• বাঙালবাড়ির কিস্‌সা ( কলিকাতা পর্ব - দশম)

    রঞ্জন রায়
    ধারাবাহিক : গপ্পো | ০৫ অক্টোবর ২০১৬ | ৯৯ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • বাঙালবাড়ির কিস্‌সা ( কলিকাতা পর্ব)
    --------------------------------------
    (১)
    ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
    ---------------------------------
    পার্কসার্কাসের ধাঙড় বাজারের সার্কাস হোটেল। সামনের ফুটপাথে একটা হাইড্রেন, তার থেকে মুখ খুলে হোসপাইপ লাগিয়ে কর্পোরেশনের লোক রোজ ভোরে রাস্তা ধুয়ে দেয়। সময়টা যে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি। তোড়ে যে জল বেরিয়ে আসে তা কিন্তু গঙ্গার ঘোলা জল, আর ফুটপাথে থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠলেই খোলা উনুন বসানো। সেখানে ঝকঝকে শিকে গেঁথে পোড়ানো হচ্ছে মশলা মাখা লালচে হলুদ রঙের মাংসের টুকরো। তৈরি হচ্ছে শিককাবাব। তার পাশেই দু'জন ময়দা মেখে লেচি বানিয়ে সেঁকছে রুমালি রুটি আর ভেজে তুলছে পরোটা।
    রাস্তার ওপারে ভাড়াবাড়ির লম্বাটে জাফরিকাটা এল-শেপের বারান্দার থেকে আমরা বাচ্চারা উঁকি মেরে দেখি কেমন কায়দা করে দুহাতের তালুতে লেচিগুলো থাপড়ে থাপড়ে আকার দেওয়া হচ্ছে আর শেষ মুহুর্তে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার বাজিগরের মত লুফে নেওয়া হচ্ছে।
    আমরা বড় হই শিককাবাবের সেঁকা-ঝলসানো-পোড়া মাংসের গন্ধ নাসায় নিয়ে, অভ্যস্ত হই । যদিও অজ্ঞাত কারণে ওখান থেকে লোভনীয় দেখতে শিককাবাব কিনে বাড়িতে আনার কথা কেউ বলে না। সেজকার বিয়ে হল খড়গপুরের ইন্দায়। সেখান থেকে নতুন কাকিমার বোন হিমানীমাসি এলেন ক'দিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন বলে। কিন্তু সারাক্ষণ নাকে আঁচল গোঁজা, বারান্দা পা রাখতেন নিতান্ত অনিচ্ছায়।
    --- কী হল মাসি, শরীর ভালো লাগছে না?
    -- হ্যাঁ রে, তেমন কিছু না। ওই বিচ্ছিরি গন্ধ, আমার মাথা ধরে যায়, গা গোলায়, বমি পায়।
    --- সে কী, ও তো মাংস সেঁকার গন্ধ। আমাদের তো অসুবিধে হয় না। তুমি মাংস খাও না?
    --- দুর বোকা, খাব না কেন? কিন্তু ওগুলো যে গরুর মাংস, বীফ! ছি!
    আমরা এই নতুন শব্দটি উচ্চারণ করতে জিভে আরাম পাই--বীফ! বীফ! কেমন জয়ন্তী মণিমেলার মাঠে ড্রিলের হুইসিলের আওয়াজের মতন শোনায়--বীফ! বীফ! বিপ! বিপ!
    পরে মা-কাকিমাদের জিগ্যেস করি।
    সামনের হোটেলে গরুর মাংস রান্না করে কেন? কেন আবার, ওটা যে মুসলমানের হোটেল। আমরা ওসব খাই না। কেন খাই না? উঃ, এটা হদ্দ বোকা। আমরা যে হিন্দু। আমাদের ধর্মে গরু খাওয়া বারণ। কে বারণ করেছে? পন্ডিতমশাই? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব পন্ডিতমশাই। এবার যা তো এখান থেকে! ছাদে গিয়ে খেল গে যা!
    ছাদে গিয়ে খেলতে থাকি নীচের তলার ইলির সঙ্গে।
    কী জানি কেন ইলিকে দেখলেই আমার ঠাকুমার গা জ্বলে যায়।
    --- যা, তর গুরুঠাকুর আইছে! তুই পুষ্যালোক, মাইয়ামাইনসের লগে খেলস ক্যারে? শ্যাষে তুই ও মাইগ্যা ( মেয়েলি?) হইবি, হেইডা বুঝস?
    আমি সরে যাই। একটাই বুঝি, আমি ক্লাস থ্রি তে পড়ি, ইলিও তাই, তবে আলাদা স্কুলে।
    হ্যাঁ, ও পরে ফ্রক আর ইজের, আমি গেঞ্জি আর প্যান্ট।
    কিন্তু ঠাকুমা যে হাত নেড়ে তেড়ে তেড়ে আসে-- পড়াশুনায় মন নাই, খালি ছাদে গিয়া ইলির লগে কিলিকিলি করস্‌! শ্যাক বাড়ির ছেরির লগে অত কিয়ের পীরিত?
    অনুপ্রাসের ধ্বনি ও অন্ত্যমিলের মজা আমার বালক মনের নান্দনিকবোধে সুড়সুড়ি দেয় বটে, কিন্তু কথার ঝাঁঝে পিত্তি জ্বলে যায়।
    --- হ্যাঁরে ইলি! তোরা মুসলমান?
    --- হ্যাঁ তো; আমার ভাল নাম মনিজা খাতুন।
    --- কী অদ্ভূত নাম! আর তোর ছোটবোন জুলি? ও কি মুসলমান?
    ইলি খিলখিল করে হাসে। ও আলাদা করে কিছু হবে নাকি? ওর ভাল নাম আফরোজা!
    ---- মনিজা, আফরোজা!-- এরকম শব্দ তো কখনও শুনিনি। তোর নামের মানে কি রে?
    --- আমিও জানি না। এগুলো উর্দূ নাম; মার থেকে জেনে তবে কালকে বলব।
    -- আমাদের বাড়ির বা চেনা কারও অমন নাম হয় না।
    --- কী করে হবে, তোরা যে হিন্দু?
    ---- আমরা কিসে আলাদা?
    -- উমম্‌ তোরা পূজো করিস কেষ্টঠাকুরের, নামাজ পড়িস না। আমরা আমরা পূজো করি না, আল্লার জন্যে নামাজ পড়ি।
    --- নামাজ কেমনি করে পড়ে রে?
    ও হাসতে থাকে।
    -- আরে দেখা না!
    ও হাসতে থাকে।
    --তুই কিস্যু জানিস না, জানলে দেখা।
    ও গম্ভীর হয় , তারপর পালাক্রমে দু'কানে হাত দিয়ে ,হাঁটু গেড়ে মাটিতে উবু হয়ে 'আল্লাহু আকবর' উচ্চারণ করে দেখাতে থাকে।
    তারপর দুজনেই হেসে ফেলি। আমি ভাবি নামাজ পড়ার রহস্য জেনে গেছি। এই ফ্ল্যাটবাড়িতে কোন বাচ্চা জানে না।
    তখন ইলি বলে যে আরেকটা ব্যাপার আছে। তোরা ছুন্নত করিস না। আমাদের ছেলেরা করে।
    ---- সেটা আবার কী?
    --- ছেলেরা নয় -দশ বছরের হলে বাড়িতে বড়রা কোন মোল্লাকে ডেকে আনে। তারপর বাচ্চাটাকে ন্যাংটো করে হাতে একটা ছুরি নিয়ে বলে-- উ দেখ লালচিড়িয়া ! উ দেখ লালচিড়িয়া !
    --তারপর?
    --তারপর ঘ্যাঁচ করে নুনুর সামনেটা কেটে দেয়।
    --ওরে বাবা! ওর লাগে না? রক্ত বেরোয় না?
    --একটু লাগে, কেউ কেউ কাঁদে। তারপর ওষুধে দু-একদিনে ঠিক হয়ে যায়।
    -- কাউকে ন্যাংটো করে নুনু কেটে দেওয়া? অমন অসব্য কাজ কেন করে?
    --- আরে আমাদের ধর্মের নিয়ম যে! ছুন্নত করলে তবে মুসলমান হয়।
    --- নাঃ, আমি কক্‌ক্ষণো মুসলমান হব না।
    --- তোকে কে হতে সাধছে?
    ---- আচ্ছা, তুই তো মুসলমান, তোর ছুন্নত হয়েছে?
    --- ধ্যাৎ, ওসব খালি ছেলেদের হয়, আমাদের নুনু নেই তো?
    --তোদের কী রকম? দেখাবি?
    --এবার মার খাবি। বলছি তো অন্যরকম।
    অপ্রস্তুত হয়ে অন্য কথায় আসি।
    -- আচ্ছা, ইলি! তুই গোরুর মাংস খাস?
    --খেয়েছি; কখনও সখনও।
    --তোদের বাড়িতে রোজ রান্না হয় না?
    --না; আমাদের মাংস হয় মাসে একদিন। খাসির। গোস্ত রাঁধা হয় পরবের দিনে।
    --রোজ কী হয়?
    --- মাছ হয়, তোদের মতনই। আর তোকে বলি খেতে ভাল খাসি আর মুরগী।

    পরের দিন দুপুরে ছোট ভাইকে মন দিয়ে হিন্দু মুসলমানের তফাৎ বোঝাছি এমন সময় কড়া নড়ে উঠল। আমার আগে ভাই দৌড়ে গেল। সবুজরঙা দরজার উঁচুতে ছিটকিনি লাগানো, আঙুল উঁচু করেও নাগাল পাইনে। ভাই জানলায় উঠে হাত বাড়িয়ে দরজাটা খোলে তারপরই 'দাদা, শকুনিবুড়ো এসেছে রে" বলে বাড়ির ভেতরের দিকে ছুট লাগায়।
    অগত্যা আমি দরজা খুলে কড়া নাড়া আগন্তুককে দেখি।
    লম্বা শুকনো চেহারার এক হাড়-খটখট বুড়ো। তোবড়ানো গালে সাতদিনের না-কামানো দাড়ি। বাঁকানো নাক আর হলদেটে চোখে তীব্র চাউনি।
    সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন--খোকা, তোমার দাদুকে খবর দাও। বল, আমি এখন তোমাদের বাড়ি খাব।
    --- দাদু তো বাড়ি নেই।
    --- ঠাকুমা আছেন তো? তাহলেই হবে, গিয়ে বল।
    ওঁর গলার হুকুমের সুরে পেছনে হটি। কী নাম বলব?
    --নাম বলার দরকার নেই। আমি খাব বললেই হবে, উনি বুঝবেন।
    দৌড়ে ভেতরে গিয়ে দেখি ভাইয়ের মুখে খবর পৌঁছে গেছে।
    -- যাও, ওনাকে এনে বাইরের ঘরের চেয়ারে বসাও।
    তারপর ঠাকুমার নির্দেশমত মাথায় ঘোমটা দিয়ে মা এসে বাইরের ঘরে মাটিতে জল দিয়ে জায়গাটা মুছে আসন পেতে দেয়। তারপর থালায় করে ভাত আর বাটিতে করে ডাল, তরকারি আর দু'টুকরো মাছের সঙ্গে ঝোল এনে দেয়।
    ভদ্রলোক খেতে বসেন।
    ঠাকুমা পাখা হাতে করে নাড়তে থাকে। উনি সুন্দর করে ডাল দিয়ে ভাত মেখে তরকারি দিয়ে গুছিয়ে পাত পরিষ্কার করে খেয়ে নিয়ে বললেন--বৌমা, আরও ভাত লাগবে।
    মা তৈরিই ছিল। উনি মাছের ঝোল দিয়ে মেখে চেটেপুটে তৃপ্তি করে খেলে মা টমেটোর চাটনি এনে দিল।
    ঠাকুমা ওনাকে জল দিয়েছেন ইসলামপুরি কাঁসার গেলাসে। দেশভাগের সময় ওপার থেকে নিয়ে আসা।

    উনি বিদায় নিলে বলি--ঠাকুমা , শকুনিবুড়ো কে? কোথায় থাকেন?
    -- অ্যাই! খবরদার শকুনিবুড়ো কইবি না। উনি তোর দাদুর বয়সি।
    আমাদের ময়মনসিংহের আঠারবাড়িয়া গাঁয়ের পড়শি। এখানে ভাগ্নের কাছে থাকেন। ওনার আর কেউ নেই।
    -- ভাগ্নে কে? তুমি চেন?
    -- তুইও চিনিস, আমাদের পাড়ার বীরেন কম্পাউন্ডার।
    -- যিনি আমাদের বাড়িতে এসে হাসিমুখে গল্প বলে কলেরা টি এ বি সি ইঞ্জেক্শন, বসন্তের টিকা লাগিয়ে যান?
    --হ্যাঁ, তাইন বটে!
    --- উনি আমাদের বাড়ি খাইতে আসেন ক্যারে? বিনা নিমন্তনে? দুই-তিন মাস পরে পরে?
    --- ভাইগনায় ঠিকমত খাওন দেয় না, পেট ভরে না। বুড়া শুকাইয়া যাইত্যাছে, মরলে ওদের হাড় জুড়ায়।
    -- হেই লেইগ্যা?
    -- হ, নাতি। খিদা পাইলে মাইনষে কি না করে! প্যাটের জ্বালা বড় জ্বালা!

    ২)
    আজ সকাল থেকেই বাচ্চাগুলো ভয়ে ভয়ে রয়েছে। কেননা বাড়ির কর্তা সতীশচন্দ্রের মেজাজ সকাল থেকেই বেলা বারোটার রোদ্দূরের মত উত্তাপ ছড়াচ্ছে। তার অনেকটাই পড়েছে মেজ নাতির ওপর।
    কী জানি কেন উনি এই নাতিকে বিশেষ পছন্দ করেন না। আবার বড় নাতিকে মাথায় চড়িয়ে রেখেছেন। অনায়াসে বলেন নাতিদের মইধ্যে বড় শ্রেষ্ঠ, কিন্তু আমার ছেলেদের মধ্যে খুকা শ্রেষ্ঠ। খুকা বা খোকা তাঁর তৃতীয় সন্তান।
    পোষা জন্তু ও বাচ্চারা তাদের ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে চিনে নেয় কে তাদের আশকারা দেবে আর কে দুরছাই করবে। বড়নাতি দাদুর সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোয়। আর মেজনাতি দাদুর থেকে দূরে দূরেই থাকে।
    কিন্তু আজ ওর কপাল খারাপ।
    ছাদে খেলতে খেলতে পেটে মোচড় দেওয়ায় দৌড়ে নেমে বারান্দা পেরিয়ে এক ধাক্কায় বাথরুমের ভেজানো দরজা খুলে পায়খানায় ঢুকতে যাবে এমন সময় এক ধমক। ভেতরে ওর দাদু বসে আছেন , দরজা ঠিক মত বন্ধ হয় নি। এদিকে বাইশ জন সদস্যের জন্যে একটিই বাথরুম পায়খানা। আগে বাথরুমে ঢুকলে তবে পায়খানায় যাওয়া যায়। তাই অধিকাংশ সময়েই কোন একজন সেখানে প্রবেশাধিকার পায়-- সে বড় বাইরেই হোক কি ছোট বাইরে।
    বাজপড়ার মত এক ধমকে ওর তলপেটের চাপ উর্দ্ধমুখী হয়ে যায়। ও একহাতে প্যান্ট তুলে নিয়ে এক দৌড়ে আবার ছাদে ফিরে যায়।
    অনেকক্ষণ হয়ে গেল। উনি কি এখনও বেরোন নি? আবার পেটের ভেতরে মেঘ ডাকতে শুরু করেছে যে! ও পা টিপে টিপে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় নেমেছে কি আবার সামনে দাদু। উনি সেজে গুজে কাঁধে একটি গরম চাদর নিয়ে বেরোচ্ছেন, আজ মামলার দিন পড়েছে, কোর্টে যাবেন।
    চোখে চোখ পড়তেই নাতি ভয়ে কেঁচো। উনি চোখ পাকিয়ে আহাম্মক অপোগন্ডটিকে এক নজর দেখলেন। বন্দুকের গুলির মত মুখ থেকে ছিটকে বেরোল-- বলদ!
    নাতি মাথা নীচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ওঁকে পাশ কাটিয়ে সোজা বাথরুমে।
    সুযোগসন্ধানী বড়নাতি ভাইয়ের হেনস্থা আন্দাজ করে ধীরে সুস্থে নীচে নেমে রান্নাঘরে গেল। ও বড়দের গল্প ও পরচর্চা হাঁ করে গেলে। সেখানে ঠাকুমা ও পিসিমার উত্তেজিত কথা বার্তা থেকে যা বুঝল তা হচ্ছে আজ সতীশচন্দ্রের মেজাজ বিগড়োনোর প্রত্যক্ষ কারণ পূর্ব পাকিস্তানে থেকে আসা একটি চিঠি।
    ময়মনসিংহ জেলার আঠারবাড়িয়া গ্রাম থেকে কোন এক লাউয়া মিঞা বা মোম আলি পনের টাকা ধার চেয়ে লিখেছে এক নাতিদীর্ঘ পত্র।

    ছালাম আলেকুম,
    বড়কর্তা,
    আশা করি খোদার দয়ায় আপনে মা ঠাউরাইন শংকর, নারু, খোকা, ও বাকি সব ছাওয়ালেরা খেইরতে আছেন।
    হিন্দুস্থানে গিয়া আপনারা ভাল থাকেন, আমি খোদার কাছে হেই দোয়া করি, মোনাজাত করি।
    আমরা এখানে ভাল নাই। যারা আপনের ধানীজমি আর বাড়ি কিনছে তারা অইন্য মুনিষ অইন্য মাইন্দার রাখছে। আমারে কেউ কামে লয় নাই। বড় ব্যাডার বিয়া দিছি, অপনাদের দয়ায় বড় মাইয়া জহিরন বিবিরও নিকা হইয়া গ্যাছে।
    কর্তা , কথা হইলে কিছু ধার কর্জ হইয়া গেছে। এইবার পাটের ফসল মাইর গ্যাছে। নিবেদন এই যে যদি আমার ঠিকানায় পনেরডি ট্যাহা পাঠাইয়া দেন তো খাইয়া বাঁচি।
    আমি এই ট্যাহা দশ মাসে শোধ দিয়াম। আপনে দ্যাখছেন আইজ অব্দি আপনাদের লাউয়া মিঞার মুখ দিয়া হাচা বই মিছা বাইরয় নাই।
    খোদা হাফিজ!
    আপনদের বান্দা মোম আলি উরফ লাউয়া।

    নিরক্ষর লাউয়া মিঞা নিশ্চয় এই চিঠি কাউকে ধরে লিখিয়েছে। এই চিঠি পড়ে সতীশচন্দ্রের মুখ ভার। স্ত্রী সরযুবালা সব শুনে বললেন-- দ্যান পাঠাইয়া পনেরডা ট্যাহা! পারলে শোধ দিব, না পারলে নাই।
    কত ট্যাহা তো আনালে যায়।
    স্ত্রীর এই ওকালতিতে সতীশচন্দ্র রেগে আগুন।
    --এইডা কী কইলা? আমাদের নিজেদেরই একহনও মাথা গুঁজবার ঠাঁই জুটে নাই,সাহার বাড়িতে ভাড়া আছি। গুণা গনতি ট্যাহা। রোজ বাজার থেইক্যা ফিরা এক এক পয়সা তবিল মিলাইয়া তবে সকালের জলখাবার খাই।
    নাঃ শ্যাকের লাথথি খাইয়া হেই দেশ থেইক্যা এই পারে আইছি এখ্ন আর লাউয়ার সঙ্গে কুন সম্বন্ধ নাই। মেঘনা নদী পার হইয়া সবকিছু চুইক্যা বুইক্যা গ্যাছে।
    সরযূবালা ,মুখ ভার করে দুপুরে খেলেন না। বড়মেয়ে বকুল আর বড় বৌ স্মৃতিকণাকে বললেন-- কথাডা শুনলি? লাউয়া আর অর ভাই বুইধ্যা আমাদের ছেলেপিলেদের কোলেকাঁখে কইর‌্যা কানমলা দিয়া বড় করছে--এখন কুন সম্বন্ধ নাই কইলে হইব?

    ৩)
    - ' দ' য়ের হইল মাথায় ব্যথা।
    দাদু শ্লেটে চক পেনসিল দিয়ে একটা বড় করে 'দ' আঁকলেন।
    --চন্দ্র আইলেন দেখতে।
    এবার দ'য়ের পাশে একটা চন্দ্রবিন্দু আঁকা হল।
    -- তাইন দিলেন বাইশ টাকা।
    দাদু দয়ের পেটের নীচে বিচ্ছিরি করে ২২ লিখলেন।
    --- এইবার মাথাব্যথা পলাইয়া গেল।
    একটানে উনি দয়ের মাথাও লেজ মিলিয়ে দিলেন।
    --দ্যাখ দাদুভাই, কেমুন পাখি হইছে!
    হরিদাস শোয়া থেকে উঠে বসে দাদুর হাতের শ্লেটে উঁকি মারে।
    হ্যাঁ, একটা বাচ্চাদের আঁকা পাখির মত দেখা যাচ্ছে বটে! দ' হল পাখির ঠোঁট আর পেট, ২২ হল জোড়া পা আর চন্দ্রবিন্দু পাখির চোখ ।
    হরিদাস পালের জ্বর এখনো সারেনি। একটু আগে ওর মা এসে মাথা ধুইয়ে দিয়েছেন। বালিশের নীচে একটা বড়সড় গামছা ঘাড়ের নীচে গোঁজা যাতে বালিশ না ভিজে যায় । আর তার নীচে একটা লালরঙা রাবার ক্লথ, কিন্তু বাঙালবাড়িতে বলা হয় অয়েল- ক্লথ; কেন? কে জানে। সেই অয়েলক্লথ ওর বালিশ থেকে নেমে গেছে একটি লোহার বালতির ভেতর। পাশে একটা চেয়ারে বসে ওর মা ঘটি দিয়ে বালতি থেকে জল তুলে ঝিরঝির করে ওর মাথায় ঢালছেন আর মাথায় হাত বুলিয়ে জলধারাকে সঠিক দিশায় চালনা করছেন। কপাল ও মাথা ভিজিয়ে সেই জল অয়েলক্লথ বেয়ে বালতিতে ফিরে যাচ্ছে।
    হরিদাসের দুই চোখ আরামে বুজে আসে। বারান্দায় রেলিং এ বসে কাক ডাকছে। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের টানা বারান্দায় কেউ ধাঁই ধপাস করে কাপড় কাচছে আর ওদের লোক্যাল সেট রেডিওতে বিজনবালা ঘোষ দস্তিদার বলে একজন মহিলা ভারী গলায় খেয়াল গাইছেন।
    হরিদাসের ইচ্ছে এই মাথা ধুইয়ে দেওয়া যেন বন্ধ না হয়, অনন্তকাল ধরে চলে। ক্লাস টু'র হরিদাস জানে না অনন্তকাল মানে কতকাল। দাদুর মুখে পুরাণের গল্প শোনার সময় অনন্তকাল শব্দটা অনেকবার শুনে ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। এটুকু বোধ হয়েছে যে এটার মানে অন্ততঃ কয়েকমাস বা তারও বেশি হবে। কিন্তু কোন ভাল জিনিসই অনন্তকাল চলে না। তাই মাথামুছিয়ে দিয়ে মা নিয়ে এসেছেন একবাটি বার্লি, লেবু দেওয়া। এঃ কিছুতেই খাবে না হরিদাস, ওর বমি পায়। আর ও জানে যে বার্লির বাটি খালি হলেই পাশের কালো টেবিলে রাখা একটা কাঁচের শিশি থেকে একদাগ মিক্শ্চার ছোট কাঁচের গ্লাসে করে খেতে ওকে বাধ্য করা হবে।
    অতদিন ধরে মা ওর মাথায় জল ঢালতেই থাকবে? দূর সে আবার হয় নাকি? বাড়ির একমাত্র বৌ ওর মা, ভোর থেকে হেঁসেল সামলায়। রাত্তির এগারটায় ছুটি।
    তো কী হয়েছে? মা না হোক, ঠাকুমা আছে, আছে পিসিমণি। আর বড়পিসিমা। এছাড়া ছুটির দিনে মেজকাকাও তো জল ঢালতে পারেন। এরা সবাই হরিদাসকে ভাল বাসেন। ও যে হিন্দু সংযুক্ত পরিবারের কর্তার বড়ছেলের বরছেলের বড়ছেলে।
    দাদু হুকুম করলেই সবাই মেনে নেবে। ও যে দাদুর আদরে বাঁদর হচ্ছে সেটা ওর কাকারা কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন। তাতে ওর বয়েই গেছে।
    ও বায়না ধরে দাদুকে ডাক, উনি বললে তবে খাব।
    দাদু দৌড়ে এসেছেন। ওর কপালে হাত দিয়ে জ্বরের আন্দাজ নিয়ে ওর বিছানায় বসে শ্লেটে পাখি আঁকতে শেখাচ্ছেন।
    --এই বার পথ্য খাইয়া লও সোনাভাই। এক চুমুকে বাটি খালি কর। ওষুধ্হ খাও, তারপরে চোখ বুইজ্যা শুইয়া থাক। তাড়াতড়ি সাইর‌্যা উঠবা।

    আচ্ছা, ঘটিদের বাড়িতে বড়দা-মেজদা-সেজদা-ছোড়দার মাঝখানে ফুলদা, নতুনদা, --কী সুন্দর সব নাম।
    কিন্তু বাঙালদের সেজদা ও ছোড়দার মাঝে অবধারিত ভাবে একজন ধনদা, ধনদি, সোনাদা, সোনাদি, রাঙাদা-রাঙাদির পর একখানা কুলিদা এসে জুটবে।
    ধনদার কোন ধন নেই; কুলিদা কোন স্টেশনে মাথায় করে মাল বইতে যায় না।
    ওর কাকারা ওকে নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতে শিখিয়েছেন--'সেদিন দেখিনু রেলে,
    কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে।'
    হাওড়া স্টেশনে লাল জামা গায়ে হাতে বাঁধা পেতলের চাকতি মাথায় গামছ পাকানো পাগড়ি কুলিদের ও দেখেছে। ওদের মনে হয়েছে অন্যগ্রহের জীব। ওর বড় হয়ে কুলি হতে একটুও ইচ্ছে করে না।
    তবে কেন দাদু ওর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে নীচুগলায় বলছেন-- আমার সোনাভাই! আমার কুলিভাই! তাড়াতাড়ি সাইর‌্যা উঠ, সুস্থ হও। অনেক কাজ করনের আছে।
    দাদুর গলায় ময়মনসিংহের ঘুমপাড়ানো গানের সুরঃ
    'আয় ঘুম, যায় ঘুম, ঘুমাল গাছের পাতা,
    হেঁসেলঘরে যায় ঘুম মাগুরের মাথা।
    আগদুয়ারে যায় ঘুম কালো কুকুর,
    বিছানাতে যায় ঘুম বাপের ঠাকুর।'
    গানের একঘেয়ে সুরের দোলানিতে ও কখন ঘুমিয়ে পড়ে।
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৫ অক্টোবর ২০১৬ | ৯৯ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত