• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

    Saikat Bandyopadhyay
    বিভাগ : ব্লগ | ১৬ মে ২০১৯ | ২৮১ বার পঠিত
  • হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান আদতে একই প্রকল্পের অংশ। আজকের সরকারি হিন্দি একটি অর্বাচীন ভাষা, তথাকথিত নব্য হিন্দুত্বের হাত ধরেই তার জন্ম। দেশভাগের আগে একটি-পৃথক-ভাষা হিসেবে হিন্দির কোনো অস্তিত্ব ছিলনা। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণে সুভাষচন্দ্র বসু অখণ্ড ভারতবর্ষের যোগাযোগরক্ষাকারী হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন 'হিন্দুস্তানি'কে, হিন্দি নয়। হিন্দি বা উর্দু নামের আলাদা কোনো ভাষা সে সময় ছিলনা। শব্দদুটো ছিল, তারা লিপির পার্থক্য বোঝাতে হিন্দুস্তানির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হত মাত্র। আর এই হিন্দুস্তানি কোনো নির্দিষ্ট ভাষা ছিলনা, ছিল একটি ছাতা মাত্র, যার মধ্যে নানারকম ভাষা বা কথনরীতি ঢুকে ছিল। আজ যাকে উর্দু বলি, সে তো ছিলই, আরও ছিল খড়িবোলি, আওধী, ভোজপুরি, মৈথিলী ইত্যাদি প্রভৃতি।

    এ হেন সেকুলার এবং বহুমাত্রিক হিন্দুস্তানিকে সরিয়ে হিন্দি নামক অর্বাচীন একটি ভাষার উদ্ভব হয় দেশভাগের পরে ( প্রকল্পটি আগে থেকেই চালু ছিল, কিন্তু সে জটিলতায় এখানে ঢুকছিনা)। এর দুটি কারণ ছিল। একটি ডাহা সাম্প্রদায়িক। যেজন্য উর্দু এবং হিন্দি দুটি আলাদা ভাষা তৈরির দরকার হল। যেন হিন্দি হিন্দুর ভাষা এবং উর্দু মুসলমানের। ভারত এবং পাকিস্তান তৈরির সঙ্গে এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন একদম খাপে-খাপে যুক্ত। এই পদ্ধতিতেই ফার্সি শব্দ তাড়িয়ে, তৎসম শব্দ ঢুকিয়ে কৃত্রিম 'হিন্দি' নামক একটি ভাষা তৈরি শুরু করা হয়। প্রক্রিয়াটি দেশভাগের আগে থেকেই চালু ছিল, কিন্তু দেশভাগের পর সেটা সর্বশক্তিমান কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প হয়ে দাঁড়ায়। দুই নম্বর কারণটি এর সঙ্গেই আসে। হিন্দি যেহেতু 'ভারত'এর ভাষা, তাই, সমস্ত আঞ্চলিক ভাষার উপরে কার্যত 'রাষ্ট্রভাষা' হিসেবে হিন্দি চাপানো শুরু হয়। একটু একটু করে আওধী, মৈথিলী, ভোজপুরির মতো ভাষাগুলিকে মেরে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যান্য উত্তর ভারতীয় ভাষাগুলির ক্ষেত্রে, পরোক্ষে হলেও, ধংসের পরিকল্পনাটি একই। এবং একই সঙ্গে ভারতকে একটি বহুজাতিক যুক্তরাষ্ট্রের বদলে এক-জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে চালানো শুরু হয়। 'এক ভাষা, এক সংস্কৃতি', 'বোম্বে আর ক্রিকেট আমাদের ঐক্যের প্রতীক', ইত্যাদি। বৈচিত্র্য বাদ দিয়ে স্রেফ ঐক্যের উপর জোর দেওয়া হয়। রাজভাষা প্রসার সমিতি সরকারিভাবে এবং বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আধা-সরকারি ভাবে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে। বোম্বে সিনেমা খুব সূক্ষভাবে 'হিন্দু লব্জ' আর 'মুসলমান লব্জ'কে আলাদা করে দেয়। দেশবিভাগের আগে মান্টো হিন্দুস্তানি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতেন, কস্মিনকালেও তাঁর তাতে কোনো অসুবিধে হয়েছে বলে শোনা যায়না। কিন্তু ক্রমশ জানা যায় মান্টো যে উর্দু লেখক, আর প্রেমচাঁদ হিন্দি লেখক। এইসব তথ্য খুব সিস্টেমেটিকালি আমরা জানতে শুরু করি।

    এই প্রকল্প বিনা বাধায় হইহই করে চলেছিল এমন না। দেশভাগ যেমন বাকি সবাইকে বাদ দিয়ে কয়েকজন মাথার সিদ্ধান্তে প্রায় পিছনের দরজা দিয়ে সেরে ফেলা গিয়েছিল, এটা সেরকম হয়নি। ১৯৪৪ সালেও আজাদ-হিন্দ-ফৌজে সুভাষ চন্দ্র বসু রোমান হরফে হিন্দুস্তানির প্রচলন করেছিলেন যোগাযোগের ভাষা হিসেবে। ১৯৪৮ সাল থেকে সিপিআই এক-জাতি-এক-ভাষা তত্ত্বের বিরোধিতা করতে থাকে। পার্টির মধ্যেই একদিকে আসতে থাকে উর্দুকে পুনরন্তর্ভুক্তির দাবী, অন্যদিকে রাহুল সাংকৃত্যায়ন প্রমুখরা খড়িবোলি-আওধী-ব্রজভাষার সীমান্ত অনুযায়ী নতুন রাজ্য তৈরির কথা বলেন। ১৯৪৯ সালে সিপিআইএর নানা দলিলে খুব স্পষ্ট করেই ভারতকে একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র (মাল্টিনেশন) বলা হয়। এবং মারোয়াড়ি-গুজরাতি পুঁজিপতিদের আধিপত্যের ছক হিসেবে এক-ভাষা (হিন্দি) কে তুলে ধরার তীব্র বিরোধিতা করা হয়। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মাতৃভাষায় বলতে দেবার দাবীতে কক্ষত্যাগও করেছিলেন তাঁরা। অন্যদিকে আঞ্চলিকভাবেও ভাষাগত জাতিসত্ত্বার দাবী মাথাচাড়া দিতে থাকে। ১৯৫২ সালে তেলুগু জাতিসত্ত্বার অধিকারের দাবীতে স্বাধীন ভারতে আমরণ অনশনে প্রাণ দেন শ্রীরামালু। কেন্দ্রীয় সরকার নতুন অন্ধ্র রাজ্য ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ওই দশকেই জাতিসত্ত্বার লড়াই লড়ে বাংলার মানুষ এবং বামপন্থীরা বাংলা-বিহার সংযুক্তির পরিকল্পনা ঠেকিয়ে দেন। ১৯৬১ তে মাতৃভাষার দাবীতে প্রাণ দেন বরাকের মানুষ। এক-জাতি-এক-রাষ্ট্র তত্ত্বটি আপাতদৃষ্টিতে পরাস্ত হয় এবং ভাষাই রাজ্যগঠনের মাপকাঠি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

    এতে করে অবশ্য আগ্রাসন তার চরিত্র বদলায়নি। পদ্ধতি বদলেছিল মাত্র। এর মূল কারণ নিহিত ছিল 'শক্তিশালী কেন্দ্র'তে। সমকালীন একজন রাশিয়ান লেখক লিখেছিলেন, তাঁদের মিউনিসিপ্যালিটিগুলি ভারতের রাজ্য সরকারের থেকে বেশি ক্ষমতা রাখে। কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্ব এক আলাদা বিষয়, সেটায় এখানে ঢুকবনা, এখানে পয়েন্টটা হল, 'শক্তিশালী কেন্দ্র'র নেতৃত্বে অর্বাচীন হিন্দিকে তৈরি করা শুরু হয়। এর আগে কংগ্রেসি হুইপ সত্ত্বেও মাত্র এক ভোটে সরকারি ভাষা হিসেবে 'হিন্দি'কে চয়ন করা হয়। দক্ষিণী একটি সংবাদপত্র লিখেছিল, কংগ্রেস হাইকম্যান্ড হস্তক্ষেপ না করলে হিন্দি ভোটে হারত।

    পঞ্চাশের দশকের নতুন হিন্দি ভাষা বলাবাহুল্য খোঁড়াচ্ছিল। ফার্সি এবং অন্যান্য 'বিদেশী' শব্দ বিতাড়ন করে সংস্কৃত শব্দ ঢোকানো প্রচুর হাস্যরসেরও সূচনা করে। বহুল প্রচলিত 'উজির'কে তাড়িয়ে 'সচিব', 'মজলিশ' বা 'দরবার'কে তাড়িয়ে 'লোকসভা', এরকম হাজারো শব্দ তৈরি করা হচ্ছিল সে সময়। ভাষায় এগুলির চল ছিলনা, ফলে তথাকথিত হিন্দিভাষীরা ব্যবহারও করতে পারতেননা বা জানতেননা। দক্ষিণী সংবাদপত্রে এই নিয়ে ঠাট্টা করে বলা হয়, হিন্দিভাষীরা নেতারা নিজের ভাষায় বক্তব্যই রাখতে পারেননা। কথাটা ঠাট্টা হলেও একেবারে মিথ্যে ছিলনা। হ্যারিসন ওই দশকের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, সেই সময়ের শিক্ষিত বাঙালিরা ইংরিজির পাশাপাশি নিজের ভাষা জানতেন, অন্তত রবীন্দ্রসাহিত্যে দীক্ষিত ছিলেন। কিন্তু নব্য 'হিন্দি'ভাষীদের সেসব চল ছিলনা। মান্টো-চুঘতাই-ফয়েজ আর হিন্দি নয়, ফলে সে ঐতিহ্য থেকে তাঁরা বঞ্চিত। আওধীতে লেখা লক্ষৌএর মিঠে গজল-ঠুংরি আর তাঁদের নয়। মৈথিলীর অপার্থিব গীতিকবিতাকে হিন্দি তাঁরা বলতে পারেননা। অতএব হিন্দি তৈরি করা শুরু হয় কৃত্রিম, সংস্কৃতবোঝাই রসকষহীন একটি ভাষা হিসেবে।

    এই কৃত্রিম, অর্বাচীন ভাষাটিকে 'জাতীয়' ভাষা হিসেবে তুলে ধরা সহজ ছিলনা। সেজন্য প্রথমে বহু-জাতির পরিবর্তে এক-জাতির একটি প্রকল্প হাজির করা জরুরি ছিল। একাধিক যুদ্ধ এই প্রকল্পটিকে তৈরি করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে ১৯৬২ সালের চিন-ভারত যুদ্ধে, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টিও ভেঙে যায়। যদিও তাত্ত্বিকভাবে কারণ ছিল আলাদা, কিন্তু অন্তত যুদ্ধটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল বলতে কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। ১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধ বিষয়টিকে আরও একধাপ এগিয়ে দেয়। ইন্দিরা গান্ধী কার্যত 'জাতির নেত্রী' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। 'জাতিয়তা' হিসেবে বাঙালি বা গুজরাতি নয়, ভারতীয়ত্ব প্রাধান্য পেতে শুরু করে। বহু-জাতির বিপরীতে এই 'জাতিয়তা' এবং তার সঙ্গে হিন্দির সংযোগস্থাপনের কাজে বোম্বের চলচিত্র শিল্পও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো রাজভাষা প্রসার সমিতি নয়, এক এবং অদ্বিতীয় বোম্বের উদ্যোগেই 'ভারতীয়' হিসেবে 'হিন্দি' সিনেমাকে উপস্থাপন করা শুরু হয়। এটা একেবারেই বেসরকারি পুঁজির জয়যাত্রা নয়, ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র প্রত্যক্ষভাবে বিষয়টায় সহযোগিতা জুগিয়েছিল। নেহরু পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই হিন্দি সিনেমার বিশ্বজয়ের অন্যতম কান্ডারি ছিলেন। তাঁর সক্রিয় উদ্যোগ রীতিমতো ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত।

    অনেকে অবশ্য বলেন, হিন্দি সিনেমা ছিল 'ইনক্লুসিভ'। উর্দু জবানকে সে নিজের অক্ষে স্থান দিয়েছিল, 'বিশুদ্ধ' হিন্দিকে নয়। কিন্তু, বস্তুত হিন্দি সিনেমা খুব স্পষ্ট করে হিন্দি-উর্দু বিভাজনকে তুলে ধরেছে এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে এদের যোগাযোগ স্পষ্ট করে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি 'উমরাও জান' এর মতো সিনেমা, যেখানে উর্দু জবানকে ব্যবহার করা হয়েছে মুসলমান খানদানির সঙ্গে যোগ করে। এটি নিঃসন্দেহে 'বাস্তবতা'র কারণে হয়নি। কারণ বাস্তবতা হল সিনেমায় বর্ণিত এলাকার ভাষা ছিল আওধী। ওই অঞ্চলেই ওয়াজিদ আলি শা লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত বন্দিশগুলি, যা কখনই কথাকথিত হিন্দি বা উর্দু নয়। অবশ্য লক্ষৌতে প্রায় সমসময়েই কাটিয়ে গেছেন গালিবের মতো কবি, তিনি আওধীতে লেখেননি, যদিও তাঁর ভাষাও নিঃসন্দেহে শিক্ষিত সমাজ বুঝত। কিন্তু গালিব নিজের ভাষাকে আখছারই 'হিন্দি' বলেছেন। সে ভাষা ছিল সুন্দর ও পালিশ করা। সুমিত সরকার বলেছেন এই শীলিত ভাষায় হিন্দু ও মুসলমানদের সমান অধিকার ছিল। ফলে উর্দু=মুসলমান, হিন্দি=হিন্দু -- এই সমীকরণদ্বয় মোটেই বাস্তবসম্মত নয়, কিন্তু ভারত এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্রের মতো বোম্বে সিনেমাও এই একই বস্তুকে দাগ কেটে জনমানসে গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

    ফলে যুদ্ধ, সরকারি ভাষা, বোম্বে সিনেমা, এসবের যোগফলে গোটা সমীকরণটি দাঁড়ায় এরকমঃ ভারতবর্ষ বহুজাতিক দেশ নয়, একটিই জাতি। তার রাজভাষা (এই শব্দটি খুব সুকৌশলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে) হল হিন্দি। ভারতের জাতিয়তার মূল সূত্র যেমন পাকিস্তান-বিরোধিতা (অর্থাৎ মূলগত সাম্প্রদায়িকতা), তেমনই রাজভাষার মূল সূত্র হল উর্দুর বিপরীতে সংস্কৃত নিয়ে দাঁড়ানো (সেই একই সাম্প্রদায়িকতা)। ভারতের ঐক্যের সূত্র যেমন শক্তিশালী কেন্দ্র, তেমনি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ভাষা। আসমুদ্র হিমাচল যতবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হাত মুঠো করে শপথ নিয়েছে, যতবার দেব আনন্দ থেকে অমিতাভ হয়ে শাহরুক খানে মুগ্ধ হয়ে 'গুরু' বলেছে, ততবারই এই মূলসূত্রগুলি গেঁথে গেছে জনতার বুকে। আধুনিক হিন্দি যেমন একটি শিকড়হীন ভাষা, ভারতের শক্তিশালী এককেন্দ্রিক (বৈচিত্র্যের সমাহারের বিপরীতে) 'জাতিয়তা' যেমন একটি কয়েক দশকের তৈরি করা ডিসকোর্স, একই ভাবে বোম্বের সিনেমাও সামগ্রিকভাবে একটি অলীক (রিয়েলিজমের বিপরীতে) জগতের সিনেমা।

    এই এক-জাতি-এক-ভাষা ডিসকোর্স দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা হয়েছে। যুদ্ধ-সিনেমা-ক্রিকেট এবং সরকারি উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরেই চালু ছিল। মতাদর্শগত আধিপত্য তৈরি হতে সময় লাগে। অবশেষে আশির দশকে এসে পুরো আধিপত্যের গল্পটি হয়ে ওঠে আরও সরাসরি। দূরদর্শনে চালু করা হয় 'জাতীয় কার্যক্রম' এর বাধ্যতামূলক হিন্দি শিক্ষাক্রম। এর আগে পর্যন্ত রেডিওর জমানায় 'স্থানীয় সংবাদ' এবং 'দিল্লির খবর' দুইই প্রতিটি জাতির ভাষায় প্রচার করা হত। খোদ দিল্লি থেকেই শোনা যেত গোটা দেশের খবর। টিভি এসে এক ধাক্কায় 'জাতীয় কার্যক্রম'= হিন্দি/ইংরিজি করে দিল। এক-জাতি-এক-ভাষা তত্ত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হল। তবে এবার আর শুধু হিন্দি নয়, তার সঙ্গে আস্তে আস্তে ঢুকল আরেকটি যোগাযোগরক্ষাকারী ভাষা -- ইংরিজি। সেটা অবশ্য আরও একটু প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে আসে। ইন্দিরা গান্ধির জমানায় শিক্ষাকে রাজ্য তালিকা থেকে সরিয়ে যুগ্ম তালিকায় নিয়ে যাওয়া হয়, তৈরি হয় কেন্দ্রীয় বোর্ড, যার মাধ্যম মূলত ইংরিজি। পরবর্তী কয়েক দশক শিক্ষার আঞ্চলিকতাকে ধ্বংস করে নতুন এই 'রাজভাষা'র বিজয়ের দশক। ক্রমশ এই দুই ভাষায় তৈরি হবে গাদা-গাদা 'জাতীয়' চ্যানেল, তৈরি হবে গাদা 'কেন্দ্রীয়' বোর্ডের বিদ্যালয়। আঞ্চলিকতাকে অগ্রাহ্য করে 'ভারতীয় জাতিয়তা'র হুঙ্কারও সর্বোচ্চ গ্রামে পৌঁছবে ধীরে-ধীরে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও নব্বইয়ের দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র শব্দটা কার্যত অচ্ছুত হয়ে যাবে। রাজ্যগুলির একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়াবে বিদেশী পুঁজি আকর্ষণ করার জন্য কামড়াকামড়ি। নিজের জাতির বা ভাষার হয়ে কথা বলার একমাত্র নাম হবে 'প্রাদেশিকতা'। ভুলে যাওয়া যাবে, ভারতে কোনো প্রদেশ নেই। ভারত নেশন-স্টেট নয়, যুক্তরাষ্ট্র, বহু জাতির বহু জাতিয়তার সমন্বয়। সেই জন্যই এই অঙ্গগুলিকে 'রাজ্য' বলা হয়, 'প্রদেশ' নয়।

    আধিপত্য অবশ্য এতে থামবেনা। এক-জাতি-এক(বা দুই)-ভাষা জিগিরের পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ হল 'ঐক্য'এর অন্তরায় খুচরো 'প্রাদেশিকতা'কে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া। প্রথমে তা আসে ভাষার উপরে। এ কোনো অলীক কল্পনা নয়। মৈথিলী বা ভোজপুরি আজ প্রান্তিক। এমনকি বামপন্থীদের পোস্টারবালক বেগুসরাইয়ের ছেলে কানহাইয়া কুমারও আর বেগুসরাইয়ের মৈথিলী বলেননা, প্রাত্রিষ্ঠানিক হিন্দিতে কথা বলেন, একটু 'বিহারি' টান সহ। বাঙলার বিপ্লবী অবিপ্লবী নির্বিশেষে রাজনীতিকরা বিহারি শ্রমিকদের ভাষাকে 'সম্মান' দিয়ে যখন তাঁদের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলতে যান, তখন ভুলে যান, যে, এ একেবারেই একজন ওড়িয়ার ভাষাকে সম্মান করে তার সঙ্গে অসমীয়া বলার মতো ব্যাপার । কারণ বেশিরভাগ বিহারি শ্রমিকেরই ভাষা হিন্দি নয়, তাঁদের ওটা আলাদা করে শিখতে হয়েছে, এবং সেই কারণেই তাঁদের ভাষা অবলুপ্তপ্রায়।

    গোটা খন্ডিত ভারতবর্ষ জুড়েই এই হিন্দি-ইংরিজি যুগলবন্দী এক শিকড়হীন অদ্ভুত 'ঐক্য'এর ধারণার জন্ম দিয়েছে। বোম্বে, ক্রিকেট আর পাকিস্তান-বিরোধিতা (অংশত বাংলাদেশ) ছাড়া এর আর কোনো জমিগত ভিত্তি নেই। বোম্বের চড়া দাগের গান, নাচ আর মোটামোটা ডায়লগ ছাড়া এর কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নেই। সেই কারণেই হিন্দির জায়গায় ক্রমশ ইংরিজির ঢুকে পড়ায় এর কোনো অসুবিধেও নেই, কারণ রক্ষা করার মতো কোনো ঐতিহ্যই এর নেই। আদ্যন্ত সাম্প্রদায়িক উৎসের এই আধিপত্যমূলক শিকড়হীন 'ভাষা' তৈরির প্রক্রিয়াটিতে উত্তর-ভারতের বুদ্ধিজীবীরা বিশেষ বাধা দেননি (কিছু বামপন্থী এবং কিছু তথাকথিত উর্দুভাষীর বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ ছাড়া)। তার ফল হিসেবে গোটা ভারত রাষ্ট্র জুড়ে এই শিকড়হীনতার প্রচার, প্রসার এবং গ্লোরিফিকেশন চলেছে এবং চলছে। এবং এই প্রক্রিয়ায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে বহুজাতিক এই রাষ্ট্রের বহুজাতীয় ঐতিহ্যগুলি। ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, যাপনের বৈচিত্র্য, সবকিছু।

    চল্লিশের শেষে বা পঞ্চাশের শুরুতে সিপিআই এর তাত্ত্বিক রামবিলাস শর্মা লিখেছিলেন, রাষ্ট্রভাষার দাবী ভারতীয় বৃহৎ পুঁজির সাম্রাজ্যবাদী এবং ঔপনিবেশিক অভিব্যক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। নানা বর্ণের কমিউনিস্টদের অবস্থান গত ষাট-সত্তর বছরে অনেক বদলেছে, বদলেছে লব্জ, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্ক সম্পর্কে মৌলিক অবস্থান মোটের উপর একই আছে। তবুও তাঁদের মুখেও আর এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধতার লব্জ আর শোনা যায়না। হেজিমনি আর প্র্যাগম্যাটিজম বড় মায়াবী জিনিস।
  • বিভাগ : ব্লগ | ১৬ মে ২০১৯ | ২৮১ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1 | 2
  • pp | 9004512.142.340112.12 (*) | ১৭ মে ২০১৯ ১২:৫৮48151
  • একটু অফ টপিক তাও বলি বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে এরকম তথ্যনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণ ধর্মী প্রবন্ধ নামাও।
  • Ishan | 89900.222.34900.92 (*) | ১৮ মে ২০১৯ ০২:১১48187
  • লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট দেখেছি তো। লক্ষ্য করে দেখবেন, দেখেছেন তো বটেই, ওতে আলোচ্য ভাষার তিনটি গোষ্ঠী আছে।

    ১। বিহারী (মৈথিলী, ভোজপুরি ইত্যাদি)।
    ২। পূর্ব হিন্দি ( আওধী ইত্যাদি)
    ৩। পশ্চিমী হিন্দি ( হিন্দুস্তানি ইত্যাদি)।

    এই সীমারেখা অনুযায়ীই পরবর্তীতে রাহুল সাংকৃত্যায়ন জাতির (অর্থাৎ রাজ্যের) সীমান্ত চেয়েছিলেন। সেটা হয়নি। বরং আওধী, মৈথিলী, ভোজপুরীকে দীর্ঘদিন ধরে 'হিন্দি' বলে যাওয়া হয়েছে। যদিও এগুলো কোনো ডায়লেক্ট নয়, আলাদা ভাষা। সুমিত সরকার লিখেছেন, যে ভাষায়্কে 'জাতীয়' মর্যাদা দেবার কথা ভাবা হচ্ছিল, তা ছিল এদের অনেক দূরের জিনিস।

    যতদূর মনে পড়ছে, হিন্দি-উর্দুর ভাষাগত কোনো পার্থক্যও ওই সার্ভেতে নেই। মনেহয় ভুল বলছিনা।

    এই প্রসঙ্গেই আসে দ্বিতীয় বইটি। অর্থাৎ, পিটার হার্ডি। উনি রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে লিখতে গিয়ে বারবারই হিন্দি-উর্দু দ্বন্দ্বের কথা লিখেছেন। পৃথক বিদ্যালয়, সংবাদপত্র ইত্যাদি। আমি বলেছি, দ্বন্দ্ব অবশ্যই ছিল, বস্তুত সাম্প্রদায়িকতার শুরুর দিকের একটা উৎস ওটাই, কিন্তু সেটা মূলত লিপির দ্বন্দ্ব। হিন্দি-উর্দু তফাত বলতে মূলত লিপির তফাত। এটা কেন বললাম? বানিয়ে বলিনি। হার্ডি লিপি না ভাষা স্পষ্ট করে লেখেননি। কিন্তু সুমিত সরকার লিখেছেন। হার্ডিকে তিনি উদ্ধৃতও করেছেন। হার্ডি উল্লিখিত দ্বন্দ্ব (সেই বেনারস থেকে যার শুরু)কে তিনি 'হরফ-বিতর্ক' বলেছেন। বস্তুত বিতর্কটিকেই তিনি উর্দু-দেবনাগরী বিতর্ক বলেছেন, উর্দু-হিন্দি নয়। এবার, একথা অনস্বীকার্য, যে, সংস্কৃতঘেঁষা পন্ডিতরা ভাষায় বেশি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন, উল্টোদিকের পন্ডিতরা অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছিলেন ফার্সি-ঘেঁষা শব্দকে। কিন্তু এটুকু টানাপোড়েন তো ভাষায় থাকবেই। আগেই লিখেছি, বাংলায়ও এমনই ছিল।
  • Ishan | 89900.222.34900.92 (*) | ১৯ মে ২০১৯ ০২:০৫48190
  • এইগুলোর কী মানে?
  • এলেবেলে | 230123.142.1278.67 (*) | ১৯ মে ২০১৯ ০৬:৩৪48191
  • কোনও মানে নেই। পাতি গুগল করলে হ্যারল্ড কাওয়ার্ডের সঙ্গে এ দুটোও দেখাচ্ছে তাই @taa bote-র জন্য রেখে গিয়েছি। আপনাকে কিছুই বলিনি।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1 | 2
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত