
সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক হয় ইলিশ ভাজা আর ঝাল হবে। আর ফিলে করা আনা ভেটকি রেডি করে রাখা ছিল লাঞ্চ-এর শুরুতে ফ্রাই-এর জন্য। সেটা বরং পরিবেশন করা হবে হার্ড আর সফট ড্রিংকসের সাথে। কিছুক্ষণ পরের কথা। ফিশ ফ্রাই সহযোগে হুইস্কি খাচ্ছে সবাই। বিনীতাকে দেখা যাচ্ছে রান্নার জায়গায়। একটু দূরে ড্রাইভাররা গল্প করছে। ওদিকে ব্যাডমিন্টন খেলছে গায়ত্রী আর কবিতা। ফেদার দূরে চলে গেলে ছুটে গিয়ে নিয়ে আসছে রঙিন। নিচু হয়ে একটা শট মারতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যায় গায়ত্রী। কবিতা ছুটে আসে, “লাগেনি তো?” গায়ত্রী মাথা নাড়ে। তারপর উঠতে গিয়ে ফের বসে পড়ে। তার চোখেমুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে ওঠে। মদের গ্লাস ছেড়ে দৌড়ে আসে রঞ্জিত। অন্যরাও আসে। গায়ত্রী বাঁ পায়ের গোড়ালি চেপে ধরে আছে। ... ...

রাতে খেতে বসেছে অরুণাভ, বিনয়, রঙিন। বিনীতা রান্নাঘর থেকে একটা পাত্র নিয়ে এসে টেবিলে রাখে। তারপর নিজে টেবিলে বসতে বসতে বিসপাতিয়াকে রুটি নিয়ে আসতে বলে। অরুণাভ বিনয়কে জিজ্ঞাসা করে, “আপনি আছেন তো কয়েক দিন?” “সাত দিন, এক হপ্তা,” জানায় বিনয়। “গুড,” বলে অরুণাভ। বিসপাতিয়া ইতিমধ্যে ক্যাসেরোলে করে রুটি দিয়ে গেছে টেবিলে। সেখান থেকে সবাইকে রুটি দিতে দিতে বিনীতা বলে, “আর গুড ! সাত দিন ধরে ঘরেই তো বসে থাকবে। বললাম চল দু-দিন ঘুরে আসি, তাও তো…” অরুণাভ একটু জোরের সঙ্গে বলে, “বললাম তো কাজটা শেষ হলে যাব.....” বিনয় বলে, “নেহি নেহি, ইয়ে ঠিক নেহি হ্যায়। ঘুরতে যানা শরীরকে লিয়ে আচ্ছা হোতা হ্যায়।” বিনীতা বলল, “সে আর ওকে কে বলবে? কাজে না গেলেই বরং ওর শরীর খারাপ হয়।” রঙিনের এই সব কথা ভাল লাগছে না। সে মসুর ডালের বাটিতে চুমুক দিয়ে খানিকটা খেয়ে নিল। তারপর বলল, “আমায় আর একটু ডাল দাও।” বিনীতা রঙিনকে ডাল দেয়। অরুণাভ কিছু একটা ভাবছিল। এবার বলল, “এক দিনের জন্য কোথাও যাওয়া যেতে পারে। সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফেরা।” “হাঁ হাঁ, ইয়ে প্রস্তাব আচ্ছা যায়। চারদিকে তো বহুত সুন্দর সুন্দর জায়গা হ্যায়।… হামারা ভি এক প্রস্তাব হ্যায়।” সবাই বিনয়ের দিকে তাকাল, সেও সবার মুখের দিকে দেখে নিয়ে বলল, “পিকনিক মে গেলে কেমন হোগা?” ... ...


ইন্দ্রনীলের কোয়ার্টার প্রায় অন্ধকার। কেবল ছোট ঘরটায় একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে ‘ক্যাথেড্রাল' সিরিজের বাঁধানো ছবিটা। রকিং চেয়ারটায় চোখ বুজে বসে আছে ইন্দ্রনীল, হাতে হুইস্কির গ্লাস। রবীন্দ্র সঙ্গীত বাজছে প্রায় অন্ধকার ঘরে - "তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে…” ছাদে একা বসে থাকা বিনীতার চোখে জল টলটল করছে, পাতা ফেলতেই এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। জলটা মুছে নিল সে, জীবনের সমস্যাগুলোও যদি এমন সহজে মুছে ফেলা যেত! বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল সে। ... ...


প্রসন্ন এ প্রাতে ----- তোমার করুণা পথ উঠিতেছে জাগি। বাদ্য নিষিদ্ধ এই পথে --- শব্দহীন শিশিরের লাগি। ... ...

মিনিট পনের পরে ফোন পায় বিনীতা। ডাক্তার তাকে চেম্বারে যেতে বলছে। বিনীতা ভেতরে গেলে ইন্দ্রনীল বলে, “বসুন ম্যাডাম। বলুন কী ব্যাপার? হঠাৎ জরুরী তলব?” অরুণাভর ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট দেয় বিনীতা। ইন্দ্র রিপোর্ট খুলে দেখে। “এটার তো তাড়া দিল না। যে দিন দেখাতে আসতেন সে দিন আনলেই হত,” বলে ডাক্তার। বিনীতা বলে, “আর একটা কাজ আছে। আমার সঙ্গে যেতে পারবেন? ঘন্টা খানেকের জন্য?” “কোথায়?” “আসলে ফ্ল্যাটটা দেখতে যাব, একটা চেকও দেওয়ার আছে। ওর যাওয়ার কথা ছিল, কাজে আটকে গেছে। বলল যদি আপনি যেতে পারেন।” ইন্দ্রনীল ঘড়ি দেখল। বলল, “ঘন্টা খানেকের ব্যাপার হলে অসুবিধে নেই। আসারও দরকার ছিল না, একটা ফোন করে দিলেই হত।” “ফোন করলে তো আসতেন না। বলে দিতেন ইমার্জেন্সি কেস আছে। সেদিন সিনেমাতেও তো এই কথা বলে এলেন না।” ... ...



দিদিমা বললেন, “ছাড়ো বৌমা, বেঋয়ে পড়ি। তোমার বাবার যত্তো ছিটিয়া৯ কারবার, সারাজীবন মাষ্টাঋ করে মাথার মধ্যে ছিটমহল বানিয়ে ফেলেছেন। নী৯মা আমার বেরোচ্ছি...” গলা তুলে নৃপেনবাবুকে চেঁচিয়ে বললেন, “শুনছো, আমরা বেরোচ্ছি”। তারপর নমুর গাল টিপে বললেন, “তুমি তো লক্ষ্মী ছেলে, দাদুর দিকে একটু নজরদাঋ করো, কেমন? দাদু যেন দুষ্টুমি না করতে পারে। আমরা বেরোলে দরজাটা বন্ধ করে ওপরেই থেকো”। ... ...


বেচা কেনা সাঙ্গ করে বন্ধ চোখ দোকানের ঝাঁপ নিতে চায় নীরব এ বিশ্রামের স্বাদ --- ফিরতি পথে --- মাতৃ পথে-- পাড়ি দিতে চায় আজ যত পুণ্য পাপ --- সেই পথ ঘিরে রাখে সে আদিম অনাহত নাদ। ... ...

ক্লান্ত পায়ে বিছানা থেকে ওঠে বিনীতা, হাউসকোট পরে নেয় ঠিক মত। বাথরুমের দরজা খোলে। বেসিনের কল থেকে চোখে মুখে ঘাড়ে জল দেয়, আয়নায় একবার মুখ দেখে। মনে পড়ে যায় কয়েকমাস আগে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হওয়া একটা কথা। অনেক দিন পরে রঙিনকে খাইয়ে দিয়েছিল অরুণাভ সেই দিন, পরে বিনীতাকে বলেছিল, “যে কোনও কাজ আমরা কোনও না কোনও দিন শুরু করি। খুব মেজর কিছু হলে প্রথম দিনের ঘটনাটা মনে থাকে, শেষ দিনেরটা থাকে না।” উত্তরে বিনীতা জানিয়েছিল, “বেশির ভাগ সময়ে তো জানাই থাকে না যে এই কাজটা এই বারই শেষ বার করছি।” বিনীতা তাকিয়ে থাকে আয়নার দিকে, বেসিনের কল থেকে জল পড়তে থাকে। ... ...


বিনীতার শান্ত স্বরে গায়ত্রীর উত্তেজনা কমে আসে। “ডাক্তার কি ব্যাচেলর?” “ডিভোর্সি।” “সেটার কারণ জানিস?” “ওয়াইফের দিল্লি পছন্দ, ওনার নয়। এই নিয়ে টানাপোড়েনের ফলেই ডিভোর্স।” “এটা একটা কারণ হল?” অবিশ্বাসের সুরে জানতে চাইল গায়ত্রী। “এটাই বলেছে। ভেরিফাই করার জন্য স্ত্রীর ফোন নম্বরও দিয়েছে।” কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে গায়ত্রী। তারপর জিজ্ঞাসা করে, “রঙিনের কথা ভেবেছিস?” বিনীতা বলে, “ওর জন্যই।” “মানে?” জানতে চায় গায়ত্রী। “রঙিনের বাবা অফিস আর কাজ আর বই ছাড়া কিছু বোঝে না। এত বছরের ম্যারেড লাইফে আমরা এক বার মাত্র বেড়াতে গেছি, কালিম্পং-এ। সেটাও বিয়ের পরপরই। আমার কথা ছেড়ে দে, মেয়েকেও তেমন সময় দেয়নি কখনও। আমার বা মেয়ের শরীর খারাপ হলেও সময় মতো ঠিক অফিস চলে গেছে। ফোন করে খবরও নেয়নি কেমন আছি আমরা। অসম্মান যেমন করেনি, তেমনি সম্মানও দেয়নি।…” ... ...


রূপটি ছাপিয়ে সে যে অরূপিণী আলো! অন্ধজন তাই বুঝি দেখে তারে কালো ... ...


অসুস্থ থাকার ফলে দু দিন আসতে পারেনি এজিএম সাহেব। আজ অফিসে আসার পরপরই রামাকৃষ্ণান দেখা করতে আসে অরুণাভর সাথে। আর যে খবরটা সে দেয়, তার ফলে হন্তদন্ত হয়ে সোজা খুরানার ঘরে আসে চলে আসে অরুণাভ। সম্ভবতঃ তার কেরিয়ারে এই প্রথম অ্যাপয়েন্টমেন্ট না নিয়েই জি এম-এর কাছে এসেছে সে। খুরানার সেক্রেটারি একটু অবাকই হয় অরুণাভকে দেখে। জানিয়ে দেয় তার বস ঘরেই আছে। দরজাটা একটু খুলে ভিতরে আসার অনুমতি চায় অরুণাভ। “ইয়েস দাস, এস।” ইসারায় চেয়ার দেখিয়ে অরুণাভকে বসতে বলে খুরানা। তারপর হাতের ফাইল সরিয়ে রেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। “স্যার, শুনলাম আমায় রিমুভ করা হচ্ছে?” ... ...
