• হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • করোনা ডাইরি: পর্ব ২

    Nirmalya Bachhar লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ৪৩৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • দিনগুলো আর কাটতে চায় না। সকাল থেকে বিকেল গড়ায় কিছু একটা হবে বলে। আমার জানলার কাঁচে সূর্যের আলো ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘরটাকে গ্রীন হাউসের মত করে দিয়েছে। রোদ্দুরের তাপে পাশের বাড়িটা যেখানে ভেঙে ফেলে নতুন করে গড়া হচ্ছে বলে মাটি কেটে ভিত বানানো হচ্ছে, সেখানের মাটি শুকিয়ে ফেটে আবার নিচে পড়ে যাচ্ছে। দুটো শালিখ সেখানে বসে দাম্পত্যকলহ করছিল। দোতলা থেকে একটা বাচ্চা তাই দেখে খুব হাততালি দিচ্ছিল, আমি নিচে বসে বসে শুনলাম।

    বাচ্চাগুলো আজকাল আর ঘরের সামনে খেলতে আসে না বিকেল হলেই। ক্রিকেট ব্যাটের শব্দ, "মাঝা মাঝা" চিৎকার করে ফুটবল খেলা আর শুনতে পাই না। আমাদের সোসাইটির কিছু বৃদ্ধ বিকেল হলে সামনের রোয়াকে বসে গল্প করতেন। তারা আর কেউ আসেন না। শুধু একজনকে দেখি বিকেল হলে একটা লাঠি নিয়ে ঠুকঠুক করতে করতে ঐ রোয়াকটায় এসে বসেন। তারপরে যতক্ষণ সূর্য অস্ত না যায়, বাড়ির উল্টোদিকের নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে যতক্ষণ সূর্যের শেষ আলোটুকু নিভে না যায়, ততক্ষণ বসে থাকেন। আমি জানি না কেন এমন হয়। জানতে কেন জানি ইচ্ছেও হয় না।

    আমাদের গলির আশেপাশে একটা ভিখারি মত পাগল থাকত। বিভিন্ন সময় তাকে নানা ফুটপাথে শুয়ে থাকতে দেখতাম। শতছিন্ন একটা ট্রাউজার আর একটা ধূলিধুসরিত জামা পরে। চেহারাটা দেখলে পরশপাথরের খ্যপার কথা মনে পড়ে যায়। ঠিক যেন মলিন ছায়ার মত ক্ষীণ কলেবর। এখানে যখন কলেজে পড়তাম তখন এরকম এক বন্ধু ছিল আমার। পৃথ্বী তার নাম। পৃথ্বীর বুদ্ধি ছিল ঢের, দূর্ভাগা ছিল সে আরো বেশী। সংসারের চাপ আর ভুল ডিসিশান কি করে একটা হাসিখুশী বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেকে মাথায় পা দিয়ে ডুবিয়ে দিতে পারে তা পৃথ্বীকে দেখে আমি শিখেছি।

    কলেজ থেকে পৃথ্বীকে তাড়িয়ে দিয়েছিল রিসার্চ ভালো করে না করতে পারা আর মিসকন্ডাক্টের জন্যে। তারপরে তার অনেকদিন কোন খোঁজ পাই না। কারো কারো মুখে শুনেছি যে সে কোন ব্রীজের তলায় না কোন গ্যারাজে থাকে। চেনা মুখ দেখলে টাকা ধার করে। আর টাকা পেলেই মদ খায়। এ রাস্তায় ও রাস্তায় শুয়ে থাকতে দেখেছে তাকে অনেক লোক। বাড়ির লোকেরা ইনস্টিটিউটকে গাল মন্দ যত না করেছিল, পৃথ্বীকে উদ্ধার করতে আসার চাড় দেখা যায় নি তাদের মধ্যে। শেষ বার যেদিন দেখা হয় পৃথ্বী হাজার দেড়েক টাকা চেয়েছিল ঘরে ফেরার জন্যে। দিই নি, বলেছিলাম টিকিট কেটে দিতে পারি, টাকা দেব না। চলে গেছিল মুখ ঘুরিয়ে।

    কিছুদিন আগে, প্রায় ৭-৮ বছর পরে হঠাৎই ফেসবুকে দেখা হয়ে গেল পৃথ্বীর সাথে। আমাকে মেসেজ করে ফোন নাম্বার দেয় তার। তক্ষুনি ফোন লাগালাম তাকে। ফোনের ওপাশে খসখসে আওয়াজ শুনি কোন কথা নেই। প্রায় ৪০ সেকেণ্ড পরে শুনলাম এক অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে অবাক হয়ে গেলাম। জানলাম স্ট্রোক হয়ে তার বাঁ দিকটা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেছে। ফলে গলার আওয়াজ আর তেমন নেই। মাথার বাঁ দিকে অনেকটা ক্ষতি হওয়ায় সে আর ইংরেজী বলতে পারে না ঠিক করে। শব্দ ভুলে যায়। মাতৃভাষা তামিলটা খানিকটা বলতে পারে। অতি কষ্টে এই কটা কথা বুঝতেই আমার আধঘন্টা লেগে গেল। শুনলাম বাড়িতে সে এখন পরিবারে বিজনেসের একাউন্ট দেখে। শুনে ভালো লাগল। এখনো পৃথিবীর থেকে পৃথ্বীর প্রয়োজন ফুরায় নি। কথা দিলাম যে আর কন্ট্যাক্ট হারাবো না। মৃতপ্রায় পৃথ্বীকে পাওয়াই হসপিটাল থেকে কিভাবে তার পরিবার নিয়ে গেছিল সে কথা আর জানতে চাই নি। সব খবর জানা ভালো না।

    আমাদের গলির পাগলটাকেও আর দেখি না অনেক দিন। দারোয়ানটাকে জিজ্ঞেস করলাম একবার। সে বলল, ও করোনাওয়ালে লোগ আয়ে থে, উসে উঠাকে হসপিটালমে লেকে গ্যায়ে। আমার ভাবতে ভালো লাগে যে এই সব কেটে গেলে হয়তো তাকেও কেউ খুঁজে নিয়ে যাবে। হয়তো এ পৃথিবীকে আরো কিছু দেবার আছে তার। বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের মত বলতে ইচ্ছে করে - তবু সে এখনও মুখ দেখে চমকায়, এখনও সে মাটি পেলে প্রতিমা বানায়।

    নিরমাল্লো
    ২৩শে এপ্রিল ২০২০
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ৪৩৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ২৯ এপ্রিল ২০২০ ০৭:৩৬92794
  • "তবু সে এখনও মুখ দেখে চমকায়, এখনও সে মাটি পেলে প্রতিমা বানায়।"

    ব্রেভো নিরমাল্লো।  উড়ুক 

  • জ্যোতিষ্ক | ২৯ এপ্রিল ২০২০ ০৮:২৮92796
  • গুরুতে মাঝে মাঝে চেনা মুখ দেখলে যে কী ভালো লাগে ... বন্ধু হলে তো কথাই নেই :) 

    বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের এই কবিতাটা অসম্ভব প্রিয়, তুই গানটা শুনেছিস? 

  • Nirmalya Bachhar | ২৯ এপ্রিল ২০২০ ১৩:২৮92809
  • বিপ্লবকে অনেক ধন্যবাদ। খুব ভালো থাকুন।

    আর জ্যোতি, কবিতাটাই পড়েছি রে। গানটা তো শুনি নি। পারলে লিঙ্ক দিয়ে দিস।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন