• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • অর্চনা গুহ মামলা: বিশ্বাসঘাতকতার বিপ্রতীপে বৃষ্টিদিন

    Tapas Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৭ মার্চ ২০২১ | ৬৫৫ বার পঠিত | ৪ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • সেভেন্থ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে অর্চনা মামলায় নিজে সওয়াল করার সপক্ষে সৌমেনদা যে যু্ক্তি দিয়েছিলেন, তার অন্যতম ছিল - নিজের আইনজীবীদের উপর আস্থা হারানো। প্রত্যয়ের সঙ্গে বলা চলে, আইনজীবীদের বিশ্বাসঘাতকতা না ঘটলে, এই মামলায় রুণুরা সত্যিই জেলে যেতে পারত। 


    সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যেদিন মামলার শুনানি শুরু হল, তখন অর্চনাদির ডিপোজিশন চলছে। ডিপোজিশনে অর্চনাদিকে প্রশ্ন করছেন, বিশিষ্ট সিনিয়র আইনজীবী। ভঙ্গিটা এরকম- কাঠগড়ায় অর্চনাদি, লইয়ারের সামনে টেবিল, এজলাশে যেমন হয়, তিনি দাঁড়িয়ে, একটা পা পিছনের চেয়ারে তোলা। ঠিকই পড়লেন। একটা পা পিছনের চেয়ারে তোলা, আশ্চর্য সে ভঙ্গি। আর তিনি একটা কাঠি দিয়ে কান চুলকোতে চুলকোতে নিজের মক্কেলকে প্রশ্ন করছেন। এটা একদিনের ঘটনা নয়, সে আইনজীবী ডিপোজিশন চলাকালীন এরকম ভঙ্গিতেই সওয়াল চালিয়ে গিয়েছেন। সে সব ডিপোজিশন পর্ব অতি স্বল্পস্থায়ীই হত। মনে রাখতে হবে, এই মামলার জন্য অর্চনাদি বিদেশ থেকে এখানে আসতেন। এসে থাকতেন কোনও আত্মীয়ের বাড়ি। এই পর্যায়ে মূলত জপুরের বাড়িতেই।  


    কান চুলকোনো সেই আইনজীবী অমিয় চক্রবর্তী। পরবর্তীকালে, অমিয়র সওয়াল শুনে একদিন সন্ধেবেলা সুকিয়া স্ট্রিটে গিয়ে বলেছিলাম, অমিয় টাকা খেয়েছে। কালধ্বনির দফতর তথা আড্ডাখানা, সুকিয়া স্ট্রিট। প্রশান্তদা রাগ করেছিলেন। প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায়, বহু বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে চলা কালধ্বনি পত্রিকার সম্পাদক। বলেছিলেন, এরকম কেন বলছিস। তুই কী করে এরকম বলতে পারিস! সে অর্থে দেওয়ার মত উত্তর ছিল না; আমি আইনজ্ঞও নই যে ল পয়েন্ট ধরে বলতে পারব। তবে সৌমেনদা নিজের আইনজীবীদের উপর অনাস্থা ব্যক্ত করার পর, নিজে সওয়াল শুরু করার পর, এই মামলাতেই, রুণুর পক্ষে চলে গিয়েছিল অমিয়। গোপনে নয়, প্রকাশ্যে। রুণুর হয়ে আদালতে আসত, জেরা করত, বিষ্টু ঘোষকে পয়েন্ট জোগাত। এই মামলা বিশ্বাসঘাতকতার। 


    অর্চনাদি লক আপ টর্চারে পঙ্গুত্ব অর্জন করেছিলেন। তাঁর শরীরের নিম্নাঙ্গে পক্ষাঘাত হয়েছিল। বেশ কিছু বিদেশি সংস্থা, অর্চনা গুহর কথা জানাজানি হবার পর এগিয়ে আসে। অর্চনাদিকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় তাদের তরফে। ডেনমার্কে সে সময়ে অর্চনাদির ফিজিওথেরাপি যিনি করতেন, তাঁর নাম পিয়া জনসন বা জেনসেন। পিয়ার সঙ্গে অর্চনাদির বিয়ে হয়েছিল। 


    অর্চনা গুহর ঘটনা নিয়ে একটা উপন্যাস আছে। ডোন্ট কল মি আ ভিক্টিম! আমাজনে দেখলাম দু হাজার টাকার বেশি দাম।  ওই কারণেই পড়া হয়ে ওঠেনি, উঠবেও না কদাপি। 


    ম্যাজিস্ট্রেটের বিধান ছিল, সৌমেনদা কেন সওয়াল করার অধিকারী, তা সওয়ালের মাধ্যমেই সৌমেনদাকে বলতে হবে। সেদিন ভয়াবহ বৃষ্টি ছিল। সে মারাত্মক বৃষ্টি। কুষ্টিয়ার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি ডাকতে গিয়ে পাচ্ছিই না। পিকনিক গার্ডেন পর্যন্ত চলে গেলাম। অত জলে কেউ ডালহৌসি যেতে রাজিই হয় না। অনেক বেশি টাকা চাইছিল একজন। শেষ পর্যন্ত তাকেই নিয়ে যাওয়া হল। ডিকিতে বই, পায়ের কাছে বই। সাইটেশনের জন্য। বই একটা ব্যাপার হয়ে উঠবে, আরও পরে, এই মামলায়। সে পরেরই কথা। 


    সেদিন সৌমেনদা প্রায় তিন ঘণ্টা সওয়াল করেছিলেন। ফাঁকা, প্রায় সম্পূর্ণ ফাঁকা একটা এজলাশে, বৃষ্টিবিধৌত শহর কলকাতার এক খুপরি বিচারশালায়, সেদিন ইতিহাস রচিত হল। সৌমেনদা সওয়াল করলেন, কেন তিনিই এ মামলার সওয়ালের যোগ্যতম ব্যক্তি। তিনিই এই মামলার প্রথম দিন থেকে রয়েছেন, সমস্ত নথি আগা থেকে গোড়া তিনিই দেখেছেন, উকিল পাল্টেছে, অর্চনাদি বিদেশে থেকেছেন পরিবার ও অসুস্থতা সঙ্গী করে। সৌমেনদা বলেছিলেন, আইনজীবীদের উপর তিনি আস্থা হারিয়েছেন। এরকম ঘটনা আরও ঘটেছে নিশ্চয়ই, পৃথিবীর ইতিহাসে, ভারতের ইতিহাসে, কিন্তু এত বড়, এত খ্যাত একটা মামলার ভার সম্পূর্ণ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার পিছনে যে অপরিসীম স্পর্ধা ছিল, তা বাংলা ভাষার কোনও ইতিহাসে লিখিত নেই। 


    সৌমেন গুহর কাছে, লতিকা গুহর কাছে, সৌমেনদা-লতিকাদির পালিতা কন্যা মীনার কাছে, এই অস্বীকৃতির কারণে অপরাধী থাকতে হবে। কিন্তু অপরাধী কেউ নয়, কারণ এই দায়টুকুও কেউ ওন আপ করেনি। 


    এ কথাগুলো না লিখলেও হত। সৌমেনদা এমনিতে লোকসমক্ষে সিভিল রাইটস, হিউম্যান রাইটস- এসব শব্দবন্ধ ব্যবহারে একটা কস্টিক অ্যাটিচিউড দেখাতেন। তবে একদিন, একবার বলেছিলেন, শোন তাপস, হিউম্যান রাইটস কোনওদিন তুমি করতে পারবে না, যতদিন না তুমি এমপ্যাথেটিক হতে পারবে। সিমপ্যাথি নয়, এমপ্যাথি। 


    সেই কথাটা মনে পড়ে।


  • বিভাগ : ব্লগ | ২৭ মার্চ ২০২১ | ৬৫৫ বার পঠিত | ৪ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 14.139.196.12 | ২৭ মার্চ ২০২১ ১৯:৩০104141
  •  আরো কিস্তি আসবে তো? 

  • Kausik Banerjee | ২৭ মার্চ ২০২১ ২২:৫৭104151
  • এই বিখ্যাত মামলার শুনানী শোনার কৌতূহল নিয়ে আশির দশকে একবার  বন্ধুদের সঙ্গে একটি আদালত প্রাঙ্গনে গেছিলাম মনে পড়ে। তবে সেদিন কোনো কারণে যতক্ষণ উপস্থিত  ছিলাম, শুনানী শুরু হয় নি - এমনটা মনে পড়ে।

  • Tapas Das | ২৮ মার্চ ২০২১ ১০:২১104167
  • চেষ্টা করব কিস্তিতে কিস্ততে লেখার। 


    এটা ৯ এর দশকের বিবরণী; সুপ্রিম কোর্ট যখন বলেছিল, ডেইলি বেসিসে লোয়ার কোর্টে মামলার শুনানি সম্পূর্ণ করতে হবে। 

  • aranya | 2601:84:4600:5410:2c03:b288:50b4:4ff6 | ২৯ মার্চ ২০২১ ০৬:২৫104177
  • পড়ছি 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন