• হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • করোনাভাইরাস ক্রান্তিকাল ও আমেরিকার মহাসঙ্কট -- ডঃ পার্থ ব্যানার্জী, নিউ ইয়র্ক

    বকলমে লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৫ এপ্রিল ২০২০ | ৬৮৩ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • -- ১ --
    ___________________________
    এপ্রিল ৯, ২০২০

    পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে ধনী দেশ, "স্বপ্নের দেশ" আমেরিকায় আজ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৪ লক্ষ ৩৫ হাজার মানুষ। মৃত ১৫,০০০। রাতারাতি কর্মহীন প্রায় দু কোটি আমেরিকান। এই হলো শুধু সরকারি হিসেব।

    এই আলোচনাটার এখন আদৌ কোনো দরকার আছে কি? এই প্রশ্ন হয়তো অনেকেই করবেন।

    বলবেন, এই সঙ্কটের সময়ে রাজনীতির আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। এখন শুধু প্রয়োজন মানুষের জীবন বাঁচানোর।

    অনেকে বলবেন, যেমন সবসময়েই বলে থাকেন, আপনি আমেরিকায় থেকে আমেরিকা সম্পর্কে সবসময়ে নেগেটিভ কথা লেখেন কেন? এতোই যদি আমেরিকা-বিদ্বেষ, ডলার কামানো ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে এলেই তো পারেন।

    (এই মুহূর্তে অবশ্য ডলারও কামানো সম্ভব হচ্ছেনা, কারণ প্রভুদের দয়ায় আমার চাকরিটাও রাতারাতি গেছে। যাক সে কথা।)

    ঠিক যেমন এখানে আমার ইংরিজি লেখাগুলো পড়ে মার্কিন বন্ধুদের মধ্যেও কয়েকজন বলে থাকেন, এতোই যদি আমেরিকার সমালোচনা, তাহলে এখানে পড়ে না থেকে কেটে পড়লেই তো হয়। এসব আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। গরিব ঘরে জন্মেছিলাম তো, অনেক লড়াই করেছি বেঁচে থাকার জন্যে। গায়ের চামড়া গণ্ডারের মতো হয়ে গেছে। এসব কথায় আমার কোনো প্রতিক্রিয়া এখন আর হয়না।

    ভারতে থাকলে ভারতীয় শাসকশ্রেণীর ও জনবিরোধী শাসনের কঠোর সমালোচনা করলে যেমন ভারতবিদ্বেষী, দেশদ্রোহী হওয়া বোঝায়না, ঠিক তেমনই আমেরিকায় থেকে আমেরিকার অত্যাচারী, সভ্যতাবিরোধী রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার চালিকাশক্তি ওয়াল স্ট্রীট, মিডিয়া ও যুদ্ধ কর্পোরেশনগুলোর বিরুদ্ধে কথা বললে আমেরিকাবিদ্বেষ বোঝায়না।

    প্রকৃতপক্ষে, সত্যের ওপর নির্ভর করে অত্যাচার, অনাচার, মিথ্যা, ঘৃণা, হিংসা এবং দেশের সম্পদ ও শ্রমকে লুঠপাট করার প্রকাশ্য ও গোপন ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেওয়া হলো আসল দেশপ্রেম। এবং মানুষকে যাচাই করা সত্য ও তথ্যনির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হলো শুধু দেশপ্রেম নয়, ঈশ্বরপ্রদত্ত ব্রত ও কর্তব্য।

    সুতরাং, আজকের এই মহাসঙ্কটের দিনে মানবসভ্যতার অশনি সংকেতের কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করা আমার কাছে আসল ধর্ম ও বিবেক।

    --২--

    আমেরিকার কেন এই শোচনীয় দশা?
    __________________

    এই আজকেও, এই মৃত্যুর মিছিলের মধ্যেও, আমাদের ব্রুকলিনের বাড়ির সামনে দিয়ে মাঝে মাঝে কিছু লোক হেঁটে যাচ্ছে। তাদের মুখে কোনো মাস্ক নেই। কিছু কিছু গাড়ি মাঝে মাঝে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেও কোনো সাবধানতা অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছেনা তাদের। জানলার কাচ নামানো। চালকের মুখে মাস্ক নেই।

    এই দেশটাই এমন। কেউ জানেনা। আমেরিকা সম্পর্কে এমন একটা মায়াজাল সৃষ্টি করা হয়েছে বহুকাল ধরে যে মানুষ জানেইনা এদেশের আসল চেহারাটা কেমন। এই করোনাভাইরাসের মৃত্যুর মিছিল তাই তাদের একটু হলেও ভেতর থেকে শক দিয়েছে। কট্টর আমেরিকাপন্থীরাও একটু মুশকিলে পড়ে গেছে তাদের নিজের কাছে, পরিবারের কাছে, বন্ধুদের কাছে ব্যাপারটার কারণ ব্যাখ্যা করতে। কোনো যুক্তিই খাটছেনা।

    সুতরাং, "এখন রাজনীতি করার সময় নয়" -- এই হলো তাদের এখনকার মাস্টারমশাইদের বেত।

    সবচেয়ে পপুলিস্ট যুক্তিগুলো যা তারা সবসময়ে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে তা হলো এই।

    (১) আমেরিকার সমস্যার মূলে হলো মেক্সিকান ও অন্যান্য দেশের ইমিগ্রেন্টরা। (ঠিক যেমন আমাদের দেশে হিন্দুত্ববাদীদের বাংলাদেশী বা পাকিস্তানী ইমিগ্রেন্ট সম্পর্কে অপপ্রচার।)

    সেটা এখন খাটছেনা, কারণ পাশের দেশ ক্যানাডায় ঠিক আমেরিকার মতোই পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক সিস্টেম, এবং সারা পৃথিবী থেকে ইমিগ্রেন্টরা সেখানেও এসেছে বিশাল সংখ্যায়।

    কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসে আজ পর্যন্ত মৃত্যু ১৫,০০০। ক্যানাডায় ৪৫০। আর এক সমান্তরাল দেশ অস্ট্রেলিয়াতে আরো কম।

    (২) আমেরিকার সমস্যার মূলে হলো "কালুয়া" বা "কাল্লুদের" অলসতা ও বসে বসে ওয়েলফেয়ার চেক নেওয়ার প্রবণতা। (ঠিক যেমন আমাদের দেশে গরিব "নিম্নবর্ণের" মানুষদের সম্পর্কে সবসময়ে বলা হয়ে থাকে।)

    অথচ, ঠিক আমাদের দেশের ওই দলিত বা নিচু জাতের মানুষদের সবচেয়ে নিচুতলার কাজগুলো না করলে যেমন আমাদের মতো সুখী লোকেদের চলবেনা -- আমরা শুধু চন্ডীপাঠ করতে পারি, কিন্তু জুতো সেলাই বলুন, বা মলমূত্র সাফ করা বলুন, এমনকি মৃতদেহ সৎকার বলুন, ওই নিচু জাতের লোকেদের ছাড়া আমাদের "সভ্যতা" অচল। ঠিক তেমনই আমেরিকায় ওই গরিব কালো মানুষগুলোর, এবং এখনকার দিনে মেক্সিকো বা বাংলাদেশ বা কলম্বিয়া কি গুয়াতেমালা থেকে আসা মাইগ্রেন্ট শ্রমিকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ছাড়া আমাদের বা আমাদের থেকেও সুখী আমেরিকানদের একদিনও চলবেনা। কিন্তু তাদের শ্রমের মূল্য সুখী আমেরিকানরা কোনোদিনও দেয়নি, আর আজও দিচ্ছেনা। অনাহারে কেউ হয়তো আমেরিকায় খুব একটা থাকেনা, কিন্তু অর্ধাহারে অনেকেই থাকে। অসংখ্য লোক থাকে -- বিশেষ করে ওই কালোরঙের আর বাদামি রঙের গরিব লোকগুলো আর তাদের পরিবার। অগন্তি। অসংখ্য।

    তাদের মধ্যেই কিন্তু করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ম্যাকডোনাল্ড, কে এফ সি, পিজ্জা হাট, পপআই'স চিকেন, সনিক, চেকার্স আর নানা জাঙ্ক ফুড খেয়ে, আর কোক পেপসি এবং এই ধরণের বিষাক্ত পানীয় যুগ যুগ ধরে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে মানুষগুলোর প্রতিরোধক্ষমতা একেবারেই শেষ। ওরা কেউ ইচ্ছে করে এসব খাবার খায়না। বাধ্য হয়ে খায়। কারণ, সস্তা। কারণ, বাড়িতে রান্না করে খাওয়ার সময় নেই -- সারাদিন রাস্তায় কাজ করে বেড়াচ্ছে তারা জীবনধারণের তাগিদে।

    এই হলো আমেরিকা। তার সঙ্গে যোগ করুন আকাশছোঁয়া অশিক্ষা, ধর্মান্ধতা ও বিজ্ঞানবিরোধিতা। আমেরিকার গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র আর ছত্তিসগড় -- অর্থাৎ কেন্টাকি, মিসিসিপি, টেক্সাস, লুইসিয়ানা, অ্যালাবামা, জর্জিয়া বা ক্যারোলাইনা -- সেসব জায়গায় এখনো বহু চার্চ খোলা। মানুষের বিন্দুমাত্র সচেতনতা নেই।

    এই সেদিনই এক ধর্মযাজক "গড উইল সেভ মি, আই এইন্ট নো ফিয়ার" বুক বাজিয়ে চার্চে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন। তিনি এখন ওপরে -- যীশুর কোলে। এরকম লোক আমেরিকায় কয়েক কোটি আছে।

    তাহলে সভ্য, শিক্ষিত নিউ ইয়র্কে এই অবস্থা কেন?

    --৩--

    আমেরিকায় ১৬,০০০ মৃত্যু। কেন? কে দায়ী? কী দায়ী?
    _________________________________

    ১০ই এপ্রিল, ২০২০।

    আমি যখন ৬ই মার্চ কলকাতা থেকে দোহা বিমানবন্দর হয়ে প্রথমে লণ্ডনের হিথরো এবং তারপর নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডিতে এসে নামলাম, দেখলাম প্রথম বিশ্বের এই দুটো বিশালতম এয়ারপোর্টে কোনো করোনাভাইরাস পরীক্ষা নেই। প্রায় কারুকে মাস্ক পরতেও দেখিনি। কোয়ারেন্টিন তো দূরের কথা। বরং নিজেকে মাস্ক পরে বোকার মতো লাগছিলো।

    ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসকশ্রেণী ঠিক ওই ইতালি, ইরান বা স্পেনের মতোই এই বিভীষিকা সম্পর্কে মানুষকে সাবধান করে দেয়নি। চীনও দেয়নি। ঠিক সেই একই সময়ে কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান, জার্মানি, অথবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো আপৎকালীন ভিত্তিতে টেস্টিং শুরু করেছিল, এবং এয়ারপোর্টগুলোতে কঠোর বাধানিষেধ আরোপ করেছিল।

    (কিউবা, রাশিয়া ও ভিয়েতনামও করেছিল, কিন্তু ওসব দেশের কথা আর আজকে কেই বা শোনে? ওখানে কিন্তু এই মহাসঙ্কটে মৃত্যুর হার প্রায় শূণ্য। জিরো। মঙ্গোলিয়াতে শূণ্য। ভুটানে শূণ্য। গরিব মায়ানমারে এক কি দুই। বাংলাদেশেও অনেক কম।)

    তার ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। আজকের হিসেব অনুযায়ী এখানে এই সর্বশক্তিমান, যুদ্ধবাদী আমেরিকায় ৪ লক্ষ ২৫ হাজার সংক্রমিত, এবং ১৬, ৬৯১ জনের মৃত্যু। প্রায় দু কোটি আমেরিকান দু তিন সপ্তাহের মধ্যে কর্মচ্যুত, কপর্দকহীন। ব্রিটেনে ৮,০০০ মৃত্যু।

    কিন্তু আমেরিকার পাশের আর এক পুঁজিবাদী সমান্তরাল দেশ ক্যানাডায় এখনো পর্যন্ত মাত্র ৫০০ জন মারা গেছেন। কিউবা নিজের দেশের সঙ্কট প্রতিরোধ করে ইতালি ও অন্যান্য দেশের তাদের মেডিক্যাল টীম পাঠিয়েছে। সেসব খবর আমাদের দেশে বা মার্কিনি মিডিয়াতে কখনো বলা হবেনা।

    গরিব কালো আফ্রিকার দেশগুলো আর গরিব ল্যাটিন আমেরিকার বাদামি দেশগুলো (ব্রাজিল ছাড়া) করোনাভাইরাসকে প্রায় ঢুকতেই দেয়নি। আজকেই সকালে আফ্রিকার এ্যাক্টিভিস্টদের সঙ্গে এক অনলাইন মিটিংএ শুনছিলাম, কীভাবে তারা প্রথম থেকেই এই অতিমারী সম্পর্কে সজাগ ছিল, এবং বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছিলো। যা আমেরিকা নেয়নি, ব্রিটেন নেয়নি। মৃত্যুর হারে ব্রিটেন এখন সর্বোচ্চ দেশগুলোর মধ্যে একটা দেশ। সংক্রমণ সংখ্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রথম। মৃত্যুর সংখ্যায় তৃতীয়। এ এক শোচনীয় অবস্থা।

    কিন্তু আমেরিকার মানুষ -- যাদের পরিবারের কেউ বা সহকর্মীদের মধ্যে চেনাশোনা কেউ মরেনি, তাদের কাছে এই সংখ্যার ভয়াবহতা কতটা ভয় সৃষ্টি করতে পেরেছে, আমার সন্দেহ আছে। আমেরিকার মানুষ বোধহয় ভারতের মানুষের মতোই উগ্র দেশপ্রেমে সম্পূর্ণ অন্ধ। এই দুটো দেশকেই আমি সারা জীবন খুব কাছ থেকে দেখলাম। এতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আত্মসর্বস্ব সমাজ পৃথিবীতে আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।

    যখন দেশ ছেড়েছিলাম পঁয়ত্রিশ বছর আগে, তখন ভারতে এই অবস্থা ছিলোনা। আজ ভারত শুধু যে মার্কিনি নিষ্ঠুর লাগামছাড়া কর্পোরেট পুঁজিবাদ গ্রহণ করেছে তাই নয়, সমাজবিচ্ছিন্নতা ও আমি-সর্বস্ব জীবনদর্শন আমেরিকার থেকে গ্রহণ করেছে। আজ তাই রাস্তায় কারুকে মরে পড়ে থাকতে দেখলেও ভারতীয় বা বাঙালি পাশ কাটিয়ে চলে যায়। পাশের বাড়ির একটা মেয়ের ওপর অত্যাচার হলে আমরা আমাদের দরজা জানালা বন্ধ করে টিভিটা জোরে চালিয়ে দিই। ভালো হিন্দি সিরিয়াল বা ক্রিকেট খেলা দেখি।

    আমেরিকার আজকের এই শোচনীয় অবস্থার জন্যে আমেরিকার সাধারণ মানুষ দায়ী নয়। দায়ী এদেশের শাসকশ্রেণী ও তাদের গত তিরিশ চল্লিশ বছরের নির্মম শাসন। যেখানে অর্থনৈতিক দিক থেকে মানুষকে সম্পূর্ণ কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যেখানে মানুষের শিক্ষার হার খুব কম, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা খরচের কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যেখানে সারা পৃথিবীর ধনী দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকা একমাত্র দেশ -- যেখানে স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা অধিকার নয়, প্রিভিলেজ। তোমার অর্থ থাকলে তুমি মেডিকেল ইনস্যুরেন্স কিনবে। না থাকলে তোমার ভাগ্য খারাপ। তোমার চাকরির জায়গায় যদি মেডিকেল বেনিফিট থাকে, তাহলে তোমার থাকবে। চাকরি এই আমার মতো হঠাৎ রাতারাতি চলে গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তোমার মেডিকেল কাভারেজও থাকবেনা। চিকিৎসার খরচ আকাশছোঁয়া। আমাদের দেশে যে প্রাইভেটাইজেশন বা বেসরকারিকরণ আজ দেখছেন, আমেরিকায় তা গত তিরিশ চল্লিশ বছর ধরেই আছে।

    এখানে বেশির ভাগ মানুষ জানেই না, আশির দশকের আগে পর্যন্তও এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যেও আমেরিকার অবস্থাটা সম্পূর্ণ অন্যরকম ছিল। মধ্যবিত্তের এতো দুর্দশা ছিলোনা, তারা সারাজীবন আকণ্ঠ ঋণে জর্জরিত ছিলোনা। তারা ছেলেমেয়েদের সরকারি কলেজে পাঠাতে পারতো। তারা অসুস্থ বাবামায়ের চিকিৎসা করতে পারতো ঋণে দেউলিয়া হয়ে না গিয়ে।

    আজ, আমেরিকায় আমি এমন লোককেও চিনি, কেবলমাত্র একদিনের জন্যে মেডিকেল ইনস্যুরেন্স না থাকার কারণে তাকে ও তার পরিবারকে সারাজীবন ধরে চিকিৎসার খরচের ঋণ শোধ করে যেতে হচ্ছে।

    ঠিক ওই যেদিন দুটো চাকরির মাঝখানে তার ইনস্যুরেন্সটা ছিলোনা, সেইদিন তার স্ট্রোক হয়েছিল।

    এই হলো এখনকার আমেরিকা, ও তার অমানবিক অর্থনৈতিক সিস্টেম। যে সিস্টেম এখন আমাদের দেশে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

    --৪--

    নিউ ইয়র্কে ৯২,০০০ সংক্রমিত। প্রায় ৬,০০০ মৃত। দায়ী কে?
    _________________________________
    নিউ ইয়র্ক শহরের পাঁচটা বরো। যেমন আমাদের কলকাতায় ধরুন লোকসভা আসনগুলো। একটা মোটামুটি তুলনা করলাম।

    এছাড়া, নিউ ইয়র্ক রাজ্যে আরো কয়েকটা শহর আছে -- যেমন বাফেলো (যার পাশেই নায়াগ্রা ফলস), রচেস্টার, বিংহ্যামটন, সিরাকিউজ, নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজধানী অলব্যানি ইত্যাদি। আমরা অলব্যানিতে সাত বছর ছিলাম। ছোট্ট শহর, বছরে ছমাস শীত আর বরফ। বাফেলোতে আরো বেশি।

    ওসব জায়গায় জনবিরলতার কারণে সংক্রমণ অনেক কম। আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট নেই তেমন। আন্তর্জাতিক আনাগোনা নেই। অনেকগুলো প্লাস।

    নিউ ইয়র্কে দুটো বিশাল বিমানবন্দর। তার মধ্যে জে এফ কে, বা জন এফ কেনেডি বিশালতম। সেখানে আমি যখন ৬ই মার্চ কলকাতা থেকে এসে পৌঁছেছিলাম, কোনো টেস্টিং বা স্ক্রীনিং আমি দেখিনি। ট্রাম্প ক্রমাগত মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছিলো। মিডিয়াগুলোও তাকেই রাজার মতো দিবারাত্র দেখাচ্ছিল। করোনাভাইরাস ও তার করাল গ্রাস সেই সময়েই এই শহরে থাবা বসিয়েছে। আজ নিউ ইয়র্কে ৯২,০০০ সংক্রমিত। প্রায় ৬,০০০ মৃত।

    নিউ ইয়র্ক শহর মেগা সিটি। ওই পাঁচটা বরোর মধ্যে বৃহত্তম হলো ব্রুকলিন, যেখানে আমাদের বাড়ি। এছাড়া আছে ব্রঙ্ক্স, কুইন্স, ম্যানহাটান, আর স্ট্যাটেন আইল্যান্ড।

    বোধহয় আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী শহর। আর, বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, সবচেয়ে গরিব শহর। নির্ভর করছে আপনি কোথায় থাকেন এই শহরে, এবং আপনার আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা ঠিক কী রকম।

    চার্লস ডিকেন্স সেই কতকাল আগে "এ টেল অফ টু সিটিজ" লিখেছিলেন -- ধনী ও দরিদ্রের আকাশপাতাল তফাৎ বোঝাতে। আজকের আমেরিকা, এবং বিশেষ করে আজকের নিউ ইয়র্কে থাকলে ডিকেন্স সাহেব হয়তো "এ টেল অফ মেনি সিটিজ" লিখে ফেলতেন।

    এই সব রকমের সিটিজ উইদিন দ্য সিটি -- অর্থাৎ এক শহরের মধ্যে অনেক শহর -- আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছি গত কুড়ি বছর এই নিউ ইয়র্কে বাস করে। পিরামিডটা এই রকম।

    সবচেয়ে ধনী যারা, তারা ওয়াল স্ট্রিটের বিশালতম কর্পোরেট জগতের বাসিন্দা -- ম্যানহাটানের কিছু নির্বাচিত অংশের আকাশছোঁয়া বাড়ির বাহাত্তর তলা বা ঊনপঞ্চাশ তলায় বিশাল প্রাসাদের মতো তাদের এপার্টমেন্ট। বিজনেস টাইকুন, ফিল্ম স্টার, সেলিব্রিটি বেসবল বা ফুটবল প্লেয়ার, রক স্টার, ব্রডওয়ে শোর মালিক, বিখ্যাত সাংবাদিক, লেখক, লেখিকা, ফ্যাশন ডিজাইনার, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার (গোল্ডম্যান স্যাক্স, প্রভৃতি), ডোনাল্ড ট্রাম্প।

    বাকিরা ওয়াল স্ট্রিটে প্রতিদিন কয়েকশো কোটি ডলার লেনদেন করে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারে নিউ জার্সির প্রাসাদে ফিরে যান।

    (আমাদের দেশের সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন -- খুব একটা তফাৎ নেই।)

    পিরামিডের দ্বিতীয় থাকে হয়তো উপরোক্ত উচ্চতম শ্রেণীর ব্যক্তিদের সহকারীরা, বা জুনিয়ররা। তারপর আছে রেস্টুরেন্ট চেন, গ্রোসারি স্টোর চেন, জাঙ্ক ফুড চেন ইত্যাদির ম্যানেজার গোছের লোকজন। ডাক্তার, আইনজীবী -- অবশ্য তার মধ্যেও স্তরভেদ আছে। প্রথম সারির ব্যক্তিরা যা রোজগার করেন, এঁরা হয়তো তার একশো ভাগের এক ভাগ করেন।

    পিরামিডের তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম -- এভাবে কল্পনা করুন। এদের প্রত্যেক সারির লোক আগের সারির তুলনায় মোটামুটি একশো ভাগের এক ভাগ রোজগার করেন। এবারে এদেরকে ম্যানহাটান থেকে ব্রুকলিন, নিউ জার্সি, কিংবা লং আইল্যান্ড পাঠিয়ে দিন বড় বড় বাড়িতে থাকার জন্যে।

    আমাদের এই ব্রুকলিন বরোতেই আবার হয়তো পাঁচ কি দশটা শ্রেণীবিভাগ আছে। এর মধ্যে আমরা হয়তো মাঝামাঝি জায়গাতে। আমাদের নিজেদের একটা বাড়ি আছে, এবং আমরা উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু আমরা ব্রুকলিনের পশ এলাকায় থাকিনা। সেখানে থাকে বড় বড় ডাক্তার, আইনজীবী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, মাঝারি মাপের বিজনেসম্যান, ব্রুকলিন কলেজের ডিন বা হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট। ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

    এতো কিছু কেন বলছি এই আলোচনায়? কারণ, আসল কথাটা বলতে গেলে এই ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক শ্রেণীবিন্যাসের ব্যাকগ্রাউন্ডটা দিতেই হবে।

    এবারে আসল কথা। এই ব্রুকলিন বা কুইন্স বা স্ট্যাটেন আইল্যান্ড এলাকার এমন কিছু কিছু জায়গা আছে, যেখানে মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। অর্থাৎ, না খেতে পাওয়া, প্রায় না খেতে পাওয়া, ভগ্নস্বাস্থ্য, ক্লাস এইট বা টুয়েলভ পর্যন্ত পড়ে ছেড়ে দেওয়া, ভাঙাচোরা নোংরা অস্বাস্থ্যকর ফ্ল্যাটে থাকা, ম্যাকডোনাল্ড, কে এফ সি, কোক পেপসি খাওয়া, গরমকালে রাস্তার ধারে বা পার্কের বেঞ্চিতে শুয়ে থাকা, শীতকালে সাবওয়ে ট্রেনে বা হোমলেস শেল্টারের রাত কাটানো অসংখ্য মানুষ।

    ওই বিলাসবহুল ফিফ্থ এভেন্যুয়ের বা পার্ক এভেন্যুয়ের ম্যানহাটান? ওই বরোতেই, ওই ফিফ্থ বা পার্ক এভিনিউ ধরে উত্তর দিকে আর এক কি দেড় মাইল হেঁটে গেলেই শুরু হয়ে যাবে অতি দরিদ্র পল্লী। আরো দারিদ্র্য দেখতে চান? আরো একটু উত্তরে ব্রঙ্ক্স বরোতে চলে যান। ওই পিরামিডের একেবারে নিচের তলার হতভাগ্য মানুষদের দেখতে পাবেন সেখানে। নিউ ইয়র্ক শহরের পঁচাশি লক্ষ মানুষের মধ্যে অন্তত পঁচিশ লক্ষ পিরামিডের এই মাটিতে ছুঁয়ে থাকা তলদেশে। যেখানে ওবেসিটি, যেখানে ড্রাগ, যেখানে ক্রাইম, যেখানে টিন প্রেগনেন্সি, যেখানে ডিপ্রেশন, হতাশা, যুগযুগ ধরে বঞ্চনা। যেখানে শিশুদের হাঁপানি, মায়েদের হাই প্রেসার, বাবাদের ডায়াবেটিস।

    যেখানে প্রায় নিরপরাধ মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলতে আমেরিকার পুলিশের চোখের পাতা ফেলতে হয়না। যেখানে প্রায় প্রতিটি পরিবারে অন্ততঃ একজন হয়তো অনেক বছর ধরে জেলে আছে -- তার মধ্যে অনেকেই সামান্য অপরাধে। আজকে এই করোনাভাইরাস তাদের আক্রান্ত করেছে সবচেয়ে বেশি।

    অস্বাস্থ্য, কুস্বাস্থ্য, অশিক্ষা, বিজ্ঞানচেতনার অভাব, চিকিৎসার অভাব, আর শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় শূণ্য -- এই সব মিলে কোভিড-১৯ ওই পিরামিডের তলায় চিরকাল পড়ে থাকা মানুষের শরীরে বাসা বেঁধেছে অতি দ্রুত। রাষ্ট্রের ও শাসকের সম্পূর্ণ, নিরঙ্কুশ অবজ্ঞা, অবহেলা ও বঞ্চনা।

    এদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সংখ্যা হয়তো বেশি। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ হতদরিদ্র মানুষ অনেক আছে। অনেক। তার পরে আছে গরিবের গরিব মেক্সিকো, হণ্ডুরাস, সালভাডোর, বা হাইতি, ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে আসা বাদামি গাত্রবর্ণের মানুষগুলো।

    আরো আছে। গরিবের গরিব চীনা ইমিগ্রেন্ট। আফ্রিকান ইমিগ্রেন্ট। আর আছে গরিব বাংলাদেশী, ভারতীয় ও পাকিস্তানী ইমিগ্রেন্টদের দল। যারা আমেরিকার এই নতুন বহুমাত্রিক পিরামিডের নিচের তলার অন্ধকারে বাস করা নতুন ক্রীতদাস। তাদের অনেকে একদিন স্বপ্ন দেখেছিলো।

    শুধু নিউ ইয়র্ক আর নিউ জার্সিতেই বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রায় একশো জন আজ করোনাভাইরাসের করাল গ্রাসে মৃত।

    (ক্রমশঃ)
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৫ এপ্রিল ২০২০ | ৬৮৩ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • স্বপ্নিল রায় | 141.101.98.107 | ২৬ এপ্রিল ২০২০ ১২:৪৪92699
  •  নিছক কৌতূহল 
    এই লেখাটা কি চাকরি যাবার কারণ না প্রতিফলন ?

  • Jhuma Samadder | ২৮ এপ্রিল ২০২০ ১২:২৬92761
  • অনেক কিছু জানলাম। বুঝতে চেষ্টা করলা।। বাকী অংশের জন্য  অপেক্ষা করছি।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন