্রহের প্রথা ‘নিবারণ নিমিত্ত কোন আইনকালীন অনায়াসেই রহিত হইতে পারে’ বলা হয়।
    • বহুবিবাহ আইন করে বন্ধ করার জন্য, ১৮৫৫ সালের গোড়ার দিকে কিশোরীচাঁদ মিত্র ভারত সরকারের কাছে প্রথম আবেদন করেন। ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বর্ধমানের মহারাজা সরকারের কাছে যে আবেদনপত্র  পাঠান তার অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন বিদ্যাসাগর। এভাবে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরকারের কাছে ১২৭টি আবেদন পত্র পৌঁছে যায়। তারপর ১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রামমোহন পুত্র রমাপ্রসাদ রায় জে পি গ্র্যান্টের সহযোগিতায় একটি খসড়া বিল প্রস্তুত করেন।  কিন্তু এতসব হওয়ার পরও সরকার সিপাহী বিদ্রোহের অজুহাত দেখিয়ে আইন পাশে উদ্যোগী হলেন না। খসড়াটির খোঁজ পাওয়া গেল না।
    • বিদ্যাসাগর কী করলেন? শুধু হা-হুতাশ! এই প্রথাকে ‘কুৎসিত’ বলেও সেরেফ ইংরেজ রাজপুরুষদের অজুহাতের তরফদারি। “কিন্তু, এই হতভাগ্য দেশের দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই সময়ে রাজবিদ্রোহ উপস্থিত হইল। রাজপুরুষরা বিদ্রোহনিবারণবিষয়ে সম্পূর্ণ ব্যাপৃত হইলেন; বহুবিবাহ বিষয়ে আর তাঁহাদের মনোযোগ দিবার অবকাশ রহিল না”।[22]
    • ১৮৬৩ সালের গোড়ায় সরকারের কাছে দুটো আবেদন জমা পড়ে এবং ১৮৬৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আবার বাংলার ছোটলাটের কাছে বহুবিবাহ নিবারণের জন্য বিদ্যাসাগর সমেত অনেক বিশিষ্টজনের স্বাক্ষরযুক্ত একটি আবেদন পত্র পাঠানো হয়। বর্ধমানের মহারাজার আবেদনও পেশ হয়। রাজা রাধাকান্ত দেব পালটা আবেদন দিয়ে আইন পাশ না করতে অনুরোধ করেন। ১৯ মার্চ বিদ্যাসাগর সমেত বিদ্বজ্জনের একটি প্রতিনিধি দল ছোটলাট বীডনের সঙ্গে দেখা করে। বাংলা সরকার ভারত সরকারের কাছে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ৫ এপ্রিল চিঠি পাঠায়। ৮ অগাস্ট ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয় অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ এখনও আইনের মাধ্যমে বহুবিবাহ রদের বিপক্ষে, তাই এক্ষুনি নতুন আইনের প্রয়োজন নেই।
    • বিদ্যাসাগর সরকারের অপারগতার বিষয়টিতে যথেষ্ট পরিমাণে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করলেন[23] বললেন, ‘কিন্তু, উপরিস্থ কর্তৃপক্ষের অনভিপ্রায়বশত, অথবা কি হেতু বলিতে পারা যায় না, তিনি (ছোটলাট সিসিল বীডন) এতদ্বিষয়ক উদ্যোগ হইতে বিরত হইলেন’।
    • ভারত সরকারের মনোভাব জানার পর বাংলার সরকার বহুবিবাহের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্যে একটি কমিটি গঠন করল যাতে দু’জন উচ্চপদস্থ বৃটিশ আমলা ও বিদ্যাসাগর সমেত পাঁচজন  দেশীয় ব্যক্তি। কমিটির তিনজন বাঙালি সদস্যের অভিমতঃ মানসিকতা বদলাচ্ছে, ‘শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা আপনা থেকেই লোপ পাবে, আইনের সাহায্যে তা বন্ধ করার প্রয়োজন হবে না’। বিদ্যাসাগর এদের সঙ্গে একমত না হতে পেরে লেখেনঃ

    “I do not concur in the conclusion come to by the other gentlemen of the Committee. I am of opinion that a Declaratory Law might be passed without interfering with the liberty which Hindoos now by law possess in the matter of marriage”.[24]

    কিন্তু বহুবিবাহ নিয়ে কমিটির প্রতিকুল রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা বন্ধ হয়ে গেল। বিদ্যাসাগর ১৮৭০ থেকে বিরোধীদের আপত্তি খণ্ডন করে “বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব” নামের একের পর এক দুটি পুস্তিকা লিখে বিরোধীদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন। ওঁর অভিমত- এটি একটি ‘অতি জঘন্য অতি নৃশংস প্রথা’, এটাকে রহিত করতে আইন প্রণয়নের দাবিতে ১৮৭০ সালে ‘সনাতন ধর্মরক্ষণী সভা’র উৎসাহ দেখে উনি তাঁদের সঙ্গে হাত মেলালেন। প্রমাণ করতে চাইলেন এই বহুবিবাহ প্রথা ধর্মশাস্ত্রবিরোধী; পুরুষের একাধিক বিবাহের অনুমতি শুধু ব্যতিক্রমী ছয়টি ক্ষেত্রে রয়েছে, সাধারণ নিয়মে নয়।

    বেশ কথা; এই পর্য্যন্ত বিদ্যাসাগরের লেখক কথিত  ‘কদর্য মূর্তি’র সঙ্গে সাক্ষাৎ হল না। কিন্তু লেখক ইঙ্গিত করছেন সেটা হবে ওঁর প্রথম পুস্তিকাটি ও তার পরিশিষ্টের বিশ্লেষণ করলে।

    পূর্বপক্ষ

    1. আপত্তি শাস্ত্রবিচারে জোর দেওয়ায়, আপত্তি শাস্ত্রবিচারে অথরিটি প্রশ্নে মনু ও পরাশরকে নিয়ে পালটি খাওয়ায়। বিধবাবিবাহের সময়ে বিদ্যাসাগর বললেন—কলিতে পরাশর মান্য, মনু নয়। আবার বহুবিবাহের সময় মনুকে অথরিটি বলছেন। “শাস্ত্রবিচারের ক্ষেত্রে এহেন গোঁজামিলের কারণে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে”।[25]
    2.  মনুকে অনুসরণ করে তিনি প্রথমে বলেন ‘স্ত্রীবিয়োগ হইলে গৃহস্থ ব্যক্তির পুনরায় দারপরিগ্রহ আবশ্যক’। (মনু, ৫/১৬৮)। তারপর লেগে পড়েন জীবিত অবস্থায় পুরুষের কী কী শর্তে দ্বিতীয়বিবাহের অনুমতি মনু দিয়েছেন তার ব্যাখ্যায়। যেমন, ‘যদি স্ত্রী সুরাপায়িণী, ব্যভিচারিণী, সতত স্বামীর অভিপ্রায়ের বিপরীতকারিণী, চিররোগিণী, অতিক্রুরস্বভাবা, ও অর্থনাশিনী হয়, তৎসত্ত্বে অধিবেদন, অর্থাৎ পুনরায় দারপরিগ্রহ, করিবেক’।(মনু, ৯/৮০)। ‘এছাড়া বন্ধ্যা হইলে অষ্টম বর্ষে, মৃতপুত্রা হইলে দশম বর্ষে, কন্যামাত্র প্রসবিনী হইলে একাদশ বর্ষে, ও অপ্রিয়বাদিনী হইলে কালাতিপাত ব্যতিরেকে অধিবেদন করিবেক’। (মনু, ৯/৮১)।  একই পুস্তকে তিনি কাশ্যপের মত উদ্ধৃত করে বলেন, ‘অবিবাহিত অবস্থায় কন্যার ঋতুদর্শন শাস্ত্রানুসারে ঘোরতরপাতকজনক’। এভাবে একই সঙ্গে উনি বাল্যবিবাহের সমর্থন করেন।[26]
    3.   বারাণসীর রাজা দেবনারায়ণ সিং বহুবিবাহ নিবারণ আইনের যে পাণ্ডুলিপি সরকারের কাছে পেশ করেছিলেন সেটি বিদ্যাসাগর তাঁর প্রথম পুস্তিকার পরিশিষ্টে সংযোজিত করেন। তাতে পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহের জন্য কিছু শর্ত দেওয়া রয়েছে যার কোন একটি পূর্ণ হলেই দ্বিতীয় বিবাহ শাস্ত্রানুমোদিত। যেমন,  স্ত্রী ব্যাভিচারিণী, উন্মাদিনী, কুষ্ঠ বা কোন দুরারোগ্য ব্যাধি আক্রান্তা, আট বছরের মধ্যে কোন পুত্রসন্তান প্রসব না করতে পারা, হিন্দুর সমাজচ্যুত হওয়ার মত কোন কাজ করা, প্রতারণার মাধ্যমে তথ্য লুকিয়ে বিয়ে করা।
    4.   মনুকে অনুসরণ করে বিয়ের ব্যাপারে শূদ্রদের খাটো করা। এভাবে শাস্ত্রের অনুসরণ করতে গিয়ে কবের সেই ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’কে আপ্তবচন মনে করে নারীকে চুড়ান্ত অবমাননার মুখে ঠেলে দেওয়া।[27]


    উত্তরপক্ষ

    1.  মনে হচ্ছে লেখক ১৭০ বছর আগের মূল্যবোধকে আজকের একবিংশ শতাব্দীর মূল্যবোধের চশমায় দেখছেন। তখন ইউরোপ এবং ভারত সর্বত্র ফ্যামিলি ল’ তৈরি হত নিজ নিজ ধর্মের অনুশাসন মেনে, তার চৌহদ্দিতে। তাই বিদ্যাসাগরকে নারীর পক্ষে আইন প্রবর্তনের জন্যে দাঁড়াতে হলেও অবধারিত ভাবে শাস্ত্রবিচারে নাবতে হয় । অবশ্যই উনবিংশ শতাব্দীর সমাজ সংস্কারকেরা ছিলেন মুখ্যত উচ্চবর্ণীয় পুরুষ, এবং নারীদের সম্বন্ধে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতায় আবদ্ধ। তাই নারী তাঁদের চোখে গার্হস্থ্যজীবনের প্রধান অঙ্গ,  সেই ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ ধারণায়। বিদ্যাসাগরের মূল্যায়ন হবে নারীকে পীড়িত অবলা হিসেবে এবং পুরুষকে রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখেছেন বলে নয়-তখন সবাই সেভাবেই দেখত-  বরং ওই খাঁচার মধ্যে থেকেও নারীদের যন্ত্রণা অনুভব করে যেন তেন প্রকারেণ তাঁদের দুঃখ লাঘব করার কথা ভেবেছেন, ময়দানে নেমেছেন এবং চেষ্টা করেছেন বলে।
    2. আরেকটু স্পষ্ট করি। তাঁর চার দশক পরে জন্মানো সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা শ্রেষ্ঠ বাঙালি চিন্তানায়ক রবীন্দ্রনাথ এ নিয়ে কী ভাবতেন? হিন্দু বিবাহের কথিত পবিত্রতা এবং মেয়েদের স্বাধীনতার অভাব ও পুরুষের লাগামছাড়া উচ্ছৃংখলতার সমালোচনা করেও তিনি বলছেন

    “সাংসারিকতাকে প্রাচীন হিন্দুরা হেয়জ্ঞান করিতেন না, কিন্তু খৃস্টানেরা করেন। অতএব, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা – একথা স্বীকার করা হিন্দুর পক্ষে লজ্জার কারণ নহে, খৃস্টানের পক্ষে বটে। হিন্দু স্ত্রীকে  যে পতিপ্রাণা হইতে হইবে সেও সাংসারিক সুবিধার জন্য। পুত্রার্থেই বিবাহ কর বা যেকারণেই কর -না কেন, স্ত্রী যদি পতিপ্রাণা নাহয় তবেঁ অশেষ সাংসারিক অসুখের কারণ হয়, এবং অনেক সময়ে বিবাহের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হইয়া যায়, অতএব সাংসারিক শৃঙ্খলার জন্যই স্ত্রীর পতিপ্রাণা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে স্বামীর পত্নীগতপ্রাণ হইবার এত আবশ্যক নাই যে তাহার জন্য ধরাবাঁধা করিতে হয়”। [28] (বড় হরফ আমার)।

    1. তাহলে কি আমাদের রবীন্দ্রনাথের ‘কদর্য মূর্তি’র সঙ্গে সাক্ষাৎ হল? না, সাক্ষাৎ হল উনবিংশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রায় দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত ব্যাপ্ত বাঙালি হিন্দুর মানসিকতায় নারীর অবস্থান, যা লেখক সঠিক ভাবেই চিহ্নিত করেছেন পুরুষতান্ত্রিক বলে। এ’ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র কেউই ব্যতিক্রম নন।
    2. শাস্ত্রীয় বিতর্কে বিদ্যাসাগর দুটো অবস্থান নিয়েছেন।

    এক, বিধবাবিবাহের পক্ষ নেবার সময় পরাশর থেকে (মনুতে বিধবাবিবাহ নেই তাই) দেখিয়েছেন যে সমস্ত ‘ব্যতিক্রমে’ (নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ইত্যাদি) বিবাহিত নারীর পুনর্বিবাহের অধিকার শাস্ত্রানুমোদিত, তাদের মধ্যে ‘মৃতে’ ( নারীর বিধবা অবস্থা) রয়েছে। অতএব, বিধবার দ্বিতীয় বিবাহ হতে পারে। বিধবাজীবনও তো ব্যতিক্রমই।

    দুই, বহুবিবাহের বিরুদ্ধে বলার সময় মনুকে( যেহেতু মনুতে বহুবিবাহ ব্যতিক্রমীও শর্তাধীন)  আশ্রয় করে দেখাচ্ছেন পুরুষ প্রথম স্ত্রীর জীবিত অবস্থায় দ্বিতীয় স্ত্রীর পাণিগ্রহণ কেবল কিছু ব্যতিক্রমী অবস্থায় করতে পারে।

    লেখক গোটা বইয়ে কোথাও কোথাও মনুকে শ্রেষ্ঠ স্মৃতিশাস্ত্র বলার সমালোচনা করেছেন। আমার বক্তব্য, বিদ্যাসাগরের প্রায় একহাজার বছর আগে শংকরাচার্য তাঁর ব্রহ্মসূত্রের প্রথম অধ্যায়ের গোড়াতেই মনুকে শ্রেষ্ঠ স্মৃতি এবং মান্য বলে লেবেল লাগিয়ে দিয়েছেন।

    তিন, খেয়াল করুন, বিদ্যাসাগরের লক্ষ্য এইটুকু দেখানো যে বহুবিবাহ দুর কী বাত, এমনকি দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণও ব্যতিক্রমী শর্তাধীন। ওই শর্তগুলোকে জাস্টিফাই করা নয়। বাল্যবিবাহ?  নৈব নৈব চ! এমনকি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কথা বলেও কেশব চন্দ্র সেন নিজের মেয়ের কম বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর সেটা করেননি। কাজেই শাস্ত্রবিচারে ওঁর কাশ্যপের কোন উক্তি উদ্ধৃত করাকে যদি বাল্যবিবাহের পক্ষে বিদ্যাসাগরের বলে ভর্ৎসনা করতে হয়, তাহলে ওথেলো নাটকে আয়াগোর উক্তির জন্যে বা মার্চেন্ট অফ ভেনিসে ব্যাসানিওর পোর্শিয়াকে মালদার মালকিন ভেবে বিয়ে করার কথা বলার জন্যে শেক্সপিয়রকে গাল দিতে হয়।

    মানতেই হবে যে বিদ্যাসাগরের সমকালীন বঙ্গীয় সমাজে যন্ত্রণায় ভুগছে যে নারী সে উচ্চবর্ণের এবং হিন্দু। তাতে সমস্যা কী? লেখক নিজেই দেখিয়েছেন নিম্নবর্ণের খেটে খাওয়া সমাজে নারীপুরুষের সম্বন্ধ অনেক স্বচ্ছন্দ, তারা সবসময় পাঁজিপুথি মেনে চলে না। ফলে আইনে কোন পরিবর্তন হল অথবা নতুন কোন আইন হল তা’নিয়ে তাদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। কিন্তু বিদ্যাসাগর যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন তার অভিঘাত বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর সমাজে নারীপুরুষ সম্পর্কের আইনে পড়েছে। তাই বহুবিবাহ রদ হয় ১৯৫৫ সালেও এবং ১৮ বছরের কম বয়সের পত্নীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক ধর্ষণ বলে ধরা হয় ২০১৭ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। [29]

    বলা হয় ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ধারা ৩৭৬(২) বিবাহিত এবং অবিবাহিত নাবালিক বালিকার মধ্যে খামোকা অনাবশ্যক তফাৎ করেছে। ধর্ষণ সবার জন্যেই ধর্ষণ। বলা হয় এখানে ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড ১৮৬০ এর ১৯৮(৬) প্রযোজ্য হবে।

    এবার ভাবুন তো, উপরের প্রেক্ষিতে বিদ্যাসাগরের ‘কদর্য মূর্তি’ কতটুকু দৃশ্যমান?

    (আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)



    [1] শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন, বিদ্যাসাগর জীবনচরিত, পৃঃ ২১৮-১৯।
    [2] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৩০।
    [3] কার্তিকেয়চন্দ্র রায়, ‘ক্ষিতীশ-বংশাবলী চরিত”, ১৯৩২। প্রৃঃ ২১৮-১৯।
    [4] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৩০।
    [5]   ঐ, পৃঃ ২৩৪।
    [6]স্বপন কুমার বসু,  “সমকালে বিদ্যাসাগর” , পৃঃ ৪২।
    [7] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৪১।
    [8] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ২৪৯।
    [9] স্বপন বসু,  “সমকালে বিদ্যাসাগর” , পৃঃ ৪।
    [10] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ৩২৫।
    [11] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ৩৩০।
    [12] Tanika Sarkar, ‘Conjugality and Hindu Nationalism: Resisting Colonial Reason and Death of a Child-Wife”. Women and Social Reform in Modern India, Vol. I, New Delhi, 2017; page-400.
    [13] স্বপন বসু, ‘সমকালে বিদ্যাসাগর’, পৃঃ ২২।
    [14] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ৩২৮।
    [15] ঐ; পৃঃ ৩২৬।
    [16] ঐ; পৃঃ ৩২৯।
    [17] Meera Kosambi, in  “Girl-brides and Socio-Legal Change”, Economic & Political Weekly, August 3-10, 1991.
    [18] দেবোত্তম চক্রবর্তী; “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান”, পৃঃ ৩৩৩।
    [19] ঐ; পৃঃ ২৯২।
    [20] ঐ,পৃঃ ২৮৭।
    [21] ঐ,পৃঃ ২৮৮।
    [22] ঐ, পৃঃ ২৮৯।
    [23] ঐ, পৃঃ ২৯০।
    [24]  ঐ, পৃঃ ২৯১।
    [25] ঐ, পৃঃ ২৯৩।
    [26] ঐ, পৃঃ ২৯৬।
    [27] ঐ, পৃঃ ২৯৫।
    [28] রবীন্দ্ররচনাসমগ্র> প্রবন্ধ> সমাজ> পরিশিষ্ট (বৈদ্যুতিন সংস্করণ), ভাষা প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদ পরিবেশিত।
    [29] Independent Thought Vs Union of India, October, 2017.


  • বিভাগ : পড়াবই | ২৯ আগস্ট ২০২১ | ৫২৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ২৯ আগস্ট ২০২১ ১৬:৪৫497354
  • সরি!
    প্যারা ১১.৫ এর পূর্বপক্ষে যাতা টাইপো হয়েছে, আমার ঢিলেমিতে।
    প্রথম দুই পয়েন্টে লেখা হয়েছে ১৯৫০ এবং ১৯৯০; হবে ১৮৫০ এবং ১৮৯০।
  • Amit | 203.0.3.2 | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৫:০২497436
  • বাকি জায়গায় হল্লা করতে গিয়ে এইটা চোখ এড়িয়ে গেসলো। যথারীতি দারুন। 
  • জ. স. লোচবক্ষুলা | 2405:201:8005:9947:fc0c:587d:352b:90a3 | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৫:৪৮497455
  • আচ্ছা, এখানে ঠিক কী চলছে? মূল বইয়ের প্রতিপাদ্য ছিল বিদ্যাসাগর সুবিধের লোক নন, আর বইয়ের আলোচনার প্রতিপাদ্য হলো, না উনি লোক মোটের ওপর ভালোই?
     
    এমনিতে পড়ে দেখা উচিত, শুরুতে পড়ছিলামও, কিন্তু নয় পর্বে সমালোচনা যে বইয়ের সেই বইটা কত বড় তাই ভেবে হুব্বা হয়ে যাচ্ছি। এটা যদি কোনদিন শেষ হয় তাহলে একবারে পড়বো।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন