• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ভার্চুয়াল রবীন্দ্রনাথ -- কৃষ্ণশর্বরী দাশগুপ্ত

    বকলমে লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৯ মে ২০২১ | ১২৭৫ বার পঠিত
  • তখনও লক ডাউনের থালা বাজে নি। মোমবাতি জ্বলেনি। ফুলটুলও ঝরে পড়েনি আকাশ থেকে। তখনও উহানের বাজারে ইঁদুর, বাদুড়, বাঁদর কিংবা প্যাঁচা বিক্রি হচ্ছে নির্বিবাদে। পরম আহ্লাদে তাদের মাংসের ঝাল, ঝোল, রোস্ট অথবা কিমা বানিয়ে খেয়ে নিশ্চিন্তে ঢেঁকুর তুলছেন হিউয়েন সাংয়ের বংশধরেরা। কাঁটা কাঁটা কোন আপদ ভাইরাস নিয়ে আবিশ্ব এমন আদিখ্যেতার লেশমাত্র আভাস মেলে নি তখনও পর্যন্ত। এমনি এক ফুরফুরে সুসময়েই ঘটে গেল নাটকটা। স্থান: কলকাতার আকাশবাণী ভবন, কাল: ২৫শে বৈশাখের ঠিক দুক্কুরবেলা, কুশীলব: রেডিও আপিসের এন্তার লোকজন আর নাম ভূমিকায়:... না থাক, সবটাই একবারে বলা উচিত হবে না। বাইরে থেকে কিছু টের না-পাওয়া গেলেও আকাশবাণীর ভিতরবাড়িতে সেদিন সকাল থেকেই উৎসবের মেজাজ। স্টুডিওর দরজা খুললেই গোড়ে মালায় সাজানো রবিঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। পায়ের কাছে রজনীগন্ধার গুচ্ছ। গোটা পাঁচেক চ্যানেল সেই ভোরসকাল থেকে পাল্লা দিয়ে শুরু করেছে রবীন্দ্র-উদযাপন। লাইভ, রেকর্ডেড মিলে সবকটি প্রভাতী অনুষ্ঠানে গমগম ঝমঝম করে বেজে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ -- কবির শৈশব-যৌবন, গান-কবিতা, প্রেম-বিরহ নিয়ে বাঙালি শ্রোতার কান ঝালাপালা করে সেইসব খোকাখুকুরা রণে ভঙ্গ দেবার পর আসরে নামলেন নানা বয়সের কর্মীদের মাঝারি একটি দল। কেজো দিন শুরুর আগে কবির ঝাড়ামোছা মূর্তিকে ঘিরে ছোটখাটো একটি জমায়েত। অনভ্যস্ত গলায় গান-কবিতা, দু'চারটে টুকরো কথা -- আর তারপর যে যার টেবিলে ফিরে প্রথম কাপ চা-সহযোগে দিনের 'খাতা খোলা' যাকে বলে।

    ঠিক এইরকম একটা সময়ে সিকিউরিটি অফিসারের ইন্টারকম বেজে উঠল। "একবার আসবেন, স্যার?" ওপারে রিসেপশনিস্টের ফিসফিসে গলা। "কেন,সক্কালবেলাই কী হল আবার?"
    -- "এক ভদ্রলোক ভেতরে যেতে চাইছেন -- খুবই বয়স্ক--"
    -- "কার কাছে যাবেন জেনে নিয়ে পাঠিয়ে দিন না। আর এত আস্তে কথা বলছেন কেন বলুন তো?"
    -- "না, মানে, আপনি একবারটি এলে ভালো হত আরকি।" অগত্যা নামতেই হয়। রিসেপশনের চেয়ারে বসে এদিকওদিক মাথা ঘুরিয়ে দেখছেন যিনি, তাঁর বয়সটা ঠিক বোঝা না গেলেও মুখটা একটু যেন চেনা চেনা লাগে। সামনে এসে হাতজোড় করলেন নিরাপত্তা আধিকারিক, "কারুর সঙ্গে দেখা করবেন কি?" আগন্তুকও উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিনমস্কার করলেন। বয়সের জন্যে একটু ঝুঁকে গেছেন যদিও, তবে এককালে লম্বা ছিলেন বোঝা যায়। "আসলে এদিকে বহুদিন আসা হয়না। দেখা করতে ইচ্ছে তো করে অনেকের সঙ্গেই। তা বীরেন বা পঙ্কজের সঙ্গে চাইলেও কি আর দেখা হবে? আমার গান বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল পঙ্কজ, সে কৃতজ্ঞতা আর জানাতে পারলাম কৈ!"
    -- "ও, দাদু বুঝি গান লেখেন? তাহলে মিউজিক সেকশনে দেখা করবেন কারুর সঙ্গে?" অফিসার একটু অধৈর্য হন, রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, গালগল্প করার সময় নয় এটা। কিন্তু একজন প্রবীণ মানুষকে কড়া কথা বলতেও খারাপ লাগে।
    -- "কে দাদু! আমি কারুর দাদু-টাদু নই। ছেলেমেয়েরা বলত 'বাবামশাই', বাকি সকলে 'গুরুদেব'। তা তোমরা তো 'গুরু' শব্দটারই বারোটা বাজিয়ে রেখেছ। রবিবাবু বা মিস্টার টেগোর এতটুকু ছেলেপুলের মুখে মানায় না। পুপে আমাকে বলত 'দাদামশাই', তা তোমরা না হয় 'ঠাকুরদা'ই বোলো। আমার নাটকগুলোতে একজন ঠাকুরদা থাকতেন, মনে আছে? অনেকটা বিবেকের মতো। মঞ্চে অভিনয় হলে ওই রোলটা ছিল আমার একচেটে।"

    কথাবার্তার মধ্যে আরও দু'চারজন এসে জড় হয়েছে। বৃদ্ধের কথা শুনে মুখ চাওয়াচায়ি করে মুচকি হাসছে তাদের অনেকেই। বুড়ো হয় খ্যাপাটে, আর নয়ত গুলবাজ। তবে সে যা-ই হোক, এই মানুষটার জন্যে আপিসের নিরাপত্তা নষ্ট হবার ভয় থাকতে পারে বলে মনে হল না কারুরই। বরং মজা করার জন্যে কে একজন বলে উঠল, "চলুন দা-- ইয়ে, ঠাকুরদা, আমাদের অফিসটা আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাই।আগে তো আসেন নি মনে হয়।"

    -- "তোমাদের অফিস এ বাড়িতে এসেছে ১৯৫৮ সালে। '৪৭এর স্বাধীনতাই দেখা হল না, এবাড়ি আর দেখব কী করে বল!" দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ান মানুষটি। প্রশ্নকর্তা পরখ করার জন্যে বলে, "পুরনো বাড়ি দেখেছিলেন তাহলে?"

    -- "সে এক কান্ড। চোখ দেখাতে কলকাতায় এসেছি সেবার, অশোক, অশোক সেন, তোমাদের অস্থায়ী ডিরেক্টরের কাজ দেখছিল তখন, ফেরার পথে টেনে আনল আমাকে গার্স্টিন প্লেসের বাড়িতে। ঢোকার পথে মাটির ওপর ভারতবর্ষের মানচিত্র আঁকা ছিল মনে আছে। সবাই তার ওপর দিয়েই মসমস করে ঢুকে যাচ্ছে দেখে খারাপ লেগেছিল খুব।" কথা বলতে বলতে মাঝারি দলটা এগিয়ে এসেছে স্টুডিওর দিকে। উৎসাহী কর্মীদের একজন সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই খুলে গেলো স্বয়ংক্রিয় দরজা। সামনে সুসজ্জিত রবীন্দ্র ভাস্কর্য। বয়স্ক মানুষটি খানিকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। "বাঃ, সুধীর (খাস্তগীর) কাজটা ভালো করেছে। তোমাদেরই আর এক কেন্দ্রে তো শুনেছি রবিঠাকুরের মূর্তি দেখে কে নাকি কার্ল মার্ক্স বলে ভুল করেছিল।"

    --"স্টুডিওতে ঢুকবেন না একবার? দেখবেন না কোথায় আমরা রেকর্ডিং করি, কোথা থেকে সম্প্রচার হয়?"
    -- "না বাপু, ওসব এসি-টেসি মোটে সয়না আজকাল। বয়েস হচ্ছে তো। আগের স্বাস্থ্য কি আর আছে! তা স্টুডিওর সামনে এই ঘরগুলোতে কি কাজ হয়?"

    এগুলো হল ডিউটি রুম। সবগুলো চ্যানেলের অনুষ্ঠান 'মনিটর' করা হয় এখানে। মানে প্রোগ্রাম শুনে রেকর্ড রাখেন এঁরা। লিখে রাখেন কোনটা কেমন হল, সেইমতো যাতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।" অতিথি ভদ্রলোকের দাড়িগোঁফের ফাঁকে এবার হাসির রেখা স্পষ্ট হয়। "ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলছ? তাহলে এই যখন আমার গানের ওপর দিয়ে স্টিম রোলার চালিয়ে যায় শিল্পীরা, তখন কি এরা কানে তুলো গুঁজে রাখে বলতে চাও? সাতটা পঁয়তাল্লিশের গানগুলো পর্যন্ত মাথা ঠান্ডা রেখে শোনা যায়না অনেকদিনই।" বেগতিক দেখে কথা ঘোরাতেই হয়, "আসলে কি জানেন, রেডিওর আগেকার সব এ-গ্রেড, টপ গ্রেড শিল্পীদের বেশিরভাগই প্রয়াত হয়েছেন। যাঁরা আছেন, বয়সের জন্যে তাঁদেরও আর আগের গলা নেই" – বৃদ্ধের ফর্সা মুখ লাল হয়ে ওঠে, "রবিঠাকুরের গান তাহলে বন্ধ হয়ে যাবে বল? তার ওপর আছে আবার যন্ত্রের যন্ত্রণা। আমার গানের সঙ্গে যাতে হারমোনিয়াম বাজানো না হয়, এই মর্মে একটা আবেদন করেছিলাম একসময়ে। তা তোমাদের 'বেতার জগৎ' সেটা ছেপেও ছিল যত্ন করে। কিন্তু এখন যাঁরা গাইতে আসেন, তাঁদের পিছু পিছু আসে একগাড়ি বাজনাবদ্যি। গানের বাণীই তাতে ঢাকা পড়ে যায়।"

    -- "আপনি বোধহয় স্টেজ পারফরমেন্স বা প্রাইভেট রেকর্ডিংয়ের কথা বলছেন, স্যার। আমাদের এখানে কিন্তু শিল্পীরা এখনও খুব কম যন্ত্রসঙ্গীত নিয়েই গান করেন।" সঙ্গীত বিভাগের একজন আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। বৃদ্ধ মানুষটিকে হঠাৎ খুব বিমর্ষ দেখায়। "জালিয়ানওয়ালাবাগের পর সেই যে নাইটহুড প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, তারপর থেকে এই 'স্যার' সম্বোধনটা সইতে পারি না, জানো। রক্তে যেন জ্বালা ধরিয়ে দেয়।"

    --"ওহো, ভেরি স্যরি। আপনি বরং ওপরে আমাদের প্রোগ্রাম সেক্শনটা একটু দেখবেন চলুন। কাছ থেকে আপনাকে একটু দেখবে বলে আমাদের সব দপ্তরের সহকর্মীরা বারান্দায় কেমন ভিড় করেছেন দেখুন না। এরমধ্যে বাইরে থেকে আসা লোকও জুট গেছে জনাকয়।" প্রবীণ মানুষটি একটু কষ্ট করেই ওপরের দিকে তাকাতে চেষ্টা করেন। রবিদা, গুরুদেব, রবিন কাকু, ঠাকুর জ্যেঠু -- সম্মিলিত কলরবে মনটা বোধয় ভালো হয়ে যায় তাঁর। একটু আগের গানের কাজিয়া ভুলে সিঁড়ির দিকে পা-বাড়ান। "একি, লিফটে যাবেন তো--" দু'একজন ছুটে আসে। স্মিত হেসে বলেন, "না বাবা, ওই বদ্ধ খাঁচায় আমার প্রাণপাখিটা ধড়ফড় করে। হেটো-মেঠো মানুষ তো, আমার জন্যে সিঁড়িই ভালো। তা তোমাদের বুঝি অনেকগুলি বিভাগ?" পাশেপাশে উঠতে উঠতে আঙুলের কর গুনে কে-অর্ডিনেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার বলতে শুরু করেন, "তা ধরুন বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, সাঁওতালি ভাষায় তো নিয়মিত অনুষ্ঠানই হয়। এছাড়াও আছে সংগীত, এফএম, যুববাণী, শিশুমহল, মহিলামহল, খেলা, চাষবাস, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, আইন, অর্থনীতি, শ্রমজীবীদের জন্যে অনুষ্ঠান। কয়েক বছর হল শুরু হয়েছে অন্তর্দেশীয় প্রচারতরঙ্গে নতুন চ্যানেল 'আকাশবাণী মৈত্রী। প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকেও শোনা যায় এই অনুষ্ঠান। কথা ছিল বাংলাদেশ থেকেও অনুষ্ঠান পাওয়া যাবে, তা সেটা এখনও পাওয়া যায়নি ততটা।"

    -- "যায় নি বুঝি? বেশ, এইতো পরের মাসেই আমার ঢাকা যাওয়ার কথা। হাসিনা মা-কে মনে করিয়ে দেব না হয় অনুষ্ঠান আদানপ্রদানের কথাটা।"

    সঙ্গী ছেলেটি একটু থতমত হয়ে তাঁর দিকে তাকাতে তাকাতেই দোতালায় পৌঁছে গেল। সিঁড়ির মুখোমুখি ঘরটির দরজায় হাসিমুখে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে। "আজ্ঞে, আমরা বিজ্ঞাপন বিভাগ। বেতারের সময় বিক্রি করি। এই যে আমাদের রেট কার্ড। রেখে দিন না আপনার জোব্বার পকেটে। কখন কী কাজে লাগে।"

    -- "বাঃ, রেডিওতে বিজ্ঞাপনও দেওয়া যায় এখন! আমার বইয়ের কাটতি আজকাল কমে যাচ্ছে। তা বিশ্বভারতী তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তো পারে। বলব'খন।"

    -- "কিছু মনে করবেন না, গুরুদেব, এই বাজারে ব্যবসার স্ট্রাটেজিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ওই সন্নিসি-রঙা মলাট পাঠককে আর টানে না। তাছাড়া নামটামও একটু ঝক্কাস করতে হবে তো, নাকি? ধরুন, 'একমুঠো রবীন্দ্র' কিংবা 'বাসে বাসে বিশ্বকবি' -- এখন এগুলোই খাবে।"

    --"খাবে বুঝি? ও!" বৃদ্ধ হাঁ - করে শুনছিলেন, হঠাৎ যুববাণীর হাফ ডজন গাছপাকা ছেলেপুলে হৈ-হৈ করে এসে ঘিরে ফেলল তাঁকে -- "সেলফি প্লিজ!" হাতে তাদের উদ্যত মোবাইল। এক আদুরে কন্যে তো প্রায় গলাই জড়িয়ে ধরে আর কি -- "একটা 'বাইট' কিন্তু দিতেই হবে আমাকে বলে দিলাম, উঁ?" এবার দৃশ্যতই বিব্রত দেখায় তাঁকে। সরে দাঁড়াতে গিয়ে টের পান চক্রব্যূহের মধ্যে আছেন। বারান্দার একটা দিকে নাটকের ঘর। একটা রিহার্সাল চলছিল সেদিন। কিন্তু খবর পেয়ে সেসব মুলতুবি রেখে অভিনেতা, প্রযোজক সবাই বাইরে এসে ভিড় করেছে। স্মার্ট প্রযোজক এগিয়ে এসে পরিচয় দিয়ে বললেন, "বাই জোভ,আপনার নাটকের কিন্তু এখনও হেব্বি ডিমান্ড, দাদা। এবার শম্ভূ মিত্রের রেট্রোতে 'রক্তকরবী' বাজাতেই ফোনের পর ফোন।"

    -- "কেন, রেট্রো ছাড়া আমার 'ডাকঘর', 'অচলায়তন' লোকে কি আর শুনতে চায় না? মানিক কতগুলো ফিল্ম করে ফেলল, সে তুলনায় রেডিওতে রবীন্দ্রনাটকের প্রচারটাই তো কম। সারাটা বছরে তোমাদের রবিপুজো বলতে তো শুধু ওই পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ।" নাটক জিভ কাটে, "আপনি খামোকাই রাগ করছেন, দাদা, মানছি আপনি হাত খুলে লিখে গেছেন, সে লেখার কোয়ালিটি নিয়েও কোন কথা হবে না, কিন্তু আমাদেরও তো টিকে থাকতে হবে, বলুন। কনটেম্পোরারি সমাজচিত্র না পেলে পাবলিক শুনবে নাটক? এমনিতেই আজকাল লোকে বলে রেডিও নাকি মান্ধাতার আমলেই পড়ে আছে।"

    কথার মধ্যেই কোথা থেকে মোবাইল হাতে নিয়ে প্রায় নাচতে নাচতে এসে পড়ে একটি মেয়ে। চোখ মুখ ঘুরিয়ে অদ্ভুত গলায় বলতে থাকে, "এসে গেছি শ্রোতাবন্ধুরা, এই বিন্দাস বিকেলে, আপনাদের জন্যে একটা ঝক্কাস গিফট নিয়ে। কী বলুন তো সেটা? স্যরি, কী নয়, কে? ইউ জাস্ট কান্ট ইমাজিন -- শ্রীল শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! বিষম খাবেন না প্লিইইজ।" আশপাশ থেকে চটপটাপট হাততালিতে বেজায় চমকে সরে যেতে চেষ্টা করেন আগন্তুক। -- "আরে আরে, এসব কী হচ্ছে?"

    "ও কিছু না। 'ফেসবুক লাইভ' করছে এফএম থেকে।" সগর্বে ঘোষণা করেন এফএম-রামধনুর তরুণ প্রযোজক। বৃদ্ধ আপনমনে বলেন, "বড় বেশি অনার্য শব্দের ব্যবহার হচ্ছে আজকাল। হাততালির শব্দে চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে যায় বলে শান্তিনিকেতন আশ্রমে তালির বদলে 'সাধু সাধু' বলা চালু করা হয়েছিল।" মৃদু দীর্ঘশ্বাস পড়ে তাঁর।

    "এখানে কি সার্কাস হচ্ছে, ভাই? এই কাজের সময়ে কে একটা বহুরূপী নাকি রবিঠাকুর সেজে এসেছে?" নিউজ রুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছেন মাঝবয়েসি অধিকর্তা। "বহুরূপী হবেন কেন, উনি তো বলছেন উনিই রবীন্দ্রনাথ। পুরোনো অনেক কথা বলেও দিচ্ছেন ফটাফট।" ভিড়ের মধ্যে থেকেই প্রতিবাদ ওঠে। "তবে আর কি, চমৎকার! তা ইনি কি ভূত, না অতিমানব, নাকি রেজারেক্টেড রবি -- 'বিশ্বকবির পুনরুত্থান' বলে খবর করে দেবে মিডিয়া। কত যে ফ্রড ঘুরে বেড়াচ্ছে চারিদিকে তার খোঁজ রাখেন আপনারা? আপনি কে ঠিক করে বলুন তো মশাই।" ঝুকে পড়া মানুষটি একটু সোজা হয়ে দাঁড়ান। সহজ গলায় বলেন, "ভূত ভবিষ্যত কিছুই নই, বলতে পারেন, 'ভার্চুয়াল রবীন্দ্রনাথ'। ভোর থেকে দেখছি এই বাড়িটাতে প্রাণ ঢেলে সবাই বড় ডাকাডাকি করছে আমাকে। তাই আর থাকতে না পেরে চলে এলাম। হ্যাঁ, ভালো কথা, আমাদের বিশ্বভারতীর যত গন্ডগোলের খবরই দেখি তুলে ধরেন আপনারা। কিন্তু নতুন নতুন গবেষণা, কাজকর্ম যা হচ্ছে তার তো দেখি নামও করেন না।"

    -- "বেশ তো, আমাদের জেলা সংবাদদাতাকে পাঠিয়ে দেব'খন আপনার কাছে। ব্রিফ করে দেবেন তাকে। যত্তোসব !" বিরক্ত মুখে যেমন এসেছিলেন তেমনি গটগট করে ফিরে গেলেন তিনি। ইতিমধ্যে অসমবয়সি দুই মহিলাকে আসতে দেখা যায়। বড় জন সামনে এসে বিনীতভাবে বলেন,"আপনাকেই খুঁজছিলাম, গুরুদেব। এক্ষুনি 'মহিলামহল' শুরু হবে। আমাদের রান্নার স্লটটাতে সেই মৃণালিনীদেবীর রান্নার কথাটা যদি ছোট্ট করে একটু বলে দেন। সেই যে আপনি নিজে বলে যেগুলো করাতেন।"স্টুডিওতে যেতে হবে না, এখানেই রেকর্ড করে নেবে। রিনি কোথায় গেলি, রেকর্ডারটা নিয়ে আয়না চট করে। আর তোরা যে সব হাঁ - করে দাঁড়িয়ে আছিস, প্রবীণ মানুষটাকে দাঁড় করিয়েই রাখবি?" কোথা থেকে একটা চেয়ার চলে আসে। মহিলা এদিকওদিক তাকিয়ে নিজেই তাতে গ্যাঁট হয়ে বসে পড়ে হাঁফাতে থাকেন -- "ইয়ে, যদি কিছু মনে না-করেন, আপনার বয়সটা ঠিক কত বলব এখন, ১৬০ তো?" ভদ্রলোকের গলাটা ক্লান্ত শোনায়, "না। মৃত্যুর পর তো কারুর বয়স বাড়ে না। যাত্রা যেখানে থেমে যায়, সেখানেই মানুষের ইতি। আর তার এগনোও নেই, পিছনোও না।" রিনি ডিজিটাল রেকর্ডার 'অন' করতে করতে মহিলার কানে ফিসফিস করে, "স্কিন কেয়ার টিপসটাও নিয়ে নিই, ম্যাম, এই বয়েসেও জেল্লা দেখছেন!"

    জোব্বাপরা মানুষটিকে ঘিরে ভিড়টা করিডর ধরে একটু একটু করে এগোতে থাকে। আর কো-অর্ডিনেশনের দায়িত্বে থাকা অফিসার তাদের সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে হোঁচট খেতে খেতে পিছিয়ে পড়তে থাকেন ক্রমাগত। এইসময়ে সবাই দেখতে পায় শিশুমহলের ঘর থেকে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে আসছে দুটি লরেল-হার্ডি বালখিল্য। একজন প্রায় গড়িয়ে, অন্যজন একরকম উড়ে। পিছন পিছন চোর-পুলিশের কায়দায় ছুটছেন সম্ভবত তাদের দুই মা। গোটা ভিড় ঘাবড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কাছাকাছি এসে মায়েরা হাতজোড় করে অনুরোধ করেন, "ছেলেমেয়েকে কোলে নিয়ে গুরুদেব যদি একটা ছবি তোলেন। ভাগ্যিস আজ অডিশনের ফর্মটা জমা দিতে এসেছিলাম। নইলে লাইফটাইম চান্স-টা মিস হয়ে যেত তো !" ছানাপোনা দুটি ততক্ষণে সময় নষ্ট না করে দাদুর আলখাল্লা বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। গোলগাল বাচ্চাটি পকেটে পা-বেধে উল্টে পড়তেই তার মা কান পাকড়ে বকতে শুরু করেছেন, "পারলি না তো! দিনরাত আরও পিৎজা-পাস্তা খা।" চেঁচামেচি কান্নাকাটিতে সে এক হট্টমেলার দেশ। ওদিকে এফএমের ঘরে দুই চ্যানেলের দুই অফিসারের প্রায় হাতাহাতির উপক্রম। দুজনেই চায় রাত দশটার অনুষ্ঠানে বিশ্বকবিকে হাজির করতে। প্রাইভেট চ্যানেলগুলো খবর পায়নি এখনও পর্যন্ত, এহেন সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়! বাইরে রথের মেলার মতো শব্দকল্পদ্রুম শুনে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে এবার আসরে নামলেন বাংলা কথিকা বিভাগ। খবরটা আগেই কানে গেছিল, কিন্তু ঠিক বিশ্বাস না-হাওয়ায় গা-করেন নি এতক্ষণ। নেপোয় দই মেরে নিয়ে যাচ্ছে দেখে তৎপর হয়ে এগিয়ে এসে ভারী গলায় ঘোষণা করেন, "আইনত, ধর্মত রবীন্দ্রনাথের ওপর প্রথম দাবি তো বাংলা বিভাগেরই, নাকি? তোমরা অযথা এত বিরক্ত করছো কেন ওঁকে? আসুন গুরুদেব, আমাদের ঘরে একটু বসুন। একটু কালো কফি খান। ছোট করে আপনার একটা সাক্ষাৎকার প্ল্যান করে নেওয়া যাক। শঙ্খবাবু নিলেই তো ভালো হয়, কী বলুন/ আপনার নাম শুনলে যে কোন কবি, সাহিত্যিকই অবশ্য হামলে পড়বে, তাবলে যাকে তাকে তো আর -- এই কে ওখানে?"

    লাজুক মুখে ঘরে ঢোকে ছেলেটি -- "আজ্ঞে আমি চাষবাসের বিভাগটা দেখি। আপনার সাহিত্য নিয়ে যত কথা হয়, শ্রীনিকেতনের ভাবনাটা নিয়ে চর্চা হয় তার চেয়ে কম। আপনার মুখ থেকেই সরাসরি একটু যদি রেকর্ড করতে পারি।"

  • -- "বলব, নিশ্চয়ই বলব। রথীকে তো বিদেশে পাঠিয়েই ছিলাম চাষের নতুন নিয়মকানুন শিখে আসতে --"

    এই গায়ে পড়া আলাপচারিতে বাংলা-বিভাগ দৃশ্যতই বিরক্ত হয় -- "আচ্ছা সে হবে'খন। নিন, কফি খান গুরুদেব। আমি বরং শঙ্খদাকে ফোনটা করে নিই কী বলেন।"

    এই গরমে চা-কফি তো বড় একটা খাই না বাবা।

    -- "তাহলে কোল্ড ড্রিঙ্কস? খাননি তো কিছু সেই সকাল থেকে। আমাদের ক্যান্টিনে ডিম-পাঁউরুটিটা কিন্তু খুব ভালো করে।"

    "না না থাক। জান তো চিরকালই আমি স্বল্পাহারি। তা বাবা, এখানে তো শুনেছি লীলা কাজ করত। লীলা মজুমদার। আমার শতবর্ষের অনুষ্ঠানের দায়িত্ব প্রথমে দেওয়া হয়েছিল অমল হোমকে। অমল অসুস্থ হয়ে পড়লে সামলেছিল তো লীলাই। আর একটা ভালো কাজ করেছিল আকাশবাণী সেবছরই। দেশের সবকটি ভাষায় আমার গান অনুবাদ করে বাজানো হয়েছিল। সুর যাতে অবিকৃত থাকে তার জন্যে শান্তিদেব ঘোষের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল কমিটি। সে রেকর্ড আছে এখনও?"

    "আছে বৈকি। সেই সঙ্গে আছে আমাদের গীতবিতান প্রজেক্ট। ওই প্রজেক্টের জন্যে দক্ষিণের বালমুরলীকৃষ্ণ আপনার গান গেয়েছিলেন জানেন কি?"

    "তাই বুঝি? --"

    "দরজা আবার ফাঁক হয়। মিষ্টি এসে মাথা গলিয়েছে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের প্রেজেন্টার -- "ক্যান আই গেট আ স্লট টু?"

    "ও বাবা, এ আবার কোন স্লটের কথা বলে গো?" স্মার্ট মেয়েটি ততক্ষণে ঘরে ঢুকে পড়েছে। দু-এক কোথায় প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দিয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতে পাশ্চাত্য সুরের প্রভাব নিয়ে একটা ইন্টারভিউ চাই তার। বৃদ্ধ বিব্রত মুখে তাকান। এরকম আর কতগুলো বিভাগ আছে বল তো তোমাদের? আর কতজন এসে চড়াও হতে পারে?"

    "ঝুঁকি মোটামুটি পার করে ফেলেছেন। বাকি যারা আছে খেলা, বিজ্ঞান বা স্বাস্থ্য তারা কি আর নাক গলাবে?"

    বৃদ্ধ হেসে ফেলেন। বিজ্ঞানের একটা হালকা সম্ভাবনা আছে কিন্তু। আমি যে 'বিশ্বপরিচয়' নামে বিজ্ঞানের একটা গোটা বই লিখেছিলাম এখনও কম লোকই তা জানে। বলতে বলতেই পর্দা দুলে ওঠে। 'আসতে পারি?' সাদা-মাঠা চেহারার যুবকটি ঢুকতেই বাংলা কথিকা ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে -- "তুই তো ইন্ডাস্ট্রিয়াল। তোরও চাই? 'মজদুরমণ্ডলী'ও রাবীন্দ্রিক হচ্ছে নাকি আজ?"

    "কেন ভাই রবিঠাকুরের ইজারা কি কেবল তোমরা নিয়েছ? শ্রমিক-মজুর ব্রাত্য? কবি নিজেই না বলেছিলেন, 'যারে তুমি নিচে ফেল সে তোমারে টানিছে যে নিচে।' কি কবি বলেন নি?"

    "তা বাপু কত এতোল বেতোলই তো বলে গেছি আজীবন, এখন তোমার বক্তব্যটা শুনি।"

    "কথা খুবই সামান্য। আপনার সাহিত্য, সঙ্গীত নিয়ে সত্যি বলতে কি খুব একটা মাথাব্যথা আমার কোনদিনই ছিল না। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালে আর সারা জীবনের পড়াশুনা, চাকরি বাকরি সংসার প্রতিপালনের চাপ না থাকলে অমন দু-চারটে আমিও হয়ত লিখে ফেলতাম -- বলা যায় না। সে কথা থাক। ছোটবেলা থেকে যেটা ভেবে আমার তাক লেগে যায়, ভেবে ভেবে কূল পাই না তা হল, আপনি নিজেই মশাই একটা ইন্ডাস্ট্রি! এই দেখুন না, জীবনের আশিটা বছর ধরে আপনি এত লিখেছেন যে তা ছেপে, অনুবাদ করে কুলোতে পারছেন না প্রকাশকেরা। কত শিক্ষক, অধ্যাপক আপনার সাহিত্য সৃষ্টির গলি থেকে রাজপথে ঘুরতে ঘুরতে, পড়তে পড়তে আর পড়াতে পড়াতে সটান স্বর্গে চলে গেলেন। কত গবেষক পিএইচডি করে ফেললেন। যত গান লিখেছেন, গেয়ে, বাজিয়ে, রেকর্ড করে ছোট, মেজ, বড় কত শিল্পী এলেন আর গেলেন; গানের মাস্টারমশাইরা করে খাচ্ছেন, অলিতে গলিতে গজিয়ে উঠছে গানের ইস্কুল, গলা কাঁপিয়ে কবিতা পড়ে নাম কিনছেন আবৃত্তিকার। গল্প, উপন্যাস, নাটকের তো কথাই নেই। মঞ্চ, সিনেমা, শ্রুতিনাটক, রেকর্ড, সিডি, ইউটিউব চ্যানেল চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলেছে। সিরিয়ালের পাবলিকরা শুধু এখনও আপনাকে ঠিক ততটা ছাঁচে ফেলতে পারে নি। যাত্রাদলগুলোও তেমন ভাবে খাপ খোলেনি। তবু পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ বছরে এই দুটো রবিপুজোর মরসুমে গ্রাম-শহরে-মফস্বলে কতগুলো হল যে আপনার নামে ভরে থাকে আজও তার ইয়ত্তা নেই। ওদিকে আপনার নামে আস্ত একটা বিশ্ববিদ্যালয় চলছে এত বছর।

    শুধু আপনার বই ছেপে আর অনুষ্ঠানের মঞ্চ বেঁধেই জীবিকা নির্বাহ করছে কত মানুষ। আর এই যে আমাদের মতো রেডিও টিভিওয়ালারা -- রবীন্দ্রসঙ্গীত আর রবীন্দ্রসাহিত্য দিয়ে কতখানি সময় ভরাট করছি বলুন দেখি দৈনিক। পত্রপত্রিকাই বলুন বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া আপনার নাম আর ছবির বিজ্ঞাপন দেখিয়ে কত কোটি টাকা কামিয়েছে বলুন দেখি!"

    -- "থাম বাপু, মাথা ঝিম ঝিম করছে।"
    -- "মাথা আমারও ঝিমঝিম করে জানেন। সবাই আপনাকে ইয়াব্বড় সাহিত্যিক বলেই পুজো করে গেল, আপনি যে কত বড় শিল্পপতি সেদিকটা কেউ খেয়ালই করল না।"
    -- "শিল্পপতি! তা বলেছ ভালো। পুঁজিবাদী বলে লোকে আমাকে আকছার গাল দেয় বটে। জমিদার বাড়িতে জন্মেছিলাম কিনা, গোড়াতেই গলদ। অথচ দেখ তাতে তো আমার হাত ছিল না কোন। বাঁধা গতের লেখাপড়া ভালো লাগত না, তা বলে মুখ্যু হয়ে থাকিনি, পড়েছি নিজের মতো করে। বিলাসিতা করেও দিন কাটিয়ে দিতে পারতাম। বউয়ের গয়না বেচে ইস্কুল করতে কেউ তো আর মাথার দিব্যি দেয় নি আমায়। লেখালিখি করেও দিব্যি চলে যেত। নোবেল পেয়ে বরাতটাও খুলে গিয়েছিল বেশ।"

    -- "ওইখানেই তো মজা। শিল্পপতি হলেও পুঁজিপতি আপনাকে বলা যাবে না কক্ষনো। ব্যবসা আপনার দুনিয়াজোড়া বটে। কিন্তু ব্যক্তিগত মুনাফা তেমন নেই। করে খাচ্ছি আমরা -- আপনি শুধু ধারণ করে আছেন আপনার এক আকাশ প্রতিভার ছায়া মেলে। এ এক আশ্চর্য ম্যাজিক। তাই বলতে এলাম আপনার কোন রেকর্ডিং চাই না আমার -- শুধু একটি বার প্রণাম করতে চাই।"

    কথার মধ্যে হঠাৎ ব্যস্তসমস্ত হয়ে একসঙ্গে অনেকে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে ঘরে। সিকিউরিটি অফিসার প্রচন্ড উত্তেজিত। "ঠাকুরদা, সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিভাবে যেন বাইরে খবরটা ছড়িয়ে গেছে। আমাদেরই কেউ চেনা পরিচিতদের ফোন করে কেলেঙ্কারিটা বাঁধিয়েছেন মনে হয়। এখন দলে দলে লোক আকাশবাণী ঘিরে ফেলেছে। ছোট-বড়, গরিব-বড়লোক, সংস্কৃতি-রাজনীতি, আমরা-ওরা, সব্বাই এসে ভিড় করেছে। দাবি একটাই, একটিবার দেখতে চায় আপনাকে। এ অবস্থায় আপনি কোনভাবে বাইরে বেরোতেই পারবেন না। আমরা যদিও পাঁচটা গেটই বন্ধ করে দিয়েছি, কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ ঠেকানো যাবে বলে মনে হয় না। লোকে দেওয়াল বাইতে শুরু করেছে, দরজাও ভেঙে ফেলতে পারে।"

    -- "আবার এক বাইশে শ্রাবণ!" বৃদ্ধ মাথা নিচু করে উচ্চারণ করেন।
    -- "কিছু বললেন?"
    -- "নাহ। অনেক পুরনো একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। তা আমাকে তোমরা কী করতে বল এখন?"
    -- "কিছুক্ষণের জন্যে একটু গা-ঢাকা দিতে হবে গুরুদেব। সন্ধ্যার আগে এখান থেকে বেরলে মবড হয়ে যাবেন। আমাদের এই ছেলেটি আপনাকে এসি প্ল্যান্টে নিয়ে যাবে। সেখানে খানিকখন দরজা বন্ধ করে থাকলে কেউ আপনার হদিস পাবে না। ভয় নেই, ওখানে লোক থাকবে আমাদের। ওদিকে প্রেস তো এসে পড়ল বলে। তখন কী বলে যে সামলাব ব্যাপারটা, আমার তো কিছু মাথাতেই আসছে না।"
    -- "কেন, বলে দেবে তোমরা আজ একটা স্পেশাল নাটক করছিলে। তার জন্যে রবিঠাকুর সাজাতে হয়েছিল একজনকে। এতটাই রিয়ালিস্টিক হচ্ছিল অভিনয়টা যে অনেকে তাকেই সত্যি রবীন্দ্রনাথ বলে ভুল করেছে।"
    -- "তারপর? যদি বলে, গেল কোথায় লোকটা!"
    -- "বাহ্ রে! সাজ বদলে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে কখন বেরিয়ে গেছে বলা যায় নাকি! সত্যি সত্যি রবিঠাকুর তো আর নয়।"
    -- "ঠিক বলেছেন। আপনি তবে -- ওই যেমন বললাম। অপরাধ নেবেন না প্লিজ।"

    নিচের স্টুডিওতে ঢুকে কবিগুরুর মূর্তিটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন বৃদ্ধ। ভাস্কর্যের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে যেন অনেক দূর থেকে বললেন, "সুধীর কিন্তু কাজটা খুব ভালো করেছিল, বল। আমার যেখানে যত মূর্তি দেখেছি -- ," তারপর মজদুরমন্ডলীর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে কৌতুকের গলায় বললেন, "এটা কিন্তু তুমি বল নি -- কত লোক যে আমার ছবি এঁকে আর মূর্তি বানিয়ে সংসার করছে এত বছর!" এই প্রথম শব্দ করে হাসতে শোনা গেল বুড়ো মানুষটিকে। সবাই তখন বাইরে জনতা সামলাতে ব্যস্ত। মজদুরমন্ডলীর ছেলেটি ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে চাইল -- "ওরা এসে যাবে, চলুন।" কিন্তু দরজার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকিয়েই চমকে উঠল সে। এই তো ছিলেন, কোথায় গেলেন ভদ্রলোক! কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলেন কর্মীরা। যাক বাবা -- খুব ঝামেলা করে সামলান গেছে উত্তেজিত জনতাকে। কিন্তু ভার্চুয়াল রবি? কোথায় তিনি? এসি প্ল্যান্ট তো ফাঁকা। সঙ্গী ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করা হল। সে কেমন উদাস চোখে বলল, জানি না। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করেও খুঁজে পাওয়া গেল না বৃদ্ধকে। পঁচিশে বৈশাখের বিকেলে মালা পরা রবীন্দ্র-মূর্তির সামনে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে তখন সবাই ভাবছে ঘটনাটা আদৌ ঘটেছিল কী? যদি না ঘটেই থাকে তবে সবাই মিলে সারাদিন একই স্বপ্ন দেখল কি তারা? ধুর! তাও আবার হয় নাকি!
    --------------------
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৯ মে ২০২১ | ১২৭৫ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সুকুমার ভট্টাচার্য্য | 103.27.140.173 | ১৫ মে ২০২১ ২২:২৫106042
  • চমৎকার লেখা। পড়তে পড়তে তো আমিও ভার্চুয়ালী গুরুদেবকে পেয়ে গেলাম।


    অসাধারণ কল্পনা আর আকাশবাণী ভবনের জীবনের সাথে ছন্দে মেলানো।


    কৃষ্ণশর্বরী দাশগুপ্তর লেখা আরও চাই।

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন