ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা

    Kasturi Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ ডিসেম্বর ২০২১ | ৬৮৪ বার পঠিত
  • ঝিমলিতলায় সকালের সোনা রোদ পড়ে ঝলমল করে উঠতেই, পাকুড়তলির গা গেল জ্বলে। মনে মনে একশো শাপান্ত করেও আশ মেটেনা তার। পাকুড়তলির ডোবাটার চারপাশটা কেমন নিঃঝুম। চারপাশের বড় বড় আম, জাম, কাঁঠাল ঝামড়ে পড়েছে ওর ওপর। তাই, সকালের সোনা রোদ, দুপুরের ঝলমলে বা শেষ বিকেলের আদুরে নরম আলোর কোনোটাই ওর কাছে পৌঁছতে পারে না। তার ওপর অভিমানে গুমরে থাকা মনটার কালোও তো আছে! সবমিলিয়ে পাকুড়তলিতে কিবা দিন, কিবা রাত্রি.. একই সুর। শুধু ঝিঁ ঝিঁ। দিনরাত ঝিঁঝিঁ পোকাদের কনসার্ট, ব্যাঙেদের কটকট আর ধেরে ইঁদুরদের ধড়ফড়, সাপেদের সড়সড় গতির আওয়াজে দম বন্ধ হয়ে আসে। 

    ওদিকে ঝিমলিতলায় গাছের পাতায় পাতায় শিশিরের টুপটাপ। ভিজে ঘাসজমিতে উজ্জ্বল শিশিরের ফোঁটা। ভোরের নরম রোদে দোয়েল, চড়ুই, টুনটুনিদের শিশিরস্নিগ্ধ সূর্যস্নান। লম্বু গাছেদের মাথায় বিলি কেটে হাওয়া দাদাদের পূব বাগানে ছোটাছুটি। সে এক মস্ত হুল্লোড়। 

    পূব বাগানের পাশেই এক মস্ত দিঘী। লোকমুখে পরাণ দিঘী। সেখানে পদ্ম শালুকের গা ঢলাঢলি হাসি দেখে সূয্যি মামা আলো ঢেলে দেন আরো। ঝলমল করে ওঠে চারপাশ। বেলা বাড়তে থাকে সোনা রোদের আঁচল ধরে। 

    এমনই এক পড়ন্ত বেলায় বিন্নী প্রজাপতি আর পান্না জলফড়িং বেড়িয়ে পড়ে হাত ধরাধরি করে। পান্না একটা সবুজ জলফড়িং। এই পাকুড়তলির বদ্ধ ডোবাতেই ওর জন্ম। ওর সবুজাভ স্বচ্ছ ডানায় রুপোলি রেখার জল্পনা কল্পনা। বিন্নী প্রজাপতি অবশ্য জন্মেছে ঝিমলিতলায় চামেলি গাছে। বিন্নীর রূপে আলো হয়ে থাকে চারপাশ। ওর আকাশি ডানায় সবুজ হলুদ সোনালীর বুটি। হাত ধরাধরি করে ওরা চললো পরাণ দিঘীতে, যেখানে পদ্মবনে গোধূলীর মায়া আলো। 

    পাকুড়তলি ওর অন্ধকার কোণ থেকে উঁকি মেরে কেবলই দেখে। অভিমানে গুমরে ওঠে ওর মন। 

    দিনের আলো শেষ হয়ে আসছে দ্রুত। শালপাতা দিদিকে আঁকড়ে ধরে ধুলোবালি। শহরের বুকে সেদিন প্রবল ঝড়। ঝড়ের ধাক্কায় ধুলো বালি মুখ থুবড়ে পড়েছিল মাঝ রাস্তায়। ঠিক তখনই শালপাতা দিদি উড়ে এসে বুকে তুলে নিয়েছিল ওদের দুজনকে। সেই থেকে  ওরা একসাথেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই শহর থেকে ওরা এসে পড়েছে মালতিপুরে। আহা, বেশ নাম তো !..আনন্দে ওরা নেচে নেচে ঘুরপাক খেয়ে নিল। তারপর, বৈকুুুণ্ঠ কাকুর ম্যাজিক গাাড়িতে চেপে, পুুুচকু ভেচকু র ব্যাগের তলায় পড়ে রইলো চুপচাপ। 

    মিনিট পনেরো পর পুচকু ভেচকুর ব্যাগের সঙ্গে নেমে পড়েছে এই ঝিমলিতলায়। পুচকু ভেচকুর মা 'ইস, কোত্থেকে এলো এই শালপাতা বলে উড়িয়ে দিতেই ওরা এসে পড়েছে পরাণ দিঘীর পাড়ে। 'উফফ, বাব্বাহ পথ যেন আর শেষই হচ্ছিল না।' ততক্ষণে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। 

    শালপাতা দিদি পরাণ দিঘীর এক কোণ ঘেঁষে পড়ে রইলো চুপচাপ। সঙ্গে রইলো ধুলো বালি। 'একদম চুপ করে থাক। রাতের অন্ধকারে বিপদ বাড়ে..সকাল হলেই বুঝে নিতে হবে চারপাশ। এখন ঘুমিয়ে পড় তোরা।' ধুলো বালি শালু দিদির কথা মতন পাশ ফিরে শোয়। 

    রাত গভীর হয় ক্রমশঃ। পাকুড়তলির ডোবার ব্যাঙদের উল্লাস, ঝিঁ ঝিঁ দের ঝামেলাঝাঁটি বাড়তে থাাকে পাল্লাা দিয়ে। আম জাম বকুল গাছেদের ঘিরে ঘিরে অন্ধকারে জোনাকীদের নৃত্য শুরু হয়। এই, শুধু এইটুকুনি আলোর জন্যই পাকুড়তলি সারারাত জেগে থাাকে। মনের সমস্ত দুঃখ ভুলে পাকুুড়তলি গেয়ে ওঠে..
    'জোনাকী, কী সুখেে ওই ডাানাদুটি মেলেছ ও জোনাকী'।.. 

    দুদিন হলো সূয্যিমামার দেখা নেই একেবারে। দিনের বেলাতে ঝিমলিতলাতেও অন্ধকার। নেই কোনো শিশিরের টুপটাপ। পান্না বিন্নী দোয়েল টুনটুনিদের আনন্দস্নান। অসময়ের বৃষ্টি।শুধু একটানা ঝিরঝির ঝরঝর। ঝিমলিতলা, পূবের বাগান, দত্তদের বাড়ির কুটুরে পেঁচা, লম্বু গাছ এমনকি পাকুড়তলির ডোবাও কত করে বৃষ্টিকে বোঝালো..'দেখ বৃষ্টি তোর এই অসময়ের নাচ গান আমাদের একদম পছন্দ হচ্ছে না। তুই এখন যা।' তবু কে শোনে কার কথা !..

    এদিকে শালপাতা দিদির বুকে ধুলো বালি তো মরতেই বসেছে প্রায়। কাঁকড়া ভাইয়ের ডেরায় আশ্রয় না পেলে ওদের যে কি হতো !..

    এই কদিনের বৃষ্টিতেই ঝিমলিতলা বুঝতে পেরেছে পাকুড়তলির মনের ব্যাথা। এত অন্ধকার কি কারো সয় !..এই অসময়ের বৃষ্টিতে পাকুড়তলির ডোবার চারপাশের আম জাম কাঁঠাল গাছেরাও বুঝতে পেরেছে, পাকুড়তলির দুঃখ টা। ওদের জন্যই তো পাকুড়তলির বুকে এতটুকু আলো পৌঁছয়না। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস কথা সেরে নেয় তারা। ঝরঝর করে জল ঝরিয়ে ডালপালা তুলে দেয় ওপর দিকে। ব্যাস..তাতেই কেল্লাফতে! 

    অনেক অনেক মেঘলা আলো এসে পড়ে পাকুড়তলির বুকে। আনন্দে ঝলমল করে ওঠে ওর মন। 

    দিকে বৃষ্টিও বুঝতে পারে, ওর এই অসময়ের খেলায় সঙ্গী হতে চাইছেনা কেউই। তাই মানে মানে সরে পড়ে সে। 

    শালপাতা দিদি আর ধুলো বালি র সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায় সবার। পরাণ দিঘীর পদ্মরা, বিন্নী, পান্না, হাওয়াদাদা, শালপাতা দিদি, কুটুরে পেঁচা, কাঁকড়া ভাই, টুনটুনি, দোয়েল, চড়ুই, পাকুড়তলির ডোবা আর ঝিমলিতলা আমাদের মনে মনে ঘুরে বেড়াতে থাকে..
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • bhanga gala | ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ০৩:২৬501963
  • কয়েকটা বানান একটু দেখবেন , যেমন :
     
    ধেরে ইঁদুরদের  >> ধেড়ে ইঁদুরদের
     
     দিঘী >> দীঘি বা দিঘি
  • bhanga gala | ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ০৩:২৮501964
  • লেখাট অন্যরকম । বেশ ভাল লেগেছে ৷
  • Mousumi Banerjee | ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ০৭:০৮501966
  • খুব ভালো লাগল। আরোও লেখা চাই।
  • মধুমিতা দে | 115.187.51.32 | ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ১৪:১৭501968
  • খুব ভালো লাগল। এভাবেও যে প্রকৃতি কে জীবন্ত করে তোলা যায় ভাবতে ভালো লাগে।অপূর্ব কল্পনা শক্তি। মনে দাগ কাটে।
     
  • Kasturi Das | ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:৩৮501975
  • অনেক অনেক ধন্যবাদ সবাইকে। আপনারা লেখাটা পড়েছেন এটা আমার এক বিরাট প্রাপ্তি। যা কিছু ভুল ত্রুটি, মার্জনা করবেন। আমি পরবর্তীতে ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা করবো। বানানের দিকে নিশ্চয়ই নজর দেব
  • Sangeeta Chatterjee | 42.110.136.200 | ১৪ ডিসেম্বর ২০২১ ১৭:০৯502097
  • খুব Khubvalo vabna.pratiki jeno jibontto hoye utheche.onek suvecha o valobasa janai emon misti ei vabna nie lekhar jonno
  • Kasturi Das | ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ ১৭:৫১502117
  • অনেক অনেক ধন্যবাদ
  • অধীর বিশ্বাস | 202.142.107.106 | ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২২:২৩502121
  • ঝিমলিতলা বুঝতে পারে। আমরাও তো পারি কিছু! সহজ গদ্য। সরল প্রকৃতির বুনন। সরিয়ে রাখা হচ্ছে ছোটদের নাগাল থেকে। এমন রচনা আরও চাই। সুর্যকিরণের মতো ছড়িয়ে পড়ুক।
  • Kasturi Das | ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২২:৩৯502122
  • অনেক অনেক ধন্যবাদ অধীর দা। আপনি পড়েছেন, এটা আমার বিরাট প্রাপ্তি। আমি নিশ্চয়ই এমন আরো লেখার চেষ্টা করবো
  • Mousumi Banerjee | ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ ১৫:১৮502130
  • আমারও মনে হয় ছোটদের নাগাল থেকে এসব যত্ন করে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। তাই ছোটরা আর স্বপ্ন দেখে না।
  • মিনতি চক্রবর্তী হালদার | 113.21.77.58 | ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:৫৪502314
  • Imagery টা অসাধারণ! কল্পনায় হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে ! শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং লীলা মজুমদারের লেখার সাথে প্রচুর মিল পেলাম। আজকাল এইরকম গল্পের বড্ড অভাব, তাই এইরকম গল্প আরোও পড়তে চাই।
  • Kasturi Das | ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ ১৩:০৩502315
  • নিশ্চয়ই চেষ্টা করবো দিদি
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন