এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • মায়াবট (শ্রদ্ধেয়া প্রব্রাজিকা শ্রদ্ধাপ্রাণাজীর স্মৃতিতে নিবেদিত)

    Sara Man লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ৩১৯ বার পঠিত
  • আমি যখন ছোট ছিলাম, মায়ের কাছে গল্প শুনতাম এক আশ্চর্য পাঠশালার।‌ পাঠশালায় দুটো বাড়ি, একটা চারাগাছেদের জন্য আর একটা একটু বড়দের জন্য। হঠাৎ এক এক দিন চারাগুলো জল বাতাস পেয়ে হিলহিলিয়ে খিলখিলিয়ে যখন দু একটা লম্বা লিকলিকে ডাল ছড়াতো, তখন বিরাট একটা কালো সিংদরজায় কাঁপন ধরত। তার গায়ের সোনালি নকশাগুলো ঝিলিক দিত। আর সঙ্গে সঙ্গে দরজার সামনে এসে হাঁকতে হত, 'চি-চি-ং ফাঁক'।‌আর যায় কোথা! ক্যাঁচকোঁচ করে দরজা নড়ে সরে গেলেই হিলহিলে খিলখিলে ল্যাকপ্যাকে চারাগাছের দল তার ভিতর দিয়ে সেঁধিয়ে যেত। দরজার ওপারে ছিল একটু বড় গাছেদের বাড়ি।‌ চারিধারে হলদে সাদা জাফরি কাটা রেলিঙের মাঝে একরত্তি উঠোনে রোদে আর মেঘে রোজ খেলা করত। তার এককোণে একটা টলটলে চৌবাচ্চা, আর কলাফুলের গাছ। উঠোনের তিনদিকে টুকটুকে লাল পথ ছিল, সেই পথ গিয়ে মিশত একটা সবুজ বাগানে। বাগানে না আসলে দালানে - ঘন সবুজ ঘাসের মত মখমলি, মাটির দাওয়ার মত শীতল এক দালান। সে দালান যেমন বড়, না ঠিক বড় নয়, মানে যেন অতল গভীর, মানে ঠিক গভীর নয়, ঠিক কেমন বলতে ঠাহর পাইনা। তবে যেমনই হোক, খুব আপন আপন। আমি যেদিন প্রথম সেখানে গিয়েছিলাম, তখন সবে কুঁড়ি ফুটেছি, অমন কুঁড়ি পাঠশালে কেউ নেয়না। সেদিন সেই দালানে গিয়ে শুয়ে পড়লাম, ঘুম এসে গেল। চোখ খুলে দেখি দালানে একজন মা রয়েছেন। তিনি কে তো জানিনা, মনে হল মায়ের মতো। মা বলল, উনি সবার মা, মায়েরও মা, আমারও মা।

    যেদিন আমার তিন নম্বর সবুজ পাতা গজালো, সেইদিন বাবা আমাকে বাগবাজারে মালতী-পার-পাশে ইস্কুলে ভর্তি করে দিল। সেই আশ্চর্য পাঠশালায় যাওয়া হলনা। মা বলল, এখন এখানে থাকো, পাঠশালায় যেতে গেলে আমাকে নাকি অন্তত ছটা পাতা গজাতে হবে।

    পাঠশালায় যে এক বটঠাকরুণ আছেন, তা আমি জানতুম না। একদিন মা বলল, এবার থেকে মা রোজ বটগাছের ছায়ায় বসে ছোট্ট ছোট্ট চারাগাছদের বড় হতে শেখাবে। বড় হওয়া আবার শেখানো যায় বুঝি? ও তো এমনি এমনি হয়। আমারও তো একটা একটা করে পাতা বাড়ছে - এখন হয়েছে পাঁচটা। মা বলল, এমনি এমনি বড় হওয়া নয়, বড়োর মত বড় হওয়া শিখতে লাগে। হবেও বা, আমি এখন ছোট - সবটুকু তো জানিনা। আমার মা ছিল নদীর নামে কৃষ্ণা। মায়ের কলম থেকে অক্ষরগুলো ঝরঝরিয়ে তরতরিয়ে বেরিয়ে আলাদা নদী হত - গল্পের নদী, নাটকের নদী, ছড়ার নদী। আমি সেখানে সাঁতার কাটতাম। সে ভারি মজা হত। শুনলুম বটঠাকরুণ বলেছেন, এবার থেকে মায়ের কলমের অক্ষরগুলো গোল গোল করে ঘুরিয়ে নকশা করে পদ্মফুল বানাতে হবে। এক একটা পদ্মফুলে বসবে এক একটা কুঁড়ি গাছ। সেখানে জল বাতাস পেয়ে বড় হতে পারলে তাদের কলমও নদী হবে। সেই হওয়াটা নিশ্চিত করাই নাকি মায়ের কাজ। আমি ভাবি অদ্ভুত বটগাছ তো, সে নিজের জন্য মাটি নয়, সবার জন্য নদী বানাতে চায়! তাও মাকে বললুম, তুমি তো নিজেই নদী গো মা, পদ্মফুল বানাবে কী করে, বয়ে যাওয়া জলে যে ও ফুল থাকেনা। শুনলুম পাঠশালে মা নদী নয়, অনেক চারা বয়সে যখন বটের ছায়ায় মা আশ্রয় নিয়েছিল, তখন সেই বটঠাকরুণ গালুফুলো কোঁকড়া চুলো মায়ের কৃষ্ণা নাম বদলে ফুলকুমারী, মানে কৃষ্ণকুমারী করে দিয়েছেন। মা বলল টুংটাং ঠুং ঠাং ঝিরঝির কুলকুল জলের ধারা বেঁধে অতল আর থির, কাজল আর গভীর হ্রদ বানিয়ে পদ্ম ফোটানোই আজ থেকে মায়ের সাধনা। যেদিন থেকে মা এই অদ্ভুত কাজ শুরু করল, সেদিনই আমার ঘাড় সুড়সুড় করতে লাগল, হাত দিয়ে দেখি কেমন করে যেন ঘাড়ে একটা নতুন মানে আমার ছয় নম্বর পাতাটা গজিয়েছে।

    মায়ের কাজের সঙ্গে সঙ্গে আমার রোজের বদল হল।‌ সেই যখন আকাশ লাল করে সুয্যদেব সাতরঙা ঘোড়ায় চড়ে টগবগ করে বেরিয়ে পড়েন তখন মালতী ইস্কুলে যাই, সেখান থেকে বেরিয়ে মায়ের সঙ্গে পাঠশালায় যাই। আবার যখন সুয্যদেব পাটে বসেন, তখন বাড়ি ফিরি। ছোট পাঠশালায় একটা বাগান ছিল, না বাগান মানে ছাদ ছিল, ছাদে টিনের ছাউনি ছিল, ছাউনিতে বৃষ্টিফোঁটার গান ছিল। আর দুই মা ছিল, মানে আমরা ডাকতাম মাসি। একজন রাখালরাজার হাতে 'বেণু', আর একজনের ঝোলায় টকমিঠে ঝাল ঝাল রকমারি মণিমানিক। আর ছিল এক অশথগাছ। খুব ভালো আর দয়ালু। নিজের ঘরবাড়ি ত্যাগ করে পাঠশালাতেই থাকেন - তাই নতুন নাম হয়েছে ত্যাগপ্রাণা। কিন্তু পাঠশালায় সকলে সেই অশথগাছকে আদর করে বড়গীতাদি বলে ডাকত। সেই অশথগাছের তলায় সারাদিন বসে থাকতাম। একটা লালরঙা ছবিওলা রামায়ণের বই ছিল - সেটাই নাড়াচাড়া করতাম বসে।

    মা একদিন বলল, আমায় বটঠাকরুণ ডেকেছেন। আমি তো এক পায়ে খাড়া। কত না শুনেছি গল্প। লাফিয়ে লাফিয়ে পাতা নেড়ে নেড়ে চললাম এগিয়ে সেই বেণুমায়ের সঙ্গে। পথ বড় কম নয়। প্রথমে সিংদরজা, তার পর সেই অতলান্ত সবুজ দালান, তার ধারে একটা সিঁড়ি। ধাপে ধাপে ওঠে - এক পা, দু পা, তিন পা, চার পা - সিঁড়ি ঘোরে এক পাক, দু পাক - তিন পাকের পর ওপরে একটা সাদামাটা ঘর। সেখানেই আছেন বটঠাকরুণ। জানলা সাদা পর্দা দিয়ে ঢাকা। কিন্তু ঘরে ছায়া ছিলনা। ঠাকরুণের নিজের একটা আভা ছিল। তাতেই ঘরটা আলো আলো লাগছিল। ঘন বর্ষার আগে যেমন একটা গুরু গুরু শোনা যায়,  মৃদু তবু গম্ভীর, তেমন একটা কন্ঠ শুনলুম,
    - তুমিই বুঝি আমাদের কৃষ্ণকুমারীর মেয়ে?
    - (আমি হেসে বললুম) পদ্মফুল এঁকে দেখাবো তোমায়? তুমি মাকে যে বলেছিলে।
    - ওটা মায়ের জন্য। আমি চাই চারাগাছেরা বন্দী না থেকে নদী হয়ে যাক।
    - আরে জানি গো জানি, তাই তো খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল তোমায়।
    - কেন?
    - ভাবছিলাম তুমি কেমন বটগাছ গো, এত যে ঝুরি নামিয়ে বসে আছো, নড়ন চড়ন নেই, তুমি নদীর খবর কোথায় পেলে? তোমার পাতার ওপরে ঐ যে আলোগুলো বসে আছে ওরাই বুঝি খবর দেয়?
    - হ্যাঁ, তা তো দেয়।
    - ঠিক বুঝেছি। জানো তো, নদী হবার কথা শুনে পর্যন্ত আমি পথ খুঁজছি, কী করে নদী হব, পথ পেয়ে যাব ঠিক তুমি দেখে নিয়ো।‌
    - বেশ, তাই হোক।
    আবার বেণুমায়ের সঙ্গে সেই পথ উজিয়ে ফেরা। তবে ফেরার সময়ে অবিরাম কানের মধ্যে ছল ছল ছলাৎ, কলকল কুলুকুলু কী যেন সব ঝঙ্কার উঠতে লাগল। চুপচাপ অশথ গাছের তলায় গিয়ে বসলুম। আমার মুখ দেখে অশথ গাছ বলল
    - কী কথা হল বটঠাকরুণের সঙ্গে?
    - বললুম, আমি নদী হবার পথ খুঁজছি।
    - তাই বুঝি? আমি একটা দিশা জানি পথের, তোমাকে সেখান থেকে নিজেকে খুঁজে নিতে হবে।
    - কোথায় বলো না গো!
    অশথ গাছ তখন নড়েচড়ে এক বিশাল কালো দেরাজ খুলে বললে, এদিকে এসো। আমি মুখ বাড়িয়ে দেখি তার মধ্যে অজস্র কীসব যেন ঝিলমিল করছে, চোখে ধাঁধা লেগে যায়। একটু চোখ সয়ে এলে দেখলাম বই। এদের মধ্যেই নদীর পথ আছে। মনে ভাবি, - মা অক্ষরের কথাই বলেছিল বটে।
    তারপরে রাত ভোর হয়, রাঙা আলো হলুদ হয়, হলুদ থেকে সাদা। আমি আর রাঙা আলোয় মালতী ইস্কুলে যাইনা। সুয্যির আলো সাদা হলে মায়ের হাত ধরে পাঠশালে যাই। বটঠাকরুণ যে পরীক্ষা করে দেখতে চান, আমি নদী হতে পারি কিনা। সারাদিনমান কেটে যায় নানা কাজে। দিন থেকে সপ্তা, সপ্তা থেকে মাস। ঠাকরুণের কথা ভুলে থাকি। হঠাৎ একদিন কোকিল ডেকে উঠল। চৈতি হাওয়া পাঠশালার আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে নেচে বেড়াতে লাগল। মনে একটা খুশির দোলা - জানিনা আজকে কী! মাকে বললুম,
    - আজ এত আনন্দ হচ্ছে কেন গো মা, মনটার মধ্যে আপনা আপনি নূপুর বাজছে, কানে যেন ঘন্টা বাজছে টুংটাং!
    - সে তো হবেই, আজ যে রামচন্দ্রের জন্মদিন।
    - রা-ম! অযোধ্যার রাম? তার জন্মদিন পালন হবে? কীকরে গো মা?
    - আজ ছুটির পরে বটঠাকরুণ সকলকে রামলক্ষ্মণের গল্প বলবেন, শুনবি।‌
    আজ গল্প হবে! পল যায়, ক্ষণ যায়, সে এক অপেক্ষা! সময়ের কলগুলো সেদিন ইচ্ছে করেই খুব ধীরে চলতে লাগল, আর আমার প্রাণপাখি খালি উড়ি উড়ি করে। অবশেষে ছুটি হল, মায়ের সঙ্গে সেই সবুজ দালানে গিয়ে বসলুম। দালানে বেশ ভিড়। সকলেই গল্প শুনতে এসেছে। একধারে মহাযোগী রাজর্ষি সিদ্ধার্থ শ্বেতপদ্মের ওপরে বসে রয়েছেন। তার সামনে একটি সাদামাটা কাঠের পীঠাসন।‌ আমি চোখ পিটপিট করে চারিপাশ দেখছিলুম। এমন সময়ে দেওয়ালগুলো ফিসফিস করতে শুরু করল, ঐ যে শ্রদ্ধাপ্রাণা, লক্ষ্মীদি, ল-ক্ষ্মী, ল----ক্ষ্মী কে? শ্রদ্ধাই বা কে? হ্যাঁ, বটঠাকরুণ খুব লক্ষ্মীমন্ত একথা আমি মানি, তাঁকে সবাই শ্রদ্ধা ভক্তি করে, এও ঠিক।‌ তাহলে কি এগুলো ওঁর নাম? বটঠাকরুণ নিজেই একটা আলো-গাছ, তাঁর আবার নামে কী প্রয়োজন? সাতপাঁচ ভাবা বন্ধ হল, কারণ বটঠাকরুণ সেই পীঠাসনে এসে বসলেন। মহাদেবের জটার মত তাঁর ঝুরিগুলো ঝলমলিয়ে উঠলো। ফাঁকে ফাঁকে মখমলি পাতাগুলো দুলতে লাগল, চিকমিক ঝিকমিক করতে লাগল। সেই অতল দালানের সবুজ আর বটের পাতার সবুজ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।‌ দালানের এই ক্ষুদ্র ভিড়টাতো ছার, আজ বিশ্বচরাচর তাঁর এই রূপ দেখে যেন স্তব্ধ হয়ে রইল। পিছনে সিদ্ধার্থ ধ্যানে বসেছেন। আচ্ছা জেতবনের অক্ষয় বট - সেও কি এমনই ছিল? জলদ মেঘের গুরু গুরু কন্ঠে বটঠাকরুণ রামলক্ষ্মণের গল্প বলছেন।‌ চারভাইয়ের জন্মে অযোধ্যায় সেদিন কী আনন্দের স্রোত! অশথ গাছের দেরাজে একটা বই ছিল, 'নালক'। আমি তার ভিতরে অক্ষরের নদী খুঁজতে গিয়েছিলাম। বুদ্ধের জন্মে কপিলাবস্তুর আনন্দ, আর অযোধ্যার আনন্দ আমার কাছে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।

    দিন যেতে যেতে একদিন আমি নিজে নিজে সিংদরজা পেরিয়ে পাঠশালার সেই দালান বাড়িতে ঢুকে পড়লুম, মায়ের হাত ধরে না, বেণুমায়ের সঙ্গেও না, পুরো একা। বটঠাকরুণের সঙ্গে মাঝেসাঝেই দেখা হত। রামের জন্মদিন এলে মানে প্রতি রামনবমীতে গল্প শোনাও চলল পুরোদমে।‌ আমার কচি বাকল ঝরে ঝরে ঝুনিয়ে উঠছিলুম একটু একটু করে। তবে সঙ্গে আরও চারাগাছেরা ছিল যারা একটু বেশিই ঝুনো হয়েছিল। আমাদের পাঠশালা ছিল মেয়ে গাছেদের জন্য। তার মানে ধারে চারে ছেলে চারাগাছ ছিলনা তা তো নয়, বিস্তর ছিল। উঁকিঝুঁকিও ছিল। আমরা বটগাছের ছায়ায় থাকলেও একটা কাঁঠাল গাছের গান পথেঘাটে খুব শুনতুম, - হুঁ হুঁ যে কাঁঠালের আঠা-আ-আ, লাগলে পরে ইত্যাদি। গানটা চারাগাছেদের মনে ধরেছিল। আমরা সবাই সবই জানছিলুম, কেবল পাঠশালায় এসব কথা উচ্চারণ বারণ ছিল। একবারের রামনবমীতে বটঠাকরুণ রামচন্দ্র আর হনুমানের কাহিনী শোনালেন, ভক্ত আর ভগবান, ভগবান না কি চিরসখা, সখা নাকি রক্ষক? তিনি যখন গল্প করতেন তখন তো সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতাম, তারপরে কিছুদিন কেবল সেই নিয়েই আলোচনা চলত। একটা ঝুনো চারা বলে উঠল - আহারে কী পীরিতি! পাশ থেকে আর এক ঝুনো সঙ্গত দিল - পীরিতির বাকশো। ব্যাস - সেই হল আমাদের সঙ্কেত। আর উঁহুঁ, হুঁ হুঁ নয়, সবার সামনেই বাকশো নিয়ে আলোচনা চলতে লাগল। কয়েকটা নালিশকুটি, মরকুটি চারা এসে যদি নাক কান গলানোর চেষ্টা করত, ঝুনো চারারা চোখ গোল করে বলে দিত - এখানে রামচন্দ্র আর হনুমানের গল্প হচ্ছে, শোননি বুঝি বটঠাকরুণের মুখে! ঐ নাম শুনে নালিশকুটিরা দমে যেত, সে আমাদের কী এক নিষিদ্ধ মজা! কিন্তু পাঠশালায় ধরা না পড়লেও মায়ের কাছে ধরা খেলাম।
    - তোরা বটঠাকরুণের নাম নিয়ে ছলনা করিস?
    সেদিনও ছিল এক রামনবমী। বটঠাকরুণ বলে চলেন - বিশ্বামিত্র মুনি এসেছেন রামলক্ষ্মণকে নিয়ে যাবেন তাড়কা বধ করার জন্য। ছোট ছেলে রাক্ষসের সঙ্গে কীকরে যুদ্ধ করে, ভেবে কেউ কূলকিনারা পায়না, দশরথ কাঁদেন ভূমিতে পড়ে, অযোধ্যায় কত শোক, মা কৌশল্যা কাঁদেন, পুরবাসী কাঁদে, সবুজ গাছ, হলদে পাখি, বাগানের লাল ফুল কাঁদে, আমরা সজল চোখে দেখি সেই দৃশ্য। হঠাৎ তাল কেটে যায়, দেখি বেণু মা এককোণে দুই হাঁটুর মধ্যে থুতনি ডুবিয়ে অঝোর ধারায় কেঁদে চলেছে ঠিক যেন মা কৌশল্যার মত। থমকে যাই, বেণুমায়ের কি কিছু হারিয়ে গেছে? মায়ের কাছে শুনলুম, সেই যেবার পুব পশ্চিমের মাঝখানে পাঁচিল উঠল, এদিকের বন ওদিকে, ওপাশের জঙ্গল এপাশে - সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল, ফুল ফল, পাখি, কাঠবিড়ালি, চারাগাছ, বড়গাছ যে যেখানে ছিল, সবার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেল, সেই সময়ে বেণুমা আর কোলের ছেলেকে বসিয়ে রেখে তার বর - 'একটু আসছি' বলে চলে গেল, আর ফেরেনি। ছোট্ট জীবন আমার, এত কষ্টের কথা আগে শুনিনি। আমার ভিতরটা আর্তনাদ করে, ওপরে নির্বাক।
    - তারপর?
    - কোনভাবে বটঠাকরুণ জানতে পেরে আশ্রয় দিয়েছেন।
    - সকলেই তো কষ্ট করেছে মা, শুধু বেণুমার কপালে এমন কেন হল?
    - শুধু বেণুদি কেন, এমন হয়েছে হাজারে হাজারে। বটঠাকরুণ নিজেই কতজনকে উদ্ধার করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
    মায়ের কথা শুনে মুখে আর কথা সরেনা আমার। কিছুক্ষণ পরে বললুম,
    - আর কাউকে চেনো এমন যাকে বটঠাকরুণ উদ্ধার করেছেন?
    - চিনতে হবে কেন? আমি নিজেই তেমন উদাহরণ।
    - মানে?
    - আমার বাবার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে দুঃখ কষ্ট সহ্যের অতীত হয়ে গেল। বাগবাজারের বনেদী প্রাসাদে বাবা আমাদের খাওয়া বন্ধ করে দিল। আমার মা তখন আমাদের দুইজোড়া ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে অনেকদূরে অশোকবনে মানে অশোকনগরের উদ্বাস্তু কলোনিতে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছিল। পাঠশালা আসা বন্ধ হল। অভাব, অনটনে আনন্দের সব দরজা বন্ধ হল।
    - সেকী! তারপর?
    - বটঠাকরুণ যে আমাদের ভুলে যাননি, তিনি যে আমাদের খুঁজছেন তা জানতুম না।‌
    আমি নির্বাক।
    - দুবছর খোঁজাখুঁজির পর, তিনি আমাদের খুঁজে বার করেন। একটা একটা করে বন্ধ দরজা খুলে, পাঠশালা শেষ করিয়ে আমাকে পৌঁছে দেন মহাবিদ্যালয়ে, তারপর সংসারে - যেখানে তোকে পেলাম।‌
    আমার মনের ভেতর উথালপাথাল চলতে থাকে। বটঠাকরুণ নিজেই এক বাল্মীকি, তাই রামায়ণের গল্প এমন সজীব করে তুলতে পারেন। যা শুনলুম তার অর্থ হল যে, আমার এই ক্ষুদ্র অস্তিত্বটা বটঠাকরুণের কাছে ঋণী। দুঃখের মাঝেও মনে মনে হাসি, কপিলাবস্তুর সোনার পাঁচিলের বাইরে বেরিয়ে রাজপুত্র সিদ্ধার্থ রোগ, দুঃখ, জরা, মৃত্যু দেখেছিলেন। এমন প্রথম ধাক্কা সবার জীবনেই আসে। হ্যাঁ, সকলে বুদ্ধ হতে পারেনা ঠিকই, তবে বোধের উত্তরণ হয়। মা বলে চলেছিল, সব কথা কানে ঢুকছিলনা আমার। একটু শান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম,
    - বটঠাকরুণ এত কাজ, এত ব্যস্ততার মধ্যেও এত শক্তি কোথায় পান গো মা?
    - কেন পাঠশালায় শুনিসনি - সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়, কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না! বটঠাকরুণ সত্যকে ধরে আছেন, সেই তাঁর শক্তি। বড় থেকে ছোট কোন দুঃখই তাঁর অগোচরে থাকেনা। মনে নেই রাঙা আলোয় ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট্ট চারা তুই চাঁদের আলোয় ঘরে ফিরতিস, তাই নিজেই তোকে ডেকে কেমন পাঠশালায় টেনে নিলেন! আর তোরা ওঁর নাম নিয়ে ছলনা করিস!

    মায়ের কথায় চমকে উঠি। ছলনা শব্দটা যে এতটা ধারালো আগে তা বুঝিনি। অনুতাপে দগ্ধ হয়ে যাই।‌ আমার পোড়া চেতনাটা টুকরো টুকরো হয়ে বটঠাকরুণের ঝুরির ঝিলিমিলি আলোর সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে যায় মাঠ ঘাট বনবাদাড় পেরিয়ে পর্বতচূড়ায় শীতল হিমানীর উদ্দেশে।‌ পাঠশালা পেরিয়ে মহাবিদ্যালয়ে, মহাবিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংসারে। সত্যই শক্তি, শক্তি না পেলে বরফ গলে জল হয়না, জলকণা জুড়ে জুড়ে নদী হয়না। আমাকে নদী হতে হবে - আমি বটঠাকরুণকে কথা দিয়েছি। সুয্যদেবের উদয় থেকে অস্ত, আবার অস্ত থেকে উদয়, পৃথিবীটা এই চাকায় খালি ঘুরে মরে। আমি মায়ের মত চারাগাছেদের নদী করে তোলার কাজ নিয়েছি, আমার নিজের কোলেও কুঁড়ি ফুটেছে।‌ খুব ইচ্ছে করে কুঁড়ি কোলে নিয়ে একবার বটঠাকরুণের কাছে যাই। এত ইচ্ছে তবু পা সরেনা, শ্যাওলা, ঝাঁঝি জমিয়ে ফেলেছি বিস্তর, কেবল পিছন থেকে টেনে ধরে। একদিন সকালের হলুদ আলোয় তেমন চাঁপা ফুলের উজ্জ্বল রং ধরছিলনা, কেমন যেন মরা মরা, পাঁশুটে। আমি জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিলুম, এমন কেন হল? তখনই কে যেন খবর দিল, সুয্যদেব সাতরঙা সাতঘোড়ার রথে এসে বটঠাকরুণকে নিয়ে চলে গেছেন আকাশের ওপারে, তাই এখন পৃথিবীতে রং কম পড়ে গেছে। এতদিনের শেওলা ঝাঁঝি সরিয়ে, বনবাদাড় কেটে, শেয়ালকাঁটা, ফণিমনসা পেরিয়ে মাকে নিয়ে গেলাম পাঠশালায়।সেই আমার মাকে পাশে নিয়ে শেষবারের মত সবুজ দালানে দাঁড়ানো। পাঠশালায় কত ভিড়, তবু দশদিকে শুধু হুহু, খাঁ খাঁ। সেই ঝুরিগুলোর ঝিলিমিলি আলো নেই, কেবল তার একটা আভার রেশ মেখে চারদিক আলো আলো হয়ে আছে। এখন তো আর মাও নেই। আজকাল কীসব অচেনা গাছ এসেছে চারিপাশে, ছায়া দেয়না, ডালপালা নেই, ঝুরি নেই, পাতায় ছাউনি নেই, কেবল লম্বা ঢ্যাঙা লাঠি গাছ, মাথাটা বল্লমের ফলার মত সূঁচোলো। রামলক্ষ্মণের নামে সেই প্রীতির গল্পগুলো আজকাল আর কেউ বলেনা। আমার ভারি ভয় করে, ঘুম আসেনা। ও বটঠাকরুণ, লক্ষ্মীটি আর একবার রামলক্ষণের ভালোবাসার গল্প বলো আমায়, শুনতে শুনতে আমি ঘুমোই। ও বটঠাকরুণ! শুনতে পাচ্ছো? তুমি ফিরে এসো।‌ আমার বড্ড রোদ লাগছে।‌
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • প্রবন্ধ | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ৩১৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2607:fb90:eab2:c595:cd4d:6d7e:49e5:2761 | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৪:৩৫528799
  • অন্য রকম রূপকথা ...
  • Sara Man | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৯:৫৯528809
  • নমস্কার kk। অনেক দিন পরে কথা হল। ভালো আছেন তো? 
  • kk | 2607:fb90:eab2:c595:cd4d:6d7e:49e5:2761 | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২০:৪৩528839
  • আপনাকেও নমস্কার শারদা।  হ্যাঁ, অনেকদিন কথা হয়নি। আপনার এই লেখা এলো বলে সে সুযোগটাও এসে গেলো। আপনি ভালো তো? লিখবেন আরো, সময় পেলে। ভালো লাগে পড়তে।
  • Kishore Ghosal | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:১৭528843
  • বাঃ। ভক্তিপ্রাণার অপূর্ব শ্রদ্ধা-নৈবেদ্য।  
  • Sara Man | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:৪২528845
  • হ্যাঁ kk, ভাবছি এবারের পরীক্ষা ঋতু শেষ হলে এতদিনের ফিল্ড সার্ভের অভিজ্ঞতা লিখব। 
  • Sara Man | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:৪৩528846
  • ভক্তিপ্রাণা! এটা কী হল, কিশোর বাবু? 
  • Sara Man | ০১ মার্চ ২০২৪ ১১:৪৮528943
  • আপনাকেও নমস্কার জানাই বিপ্লব বাবু। ভালো আছেন তো?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন