• টইপত্তর  বাকিসব  মোচ্ছব

  • অগ্নিসাক্ষী (গল্প)

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | মোচ্ছব | ০৯ আগস্ট ২০২১ | ৪৮৫ বার পঠিত
  • (১)

    আজ আমার মারাঠি বন্ধু জোগলেকরের চাপাচাপিতে আমরা বিলাসপুরের সিদ্ধার্থ টকীজে নানা পাটেকরের ‘অগ্নিসাক্ষী’ ফিল্ম দেখতে গেছলাম। আমরা মানে আমাদের বিলাসপুর ড্রামা সার্কল নামের নাটকের দলের ছ’জন সিনিয়র।

    সিনেমা দেখে বেরিয়ে এসেছি, সুদেশ বলল ওর মাথা ধরে গেছে। সুগন্ধা চিমটি কাটল, ‘আমাদের মেথড-অ্যাক্টিং-ভক্ত অভিনেতাপ্রবরের এবংবিধ শিরঃপীড়ার কারণ জানিতে পারি কি? না না, ইহার অন্য কোন গূঢ় উদ্দেশ্য নাই, কেবল বালিকাসুলভ কৌতুহল নিবারণার্থ।

    সুগন্ধার মাথায় এক চাঁটি কষিয়ে সুদেশ বলল - মেলা বকিস না, নানা পাটেকরের অ্যাক্টিং দেখলি? ওটা অ্যাক্টিং? বড্ড ম্যানারিজম এবং স্টেনসিলমার্কা, মনে হয় সারাক্ষণ নানাকেই দেখছি, চরিত্রটাকে নয়। দূদ্দূর!

    সবাই হেসে উঠল, জোগলেকর রেগে কাঁই। ও নিখাদ নানা পাটেকর ভক্ত, কোন সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে মারাঠি উচ্চারণে বলে উঠি - থাম্বা! থাম্বা! অব ঠিণগী উড়েলা!

    থাম থাম! এবার খালি আগুনের ফুলকি ছিটকে ওঠা বাকি!

    আমার বাঙালী উচ্চারণে আধা-খ্যাঁচড়া মারাঠি শুনে সবাই সুনীলের দিকে তাকায়। সুনীল হাত নেড়ে এসব কথা উড়িয়ে দিয়ে বলে - চল, কফি হাউসে যাই।

    আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি; সমস্বরে বলি - সেই ভাল, নানার অভিনয় নিয়ে কাটাছেঁড়া কফির সঙ্গেই জমবে। সুগন্ধা ফোড়ন কাটে - মনীষা কৈরালা? ওকে নিয়ে কিছু কথা হবে না?

    সবাই হাসে, কিন্তু সুনীল গম্ভীর।

    কফি হাউসে বাগানের দিকের জানলা ঘেঁষে কোনায় আমাদের দুটো টেবিল বরাদ্দ। ভীড় না হলে ও দুটো আমাদের জন্যে খালিই থাকে। জানলা ঘেঁষে আমি বসি, আর আমার পাশে সুনীল; বরাবরের মত। সুগন্ধা উঠে ম্যানেজারকে কিছু বলতে যায়।

    সুনীল বোরকর হল আমাদের দলের নাট্য-পরিচালক। ও শুধু আমাদের সেরা অভিনেতাই নয়, আলোকসম্পাত, সাউন্ডের ব্যবহার এবং স্টেজে ফিজিক্যাল কম্পোজিশনের মাস এবং ভল্যুম — এসব নিয়ে ওর নান্দনিক বোধ শুধু আমাদের নয়, বিলাসপুরের অন্য দলগুলোর চোখেও সম্ভ্রম আদায় করেছে। ভিলাইয়ের বহুভাষিক ড্রামা ফেস্টিভালে সুনীল জুরিদলের সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ পায়; কখনও যায়, কখনও যায় না।

    ও স্বভাবে আমুদে, হৈচৈ করতে ভালবাসে, আর লোকের আপদে বিপদে একপায়ে খাড়া। আবার ওর বাবার ছোট্ট ডেইলি নীডসের দোকানে সকাল বেলা বসে কাউন্টার সামলায় যাতে বাবা স্নান-খাওয়াদাওয়া সেরে দোকানে নিশ্চিন্ত হয়ে আসতে পারেন।

    বছর দশেক আগে আমাদের এখানে একটা যা তা ঘটনা ঘটেছিল। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার বিলাসপুর সংবাদদাতা দিব্যেন্দু বোস মাকে বিবেকানন্দ জন্মোৎসবের দিন নদীর ওপারে রামকৃষ্ণ মিশন থেকে পূজো এবং এগজিবিশন দেখিয়ে বিকেল নাগাদ ঘরে ফিরছিল। নেহরু চৌকের কাছে লালবাতির সামনে থেমে থাকা ওর হিরোহোন্ডা বাইককে একটা ট্রাক পেছন থেকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়। সম্ভবতঃ ট্রাকের লাইসেন্স বা কাগজপত্তর ঠিক ছিল না। সে যাই হোক, এর ফলে বাইকের পেছনে বসা মাসিমা রাস্তায় ছিটকে পড়েন এবং তখনই লাল বাতি সবুজ হয় আর পেছনের গাড়ি্র চাকায় ওনার মাথা পিষে গিয়ে রাস্তায় ঘিলু ছড়িয়ে পড়ে। দিব্যেন্দুও মাটিতে, ভারি মোটরবাইকের লেগগার্ডে ওর পা ফেঁসে গেছে। দৌড়ে আসা পাব্লিক ও ট্রাফিক পুলিশ ওকে তুলতে গেলে বোঝা গেল পা’টা গোড়ালির কাছে ভেঙে গেছে, সম্ভবতঃ মাল্টিপল ফ্র্যাকচার।

    আমাদের দলের কাছে খবরটা পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গেছল। যখন গেলাম, তখন দিব্যেন্দু হাসপাতালে সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে, মাসিমা মর্গে।

    সুনীল অবস্থাটা বুঝে প্ল্যান ছকে নিল। দলের ফান্ড থেকে কিছু টাকা সবাইকে জানিয়ে হাসপাতালে অ্যাডভান্স জমা করল, আমাদের দিনরাতের ডিউটি ভাগ করে দিল। নিজে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে পরের দিন বেলা এগারটা নাগাদ পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বের করে মাসিমার বডি নিয়ে মধুবনে (শ্মশানঘাটে) পৌঁছে গেল। আমাদের একটা দল যখন কাঠকুটো দিয়ে চিতা প্রায় সাজিয়ে ফেলেছে ততক্ষণে ও অ্যাম্বুল্যান্সে করে দিব্যেন্দুকে নিয়ে ফের হাজির। একটা হুইল চেয়ারে বসিয়ে নিয়ে এসেছে দিব্যকে, এভাবেই মুখে আগুন ছোঁয়ানোর ব্যবস্থা করা হল। তারপর বাকি কাজ আমরা করলাম। এই না হলে কম্যান্ডার!

    এখানেই শেষ নয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও দিব্যেন্দুর নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে তিন মাস লেগে যায়। ও বাড়িতে একা এবংশয্যাশায়ী। সুনীল কাজের লোক ঠিক করে দিল আর ওই ক’টা মাস নিজের বাড়ির রান্না করা ডাল-ভাত তরকারি টিফিন ক্যারিয়ারে করে ওর ঘরে দু’বেলা পাঠিয়ে দিল। আমরা জানতাম এটা ওর স্বভাব। ও এই রকমই, এসব নিয়ে বেশি কথা বলা পছন্দ করে না।

    সুনীল আমাকে পছন্দ করে। আমি দলের মধ্যে বয়সে বড়, আমাদের নাটকের দলের স্ক্রিপ্ট রাইটার। কোন একটা নাটক ঠিক হলে সুনীল সেটা কাটাছেঁড়া করে, প্রোডাকশন অ্যাঙ্গেল থেকে নোটস বানায়। তারপর আমরা বসি; শুধু আমরা দু’জন । আমাদের প্রোডাকশনের জন্যে স্ক্রিপ্ট রি-রাইট করা হয়। কয়েক দিস্তা কাগজ নষ্ট হয়, প্রতিবার সুনীলের সঙ্গে তর্ক হয়। আমি প্রথমে মাথা নাড়ি, তারপর কিছু কিছু চেঞ্জ করি, সবটা নয়। এইভাবে রিহার্সাল শুরু হয়। তখন আবার কিছু বদল হয়। ডায়লগ বদলে যায়। কিছু চরিত্রের ডায়লগ বেড়ে যায়, কিছুর কমে যায় । কখনও গোটা একটা সীন বা চরিত্র বাদ যায়। সেই ফাঁক ভরাট করতে আবার আমাকে কলম ধরতে হয়।

    সেবার নাট্য উৎসবে ছত্তিশগড়ের দু’জন, যারা দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন, আমাদের এখানে বিচারক হয়ে এলেন। আমরা আয়োজক দল। এছাড়া ছত্তিশগড়ের চারটে শহর এবং মধ্যপ্রদেশের জবলপুর থেকে একটি টিম।

    ওঁরা বললেন - জবলপুর মানে মধ্যপ্রদেশের দল। তাহলে এটা দুটো রাজ্যের মিলিত নাট্যোৎসব। আপনারা অনায়াসে একে ইন্টারস্টেট ফেস্টিভ্যাল করাচ্ছেন বলে লেবেল লাগিয়ে সংগীত কলা নাটক অ্যাকাডেমি’র থেকে গ্র্যান্ট চাইতে পারেন, খরচা উঠে যাবে। টিকিট বিক্রির টাকাটা আপনাদের দলের ফান্ডে জমা পড়বে।

    আমরা খুব বাড় খেলাম, সুনীল রাজি হল না। বলল, দূর! জবলপুরের টিম আমার পেরেন্ট টিম। আমি ওই শহরের ছেলে। ওখানকার যুব নাট্য সংঘের ডায়রেক্টর টাইটাস বা লাড্ডু ভাইয়ার কাছে নাটকের অ আ ক খ শিখেছি। ওঁরা আমার অনুরোধে ওদের নাটক নিয়ে এসেছেন আমাদের ওজন বাড়াতে, কম্পিটিশনের জন্য নয়। আমি ওদের মুখ দেখিয়ে ব্যবসা করতে পারব না।

    আমরা হতাশ হলাম, সুনীল নির্বিকার।

    আমরা সুনীলকে ভালবাসি। সুনীলকে সবাই ভালবাসে। গরমের ছুটিতে সদ্য স্কুলের বেড়া ডিঙোনো বা কলেজের মেয়েরা আমাদের ওয়ার্কশপে এসে গন্ডায় গন্ডায় সুনীল স্যারের প্রেমে পড়ে যায়। সুনীল নির্বিকার। ও শুধু নাটককে ভালবাসে।

    ভুল বললাম, ও ভালবেসে ছিল অরুণিমাকে। অরুণিমা ও সুনীল আমাদের বিলাসপুর ড্রামা সেন্টারের ফাউন্ডার মেম্বার, আমিও তাই। অরুণিমা আমাদের সবচেয়ে ভাল অভিনেত্রী। ওর জন্য আমাদের দল উজ্জয়িনী ও গোরখপুর সর্বভারতীয় ড্রামা ফেস্টিভ্যালে প্রাইজ পেয়েছে। না, বেস্ট প্রোডাকশন, বেস্ট ডায়রেক্টর পায়নি; কিন্তু বেস্ট অ্যাক্ট্রেস দু’তিনবার।

    অরুণিমা কি সুনীলকে ভাল বেসেছিল? জানি না। তবে ওদের দুজনের সহজ ঘনিষ্ঠতা, অরুণিমার সুনীলের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ওয়ালেট বের করে চা ও নাস্তার পেমেন্ট করা, রাস্তায় নুক্কড় নাটকের সফল অভিনয়ের পর লাফিয়ে সুনীলের গলা ধরে ঝুলে পড়া অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়ে গেছল। কিন্তু সেই অরুণিমা বছর পাঁচ আগে আমাদের দল ছেড়ে শহর ছেড়ে জবলপুর চলে গেল। কেন? কেউ জানে না। আমি জানতাম। কারণ, আমি অরুণিমাকে ভালবেসেছিলাম। ওকে বলতে পারি নি, প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ওর সব খবর রাখা আমার জন্য ভীষণ দরকারি কাজ হয়ে গেছল।

    গতবছর অরুণিমা ফিরে এসেছে বিলাসপুরে, নিজের বাড়িতে। কাজ জুটিয়ে নিয়েছে একটা মোবাইল বিক্রির দোকানে, নাটক ছেড়ে দিয়েছে। কেন? কেউ জানে না। জিগ্যেস করায় উত্তর পাওয়া গেছে — বাড়ির বড় মেয়ে, ভাইয়েরা ছোট, বাবা বুড়ো হয়েছেন। সংসার চালানোর দায়িত্ব আমার কাঁধে। নাটক করে শীল্ড মেডাল এসব জুটতে পারে, ছ’জনের পরিবারের ভাত জুটবে না।

    সে যাই হোক, তিনটে বাইকে করে আমরা ছ’জন কফিহাউস মুখো হলাম। ম্যাটিনি শো ভাঙার পর ঘন্টাখানেক পেরিয়েছে। সুয্যি ডুবলেও আকাশে লালচে আভা ছড়িয়ে রয়েছে। এটা আমার মন খারাপের সময়। এই সময় অরুণিমা আমাদের জানিয়েছিল যে ও অভিনয় ছেড়ে দিচ্ছে, আমাদের দলও ছেড়ে দিচ্ছে-হ্যাঁ, বরাবরের মত।

    শনিবারের সন্ধ্যে, আড্ডা আজ ভালই জমবে। সবাই একটু দেরি করে বাড়ি ফিরবে। টেবিলে যথারীতি জলের গ্লাস ও ব্ল্যাক কফি এসে গেছে তিন কাপ, আর তিনটে খালি। এইভাবেই চলবে তিন বা চার রাউন্ড, কারও পকেট গরম থাকলে সাম্ভর বড়া দু’প্লেট জুটতে পারে।

    সবাই জানতে চায় অগ্নিসাক্ষী নামক অমন খাসা মেলোড্রামা দেখে আমাদের হিরো সুদেশের এ’রকম ছ্যাঃ ছ্যাঃ করার কী হল? আফটার অল, নানা পাটেকর হোল মরা হাতি লাখ টাকা, এ’নিয়ে কোন কথা হবে না।

    সুদেশের চেহারায় বিরক্তি ফুটে উঠেছে।

    - অভিনয়ের কথা ছাড়, ফিলিমটাই মহা-বন্ডল। থীমটা একবার ভাব? অবিশ্বাস্য! একটা লোক নিজের বৌয়ের প্রেমে এতই অন্ধ যে তাকে ঘরে প্রায় পায়ে শেকল পড়িয়ে রাখবে? যে মেয়েকে ও ভালবাসে তার দিকে কেউ যেন না তাকায়, কেউ কথা না বলে? বৌ যেন সাতপুরুষের পৈতৃক সম্পত্তি। আবার বৌ যদি নিজের ইচ্ছেয় কিছু করে, খালি ঘরে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে নাচে তো তাকে স্বামী বেল্ট পেটা করবে? একটা খপ-পঞ্চায়েত মার্কা রিগ্রেসিভ থিম! এটা ভালবাসা না মানসিক বিকার?

    ব্যস্‌ তর্ক বেঁধে গেল। জোগলেকারের চেঁচাতে লাগল যে মেলোড্রামাও একটা আর্ট ফর্ম, ওটাকে এককথায় নাকচ করা যায় না।

    সুগন্ধার বক্তব্যঃ হোরেশিও, এই দুনিয়ায় অনেক কিছু ঘটে যা ঠিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

    অঙ্কের দিদিমণি বিদিশা এতক্ষণ কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল আর চশমার ফাঁক দিয়ে এর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। এবার ও খালি কাপটা সামনে সামান্য ঠেলে দিয়ে বলে উঠল — যাই বল, এমন ঘটনা বাস্তবে কখনও ঘটে? বিশ্বাস হয় না। আমাদের চেনাজানার মধ্যে তো শুনি নি। জোগলেকার শুনেছে নাকি? তাহলে বলুক, এমন প্রমাণ পেলে ‘দুধ কা দুধ, পানী কী পানি’ হয়ে যাবে। এঁড়ে তক্কো করার স্কোপই থাকবে না।

    সন্নাটা! সন্নাটা! সবাই চুপ।

    আমার পাশের কাঁচের জানলায় বাইরের বাগান থেকে একটা মৌমাছি এসে বারবার আছড়ে পড়ছে। আমি মন দিয়ে ওর ভোঁ-ও-ও শুনি আর ভাবি একটা মৌমাছির ক’টা পা? রাণী মৌমাছি ও শ্রমিক মৌমাছির পায়ের সংখ্যায় কোন হেরফের আছে?

    চটকা ভাঙল সুগন্ধার হাতের ঠেলায়। আরে দাদা, কুছ তো বলিয়ে? আপনি কোথায় চলে গেছেন?

    ও আমার মুখের সামনে হাত নাড়ে, বলে ক’টা আঙুল যেন ঠিক করে বলি।

    আমি লজ্জা পাই, ঘাড় চুলকে জানতে চাই - কী নিয়ে কথা হচ্ছে?

    বাকি সবার মিলিত হাসিতে গুমোট ভাব কেটে গিয়ে পরিবেশ হালকা হয়ে যায়।

    জোগলেকার বলে - দাদা, আপনিই বলুন, ওই নানা পাটেকরের রোলের মত কোন পুরুষ, যে ভালবাসার মানুষকে প্রায় বগলদাবা করে রাখতে চায়, কি বাস্তবে নেই? আমরা ক’জনকে জানি?

    আমি অন্যমনস্ক হবার ভান করে সামান্য মাথা নাড়ি।

    সুদেশের চেহারায় পেনাল্টি গোল করার আত্মতৃপ্তি। জোগলেকারের মুখ হতাশায় কালো। অন্যদের চোখে মুখে কৌতুক। বিদিশা এবার সুনীলকে পাকড়াও করে।

    -- সুনীল স্যার, আপ হী কুছ বতাইয়ে। এমনটা হতে পারে কি? এসব একটু বেশি আবদার না?

    সুনীলের উত্তর আমার জানা ছিল। তাই আমি ফের জানলার কাঁচে আছড়ে পরা মৌমাছির ভনভনানিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু সুনীলের অপ্রত্যাশিত উত্তরে আমার স্নায়ুতন্ত্র ঝনঝনিয়ে উঠল।

    -- হ্যাঁ, অসম্ভব নয়। এমন ঘটনা খুব কম, তবু ঘটতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, আমার চোখের সামনেই ঘটেছে।

    সবার চোখ ছানাবড়া, জোগলেকরের মুখের হাঁ দেখার মত। সুদেশের চোয়াল ঝুলে পড়েছে। সুগন্ধা হাতের কাপ বেশ জোরে ঠক করে নামিয়ে রাখে। কিন্তু অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল। এবার সুনীল বলে — কথাটা এতদিন বলা হয়নি। বুঝতে পারছিলাম না এটা সবার সঙ্গে শেয়ার করা উচিত হবে কিনা।

    কিন্তু আজ বলব, কারণ যার ঘটনা তার থেকে পারমিশন পেয়ে গেছি ক’দিন আগে। তবে একটা শর্ত আছে। এই ঘটনা আমাদের ছয়জনের বাইরে পাঁচ কান হবে না। এটা যার সঙ্গে ঘটেছিল মানে বাস্তবিক অগ্নিসাক্ষীর যে নায়িকা তাকে আমরা সবাই খুব পছন্দ করি, ভালোবাসি। এটা তার সম্মান রক্ষার প্রশ্ন।

    কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। সবার চোখে নীরব প্রশ্ন — কে সে?

    -- বলছি, সে হোল আমাদের পুরনো সাথী, আমাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য - অরুণিমা। আর ওই ঘটনার আরও একজন সাক্ষী আছে, আমাদের বাঙালি দাদা। কাজেই গল্পটা আমরা দু’জনে মিলে বলব, কারও খেই হারিয়ে গেলে অন্যজন ধরতাই দেবে। কিন্তু তার আগে আরেক দফা কফি হয়ে যাক।

    (২) সুনীল

    তোমাদের সবার মনে আছে সেবার ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ডের অ্যানুয়াল ফাংশনে আমাদের চেখভের ‘ম্যারেজ প্রপোজাল’ নাটকের ৩২ তম অভিনয় হোল।

    - হ্যাঁ, হ্যাঁ; সেবার সিটি কেবলের লোকজন আমাদের না জানিয়ে পুরোটা শ্যুট করে ওদের সারাদিনের প্রোগ্রামে ফিলার হিসেবে টুকরো টুকরো দেখাচ্ছিল। তারপর কী হেব্বি ক্যাচাল!

    সুনীল হাত তুলে সুগন্ধার প্রগলভতা থামিয়ে দেয়।

    -- আমাদের দলে সেটাই অরুণিমার শেষ অভিনয়। তারপরই ও বিলাসপুর শহর ছেড়ে সোজা জবলপুর পাড়ি দেয়। ভেবেছিল ওখানে আরও গ্রোথের সম্ভাবনা আছে। ও অভিনয়কেই ক্যারিয়ার করার স্বপ্ন দেখেছিল। গোড়ায় আমার রেকমেন্ডেশনে আমার গুরুর দলে গিয়ে অভিনয় শুরু করল, ‘চরণদাস চোর’ নাটকে ওর রাণী ফুলমতী পাবলিক খুব পছন্দ করেছিল।

    কিন্তু ছ’মাস যেতে না যেতে খটাখটি লাগল। লাড্ডু ভাইয়া ভাল পরিচালক, তবে কিছুটা প্রাচীনপন্থী। সেখানে অরুণিমা মনের খোরাক পাচ্ছিল না। ফলে ও ওই দল ছেড়ে একটি নতুন দল, পিপলস থিয়েটার কম্বাইনে যোগ দিল। ওদের সঙ্গে কমিউন করে থাকতে লাগল। বাড়ি থেকে টাকা পয়সা আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ও একটি টিউটোরিয়ালের অফিস সামলানোর দায়িত্ব নিল। রিহার্সাল রাতের বেলায় এবং ছুটির দিনে। তারপর আরও অনেক কাজ ও দু’একটা বিজ্ঞাপন ফিল্মে কাজ করার পর ধীরে ধীরে ও কেমন মিইয়ে পড়তে লাগল। পূজো পার্বণেও বছরে দু’তিনবারের বেশি বাড়ি আসতো না। আমার সঙ্গে ফোনালাপ ও কুশলমঙ্গলের পালা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।

    ওর বাবা-মা আমাকে ডেকে পাঠালেন। জানতে চাইলেন অরুণিমা জবলপুরে ঠিক কী করছে কেমন আছে - তা আমি সঠিক জানি কিনা। দেখলাম ওর সিমকার্ড বদলে গেছে।

    শেষে আমি জবলপুরে আমার নাটকের দলের পুরনো সাথী সুমিতকে ফোন করে বললাম ওর খোঁজ নিয়ে আমাকে ঠিক ঠিক খবর দে।

    সুমিত জানাল যে চিন্তার কোন কারণ নেই। অরুণিমার খোঁজ পাওয়া গেছে। ও বর্তমানে একটি কুরিয়র সার্ভিস আউটলেটের ম্যানেজার কাম অ্যাকাউন্ট্যান্ট। আলাদা একটা এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়েছে। সুমিতই জোগাড় করে দিয়েছে। আগামী মাসের গোড়ায় ও বিলাসপুর গিয়ে নিজের ছোটভাইকে নিয়ে আসবে, জবলপুরের স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করে দেবে নিজের দায়িত্বে। ওকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করিয়ে কলেজে পড়ানোর ব্যবস্থা করবে।

    আমি খুশি খুশি সব খবর ওর বাবা-মাকে দিলাম। ওঁরা বললেন - হ্যাঁ, ওদের কাছেও খবর এসেছে, ও আসছে ভাইকে নিতে। আমি ওঁদের কাছ থেকে ওর নতুন ফোন নম্বর নিলাম। কিন্তু কী যে হোল, যখনই ফোন করি, ও হয় ধরে না বা ‘ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব’ গোছের কিছু আউড়ে লাইন কেটে দেয়।

    পরের মাসের গোড়ায় অরুণিমা বিলাসপুরে এল তিনদিনের জন্য, না, আমাকে কেউ খবর দেয় নি। আমি আন্দাজ করে যখন ওদের বাড়ি গেলাম তখন ভাইবোনের প্যাকিং হয়ে গেছে। স্টেশনে যেতে মাত্র একঘন্টা বাকি। আমি আলাদা করে কিছু কথা বলতে চাইছিলাম, সুযোগ পেলাম না। তবু ট্রেন ছাড়ার অল্প আগে স্টেশনে গিয়ে প্ল্যাটফর্ম থেকেই জানলায় উঁকি দিয়ে বললাম
    - কিছু কথা ছিল।
    -- কী কথা?
    - এরম করছিস কেন?
    -- তোমরা স্টেজে নাটক করছ, করে যাও। আমি আর ওসবের মধ্যে নেই।
    - ঠিক আছে; কিন্তু যোগাযোগ থাকবেনা কেন? খোঁজখবরের জন্য ফোন করি, লাইন কেটে দিস কেন?
    -- আমি ভালই আছি, মুঝকো মেরি হাল পর ছোড় দো! অপনে হিসাবসে জীনে দো! আমাকে আমার মত থাকতে দাও।

    আমার ভেতরে কিছু একটা ছিঁড়ে গেল। আমি আর ফোন করি নি, ওর কথা কাউকে জিজ্ঞেস করারও ইচ্ছে হয়নি। এভাবে কেটে গেল পুরো একটা বছর।

    শুধু সেবার কটক ড্রামা ফেস্টিভ্যালে ‘দুলারীবাঈ’ নাটক নামানোর সময় মনে হয়েছিল অরুণিমা থাকলে বড় ভাল হত, এই রোলটা ওর জন্য একেবারে মাপমত তৈরি।

    তারপর ওর বাবা-মা দ্বিতীয় মেয়ে অজন্তার বিয়ে ঠিক করলেন। আমরা সব খাটাখাটনি করছি। অরুণিমা এসেছে, কিন্তু আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। আমারও বয়ে গেছে। কিন্তু বিয়ের পরদিন কনে বিদায়ের সময় অজন্তা আমাকে একান্তে ফিসফিস করে বলল - দিদি খুব বিপদের মধ্যে আছে, খুলে বলছে না। আপনিই ভরসা, মান-অভিমান ছেড়ে খোলাখুলি কথা বলুন।

    - ও তো এড়িয়ে যাচ্ছে, আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়না।

    অজন্তার চোখ জ্বলে উঠল।

    -- কেমন পুরুষ আপনি? দিদিকে ভালবাসেন না? জোর করে কথা বলুন। ভালবাসার জোর। ওর যে বড় বিপদ!

    সবাইকে কাঁদিয়ে কনে বিদায় নিল। তারপর অতিথিরা, একের পর এক। ডেকরেটার্সের দল তখনই কিছু কিছু করে ঝাড়লন্ঠন, টুনিবালবের সজ্জা, বরের সিংহাসন, ভেলভেটের কানাত সব খুলতে শুরু করেছে। এই সময় আমি ওর হাত ধরে বললাম - চল।
    - কোথায়?
    - আমার বাইকের পেছনে ওঠ। তারপর বলছি, তোর সব কথা শুনব, আগে আমার সঙ্গে চল।

    ওকে নিয়ে গেলাম ওর ঘরের কাছে তিন কিলোমিটার দূরের ঘুটকু বলে ছোট্ট স্টেশনের ওয়েটিং রুমে। সেখানে বসে কথা শুরু হোল। প্রথম প্রথম মুখ খুলছিল না। বলছিল কোন লাভ নেই, অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু একটু একটু করে তারপর যেন বাঁধা ভেঙে কলকল করে বেরিয়ে এল এক আশ্চর্য কাহিনী, সহজে শেষ হবার নয়। ছোট স্টেশনের প্রায় ফাঁকা ওয়েটিং রুম, রাত বাড়ছে, কিছু কিছু লোকের অবাঞ্ছিত কৌতূহল বাড়ছে।

    তখন নিয়ে এলাম আমার বাড়িতে। রাত প্রায় এগারটা । মাকে বললাম - আজ ও সারারাত আমার ঘরে থাকবে, খুব জরুরি কথা এবং বোঝাপড়া বাকি আছে। দরজা বন্ধ থাকবে। তোমাদের ঘুমের ব্যাঘাত হবে না। ওর বাড়িতেও ফোনে জানিয়ে দেওয়া হল । আমি ফ্লাস্কে ছ’কাপ লাল চা ভরে কামরার দরজা বন্ধ করলাম।

    - নে, এবার খুলে বল; কিস্যু লুকোবি না।

    (৩) অরুণিমা

    কী হবে বলে! যখন আমার দরকার ছিল তখন তুমি এলে না। কোথায় ছিলে তোমরা?

    শোন, আমার তখন দিশেহারা অবস্থা, কারণ আমার শেষ আশ্রয় পিপলস কম্বাইন দলটা গেল ভেঙে। দলের ডায়রেক্টর ও আরেকজন মুম্বাই পাড়ি দিল, ভাগ্যপরীক্ষা করবে বলে। আমাকেও ডেকেছিল, রাজি হই নি। জবলপুরে কাজ পেলাম - একটা এইডস এর বিপদ নিয়ে প্রচারমূলক ফিল্মের নায়িকা। ভাল টাকা দেবে। প্রথম পাঁচ হাজার দিল, বলল তিন খেপে দেবে। শেষ দশহাজার ফিল্ম রিলীজ হলে বা বিক্রি হলে। আমার তখন তিনমাসের ভাড়া বাকি। রাজি হয়ে গেলাম। সাতদিন শ্যুটিং চলার পর টের পেলাম, ওরা ফেক; চাইছে এইডসের আড়ে ব্লু ফিল্ম বানাতে। ছেড়ে দিলাম।

    সেই সময়ই তোমার ফোন পেয়ে আমাকে খুঁজে বের করল সুমিত ভোজওয়ানি, তোমার পুরনো দলের বন্ধু । ভাল অভিনেতা। সেবার ‘চরণদাস চোর’ নাটকে আমি রাণী ফুলমতী আর ও পুলিশ। ওকে পেয়ে যেন হাতে স্বর্গ পেলাম। ও সব কথা শুনে আমাকে সাতদিনের মধ্যে ওর বন্ধুর বাবার ক্যুরিয়র সার্ভিসে কাজে লাগিয়ে দিল, শস্তায় ভাড়ার ঘর খুঁজে দিল। চারতলার উপরে খাড়া সিঁড়ি ভেঙে চড়তে হয়। গরমের দিনে ছাত আর দেয়াল তেতে আগুন, কলে জল ওঠে না। নীচের তলায় রাস্তার ওপারের টিউবওয়েল থেকে বালতিতে ভরে জল আনতে হয়। তা’ হোক গে! ভাড়া মাত্তর দেড় হাজার। একটা মানুষ, ওইটুকু কষ্ট আমার কাছে কিছুই নয়। মাসকাবারে মাইনে পাই দশহাজার। প্রতিমাসে বাবাকে দু’হাজার আর মাকে আলাদা করে পাঁচশ’ টাকা পাঠাই। বাবা খুশি হল, ‘লোকস্বর’ বলে যে বিলাসপুরের ট্যাবলয়েড পেপারে মাসে তিনহাজার টাকার জন্যে বারো ঘন্টা খেটে মরত, সেটা ছেড়ে দিল। মা’র সেলাইয়ের স্কুল, বালবাড়ি চলছিল মন্দ নয়। সুমিতের জন্য আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।

    কিন্তু ঝলমলে আকাশের কোণায় সিঁদুরে মেঘ ছিল, আমি দেখতে পাইনি।

    সুমিত ভাইয়া প্রথম দু’মাস আমার বাড়িভাড়া খাইখরচা চালিয়েছিল। বলেছিলাম এটা ধার নিচ্ছি, মাসে মাসে একহাজার করে পাঁচমাসে শোধ দেব। প্রথমে বলেছিল ঠিক আছে। তৃতীয় মাস থেকে যখন দিতে গেলাম ও নিল না। বলল, এত তাড়াহুড়োর কী আছে? তুই তো পালিয়ে যাচ্ছিস না। জুম্মা জুম্মা নোকরি লাগিস, থোড়কন রুক জা! মাত্র চাকরিটা পেয়েছিস, একটু থিতু হয়ে নে।

    তুমি তো জান, জবলপুর শহরের এই দিকটা মূল শহরের বাইরে, অর্ডিনান্স ফ্যাক্টরির কাছে। এই এরিয়াটা গড়ে উঠেছে মূলতঃ ওই অর্ডিনান্স ফ্যাক্টরির কর্মচারিদের কোয়ার্টার এইসব নিয়ে। সুমিত ভাইয়াও ওই ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, কোন টেকনিক্যাল কাজ, আর বিধবা মাকে নিয়ে একটা দু’কামরার সরকারি কোয়ার্টারে থাকে। আমার ঘর থেকে ক্যুরিয়র সার্ভিসের অফিসটা প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে আর সুমিত ভাইয়ার কোয়ার্টার চার কিলোমিটার। এদিক থেকে সময়মত যানবাহনের ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ লোক নিজের সাইকেল বা স্কুটারে যাতায়াত করে।
    আরও পড়ুন
    বাধা - Tanima Hazra
    আরও পড়ুন
    চুপির চর  - Abhyu
    আরও পড়ুন
    ইউরো ২০২০  - b



    সুমিত ভাইয়া খুব সাহায্য করছিল। রোজ নিজের স্কুটার চালিয়ে আধঘন্টা আগে আমার ঘরে এসে নিচের থেকে হর্ন বাজাতো , আমাকে বলত আগে থেকে তৈরি হয়ে থাকতে। আমি নিচে নেমে এসে ওর পেছনে বসে যেতাম, ও আগে আমাকে আমার অফিসে ছেড়ে তারপর ফ্যাক্টরিতে যেত। ফেরার সময় আমাকে ওর অপেক্ষায় থাকতে হত। ও ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে আমাকে পিক আপ করে ঘরে ছেড়ে তারপর নিজের কোয়ার্টারে ফিরত।

    শুরুতে বেশ ভাল লাগত, নাটকের পরিচয়ে একজনকে পেয়েছি; এই বিদেশ বিভুঁইয়ে আমার অভিভাবক। নো টেনশন! আমাকে বেশি খরচা করতে দেয় না। কখনও কোথাও পানিপুরি, চাট বা ছোলে ভাটুরে খেলে কিছুতেই আমাকে পয়সা দিতে দেয় না, রেগে যায়।বলে -বোকা মেয়ে! এখন পয়সা জমাতে থাক, পরে কাজে লাগবে।

    আমি আমার ভয় হতাশা সব কাটিয়ে উঠলাম। আবার হাসছিলাম, ঘরে গান গাইছিলাম, গলা সাধছিলাম। হার্মোনিয়ামটাও সুমিত ভাইয়া নিজের বাড়ি থেকে নিয়ে এসে আমার চারতলায় তুলে দিয়েছিল। একদিন সুমিত ভাইয়ার ফ্যাক্টরি থেকে আসতে দেরি হয়েছিল। খানিকক্ষণ পরে আমি আমার অফিসের সহকর্মী অবিনাশের সঙ্গে ওর স্কুটারের পেছনে বসে ঘরে ফিরলাম। বোধহয় ঘন্টাখানেকও কাটেনি। দরজায় দুম দুম ধাক্কা। এই সময় কে আসতে পারে! দরজা খুলে দু’পা পিছিয়ে এলাম । আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে সুমিত ভাইয়া। পর্দা সরিয়ে দেখে নিচ্ছে বাথরুম, রান্নাঘরের কোনা ও একচিলতে ব্যালকনি। তারপর আমাকে হিমশীতল গলায় জিজ্ঞেস করল - কই, ও কোথায়?

    - কওন? কিসকী বাত কর রহে হো ভাইয়া?

    উত্তরে ঠাস করে গালে একটা চড়, তার সঙ্গে অশ্লীল অভদ্র মুখভঙ্গী।

    -- ভাইয়া হোগা তেরা বাপ! ম্যায় তেরা কোই ভাইয়া নহী হুঁ। সেই লফঙ্গা কোথায়, আমাকে এড়িয়ে যার সঙ্গে তুই ঘরে ফিরেছিস?

    -- অবনীশ? ও তো আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে; ওপরে আসে নি।

    আমাকে বাড়িতেও কেউ গায়ে হাত তোলেনি। প্রচন্ড চড় খেয়ে আমার মাথা ঝিমঝিম করছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গায়ে লাগছে ওই ভাষা, কুৎসিৎ ইশারা ও অঙ্গভঙ্গী। এ কোন সুমিত ভাইয়া? লালচে চোখ, কপালে ঘাম, জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। ওর বুকের ভেতর থেকে একটা অজগর বেরিয়ে এসে কুতকুতে চোখে আমাকে দেখছে।

    হিসহিস করে বলল - থাকে কোথায় ছেলেটা?

    - আমি ঠিক জানি না, ভাইয়া।

    ফের একটা বিরাশি সিক্কার চড়।

    - শোন, আমি তোর কোন ভাইয়া দাদা কিস্যু না। আরেক দিন বললে ফের মার খাবি। আর শুনে নে, তুই আমাকে ছাড়া অন্য কারও স্কুটারের পেছনে উঠবি না। আমার আসতে দেরি হলেও না। কারো সঙ্গে ঢলে পড়বি না। নইলে পুঁতে ফেলব। তুই আমার, আর কারও না, এটা ভাল করে জেনে রাখ।

    এসব বলে দুম দুম করে চলে গেল। আর সেদিন থেকে শুরু হল আমার নরকযন্ত্রণা।

    পরের দিন অফিসে অবনীশ আমার সঙ্গে কথা বলছিল না। অন্য মেয়েদের থেকে জানতে পারলাম যে সুমিত ভাইয়া কাল রাতে খুঁজে খুঁজে ওর বাড়ি গেছে এবং ওকে আর ওর বাবামাকে বলে এসেছে যে ভাইয়ার সঙ্গে আমার নাকি মাঙ্গনি হয়ে গেছে, ছ’মাস বাদে বিয়ে হবে। ও যেন অফিসে বা অফিসের বাইরে আমাকে এড়িয়ে চলে, নইলে ঠ্যাঙানি খাবে।

    আমার লাইফ হেল হয়ে গেল। টের পেতাম, ও লুকিয়ে লুকিয়ে আমার অফিস আওয়ারে, লাঞ্চের সময় আমার অফিসের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, দেখছে আমি কার সঙ্গে কথা বলি, কারও সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ হচ্ছি কিনা। যদি কারও ওপর সন্দেহ হোল সেদিন আমার কপালে মার খাওয়া অবধারিত। ফেরার পথে চারতলায় উঠে দরজা বন্ধ করে আমাকে মারত, তারপর কাঁদত, মাপ চাইত, হারমোনিয়াম বের করে গান গাইতে বসত। আমায় ছড়ে যাওয়া হাত-পা জ্বলে যাওয়া গাল নিয়ে ওর সংগে বসে গলা মেলাতে হত। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। সবচেয়ে সহজ ছিল চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বিলাসপুরে বাবা-মা’র কাছে ফিরে যাওয়া। কতবার ভেবেছি। রেজিগনেশন লিখে আবার পরের দিন ছিঁড়ে ফেলেছি। কারণ আমার বাবা; বাপুকে আমি বড্ড ভালবাসি। আমাদের বড় কষ্ট করে বড় করেছে। এখন আমার চাকরির ভরসায় হাড়ভাঙা খাটনি থেকে রেহাই পেয়ে ঘরে বসে একটু আরামের স্বাদ পাচ্ছে। আমি ফিরে গেলে বাবাকে আবার --। তোমার ফোনের উত্তরে কাটা কাটা কথা বলতাম। ভাবতাম তোমার নিশ্চয়ই সন্দেহ হবে যে কিছু একটা গড়বড় হয়েছে, বুঝতে পারবে অরুণিমা ভাল নেই। তারপর তুমি জবলপুরে আসবে, আমার খোঁজ নিতে। নিজের নাটকের দলের সঙ্গে, ডায়রেক্টর লাড্ডু ভাইয়ার সঙ্গে দেখা করবে। আর সুমিত ভাইয়াকে পথে আনবে। কিন্তু তুমি বুঝতেই পারলে না।

    তুমি দুনিয়ার লোকের দুঃখ দুর করতে কোমর বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়, কিন্তু অরুণিমার বিপদ বুঝতে পারলে না। আরে, টেলিফোনে কীকরে এত কথা বলব? তোমার কথায় সুমিত ভাইয়া আমার কাছে এসেছে, ঘরদোর চাকরি সব করে দিয়েছে, একেবারে আমার মুশকিল আসান! তাই ওর বিরুদ্ধে কিছু বললে তুমি প্রথম দফায় বিশ্বাস করতে না। ওকে বলে দিতে আর আমি ঠ্যাঙানি খেতাম।

    বাবাকে ঘুরিয়ে বললাম - একা একা ভাল লাগছে না। এসে কয়েক মাস আমার কাছে কাটিয়ে যাও। কিন্তু বাবা কিছু কম যায় না। বিয়ে না হলে নাকি ঠিক ‘মেয়ের ঘর’বলা যায় না। কাজেই এল না; এলে হয়ত সুমিতের উৎপাত কিছু কম হত, আমি একটু শান্তি পেতাম, সেফ ফিল করতাম। তাই ছোটভাইকে নিয়ে এলাম।

    কিছুদিন ভালয় ভালয় কাটল। সুমিত ভাইয়া আর উপরে আসত না। ঘরের দোরগোড়ায় নামিয়ে দিয়ে নিচের থেকেই চলে যেত। আমি আসতে আসতে সংকোচ কাটিয়ে উঠছিলাম। তারপর দুটো ঘটনা ঘটল। গত মাসের এক তারিখ ছিল শনিবার। সেদিন সুমিত ভাইয়া আমাকে অফিস থেকে তুলে নিয়ে গেল একটা শাড়ির দোকানে। কাউন্টারে একগাদা সিল্কের শাড়ির থেকে একটা পছন্দ করতে বলল। একটা নীল রঙা পছন্দ করলাম। ও দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল — না, লাল রঙের থেকে দেখ। বিয়ের শাড়ি লালরঙের হয়। আমি ভয়ে ভয়ে একটা লালরঙের বেনারসীতে হাত ছোঁয়ালাম। ও বলল ট্রায়াল রুমে গিয়ে পরণেরটা বদলে এটাই পরে এস।

    তারপর আমাকে ওই অবস্থায় স্কুটারে করে ওর কোয়ার্টারে নিয়ে গেল। সন্ধ্যা নামছে্‌ রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠছে। ওদের ঘরের সামনে নেমে হাঁক পাড়ল – মা, আয়; দেখ কাকে নিয়ে এসেছি।

    ওর গলার আওয়াজ শুনে এক বৃদ্ধা, সামান্য ঝুঁকে পড়া বেরিয়ে এসে বললেন — কে এসেছে?

    সুমিত ভাইয়া ওর ডিকি থেকে বের করল একটা সিঁদূর কৌটো, তারপর এক খাবলা নিয়ে আমার কপালে আর সিঁথিতে ধেবড়ে দিয়ে বলল - তোর জন্য ঘরের বৌ এনেছি মা, বরণ করে ঘরে তোল।

    উনি এসে চিবুক ধরে মুখে চুক চুক করলেন। আমার চোখ বোঁজা, দু’গাল বেয়ে জল গড়াচ্ছে। সেটা দেখে হোক, বা যে জন্যেই হোক, উনি ওকে একটু কড়া সুরে বললেন - চমৎকার বউ হয়েছে। কিন্তু এভাবে হয় নাকি? আগে ওর বাবা-মা’র সঙ্গে কথা বলতে হবে। যাও, আজ ওকে ওর ঘরে ছেড়ে এস।

    আমি ওঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম।

    উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন - তোমরা কী জাত বেটি? কায়স্থ? আমরা কিন্তু কায়স্থ নই, দেখ যদি তোমার বাপ-মা রাজি হন।

    আমি বুঝতে পারছিলাম আমার আর কোন উপায় নেই। আমার নিয়তি আমাকে অজগরের সামনে ঠেলে দিয়েছে। অজগর তার দু’চোখের হিম চাউনিতে আমাকে অবশ করে ফেলেছে। আমাকে ওর কথায় উঠতে বসতে চলতে ফিরতে হবে। আমার শরীর আমার মন সব ক্রমশঃ ওর কব্জায় চলে যাচ্ছে।

    বাড়ি থেকে খবর এল আমার পরের বোন অজন্তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। মাসের প্রথমে আমাকে ও ভাইকে বিলাসপুর যেতে হবে, অন্ততঃ দশদিনের ছুটি নিয়ে। আমি খুশি, কিছুদিন অজগরের হিপনোটিজম থেকে রেহাই পাব। ভাইও খুশি, দিদির বিয়েতে বাড়ি গিয়ে হৈচৈ করবে। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। আমাদের প্যাকিং শুরু হয়ে গেল।

    এক রবিবারের বিকেলে ও এখানকার দুই বন্ধুকে আমার ঘরে নিয়ে এল। আমি মোড়ের দোকান থেকে গরম জিলিপি ও সিঙাড়া আনিয়ে নিলাম। গল্প-গান সব মিলিয়ে সন্ধ্যে জমজমাট। একটি ছেলে বেশ ভাল গায়। ঘরের দরজা খোলাই ছিল। হঠাৎ গান থেমে গেল। দরজার ফ্রেমে সুমিত ভাইয়ার ক্রুদ্ধ মূর্তি।

    এসেই আমার হাত চেপে ধরল, কী রে বলেছিলাম না, আর কারও সঙ্গে হাহা-হিহি চলবে না। আমি তোর জন্যে সিনেমার টিকিট কেটে এনেছি, আর তুই ঘরে দুটো জোয়ান ছোকরার সঙ্গে ঢলানি করছিস? ছিনাল!

    ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতভম্ব।

    আমি বললাম — কী বলছেন এসব? ওরা তো আমার ছোটভাইয়ের বন্ধু, আমায় দিদি বলে। সব চোদ্দ-পনের বছরের বাচ্চাছেলে।

    - বাচ্চাছেলে? সব জানা আছে। আখির মর্দ হ্যায় না? মেয়েদের কাছে এলে শরীর শক্ত হয় না?

    তারপর একটা থাপ্পড়, ঠিক আগেকার মত।

    আমার ছোটভাই রুখে দাঁড়াল। আমাদের সামনে আমার দিদিকে এভাবে বলতে পারেন না। কী করেছে আমার দিদি?

    - কী করেছে? জিজ্ঞেস কর। সেদিন ওর কপালে এবং সিঁথিতে সিঁদূর পরিয়েছি কিনা? আমার মায়ের সামনে? জিজ্ঞেস কর।

    ভাই আমার দিকে তাকাল। আমি অজগরের সামনে হিপনোটাইজড হরিণ, মাথা হেলিয়ে সায় দিলাম।

    তারপর সুমিত ভাইয়া হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল। তোমরা আমায় মাপ করে দাও। আমি খুব খারাপ, জঘন্য, ইতর। নিজের বৌয়ের সঙ্গে এমন নীচ ব্যবহার করলাম!

    দু’দিন পরে এমাসের শেষ অফিস যাওয়ার দিন। পরের দিন সকালে আমরা ভোরে বিলাসপুর যাওয়ার ট্রেন ধরব। বিকেলে ছাড়তে এসে সুমিত ভাইয়া স্কুটার থেকে আমাকে নামিয়ে বলা নেই, কওয়া নেই ঠাস ঠাস করে চারটে চড় কষাল। গলির মুখে লোক জড়ো হল, কয়েকজন এগিয়ে এল। ও নির্বিকার, সবাইকে ঠান্ডা গলায় শোনাল -- স্বামীস্ত্রীর ব্যাপারে নাক গলাবেন না।

    ভীড় সরে গেলে আমাকে বলল - এই জন্য মারলাম যেন বোনের বিয়েতে গিয়ে বেশি ঢলাঢলি না করিস।

    কাকে বলব এসব? শেষে বিলাসপুরে এসে এক ফাঁকে শুধু অজন্তাকে কিছুটা বলেছি, ব্যস্‌।

    (৪) বাবুমোশায়

    সুনীল তো অজগর সাপ আর মন্ত্রমুগ্ধ অবশ হরিণের গল্প শুনিয়ে খালাস, অবশ্য হরিণ নয় হরিণী। সুনীল ঢক ঢক করে জল খাচ্ছে। সবার কফি জুড়িয়ে জল। কাজেই আর এক রাউন্ড এসে গেল। আমি গলা ভিজিয়ে তৈরি হই, এবার আমার পালা। কিন্তু বাকিটা বলা আমার পক্ষে যে কতটা যন্ত্রণার --! যাকগে দুগগা বলে ঝুলে পড়ি।

    সেই যে সুনীল রাতভর অরুণিমার সংগে বোঝাপড়া করল (অবশ্য ওর ‘আই’ বা গর্ভধারিণীও সারারাত দু’চোখের পাতা এক করেন নি। আর দু’একবার পা টিপে টিপে দরজার গায়ে কান পেতে ওদের গলার আওয়াজ শুনে ফিরে গেছেন), তারপর সাত সকালে যুগলে আমার ঘরে হাজির। কিম্‌ কর্তব্যম্‌?

    আমার একটাই কথা। অরুকে জবলপুরের ওই অশুভ বাতাসের আবহাওয়া থেকে সরিয়ে আনতে হবে। চুলোয় যাক ওই চাকরি। এখানে নিজের বাড়িতে থেকে ওর আদ্দেক মাইনেয় পুষিয়ে যাবে। পাঁচ-ছ’হাজার মাইনের চাকরি বিলাসপুরে জুটে যাবে। দৈনিক পত্রিকায় কপি লেখা, কোন প্রাইভেট ইন্সটিট্যুশনের মার্কেটিং বা মোবাইল হ্যান্ডসেটের দোকানে সেলস ও অ্যাকাউন্ট সামলানো! ওসব আমরা ঠিক দেখে নেব। মেরে কেটে একমাসের বেশি ঘরে বসতে হবে না।

    অরুণিমা ফিরে যাক জবলপুরে, ভাল ব্যবহার করুক ওই অজগরের সঙ্গে, জেনে নিক আগামী মাসে কবে ওকে কোন বাইরের শহরে সরকারি ট্যুরে যেতে হচ্ছে। তারপর ও রওনা হয়ে গেলে আমরাও পৌঁছে যাব জবলপুর এবং পরেরদিন ভোর ভোর ওদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে বিলাসপুর রওনা দেব। তবে ওর বিলাসপুরের বাড়ির ঠিকানা ওই অজগর সুমিত জানে না। কোনভাবেই ওকে জানতে দেওয়া হবে না।

    এভাবেই তিন সপ্তাহের মাথায় ফোন এল, আজ সুমিত রওনা হয়ে গেছে কাটনি, পরশু সকালের ট্রেনে ফিরে আসবে। সময় বড় কম, মেয়েটা কেন আগে জানালো না?

    আমার যে বড় মুশকিল। কাল ব্যাংকে মুম্বাই থেকে ম্যানেজমেন্ট অডিট টিম আসছে। আজকে তার প্রিপারেটরি মিটিং! নাঃ ছুটি চাইলেও পাওয়া যাবেনা। সিক লীভের অ্যাপ্লিকেশন দিই? ধরা পড়ে যাব, জিএম আমার খাল খিঁচে নেবে। অথচ জবলপুর যাওয়ার ট্রেন ছাড়বে মাত্র দু’ঘন্টা পরে, সকাল দশটায়।

    আমি না গেলে হয় না? না, হয় না - সুনীলের স্পষ্ট অভিমত। অ্যাপ্লিকেশন লিখে আমার ক্লার্ককে দিয়ে বলি – লাঞ্চের পরে সাবমিট করতে। জানি, শেষ রক্ষা হবে না। এসে মেমো পাব। কোই বাত নহীঁ, অরুণিমার জন্য এ’টুকু করতে পারব না?

    -- পারতেই হবে, এটা অরুণিমার জীবনমরণের প্রশ্ন।

    কথাটা কে বলল? আমার ভেতরের থেকে কেউ। উঠে পড়ে দ্রুত দুদিনের জামাকাপড় একটা সাইড ব্যাগে ঠুসে দিই, আর একটা বই। স্নানের সময় গুনগুনিয়ে উঠি — ও তোর ভিতরে জাগিয়া কে যে!

    এখন মে মাসের শেষ, ট্রেনের কামরার বাইরে গরম হাওয়ার লু’ বইছে। স্লিপার কোচের জানলার কাঁচ তোলা যাবে না। রেক্সিনের গদি গায়ে ছ্যাঁকা দিচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। সামনের বার্থে অরুণিমার মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে লম্বা হয়েছেন। সঙ্গে ওনার তিন নম্বর মেয়ে। ও বকবক করছে - মা’র খুব সাহস। বলছে আমি যাচ্ছি মেয়েকে তুলে আনতে। আমার মেয়ে ঘরে ফিরবে, দেখি কে আটকায়?

    উল্টোদিকের লোয়ার বার্থে আমি ও সুনীল। জবলপুর স্টেশন আসবে সেই রাত দশটায়। আমরা গড়াই, উঠে বসি, কোন স্টেশন থেকে চা, কোথাও নুন লাগানো ঠান্ডা শসা, কামরার মধ্যেই চিনেবাদাম। সুনীল বাদামওলার নকল করে শোনায় — ফল্লী, টাইম পাস!

    এভাবেই যাত্রা শেষ হয়। জবলপুরে নেমে দেখি প্ল্যাটফর্মে অরুণিমার ভাই দাঁড়িয়ে। মাকে প্রনাম করে হাত থেকে ব্যাগ টেনে নিয়ে একটা বড় সড় রিজার্ভ করা টেম্পোতে তুলে দেয়। সামনে ও চলে ওর বন্ধুর সঙ্গে একটা বাইকে।

    আধ ঘন্টা; আমরা পৌঁছে গেলাম অরুণিমার চারতলার এককামরার আগুন গরম ফ্ল্যাটে। রান্না হয়ে গেছে। ওর ভাই আমার আর ওর মা’র জন্যে নীচের টিউবওয়েল থেকে বালতি ভরে ভরে চারতলায় জল টেনে তোলে। সুনীল রাস্তার টিউবওয়েলেই স্নান ষেরে নেয়।

    আঃ গা জুড়িয়ে গেল। আমরা ঘরের মেজেতে গোল হয়ে বসে খেতে শুরু করি। ডাল, ভিন্ডির শুখা তরকারি, পেঁয়াজ আর চারটে করে মোটা মোটা রুটি। খাওয়া শেষ, সবাই অস্বস্তিতে ভুগছে। অরুণিমা গম্ভীর। বলে, সবাই শুয়ে পড়ুন। ভোর সাড়ে পাঁচটায় ট্রেন এসে ছ’টায় ছাড়বে। আমাদের অন্ততঃ সাড়ে চারটেয় রওনা দিতে হবে, টেম্পো বুক করা আছে, ঠিক সময়ে এসে যাবে।

    সবাই চুপ। অরুর মা ও সুনীল আমার দিকে তাকায়। এবার কিছু করতে হবে। গলা খাঁকারি দিই।

    - তুই কি ভেবেছিস আমরা এই প্রচন্ড গরমে বারো ঘন্টা ট্রেন জার্নি করে এসেছি শুধু তোর চাঁদমুখ দেখে ফের সক্কালে ট্রেন ধরে বারো ঘন্টায় বিলাসপুরে ফিরে যাওয়ার জন্যে? আমরা যাব, কিন্তু তুইও সঙ্গে যাবি।

    অরুণিমা রাজি হয় না। নানা যুক্তি দেখায়। বলে ওই ক্যুরিয়র সার্ভিস ওর উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এভাবে আগাম না জানিয়ে যাওয়া যায় না। অফিসের চাবির গোছা ওর কাছে, ইত্যাদি।

    -- তোর কখনও জ্বর হয়নি? তখন কী করিস?
    --‘আমি দিদির অ্যাপ্লিকেশন আর চাবির গোছা নিয়ে অফিসে পৌঁছে দিই’। ছোট ভাই বলে ওঠে।
    - সাবাশ! কাল তোর জ্বর হবে। পরশু বিলাসপুর থেকে টেলিগ্রাম করে জানাবি, চেক আপ করাচ্ছিস। সাতদিন পরে অফিসে ফিরে যাচ্ছিস। চিন্তার কারণ নেই।

    অরুণিমা মানে না। বলে এখানে আমি ভাল আছি, বিলাসপুরে ফিরে গিয়ে কী করব?

    -- শোন, তুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে। জোর করব না। কিন্তু এখানে সুমিত তোকে জাদু করেছে, কালা জাদু, ব্ল্যাক ম্যাজিক। আমি বাঙালি, এসব লক্ষণ চিনি। তুই এখানে পরিষ্কার ভাবে চিন্তা করতে পারছিস না। একবার ঘরে ফিরে একসপ্তাহ গুছিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভেবে নে। তারপরও যদি মনে হয় যে তোর জবলপুরেই থাকতে হবে, এই চাকরিটাই করতে হবে—তাহলে বাধা দেব না। আমরাই পৌঁছে দিয়ে যাব। কিন্তু আগে বিলাসপুর ও জবলপুরের মহিলা থানায় ডায়েরি করে তবে, যাতে তোকে কেউ বিরক্ত করতে না পারে। করলে সে লোক অ্যারেস্ট হবে, সরকারি চাকরি খোয়াবে। এবার ভেবে দেখ।

    সকাল বেলা আমরা সবাই আগেভাগে স্টেশনে পৌঁছে জানলাম ট্রেন এক ঘন্টা লেট। আমাদের আক্কেল গুড়ুম। উলটো দিকের প্ল্যাটফর্মে সুমিতের ফেরার ট্রেন আসবে, ওটা রাইট টাইম। আমাদের ট্রেন দেড়ঘন্টা লেট। এসব করে যখন দশ মিনিটে ইন করার ঘোষণা হোল, তখন উলটো দিকে সুমিতের ট্রেন এসে গেছে। আমি আর সুনীল প্ল্যাটফর্মের অন্য মাথায় চলে যাই, ইঞ্জিনেরও আগে। এদিকে অরুণিমার মা মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে আঁচল দিয়ে ওকে ঢেকে রাখেন, দেহাতি মহিলাদের মত। সামনের ট্রেন চলে যায় , যাত্রীরা বেরিয়ে যায়। আমাদের ট্রেন ঢুকছে। আমরা ফিরে আসি। অরুণিমা থরথর করে কাঁপছে। আমরা স্লীপার কোচে উঠে জানলা বন্ধ করি, কুড়ি মিনিট দাঁড়াবে । অরুণিমা আপার বার্থে উঠে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ে।

    ট্রেন ছাড়ে, দু’ঘন্টা পরে কাটনি জংশন। আমরা হাসি, আমরা মিষ্টি কিনি। সামোসা কিনি। মাটির ভাঁড়ে চা খাই। অরুণিমাকে জোর করে নীচে নামিয়ে জানলার ধারে বসিয়ে দিই, ওর মুখের চেহারা এখনও ফ্যাকাশে। বলে সুমিতকে দেখেছি, একটা স্যুটকেস হাতে ওভারব্রীজ পার হচ্ছে, আমাদের দেখতে পায় নি।

    আমি বলি, আর পাবেও না।

    দুটো দিন কেটে গেছে। অফিসে আমি একটা শো-কজ পেয়েছি, রিপ্লাই দেব সাতদিনের মধ্যে। বেলা সাড়ে আটটা, সবে সকালের দু’নম্বর চায়ে চুমুক দিয়েছি কি সুনীল এসে হাজির। সুমিত এসেছে, আপনাকে ডাকছে, চলুন। কি গেরো! আজ অফিসে লেট হলে চলবে না।

    কোথায়?

    আমাদের ডেইলী নীডসের দোকানে।

    গিয়ে দেখি দোকানে সামনে একটা চেয়ার লাগিয়ে পা লম্বা করে বসে আছে সুমিত, বোঁজা চোখ, একটা টুপি দিয়ে মুখটা প্রায় ঢাকা।

    -- কী ব্যাপার?
    - আপনারা সেদিন অরুণিমাকে জোর করে তুলে এনেছেন! ভাল করেন নি।
    - এক মিনিট! অরুণিমা ওর মায়ের সঙ্গে স্বেচ্ছায় এসেছে। জোর করার প্রশ্নই ওঠেনা। আমরা সঙ্গে ছিলাম, এই পর্য্যন্ত।
    - আমি সত্যি কথাটা অরুর মুখেই শুনতে চাই। ওর অ্যাড্রেস দিন বা বাড়ি নিয়ে চলুন।
    - হবে না, মানা আছে।
    - কার মানা?
    - ওর মায়ের, ব্যস্‌।
    - এসব চালাকি! ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই।
    - ফোন করে নাও। আমরা ওর বাড়ি নিয়ে যাব না, ঠিকানাও দেব না।
    - ফোন লাগছে না, বন্ধ হয়ে গেছে।
    - তার আমি কী করব?
    - আপনারা ওকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিডন্যাপ করে এনে কোথাও আটকে রেখেছেন।
    - থানায় গিয়ে ডায়েরি কর, টের পাবে থানার লোকজনের হাত নিশপিশ করছে। ওরা জানে তুমি কতবার কার কার সামনে অরুণিমার গায়ে হাত তুলেছ, ফলে জেলে যাবে, চাকরিটিও খোয়াবে।
    - আপনারা কিস্যু জানেন না। ও জবলপুরে আজেবাজে লোকের খপ্পরে পড়ে ছিল। আমি গিয়ে ওকে বাঁচিয়ে আনি, শেলটার দিই, টাকা দিয়ে সাহায্য করি। ধার নয়, সাহায্য।
    - বেশ করেছ, একসঙ্গে নাটকের দলে কাজ করলে ওরকম সবাই করে। তুমি কি ওকে কিনে নিয়েছ নাকি?
    - ওর স্বভাব ভাল নয়। ল্যাঙড়া বলে একটা লোকের সংগে কিছুদিন ছিল।

    আমি হাত তুলে থামাই।

    - তুমি কি ওর গুরুঠাকুর? আমাদের দলে আমরা কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাই না, ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট বিলি করি না। তুমি বাছা সুনীলের এখানে খাও দাও আর বিকেলের ট্রেন ধরে জবলপুর ফিরে যাও। আমি চলি, অফিসের টাইম হচ্ছে।

    আমি উঠে দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ওঠার আগে একটা আর্তনাদ শুনে চমকে উঠি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সুমিত মাটিতে শুয়ে সুনীলের পা জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদছে।

    -ওরে, একবার ওর সঙ্গে দেখা করিয়ে দে। আমি একবারটি দেখতে চাই। ওর মুখে শুনতে চাই। ওরে, নিজের বাচ্চার মত করে ওর দেখাশোনা করেছি, দু’বছর ধরে -- একবারটি দেখা করিয়ে দে!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • syandi | 45.250.246.239 | ০৯ আগস্ট ২০২১ ২৩:২৯734828
  • এটা কি এখানেই শেষ হয়ে গেল? 

  • Ranjan Roy | ১০ আগস্ট ২০২১ ১০:২৩734831
  • @স্যান্ডি, 


    হ্যাঁ। গলপের  গোড়াতেই বলে দিয়েছি যে অরুণিমা(নাম পরিবর্তিত) এখন বিলাসপুরের একটি মোবাইল বিক্রির শপে কাউন্টার ও অ্যাকাউন্টস সামলচ্ছে, পরিবারের বড় মেয়ের দায়িত্ব পালন করছে। গল্প শেষ। 


    কিন্তু গল্প হিসেবে যদি না দাঁড়ায় তাহলে নিঃসন্দেহে বলতে পারেন, উপকৃত হব।


    রিয়েল লাইফেঃ


    তারপর  কেটে গেছে ঠিক কুড়িটি বছর।  এরমধ্যে অরুণিমা অনেক পথ হেঁটেছে। দুটো টিভি চ্যানেলের সফল স্ট্রিংগার থেকে আকাশবাণীতে ক্যাজুয়াল অ্যানাউন্সার ইত্যাদি। তারপর বিয়ে করে  অন্য কমিউনিটিতে। চলে যায় ছত্তিশগড়ের রাজধানীতে। চাকরি ছেড়ে ক্যান্সারে টার্মিনাল স্টেজের শ্বশুর শাশুড়ির দায়িত্ব সামলায়। ওঁরা প্রয়াত হলে আবার টিভি চ্যানেলের কাজ ইত্যাদি করতে করতে  আর্থিক সাফল্যের মুখ দেখে। এখন তিন সন্তানের মা। তাদের ও প্রাইমারি স্তর পর্য্যন্ত ফরমাল স্কুলে না পাঠিয়ে ঘরে পড়ায়, নাচ গান শেখায়। এখন স্কুলে দিয়েছে। আবার আমাদের নাটকের দলের রায়পুর শাখা খুলেছে। ওখানে পুণের সঙ্গে যোগাযোগে রায়পুরে শর্ট ফিল্ম মেকিং এর ওয়ার্কশপ, নাটকের ওয়ার্কশপ সব চালিয়ে যাচ্ছে। করোনা ও লক ডাউনের মাঝেও অনলাইন প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করছে।


    ওর জীবনসঙ্গী নাটকের লোক নয়, কিন্তু অরুণিমার এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে কোন ঝামেলা করেনা, বরং গর্বিত।


    সুনীল বিয়ে করেছে জবলপুর শহরে। তাতে অরুণিমা ওখানে গিয়ে সক্রিয় দায়িত্ব পালন করেছিল, সুমিতের চোখের সামনে। হ্যাঁ, সুমিতের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। বিলাসপুরে সুনীলের ফটো স্টুডিওর বেশ নাম। নাটকের দল আর্থিক দিক দিয়ে সফল। সেদিনের  একটি জুম অনুষ্ঠানে ৪৩ জন ছিল, তাতে ১১ জন মেয়ে ও ৩২ জন ছেলে। সেদিন ডিসিশন নিয়ে দল পরিচালনার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভাবে নতুন জেনারেশনের ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সুনীল থেকে সুরু করে আমরা সবাই কেবল পরামর্শদাতা কমিটি! ঃ)))

  • syandi | 45.250.246.239 | ১২ আগস্ট ২০২১ ২৩:৪৭734863
  • আরে না রঞ্জনদা, আসলে আপনি তো অনেক বড় বড় গল্প লিখে থাকেন এবং সেগুলো সিরিজ আকারে আসে। এজন্যই এই বেয়াড়া জিজ্ঞাসা। পাঠক হিসাবে গল্পটি জীবন থেকে তুলে আনা বলেই মনে হয়েছিল  এবং আপনার উপরের পোস্টটা দেখে সেসম্পর্কে নিশ্চিতও হলাম।  

  • 4z | 184.145.34.178 | ১৩ আগস্ট ২০২১ ০০:২৪734864
  • রঞ্জনদা কি এই গল্পটা আগে কোথাও লিখেছিলেন? গুরুর পাতাতেই কি? খুব চেনা লাগছে। 

  • Ranjan Roy | ১৩ আগস্ট ২০২১ ০৯:১১734865
  • 4z


    ঠিক বলেছেন।  কাহিনীটি এক। কিন্ত গল্পটা আলাদা। সেবার ওটা খালি ঘটনার  গ্রাফিক বর্ণনা হয়েছিল,  গল্প হয়নি। লেখার ব্যাপারে আমার অন্যতম মেন্টর দময়ন্তী সঠিক সমালোচনা করেছিল। এতদিন বাদে নতুন করে আবার চেষ্টা করলাম আর কি:)))

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
    • কি, কেন, ইত্যাদি
    • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
    • আমাদের কথা
    • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
    • বুলবুলভাজা
    • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
    • হরিদাস পালেরা
    • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
    • টইপত্তর
    • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
    • ভাটিয়া৯
    • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
    গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন