বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  অপর বাংলা

  • রক্তের অক্ষরে 

    Lipikaa Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    অপর বাংলা | ১৫ আগস্ট ২০২২ | ১৩১ বার পঠিত | রেটিং ৩ (১ জন)


  • রক্তের অক্ষরে...

    দেশের স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পূর্ণ হওয়ায় চারিদিকে আবেগের ছড়াছড়ি। বইওয়ালারা দেশাত্মবোধক বইও দিচ্ছে বেশি ছাড়ে। কমলা দাশগুপ্তের "স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী" বইটি চোখ এড়াইনি, কিনেছিলাম।  রাডিক্যাল ইম্প্রেশন প্রকাশনার বই, প্রথম প্রকাশ ১৯৬৩ সালে। পরে ২০১৫ আর ২০২১ সালে আরো দুটি সংস্করণ বের হয় সোনালী দত্তের সংযোজন সহ।

    বইয়ের লেখিকা কমলা দাশগুপ্ত একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। মোট একশো কুড়ি জন বাংলার নারীর দেশের প্রতি অবদানের কথা, আত্মত্যাগের কথা এতে লেখা আছে রক্তের অক্ষরে। যাঁরা ছিলেন বেশির ভাগই পরাধীন ভারতের অবিভক্ত বাংলার প্রথাগত শিক্ষা বহির্ভুত সাধারণ ঘরের মেয়ে, উনবিংশ শতাব্দীর সামাজিক বিধি নিষেধের বেড়াজাল উপেক্ষা করে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আছে ননীবালা দেবী, দু'কড়িবালাদেবী থেকে বেগম রোকেয়ার কথা, আছে নেলী সেনগুপ্তর কথা, যিনি যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তর স্ত্রী,  ভারতীয় না হয়েও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। আর যে নারী বিভিন্ন সময়ে বিপ্লব করতে গিয়ে কারাবরণ করেছেন, তাদের কথাও রয়েছে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই বইটি লিখেছেন যিনি সেই বিপ্লবী কমলা দাশগুপ্ত ( ১৯০৭-২০০০) জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন জেলে। বাবা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও মা চারুলতা দেবীও বিবেকানন্দর ত্যাগ ও সেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।  ঢাকার বিদগাও গ্রামের কমলা বেথুন কলেজে পড়তে এসে কল্যানী দাসের ছাত্রীসংঘের সদস্য হয়েছিলেন। প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন যুগান্তর দলে - স্বাধীনতা আন্দোলনে যা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, ছোটবেলা থেকেই তিনি দেশপ্রেমী ছিলেন। ১৯২৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকা অবস্থায় হঠাৎ একদিন গান্ধীজিকে চিঠি লিখে বসলেন, সবরমতি আশ্রমে গিয়ে সেখানে থেকে দেশসেবা করবেন বলে। গান্ধীজিও লিখে দিলেন বাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে চলে আসতে। কিন্তু সেই সময় মায়ের অনুমতি না পাওয়ায় তাঁর আর যাওয়া হয় নি।  তাই তিনি ঠিক করলেন কলকাতায় থেকেই দেশের সেবা করবেন। কলকাতায় ছাত্রীসংঘে যোগ দিয়ে লাঠিখেলা শিখলেন দীনেশ মজুমদারের কাছে। তিনি রসিকলাল দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য যুগান্তর দলের সদস্য হলেন। বাড়ি ছেড়ে হস্টেলে থাকতে শুরু করলেন।

    এই হস্টেলেই তিনি ট্রাঙ্ক ভর্তি করে বোমা লুকিয়ে রাখতেন। যে বোমা ব্রিটিশদের ওপর আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হত। হস্টেলের ভাঁড়ার ঘরেও বোমা রেখেছেন প্রয়োজনে। এই বোমা কখনও কমলা দাশগুপ্ত নির্দিষ্ট জায়গায় পৌছে দিতেন, কখনও হস্টেলে এসে নিয়ে যেত অন্য বিপ্লবীরা।  এর পর ডালহৌসি স্কোয়ার ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন কমলা দাশগুপ্ত। ১৯৩০ এর ২৫ এ অগস্ট দীনেশ মজুমদার, শৈলেন নিয়োগী,  অতুল সেন ও অনুজা চরণ সেন ডালহোউসি স্কোয়ারে গিয়ে কলকাতার কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগারকে মারতে চেয়েছিলেন। অভিযান ব্যর্থ হলেও ধরা পড়েন দীনেশ মজুমদার। এর পরই সন্দেহ হয় কমলা দাশগুপ্তকে নিয়ে কিন্তু প্রমাণের অভাবে  ২০/২১ দিন পর তাঁকে ছেড়ে দিতেই হয়। ছাত্রীসংঘের বীণা দাস ও কল্যাণী দাস ছিল তাঁর খুব কাছের মানুষ। কৃষ্ণনগরের বীণা দাস যে পিস্তল দিয়ে  গভর্নরকে গুলি করেছিলেন সেটি তাঁরই গোছানো ২৮০ টাকায় কেনা হয়েছিল। বীণাদেবীকে গোপনে লাইব্রেরিতে নিয়ে গিয়ে তিনিই নাকি শিখিয়েছিলেন কেমন করে পিস্তল চালাতে হয়। বীণা দাসের গভর্নরকে গুলি চালানোর চক্রান্তের সঙ্গে কমলা দাশগুপ্ত জড়িয়ে আছেন সন্দেহে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্সি ও হিজলি জেলে রাজ বন্দি করে রেখা হয়েছিল তাঁকে।  সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে ছিলেন ১৯৩৮ এ আর ঐ বছরেই তাঁদের "যুগান্তর" দলের সঙ্গে তিনিও কংগ্রেসে যোগ দিলেন। সেই সময় সমাজের অন্য মহিলাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার জন্য “মন্দিরা” বলে একটি পত্রিকা চালাতে শুরু করলেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরে মেয়েদের সঙ্ঘবদ্ধ করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। পরাধীন ভারতে যদিও কাজটা খুব সহজ ছিল না। সাধারণ মানুষ এসব ভালো চোখে দেখতে না। বিপ্লবী মহিলাদের থেকে অনেকেই দূরে থাকত।

    তবু তিনি হাল ছাড়েননি। ১৯৪২ এ গান্ধীজির “করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে” মন্ত্রে যখন দেশ উত্তাল তখন সেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে কমলা দাশগুপ্ত আবার তিন বছরের জন্য জেলে গিয়েছিলেন। ৪৬এর নোয়াখালির দাঙ্গায় ধর্ষিত হয়ছিল অসংখ্য বাংলার মেয়ে। এই  দাঙ্গা, যুদ্ধ পুরুষরা করে আর তার ফলস্বরূপ বিভৎস অত্যাচার সহ্য করে নারী। যেন নারীকে অত্যাচার করার এ এক চক্রান্ত।  কমলা দাশগুপ্তে দাঙ্গার পর এই  ধর্ষিত মহিলাদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবলেন। বিয়ের ব্যবস্থা করার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপণ দিয়েছিলেন। সেই বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে ৮৬ জন যুবক ধর্ষিত মেয়েদের বিয়ে করতে সম্মত হয়ে চিঠি লিখেওছিল। সেই সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে ধর্ষিত মেয়ে খুঁজেছিলেন, কিন্তু যাদের পেয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগের ১৪ বছরের নীচে বয়স ছিল। ভাবতেও গা শিউরে ওঠে চোদ্দ বছরের কম বয়সী বালিকারাও বাদ যায়নি পাশবিক অত্যাচার থেকে। আরও কিছু মহিলাকে খুঁজে পেয়েছিলেন যারা ঐসময় ধর্ষিত হয়েছিল কিন্তু তখন তারা স্বামীর সঙ্গে সংসার করছে। তাই শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। স্বয়ং গান্ধীজি এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দেশের কাজেই নিজেকে নিয়োজিত রাখা এই মহীয়সী তাঁর  সংগ্রামী জীবন নিয়ে আত্মজীবনী লিখেছিলেন “রক্তের অক্ষরে”। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করে গিয়েছেন তা হল “স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার  নারী” নামের বইটি যা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বাংলার নারীর অবদানের এক জ্বলন্ত দলিল।

    বইটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল  আজ থেকে একশো/দেড়শো বছর আগে এই বাংলার নারী নিজেদের সামাজিক অবস্থানের কথা না ভেবে দেশের স্বাধীনতার কথা ভেবে সমাজের বিধি নিষেধের শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে, পুরুষের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়েছেন, নিঃস্বার্থে, নিঃশর্তে দেশের সেবা করেছেন।  এ বইয়ের প্রথম ভূমিকায় ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত  লিখেছেন, "শিক্ষিত হলেই বুদ্ধির মুক্তি হয় না। বুদ্ধির মুক্তি হলেই সেবার প্রেরণা, আত্মত্যাগের সংকল্প জাগে না।" .... আবার আশঙ্কা করে লিখেছেন, "বুদ্ধির মুক্তিতে আত্মত্যাগের দিকে না গিয়ে ব্যক্তিগত বিলাসব্যসন এর দিকেও মানুষ যেতে পারে।" 

    স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পর আমরা আজকের নারী কি একটু বেশি স্বার্থপর হয়ে গেছি? নারী স্বাধীনতা আন্দোলন করে আজ এটাই হিসাব করি দেশ আর সমাজ থেকে আমরা কী পেলাম। দেশ আর সমাজকে আমরা কী দিলাম তার হিসাব করি না তো!  

    তবে আমরা তাঁদের অনুসরণ করতে পারি বা না পারি তাঁদের অবদানের কথা স্মরণ করে দেশের বর্তমান নাগরিকের সামনে তুলে ধরতে নিশ্চয়ই পারি। এটুকু স্বাধীনতা আজকের নারীরা নিশ্চয়ই পেয়েছি। আজ স্বাধীনতা দিবসে তাঁদের মহান কর্ম আমাদের এক অন্তর থেকে অন্য অন্তরে প্রেরণার বীজাণু ছড়িয়ে দিক। সেই চিরনমস্য মহীয়সী ব্যক্তিত্বদের উদ্দেশে আমাদের আজকের নারী পুরুষ সকলের শির চির অবনত হোক। 

    ***
  • অপর বাংলা | ১৫ আগস্ট ২০২২ | ১৩১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন