এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • বিকল্প

    Sukdeb Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ০৪ জুলাই ২০২৪ | ১০৪ বার পঠিত
  • বিকল্প
    শুকদেব চট্টোপাধ্যায়

    ছোট্ট এই শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার ইতিবৃত্ত। আভিধানিক অর্থ — পরিবর্তে কল্প, বিভিন্ন কল্পনা। বি(বিভিন্ন ) কল্প (বিধান)। অর্থাৎ বর্তমানের পরিচিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে নতুন কিছুর চিন্তা ভাবনা করা, কল্পনা করা। এই সৃজনীকল্পনা, উদ্ভাবনী শক্তিই হল বিজ্ঞানের আধার। সেই কল্পনা, সেই ভাবনা, কখনো কখনো যুক্তি তর্কের পরোয়া না করে আপন খেয়ালে তৈরি করে ইচ্ছাপূরণের এক একটি স্বপ্নপুরী।

    সভ্যতার আদিপর্ব থেকেই মানুষ উন্নততর জীবনের সন্ধানে সচেষ্ট। এই সন্ধান বিকল্পের সন্ধান, যা সভ্যতার ক্রমবিকাশের চাবিকাঠি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যা আছে, যেভাবে আছে তার পরিবর্তে আর একটু ভাল, একটু উন্নততর কিছুর সন্ধান। বর্তমানের জানা, দেখা, বোঝার ভিতের উপরে গড়ে ওঠে বিকল্পের কাঠামো। কিছু মানুষের আজীবন পরিশ্রম, গবেষণা এবং তজ্জনিত যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে পর্যায়ক্রমে আমরা খুঁজে পেয়েছি বিকল্পের নানান সম্ভার এবং আরোহণ করেছি সভ্যতার পরবর্তী সোপানগুলিতে। প্রাতঃস্মরণীয় এই বিজ্ঞানীদের অসংখ্য তত্ত্ব আর সমীকরণের সমাহারে অব্যাহত রয়েছে সভ্যতার সিঁড়িভাঙ্গা। বিজ্ঞানীদের এই জটিল কর্মকাণ্ডে গণনা আছে, ভাবনা আছে, আছে গতি, স্থিতি, অক্ষ, তুলনা, মৌলিক, যৌগিক, অম্ল, ক্ষার, শক্তি এমন অনেক কিছু, কিন্তু কল্পনার জায়গাটা খুব সীমিত।

    কল্পনা ডানা মেলে উড়ছে শিল্পী, সাহিত্যিক ও অসংখ্য কল্পনাবিলাসীর মনে। কল্পনাকে অবলম্বন করেই তৈরি হয়েছে রূপকথার জগত, ফেয়ারি টেল, আরো অনেক পরে সায়েন্স ফিক্সানের উপর অজস্র গল্প উপন্যাস।

    কল্পনাবিলাসীরা ভাবে বিজ্ঞানীরাও ভাবে। বিজ্ঞানীদের ভাবনা যুক্তির সীমারেখাকে অতিক্রম করতে পারেনা। কারণ, তাদের শুধু ভাবলেই হবে না ভাবনাটাকে বাস্তবায়িত করার একটা দায় থাকে। কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকেরা সে দায় থেকে অনেকটাই মুক্ত। অসীম ধীশক্তির উন্মুক্ত সঞ্চালনজাত যে রত্নসম্ভার তাঁরা যুগে যুগে সমাজকে উপহার দিয়েছেন তারই ছটায় মানুষ সন্ধান পেয়েছে এক অনন্ত কল্পলোকের। নিজ নিজ জ্ঞান, বুদ্ধি, ভাবনার রথে চড়ে তারা পরিক্রম করেছে তার নানা অলিন্দ। এ ছাড়াও আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে ছিল বহু চারণ কবি ও কথক যাদের মুখে মুখে লোককথা এক পুরুষ থেকে আর এক পুরুষে সঞ্চারিত হয়ে এসেছে। এরাও ছিলেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।

    মানুষ পশুকে বশ করে নানাভাবে ব্যবহার করেছে। তার মধ্যে মুখ্য হল বাহন রূপে প্রয়োগ। পরে পশুর সাথে জোড়া হয়েছে শকট। ধীরে ধীরে তাতেও ক্রমান্বয়ে এল পরিবর্তন। পরে পশুর পরিবর্তে এল বাষ্প, পেট্রল, ইলেকট্রিক, আনবিক ইঞ্জিন। এগুলো সবই বাস্তব, অত্যন্ত রকম বাস্তব, এসেছে এক একটি যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সৌজন্যে। এতে সুচিন্তিত ভাবনা আছে, আছে জীবনব্যাপী বিজ্ঞানের অনন্ত সাধনা। কল্পনার অবকাশ ও পরিসর এখানে সীমিত। অপরদিকে কল্পনাবিলাসী অশ্বারোহীর অশ্বের গতিবেগ অথবা অশ্বশক্তি নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। সে অশ্বারোহণের আনন্দ উপভোগ করতে করতে চারিপাশ পর্যবেক্ষণ করে। আনন্দ পায় শ্লথগতির কোন জীবকে অতিক্রম করে যাওয়ার মুহূর্তে। আবার মাথার উপর দিয়ে যখন কোন পাখী ডানা মেলে উড়ে যায় তখন হয় একটু আক্ষেপ – আহা আমি যদি অমন উড়তে পারতাম!

    বাস্তবে নেই তো কি আছে। কল্পনায় মেলা ডানা ঘোড়ার পিঠে জুড়ে তৈরি হল পক্ষীরাজ। উড়িয়ে নিয়ে চলল রূপকথার এক রাজ্য থেকে আর এক রাজ্যে।

    অতীতের রূপকথা থেকে আজকের কল্পবিজ্ঞান এ সবই স্বপ্ন দেখা ও দেখানোর এক চিরন্তন প্রয়াস।

    এই যে কল্পনা, স্বপ্ন, যা সেই মুহূর্তে বাস্তবের সাথে সম্পর্কহীন কেবলই মনের এক খেলা, তার অনেক কিছুই পরে, অনেক পরে, বিজ্ঞানের হাত ধরে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ঐহিক জাগতিক সত্ত্বা হিসাবে। আদি যুগে উল্লিখিত পুষ্পক রথ বা ভিনগ্রহের নানান ঘটনার মত অনেক তৎকালীন মনশ্ছবি আজ বাস্তব। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে এই চিন্তা, ভাবনা, কল্পনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবকে কোনভাবেই অস্বীকার করা সম্ভব নয়।

    বিকল্পের সন্ধান প্রতিটি মানুষ তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অহরহ করে। তার পরিচিত পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, মনন ও কল্পনার ছোঁয়ায় নকশা তৈরি হয় সন্ধানের গতিপ্রকৃতির। বিকল্পের সন্ধান মানুষকে উন্নত থেকে উন্নততর জীবে রূপান্তরিত করে চলেছে। এই সন্ধান কেবল বস্তু কেন্দ্রিক নয়। জীবনকে সুন্দরতর করার জন্য যাবতীয় কিছুর সন্ধান। তাই ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী, গোষ্ঠী থেকে এসেছে সমাজ। এসেছে ন্যায়, নীতি, আদালত, শাসন, শিক্ষা ব্যবস্থা। এসেছে সঙ্গীত, খেলাধুলা ও আরো নানান বিনোদন। সমাজের বহুমাত্রিক বিকাশ সাধনার্থে এসেছে সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন ও আরো কত কিছু। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে বিকল্পের বিরামহীন অনুসন্ধান। প্রতিনিয়তই উন্মোচিত হচ্ছে নতুন বিকল্পের অবয়ব যার কিছু আমরা আত্মস্থ করি কিছু পরিহার করি।

    যুগ যুগান্ত ধরে বিশ্বব্যাপী সভ্যতার অগ্রগতির নিমিত্ত এই সাধনার সুফল কিন্তু সমাজ জীবনে সুচারু রূপে প্রতিফলিত এবং প্রত্যক্ষীকৃত হয়নি। যুদ্ধবিগ্রহ, দারিদ্র, অসহিষ্ণুতা, সন্ত্রাস, অপশাসন এর মত নানান উপদ্রবের ফলে নির্মল, সুন্দর পৃথিবী এখনও অধরা। এ তো আমাদের ঈপ্সিত নয়। তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত এই সমস্যাগুলির হেতু কি ?

    কারণ একটাই, বিকল্প নির্বাচন এবং তার ব্যবহারে ত্রুটি। রাজনীতিতে এর অনেক উদাহরণ আমরা দেখতে পাই। যে সরকার বা শাসনের উপর বিরক্ত হয়ে মানুষ বিকল্প একটি দল বা ব্যবস্থাকে গদিতে বসাল, কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল তারা পূর্বাপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট। তখন ভ্রম সংশোধনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। একই পরমাণুর সঠিক ব্যবহারের ঋদ্ধ হয় বিজ্ঞান ও মানব জীবন আবার জিঘাংসার প্রতিরূপ হলে প্রত্যক্ষ করি হিরোশিমা নাগাসাকির ভয়াবহ বিনাশ। সামাজিক অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা এবং তজ্জনিত সন্ত্রাস, এমন অনেক কিছুই শিশু বা কিশোরের মানসিক বিকাশকালে সঠিক শিক্ষার বিকল্পে উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে নানাবিধ অসামাজিক কুশিক্ষা প্রদান এর ফল। কিছু মানুষ, কিছু গোষ্ঠী এবং বৃহত্তর প্রেক্ষিতে কখনো কখনো কিছু দেশ আপন স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে বিষাক্ত করে সমগ্র বিশ্বকে এবং সেই বিষের যাতনা একসময় তাদেরও দগ্ধায়।

    অতএব কেবল বিকল্পের সন্ধান নয়, প্রয়োজন সঠিক নির্বাচন ও ব্যবহারের। অন্যথায় সাময়িক বিচ্যুতিও সভ্যতাকে সঙ্কটে ফেলতে পারে, আবাহন করে আনতে পারে মহা প্রলয়কে।

    Email: [email protected]
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • প্রবন্ধ | ০৪ জুলাই ২০২৪ | ১০৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন