• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • শেষ পারানির কড়ি

    শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ০৮ আগস্ট ২০২১ | ৬৩৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • এলেবেলে (পর্ব - ৭) : শেষ পারানির কড়ি



    সুবীর কুমার বসুকে কেউই চিনবেন না। পারিবারিক সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপের সময়ে আমি তাঁকে চিনেছিলাম একজন বৈজ্ঞানিক-অধ্যাপক হিসেবে। অনেক, অনেক পরে, বড় হয়ে, কবিতায় উৎসাহ জন্মানোর পর, হঠাৎই একদিন দাদুর ঘরের তাকে সুবীর বসুর লেখা ৬-৭টা কবিতার বই পেয়ে আমার দ্বিতীয়বার পরিচয় হয় তাঁর সঙ্গে। কেউ চিনবেন না এ' কারণেই বললাম যে আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউই তাঁর ছাত্র ছিলেন না, এবং দ্বিতীয়ত, কবি হিসেবে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ।


    সুবীর বসুর কবিতার বইগুলো যখন আমার হাতে আসে, দাদু আর নেই। কবি নিজেও বয়সের ভারে স্মৃতিভ্রষ্ট। খুবই খসখসে, পাতলা কাগজে ছাপা কিছু কবিতা, আদ্যোপান্ত রবীন্দ্র-বাংলায় লেখা। লাল-নীল-সবুজ, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই তিন রঙের কোনো একটির এক-কালারের মলাট। দাদুর কাছে তাঁর যাতায়াত ছিল, সেই সূত্রে দাদুকে দিয়েছিলেন বইগুলো। তাকে সমস্ত বইয়ের পিছনে পড়ে ছিল। আর কারুর কাছে সে বই থাকা তো দূরস্থান, তাদের উল্লেখও আমি শুনিনি। 


    আমি বইগুলো খুঁজে পাওয়ার পর আরো মাস আটেক বেঁচেছিলেন সুবীর বসু। এই ক'মাসে আমার তাঁর কাছে যাতায়াত একটু বাড়ে। কবিতাগুলো ভালোবেসে, এমন নয়; আমাদের প্রজন্মের চেতনায় সেই কবিতাগুলোকে ঠিক বুকে বেঁধে রাখা হয়তো যায় না। কিন্তু যে মানুষটাকে এতদিন শুধু আত্মীয়তা ও বিজ্ঞানের সূত্রে চিনতাম, আজ তিনি কবি, সাফল্য-ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে একজন কবি যিনি কলম ধরেছিলেন ছন্দের জন্য, এটুকুই আমায় তাঁর কাছে আবার নিয়ে গিয়েছিল। তাঁকে আবার কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছে করেছিল।


    সে সময়ে বৃদ্ধ মানুষটি সম্পূর্ণ আনমনা বসে থাকতেন নিজের বাড়ির ছোট্ট, সরু বারান্দায়। একমাথা টাকের শেষে শনের মতো চুল সামান্য হাওয়া দিলেও উড়ত। স্ত্রী গত হয়েছেন বছরখানেক আগে। এখন পরিচারিকা নিত্য স্নান-খাওয়ার ব্যবস্থা করে, রাতেও থেকে যায় প্রায়দিনই। সুবীর বসু বহুদিন রাতে ঘুমোন না; কারণ, তিনি এখন আর দিন-রাতের তফাৎ বোঝেন না। 


    সকালের দিকে আমি গেলে অবাক হয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। তাঁর লেখা বইগুলো ব্যাগ থেকে বার করে দেখাই তাঁকে। অনেকক্ষণ ধরে দেখেন। তারপর খুব আস্তে, প্রায় সংকোচে, বলেন, "পাণ্ডুলিপিটা দেওয়ার মতো নয়।" একটু ভেবে, আরো এক দুবার বলেন, "নয়। একদমই নয়।" তারপর বাইরের দিকে তাকান। সব ভুলে যান। আমি তার পাশে বসে থাকি। পরিচারিকা চা করে আনেন। কবিতাগুলো উল্টে পাল্টে দেখি। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ ছায়ায় এরকম হারিয়ে যাওয়া অনেক কবির একজন আমার পাশে বসে; বয়স ৯৫। রবীন্দ্রনাথের ছায়া আর বড় হয়ে ওঠে না এখন। মনে হয়, তবু তো লিখবেন বলে কেউ কেউ কলম ধরেছিলেন। বিরাট সমুদ্রে খড়কুটোর হারিয়ে গেলেও, তখন লিখতে লিখতে নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন, হারিয়ে যেতে দেবেন না নিজেকে। এটাই কি অনেক নয়?


    সুবীর বসু কখনো কখনো আমার সঙ্গে বিকেলে হাঁটতে বেরোতেন। শেষ বয়সের কুঁচকে যাওয়া, চকচকে চামড়া, টলোমলো পা। হাত ধরে ধরে কিছুটা নিয়ে গিয়ে ফিরিয়ে আনতাম আবার। যাওয়াতেও যে তাঁর খুব আপত্তি ছিল, এমন নয়; আবার ফিরেও আসতেন লক্ষ্মী হয়ে, কিচ্ছুটি না বলে। 


    এমনই একদিন বিকেলে পাড়ার বড় ঝিলের ধারের বেঞ্চিতে বসে আছি তাঁকে নিয়ে। গ্রীষ্মের সন্ধের মুখ, আলো স্থির হয়ে আছে বহুক্ষণ, অন্ধকার এসেও আসছে না। এমন সময় তিনি বললেন, "লেখা হয় না বহুদিন।"  


    অন্যমনস্ক ছিলাম; তা ছাড়া ওপর প্রান্ত থেকে এমন কোনও কথা শোনার জন্য প্রস্তুতও ছিলাম না সম্ভবত। চমকে বলে উঠলাম, "হ্যাঁ?"


    একইরকম নির্লিপ্ত, হয়তো বা সামান্য দ্বিধামেশানো কণ্ঠে সুবীর বসু আবার বললেন, "লিখবো। একটা লাইন... মনে..."


    খরমড়িয়ে ব্যাগ হাতড়ে একটা পুঁচকে ডায়রি আর কলম বার করে এগিয়ে দিলাম। ধরলেন না প্রথমটায়। একটু অপেক্ষা করে হাতে ধরিয়ে দেওয়ায়, ওভাবেই অনেকক্ষণ বসে রইলেন। আমিও অধীর আগ্রহে বসে, এক কবিকে লিখতে দেখবো, ক' যুগ পর কে জানে! তাঁর হাত কাঁপতে লাগলো কলম ধরে, কলমের ঢাকনিও খুললেন না। অনেক, অনেক পরে, খুব অপ্রস্তুত একটা সঙ্কোচের আধো-হাসি হেসে আমার দিকে তাকালেন।


    - কিছু বলবেন?


    ঘাড় নাড়লেন। থেমে থেমে বললেন, "কেউ পড়বে?" 


    আমি একটু হেসে বললাম, "এই যে, আমি।"


    তিনি আবার একটু সময় নিয়ে বললেন, "আর লিখতে পারি না ..."


    সুবীর বসু আমায় কলম ফিরিয়ে দেন। ডায়রিও। এবার সন্ধে নেমে আসে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে এক কবি জলের ধারে সব ভুলে বসে থাকেন। তাঁর শেষ একটি কবিতার জন্মের সাক্ষী থাকতে না পারার সাময়িক হতাশার শেষে আমারও মনে হয়, কবিতা লেখার মতো গভীর ব্যক্তিগত মুহূর্তে কবিকে দেখতে হলো না, সেই অনাগত থেকে কেবল তাঁরই রয়ে গেল, এটুকু আড়াল বোধ হয় ভালোই।

     

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৮ আগস্ট ২০২১ | ৬৩৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন