• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • আমি মোহনবাগানের মেয়ে  (পর্ব এক)

    Sara Man লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ২৮ জুলাই ২০২১ | ৩৭০ বার পঠিত
  • ড. শারদা মন্ডল

    ১৯৭৭ সালের এক সকালের কথা মনে পড়ে, তখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। দিনটা ছিল ২৪শে সেপ্টেম্বর। তখন রেডিওতে বর্ণালী আর মঞ্জুষা শুনতে শুনতে সকালের রান্নার তোড়জোড় শুরু হত। তখন দুর্গাপুজোর কিছু দিন বাকি ছিল। পুজোর ছুটি পড়বে আর দেশের বাড়ি বসিরহাটের আড়বালিয়ায় যাব, এই ভাবনায় আমি আর বোন মশগুল হয়ে ছিলাম। দাদা দিদিদের সঙ্গে দেখা হবে। কত খেলা হবে, ফুল কুড়োবো। এক রাত্তিরের বাড়ি, নাগচৌধুরীদের বিশাল গেটের ওপরে সিংহ, আর তিন শিবের মন্দিরের মাঠে মেলা যেন আয় আয় করে ডাকছিল। ২৪ তারিখ শনিবার ইস্কুল ছিলনা। অথচ ঐ দিন খুব তাড়াতাড়ি আমাকে আর বোনকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাড়ির বাজার, রান্না, খাওয়া সবেতেই একটা তাড়াহুড়ো হচ্ছিল। হাতের সব কাজ গুছিয়ে ফেলতে হবে। কারণটা মাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম। ফুটবলের মণি, ব্রাজিলের কালোমাণিক পেলে এসেছেন কলকাতায় নিউ ইয়র্কের কসমস দলের হয়ে। আজ খেলা হবে মোহনবাগানের সঙ্গে। সকলে উত্তেজনায় ফুটছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হল। সবাই অধীর আগ্রহে ঘড়ি দেখছে। অন্যদিন হলে দুপুর গড়ালেই পাতিপুকুর হাউজিংয়ের মাঠে খেলা শুরু হয়ে যেত। আজ সব শুনশান। খেলা শুরু হল ইডেনে। আশপাশের সব রেডিওই আজ চলছে। আমরাও গোল হয়ে রেডিওর চারপাশে বসে গেছি। মানে বড়রা বসেছে বলে আমরাও জুটে গেছি। বল এ পায়ে ও পায়ে ঘুরছে, কিন্তু বেশ কয়েক মিনিট কেটে গেলেও, কই পেলের নাম শোনা গেলনা এখনও। অধীর আগ্রহে সকলে অপেক্ষা করছি। হঠাৎ কানে ভেসে এল, বল ধরেছেন পেলে। কিন্তু পেলের শট বারপোস্টের ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমাদের বাড়িতে তো বটেই, আশপাশের বাড়ি থেকেও একটা হুল্লোড় উঠল। যদিও ১৯৭৫এ টিভি সম্প্রচার শুরু হয়েছিল কলকাতায়, ৭৭ এর সেপ্টেম্বরে আশেপাশে কারোর বাড়িতেই টিভি ছিলনা। কিন্তু তাতে আফশোষও ছিল না। কারণ রেডিওর ধারাবিবরণীতেই মাঠ, গ‍্যালারি, সব আমরা দেখতে পেতাম। আমাদের লাগোয়া কোয়ার্টারে পূববাংলার একটি পরিবার থাকত। সেখান থেকে শুনলাম এবারটা উড়ে গেল তো কি? শিবাজী আজ দশ বারোটা খাবে। কিন্তু ওদের দুয়ো দিয়ে আমার মনের চোখের সামনে মোহনবাগান বাঘের মতো খেলতে লাগল। আর একটু খেলা এগোতেই মোহনবাগানের জালে বল জড়িয়ে দিলেন কসমসের কার্লোস। আমার মেজ মাসি ককিয়ে উঠল, ওরে পেলে হারলেও কষ্ট আর মোহনবাগান হারলে আমি শেষ। আমার মাসি নিপুণ ভাবে ঘরের কাজ করতো, রথ সাজাতো, ঝুলন করতো, সিনেমায় উত্তম কুমারের প্রতি কিছু খারাপ ঘটলে ফোঁপাত। সে হঠাৎ মোহনবাগান হারলে শেষ হবে কেন, বেশ একটু অবাক হলাম। যাই হোক খেলা চলছে। হাবিব, আকবর, শ‍্যাম - গো - ও - ও - ল। মা আমাকে জাপটে ধরে বলল, ওরে পেলের দলকে থাবড়া দিয়েছে শ‍্যাম থাপা। মায়ের কথা ডুবে গেল বাইরে পটকার আওয়াজে। মার মুখে এমন ভাষা আর আচরণ আমি এর আগে বা পরে কখনোই দেখিনি বা শুনিনি। মা বাগবাজারের নিবেদিতা ইস্কুলের শিক্ষিকা, সংযমী, রাশভারী। তখন অবশ্য এসব ভাবি নি। ছ বছরের আমি আর চারবছরের বোন, শ‍্যাম থা - পা, শ‍্যাম থা - পা বলে বলে তিড়িং বিড়িং নেচে নিলাম খানিকটা। রেডিওর ওধারে ইডেনেও মারকাটারি যুদ্ধ চলছে, আর এধারে দুই নারী, দুই শিশুর হৃদপেশীর কম্পন চলছে সেই যুদ্ধের তালে। একটু পরে আবার মোহনবাগানের গোল। এবারে গোল করেছেন হাবিব। বাইরে বাজির আওয়াজে কান পাতা দায়। আধঘণ্টাটাক কাটার পরে হঠাৎ মোহনবাগানের গোলের সামনে ফ্রিকিক নিতে আসেন পেলে। বোন কিছু ঘ‍্যানঘ‍্যান শুরু করেছিল। ওর গালে পড়ল মায়ের এক চড়। কিন্তু সে বল আটকে যায়। মা আবার বোনকে আদর করে দিল। একটু পরে হাফটাইম হয়ে গেল। কিন্তু ঐ সময়টা কাটছিল না। এমন একটা উত্তেজনা, খেলাটা টানা হয়ে গিয়ে ফলটা জানা গেলে বাঁচা যেত। আবার দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরু হল সেয়ানে সেয়ানে। না আর কোনো গোল হয়নি। মোহনবাগানের লিড। মা আর মেজ মাসি যেন পালকের মতো ভাসছিল। আমি আর বোনও তাই। কিন্তু শেষরক্ষা হলনা। কসমস পেনাল্টি পেয়ে গেল। ২ - ২ হয়ে খেলা শেষ হল। মন্দের ভালো হল। আমার মেজমাসি বেঁচে গেল। বাইরে বাজিও কমলো। কিছুক্ষণ পরে আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, মোহনবাগান জিতলে কি হয়? মা বলল, মোহনবাগান একটা আদর্শ, আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে গড়া যখের ধন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক, আমাদের অস্তিত্ব। মোহনবাগানের হারজিত, আর আমাদের জেতা হারা এক। আমি শুধোলাম, মানে? উত্তর হল, বড় হলে বুঝবে। শুনলাম উত্তরটা কিন্তু সন্তুষ্ট হলাম না, আবার মায়ের কথার মানেটাও বুঝলাম না।

    কিন্তু মোহনবাগান আসলে কি, সেটা জানার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠল। এটা জানতাম মোহনবাগান ফুটবল খেলে। ফুটবল কি সেটাও জানতাম। হাউসিংয়ের মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলত। মা আমাদের নামতে দিত না। বলত মেয়েরা ওসব খেলে না। আমি জানতাম মা মাঠে খেলার বিরোধী। কিন্তু এখন ভিতরে দেখছি উল্টো। মোহনবাগানে কি জাদু আছে? এতদিন রেডিওতে সবাই দুপুর থেকে খেলা শুনতো, তাই আমিও শুনতাম। এবারে আরও বেশি করে রেডিওর দিকে ঝুঁকে গেলাম। পুষ্পেন সরকার, কমল ভট্টাচার্য এবং অবশ‍্যই অজয় বসুর গলা চিনে ফেললাম। ঠিক যেমন চিনতাম বেতার নাটকে জগন্নাথ বসু বা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলা। আসলে ঐ ধারাবিবরণী মানে যাকে আমরা বলতাম রিলে, তার মধ্যে দিয়ে খেলার ব‍্যাকরণটা বোঝার চেষ্টা করতাম। শেখানোর কেউ ছিল না। দাদাদের বললে ক্ষ‍্যাপাবে। থ্রো-ইন আর থ্রু পাস দুটোর তফাৎ কি? কাকে বলে ফ্রি কিক আর কোনটাই বা গোল কিক? স্কোয়ার পাস কি, পেনাল্টি কখন হয়? কর্নার মারার নিয়ম কি? ব‍্যাক, হাফব‍্যাক, উইং, ফরোয়ার্ড পজিশন কি? এগুলো কল্পনা করে করে বোঝার চেষ্টা করতাম। অবশ্য শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেটও এইভাবেই শিখতাম। শ‍্যাম থাপা একবার বাইসাইকেল কিক মেরেছিলেন। আমি আনন্দবাজারে ছবি দেখেছিলাম। তখন আমি টু তে পড়ি। কিকটা কিভাবে হয়, ছবি দেখে ঠিক বুঝতে পারি নি। পরে টিভিতে পেলের বাইসাইকেল কিক দেখেছি। সিলভেস্টার স্ট‍্যালোনের একটা সিনেমা দেখেছিলাম - এসকেপ টু দ‍্য ভিক্ট্রি। তখন ন‍্যাশনাল চ‍্যানেলে মাঝে মাঝে রাত্তিরে ইংরেজি ছবি দেখানো হত। সেখানেও পেলের বাইসাইকেল কিক ছিল। আমার সবচেয়ে আনন্দ হতো, যখন অজয় বসুর সঙ্গে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পি কে ব‍্যানার্জি আসতেন। কারণ খেলার সঙ্গে সঙ্গে উনি নানান খেলার অভিজ্ঞতা আর ইতিহাস দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন। তাতে আমার খুব সুবিধে হত। আমার এক পিসতুতো দাদা একবার বলেছিল, দূর দূর পি কে ব‍্যানার্জি এলে ভীষণ অন্য কথা বলেন। আসলে ছেলেরা কোনদিনই বুঝবে না মেয়েদের কতরকম জ্বালা।
    আরও পড়ুন
    বাধা - Tanima Hazra



    ক্লাস সিক্সে যখন উঠলাম, মানে ঐ ১৯৮২ সালটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঐ বছরে স্পেনের বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল ইতালি আর জার্মানি। ঐ ফাইনাল খেলা গভীর রাতে আমি একজন প্রতিবেশীর বাড়িতে দেখতে গিয়েছিলাম। ঐ প্রথম পাওলো রসির গোল আমি রেডিওতে না শুনে টিভিতে দেখেছিলাম। ইতালি থ্রি টু ওয়ান জিতেছিল। ঐ খেলা দেখে রেডিও আর টিভির একটা মূল পার্থক্য বুঝতে পারলাম। টিভিতে স্লো মোশনে রিপ্লে দেখানো হয়। রেডিওতে সে সুযোগ নেই। টিভিতে কথা বলা হয় কম। তাই বিশ্লেষণটা রেডিওতে ভালো হয়। ঐ বছরে দিল্লিতে এশিয়ান গেমস হয়েছিল। একটা নাচুনি হাতির ছানা আপ্পু ছিল তার ম‍্যাসকট। আর লোগোতে ছিল যন্তর মন্তর। আমার কাছে এখনো ঐ যন্তর মন্তর ছাপওলা কয়েন আছে। গেমসের অনেক আগে থেকে সাজো সাজো রব পড়ে গিয়েছিল। দিল্লিতে গেমস ভিলেজ তৈরি হচ্ছিল। রোজ রুদ্ধশ্বাসে গেমসের খবর পড়তাম। ঐ খেলার রঙিন ছবি নাকি সরাসরি দেখা যাবে। কাগজে দূরদর্শনের নতুন মোবাইল ভ‍্যানের ছবি বেরোলো। ভারত নিজের প্রযুক্তিতে দেখাবে। কৃত্রিম উপগ্রহ যাবে। কিন্তু সব তছনছ করে যার সাহায্যে খেলা সম্প্রচারের কথা, সেই ইনস‍্যাট ওয়ান এ ভেঙে পড়ে যায়। তবে ভারত সরকার পিছু হটেনি। মার্কিন উপগ্রহ ইনটেলস‍্যাট ভাড়া করে টিভিতে রঙিন ছবি দেখানো শুরু হয়। এক দুবার প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে দেখেছি। তখন মাঝেমধ্যে হাউসিংয়ের মাঠে বাঁশ আর পর্দা বেঁধে সিনেমা দেখাতে লোক আসত। আমরাও পড়ি কি মরি করে ছুটতাম। পর্দার সামনের দিকে দাঁড়ানোর জায়গা না পেলে উল্টো দিক থেকে দেখতাম। ছবিও ডান বাঁ উল্টে যেত। একবার এইভাবে ১৯৮০র মস্কো অলিম্পিক দেখাতে লোক এসেছিল। মাঠে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম। পৃথিবীতে শুধু ফুটবল আর ক্রিকেট নয়, আরো কত খেলা, সে কথাটা এই ১৯৮২ সালটাই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল।

    আর ১৯৮২ এর কথাই যদি বললাম, তবে ক্লাস সেভেনে ১৯৮৩ এর কথাই বা বাদ যায় কিভাবে? ঐ বছর আমাদের ভারত ক্রিকেটে বিশ্বজয় করে। খেলা হত রাতে। মানে আমরা তো পূবদিকে সাড়ে পাঁচঘন্টা এগিয়ে আছি ইংল্যান্ডের থেকে। তাই রেডিওতে খেলা শোনার জন্য রাত জাগতে হত। এদিকে সকালে আবার ইস্কুল। মা আর বোন ঘুমিয়ে পড়ত। জেগে থাকতাম আমি আর বাবা। কীর্তি আজাদের ছয়ের পর ছয় মেরে ম‍্যাচ বাঁচানো, কপিলদেবের ১৭৫ নট আউট কি এ জীবনে ভোলা যায়? শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে কপিলদেবের হাতে বিশ্বকাপ উঠল। এতদিন ধরে ইস্কুলে ক্লাসে বসে ঢোলা, দিদিদের বকুনি, সব পুষিয়ে গেল। কাগজতো আমি পড়তামই। এখন জাতীয় ক্রিকেট টিমের সকলের ঠিকুজি কুষ্ঠি জানা হয়ে গেল। সকালে বাবার অফিসের তাড়া আর আমারো ইস্কুলের তাড়া। তার মধ্যে খবরের কাগজটা পড়ে নিতে হতো দুজনকে। তাই বাবা কাগজ এলেই প্রথম দুটো পাতা খুলে আমাকে দিয়ে দিত। নিজে ভিতরের খবরগুলো আগে পড়তো। আমি প্রথম, দ্বিতীয় পাতার প্রধান খবর, খেলার পাতা, রিপ কার্বি আর অরণ‍্যদেবের কমিক স্ট্রিপটা আগে পড়ে নিয়ে বাবাকে দিতাম। বাবাও ভিতরের পাতাগুলো আমাকে দিত। রবিবারেও ভাগাভাগি চলত, এমন অভ‍্যেস। তবে ঐদিন ম‍্যানড্রেকটা পড়ে আমি রবিবাসরীয় নিয়ে আগে বসতাম। বিয়ের পরে এই নিয়ে বরের সঙ্গে খিটিমিটি লাগল, কিছুতেই কাগজ ভাগ করবেনা। কাগজ নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাবে। সমাধান হল অন্য উপায়ে। এখন সন্তান বড় হয়েছে। তাই রোজ সকালে তিনরকম কাগজ আসে। মনের মিল থাকলেও বর পুরোটা বাবার মতো হয় না।

    যাকগে আবার ফুটবলে ফিরে আসি। ১৯৮৪তে নেহেরু কাপে আর্জেন্টিনার রিকার্ডো গারেকাকে আমার খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। না টিভিতে দেখে নয়। রেডিওর রিলে আর খবরের কাগজে ছবি দেখে। ইস্কুলে টিফিনের সময়ে এক বন্ধু বলল, না না শারদা, গারেকাকে তুই নিস না, ওকে আমি নেব। আমি বললাম, আচ্ছা নে। আমার তো স্টেডি হিরো একজন অলরেডি আছে। শ‍্যাম থাপা। আজ প্রায় চার দশক পরে প্রৌঢ় গারেকাকে আবার দেখলাম টিভিতে কোপা আমেরিকায় পেরু দলের সঙ্গে। ছিয়াশিতে মারাদোনার স্বপ্নমাখা বিশ্বকাপের আগে বাবা একটা ফিলিপসের বারো ইঞ্চি টিভি কিনে এনেছিল আর মারাদোনা আমার মা আর আমি - দুজনের চোখেই ঘোর লাগিয়ে দিয়েছিল। তবে বিশ্বকাপ এলেও ঘরের মাঠে বাবলু, বিকাশ, কৃষাণু চর্চাও সমানতালে চলছিল। যদিও একই যুগে বেঁচে থেকেও ওদের কাউকেই আমি চোখে দেখতে পেলাম না। বাবা আমাকে অনেক ছোটবেলায় ইডেন গার্ডেনে নিয়ে গিয়েছিল মিলিটারি টাট্টু দেখতে। আমি রেডিওতে চেনা ইডেনের সবুজ গ‍্যালারিতে বসেছিলাম। বাবা প্রায়ই খেলা দেখতে যেত। একবার পড়ে গিয়ে কালশিটে নিয়ে, কাদা মেখে ঘরে ফিরেছিল। একটু বড় হতে, আমিও চাপাচাপি করতাম, যাতে আমাকেও নিয়ে যায়। কিন্তু বাবা বলেছিল ফুটবল মাঠে মেয়েরা যায়না। মনের কষ্ট মনেই চেপে রাখতাম। না ঠিক মনে নয়, ততদিনে আমি ডায়েরি লেখা ধরেছি, তাই ডায়েরিতে লিখে সেটা লুকিয়ে রাখতাম। একবার জার্মানি থেকে বখুম বলে একটা দল এসেছিল আইএফএ একাদশের সঙ্গে খেলতে। তাতে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান সব দলের খেলোয়াড় মিলিয়ে একটা দল বানানো হয়েছিল। আমরা কখনও চাইনি ঐ খেলায় আমাদের দল হেরে যাক। কিন্ত পোড়া কপাল সেদিন আমরা ৬-০ হেরে যাই। শেষের দিকটা এমন হল, মাঠের দর্শক রেগে গিয়ে বখুমকে সমর্থন করতে শুরু করল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব‍্যাপার। পরেরদিন আমার মামা এসে বলে, জানিস, ভোরবেলা অফিস যাচ্ছি, দেখি ভাস্কর গাঙ্গুলি যাচ্ছে। একদম মুখোমুখি পড়ে গেছি। আর চেপে রাখতে পারিনি। কাল ছটা গোল খেয়েছে, দুকথা পাশ দিয়ে শুনিয়ে দিয়েছি। ১৯৮৭ তে মিরিকে প্রশ্ন লুঠ হয়ে, আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা পিছিয়ে গিয়েছিল। আর ঐ বছরে মাধ্যমিক দিয়েছিল তারকা সাঁতারু বুলা চৌধুরী। সেবার বাংলা ভাষা পরীক্ষায় চৈতন্য দেবের পাঁচশো বছর ইত্যাদি রচনা ইমপর্ট‍্যান্ট ছিল। কিন্তু মাধ‍্যমিকে এসেছে দেখি তোমার দেখা একটি খেলা। অন্য কি এসেছে আর দেখিনি। বখুমের খেলা রিলে শোনার পর, কেন বাংলার দল এভাবে হারবে, এই সব জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে একটা অনুপুঙ্ক্ষ বর্ণনা ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলাম। ঐ খেলাটাই যেন দেখেছি, এভাবে পরীক্ষার খাতায় ঝেড়ে দিলাম। নিবেদিতা ইস্কুলের সন্ন‍্যাসিনী দিদিরা জানতে পেরে তো অজ্ঞান হবার যোগাড়। বার বার বলতে লাগলেন, তুমি খেলার রচনা লিখেছ? কেন এ ভুল করলে, খেলা নিয়ে কি জানো তুমি। মূল‍্যবান নম্বর হারালে। একথা ঠিক খেলা নিয়ে বেশি জানা বোঝার সুযোগ হল কই? শুধু মোহনবাগান কিসের আদর্শ, কেন সে আমার পূর্ব পুরুষের যখের ধন, সেই সন্ধানটুকু সম্বল করেই তো আমার পথ চলা। আসলে ঐ রচনা লেখাটা ছিল, সমাজ যে সুযোগ আমাকে দেয়নি, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ইস্কুলের দিদিরা তো আমার এই সাধনার কথা জানতেন না। ভয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। শুধু আমার মা শুনে হেসেছিল। কারণ পৃথিবীতে ঐ একজনই আমার সব লেখালেখি আর পেপার কাটিংয়ের সম্ভারের কথা জানতো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যাই করে থাক, খেলার দেবী বা মোহনবাগানের দেবতা বিমুখ করেননি। মাধ‍্যমিকের ফল বেরোতে দেখলাম, না বাংলায় নম্বর কমেনি, পশ্চিমবঙ্গে আমার র‍্যাঙ্ক ৩৫, আর ইস্কুলের মধ্যে প্রথম। সব ঠিকঠাকই চলছিল। গোল বাধল পার্ট টু পরীক্ষার পরে। ঐ সময়ে অমল দত্ত আবার মোহনবাগানের কোচিং করাচ্ছিলেন। সে ভালো কথা, তবে উনি ইস্টবেঙ্গলের বাইচুংকে চুংচুং, শোশোকে শসা বলা শুরু করলেন। আমার বন্ধুদের ভিতর দুই দল মেয়ের মধ্যে লড়াই বাধার উপক্রম হল। এমনিতে আনন্দবাজার মাঝেমাঝেই নামের বানান বদলে দেয়। সবাই লিখছে গাভাস্কার। আনন্দবাজার লিখছে গাওস্কর। সঙ্গে আবার পদবীটি গাঁও থেকে এসেছে ইত্যাদি ব‍্যাখ‍্যা। আমাদের যখন বাইচুং বলে অভ‍্যেস হয়ে গেছে, তখন আনন্দ বাজার শুরু করল ভাইচুং। ছোটবেলা থেকে শুকতারায় অনিল ভৌমিকের হীরের পাহাড়, সোনার ঘন্টা, রূপোর নদী এইসব গল্প পড়ে বড় হয়েছি। সেই গল্পের নায়ক ছিল ভাইকিংদের রাজার মন্ত্রীর ছেলে ফ্রান্সিস। ভাইচুং শুনলে সেই ভাইকিংদের কথা মনে পড়ে। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। তা বলে চুংচুং? খেলার আগে বিপক্ষকে এভাবে অপমান করা কি ভালো? আমি সাবধানে আমার কট্টর মোহনবাগানী মামার কাছে এই কথা বলতে গেলাম। কারণ এই অপমান আবার মোহনবাগানের দিকে উল্টে যাবে না তো! মামা আমাকে অবাক করে অট্টহাসি হেসে উঠল। বলল, আরে পাগলি ও সব কোচের স্ট্র‍্যাটেজি। নেহেরু কাপ, বিশ্বকাপ এসবের স্বাদ পেয়ে লোকের কাছে ইস্ট-মোহনের আবেদন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। অমলদা যে হাইপ তুলেছে, আবার দেখবি মাঠ ভরে যাবে। মামার ব‍্যাখ‍্যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হল। তাহলে তো অমল দত্ত ভালো কাজই করেছেন। ইস্ট-মোহনের আবেদন তো ফিকে হতে দেওয়া যায়না। মোহনবাগান আমার পূর্ব পুরুষের আশা আর স্বপ্নের যখের ধন। আমি নিজেও তার সৈনিক। কিন্তু পূর্ব পুরুষের সঙ্গে সংযোগটা কি?
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৮ জুলাই ২০২১ | ৩৭০ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অভিজিৎ ঘোষ | 2405:8100:8000:5ca1::101:e1de | ০৯ আগস্ট ২০২১ ১৩:৩৩496599
  • মোহনবাগান-কসমস খেলার দিনটা আমারও মনে আছে, ব্রিষ্টি হয়েছিল, খুব আনন্দ পেয়েছিলাম, লিগে ইস্টবেঙ্গলের কাছে দুগোলে হারার দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছিল 

  • Al Shahriyar Mahi | ০৯ আগস্ট ২০২১ ১৩:৩৮496600
  • চমৎকার। 

  • aranya | 2601:84:4600:5410:6820:3c32:4ec:3041 | ১২ আগস্ট ২০২১ ১৯:৪০496695
  • বাঃ 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন