• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ভ্রমণ

  • পথ

    শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ভ্রমণ | ১৮ জুলাই ২০২১ | ৩২০ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • এলেবেলে (পর্ব - ৩) : পথ



    মায়ের কাছে শোনা, যখন আমাকে নার্সারি ক্লাসে ভর্তি করার জন্য শিলিগুড়ির তিস্তা শিশু বিদ্যাপীঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তপতী দিদিমণি আমাকে মৌখিকে প্রশ্ন করেছিলেন, কোথায় থাকো? আমি বলেছিলাম, "নিচে"। দিদিমণি আবার প্রশ্ন করেছিলেন হেসে, "কার নিচে? মাটির নিচে?" আমিও তাঁর এই কৌতূহল মেটাতে আরো খোলসা করে বলেছিলাম, "না। তিনতলায় মুনিয়া দিদিরা থাকে, দোতলায় বাপ্পা দাদারা, আর নিচে আমরা।"  


    ধরে নেওয়া যায়, আমার কাছে তখন তিনতলা মানে ওই একটিই তিনতলা, এবং তিনতলা মানেই মুনিয়া দিদিদের বাড়ি। তেমনই, পৃথিবীর যে কোনো দোতলাতেই বাপ্পা দাদারা থাকবে। আর 'নিচে' আমরা। ঠিকানার সংজ্ঞা তখন সরলরৈখিক, সহজ। আরো যার যার কাছে সে বয়সে নিজের বাড়ির কথা বলেছি, প্রতিবারই আমাদের ঠিকানা ছিল 'নিচে'।


    তারপর আস্তে আস্তে ওপরে উঠলাম। এখন আমি তিনতলায় থাকি, আর যেখানে চাকরি করতে যাই, সেখানেও বসি তিনতলায়। কিন্তু এখন আমার কোনো একতলা-দোতলাতেই আর মুনিয়া দিদি - বাপ্পা দাদারা থাকে না। আগে রাস্তা বলতে জানতাম, কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে বড় মাঠের পাশ দিয়ে বাঁ দিকে ঘুরে কিছুটা এগোলে ডানহাতে ইস্কুল, আর সেটা ছাড়িয়ে মহানন্দা। শেষ তিরিশ বছরে আরো হাজার রাস্তা এ' মাথা ও' মাথা কেটে বেরিয়ে গেছে।


    রাস্তা, মানে পথ? ঝাঁ ঝাঁ রোদে বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে বেরিয়ে বিজন সেতুর নিচ দিয়ে রাস্তা পেরোলেই দেখি, একটা গলির মুখে কাত হয়ে আছে রাস্তার নাম লেখা বোর্ড -- জামির লেন। বাবারা কলকাতায় এসে প্রথমে বহুদিন এখানেই ছিল, একটা ভাড়াবাড়িতে। কিন্তু সে পথ যতটা তাঁদের, আজও, ততটা আমার নয়। আমি কিছুটা জানা-না-জানার চোখে সেদিকে তাকিয়ে, তারপর এগিয়ে যাই অন্যদিকে। হাঁটি। আমার অপেক্ষারা ছড়িয়ে আছে অন্যদিকে। রাসবিহারীর মোড় থেকে আজ হাজরার দিকে যাওয়াই যেত, কিন্তু সেদিকে আজ কেউ নেই অপেক্ষার উত্তরে। তাই সোজা চেতলার রাস্তায় এগোতে থাকি। একটা গুরদুয়ারা পড়ে, তার একটু পর ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশান। ব্রীজের মুখে দাঁড়ালেই তার ফ্যাটফ্যাটে সাদা চুড়ো দেখা যায়। চুল্লীর ধোঁয়া দেখা যায়। থামি। এরপর বিপথ। ফুটপাথ বদল হয় বিকেল না হতেই। ফিরে আসি পথে।


    দিল্লী যাচ্ছি সেবার। একাই, পড়াশুনোর কাজে। এসি চেয়ার-কার ট্রেন। ছিটেফোঁটা ঘুম আসছে না। রাত ১২টা গড়িয়ে ১টা গড়িয়ে ২টো। চারদিকটা অদ্ভুত নিঃশব্দ। শুধু বন্ধ কাঁচের ও'পারে লাইনে চাকা ঘষে যাওয়ার আওয়াজ। কামরার সাদা আলোগুলো আমার চোখে গলে গলে পড়ছে যেন। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, ট্রেন নয়, অপারেশন থিয়েটার। কথা বলার কি কেউ নেই আশেপাশে? সাংঘাতিক অমূলক ভয় করতে শুরু করেছে আমার। এতক্ষণ আমার পাশে গভীর ঘুমে কাদা মানুষটি হঠাৎ জেগে উঠলেন, যেন আমার সঙ্গে কথা বলবেন বলেই। অবাঙালী, কোনো পরিচয়ই নেই। অথচ আশ্চর্য হাসি হাসি মুখে প্রশ্ন করলেন, "এনি প্রবলেম?" আমি ঘাড় নাড়লাম। দিল্লী আসার আগে সময়টা তাঁর সঙ্গে কথা বলেই কাটলো আমার। দিল্লীতে নেমে তিনি চলে গেলেন জয়পুরের কানেকটিং ট্রেনের খোঁজে। আমি, আজমেরী গেটের দিকে। বলে গেলেন, দেখা হবে। কবে, কোথায়, বললেন না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, আবার পথের কাটাকুটি হবে আমাদের। হয়তো আরো চল্লিশ বছর পর, কিন্তু হবে। সেই থেকে আমি সমস্ত সাক্ষাতের শেষে "দেখা হবে" বলি। শুধুই কি পথ? পথের প্রতিশ্রুতি বড় নয়?


    রামেশ্বরমে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টির প্রস্তুতি প্রায় শেষ, এবার ঝমঝমিয়ে এলেই হয়। সমুদ্রের গা দিয়ে একটা ভাতের হোটেলে আমরা এসেছি দুপুরের খাওয়া সারতে। হাত-ধোয়ার বেসিনের সামনে দাঁড়ালে, সামনেই সমুদ্র, মেঘের নিচে ফুলে, ফুঁসে উঠছে। বছর আঠারোর একটি ছেলে অর্ডার নিতে এলো। তখন ল্যাঙ্গুয়েজ প্রবেলেমে আমরা এমন জর্জরিত, যে কোন ভাষায় অর্ডার দেব এই ভেবেই কুলিয়ে উঠতে পারছি না, এমন সময় সে বললো, "সবার জন্য মাছের ঝোল আর ভাত তো?" আমরা তো থ! হাতে চাঁদ পাওয়া বোধ হয় একেই বলে! খাওয়া-দাওয়ার শেষে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, "তোমার বাড়ি কোথায়?" "মেদিনীপুরে ছিল। ছোটবেলায় পাঠিয়ে দিয়েছে এদিকে।" ছেলেটি পশ্চিমবঙ্গের খবর নিতে নিতে আমাদের থালাগুলো তুলে নেয়, টেবিল মুছে দেয় এঁটো ফেলে। প্রথম আমার মনে হয়, বাংলা এখান থেকে বড্ড দূরে! ছেলেটি আর বাড়ি ফেরে না এখন, ফিরবে কিনা জানি না। কিন্তু যদি ফিরতে চায়? কত সমুদ্র শেষে তার বাড়ি? মেঘের নিচে সমুদ্র রং বদলায় বাইরে, আর পথও বদলে বদলে যায়।


       


    এবার হয়েছে সন্ধ্যা। পথকে বছর দিয়ে ভাগ করার সময়। ঠিক যেমন কবিতা আসলে একটাই, আমরা কেবল নাম দিয়ে তাকে ভাঙি, পথকেও আমরা ভেঙে নিই বছরে। নতুন, পুরোনো, ইত্যাদিতে। কিন্তু তাতে পথের মনে হয় বিশেষ কিছু আসে যায় না। এমন সন্ধ্যায়ই আমরা ফোনের এ' পারে ও' পারে অন্তাক্ষরী খেলে কাটিয়েছি কিশোর কুমারের গান নিয়ে। বা, এভাবেই সন্ধ্যা নেমেছে কৌশানীতে ২০০১ সালে, আর অন্ধকারে থুম মেরে থেকেছে বরফমোড়া হাতিপাহাড়। আর ঠিক এর পরেই, রাতের মুখে নীললোহিত বেরিয়ে গেছে বাড়ি ছেড়ে চিরন্তন সাতাশের দিকে, আর তুমি কিনা ভাবলে পারো নি? এক পথ থেকে অন্য পথে পালিয়েছি বলেই আমরা ভালো আছি, জেনো। অনেকের থেকে ভালো আছি। অস্থির হয়ো না। সময় শেষ হয়; পথ নয়।


    আমার বিশ্বাস, এই শহরে আলাদাভাবে পথ চলতে চলতে আমরা একসঙ্গে যদি হঠাৎ কি যেন মনে করে পিছন ফিরে তাকাই, দেখবো, বারাণসীর নির্জনতম ঘাটেও একটি প্রদীপ জ্বালা হয়েছে আরতির জন্য, কোনো অরণ্যেই আর মানুষের সন্ত্রাস নেই, ছোটদের আবার 'সহজ পাঠ', 'শিশু' পড়ানো হচ্ছে, আর আরো দূরে, রামেশ্বরমে বৃষ্টি ধরেছে। ছেলেটি ভাবছে, বাড়ি ফিরবে কিনা এই বর্ষায়…


        


    বিশ্বাস রাখো, পথ আছে এখনও।


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৮ জুলাই ২০২১ | ৩২০ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
ছাদ - Nirmalya Nag
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Somali Mukherjee | ১৮ জুলাই ২০২১ ১৯:০৯495922
  • বেশ সুন্দর ❤️


    দুটো জায়গার মাঝে প্রায় apparate করতে হচ্ছিল আর কি! অরণ্যের সন্ত্রাস যেমন গোটা পৃথিবীর, শিশু, সহজ পাঠ তেমন একটা বদ্বীপের... বেশ দ্বৈত্য! 

  • Abhyu | 47.39.151.164 | ১৮ জুলাই ২০২১ ২০:০৮495928
  • ভালো লাগল।

  • শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী | ১৮ জুলাই ২০২১ ২১:১৭495931
  • সোমালী, ধন্যবাদ। ❤️ হ্যাঁ, ঠিকই। তবে কী চাই ভাবতে গিয়ে এই দুটো মনে পড়ছিল, আরও কিছুর সঙ্গে... 


    ধন্যবাদ, অভ্যু।

  • Anindita Roy Saha | ২৭ জুলাই ২০২১ ২১:১৭496144
  • এক পথ থেকে অন্য পথে পালিয়েছি বলেই আমরা ভালো আছি, জেনো। 


    বড় ঠিক কথা। 


    সুন্দর লেখা।  

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন