ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • কলকাতায় রাজাবাহাদুরের বাড়িতে 'দাদা-বৌদি'র ঐতিহাসিক দারুবিগ্রহ 

    Dipankar Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২২ মার্চ ২০২২ | ১১৩১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • তিনি মধুপ্রিয়। তাঁর পছন্দ নীল। তাই রুপোলি বুটিদার নীল রেশমের কাপড়ের পশ্চাৎপটে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত গৌরবর্ণ সুস্মিত দারুবিগ্রহের বুকের কাছে ধরা বাম হাতটিতে মধুর বাটি। হাতের ফাঁকে গোঁজা রয়েছে একটি হল। মাথার উপরে অনন্তনাগের প্রসারিত ফনার নিচে ডান হাতের মুঠিতে ধরা মুষল। তিনি বিষ্ণুর বাহন সর্পরাজ শেষাবতার। তিনি শ্রীকৃষ্ণের দাদা বলদেব। তিনিই তো হলধর কিংবা হলায়ুধ, বলরাম বা সঙ্কর্ষণ অথবা পুরীর মন্দিরে জগন্নাথদেবের পাশে বসা বলভদ্র। তিনি এক তবু অনন্য। বর্ধমানের রায়না থানার বোড়ো গ্রামে দশ হাত উঁচু, চোদ্দটি হাতের অনার্য-পূজিত প্রাচীন বলরাম মন্দির রয়েছে। যার উল্লেখ পাওয়া যায় ধর্মমঙ্গল কাব্যে -- "বোড়ো গ্রামের বলরামে নত কৈনু শির।" উত্তর কলকাতার রাজবল্লভ পাড়ার কাছে 'হারানো বলাই' মন্দিরও আছে। কিন্তু বেলেঘাটার শুঁড়া অঞ্চলে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ রাজাবাহাদুরের গৃহদেবতা বলদেব ও শেষজায়া অর্থাৎ রেবতীরানির এই বিশেষ মূর্তি ভূ-ভারতে আর দ্বিতীয়টি নেই। বিভিন্ন মন্দিরে বা পারিবারিক দেবালয়ে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ সুপরিচিত ও জনপ্রিয় হলেও বলদেব ও রেবতীরানির ঠাকুরবাড়ি একেবারেই ব্যতিক্রমী। শ্রীকৃষ্ণের দাদা, তাই পরিবারের ভক্তহৃদয়ে এই কুলবিগ্রহের মৌখিক পরিচিতি একান্ত আপনার 'দাদা-বৌদি' হিসেবেই। আর এই দারুবিগ্রহের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বঙ্গীয় এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় প্রধান, বাংলার রেনেসাঁসের পুরোধা ব্যক্তিত্ব রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্রের নাম। রবীন্দ্রনাথ 'জীবনস্মৃতি'তে লিখেছিলেন, "রাজেন্দ্রলাল মিত্র সব্যসাচী ছিলেন। তাঁহার সঙ্গে পরিচিত হইয়া আমি ধন্য হইয়াছিলাম।  রাজেন্দ্রলালের স্মৃতি আমার মনে যেমন উজ্জ্বল হইয়া বিরাজ করিতেছে, এমন আর কাহারো নহে।" তাঁর দ্বিশতজন্মবার্ষিকী উদযাপন হচ্ছে চলতি বছরেই। 


    আটপৌরে সম্বোধন হলেও পৌরাণিক মাহাত্ম্যে বলদেব অনুজ শ্রীকৃষ্ণের সমগোত্রীয়।  কথিত আছে বিষ্ণু দুটি কেশ গ্রহণ করেছিলেন -- একটি সাদা, অপরটি কালো।  তা থেকেই দেবকীর দুই পুত্র -- বলভদ্র ও কৃষ্ণ।  বলদেবের বীরত্ব ও মহিমা প্রকাশের সূচনা ধেনুকাসুর বধে।  গাধা-রূপী রাক্ষস আক্রমণ করলে বলদেব তার দুটি পা ধরে মাথার ওপর প্রবল বেগে বনবন করে ঘুরিয়ে তাকে নিধন করেন। বলদেবের সঙ্গে রেবতীর বিবাহের কাহিনীও চিত্তাকর্ষক। কুশস্থলির সৌরবংশীয় রাজা ককুদমি বা রৈবতের একমাত্র কন্যা ছিলেন রেবতী -- রূপে-গুণে তাঁর সমগোত্রীয় মর্ত্যে আর কেউ ছিলেন না।  তাই উপযুক্ত পাত্রের সন্ধানে বিবাহযোগ্যা কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ককুদমি বৈকুন্ঠধামে হাজির হয়ে পরামর্শের জন্যে স্বয়ং স্রষ্টা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন।  কিন্তু ব্রহ্মা তখন গন্ধর্বদের সঙ্গীতের মূর্ছনায় নিমগ্ন ছিলেন। প্রতীক্ষার শেষে  ককুদমি যখন ব্রহ্মলোকে তাঁর আসার উদ্দেশ্য নিবেদন করলেন তখন অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন ব্রহ্মা। ককুদমিকে সচেতন করে তিনি বোঝালেন, বৈকুন্ঠে প্রতীক্ষার ওই অল্প সময়ের মধ্যেই মর্ত্যে অতিক্রান্ত হয়েছে সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর যুগ। ফলে ককুদমির মন্ত্রী-সান্ত্রী, পাত্র-মিত্র-অমাত্য, দেবোপম মানুষ কেউই আর বেঁচে নেই। কলিযুগ আসন্ন। কাজেই রেবতীকে অবিলম্বে পাত্রস্থ করা বিধেয়। কিন্তু কোথায় মিলবে তাঁর কন্যার উপযুক্ত পাত্র? বিচলিত রাজাকে আশ্বস্ত করে ব্রহ্মা বললেন, সৃষ্টির পালনকর্তা বিষ্ণুর অংশভাক কৃষ্ণ ও বলরাম এখন মর্ত্যে অধিষ্ঠান করছেন। বলরামই হবেন রেবতীর যোগ্য পাত্র। ব্রহ্মার নির্দেশে তাঁরা ফিরে এলেন মর্ত্যে।  কিন্তু ততদিনে মনুষ্যজাতির আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন ঘটে গেছে।  তাঁরা দেখলেন, মানুষ এখন খর্বকায়, হীনবল এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সামান্য। বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে বলদেবের কাছে তাঁরা হাজির হলেন। তবে পূর্ববর্তী যুগে আবির্ভুত হওয়ায় দেখা গেল রেবতী বলদেবের তুলনায় অনেক লম্বা। বলদেব তখন তাঁর হল রেবতীর মাথায় স্থাপন করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে রেবতী নেমে এলেন মানানসই উচ্চতায়।
    বলদেব ও রেবতীরানির পূর্ণাবয়ব এই যুগল মূর্তি স্বপ্নাদিষ্ট বলেই অনন্য। আদতে ঘোর শাক্ত পরিবারে বৈষ্ণব কুলবিগ্রহের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপটটিও এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। মিত্র বংশের আদি নিবাস হুগলির কোন্নগরে। তাঁরা ছিলেন কালীর সাধক।  ঘটনাচক্রে পরে বৈষ্ণবোপাসক হলেও বংশধরদের মধ্যে এখনও 'কোনার কালী'র উদ্দেশে নৈবেদ্য সাজানোর প্রচলন রয়েছে।
     

    রাজেন্দ্রলালের প্রপিতামহ ছিলেন পীতাম্বর। তাঁর পূর্বপুরুষেরা মুর্শিদাবাদের নবাবের দেওয়ান ছিলেন। সম্ভবত আলিবর্দী খাঁয়ের আমলে তাঁরা রাজাবাহাদুর উপাধি পান। মিত্র বংশের নাটকীয় পট পরিবর্তন ও যাবতীয় খ্যাতির সূচনা পীতাম্বরকে ঘিরেই। আধুনিক ভারততত্ত্বের জনক রাজেন্দ্রলাল জ্ঞানচর্চার উত্তরাধিকারও অর্জন করেছিলেন তাঁর প্রপিতামহের কাছ থেকে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পরাজয়, আহমেদ শাহ আব্দালির দ্বিতীয়বার দিল্লি আক্রমণ, ব্রিটিশদের হাতের পুতুল হয়ে ক্ষয়িষ্ণু মুঘল জমানা টিকিয়ে রাখতে দ্বিতীয় শাহ আলমের নিষ্ফল চেষ্টা এইসব ঘটনা যখন একের পর এক ঘটে চলেছে তারই মধ্যে দ্বাদশ-বর্ষীয় বালক পীতাম্বরকে নিয়ে তাঁর পিতামহ বাংলা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন অযোধ্যায়। উত্তরাধিকার সূত্রে রাজাবাহাদুর উপাধি তো ছিলই, ঘটনা পরম্পরায় অযোধ্যা ও দিল্লির দরবারের দাক্ষিণ্যে তিন হাজার সৈন্য সহ মনসবদারি এবং ১৭৮৭ সালে হাভেলি-ই-এলাহাবাদের ১৫ টি গ্রামের  জায়গিরও লাভ করেছিলেন পীতাম্বর।

    কিন্তু তার ঠিক ছ'বছর আগে ভারতে যখন ব্রিটিশ আধিপত্যের ফাঁস তীব্র হতে শুরু করেছে তখনই ১৭৮১ সালে ঘটে গেল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।  সিপাহী বিদ্রোহের ৭৬ বছর আগেই ব্রিটিশদের অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন বারাণসীর ভূমিহার ব্রাহ্মণ মহারাজা চৈত সিংহ। ব্রিটিশ রাজ ও দিল্লির বাদশা যৌথ অভিযান চালালেন বিদ্রোহ দমনে। ওয়ারেন হেস্টিংস স্বয়ং সৈন্য সামন্ত নিয়ে হাজির হলেন বারাণসীতে। কিন্তু চৈত সিংহের বাহিনীর কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে মহিলার ছদ্মবেশে কোনমতে প্রাণটুকু নিয়ে পালিয়ে বাঁচলেন হেস্টিংস। আশ্রয় নিলেন চুনারে। উপহাসের রোল উঠল -- "ঘোড়ে পর হাওদা / হাতি পর জিন / কাশীসে ভাগা ওয়ারেন হেস্টিংস।" তবে সেই উল্লাস স্থায়ী হয়নি। ইংরেজরা চুনারে অতিরিক্ত বাহিনী সংগঠিত করার পর আরও বড় আক্রমণ হেনে চৈত সিংহকে ক্ষমতাচ্যুত করলেন। দিল্লির বাদশার তরফে সেনাপতি হিসেবে চৈত সিংহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন পীতাম্বর। ইতিহাসের কী বিচিত্র সমাপতন। এই ঘটনা পীতাম্বরের জীবনের বাঁক যেমন চিরদিনের জন্যে ঘুরিয়ে দিল তেমনই বাংলার জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল। লড়াই চলাকালীন এক সময় পীতাম্বরকে প্রাণরক্ষায় একটি কুয়োর মধ্যে আত্মগোপন করতে হয়েছিল। তখন তাঁর নজরে আসে কয়েকটি পরিত্যক্ত পেটিকা। শোনা গিয়েছিল, চৈত সিংহের সঙ্গে ছিল অমূল্য ধনরাশি। পীতাম্বর ভেবেছিলেন সেগুলি সম্ভবত তারই অংশ। বিপদ থেকে রক্ষা পাবার পর বিস্মিত হয়ে তিনি দেখেন হীরে-জহরতের বদলে সেই বাক্সগুলি সংস্কৃত পুঁথিতে ঠাসা। সেনাপতির ভূমিকা পালনের সুবাদে চুনারে থাকাকালীন তিনি হেস্টিংসের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান এবং আস্থা অর্জন করেন। সংস্কৃত পুঁথি আবিষ্কারের কাহিনী তিনি হেস্টিংসকে শোনান। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল, ওই একই সময়ে স্যার উইলিয়াম জোন্স বঙ্গীয় এশিয়াটিক সোসাইটি স্থাপনের সচেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছেন। হেস্টিংস সে ব্যাপারে জোন্সকে প্রয়োজনীয় সমর্থন তো জোগাচ্ছিলেনই, এবারে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের গুরুত্বের বিষয়েও তাঁর মনযোগ আকর্ষণ করলেন। সংস্কৃত ভাষাচর্চা পুনরুজ্জীবনে বিরাট অনুঘটকের কাজ করল পুঁথি আবিষ্কারের এই ঘটনা। অন্যদিকে চৈত সিংহের বিদ্রোহ দমনে অংশগ্রহণের পর থেকেই যোদ্ধা পীতাম্বরের মধ্যে বিরাট মানসিক পরিবর্তন আসে। বরাবরের মতো অস্ত্র ত্যাগ করে তিনি চলে যান বৃন্দাবনে।                                                                      
    বাল্য বয়স থেকে অযোধ্যা ও উত্তর ভারতে কাটানোয় পীতাম্বর হনুমানজির ভক্ত হয়ে ওঠেন যা ছিল বিশেষত তখনকার দিনে একজন বাঙালির পক্ষে বেশ অস্বাভাবিক। আবার বৃন্দাবনে যাতায়াতের সুবাদে তাঁর হৃদয়ে নাটকীয় ভাবে বৈষ্ণব চেতনার উন্মেষও ঘটে। 'ব্রজ কি রাজা' বলরাম তাঁর অন্তর অধিকার করেন। বৃন্দাবনে বলরামের প্রাধান্য শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। ব্রজমন্ডলের জনমানসে শ্রীরাধার আগে থেকে রেবতীর অস্তিত্বেরও হদিস পাওয়া যায়। কাজেই বলরামের একটি মন্দির গড়ে তোলার ব্যাপারে পীতাম্বরের মনে সুপ্ত বাসনার সঞ্চার হয়েছিল। চুনারে পুঁথি আবিষ্কারের পরে বৃন্দাবনে এসে তিনি অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখে বিভোর হন। বলদেব তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে বলেন, যমুনার তীরে পড়ে থাকা নিম গাছের গুঁড়ি দিয়ে ঠিক সেই রকমই মূর্তি বানাতে হবে। পীতাম্বর স্বপ্নাদেশ মেনে বলদেব ও  রেবতীরানির  বিগ্রহ তৈরি করিয়ে অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে চলে আসেন কলকাতায়। বেলেঘাটা অঞ্চলে ছিল তাঁদের বাগান বাড়ি। সেখানে তিনি ঔপনিবেশিক ও ভারতীয় ধারার মিশেলে নির্মাণ করান  বিরাট অট্টালিকা এবং ঠাকুর দালান। বৃন্দাবন থেকে নিয়ে আসা বিগ্রহ সেখানেই স্থাপন করা হয় যা আজও 'পীতাম্বর মিত্রের ঠাকুর বাড়ি' নামেই বিখ্যাত। বসন্তোৎসব বলতে আমরা তো বুঝি দোল।  কিন্তু বলদেব জিউয়ের ক্ষেত্রে 'মধু আর মাধব' মাসের তাৎপর্য আলাদা। সেই গৃহদেবতাকে ঘিরে দোলযাত্রার ঠিক এক মাস পরে চৈত্র পূর্ণিমায় বলদেবের রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মূল উৎসব পাঁচ দিনের হলেও মেলা চলে এক মাস ধরে। ঠাকুরবাড়ির পিছনেই রাসমঞ্চ। রাস মূলত নৈশলীলা।  তাই গৃহদেবতা রাত বারোটা থেকে ভোর চারটে পর্যন্ত রাসমঞ্চে অধিষ্ঠান করেন। সামনে বিরাট মাঠ ও পুকুর। সেই মাঠেই রাতভর চলে যাত্রাপালা। তবে রাসের আগে দোল পূর্ণিমার সন্ধ্যায় ঠাকুর অঙ্গরাগে বসেন।  দীর্ঘ ২১ দিন বন্ধ থাকে দর্শন। অবশেষে চৈত্র মাসের শুক্লা পঞ্চমীর ভোরে হয় নব অঙ্গরাগে বিগ্রহের অভিষেক এবং ঠাকুরকে নিয়ে শোভাযাত্রা।  মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে ১০৮ ঘড়া জলে স্নানপর্ব সম্পন্ন হলে গৃহদেবতার রাজবেশ। তবে উৎসবের মধ্যমনি রাসপূর্ণিমার দিন বিগ্রহের পুরোপুরি শ্বেতশুভ্র বসন। এমনকি নিবেদন করা ভোগেও সাদার প্রাধান্য -- রাধাবল্লভি, সাদা আলুর দম, রসগোল্লা। সেই সাবেকি ঐতিহ্য আজও বজায় রয়েছে। মাঝে শুধু করোনা মহামারীর দাপটে প্রায় দু'বছর কাল এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছিল। কলকাতার বাড়িতে পীতাম্বর বিগ্রহ নিয়ে এলেও প্রতি বছর আষাঢ় মাসে বর্ষা নামলে গৃহদেবতাকে বেলেঘাটা খাল বেয়ে জলপথে গঙ্গা ও যমুনা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হত বৃন্দাবনে। সেখানে তিনি তৈরি করেছিলেন 'পীতাম্বর কুঞ্জ'। আশ্বিন মাস পর্যন্ত বিগ্রহ ওই বাড়িতে থাকতেন। পীতাম্বরের স্ত্রী নন্দরানী গৃহদেবতার আসনে গোপালও প্রতিষ্ঠা করেন। গৃহদেবতার নামে মিত্র পরিবার বিপুল সম্পত্তি উৎসর্গ করেছেন। বেলেঘাটা ছাড়াও কলেজ স্ট্রিট 'বাটা' যে বাড়িতে সেই 'সঙ্কর্ষণ ভবন'ও দেবোত্তর সম্পত্তি। সবই শ্রীবলদেব জিউ ও গোপাল জিউ এস্টেটের অন্তর্গত। 
           
    পীতাম্বরের মধ্যে বৈষ্ণব চেতনা এমন গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল যে ব্রজবুলি ভাষায় তিনি বেশ কিছু ভক্তিমূলক পদাবলী রচনা করেন। সেই সব কবিতার কিছু সংকলিত হয়েছিল তাঁর পৌত্র জনমেজয় মিত্র প্রকাশিত 'সঙ্গীত রসার্ণব' গ্রন্থে। জনমেজয় নিজেও ছিলেন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। কলা ও বিজ্ঞান দুই বিষয়েই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। তিনিই বাঙালিদের মধ্যে প্রথম যিনি পাশ্চাত্য রসায়ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। বিজ্ঞান পড়ার পাশাপাশি 'সঙ্কর্ষণ দাস' ছদ্মনামে ব্রজবুলিতে এবং 'আরমান' ছদ্মনামে উর্দুতে তিনি কবিতা লিখতেন। ১৮৭০ সালে প্রকাশিত 'নুসখা-ই-দিলখুশা' গ্রন্থে তিনি কয়েকশ উর্দু কবি ও ২৩ জন মহিলা কবির নির্বাচিত কবিতা ভূমিকা ও টিকা সহ সম্পাদনা করেছিলেন। ধর্ম-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি এইসব দৃষ্টান্ত মিত্র পরিবারে সারস্বত সাধনার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে।

    পীতাম্বরের একমাত্র পুত্র বৃন্দাবনচন্দ্র ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং 'আত্মীয় সভা'র সক্রিয় সহযোগী। তাঁর সময় থেকেই পরিবারে নিছক ভক্তিরসের প্রাবল্য ছাড়াও প্রখর যুক্তিবোধ ও সনিষ্ঠ বিদ্যাচর্চার অনুশীলন ক্রমে বেড়ে ওঠে।  তিনি একসময় ছিলেন কটকের ইংরেজ কালেক্টরের দেওয়ান।  পিতামহের কাছে ছোটবেলায় শোনা নানা পৌরাণিক কাহিনী ও ওড়িশার মন্দিরের গল্প সম্ভবত রাজেন্দ্রলালের মনে পরবর্তী কালে মন্দির স্থাপত্য ও পুরাতত্ত্ব নিয়ে গভীর গবেষণার স্পৃহা তৈরি করে দিয়েছিল। দুই খন্ডে প্রকাশিত 'অ্যান্টিকুইটিজ অব ওড়িশা' তারই ফসল। নেপালের সংস্কৃত-বৌদ্ধ সাহিত্য নিয়েও তাঁর অসামান্য কাজ রয়েছে।  গৌতম বুদ্ধের জীবনী 'ললিতবিস্তারে'র তিনটি অধ্যায় তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। রাজেন্দ্রলালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচিতি এবং তাঁর রচনার প্রভাবেই সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের 'অরূপরতন', 'শাপমোচন', 'চণ্ডালিকা' ছাড়াও নানা কবিতায় বৌদ্ধ ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। রাজেন্দ্রলাল সম্পাদিত সচিত্র মাসিকপত্রিকা 'বিবিধার্থ সংগ্রহ' এবং 'রহস্য সন্দর্ভ' ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয়। সেকালের রক্ষণশীল সমাজের প্রচলিত সংস্কার খণ্ডন করে রাজেন্দ্রলাল প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণদের মধ্যেও গো-মাংস খাবার চল ছিল। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে চন্দ্রনাথ বসু নামে এক লেখক যখন পর পর দুটি নিবন্ধে আদর্শ 'হিন্দু আহার' হিসেবে নিরামিষের পক্ষে সওয়াল করে সমাজে সংস্কারাচ্ছন্ন মতবাদ প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়ে উঠেছিলেন, তখন তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে  রবীন্দ্রনাথ তাঁর বক্তব্যে যুক্তি হিসেবে রাজেন্দ্রলালের গবেষণার কথাই তুলে ধরেছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রাজেন্দ্রলাল নিছক ব্যক্তিগত বিদ্যাচর্চা ও সমাজসেবামূলক কাজের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। বাড়িতে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারেও নজর দিয়েছিলেন। প্রথম স্ত্রী সৌদামিনীর অকাল মৃত্যু হয় বিবাহের অল্পদিন পরেই। তিনি আবার বিবাহ করেন ৩৮ বছর বয়সে।  তিনি চাইতেন দ্বিতীয় স্ত্রী ভূবনমোহিনী যেন লেখাপড়া করেন। কাজেই গৃহদেবতার মন্দিরের সামনে পিলসুজের আলোয় প্রতি সন্ধ্যায় তিনি পত্নীর ভাগবত পাঠের ব্যবস্থা করেছিলেন।

    পাশ্চাত্য পন্ডিতদের ভ্রান্ত ধারণাই হোক বা সমকালীন সমাজের অন্ধ বিশ্বাস, অপ্রিয় হলেও নিজের গবেষণা-লব্ধ সত্য প্রতিষ্ঠায় চিরজীবন অটল থেকেছেন রাজেন্দ্রলাল। এই পরিপ্রেক্ষিতে মিত্র পরিবারের গৃহদেবতার বেদীমূলে উৎকীর্ণ প্রতীকটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কুণ্ডলাকৃতি অনন্তনাগের মধ্যে রয়েছে একটি তুলসীপত্র, হল, মুষল, ডানা মেলে দেওয়া গরুড়ের থাবায় ধরা একটি ছোট সাপ।  আর লেখা রয়েছে সেই নীতিবাক্য -- সত্যমেব জয়তে নানৃতম। বলরামের প্রতি বৈষ্ণব ভক্তের আত্মনিবেদনের চিহ্ন-স্বরূপ এই প্রতীকের বাইরেও এক গভীরতর ব্যঞ্জনা রয়েছে। জ্ঞান সীমিত হতে পারে কিন্তু তাকে ঘিরে আছে অসীম সম্ভাবনা। হলকর্ষণের মাধ্যমে জ্ঞান ও সত্যকে নিজের মধ্যে আহরণ করতে হবে এবং একই সঙ্গে বর্জন করতে হবে অসত্য এবং অজ্ঞানের নেতিবাচক দিকটি। জ্ঞান যেখানে উত্তরণের দিকে নিয়ে যায়, কুন্ডলীকৃত বিষধর সর্পও তার পথে অন্তরায় হতে পারে না। ভক্তি এবং শরণাগতি ছাড়া যে এই জ্ঞানের নাগাল পাওয়া যাবে না তারই প্রতীক তুলসীপত্র।

    একটি পরিবারে ধর্মীয় সংস্কার ও জ্ঞানচর্চার ধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কী আশ্চর্য ভাবে প্রবাহিত হয়েছিল তা সম্প্রতি নতুন করে উপলব্ধি করলাম আড়াইশ বছরেরও বেশি প্রাচীন সেই গৃহদেবতার সামনে দাঁড়িয়ে।                                   
            
     
  • ব্লগ | ২২ মার্চ ২০২২ | ১১৩১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নাইটো - একক
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • শুভঙ্কর মুখোপাধ্যায় | 2600:1700:3690:3cf0:d8e6:dc0e:7919:3cf0 | ২৩ মার্চ ২০২২ ০০:১০505202
  • তুলনা করছি না। বরং প্রত্যয়ের সঙ্গে লিখছি, তোমার লেখা পড়ে রাধারমণ মিত্রের 'কলিকাতা দর্পণ' মনে পড়ল। চমৎকার বাঁধুনি আর চলন। এমনিতেই এই ধরনের লেখার একটা অপরূপ ঘরানা থাকে যা একটা সনাতন অনুভূতির জন্ম দেয়। এই লেখায় তার সাথে জুড়েছে তোমার আপন রসমাধুরী। একেবারে মানিকজোড়। কুর্নিশ।  
  • স্বাতী চট্টোপাধ্যায় দাস | 2401:4900:1045:feee:8c44:c009:1db9:a246 | ২৩ মার্চ ২০২২ ১৬:০৩505314
  • বড় ভালো লিখেছিস
  • অনিন্দিতা | ২৩ মার্চ ২০২২ ১৯:২৭505318
  • তথ্য সূত্র দিলে ভালো হত , ঐতিহাসিক বিবরণ যখন। 
  • Rajarshi Dasgupta | 42.105.141.200 | ২৪ মার্চ ২০২২ ১৯:৪০505432
  • Oshadharon hoyeche Dipankar kaku! Amar pore bhishon bhalo laglo... especially tomar lekhar dhoron ta .!!
  • Dr. Puripriya Kundu | 2402:3a80:1cd6:5557:e988:38d6:e6ff:e627 | ১৭ এপ্রিল ২০২২ ০০:২৭506488
  • Excellent.
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন