• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • সুকিয়ানা – ৩য় পর্ব (তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা)

    সুকান্ত ঘোষ লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ০১ আগস্ট ২০২০ | ১২৮৮ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • মানুষের কথা ধৈর্য্য ধরে শোনা যে একটা আর্ট হতে পারে তা জেন-কে দেখেই আমার প্রথম শেখা। জেন কথা তো শুনতই সবার এবং তার সাথে প্রাসঙ্গিক মন্তব্য বা পরামর্শ দিত যদি বক্তা চাইত। আমরা জেন-কে ‘গ্রেস হাউস’-এর কাউন্সিলার বলতাম। তখন আমি বিদেশে প্রায় নতুন এবং বয়সও বেশ কম। ছাত্র জীবনে ওই গ্রেস হাউসে থাকতাম – জেন সহ অনেক বিদেশী ছেলে মেয়েদের সাথে।

    জেনের সাথে কথা বলে আনন্দ পাওয়া যেত – আমাদের থেকে বয়সে একটু বড় ছিল। একদিন কথা প্রসঙ্গে পরিবারের কথা উঠে এল এবং তার সাথে নানাবিধ জিনিস। তখন জেন বলল ওর বৌদি বেশ সমস্যায় পড়েছে – কারণ ওর দাদা ফ্যামিলি ছেড়ে চলে গেছে অন্য ভালোবাসার মানুষের সাথে। জেনের দাদার বয়স তখন প্রায় ৪৮ মত – তিন ছেলে মেয়ের বাবা। বিদেশে এই সব হতেই পারে – কিন্তু আমার চমকটা লাগলো অন্য জায়গায়। বেশ কিছু দিন ধরেই দাদা-বৌদির বনিবনা হচ্ছিল না। ওর দাদা নাকি অন্য একটা ছেলের প্রতি আসক্ত হয় পড়ছিল ক্রমে – এবং খুব রিসেন্টলি জেনের বৌদি-কে জানায় আর একসাথে থাকা সম্ভব নয়, কারণ তার উপর সে আর কোন আকর্ষণ অনুভব করছে না! বরং বুঝতে পেরেছে ওই ছেলেটিকে ও প্রবল ভালোবেসে ফেলেছে। তাই ডিভোর্স দিয়ে ছেলেটার সাথে থাকতে চায়। সেই শুনে আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল! অবস্থা দেখে জেন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন কাকে বলে ইত্যাদি।

    ব্যাপারটা ইন্টারেষ্টিং লাগে – কিছু পড়াশুনা করে জানতে পারি ‘সেক্সুয়াল অ্যাক্ট’ আর ‘সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন’-এর মধ্যে পার্থক্য। মিশেল ফুকো-ই মনে হয় প্রথম বোঝাতে চেয়েছিলেন, ‘হোমোসেক্সুয়ালিটি’ একটা ‘ওরিয়েন্টেশন’, সেটা কোন ‘অ্যাক্ট’ নয়! আর এখানেই ‘সডোমি’-র সাথে তাদের পার্থক্য। ‘সডোমি’ বলতে সাধারণত বোঝায় দুই পুরুষের মধ্যে যৌন সঙ্গম কাজটাকে, অর্থাৎ একটা ‘অ্যাক্ট’, অন্যদিকে ‘হোমোসেক্সুয়ালিটি” (হেটারোসেক্সুয়ালিটি-র মতই) একটা ওরিয়েন্টেশন যা মানুষের মানসিক বা হৃদয়জাত ব্যাপার। তো সেই হিসাবে একজন মানুষ মানসিক দিকে থেকে হোমোসেক্সুয়াল বা হেটারোসেক্সুয়াল, কিন্তু কখনও যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয় নি – এই ঘটনা একদমই স্বাভাবিক। আর তার থেকেও যেটা ইন্টারেষ্টিং বুঝতে পেরেছিলাম, এটাও প্রায়শই হয় যে মানসিক দিক থেকে একজন হোমোসেক্সুয়াল, কিন্তু সে কেবল হেটারো-সেক্সুয়াল যৌন সম্পর্কেই লিপ্ত হয়েছে বাধ্য হয়ে। আর এই বাধ্য ব্যাপারটা আসে মূলত আমাদের চারপাশের সমাজিক চাপ থেকে। এক জড় সমাজব্যবস্থার স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক, ভালো-মন্দ বিচারের বহুপুরাতন মানদন্ড থেকে। যাই হোক সেই সব তত্ত্ব কথায় এখানে যাবো না – এই বিষয়ে অনেক অনেক লেখা আছে, উৎসুক ব্যক্তিরা একটু খুঁজলেই পেয়ে যাবেন।

    কিন্তু ওই যে মানসিক ভাবে একজন হোমোসেক্সুয়াল মানুষ সমাজের চাপে হেটারোসেক্সুয়াল যৌন সম্পর্কেই লিপ্ত হচ্ছে বাধ্য হয়ে – মানে সামাজিক ভাবে যাকে আমরা বিয়ে বলি, এই ব্যাপারটা আমাকে ভাবায়। আমি একটু অন্য ভাবে দেখতে শুরু করি – বা তাদের কাজের ব্যখ্যা নিজের কাছেই খাড়া করার চেষ্টা করি – আমাদের পাড়ার বা গ্রামের খুব চেনা কিছু মানুষকে। এইভাবে নতুন ব্যখ্যা পাই সুধীর-কাকার ছেলেকে দীপকদার মত দেখতে হবার। সুধীর কাকা গ্রামের যাত্রায় ফিমেলের রোল করত, ডে লাইট জ্বলত স্টেজের কোণে। সুধীর কাকিমার মনে খবর রাখার কেই বা চেষ্টা করেছিল – দীপকদা কি ব্যবহার করেছিল নাকি ব্যবহৃত হয়েছিল! এ গল্পও খুব চেনা। ওদিকে গোপাল-কাকার পারিবারিক জীবন এখনো মসৃণ – কেমন লেগেছিল নতুন বউ গোপাল কাকিমার শুনতে যখন শিবতলায় লোক জড়ো হয়েছে মেয়েন্যাকড়া গোপালের বউ দেখবে বলে! আমাদের কৈশোর বেলায় গ্রামে ছেলে-ছেলে বিয়ে এই সবের প্রশ্নই ছিল না যদিও, কিন্তু এদিক ওদিকে কিছু হোমোসেক্সুয়াল ছেলে পিলে তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলই। গোপাল-কাকার মত এদের অনেককে ‘মেয়েন্যাকড়া’ বলে ডাকা হত, হয়ত তারা মনে মনে ক্ষুব্ধ বা হতাশ হত, কিন্তু সামাজিক লাঞ্ছনার উদাহরণ আমাদের সামনে ছিল না। মিলে মিশে – তালেগোলে ছিলাম সবাই। ছেলে মেয়ে নিয়ে ভড়ন্ত সংসার গোপাল-কাকার আজকে। কিন্তু ভাবি যদি গোপাল-কাকাকে চয়েস দেওয়া হত?

    আজকাল আর হয় তেমন, কিন্তু আগে ব্রেনের একভাগ মাঝে মাঝে জ্যাম করে যেত গ্রীক আর ল্যাটিন শব্দের তফাত চট করে ঠিক করে নিয়ে ব্রেনের অন্যভাগে জানিয়ে দিতে। কেন জানি না ব্রেন আগে ‘হোমো-সেক্সুয়াল’-এর (Homo Sexual) হোমো আর ‘হোমো-স্যাপিয়েন’-এর (Homo Sapien) হোমো এক জিনিস ধরে নিয়ে অ্যানালিসিস করে ফেলতে চেষ্টা করত পরিস্থিতি। মানে আমরা সবাই সেক্সুয়াল দিক থেকে হোমো-দের সাথে জড়িত, তাহলে কেন এত ‘হোমো’-দের তুরুশ্চু করা – ইত্যাদি ইত্যাদি। এদিকে ব্রেন সাময়িক ভাবে ভুলে যেত যে, হোমো-স্যাপিয়েন এর হোমো এসেছে ল্যাটিন থেকে – হোমো স্যাপিয়েনের অর্থ ‘চিন্তাশীল মানুষ’ (Thining Man) আর ওদিকে হোমোসেক্সুয়াল এর হোমো এসেছে গিয়ে গ্রীক শব্দ ‘হোমোস’ (homos) থেকে যার অর্থ ‘সম’ (same)।

    তবে এই কনফিউশনের পিছনে জার্মান কলকাঠি আছে, কারণ ওই হোমোসেক্সুয়াল এবং হেটারোসেক্সুয়াল শব্দদুটি জার্মানদের দান। হোমোসেক্সুয়াল শব্দটা প্রথম ইংরাজী ভাষার মার্কেটে নামে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ১৮৯২ সালে এক জার্মান বই “সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস” (Psychopathia Sexualis) এর ইংরাজী অনুবাদে প্রথম হোমোসেক্সুয়াল শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এই একই বই আবার হেটারোসেক্সুয়াল শব্দটিও ঢুকিয়েছিল ইংরাজীতে – হেটারো শব্দ নেমেছে আবার গ্রীক ‘হেটেরস্‌’ (heteros) থেকে যার অর্থ ‘অন্য’ (others)।
    হোমোসেক্সুয়াল শব্দটা ১৮৯৫ সাল নাগাদ কম্পিটিশন পেল যখন নিউরোলজিষ্টরা ওই একই জিনিস বোঝাতে মার্কেটে ছাড়লেন সমার্থক শব্দ ‘ইউরেনিষ্ট’ (uranist)। কেউ কেউ লেখেন আর এক জার্মান নাকি হোমো-সেক্সুয়াল মার্কেটে আসার আগেই ১৮৬৯ নাগাদ ‘ইউরেনিয়ান’ শব্দ চালু করেন। বুঝতেই পারছেন যে কম্পিটিশনে ইউরানিষ্ট বা ইউরেনিয়ান হেরে যায়। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে ইউরানিষ্ট শব্দটা টিকে না থাকায় কি ধরণের রোমান্টিকতাকে আমরা হারিয়েছি! ইউরেনিষ্ট/ইউরেনিয়ান শব্দটি এসেছিল গ্রীক ‘ইউরেনাস’ (ouranos) থেকে, যার অর্থ ‘স্বর্গীয়’ (heavenly)। আসলে হয়েছে কি প্লেটোর ‘সিম্পোজিয়াম’-এ (Symposium) পুসিনিয়াস (Pausanius) দাবী করেছিল ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি (Aphrodite) নাকি আদপে দুই-জন। একজন ‘সাধারণ’ (common) আফ্রোদিতি যিনি নারী এবং পুরুষের মধ্যেকার ভালোবাসা দেখভালের দায়িত্বে আছেন, আর একজন হলেন ‘স্বর্গীয়’ (heavenly) আফ্রোদিতি যিনি পুরুষদের মধ্যেকার ভালোবাসার ইন-চার্জ। পুসিনিয়াসের জোরালো দাবী ছিল এই যে দুই পুরুষের মধ্যে ভালোবাসা তাতে নারী-পুরুষ ভালোবাসার থেকেও বেশী স্বর্গীয় টাচ্‌ আছে কারণ তা বেশী বুদ্ধিগত এবং আধ্যাত্মিক (ইন্টেলেকচ্যুয়াল অ্যান্ড স্পিরিচ্যুয়াল)।

    ভাবছি এখনকার সময়ে ভারতে লোকসভায় ‘হোমো-সেক্সুয়াল’ এবং ‘ইউরেনিয়ান’ শব্দদুটির মধ্যে একটা বেছে নেবার জন্য ভোটাভুটি হলে কেমন হত। ‘হোমো-সেক্সুয়াল’ শব্দে সেক্স লুকিয়ে আছে – ছিঃ ছিঃ। ওদিকে ‘ইউরেনিষ্ট’ শব্দে দেবতার নাম ছোঁয়ানো ‘ইউরেনাস’! কি যে হত – খুব টাফ চয়েস। তবে ইউরেনাস ভারতীয় দেবতা নয় বলে মনে হয় ‘ইউরেনিয়ান’-ই জিতে যেত ভোটে।

    যাই হোক, ইউরেনিয়েয়ান যখন হেরে গেছে নামের খেলায়, তাকে নিয়ে বেশী নাড়াচাড়া করে লাভ নেই। আমি কোন গ্রীক ট্রাজেডি লিখতে বসি নি! আমরা ‘হোমোসেক্সুয়ালে’ ফিরে যাই। আরও একটা ইন্টারেষ্টিং ব্যাপার লক্ষ্য করতে পারবেন যদি ‘সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন’ শব্দ গুলির বিবর্তন নিয়ে তলিয়ে দেখেন, তাহলে বেশীর ভাগ শব্দই কিন্তু ‘মেল হোমোসেক্সুয়াল’ বোঝাতেই আদিতে শুরু হয়েছিল। কিন্তু হোমোসেক্সুয়াল তো ছেলে বা মেয়ে দুই হতে পারে।! এই লেখায় বেশী জটিলতার মধ্যে না ঢুকে মেল-হোমোসেক্সুয়াল দের গে এবং ফিমেল-হোমোসেক্সুয়াল দের লেসবিয়ান বলেই উল্লেখ করব। যদিও দু-চার জন লেসবিয়ান বন্ধু ছিল বা আছে, কিন্তু খুব বেশী ওদের জীবনের সাথে জড়িয়ে ছিলাম না বলে আমি মূলত আমার আলোচনা ছেলেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব।

    জেনের সাথে গল্প করার সময় অন্য একদিন থাইল্যান্ডের মেয়ে ফন্‌ পাশে এসে বসল – সেদিনের আলোচনায় আবার কি কারণে সেক্সুয়ালিটি উঠে আসলে ফন্‌ নিজেই জানালো যে ইংল্যান্ডে আসার আগে বহুদিন সে লেসবিয়ান হিসাবেই দিন যাপন করেছে। অকপটে জানালো নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়ে তখনো নিশ্চিত হতে পারে নি – তারপর এখানে এসে একটা ছেলেকে ভালো লেগে আবার বহুদিন বাদে ফিরে গেছে হেটারোসেক্সুয়াল যৌন সম্পর্কে।

    তাবলে কি হাসাহাসি হত না? রসিকতা হত বৈকী – কিন্তু সেটা সামাজিক চাপ বা স্টিগমাতে পরিণত হতে খুব বেশী দেখি নি আমাদের সময়ে ইংল্যান্ডে বা পরে আমষ্টারডামেও। একদিন ফুটবল খেলে শাওয়ারের নীচে স্নান করছি – সবাই হয়ত জানেন যে শাওয়ারে আলাদা করে কোন পার্টিশন দেওয়া থাকত না বেশীর ভাগ জায়গাতেই। ওই সব একসাথে স্নান করা – প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হত। মানে সবার সাথে উলঙ্গ হয়ে স্নান করার অভ্যেস ছিল না তো! তো সেদিন স্নান করতে গিয়ে হাত থেকে সাবান না পড়ে গেছে পিছলে, আমি হাঁটু ভাঁজ না করে জাষ্ট ঝুঁকে সাবানটা তুলছি। তা দেখে পাশেই যোসেফ হাসতে হাসতে বলল, “তোর কালচারাল ট্রেনিং এখনো ভালো করে হয় নি সুকি। এখানে তবু ঠিক আছে, কিন্তু গ্রীসে খবরদার এই ভাবে পিছন উঁচু করে সাবান কুড়াতো যাস না – পিছন মারা যাবে! কুড়াতে হলে হাঁটু গেড়ে বসে তুলবি”। পরে জানলাম যে এটা একটা বহুল প্রচলিত জোক, গ্রীসের জেলখানা থেকে নাকি উৎপত্তি হয়েছে। গ্রীসের ছেলেরা এমনিতেই ছেলে ফ্রেন্ডলি – জেলেখানায় সেই পিছন মারার ধান্দাটা কি অনেকদিন সেক্স না করে থাকার ডেস্পারেশন থেকে এসেছে নাকি গ্রীক ছেলেরা ছেলেদের পিছন পছন্দ করে বেশি – সেই বিষয়ে কবি নীরব।

    সেবারে একটা কনফারেন্সে যাব আমি, টনি, রব, ক্রিশ্চিয়ান – সবাই মিলে আমেরিকায় ন্যাশভিল শহরে। সেবারে কনফারেন্সটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল “গে লর্ড হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার’-এ! নাম শুনেই আমার বেশ হাসি পেয়ে গেল – কারণ ‘গে লর্ড’ নামটা আমি আগে শুনি নি। আমার দেখা দেখি বাকিরাও একটু হাসল – তারপর রব-এর কাছ থেকেই সেই প্রথম জানলাম যে একসময় ইংল্যান্ডে ‘গে’ অর্থে খুশী বোঝানো হত, যেমন ‘গে ডেজ্‌’। আদপে ‘গে’ শব্দটি ইংরাজীতে এসেছে ফেঞ্চ ‘গেই’ (gai) থেকে যার অর্থ ওই হাসিখুশি এবং খোলামেলা। গে শব্দটির সাথে সেক্সুয়ালিটি-র কোন সম্পর্ক ছিল অন্তত ১৬৫০ সাল বা তার আশেপাশ পর্যন্ত। তখনো গে অর্থে নির্দিষ্ট করে পুরুষদের বোঝানো হত এমন নয়। বেশ্যাখানাকে ‘গে হাউস’, বেশ্যাকে ‘গে ওমেন’ আর বহু মহিলাসক্ত পুরুষকে ‘গে মেন’ বলা হত। বাই দি ওয়ে গে লর্ড হোটেল কিন্তু বিশাল জমকালো ছিল – তবে সেই গল্প অন্যদিনে।
    ইংল্যান্ডে গে বিষয়ক সামাজিক স্টিগমা যে অনেকদিন আগে ছিল তা আমরা এখন সবাই জানি – আধুনিক কম্পিউটারের জনক অ্যালেন ট্যুরিং এর এই গে হবার কারণে দুঃখ জনক পরিণতির কথাও আমাদের সবার জানা। যদি কারো জানা নাও থাকত ইদানিং কালের খুব জনপ্রিয় সিনেমা ‘দ্যা ইমিটেশন গেম’ এর দৌলতে সবাই কম বেশী জেনে গেছেন। তবে যদি ভাবেন যে ওসব তখন হত, আর এখন সমাজ এই স্টিগমা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পেরেছে – তবে হয়ত আপনি ভুল ভাববেন। আমাদের ল্যাবের টনি ছিল ডার্বি এলাকার ছেলে – যে এলাকাটা সাধারণ মধ্যবিত্ত চাষা এবং কারখানার কর্মচারী ভর্তি। টনির এই গে ব্যাপারে মনোভাব দেখেই হালকা আঁচ পাওয়া যেত যে ওদের ওদিকে এখনো কেউ দু-হাত বাড়িয়ে গে-দের অভ্যর্থনা করার জন্য অপেক্ষা করে নেই! একবার আমরা ম্যাঞ্চেষ্টারে সব খেতে গেছি এক রেষ্টুরান্টে – বাহ্যিক চালচলনে গে বলে মনে হচ্ছিল এমন এক ওয়েটার এসে খাবার অর্ডার নেবার সময় টনিকে বলছে, “হোয়াট ক্যান আই গেট ফর ইউ সুইটি”। ব্যাস টনি গ্যাছে রেগে ফায়ার – তাকে এক ছেলে ‘সুইটি’ বলবে কেন! এই রেষ্টুরান্টে খাওয়ার মুডই নেই তার আর। অনেক বুঝিয়ে টনিকে শান্ত করা হল।

    আমষ্টারডামে বসবাস শুরু করার পর আলাপ হয়ে যায় অ্যান্ড্রু-র সাথে। ক্যানালের ধারে অ্যাপার্টমেন্টে আমি চারতলায়, আর অ্যান্ড্রু থাকত পাঁচতলায় – একদম উপরের তলায় থাকার জন্য ছাদটাও অ্যান্ড্রুর দখলে ছিল। সে বেশ বড়সড় পোষ্টে কাজ করত – স্টারবাস্ক কফি বীনস্‌ ডিষ্ট্রিবিউশনের ইউরোপীয়ান ম্যানেজার। বেশীর ভাগ সময়েই বিজনেস ট্যুরে ঘুরতে হত ওকে, আর যখন আমষ্টারডামে থাকত তখন প্রায় প্রত্যেক উইকএন্ডেই ওর ঘরে পার্টি হত- গ্রীষ্মকালে ছাদে বারবিকিউ। আমিও বাড়িতে থাকলে মাঝে মাঝে যোগদান করতাম পার্টিতে – ছেলে মেয়ে সবাই আসত, আর তাই অ্যান্ড্রু-র ওরিয়েন্টেশন নিয়ে কোনদিন মাথা ঘামাবার প্রয়োজন হয় নি। ততদিনে অন্তত এটা জানা হয়ে গেছে যে কেউ ‘গে’ মানেই সে কোন বিশেষভাবে আচরণ বা কথা বলবে এমন নয়!

    তখন আমষ্টারডামে সবে গেছি – ইংল্যান্ড থেকে বেশ কিছু বন্ধু ঘুরতে আসবে বলল। একদিন বিকেলে অ্যান্ড্রুর ছাদে বসে গল্প করতে করতে ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে পরের উইকএন্ডে থাকছে কিনা, তা হলে আমাদের সাথে পার্টিতে যোগ দেবে বন্ধুরা এলে। বলল থাকছে না – আর তারপর জিজ্ঞেস করল কয়জন বন্ধু আসছে – বললাম জনা ছয়েক, জানতে চাইল ওরা সবাই কোথায় থাকবে। আমি বললাম, ম্যানেজ হয়ে যাবে আমার অ্যাপার্টমেন্টেই। অ্যান্ড্রু আপত্তি জানালো, আমি থাকছি না – তাহলে আমার অ্যাপার্টমেন্ট তোমাদের ব্যবাহার করতে প্রবলেম কি! কি বলব বুঝতে পারছি না – আসলে আমষ্টারডামে ক্যানেলের ধারে প্রায় ফ্ল্যাট গুলোই লাক্সারি – আর এইভাবে ভারতেও মনে হয় চাওয়া যায় না কারো ফ্ল্যটে থাকার জন্য! অ্যান্ড্রু প্রায় জোর করে আমাকে ওর অ্যাপার্টমেন্টের স্পেয়ার চাবি দিয়ে দিল – বলল আমাকে ফেরত দিতে হবে না, তোমার কাছেই রেখে দাও। শুধু এই বার নয়, যখনই গেষ্ট আসবে বা পেন্টহাউসে পার্টি করতে ইচ্ছে হবে – আমাকে টেক্সট করে জেনে নেবে যে আমি এখানে আছি কিনা। যদি না থাকি তাহলে তোমার ব্যবহার করবে কোন প্রবলেম নেই। সব দেখিয়ে দিল – স্টারবাক্সের স্পেশাল কফি বিনস্‌ রাখা আছে ওর ফ্ল্যাটে আর আছে দামী কফি মেশিন – বলল এ সব যা ইচ্ছে ব্যবহার করবে, ফ্রীজ, কিচেন যা মন চায়, ইতস্তত করবে না। সেই শুরু, তারপর কত বার যে অ্যান্ড্রুর ফ্ল্যাট ব্যাবহার হয়েছে – কি আর বলব।

    একদিন পড়ন্ত গ্রীষ্মের বেলায় ছাদে বসে বসে গল্প করছি অ্যান্ড্রুর সাথে – কথা প্রসঙ্গে সেই প্রথম অ্যান্ড্রুর নিজের মুখেই বলল তার গে জীবনের কিছু কথা। আমেরিকায় আর ফিরে যেতে যায় না সে, কারণ তার নিজের স্টেটে গে-মেরেজ আইন সিদ্ধ নয় এবং তা ছাড়াও ওদের ওদিকে একটা বেশ স্যোশাল স্টিগমা-র ব্যাপারও আছে বলল। হয়ত সেটা খুব প্রকট নয় – বা অনেক সময় বেশ প্রকটও। বরং ইউরোপই ভালো সেই ব্যাপারে – বিশেষ করে হল্যান্ড। গে ব্যাপারটা এখানে বরং অনেক গ্রহন যোগ্য সামাজিক ভাবে। ক্রমে ক্রমে জানতে পারলাম, এখানে কাউকে মনের মত পেয়ে গেলে অ্যান্ড্রুর হয়ত এখানেই বিয়ে থা করে সংসার বসাবে। এইভাবেই আমাদের গল্প হত – একসাথে ছাদে পার্টি হত। মাঝে মাঝে ওর ঘর থেকে সকালে অন্য ছেলেকে বেরোতে দেখতাম – একই ছেলে নয়। কিছু দিন অন্তর অন্তর পালটে যেতে দেখতাম। এইভাবে দেখতে দেখতে আমার আমষ্টারডাম ছাড়ার সময় হয়ে গেল – ভাবলাম এবার একদিন গিয়ে অ্যান্ড্রুকে স্পেয়ার চাবিটা ফেরত দিয়ে আসি, আর আমার চলে যাবার ব্যাপারটা আগে থেকে জানিয়ে রাখি। তো এমন অবস্থায় একদিন অ্যান্ড্রু সাথে একজনকে নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এল। খুব লম্বা চওড়া, সুপুরুষ কালো একজন ছেলে – আলাপ করিয়ে দিল। বলল আমার বয় ফ্রেন্ড – বেশ কিছু দিন মেলামেশা করছে এবং তারা সিরিয়াস। উড বি হাসব্যান্ড। বলল বিয়ের ডেটটা এখনো ঠিক হয় নি – আমার কিন্তু থাকা চাই। ওরা আমষ্টারডাম ছেড়ে অন্য শহরে চলে যাচ্ছে, যেখানে দুইজনার অফিসই কাছে হবে। আমার আর অ্যান্ড্রুর বিয়েতে যাওয়া হয় নি – তার আগেই আমি আমষ্টারডাম ছেড়ে চলে আসি। ওরা ভালো আছে – সুখে আছে।

    আমাদের আমষ্টারডাম অফিসে এক কলিগ ছিল জোহান নামে – বেশ বয়ষ্ক, প্রায় ৫০ এর কাছাকাছি বয়স। অফিসের জিমে ওয়ার্ক আউট করতে গিয়ে প্রায় নিয়মিতই দেখা হত। খুব ভদ্র, মৃদুভাষী লোক – একবার গ্রীষ্মের ছুটির পর জিমে দেখা হয়েছে, দেখে বেশ অন্য রকম লাগলো সাজপোষাক। ডাচেরা গ্রীষ্মের ছুটি প্রায় ৫ সপ্তাহ বা তার বেশীও যায়। অনেকগুলো দিন না দেখার ফলে ঠিক বুঝতে পারলাম না – আর তাছাড়া জিমের পোষাকে বেশী বোঝাও চাপ। যাই হোক, আমার তখনো জিম শেষ হয় নি – জোহান শেষ করে চলে গেছে কখন খেয়াল করি নি। হঠাৎ শুনলাম মেয়েদের লকার রুম থেকে মৃদু হইচই। জোহান সেদিন মেয়েদের লকার রুমে ঢুকে গেছে – মেয়েরা ভেবেছে ভুল করে। কিন্তু জোহান জানায় ভুল করে নয়, এখন সে সেক্স চেঞ্জ করে মেয়ে হয়ে গেছে! জোহানাস নাকি নাম হয়েছে নতুন – এবার থেকে মেয়েদের চেঞ্জ রুমই ব্যবহার করবে সে। কিছু মেয়ে আপত্তি জানিয়েছে সেদিন, বলছে তুমি ছুটির আগে ছেলেদের রুমে যেতে আর ছুটির পরে এসে মেয়ে হয়ে গেলে! এই ঘটনা দেখে আমার মনে পড়ে গেল জেনের দাদার কথা!

    তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা মন জানো না!

    সেবারে জুলাইয়ের শেষের দিকে আমাদের অফিসের ডিপার্টমেন্টাল সেক্রেটারি উইলমা আমাকে জিজ্ঞেস করল, “সুকান্ত, তুমি কি ‘গে প্রাইড প্যারাড’- এ আমাদের বোটে থাকতে চাও, তাহলে বল – আমি একটা সীট বুক করে রাখছি”। উইলমা আমাদের ডিপার্টমেন্টাল মাদার ফিগার টাইপের – কত ম্যানেজার এসেছে-গ্যাছে, কিন্তু উইলমা ২৯ বছর ধরে কনস্ট্যান্ট! বিশাল করিতকর্মা – ফলতঃ নন-টেকনিক্যাল ব্যাপারে উইলমাই ছিল আমাদের ডিপার্টমেন্টে শেষ কথা! প্রথমে আমি উইলমা-র প্রশ্নটা বুঝতে পারলাম না – গে প্রাইড প্যারাড কি তখনো আমি জানতাম না, সেই বছরই আমষ্টারডামে থাকতে শুরু করেছি। আর তা ছাড়া ‘গে’ প্যারাডে আমি থাকতে যাব কেন! আমি তো আর গে নয় – কিন্তু সে তো উইলমা-ও নয়! তাহলে?
    জানতে পারলাম আমষ্টারডাম শহরের আগষ্ট মাসের একটা বিশাল ট্র্যাডিশন এবং আকর্ষণ হচ্ছে এই ‘গে প্রাইড প্যারাড’। এই প্যারাড রাস্তায় হয় না – হয় বোটে করে আমষ্টারডামের ক্যানাল জুড়ে! সে এক দেখার জিনিসই বটে – প্রথম বছর দেখে সেটা টের পেলাম। প্রতি বছর আগষ্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে এটা অনুষ্ঠিত হয় – সেই ১৯৯৬ সাল থেকে এই ট্র্যাডিশনের শুরু। এমন এক প্যারাড শুরু করার পিছনে মূল লক্ষ্য ছিল সমকামী মানুষের স্বাধীনতা এবং মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য – এমন বার্তার প্রচার। এবং আজকের দিনে সারা নেদারল্যান্ডের মধ্যে এই প্যারাড অন্যতম বড় পাবলিক ইভেন্ট। তবে এই প্যারাডের সাথে কিন্তু গে-কমিউনিটির অধিকার অর্জনের যে আন্দোলন বা ডেমোনেষ্ট্রেশন তা মিশিয়ে ফেললে হবে না। সে সবের জন্য অন্য এক অনুষ্ঠান ছিল – যার নাম ‘পিঙ্ক স্যাটারডে’ – ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু এবং তার পর থেকে হ্ল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে প্রতি বছর এটা অনুষ্ঠিত হয়।

    আমি যেটুকু মিশিয়ে এবং দেখেছি, তাতে করে মনে হয়েছে আমষ্টারডামে বা হ্ল্যান্ডে গে-লেসবিয়ান বা আজকের দিনে ওই এল-জি-বি-টি নামাঙ্করণ করা কমিউনিটি সব দিক থেকেই বাকি সবার মতই। এদের সাংবিধানিক অধিকার বা সামাজিক-গ্রহণযোগ্যতা যাই বলুন – কিছুতেই এরা পিছিয়ে নেই – এরা বাকি সবার মতই স্বাভাবিক নাগরিক জীবনেরই অঙ্গ। ইন ফ্যাক্ট এতটাই স্বাভাবিক যে, সেই নিয়ে আলাদা করে খুব কাউকে আমার চারপাশে আর ভাবতে বা আলোচনা করতে দেখি নি। তোমার ব্যক্তিগত জীবন তোমার – নিজের জীবন তুমি কিভাবে পালন করবে সেটা তোমার ব্যাপার – যদি ঠিক ঠাক ট্যাক্স দাও আর বাকি সবার মত নিয়ম কানুন মেনে চল – তাহলে কিছুই আর প্রবলেম নেই। এই ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগতো – এবং আমার অভিজ্ঞতা অনু্যায়ী এই ব্যাপারে হ্ল্যান্ড অন্য অনেক দেশের থেকে বেশ কয়েক যোজন এগিয়ে। তাই এখন ওই ‘পিঙ্ক ডে’ তেমন কিছু একটা অর্থ বহন করে না হল্যান্ডের প্রেক্ষিতে অন্তত। আর ক্যানেল প্যারাড হয়ে উঠেছে এক উৎসব আমষ্টারডামের বুকে। এই প্যারাডে যারা অংশগ্রহন করে তাআ সবাই কিছু এল-জি-বি-টি এমন নয়। বেশীর ভাগ বড় বড় কোম্পানি বা অফিস স্পনসর করত বোট – তাদের সাপোর্ট দেখাবার জন্য এবং সাথে আছে বোঝাবার জন্য। সেই বোটে করে ঘোর – সবাই মিলেমিশে। আমাদের কোম্পানীরও ছিল স্পনসরড বোট – জায়গা লিমিটেড হবার জন্য আগে থেকে কোম্পানিতে অনুরোধ করতে হত জায়গার জন্য। উইলমা আমাকে সেবার আমাদের কোম্পানীর বোটে ঘুরতে চাই কিনা জিজ্ঞেস করেছিল। উইলমার পক্ষে আমার জন্য জায়গা করে দেওয়া কোন ব্যাপারই ছিল না!

    গে প্রাইড প্যারাডের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সেই ক্যানেল প্যারেড – প্রতি বছর আগষ্ট মাসের প্রথম শনিবার যার ফিক্সড দিন। আমষ্টারডাম শহরের ভিতর দিয়ে ‘প্রিন্সেনগ্রাগট্‌’ ক্যানাল দিয়ে যেত সেই প্যারাড – সে কি ভীড় কি ভীড়। দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া মুশকিল। আমাদের বাড়ি ব্রাউজগ্রাগট ক্যানালের ধারে হবার জন্য এই প্যারাড দেখতে আমাদের বাড়ি কোন কাজে দিত না। আর হত কি, যাদের বাড়ি ‘প্রিন্সেনগ্রাগট্‌’ ক্যানালের ধারে তাদের তো ষোল আনা! এমনিতে লক্ষ্য করে দেখেবেন ক্যানালের ধারের বাড়ির জানালা গুলো খুব বড় বড় হয় – তাই বাড়ির ড্রয়িংরুমের জানালা খুলে দিয়ে সারাদিন বসে বসে দেখ সেই অপূর্ব প্যারাড! আর এটাও একটা স্যোশাল নর্ম হয়ে গিয়েছিল যে যাদের বাড়ি সেই ক্যানেলের ধারে তারা সেদিন নিজেদের বন্ধু বান্ধব বা পরিচিত-দের ডেকে পার্টি দেবে।

    তেমনি সুযোগ আমাদের হত প্রতি বছর মার্গারেট আর লরি তাদের বাড়ি পার্টিতে ডাকত বলে। প্রিন্সেনগ্রাগট্‌ ক্যানালের এক অদ্ভুত সুন্দর লোকেশনে তিনতলায় মার্গারেট-লরির বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। মার্গারেট তখনও ম্যানেজার ছিল – আর এখন তো আরো বড় র‍্যাঙ্কে উঠে ব্যাপারই আলাদা। সেক্রেটারির সাথে অ্যাপোয়েন্টমেন্ট না নিয়ে দেখা করা যায় না! তবে আমার জন্য এখনও ছাড় আছে :) সেই বছর মার্গারেটের বাড়ি গে-প্যারাড দেখতে গিয়ে দেখা হয়ে গেল এরিকের সাথে।

    এরিক-কে আমি চিনতাম না এমন নয় – বরং মাঝে মাঝেই সকালে অফিস যাবার সময় বোটে করে নদী পেরোবার সময় তার সাথে দেখা হত। ও আমেরিকান – এখানেই সেটেল করে গেছে – সাইকেল নিয়ে যেত অফিস সে। তাই কেবল বোটেতেই যেটুকু কথা হত আর তাই স্বাভাবিক ভাবেই ব্যক্তিগত জীবন জানার মত ঘনিষ্ঠতা হয় নি তখনো। মার্গারিটের বাড়িতে এরিক আলাপ করিয়ে দিল তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে। লাঞ্চ করতে বসেছি সবাই – এরিকের বয়ফেন্ড হাতের হীরের আঙটি দেখিয়ে বলল, আমাদের এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে – মাই ডার্লিং এরিক এই আঙটিটা আমাকে দিয়েছে। আমরা কনগ্রাটস্‌ বললাম – আমি স্টেকটা ছুরি দিয়ে কাটতে যাচ্ছিলাম, ছুরি-ফর্ক নামিয়ে রেখে মৃদু হাততালি দিলাম। এবার এরিক বলল, “লাভ ইউ এরিক”! আমি ফলো করতে পারছি না কেসটা এবার – ঘেঁটে গেছি। এ বলছে এরিক আমাকে আঙটি দিয়েছে – সেও বলছে এরিক তোমাকে ভালোবাসতে পেরে আমি আনন্দিত! কে কাকে ভালোবাসছে বুঝতে পারছি না! একটু মন দিয়ে শুনে বুঝলুম এদের দুজনের নামই এরিক! আমার অফিসের চেনা এরিকের বউ-য়ের নামও এরিক! সেই মনে হয় প্রথম গে-কাপলদের মধ্যে হাসব্যান্ড-ওয়াইফ এমন সব ব্যাপার নিয়ে অভিজ্ঞতা। অবশ্য এই “হাসব্যান্ড-ওয়াইফ” কেন বলা হবে সেই ব্যাপারেও রাজনীতি আছে, আলোচনা আছে, প্রতিবাদ আছে – কিন্তু সেই সব আমার এই আলোচনার আউট অব স্কোপ।

    পরিশেষে যেটা বলার – আমি জানি না “এল-জি-বি-টি” কমিউনিটির জন্য ‘এমপ্যাথি’ শব্দটা ঠিক প্রযোজ্য কিনা। করুণা বা সিমপ্যাথি এই জাতীয় শব্দগুলি তো একদমই অসম্মানজনক! এরা দাপটে জীবন যাপন করবে এটাই তো চাইব আর সেই ভাবেই আমি দেখে এসেছি হল্যান্ডে। আর এটাও বলতে পারি যে, যদি মনটা খোলা রাখা যায় আর মেশামিশি শুরু করেন, তাহলে হয়ত একটু সময় লাগবে – কিন্তু তার পর দেখবেন আপনি কিভাবেই একাত্ম হয়ে গেছেন – আর তখন আলাদা চোখে দেখার ব্যাপারটাই আশ্চর্য্যের মনে হবে।



















  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০১ আগস্ট ২০২০ | ১২৮৮ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 14.139.196.11 | ০১ আগস্ট ২০২০ ১৬:০৩95805
  • ধন্যবাদ সুকি।
  • aranya | 2601:84:4600:9ea0:55f1:8c00:b9d1:106b | ০২ আগস্ট ২০২০ ০৪:০৮95825
  • বাঃ
  • Amit | 203.0.3.2 | ০২ আগস্ট ২০২০ ০৪:৩৮95826
  • খুব ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে সুকি.
  • aranya | 2601:84:4600:9ea0:1d24:755a:657:b55e | ০২ আগস্ট ২০২০ ০৫:০৪95827
  • মানুষ এগিয়েছে, তবে আরও অনেক পথ চলা বাকী। বিশেষতঃ ধর্ম এক মহা প্রতিবন্ধক।
    সমকামিতা এখনো অপরাধ, অনেক দেশেই
  • একলহমা | ০২ আগস্ট ২০২০ ০৯:৪১95833
  • বাঃ! ভালো লাগল পড়ে। 

    আমার নিজের জীবনে যে সামান্য কয়েকজন সমকামী মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে, সকলেই পুরুষ এবং গুণী মানুষ, ভালো মানুষ। 

    ‘গে লর্ড’-হোটেলের গল্প শোনার অপেক্ষায় থাকলাম। 

  • dc | 65.49.126.132 | ০২ আগস্ট ২০২০ ১০:০৯95834
  • ভাল্লাগলো পড়তে, আর ফটোগুলোও বেশ ভালো। এমনিতেও নানান দেশের কথা পড়তে আমার খুব ভালো লাগে, বেড়াতেও ভাল্লাগে। দুই এরিকের কাহিনী বেশ মজার। আর সুকিবাবুর সাথে একমত, এলজিবিটি দের জন্য আলাদা করে এমপ্যাথি, সিমপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি কোন কিছুরই দরকার নেই। আমরাই এলজিবিটি, এলজিবিটিরা আমাদের মধ্যেই আছে। পিস ঃ-)
  • Nabanita | 2601:204:4300:4e0:4446:e7c5:66f7:7a57 | ০২ আগস্ট ২০২০ ১১:৪৮95838
  • খুব ভাল লাগল। একদম ঠিক কথা LGBTQ দের  sympathy, empathy এই সবের প্রয়োজন হওয়া মানেই সমাজে  মানবাধিকার প্রতিষ্ঠঠিত নয় আমাদের কারো জনেই।

  • বিপ্লব রহমান | ০২ আগস্ট ২০২০ ১২:২৩95844
  • হা পোড়া দেশ! সমাকামিতার অধিকারে সোচ্চার হওয়ায় এই সেদিন জেহাদীরা ঘরে ঢুকে গলা কেটে গেল জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব রাব্বি তনয়কে।

    দিনে দিনে অনেক জমিতেছে দেনা…

    https://roopbaan.org/heroes/

  • স্বাতী রায়। | 117.194.42.70 | ০২ আগস্ট ২০২০ ১৩:০২95846
  • ঠিক। সিমপ্যাথি এমপ্যাথি কিচ্ছুর দরকার নেই। শুধু নাক গলানো টা বন্ধ করে, নিজের ব্যাগেজ অন্যের ঘাড়ে না চাপালেই হল। আইনগুলোও একটু একচোখমি বন্ধ করলে ভালো।
  • সুকি | 49.207.203.64 | ০২ আগস্ট ২০২০ ১৪:১২95851
  • বি, অরণ্য, অমিতাভদা, একলহমা, ডিসি, নবনীতা, বিপ্লব, স্বাতী-দি - সবাইকে ধন্যবাদ।

    dc,  আপনার পোষ্ট গুলো কিন্তু আমি পড়ি, আপনি ফান্ডাধারী ব্যাক্তি। তবে তার থেকেও আমার আকর্ষণীয় লাগে জীবন-কে কি ভাবে দেখা বা কাটান আপনি সেই বিষয়ক মন্তব্যগুলো। তা সে পয়সা ইনকাম বা বাংলা ভাষা যাই হোক না কেন। জানি না আপনি এগুলো কতটা মজা করে লেখেন বা কতটা সিরিয়াসলি। সিরিয়াসলি হলে আরো এক্সট্রা ভালোলাগা রইল আপনার জন্য। 

  • dc | 103.195.203.108 | ০২ আগস্ট ২০২০ ১৫:৪৫95853
  • ধন্যবাদ সুকি। বেশীটাই সিরিয়াস, তবে অল্প একটু মজাও যে নেই তা নয় ঃ-)
  • অনিন্দিতা | 103.87.57.178 | ০২ আগস্ট ২০২০ ১৮:১৮95859
  • মন খুলে মেলামেশা এ দেশে শুরু হয়েছে, যদিও তা এখনো খুবই সীমিত। তবে পরীক্ষাটা কঠিন হয়ে ওঠে যখন নিজের পরিবারের ভীষণ ঘনিষ্ঠজন  এ ধরনের কোন ঘোষণা করে। এমন একজন মাকে খুব কাছ থেকে জানি। দেখেছি সে সময়ে মেনে নেওয়ার জন্য তাঁর নিজের সংগে নিজের লড়াই। 

  • শিবাংশু | ০২ আগস্ট ২০২০ ১৯:১৫95861
  • ভালো লাগলো। গোছানো লেখা।

    কিন্তু এদেশের বস্তুস্থিতি বড়ো কঠিন আর জটিল। 'সচেতনতা' সৃষ্টিটাই সব চেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। সংস্থা হিসেবে গুরুচণ্ডা৯ অন্তত কলকাতা শহরে এই কাজটা করার প্রয়াস করে। এটা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। তবে এও ঠিক, শহরাঞ্চলে আমাদের সন্তানদের প্রজন্মে ব্যাপারটি নিয়ে যুক্তিগত অবস্থান নেওয়াটা বেশ দস্তুর হয়ে উঠছে। হয়তো আলো ফুটতে শুরু করে দিয়েছে।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত