এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  অন্যান্য  মোচ্ছব

  • স্বৈরাচারী ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ের কথা বলে ‘কারবালা কথা’…

    Lipikaa Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | মোচ্ছব | ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৪৩৫ বার পঠিত
  • স্বৈরাচারী ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ের কথা বলে ‘কারবালা কথা’…
    (তথ্যচিত্র- কারবালা কথা,
    পরিচালক- সৌরভ ষড়ঙ্গী)

    এক ছবি একাধিক প্রসঙ্গ। আপাত দৃষ্টিতে এটি একটি ভ্রমণকথা বলে মনে হবে। দর্শককে সঙ্গে নিয়ে পরিচালক যেন এগিয়ে চলেছেন ইরাকের ঐতিহাসিক কারবালার পথে, আরবাইনে। আর চলতে চলতেই সে দেশের গীতিকা ও গল্প- কাহিনিতে মিশে স্মৃতি মাদুরতায় ভাসিয়ে দর্শককে নিয়ে যাবেন কখনও শৈশবে কখনো ইরাকের কারবালা প্রন্তরে।

    ইরানি বন্ধুর আমন্ত্রণে একজন ভারতীয়র নাজাফ শহর, কুফা মসজিদ, সাহলাহ মসজিদ, হজরত সালেহর সমাধি, ইমাম আলার সমাধি ঘুরে কারবালার মাঠে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা ধরা পড়েছে উসামা তিমিমির ক্যামেরায়। ২০১৭ সালে আরবাইনে যোগ দেবার অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরবিয়ান সঙ্গীতযন্ত্র কানুন ও ওউদের সুর, জারিগান, ধারভাষ্য মিশে, অ্তীতের স্মৃতি ঘুরে হয়ে উঠেছে এক আবেগঘন তথ্যচিত্র। শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য সাধারণ মানুষের দীর্ঘ পদযাত্রার ছবিটি আজকের উত্তপ্ত পৃ্থিবীতে নিঃহন্দেহে এক হিমেল পরশ দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো শান্তি-মিছিলের ছবিতেই রাজনীতি যেন ফল্গুধারার মত ছবির অন্তঃস্থল দিয়ে বয়ে চলেছে। শান্তির বার্তাবাহী এই ছবির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, রাজনীতি, সংগ্রাম, প্রতিবাদের স্পর্ধা, যা ছড়িয়ে ছিল অশ্রূসিক্ত আরবাইনের পথে পথে। তাই ২০১৭সালেও ছবির ক্যামেরাম্যান উসামা তিমিমির হাতে বোমার আঘাতের চিহ্ন কপালে ভাঁজ ফেলে।

    পরিচালক ইরাকের নাজাফ শহর থেকে কারবালা প্রান্তর পর্যন্ত প্রায় সত্তর কিলোমিটার কান্নায় ভিজতে দেখেছেন। দেখেছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ হেঁটে চলেছে অসংখ্য পথ দিয়ে যে পথের শেষ ঠিকানা কারবালার হুসেনের সমাধি। এই চলার মধ্যেই আছে হুসেনকে একবার দেখবার আকূতি, তার সমাধির কাছে গিয়ে প্রার্থনার আবেগ। কেন এতদিন পরেও সেই জননেতাকে নিয়ে এত আবেগ! কেন চোদ্দশো বছর পরেও তিনি বিস্মৃত হননি মানুষের মন থেকে! এর উত্তর খুঁজে পেয়েছেন আরবাইনে, যাত্রীদের পায়ে পা মিলিয়ে। আর সেই সব তথ্যই পরিচালক পরিবেশন করেছেন তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানায়।

    আরবাইনে যোগ দিতে গিয়ে প্রথমে পৌঁছেছিলেন ইরাকের ফুরাদ(ইউফ্রেটিস) নদীর পাশে শিয়াদের তীর্থস্থান সুপ্রাচীন নাজাফ শহরে। শহরেরই এক প্রান্তে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে ‘শান্তির উপত্যকা’, বিশ্বের প্রাচীন গোরস্থান ‘ওয়াদি উস আলম’। মনকে উদাস করা সেই উপত্যকায় শিয়াপন্থী ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নীচেই শুয়ে আছে খ্রিস্টান ধর্মের মানুষ। ক্রুশেড, কারবালা, কুরুক্ষেত্র- সব যেন এখানে সমাহিত! যেন শান্তিতে এখানেই অনন্ত ঘুম দেয় সব যুদ্ধে্র ক্লান্ত রক্তাভ চোখ।

    ইরাকের স্মৃতিসৌধ কুফা মসজিদ, সহলহ মসজিদ, হজরত সালেহর সমাধি, ইমাম আলির সমাধির সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য মনে করায় দার্শনিক হজরত মোহাম্মদ শুধু ধর্মের প্রবর্তন ও প্রচারই করেননি তাঁর প্রবর্তিত আইন শাসনব্যবস্থায় প্রয়োগ করে সমাজে ন্যায়, নীতি, সাম্য ও শান্তির প্রতিষ্ঠাও করেছিলেন। মনে করায় মোহাম্মদের উত্তরসুরি(জামাতা) ইমাম আলি ইবন আবি তালিবের বুদ্ধিমত্তা ও সততার জন্য শিয়ারা তাদের ইমাম হিসাবে এবং সুন্নিরাও তাদের খলিফা হিসাবে মেনে নিয়েছিল। উল্লেখ্য, মহম্মদের মৃত্যুর পর ক্ষমতা আর নেতৃত্ত্বের উত্তরাধিকার নিয়ে মতবিরোধের কারণে আদর্শ ঠিক রেখে রাজনীতি ও ধর্মশাসনের ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে এক সময় ইসলাম ধর্মও ভাগ হয়ে গিয়েছিল শিয়া এবং সুন্নি নামে।

    আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রথম মাস মহরমের দশম দিনে আসে ‘আশুরা’। এই আশুরার দিনে মহরম পালন করা হয়। এর চল্লিশদিন পর পালিত হয় আরবাইন। ‘আরবাইন’ শব্দের অর্থ চল্লিশতম। এতে যোগদেয় সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।

    ন্যায়, নীতিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার প্রার্থনায় অংশ নেয় বিশ্বের সমস্ত শান্তিপ্রিয় মানুষ। পরিচালকের মতে আরবাইন শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। তার আবেগ মানবতার হৃদয় স্পর্শ করে যায়।
    আরবাইনে মানুষের কান্নার সঙ্গে মিশে থাকা গীতিকার সুর আর গল্পে উঠে আসে অতীত ও বর্তমানের কথা। উঠে আসে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ১০ই অক্টোবর(৬১ হিজরি সন) আশুয়ার পরের রাতে(অনেকে আশুরার দিন বলে থাকে, ছবিতে আশুরার পরের রাতের কথা উল্লেখিত) কারবালার যুদ্ধের কথা। তীর্থযাত্রীদের গাওয়া গাথা বা গীতিকা মনে করায় হুসেনের কাটা মুণ্ড বর্শায় বিঁধিয়ে কারবালার মাঠে দুষ্টের উল্লাসের কথা। বন্দি হুসেন- কন্যা সাকিনার বাবাকে দেখতে চাওয়ার আকুতি থামাতে হুসেনের কাটা মুণ্ড হাজির করেছিল ইয়াজিদের কারারক্ষীরা। মনে করায় বিচারে মহম্মদের বংশের নারীদের দাসী করে রাখার আদেশ হলে হুসেনের বোন জয়নাবের অসামান্য বুদ্ধিমত্তা, সাহস আর যুক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হয় বিচারক। শেষে চল্লিশদিন পর মুক্তি পেলে তারা কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে কারবালার মাঠে ফিরে এসেছিল প্রিয়জনের সমাধির কাছে। আর এই ঘটনার পর থেকে প্রতিবছর আশুরার চল্লিশদিন পর দলে দলে নারী-পরুষ কারবালার উদ্দ্যেশে হাঁটতে থাকে আর কাঁদতে থাকে, হুসেনের সমাধি একবার চোখে দেখার জন্য।

    ছবির ধারাভাষ্য দর্শককে পৌঁছে দেয় সেই চোদ্দশো বছর আগের বিষাদসিন্ধুতে। আসলে বিষাদসিন্ধুর এই স্মৃতিকে ওরা বাঁচিয়ে রেখেছে বিস্মৃতির সঙ্গে লড়াই করে যেমন বাঁচিয়ে রেখেছেন পরিচালক তাঁর শৈশবের হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতিকে।

    আজ প্রায় চোদ্দশো বছর পরেও আরবাইনে যাত্রীরা কেঁদে চলেছে সদ্য প্রিয়জন হারানোর মত শোকে, দুঃখে, বেদনায়। ন্যায়ের পাশে থেকে তারা অন্যায়ের নীরব বিরোধিতা করে চলেছে আরবাইনে। ছবির শুরুতে দেখানো পর্দা জুড়ে গনগন আগুনের মত ওদেরও হৃদয় জুড়ে দুঃখের আগুন গনগনিয়ে জ্বলে চলেছে। তাই ক্লান্ত যাত্রী পথে বসেও কাঁদে আর বুক চাপড়ায়। পরিচালক দেখেছেন কারবালার দিকে হেঁটে চলা লাল পতাকার মাঝে মিশেছে বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা। দেখেছেন হুসেনের ছবির মত আরো অনেক যুবকের ছবি আঁকা ম’কেব (তাঁবুর)এর গায়ে, গাছের ডালে, কারো হাতে বা মুখে। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত আয়োজনে নিঃশর্তে অফুরন্ত খাবার আর অসামান্য সেবার সঙ্গে দেখেছেন যত্র তত্র বোমা বিস্ফোরণের হুমকি। হুমকি বাস্তবায়িত হওয়ার নমুনা পেয়েছেন বাগদাদ থেকে আসা ক্যামেরাম্যানের হাতেই। সেযুগের কারবালার যুদ্ধক্ষেত্র আজ তীর্থক্ষেত্র হয়ে গেলেও গোটা ইরাক এযুগে বারবার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিনত হয়েছে। ইরাক-ইরান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের নির্যাতন, আই এস আই এস এর চোখরাঙানী, রাসায়নিক অস্ত্র, সর্বোপরি শিয়া সুন্নির দ্বন্দ্ব ইরাকের সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষকে ক্ষত বিক্ষত করেছে। ইহুদিরা আগেই ইরাক ছেড়ে চলে গেছে তবু অল্প সংখ্যক খ্রিস্টান সহ বিভিন্ন মতাবলম্বী জনগোষ্ঠী বাস করে এই ইরাকে। উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চল জুড়ে রয়েছে কুর্দদের অধিপত্য। এই ইরাকের রাজনৈতিক পালাবদল হয়ে চলেছে সময়ের হাত ধরে -‘পৃ্থিবীর কত দ্বন্দ্ব কত সর্বনাশ/নতুন নতুন কত গড়ে ইতিহাস/ রক্ত প্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া ওঠে/ সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে/ সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা/ উঠে কত হলাহল উঠে কত সুধা’। 
     
    টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস অর্থাৎ দজলা আর ফুরাদ নদীর তীরবর্তী সুপ্রাচীন সভ্যতা মেসোপটেমিয়া আজ প্রায় চার লক্ষ আটত্রিশ হাজার বর্গমাইলের প্রজাতন্ত্র ইরাক। ব্যাবিলন, ফার্সি, ইসলামি খিলাফত, আব্বাসীয় খিলাফত, সেলজুক, মোঙ্গল, অটোমন ও ব্রিটিশদের শাসনে স্নাত হয়েছে, কখনো সমৃদ্ধ কখোনো শোষিত হয়েছে এই ইরাকের মাটি ও মানুষ। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ, ১৯৫৮ সালে হামিশি রাজতন্ত্রের পতন, ১৯৬৮ সালে ‘বাথ পার্টি কিউ’ ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৯ সালে সাদ্দাম হুসেনের রাষ্ট্রপতি হয়ে ইরাকের ক্ষমতায় আসা সবই এখন ইতিহাস। ১৯৭৯ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সাদ্দাম হুসেনের রাজত্বকালের টানা আট বছর ধরে (১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত) ইরান আর ইরাকের যুদ্ধ, বাস্তুহারা হয়েছে লক্ষ লক্ষ নীরিহ মানুষ। ১৯৯১ সালে গল্ফ ওয়ার, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরাককে দুর্বল করেছে। সেদিনও ক্ষমতার প্রচণ্ডতা, দাম্ভিকতা হুসেনের জনপ্রিয়তাকে হিংসা করেছে, যেমন করত ইয়াজিদ। তাই সহস্রাব্দ পার করেও হুসেনের সমাধি ধ্বংস করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ক্ষমতার ছবি। ইরাকের যুদ্ধের সময় শান্তির উপত্যকায় ওয়াদি উস সালামের কবরের উপর দিয়ে রাস্তা তৈরি হয় সাঁজোয়া গাড়ি যাওয়ার। জানা যায় ক্ষমতাসীন দুর্নীতিগ্রস্থ অত্যাচারী শাসক কারবালার পথে হুসেনের জন্য হাঁটলে পা কেটে শাস্তি দেয়। আবার ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বাহিনির আক্রমণ ও আগ্রাসনে দশ লক্ষের বেশি ইরাকের বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, ছিন্ন-বিছিন্ন, ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। এখনও রয়েছে শিয়া সুন্নির অন্তহীন দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়েই বিশ্বের ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলো আজও এখানে বাসা বাঁধে লোভনীয় খনিজের লোভে। পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ধেয়ে আসে আই এস আই এস বাহিনী। এই লোভী অত্যাচারী কুচক্রীদের হাত থেকে নিরীহ সাধারণ মানুষগুলো পালিয়ে বাঁচতে চায়। তাদের চোখের জলে সুপ্ত থাকে সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে - রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কার, কুসংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে বাঁচার বাসনা আর অশান্তির গণ্ডি পেরিয়ে শান্তির ম’কেব এ পৌঁছানোর সাধনা। এই শান্তিতে বাঁচতে চাওয়া মানুষগুলোকে বাঁচাতে, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষা করতে আজও আত্মাহূতি দিয়ে চলেছে এযুগের হুসেনরা। অন্যের অঙ্গুলি হেলনে নয়, স্বেচ্ছায় গোপনে অস্ত্র যোগার করে প্রতিনিয়ত তারা স্বঘোষিত নির্মম অত্যাচারী ক্ষমতা আই এস আই এসের সঙ্গে লড়াই করছে। তারা বিশ্বাস করে, দায়েশ বা আই এস আই এসের কোনো ধর্ম নেই, ওরা ইসলামকে অপব্যবহার করে। তারা বিশ্বাস করে মানুষকে অত্যাচার করা, হত্যা করা কখনো ধর্ম হতে পারেনা। তাই গণহত্যা নয়, আত্মহত্যা নয়, ন্যায়ের জন্য, শান্তির জন্য আত্মাহুতি দিয়ে চলেছে তারা আজও। এক হুসেনের সমাধি দেখতে গিয়ে পরিচালক দেখলেন এবং দেখালেন কত শত হুসেনের ছবি। তাই তো আজও সদ্য হারানো প্রিয়জনের কান্নায় ভিজে যায় কারবালার সেই একই পথ। যে পথ কোটি কোটি মানুষের অশ্রূতে ভাসে আর সভ্যতার জনক ক্ষীণকায়া ফুরাদ সেদিনের মত আজও অসহায়, বয়ে চলে সে পথের পাশে।

    হুসেনের একা লড়াই করার ক্ষমতা, আত্মাহুতি দেবার সাহস শুধু ইরাক নয়, গোটা বিশ্বকে প্রেরণা দেয়। সমস্ত মানব জাতির দেশে যুগ যুগ ধরে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্পর্ধা, দুর্নীতির সঙ্গে লড়াইয়ের শক্তি আর আত্মাহূতির সাহস জোগায় । আর আরবাইনে- ন্যায়, নীতিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার প্রার্থনায় অংশ নেয় বিশ্বের সমস্ত শান্তিপ্রিয় মানুষ। পরিচালকের মতে আরবাইন শুধুই ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। তার আবেগ মানবতার হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। কারবালায় মসজিদের দেওয়ালে ইংরাজি ও আরবিতে লেখা দৈবজ্ঞ পয়গম্বরের নাম- আদম, নোয়া, আবেগ, ইব্রাহিম, মোসেজ, জিশু ও মহাম্মদের নাম আর নিচে গির্জা ও মসজিদের ছবি বলে দেয় “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই/ নহে কিছু মহীয়ান/ নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি/ সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি”। শান্তি ও সম্প্রীতির মিছিল, মানুষের ভিড়, কান্না, আলো ঝলমলে স্মৃতিসৌধ, অসাধারণ ক্যামেরার কাজ, ধারাভাষ্য, ব্যক্তিগত স্মৃতিকথায় ‘কারবালা কথা’ আবেগময় হয়ে উঠে। শেষদৃশ্যে আকাশে ভাসমান জ্বলন্ত রক্তাভ অগ্নিপিণ্ডের ন্যায় ফানুস হুসেনের বীরত্ব আর প্রতিবাদের স্পর্ধার প্রতীক হয়ে ওঠে আর ছবির পোস্টারে হুসেনের নামাঙ্কিত হিজাব পরিহিতা শিশুকন্যার মতই নিষ্পাপ সারল্যের দুহাত তোলা প্রার্থনাও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

    ২০২০ সালে মুক্তি প্রাপ্ত চল্লিশ মিনিটের ছবিটি সত্যজিৎ রায় গোল্ডেন এওয়ার্ড, বেঙ্গল ন্যাশন্যাল ডকুমেন্টারি এন্ড শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কার পেয়েছে। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত পরিচালক সৌরভ ষোড়ঙ্গী বরাবরই বিভিন্ন বিষয়কে ভিন্ন পরিবেশনায় তথ্যচিত্রে উপস্থাপন করতে সিদ্ধহস্ত। তাঁর ভিভা ম্যান্ডেলা, বিদ্যাসাগর সেতু, ভাঙ্গন, টুসুকথা, চর, বিলাল প্রভৃতি ছবি সেকথা মনে করিয়ে দেয়।

    তবে তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে পরিচালক বর্তমান ইরাকের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা আরেকটু বেশি উপস্থিত করতে পারতেন বলে দর্শকের মনে হতে পারে। পরিচালক তাঁর ছবিকে হয়ত ততটা যুক্তি ও তথ্য দিয়ে বাঁধতে চাননি যতটা আবেগের সঙ্গে মানবিকতার বাতাবরণে শিল্প নৈপুণ্যকে গড়তে চেয়েছেন! এ কথা বলতেই হয় ভারতের যে ক’জন তথ্যচিত্রকার তথ্যচিত্রকে নিরস তথ্যের ভাণ্ডার আর সাক্ষাতকারের সমারোহ থেকে বার করে এনে উতকৃ্ষ্ট শিল্প বৈশিষ্টে নান্দনিকতা দান করেছেন তাঁদের মধ্যে সৌরভ ষড়ঙ্গী অন্যতম নাম। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই ছবিটি।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • অন্যান্য | ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৪৩৫ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    পরবাস  - Esha Ghosh
    আরও পড়ুন
    ইঁদুর  - Anirban M
    আরও পড়ুন
    ** - sumana sengupta
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Arun Kumar Roy | 2409:40e3:39:2936:f476:3cff:fe57:fd0f | ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ০০:৩৯526631
  • 'কারবালা কথা'

    সৌরভ ষোড়ঙ্গী পরিচালিত তথ্যচিত্রর আপনার আলোচনাটি আপনার অসাধারণ পাণ্ডিত্যের পরিচয়। নিঃসন্দেহে এই বিষয়ে আপনার প্রচুর পড়াশোনা। এই বিষয়ে আমি অল্প যা কিছুই পড়েছি তা মীর মোশারফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধুর তীরে। মূল এই কাহিনী যা আমার বহু আগে পড়া ছিল। আজ আপনার এই আলোচনায় পুনঃ কিছুটা স্মৃতির স্মরণী বেয়ে ফিরে আসছে।
  • guru | 103.175.168.150 | ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৯:৫০526650
  • @Lipikaa Ghosh

    এই লেখা থেকে একটি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কারবালা বা নাজাফে অমুসলিমরাও যেতে পারে তীর্থযাত্রী হিসাবে। ঠিক বলছি কি ম্যাডাম?
  • Ahsan ullah | ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ২৩:১৫526653
  • খুবই ভালো লাগল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। 
  • Lipikaa Ghosh | ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ২৩:৫৪526654
  • হ্যাঁ । পরিচালক গেছেন যখন নিশ্চয়ই তখন নিশ্চয়ই যেতে পারে ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন