এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • দুর্গা আসছেনা.....

    হাসান মোরশেদ লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৩ ডিসেম্বর ২০০৯ | ১১৫৪ বার পঠিত
  • ।অ।

    দুর্গা এলো না এবার। দুর্গাবাড়িতে শুরু হয়ে গেছে মণ্ডপের কাজ। শ্যামাপদ'র বাড়িতে আলো জ্বলতে ও দেখলাম না কাল রাতে। লোড শেডিং ছিলো। দুর্গা আসেনি জানি তবু দেয়াল ঘেরা ঐ বাড়ির সামনে একটা চক্কর দিয়ে এসেছিলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার, ভেতরে কুকুরের চিৎকার। ওদের জোড়া কুকুর। শ্যামাপদের কুকুরগুলোকে আমার বড় ভয়।
    দুর্গা তার ছোট মেয়ে। বাজারের সবচেয়ে বড় আড়ত ওদের, সবচেয়ে বড় ফার্মেসি, সবচেয়ে বড় কাপড়ের দোকান। শিলিগুড়িতেও নাকি ওরা বাড়ি কিনেছে, ব্যবসা করেছে। হরে ফিসফিসিয়ে আমাকে শুনিয়েছে এইসব - "দেখিস শ্যামা শালা একদিন পাততাড়ি গুটিয়ে ওই পাড়ে চলে যাবে'। হরের বাবা শ্যামাপ্রসাদের আড়তে কাজ করে। আমি, হরে আর দুর্গা একসাথে স্কুলে পড়তাম। আমি এখন মফস্বলের কলেজ, দুর্গা ঢাকায় বেসরকারী মেডিকেল আর হরে কিছুইনা - দুর্গাবাড়ির পেছনের গাঙ্গের ভাঙ্গা ঘাটে বসে গাঁজা টানে।

    গতবার পুজোর আগের সপ্তাহেই দুর্গা চলে এল। ঢাকা থেকে নাইটকোচ ছেড়ে সকালবেলা এসে পৌঁছে আমাদের এই আটপৌরে মফস্বলে। আমি জানতাম দুর্গা আসবে, সকাল বেলা বাসস্টেন্ডে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। প্রথমে ওর ছোটভাই রঞ্জন, রঞ্জনের পেছনে নেমে এসেছিল ও। সাদা জামা গায়ে, রাতের ক্লান্তি চোখে। তবু বাসের দরজা থেকে যখন লাফিয়ে নেমেছিল, মনে হয়েছিল যেন এই মাত্র আমাদের পিয়াইন গাঙ্গের পানি থেকে শূন্যে উড়াল দিলো সাদা রাজহংসী। আমার ইচ্ছে হয়েছিলো তার নরম গলায় হাত বুলাই, দুর্গার নরম গলায়।

    দুর্গা-আমার কেউ না। আমি ধর্মে মুসলমান।

    ।অ।

    সপ্তাহ অধিক কাল দুর্গা আমার ফোন ধরেনা। ডাক্তারী পড়ার অনেক চাপ - আমি মফস্বলে থেকে এত বুঝিনা। মাস তিনেক আগে শেষবার যখন এলো ও, দুর্গাবাড়ির পেছনের পিয়াইন গাঙ্গের ভাঙ্গা ঘাটে বসেছিলাম আমরা। ও বলেছিল - "আমি মুসলমান হব, তুমি আমারে বিয়া করো'।
    শ্যামাপদের অনেক টাকা, হিন্দু হলেও অনেক ক্ষমতা। ইলেকশনে সব পার্টিরেই চাঁদা দেয়। দুর্গা আমাকে কথা শুনায়- "ডরাও কেন? তুমি না মুসলমান পোলা। এইটাতো তোমাদের দেশ।' আমার আব্বাজান ভূমি অফিসে দলিল লেখেন, আমি টিউশনি করি, আমার বড় আপার বিয়ে হয়নি এখনো। আমরা ভাড়া বাসায় থাকি। শ্যামাপদের দেয়াল ঘেরা দোতলা বাড়ি, শিলিগুড়ির বাড়ি নাকি পাঁচতলা।

    ।অ।

    দুর্গার খবর আর কেবল জানতে পারে হরে। শ্যামাপদের বাড়ির সব খবরে ওর অনেক আগ্রহ। শ্যামাপদ কোরবানীর ঈদের আগে আগে ভারত থেকে গরু আনানোর ব্যবসা করে কাদের মোল্লার সাথে - এই খবর ও হরে জানে। কাদের মোল্লা ইলেকশনের রাতে নমশুত পাড়ায় আগুন ধরায়।
    আমি দুর্গাবাড়ির দিকে সাইকেল ঘুরাই।
    প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে, নানা রংয়ের আয়োজন। বেশ রঙ্গীন সব। স্পিকারে গান বাজছে। ছেলেপেলের অনেক ব্যস্ততা। নান্টু'দা আমাকে দেখে হাত নাড়ে, আমি ও হাসি। দুর্গার মূর্তি দেখিনা। হয়তো মূর্তি দূর্গা আসবেন দু-একদিন পর।

    আমাদের ছোটবেলা এই দুর্গাবাড়ি পুরো টিলা জুড়ে কী ভীষণ সবুজ ছিল, অসংখ্য গাছ, পাখীদের কিচিরমিচির-পেছনে পিয়াইন গাঙ্গ। পাহাড় থেকে নেমে আসা গাঙ্গ বছরের এই সময়ে কেমন জলবতী হয়ে থাকত। স্কুল থেকে কতদিন আমি, হরে আর দুর্গা এসে বসেছি ভাঙ্গা ঘাটে। পরে হরে'টা খসে পড়লে কেবল আমি আর সে। আমরা তখন বড় হয়ে উঠেছি।
    এখন পুরো টিলাটা বস্তির মত। কমিটির লোকেরা বিক্রি করে দিয়েছে মন্দিরের আশে পাশের জায়গা। গাছ নেই, কেবল ভাঙ্গা সিঁড়িটা আছে। গাঙ্গে পানি আসেনা আগের মত।

    টিলা ঘুরে সিঁড়ির দিকে নামতে নামতে হরে কে দেখি। গাঙ্গের দিকে মুখ করে বসে আছে। আমি গিয়ে পাশে বসি। ওর হাতে পাতার বিড়ি। চোখ টকটকে লাল। বুঝি বিড়ির ভিতর গাঁজায় ঠাসা।
    ধোঁয়া ফুসফুসের ভেতর টেনে নিয়ে যেতে যেতে হরে বলে - "তোর দুগগার তো বিয়ে হয়ে গেল রে!'
    কথা বলিনা। হরে বিড়ি এগিয়ে দেয়। আমি টান দিতে দিতে বলি - কার লগে?
    - শিবঠাকুরের লগে। শিবঠাকুরটা মুসলমান
    -ও!
    - তয় তোর মতো ফ্যাঁপড়া মুসলমান না। দুগগার লগে ডাক্তরী পড়ে, শ্যামাপদের চেয়ে ও বেশী ট্যাকা। শ্যামা হের বাল ও ছিড়তে পারবোনা।

    হরে'র লাল চোখে আমি পানি দেখি। আমি ধাতানি দেই
    - তুই কান্দোস কেন?
    - ক্যান কান্দি তুই বুঝোছনা চ্যাট। দুগগারে যে আমি ভালো পাইতাম, এইটা জানতি না তুই? জাইনা ও শালা তুই দুগগার লগে প্রেম করলি? আমি কিছু কই নাই।
    - হ
    - তাও যদি বাল শিবঠাকুর হইতে পারতি। তুই ও আমার মতো ফকিন্নীর পোলা
    - হ

    হরে এরপরে খগেনের এর গল্প বলে। বাজারের সব থেকে পুরনো নাপিত খগেন। কাদের মোল্লা তার জায়গা জমি দখল নেয়ায় "এই বালের দেশে আর থাকুম না' বলে সে ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিল। খগেন ফিরে এসেছে। হরে'কে নাকি বলেছে - ফকিন্নীর পুতেগো লাইগা সবদেশই সমান, ইন্ডিয়াতে ও অনেক অনাচার, ট্যাকা পয়সা নিয়া যাইতে না পারলে অনেক পব্লেম।

    বিড়ির গোড়ায় টান দিতে দিতে জিজ্ঞেস করি - তুই আমারে এই গল্প শুনাছ কেন?
    হরে হাসে - এমনেই গুরু, কোন কার্যকারণ নাই। দশটা ট্যাকা দে। আরো গাঞ্জা নিয়া আসি। দুই বন্ধু'য় সারাদিন গাঞ্জা টানি।

    আমি টাকা দেইনা। কথা বলিনা। অনেক দূরে নীল নীল পাহাড় দেখা যায়। ঐ পাহাড় আমাদের দেশ না। আমি ঐ দেশে কোনদিন যাইনি। আমি ঐ পাহাড়ে কোনদিন যাইনি। আমার পাসপোর্ট নাই। ভিসা নাই।
    - ঐ হরে তোগো মা দুগগা এইবার কিসে চড়ে আসে রে?
    - নৌকা চড়ে আসবে বেটি
    - নৌকা চলবে কোন গাঙ্গে? পিয়াইন তো শুকাইয়া গ্যাছে, দেখ পানি নাই।
    - পানি নাই কেন? আমগো গাঙ্গ শুকায় কেন?
    - ইন্ডিয়া নাকি বাঁধ দিছে উজানে

    উত্তরে'র নীল নীল পাহাড়ের দিকে প্রণামের ভঙ্গিতে হাতজোড় করতে করতে হঠাৎ করেই মুঠো পাকায় হরে। বিড়বিড় করে বলে - কামটা তুমি ঠিক করলানা শিবঠাকুর !

    ২৭শে ডিসেম্বর, ২০০৯
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ২৩ ডিসেম্বর ২০০৯ | ১১৫৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন