• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • ডাকনাম

    শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ০৪ জুলাই ২০২১ | ৪১৬ বার পঠিত | ৩ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • এলেবেলে (পর্ব - ২) : ডাকনাম



    দিদির আট-দশটা ডাকনাম ছিল। ঠাকুরদা বলতেন বুড়ি। ঠাকুরদার এক বোন, আমাদের পিসিদিদা ডাকতেন তিতা বলে। সম্ভবতঃ দিদি বেশি ছোটবেলায় দিদা না বলে তিতা বলতো, সে থেকেই। মাসি-পিসিদের দেওয়া গুচ্ছখানেক নাম ছিল -- রুপুল, বড়মা, ঝুমুর, প্রভৃতি -- শুনলেই আমার হিংসেয় গা জ্বলে যেত। বাবা-মা মেজাজ মর্জিমতো এক এক নামে ডাকতেন। একমাত্র আমার দেওয়া কোনো নাম ছিল না; দিদিকে নিয়ে সবার এই সোহাগের ভরা-কোটালে আমার অবদান বলতে শুধু 'দিদি'। দিদি নয় অবশ্য; দি।


    শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় এসে আমাদের বড় হয়ে ওঠা। বড় যে হচ্ছি, বুঝতে পারতাম, বাড়ি থেকে রাস্তায় আমাদের দুজনকে একা ছাড়ার সীমানা দিয়ে। শিলিগুড়ির ক্যাম্পাসজোড়া খেলার মাঠ কলকাতায় হারিয়ে গিয়েছিল। সবেধন নীলমণি এক পার্ক ছিল বাড়ির কিছুটা দূরে, কিন্তু সেখানে গিয়ে স্লিপ-দোলনা চড়ে বিকেল কাটানোর প্রবৃত্তি আমাদের জাগত না বিশেষ। বরং, আমাদের আব্দার ছিল, আমাদের দুজনকে ঘুরে ঘুরে পাড়া বেড়াতে দিতে হবে। এই পাড়ার সীমানা ক্রমশঃ বড় হতে হতে বেপাড়া ছাড়িয়ে রাজপথে নেমে গিয়েছিল, আর আমাদের পাড়া-বেড়ানো নগরচারণ হয়ে গিয়েছিল বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।


    লম্বা একমাসের পুজোর ছুটিতে আমরা বিকেল-সন্ধে করে পাড়া ঘুরে আসতাম রোজই প্রায়, ছোটবেলায়। কাজ ছিল, নতুন নতুন রাস্তায় গিয়ে সে রাস্তার নাম দেওয়া দেশের মতো করে। তখন মাথায় সবে সবে কলম্বাস! একটা কানাগলির নাম ছিল বারান্দাপুরী, সে গলির বাড়িগুলোর বারান্দা আমরা কিনে নেব, শলাপরামর্শ হতো প্রায়ই। ঝিলের পাশের যে ঘরোয়া আলোছায়া রাস্তা, তার নাম দি রেখেছিল দীঘিনগর। এই দীঘিনগর নাকি অভিশপ্ত। দীঘিতে যারা যারা আজ অব্দি ডুবে গেছে, রাত্রে ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁলে জলে নাকি আজও বুদবুদ ওঠে, জলে কি যেন ভেসে ওঠে … দিদির গলা ধরে আসতো কল্পনায়, আমার গায়ে কাঁটা দিত। তবু রোজই আমরা যেতাম সে রাস্তায়, কারণ তার শেষ মাথায় ছিল আরেক রাস্তার আহ্বান, ছাতিমপাড়া। যার নামে এই নামকরণ, সেই নিরীহ ছাতিম গাছটা ছিল আমাদের এই দীঘিনগর আর ছাতিমপাড়া যে মোড়ে একে অন্যকে কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে, সেইখানে। কোনো বাড়ির সম্পত্তি নয় সে। মোড়ের মাথায় একাকী, কালো পিচের উপর দাঁড়িয়ে থাকতো। তার মাথায় জ্বলতো হলুদ গ্যাসবাতি। 


    আশ্বিনের বারবেলায় দি'র সঙ্গে সে পথে গেলেই আচ্ছন্ন এক গোধূলিতে তারা-খসার মতো নেমে আসতো ছাতিম ফুল আমাদের পায়ে, যেন ভাই-বোনের আসার অপেক্ষাতেই ছিল তারা। দি আর আমি আমাদের ছোট ছোট দুই মুঠোয় যতটা ধরে, ফুল ভরে নিতাম, তারপর আঁজলার মতো ধরে শুঁকতাম সেই গন্ধ। কিসের তার টান, জানতাম না। আজও জানি না। শুধু মনে আছে, সে গন্ধ নিলে আমার হাতের পাতা, পায়ের পাতা ঘেমে উঠতো, ঘাড়-পিঠ শিরশির করে উঠতো, হঠাৎ মনে হতো শীত এসে পড়েছে কিচ্ছুটি না জানিয়ে। দি আরেকটু বড়, ও বলতো, "আমরা বড় হচ্ছি, বুঝছিস? এরপর তুই আরও বড় হয়ে যাবি আর তখন আমাদের আর এরকম আসা হবে না।" দুজনের হাত থেকে ফুলগুলো ঝরঝরিয়ে পড়ে যেত মাটিতে আবার, ম্লান হয়ে আসতো দূরের বাড়িঘর। সবে সন্ধের মুখ। হলুদ গ্যাসবাতি তখন মরা আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। আমি দি'কে বলতাম, "আমি বড় হলে আসা হবে না কেন? তুইও তো বড় হবি!" ও বলতো, "সবসময় কি আর তুই এখনের মতোই হয়ে থাকবি? বড় হয়ে অন্য কাজ থাকবে না?" দূরের গাড়ির হর্ন মিলিয়ে যেত ঝিলের ও'পারে, কোনো বাড়িতে সন্ধের শাঁখ বাজতো। ছাতিম গাছটা কোন এক অজানা হাওয়ায় একটু তিরতির করে কেঁপে আরও কিছু ফুল ঝরাতো আমার বুক হুহু করে ওঠা বুঝে।


    আমাদের সেই পাড়া হারিয়ে গেছে, দি'র কথামতো, বড়বেলায়। আমাদের ঘুরতে যাওয়াও গেছে। আমাদের আবিষ্কৃত ছোট ছোট রাস্তায় যে বড় বড় দেশ, তাদের হাতবদল হয়ে গেছে। বারান্দাপুরী কিনে নিয়েছে প্রোমোটার। শুধু রয়ে গেছে বলতে সেই মোড়ের মাথার ছাতিমগাছ। বুড়ো হয়েছে সে। গাছের বয়স হলে সে আরও নত হয়, অপেক্ষমান হয় স্মৃতির জন্য। সে পথ দিয়ে কালেভদ্রে হেঁটে ফিরি আমি বাড়ির দিকে। দি দূরে থাকে এখন। ছাতিমগন্ধে স্থির হয়ে দাঁড়াই একটুক্ষণ। পাশের বাড়ির ছোট বাচ্চা অবাক হয়ে জানলা দিয়ে দ্যাখে। আমার হাত-পা ঘেমে ওঠে, পিঠ শিরশির করে। মনে পড়ে, বড় হয়ে যাচ্ছি, একা হয়ে যাচ্ছি। আশেপাশের মানুষেরা বুড়ো হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ঠাকুরদা-পিসিদিদা কেউ নেই আর। আমাদের ছোট ছোট দেশগুলোর নামও সবসময় আর অত স্পষ্ট মনে পড়ে না। ফুল ঝরে পড়ে, অতীতে। 


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৪ জুলাই ২০২১ | ৪১৬ বার পঠিত | ৩ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
ছাদ - Nirmalya Nag
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Abhyu | 47.39.151.164 | ০৪ জুলাই ২০২১ ২০:০১495608
  • ভালো লাগল।

  • Ranjan Roy | ২০ জুলাই ২০২১ ০৮:৫৪495955
  • এই এপিসোডের মায়াবী গদ্য  স্মৃতিমেদুর করে তোলে। টের পাই সন্ধ্যা নামছে।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন