• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • ফেরারি ফৌজ : ৩য় পর্ব

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৪ নভেম্বর ২০২০ | ৩১৮ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • আস্তে আস্তে ওর মুখের চেহারা স্বাভাবিক হয়।
    আমি হাসি। ওর দুই কাঁধে হাত রাখি। তারপর বলি-- কী রে শালা লম্বু! তাম্বু মে বাম্বু?
    বৌদি বলেন-- কী বললেন?
    -- কিছু না, তুমি যাও। একটু কড়া করে কফি বানিয়ে আন।
    তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে --আমার বৌয়ের সামনে বলিস না।
    অমন হাইটের শংকর, কিন্তু ওর বাবা বীরেশবাবু ছিলেন মেরেকেটে পাঁচ দুই। তাই ভিড়ের মধ্যে চোখে পড়তেন না।
    একদিন লম্বু অরবিন্দনগরের আড্ডায় অনুযোগ করল--রমেন, তোর ব্যবহারে বাবা দুঃখ পেয়েছে রে! বলেছে রমেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগ্রেট খায়, আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু আমাকে দেখে একটু আড়াল করলেও তো পারে! লুকোনোর চেষ্টাও নেই, ফুকফুক করে ধোঁয়া ছেড়েই চলে।
    -- কী করব বল? তোর বাবা যে ভিড়ের মধ্যে চোখে পড়ে না।
    সবাই হেসে ওঠে। শংকর অস্বস্তি লুকোয়।

    -- তারপর? এদ্দিনবাদে? কী মনে করে?
    -- কিছু না, দেখতে এলাম তোরা সব কেমন আছিস।
    শংকর অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
    ---সবাই যেমন থাকে, তাই। আলাদা করে কী আর থাকবো?
    --- মেশোমশায় মাসিমা দুজনেই?
    -- আর কুসুমদি? তোর দিদি?
    শংকর আমার দিকে দশ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে, আমি চোখ সরাই না। তারপর দুজনেই হেসে ফেলি।

    সেই ষাটের দশকের শেষপাদে এই পানাপুকুর-বাঁশঝাড়-আমবাগান-শেয়ালডাকা কলোনিতে কুসুমদি হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছিল। গোঁড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে কুসুমদি পাড়ার উঠতি নায়িকা। ওর জন্যে ছেলেছোকরার দল নিজেদের মধ্যে মারপিট করে মরত। কুসুমদি সবাইকে অকাতরে প্রশ্রয় দিত।ওর চোখ কথা বলত, ওর হাসিতে এক মাদক গন্ধ টের পাওয়া যেত। শংকরকে ডাকতে কখনও অসময়ে ওর বাড়ি যেতাম না। কুসুমদির মুখোমুখি হতে চাইতাম না। মনের অগোচরে পাপ নেই, বন্ধুর দিদি যে!
    কুসুমদির বাস্তববুদ্ধি প্রখর ছিল। সামান্য বয়েস হতেই ও পাড়ারই নতুন সরকারি চাকরি পাওয়া একটু বোকাসোকা ছেলেটার সঙ্গে ইলোপ করে বোম্বে টোম্বে ঘুরে মালাবদল করে হাজির হল। সামাজিক মতে বিয়েটা হয়ে গেল। কিন্তু মেসোমশায় কেমন যেন নুয়ে পড়লেন।
    আর পাড়ার হিংসুটে ছেলেগুলোর জ্বালায় জামাইবাবু এ'পাড়া ছেড়ে ভবানীপুরে ভাড়াবাড়িতে উঠে গেলেন।
    তারপর শংকর একদিন আমাকে একলা ডেকে একগাদা চিঠিপত্র পড়তে দিল। নীল গোলাপি সাদা কাগজে লেখা অজস্র প্রেমপত্র। বলল দিদির ড্রয়ার পরিষ্কার করতে গিয়ে পেয়েছে, বাবা মাকে দেখায় নি। পুড়িয়ে ফেলার আগে শুধু বন্ধু রমেনকে পড়তে দিয়েছে।
    আমি অবাক। কি সব গদগদ ভাষা! হাস্যকর। কিন্তু তারচেয়েও অবাক হলাম লেখকদের নাম দেখে। সবাইকে চিনি না। অনেককেই চিনি। সব বয়সের লোকজন রয়েছে। ছোটভাই থেকে কাকার বয়েসি। কিন্তু বুকে ধক করে লাগল একজনের চিঠি দেখে, উনি আমার একজন শ্রদ্ধেয় স্থানীয় কমরেড।

    আমার মাথায় কেমন দুষ্টুবুদ্ধি খেলে যায়।
    --হ্যাঁ রে শংকর! এই চিঠিগুলো সত্যি পুড়িয়ে ফেলবি তো?
    -- মানে? মিথ্যে পোড়ানো আবার কিছু হয় নাকি!
    --- না, না! হয়ত তুই এগুলো যত্ন করে রেখে দিলি। আর কুসুমদিকে জানিয়ে দিলি যে ওগুলো তোর হেফাজতে সযত্নে রক্ষিত রয়েছে।
    --ধ্যেৎ, কেন এসব বলতে যাব?
    -- আজ না, ধর বেশ কিছুদিন বাদে কায়দা করে বলবি।
    -- তোর কথার মাথামুন্ডু কিস্যু বুঝতে পারছি না।
    -- মানে কুসুমদি এখন বিবাহিত, সুখের সংসার। বেশ প্রেমের -জোয়ারে ভাসালে- দোহারে গোছের ব্যাপার। কিন্তু ওই চিঠিগুলো যদি তোর জামাইবাবুর হাতে পড়ে!
    -- কেন পড়বে? কী যা তা বলছিস?
    -- যাতে কোনদিন না পড়ে তার জন্যে কুসুমদি হয়ত তোকে বাড়ির ভাগ ছেড়ে দিতে পারে।

    ওর চোখের রং মরা মাছের মত। অনেক কষ্টে শ্বাস টেনে বলে-- তোর মন এত নোংরা! তুই আমার সম্বন্ধে এসব ভাবতে পারলি? আমি দিদিকে ব্ল্যাকমেল করব?
    -- দূর বলদা! ইয়ার্কি মারছিলাম।
    -- এমন ইয়ার্কি! কাল থেকে আমার বাড়িতে আর আসিস না রমেন।

    'কিন্তু প্রথম যৌবনের বন্ধুত্ব অনেক উদার হয়। শংকর রমেনকে মাপ করে দিয়েছিল। এত বছর বাদে সেই কথাটা শংকরের আদৌ মনে আছে কি?
    ---- প্রোমোটারকে পুরনো বাড়ি ভেঙে বহুতল তুলতে দিয়ে ক'টা ফ্ল্যাট পেলি?
    --- দুটো; আমার দুই মেয়ে যে! আর কিছু টাকা। সেটা দিদিকে দিয়ে দিয়েছি।
    রমেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।সিগ্রেট ধরায়। শংকর হাত বাড়াচ্ছিল --কিন্তু শিকারী বাজের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ওর স্ত্রী।
    ---প্লীজ, প্লীজ রমেনদা! ওকে দেবেন না। আমি হাত জোড় করছি, ওর অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হয়ে গেছে।
    রমেন থতমত খায়, শংকর যেন চুরির দায়ে ধরা পড়েছে।
    খানিকক্ষণ কারো মুখেই কথা জোগায় না।
    রমেন কিছু খেজুরে করার চেষ্টা করে। তার আগে দেখে নেয় বৌদি নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছেন কি না!
    --হ্যাঁরে শালা, তোর সম্বন্ধে কিছু মজার গল্প শুনেছিলাম। সত্যি নাকি? আরে বল না! বৌদি রান্নাঘরে।
    কোন গল্প? শংকরের চোখ নেচে ওঠে।
    -- আরে তোকে নাকি সিপিএম এর অ্যাকশন স্কোয়াড তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, মার্ডার করবে বলে। কিন্তু তুই নাকি ল্যাম্পপোস্ট আঁকড়ে ধরে বেঁচে গেছলি? সত্যি? জায়গাটা কোথায়?
    --শালা! মাজাকি হচ্ছে? আমাকে মার্ডার করবে বলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে সেটা তোর কাছে মজার ব্যাপার? চুতিয়া কোথাকার !তুই শালা হারামির হাতবাক্স!
    -- রেগে যাস না! তোর মত লম্বুকে নিয়ে যাচ্ছে চ্যাংদোলা করে? ভাবলেই হাসি পায়।
    -- আমার সব তাতেই তোর হাসি পায়! পাবলিকলি আওয়াজ দিস, তুই আমার কিরকম বন্ধু রে?
    --- অ্যাই, ফালতু কথা বলবি না, পাবলিকলি তোকে কোথায় আওয়াজ দিয়েছি? সে তো খগেনমাস্টারের মালকে সবার সামনে 'বৌদি' বলে ডেকেছিলাম। তারপর সে কী কিচ্যেন!
    -- ধ্যেৎ, সেসব ছেলেমানুষি এখনও মনে করে রেখেছিস? কাজটা ঠিক করিস নি।
    -- বেঠিক কী করেছি? তুই বালের কিচ্ছু জানতিস না। মাস্টার কোচিং চালাতে চালাতে ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিল, ভেবেছিল শিবের বাবাও জানতে পারবে না।এদিকে মেয়েটার নীচের তলায় ভাড়াটে এসে গেছল। নবারুণ সংঘের ভলিবল মাঠে এসে আমাদের কাছে কেঁদে পড়ল। বাঙাল মেয়ে, বাবা-মা পাকিস্তানে; এখানে মামার বাড়িতে ঝি ছাড়িয়ে দিয়েছে।
    বলল-- আপনাগো দাদা কইত্যাছি-- বইনের ইজ্জত রাখেন। আমি খগেন মাস্টারমশায়ের সঙ্গে প্র্যাম করছি, সর্বস্ব দিয়া। আগে কইছিল বিয়া করব, আর এখন হারামজাদা খালি কথা ঘোরায়!
    তুই তখন ধূপগুড়ি না রাজাভাতখাওয়া কোথায় যেন মেশোর বাড়িতে মাংস ভাত সাঁটাতে গেছলি। সেদিন খালি আমি আর বিমল ছিলাম। ঠিক হল সবার সামনে খগামাস্টারের মুখোস খুলে দিতে হবে। মেয়েটা রাজি হল। কিচ্যেন হল। তারপর খগা বিয়ে করতে বাধ্য হল। এবার বল!

    -- কী আর বলব! হ্যাঁ, ছ'টা ছেলে আমাকে অরবিন্দনগরের দোকান থেকে গলায় ন্যাপলা ঠেকিয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, আমি বুঝলাম যে এখান থেকে নিয়ে বাঁশঝাড়টা পেরিয়ে পদ্মপুকুরের মাঠে নিয়ে ফেলতে পারলেই আমি খাল্লাস! শীতের সন্ধ্যে, কোন শালা জানতেও পারবে না। পরের দিন সকালে কাক-চিল ঠুকরে চোখ তুলে নেবে।
    কাশির দমকে ওর কথা বন্ধ হয়ে যায়। আমি জলের গেলাস এগিয়ে দিই। ইশারা করি নীচু গলায় আস্তে আস্তে বলতে।
    -- না, ওসব ল্যাম্পপোস্ট আঁকড়ে বেঁচে যাইনি। ওসব তোর জাতের যত ছ্যাবলা বন্ধুদের তৈরি চুটকি।
    -- তারপর?
    -- বেঁচে গেলাম বরাতজোরে। সেইসময় সুবীরদা অফিস ফেরত ছ'নম্বর বাস স্টপ থেকে হেঁটে ফিরছিল। ব্যাপারটা দেখে আন্দাজ করে জোর গলায় বলল-- শংকর না? কী ব্যাপার রে? এরা কারা, তোকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
    হল কি, ওদের স্কোয়াডের ছেলেগুলো ছিল বে-পাড়ার,খালপাড়ের। পরে জেনেছি-- আমাদের পাড়ার সিপিএম এর ছেলেরা রাজি হয় নি, তাই ওই বাচ্চা বাচ্চা আনকাগুলোকে পাঠিয়েছে। দুটো কুচো রোয়াব দেখিয়ে বলল-- যান, যান! সোজা বাড়িতে ঢুকে পড়ুন, নইলে বাপের বিয়ে দেখিয়ে দেব।
    সুবীরদা কিরকম রগচটা জানিস তো! ক্ষেপে গিয়ে বলল-- অ্যাই, এ'পাড়ায় দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে রঙ নিয়ে কথা! একটা আওয়াজ দিলে গোটা পাড়া বেরিয়ে এসে তোদের ছিঁড়ে ফেলবে, সেটা জানিস? এখান থেকে বেরোতে পারবি না। ওসব ন্যাপলা-রামপুরি তোদের পেছনে ভরে দেব। এদিকে সুবীরদার গলার চড়া আওয়াজ শুনে পিটুদা বেরিয়ে এল, তারপর অমল।
    ছেলেগুলোর প্রথম অ্যাকশন বোধহয়, ঘাবড়াতে লাগল। সুবীরদা গলা উঁচু করে বলল- যদি এভাবে বেপাড়ার ছেলেরা এসে আমাদের পাড়ার ছেলেকে তুলে নিয়ে যেতে পারে তাহলে আমাদের ঘরদোর বেচে দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া উচিত। সিপিএম এর লোকজনও বেরিয়ে এল। কিন্তু সুবীরদা নিজেই তো স্ট্রং সিপিএম। এখানে পাড়ার সেন্টু দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিল। ছেলেগুলো কেটে পড়ল।
    এই হল গল্প।
    আমি নির্বাক। হ্যাঁ, ওর দিদিকে লেখা প্রেমপত্রের গোছায় সুবীরদার লেখাও ছিল, মনে আছে।
    --- তারপর?
    --তারপর বাবা আমাকে মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দিল। মাসখানেকের মধ্যে যোগাযোগ করে পার্টির শেলটারে পালিয়ে গেলাম। মার তখনই বুকের ফিক ব্যথাটা বেড়ে গেল। বহুদিন কোলকাতার বাইরে ছিলাম। শেলটারগুলো এক এক করে ভেঙে যেতে লাগল। শেষে গোপনে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। হলদিয়ায় গিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে বিদ্যুৎ বিভাগের একটা অফিসে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হলাম। বেশ কয়েকবছর পরে কোলকাতায় ট্রানসফার হলে রাত্তিরে যাদবপুরের ইন্ট্রিগেটেড ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে চারবছর পড়াশুনো করে ইঞ্জিনিয়ারের পোস্ট পেলাম, একটু বয়সে বিয়ে করেছি, সংসারধম্মো করছি। ব্যস্‌।
    --- একটা কথা বুঝতে পারছি না। এত লোক থাকতে তোকেই ওরা তুলতে এল কেন? মানে তুই তো তখনো তেমন--।জীবনে কাউকে একটা থাপ্পড়ও মারিস নি।
    ও হাত তুলে আমাকে থামায়।
    -- তুইও! তুই তো শালা এ রাজ্যের বাইরে। কোলকাতার কিছুই খবর রাখিস না। তখন পদ্মপুকুর কান্ড হয়ে গেছে, শুনেছিলি কিছু?
    --- কিছু একটা হবে, আবছা আবছা মনে পড়ছে। মানে তখন তো কত কিছুই ঘটছিল।
    --- ব্যাগড়া না দিয়ে চুপ করে শোন তাহলে। সিপিএম-নকশালদের মধ্যে তর্কবিতর্ক, দল থেকে বের করে দেওয়া -- এসব গোড়ায় নেতাদের মধ্যেই আটকে ছিল। ছেলেছোকরাদের মধ্যে মতান্তর হলেও মনান্তর হয় নি।যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়ায় আমরাও দুঃখ পেয়েছিলাম। মনে কর তুই আমাদের সকলকে নিয়ে সিপিএম এর ছাত্র প্রতিবাদ দিবস, যুব প্রতিবাদ দিবস সব্তাতেই মিছিলে গিয়েছিলি। একসাথে শ্লোগান দিয়েছিলি। কংগ্রেসি গুন্ডাদের সম্ভাব্য আক্রমণের আশংকায় একজোট হয়ে রাতজেগে পাহারা দিয়েছিলি। তখনও অমন কৌরব-পান্ডব হাল হয় নি। রাষ্ট্রপতি শাসনেও না।
    -- হুঁ!
    -- হল কখন? ১৯৬৯ এর মে'দিবসে মনুমেন্ট ময়দানে কানু সান্যালের পার্টি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করার দিন থেকে। সেই দিন পাশেই বিগ্রেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সিপিএম এর বিরাট মিটিং। সেখান থেকে ওদের স্কোয়াডগুলো হামলা করে কানু সান্যালের মিটিং ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করল। আমাদের ছেলেরা প্রতিরোধ করল। উদোম ক্যালাকেলি! মারামারির রেশ ছড়িয়ে পড়ল ফেরার পথে, হুগলি অবদি।সেদিন থেকে দু'দলের ছেলেদের মধ্যে লক্ষ্মণরেখা টানা হয়ে গেল। শুরু হল পাড়ায় পাড়ায় এলাকা দখলের লড়াই। আজকের টিএমসি- সিপিএম এর মত। কারা অন্যদের পাড়া ছাড়া করতে পারে তার কম্পিটিশন।
    সেই সময় একটা বড় ঘটনা ঘটেছিল।
    বিজয়গড় লায়েলকা এলাকায় সিপিএম ছেড়ে আমাদের সমর্থক হওয়া চারটে ছেলে বাঘাযতীন -রামগড় এলাকার সিপিএম এর স্কোয়াডের হাতে ধরা পড়ল। ওরা সকালবেলা মিছিল করে চারটে ছেলেকে পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় মারতে মারতে এনে বিধানপল্লী স্কোয়াডের হাতে তুলে দিল। ওরা হাতের সুখ করে নাকতলা স্কোয়াডের হাতে রিলে রেসের ব্যাটন তুলে দিল। নাকতলায় বিচারসভা বসল। দলত্যাগী রেনেগেডদের বিচার। শাস্তি ঠিক হল-- ডেথ সেন্টেন্স। যাতে অন্যেরা দলছাড়ার আগে দু'বার ভাবে। এবার যারা মিছিলে ছিল বেশিরভাগ সুট সুট করে কেটে গেল। দশজনের জল্লাদ বাহিনী ছেলে চারটেকে মশানে নিয়ে গেল। মশান মানে ওই বাঁশঝাড়ের পেছনে পদ্মপুকুর মাঠ, এখন পুকুর নেই। ফুটবল খেলা হয়, ক্লাবঘর হয়েছে।
    --- তারপর?
    --- এর পরেও? শোন, সেই ১৯৬৯ এর শেষে কারও কাছেই ফায়ার আর্মস ছিল না বল্লেই হয়। তাই আধমরা ছেলেগুলোকে মাছমারার কোঁচ আর চাকু দিয়ে মেরে ফেলে রাখল। ওদিকটায় এমনিতেই বাড়িঘর বিশেষ ছিল না। যে কয়টা ছিল তাদেরও দুয়োরে খিল। তুই কিছুই শুনিস নি?
    -- মনে পড়ছে, ঠাকুমা পরে বলেছিলেন। আমাদের বাড়ির রান্নার মাসি নেপালের মা ভর দুপুরে কাঁপতে কাঁপতে এসে বলেছিল-- পদ্মপুকুরের মাঠে চাইরটা জুয়ান ছেলেরে কাইট্যা ফালাইয়া রাখছে। দুইডা মইর‌্যা গেছে, বাকিগুলান খাবি খাইত্যাছে। জল জল কইরতাছে, কেডা দিব? ঠাকুমা বল্লেন-- চুপ, চুপ! রাও কইর না। ঈশ্বর মঙ্গল করুন।

    আমার ধন্দ তবু কাটে না। সে না হয় হল, কিন্তু এই লম্বুটাকে ওরা কেন তুলে নিয়ে যাচ্ছিল! ও তো নকশালদের অ্যাকশন স্কোয়াডের ছেলে নয়। আর ১৯৬৯ এর শেষের দিকে নাকতলা এলাকায় ওদের অ্যাকশন স্কোয়াড-টোয়াড কোথায়? হাতে গোণা কিছু ছেলে কাঁধে ঝোলা নিয়ে ঘোরে। যাকে তাকে চোতা ধরিয়ে দেয়, বকবক করে। বিপ্লব নাকি ডাকপিওনের মত দরজায় এসে কড়া নাড়ছে! লোকজন খালি চোখ কচলাছে, চোখে মুখে জল দিয়ে দরজাটা খুলছে না, এই আর কি!
    শংকর অনুচ্চারিত প্রশ্নটি বুঝতে পারে। জল খায়। ওর দৃষ্টি ব্যালকনিতে কাপড় শুকুতে দেওয়া দড়ির ওপর বসে দোল খাওয়া চড়াইটার দিকে। ওর গলা খাদে নামে।
    --- হ্যাঁ, আমি একটা দোষ করেছিলাম। ওদের চোখে ক্ষমার অযোগ্য। আমি ওদের বিচারসভায় চারটি ছেলেকে প্রাণদন্ডের আদেশ ঘোষণা করা বিচারপতি দি গ্রেট এর নাম প্রকাশ করে একটি লিফলেট এই এলাকায় বিলি করিয়েছিলাম। ওর শিরোনামে সলিল চৌধুরির একটি গানের লাইন টুকে দিয়েছিলাম-- বিচারপতি, তোমার বিচার করবে যারা---। ব্যস্‌।
    -- কে সেই মহাপুরুষ?
    --মহাপুরুষই বটে, নাম বললে পেত্যয় যাবি নে।
    --বালের মত কথা বলিস না। নামটা বল।
    --- জেনে কী করবি? অ্যাঁ, অ্যাদ্দিন বাদে? ওপর থেকে নীচে সব তো সাদা হয়ে গেছে। আর সেই মহাপুরুষও এখানে থাকে না। সিদ্ধার্থ রায়ের আমলে যখন বামদের খেদিয়ে যুব কংগ্রেসের বানরসেনারা পাড়ার দখল নিচ্ছিল তখন আমাদের ফুটবল ক্লাবের গোলকীপার, আরে ওই গাম্বাট বাঁটকুল, ওনাকে রাত্তির আটটা নাগাদ এসকর্ট করে বৌদি আর বাচ্চাদুটো শুদ্ধু একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিল।
    --- ট্যাক্সি কোথায় গেল?
    --কোথায় গেল আমি কী জানি! তবে পরে জেনেছি উনি বেলঘরিয়ার দিকে কোনও একটা স্কুলে পড়াচ্ছিলেন।
    --- পড়াচ্ছিলেন? মানে আমাদের কোন মাস্টারমশায়?
    --হ্যাঁ রে বাল! হ্যাঁ। তোর প্রিয় একজন। তুই ওঁর ফেভারিট ছিলি। ১৯৬৬'র খাদ্য আন্দোলনের সময় যখন তুই চাঁদা তুলে নুরুল ইসলাম ও আর একটি ছোট বাচ্চার স্মরণে নাকতলা স্কুলের বাগানে শহীদ বেদী বানিয়েছিলি তখন উনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বেদীটা এখনও আছে , বুঝলি। শুধু লোহার গ্রিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে, দেখতে যাবি নাকি?
    --- ফালতু কথা ছাড়, সেদিন তিনজন স্যার বক্তব্য রেখেছিলেন। কোনজন?
    --ইংরেজির স্যার।
    বিশহাজার ভোল্টের শক্‌। দীনেনস্যার? না, হতে পারে না। অসম্ভব।
    শংকর আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে। হ্যাঁ, সেই সময়টা । সেই সময়ে অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল। সেই সময়ে অন্ধেরা দলে দলে দেখতে পাচ্ছিল। আর যাদের দেখার চোখ ছিল তারা অন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। হ্যাঁ, পঙ্গুং লংঘয়তে গিরিং শুধু কথার কথা ছিল না। জলে শিলা ভেসে ছিল কি না জানিনা।কিন্তু বানরের গলায় গীত শোনা যাচ্ছিল। আর কিছু বাঁজা মেয়ে গর্ভবতী হয়েছিল।

    তবু দীনেনস্যার! উনি কাউকে মৃত্যুদন্ড দেবেন? এটা কী করে হয়?
    ত্রিপুরা থেকে আসা ফুলশার্ট আর ধুতি পরা রোগা লম্বাটে চল্লিশ ছুঁই ছুঁই মানুষটি ছিলেন হাস্যময়, প্রাণবন্ত। নাকতলার মোড়ে বিমলের বাবার চায়ের দোকানে বড়দের আড্ডা মাতিয়ে রাখতেন। কিশোর বয়স থেকেই উনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত। বাঙাল টান সত্ত্বেও ইংরেজি ফার্স্ট পেপারটা ভালই পড়াতেন।
    আর রমেনকে গল্প শোনাতেন পুরনো দিনের কমিউনিস্ট আন্দোলনের।
    --- বুঝলি, রণদিভের বিপ্লব যখন ব্যর্থ হইল, কমিউনিস্ট পার্টি আর্মড স্ট্রাগল বন্ধ কইর‌্যা ১৯৫২র প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট দিল, তখন অন্ধ্রের থেইক্যা সরোজিনী নাইডুর আপন ভাই হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় আমাদের পার্টির হইয়া মেলা ভোটে জিইত্যা পার্লামেন্টে গেল, সোজা কথা না। কিন্তু কবি মানুষ, একটু পাগল পাগল। সংসদে বইস্যা নিজের লেখা হিন্দি গান গাইত-- সূর্য অস্ত হো গয়া, গগন মস্ত হো গয়া। আর নেহেরু তারে কিছু কইত না।
    -- কোন হারীন চ্যাটার্জি? ওই মেহমুদের ভূতবাংলো সিনেমার ভিলেন? কী যে বলেন স্যার!
    --- আরে হ', হেই মানুষটাই।সময়ের লগে বদলাইয়া গ্যাছে। হ্যাঁ, বেআইনি কমিউনিস্ট পার্টি আইনি হইল। তার মূল্য দিতে আর্মস সারেন্ডার করতে হইল। কিন্তু ত্রিপুরার পার্টি আর্মস সারেন্ডার করে নাই। অগো আর্মস স্কোয়াডের নাম ছিল 'গণমুক্তি পরিষদ'। প্রত্যেক নির্বাচনের সময় ভোটের আগের দিন রাইতে গণমুক্তি পরিষদ হাতিয়ার লইয়া রুটমার্চ কইর‌্যা যায়। ব্যস্‌, পরের দিন ভোট নিয়া আর ভাবতে হইত না। হাঃ হাঃ হাঃ।
    বুঝলি রমেন, সত্য বীর্যবান। গান্ধীর সইত্য হইল কাপুরুষের সইত্য। যীশুর সইত্য? একগালে মারলে আর এক গাল আগাইয়া দাও? এইসব ছাতামাথা কইয়া জনতারে ভুলাইয়া রাখে।
    সেই দীনেনস্যার? নাঃ, সত্যি বিশ্বাস হয় না।

    কেন হয় না? সময়ের সঙ্গে সবাই পালটে যেতে পারে, হারীন চাটুজ্জেও বদলে যেতে পারে, আর উনি পাথরের দেবতা? আরো শোন। সে বছরে আরো একটা ঘটনা ঘটে।
    নাকতলা স্কুলের মাঠে নবারুণ সংঘ ও খালপাড়ের মিলন সংঘের ফুটবল ম্যাচে ঝামেলা হয়। খালপাড়ের ছেলেরা মার খেয়ে এটাকে তড়িঘড়ি সিপিএম এর সংগে মারামারির রাজনৈতিক রং লাগায়। কারণ খালপাড়ের ক্লাবটা ছিল সিপিএম এর শক্ত ঘাঁটি। আর নবারুণ সংঘ হল পাঁচমিশেলি। ওরা রাত্তিরে তিনশো ছেলে নিয়ে এসে নবারুণ সংঘের ছেলেদের ঘর থেকে টেনে বের করে বেদম পেটায়। বাসু কে এমন মারে যে কয়েক বছর ধরে চিকিৎসা করাতে হয়। এদের মাসখানেক পাড়া ছাড়া হতে হয়।
    -- ধ্যেৎ! ফুটবল মাঠের মারামারি কোন শালা নতুন ঘটনা। আর তাতে রাজনৈতিক রং লাগানো? সে তো হয়েই থাকে। এর মধ্যে স্যারকে টানছিস কেন?
    -- আরে শোন তো পাগলা! তোর স্কুলের বন্ধু অমলও একমাস পাড়াছাড়া ছিল। কখনও কখনও রাত্তিরে লুকিয়ে বাড়ি এসে জামাকাপড় বদলে খেয়ে যেত।
    -- ওসব সেন্টু মারাস না। অমল বলে আলাদা কিছু হবে নাকি! নবারুণ সংঘের মেম্বার বলে কথা।
    -- আরে শোন তো, ওর বিরুদ্ধে যাদবপুর থানায় এফ আই আর করা হল ও নাকি বোম আর রড নিয়ে হামলা করেছিল!
    -- সে কি রে! অমল তো কারো সঙ্গে ঝামেলায় যায় না। স্কুলেও কখনও হাতাহাতিতে জড়ায় নি!
    --- তা ঠিক, কিন্তু বড্ড একগুঁয়ে যে! ওরা মার্কসবাদী স্টাডি সার্কল শুরু করেছিল না? সেই যে রোববার রোববার পাশের প্রাইমারি স্কুল বিল্ডিংয়ে বসা? নেতাজী নগর থেকে বড় কমরেডরা ক্লাস নিতে আসতেন। তুইও তো একসময় যেতিস।
    --- হ্যাঁ, চ্যাংড়া ছেলে।বয়স্কদের বেয়াড়া প্রশ্ন করে কাঠি করতে ভাল লাগত।
    --- তোর সঙ্গে আমিও তো যেতাম। কিন্তু অমল যেত না। বলত -এত বড় বড় কথা আমার মাথায় ঢোকে না। কলেজের বইপত্তর নাড়াচাড়া করেই কুল পাইনে। তখনই ওকে ওরা কড়কে দিয়েছিল, দেখে নেবে। এই ঘটনায় মওকা পেয়ে কেস খাইয়ে দিল।
    --- যাঃ! এ আবার হয় নাকি? পাড়ায় ফিরল কী করে?
    -- আরে অমলের ন্যাংটোবেলার বন্ধু--থার্ড স্কীমের বিশ্ব, বান্টি সিনেমার কাছে থাকে। ও তখন ক্যান্ডিডেট মেম্বার থেকে পুরোদস্তুর পার্টি মেম্বার! হেব্বি ঘ্যাম! মাসিমা ওকে ধরলেন।ও অমলকে নিয়ে পার্টি অফিস, ক্লাব সবগুলো ঘুরল। বলল- এ আমার বন্ধু। এর গায়ে হাত তোলা মানে আমার গায়ে হাত তোলা। ওর হাতে তখন একটা ইউনিয়ন, ওকে কে ঘাঁটাবে?
    হ্যাঁ, এটা জেনে তোর ভাল লাগবে যে অমলের বিরুদ্ধে এফ আই আরটি করেছিলেন তোর শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই দীনেনস্যার। আর জানিস তো ক্রিমিন্যাল কেস সহজে পেছন ছাড়ে না। দীনেনস্যারের কোন খবর নেই।অমলও রিটায়ার করেছে। কিন্তু পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরনো কেসের ঠেলায় আজও ওকে বছরে দু-তিনবার গাঁটের কড়ি খরচা করে আদালতে হাজিরা লাগিয়ে নতুন তারিখ নিতে হয়।

    রমেন চুপ। খানিকক্ষণ কেউ কোন কথা বলছে না। রান্নাঘর থেকে বৌদি এসে উঁকি দিয়ে গেলেন। তারপর আবার চা এল।সুগন্ধি লিকার চা। রমেন অন্যমনস্ক ভাবে একটা সিগ্রেট ধরায়। গন্ধ বোধহয় রান্নাঘরে পৌঁছে গেছে। বৌদি বিরক্ত মুখে আরও দুটো জানলার পাল্লা খুলে পাখার স্পীড বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন। নাঃ, মিডিয়ার কল্যাণে সবাই প্যাসিভ স্মোকিং এর কুফলের ব্যাপারে সজাগ। রমেন সদ্য ধরানো সিগ্রেট নিভিয়ে অ্যাশ-ট্রে তে গুঁজে দেয়।
    শংকর মুচকি হাসে।
    -- কী হল? মাথার মধ্যে একটা বোলতা ঘুর ঘুর করছে? নাকি ঘুরঘুরে পোকা?
    --বোলতা।
    --- ছাড় ওসব পুরনো কথা। ভেবে লাভ নেই। আজ আমরা বেঁচে বর্তে আছি, হাত-পা-চোখ-কান সবই আস্ত আছে, সেটাই মোদ্দা কথা।আমার কথা তো অনেক শুনলি, তোর গল্প শুনি। তুই নাকি শংকর গুহনিয়োগীর মত ছত্তিশগড়ি মহিলাকে বিয়ে করেছিলি?
    -- ধ্যাৎ, যত্ত বাজে কথা।কোথায় গুহনিয়োগী আর কোথায় তোর বন্ধু এই হরিদাস পাল! আমার স্ত্রী বাঙালী, তবে প্রবাসী।
    -- একদিন নিয়ে আয় না! আর ছেলেমেয়ে?
    রমেন হাসে।
    --সেটা সম্ভব নয়।
    --কেন?
    --আমরা অনেকদিন আলাদা হয়ে গেছি। ও মধ্যপ্রদেশের ভোপালে, স্কুলের প্রিন্সিপাল। দুই মেয়ে। ওরা মায়ের সঙ্গেই থাকে। বছরে দুয়েকবার জন্মদিন-টিনে টেলিফোনে কথা হয়। এই পর্য্যন্ত।
    --- সে কী রে! এটা কেমন হল?
    --- ওদের কোন দোষ নেই। আমি ভাল স্বামী, ভাল বাবা হতে পারি নি। উড়নচন্ডে স্বভাব। হস্টেল লাইফে বেশি স্বচ্ছন্দ। হয়ত বিয়ে করা উচিত ছিল না।
    -- আচ্ছা, এরপর কার সঙ্গে দেখা করবি? বিজনদার বাড়ি যাবি? বিজয়গড় পাড়ায়? হেঁটে বা রিকশায়, যেমন বলবি।
    --- তুইই বল।
    --তার আগে তোর মিশনটা কী সেটা বল। এমনি খেজুরে করতে আসিস নি সেটা বুঝতে পারছি।
    -- ধরেছিস ঠিকই, একটা কিছু আছে।
    --ভ্যান্তারা না করে বলেই ফেল।
    -- আমার মিশনের নাম--ফেরারি ফৌজ।
    শংকরের হাঁ-মুখ আস্তে আস্তে বন্ধ হয়।
    --তুই বলে কিছু বলছি না, নইলে বলতাম--ফোট্‌ শালা! অমন চোটের হাবিলদার অনেক দেখা আছে। তা কমরেড, আপনার এই ফেরারি ফৌজে কতজন সোলজার থাকবে? কী ভেবেছেন?
    --- আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি সাতজন ঘোড়সওয়ারকে।
    --- সেভেন সামুরাই?
    -- না, না। কোন কুরোসাওয়া প্রজেক্ট নয়। সাতজন অশ্বারোহী।
    --ওরে বালস্য বাল, হরিদাস পাল! বখতিয়ার খিলজিরও তেরোজন অশ্বারোহী লেগেছিল হাড়খটখটি বুড়ো লক্ষণ সেনকে হারাতে। তোর সাতেই হয়ে যাবে?
    -- আরে আমার মিশন বঙ্গবিজয় নয়, ফেরারী ফৌজ--সেটা খেয়াল করিস।
    শংকর হাত উল্টে দেয়। তারচেয়ে বিজনদার বাড়ি চল। ও হয়ত তোর ফেরারী ফৌজের কর্নেল হতে রাজি হবে। নিদেনপক্ষে ব্রিগ্রেডিয়ার।

    (৭)

    ‘স্বপন যদি ভাঙিলে’

    আগের সেই টিনের চাল আর চাটাইয়ের বেড়া নেই, থাকার কথাও নয়। প্রায় আটচল্লিশ বছর , কম কথা নয়। পিচের রাস্তা আর তার পাশে কালো হলুদের বর্ডার। অধিকাংশ বাড়ি পাকা। বিজনদার বাড়ি শেষ কবে এসেছিলাম? ওর ছোড়দির বিয়েতে। আমরা প্রায় পনের জন, পনের অশ্বারোহী। তার মধ্যে দুজন মেয়ে। একজন বিবাহিত। আমার সেলের কম্যান্ডার ও তার বৌ।
    আমার সেলের প্রশান্তর আলগা মুখ। একবার সেল মিটিংয়ে কম্যান্ডারকে বলে দিল-- নিজে তো পার্টনার পটিয়ে নিলে, আমাদের খালি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাচ্ছ? আমাদের কী হবে?
    --- বিপ্লবে প্রেম করা মানা নাকি? আমরা কি আনন্দমঠের সন্ন্যাসীর দল!
    -- তা কই? আমাদের পার্টনার কই?
    -- রিক্রুট কর। আমার বউ তো আমার রিক্রুট।
    --উঁহু, মেয়েদের রিক্রুট করা বহুত ঝামেলি। সুশান্তকে জিগাও।
    সেদিন লাজুক মুখচোরা সুশান্ত মুখ খোলেনি। কিন্তু বিয়েবাড়িতে সবার পেড়াপেড়িতে একরকম নিমরাজি হল।
    -- আমি কিছু বলব না। প্রশান্তই বলুক।ওই আমাকে ডুবিয়েছিল।
    সে কী?
    -- বলছি বলছি। সুশান্ত প্রেমে পড়ছিল, পাড়ারই মেয়ে। পাঁড় কংগ্রেসি বাড়ি। আমার কাছে এসে কিন্তু কিন্তু করে বলে ফেলল। ব্যস্‌, আমি ওকে গাইড করতে লাগলাম। বললাম-- প্রেমে পড়ে বিপ্লবকে ভোলা চলবে না। সলিউশন? কংগ্রেসি বাড়ির মেয়েকে রিক্রুট করে কমিউনিস্ট বানাতে হবে। মায়াকোভস্কি বলেছেন-- প্রিয়ার গোলাপি ঠোঁটে চুমু খাওয়ার সময়েও যেন রিপাব্লিকের লাল পতাকা পতপত করে উড়ছে দেখতে পাই। প্রশান্ত আমার কথা মত কাজ করতে লাগল। বিপ্লব বোঝাল, শ্রেণীসংগ্রাম বোঝাল, কৃষিবিপ্লবও বুঝিয়ে ফেলল। শেষে যখন ওকে দলে আসতে বলল তখন মেয়েটি বলল যে তোমরা ছেলেরা কত স্বাধীন,সন্ধ্যের পরে দেরি করে ফিরলেও বাড়িতে কিছু বলে না। আমরা মেয়েরা কী আর করতে পারি বল? সেদিন ওই মুখচোরা সুশান্তের জিভে দুষ্টু সরস্বতী ভর করেছিলেন। তারপর কানে আমার ফুসমন্তর! ও অনায়াসে বলল-- বেশি না, একটা কাজ তো করতে পারিস! কিছু না হোক আমার মত গোটা কয়েক বিপ্লবী তো পয়দা করতে পারিস। তারপর কী হইল জানে শ্যামলাল।
    তখন খাসির মাংস পাতে পড়েছে।

    বিজনদাকে চিনতে একটু কষ্ট হল। ছ'ফিট লম্বা একটু মঙ্গোলীয় ধাঁচের মুখে এক্ধরণের একরোখা ভাবটা এখন অনেক নরম, কারণ সামান্য মেদ জমেছে। একমাথা কোঁকড়ানো চুলের জায়গা দখল করেছে এক মরুভূমি। সেই ছিপছিপে ছিলেটানা-ধনুক ভাব উধাও, সকাল-সন্ধে মুখবুজে টিউশন করতে করতে একটু নুয়ে পড়েছে পিঠ।
    কিন্তু হাসিটা আগের মতই প্রাণখোলা। তবে ঝক্ঝকে দাঁতে আগের মত নিকোটিনের ছাপ নেই।
    চারমিনার কি বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে? নিদেনপক্ষে পানামা? বিজনদা কি আজকাল নিয়মিত ডেন্টিস্টের কাছে যায়? আগে তো ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত চক্চকে করা, বিউটি পার্লারে গিয়ে রূপটান-- এসব তো বুর্জোয়া অবক্ষয়ের লক্ষণ ধরা হত। খেটে খাওয়া মানুষদের লড়াইয়ের রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়ে ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের নার্সিসিজমে বেঁধে ফেলার ডেকাডেন্ট কালচারাল কনস্পিরেসি!
    সবাই কেমন বিশ্বাস করত যে যারা বিউটি পার্লারে কাজ করে বা সেখানে ক্লায়েন্ট হয়ে যায় তাদের চরিত্র সন্দেহজনক।
    তবে বিজনদা ছিল ওদের মধ্যে সবচেয়ে পিউরিটান। কোন আঁশটে চুটকি বা কমেন্ট, অভিধান-বহির্ভূত শব্দের ব্যবহার একেবারে সহ্য করতে পারত না। রেগে গেলেও কারও মা-বাপ তুলত না।মেয়েদের মাল বা গুল্লি বলা মানে প্রচন্ড ধমক খাওয়া। আর মাগী শব্দ মুখ থেকে বেরোলে হাতাহাতি হবার সম্ভাবনা। আঠেরো বছর বয়সের রমেন একবার পথে একজন গর্ভবতী মহিলাকে দেখে বলে উঠেছিল-- দেখেছেন, ওর না নিচের তলায় ভাড়াটে এসেছে।
    দুজন সঙ্গী হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠতে গিয়ে দেখল বিজনদা ওর কলার মুচড়ে ধরে ঝাঁকাচ্ছে-- শালা! তোর লজ্জা করে না? অপদার্থ! তুই ওদের থেকে আলাদা কিসে?

    বিজনদা এগিয়ে এসে দুহাতে জড়িয়ে ধরেছে রমেনকে।
    --- কী রে! আমাদের ভুলে গেছলি? আর আমরাও তো--।
    রমেন কোন কথা বলে না, শুধু হাসতে থাকে। শংকর এগিয়ে এসে বলে --- ওঃ, আবেগের দুধ উথলে উঠেছে। ওকে ছেড়ে দাও , অনেক কথা আছে। আগে তোমার ছাত্রছাত্রীদের ছুটি দাও।
    গোটাদশেক ছেলেমেয়ে চটপট খাতাবই ঢাউস ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে। বিজনদা রোববারের দিন এটা পুষিয়ে দেবে বলে আশ্বাস দেয়।
    শংকর বিজনদার থেকে একটা সিগ্রেট চেয়ে নিয়ে ধরিয়ে ফেলে।

    আমি আপত্তি জানাই; ওর বারণ আছে। ধোঁয়া গিলে কার কি উবগার হবে শুনি?
    --কার বারণ, বৌয়ের? সেটা ঘরের মধ্যে। ঘরের বাইরে একটু অবাধ্য না হলে চলে?
    ---হ্যাঁ, হ্যাঁ; ঘরের মধ্যে অসভ্য আর ঘরের বাইরে অবাধ্য।
    আমি চমকে উঠি। এই রে, বিজনদা ঝাড় দিল বলে। কিন্তু বিজনদার ঝকঝকে দাঁতে অমলিন হাসি।
    শংকরের দিকে তাকাই। ও চোখ টিপে একটা ভঙ্গী করে বলল--চাপ নিস না, বিজনদাও লাইনে এসে গেছে।
    একটু অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করি-- তো তুমি ঘরের মধ্যেই অবাধ্য কেন? বৌদি সিগ্রেট খাওয়া প্যাসিভ স্মোকিং নিয়ে কিছু বলে না?
    বিজনদা উত্তর না দিয়ে আরও জোরে হেসে ওঠে।
    আমি ভ্যাবাচাকা। পালা করে দুজনের মুখের দিকে তাকাই।
    --- না রহেগা বাঁশ, ন বজেগী বাঁসুরী!
    --বুঝলি না ভ্যাবাগঙ্গারাম! বিজনদা বিয়েই করে নি।
    --ও!
    --মানে করে নি বললে ঠিক হবে না, বলা উচিত দ্বিতীয়বার করে নি।
    --আচ্ছা, প্রথমবারটা কবে?
    --- সেই যে রে! বিজনদার প্রথম রিক্রুট?
    ---তপতীদি! উনি এখন কোথায়?
    বিজনদা বাইরের দিকে তাকায়, আবার একটা সিগ্রেট ধরায়। ঘরের ঘুলঘুলিতে দুটো চড়াই পাখি ঘর বাঁধছে। কিচিরমিচির। গোটা কয়েক খড়কুটো এসে আমার গায়ে মাথায় পড়ে। বিজনদা পরম মমতায় সেগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। ওর হাত আমাকে ছোঁয়, খানিকক্ষণ ছুঁয়ে থাকে। ভাবি, কোলকাতায় এখনও চড়ুইদের দেখা পাওয়া যায়!
    আমি জল চাইলাম , বিজনদা উঠে ভেতরে গেল।
    -- এই শালা! চটপট বলে ফ্যাল দিকি , কিসের কেলো?
    --- বিজনদা তখন পুরুলিয়া থেকে বহরমপুর সেন্ট্রাল জেলে এসেছে। পার্টির শেলটার-ফেলটার ভেঙে ছত্রখান। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। আগের সমর্থকরা কেউ আর আমাদের মাথা গোঁজার জায়গা দিচ্ছে না। কাউকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। বেলেঘাটায় পুলিশের ঢোকানো মোলগুলো মুখোস পরে অ্যাকশন স্কোয়াডের ছেলেদের ধরিয়ে দিল।
    তপতীদি অন্য একটা উপদলে যোগ দিয়ে আমেরিকান লাইব্রেরিতে বোম ফাটিয়ে কাঁচ ভাঙল। একবার ধরা পড়ে বেইল জাম্প করল।
    -- বেইল পেয়ে গেছল? কী করে?
    --তখন পেটে ছ'মাসের বাচ্চা।তাই কোন বুড়ো সি জে এম--!
    আমি ছটফট করি, উল্টোপাল্টা বকবক করতে থাকি।
    -- আচ্ছা, পেটে বাচ্চা এল কেন? একটু সতর্ক হলে--।
    --তুই কি বুঝবি রে আবাল! তুই তখন শান্ত ছত্তিশগড়ে বসে বাপের হোটেলে খাচ্ছিস দাচ্ছিস আর ইডিওলজিক্যাল কনফিউশন মারাচ্ছিস।

    আমি হাসি। সে তো এখনও মারাচ্ছি। কিন্তু ওদের কি তখন "চার আনায় তিনটে" কেনারও পয়সা ছিল না?
    -- এটা একেবারে বোকা-দার মত বললি। আরে তখন তো আমরা ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ে বিশ্বাস করতাম না। মাও নিজে লং মার্চের সময় ফ্যামিলি প্ল্যানিং করেন নি। আর ভাবতাম এসব গরীবদের মূল সমস্যার থেকে চোখ সরিয়ে দেওয়ার সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত। তর্ক করতাম--মানুষ শুধু পেট নিয়ে জন্মায় না, হাত-পা ও মাথা নিয়ে জন্মায়।
    তখন যদি কোন শালা বলত যে খোদ মাওয়ের চীনে সত্তরের দশকে প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাইয়ের নির্দেশে একাধিক বাচ্চা হলে প্রমোশন ইনক্রিমেন্ট আটকে দেওয়া হচ্ছে তো--।
    --সে শালার গুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়তাম। সে ঠিক আছে, তারপর কী হল?
    -- তপতীদি এ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে এমনকি নিজের মা-ভাইদের থেকেও রূঢ় ব্যবহার পেয়ে বদলে গেল।বিধবা সেজে উত্তরবঙ্গে একটা মাস্টারি যোগাড় করে চলে গেল। বিজনদার সঙ্গে কোন সম্পর্ক স্বীকার করে নি।
    আমি কী বলব বুঝতে পারি না।
    ঠিক এইসময় বিজনদা একটা থালার ওপর তিনকাপ চা দুটো লেড়ো বিস্কুট আর একগ্লাস জল নিয়ে ঢুকল। কী টাইমিং!
    আচ্ছা, আড়াল থেকে আমাদের কথাবার্তা শুনছিল নাকি!

    আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে পুরনো দিনে ফিরে যাই। বিজনদার সঙ্গে প্রথম পরিচয় কবে যেন?
    হ্যাঁ, ১৯৬৭ সালের মে দিবস। বিজয়গড়ের থেকে মিছিল বেরোবে শুনে জুটে গেছি। তখন হায়ার সেকেন্ডারির ফল বেরোতে মাস দেড়েক বাকি। পুরোদমে টো টো করে ঘুরে বেড়ানো আর চারমিনার ফোঁকা চলছে। দুটো পায়জামা আর দুটো পাঞ্জাবী বানিয়েছি-- একটা গেরুয়া আর একটা কচি আমপাতা রঙের। পরে বেরোলে এখানে ওখানে আড্ডা দেওয়া উদ্বাস্তু কলোনীর দুরন্ত মেয়েরা আওয়াজ দেয়- দেখ দেখ, একজন নতুন কমরেড যাচ্ছে। কেউ কেউ পেছন থেকে কমরেড বলে চেঁচিয়ে ভালোমানুষ মুখ করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকত।ভালো যে লাগত সে নিয়ে কোন কথা হবে না।
    সেই মিছিল। বিজয়গড় এর একটি সাংস্কৃতিক চক্রের ছেলেরা মোড়ে মোড়ে ভ্যানরিকশায় চড়ানো মাইক নিয়ে সলিল চৌধুরির গান গাইছে -- আয় রে পরাণ ভাই, আয় রে রহিম ভাই।' গানটা প্রথম শুনলাম। তাতে কালো-নদীর-বান রোখার আহ্বানে বুকের মধ্যে কেমন করে উঠল। ছোটবেলায় পার্কসার্কাস পাড়ায় দেখা দাঙ্গার পরিবেশের ছবি ভেসে উঠল যেন।
    সেখানে তানুদা পরিচয় করিয়ে দিল পায়জামা ও সবুজ পাঞ্জাবী পরা অসম্ভব ফরসা বিজনদার সঙ্গে।

    তারপর ঘনিষ্ঠ হয়ে দেখেছি কিরকম ঘোর সংসারী বিজনদা। তখন চাল দুষ্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য। তখনও গলি গলিতে হাতরুটি বেলে বেলে মহিলারা বিক্কিরি করতেন না। আসলে বাঙালী তখনও রুটিকে শুধু জলখাবারের যোগ্য মনে করত।
    চালের কর্ডন জেলায় জেলায়। র‌্যাশনের চাল মুখে তোলা কঠিন। দাদা তখন সাইকেল করে গড়িয়া-নরেন্দ্রপুর পেরিয়ে রাজপুরের বাজার থেকে প্রতিকিলোয় কুড়ি নয়া পয়সা কম দরে চাল কিনে আনত।
    সেই বিজনদা একদিন মা-বাবা-ভাই-দিদিকে ফেলে কিভাবে বিপ্লবের স্বপ্নে নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে অনন্ত সিংয়ের ডাকাতির দলে ভিড়ে গেল সেটা এক রহস্য। নিজে গেল তো গেল, আমাদের মত আরও কয়েকজনকে নিয়ে গেল যে!

    -- অ্যাই বিজনদা, এ শালাকে একটু বোঝাও তো! চল্লিশবছর দন্ডকারণ্যে বনবাস করে ওর ঘিলু কেমন ভসকিয়ে গেছে, সোজা কথাও বুঝতে পারছে না।
    বিজনদার মুখে প্রশ্রয়ের হাসি।
    --কী, হয়েছেটা কী?
    -- প্রথমতঃ আমি কোন বনবাসে ছিলাম না, ছত্তিশগড়ের স্টিল সিটি ভিলাই কি বনজঙ্গল? দ্বিতীয়তঃ--
    -- চোপ্‌ শালা! দন্ডকারণ্য কি ছত্তিশগড়ে নয়? দ্বিতীয়তঃ আমাদের ইংরিজির মাস্টারমশায় দীনেনস্যার যে গণ-আদালত বসিয়ে চারটে ছেলেকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন, সেই যে পদ্মপুকুর মাঠে গো, আর আমাদের অনেকের নামে খেলার মাঠের মারপিট নিয়ে মিথ্যে এফ আই আর করেছিলেন--সেটা ও কিছুতেই বিশ্বাস করছে না।
    -- কেন?
    --- ব্যাপারটা মেলে না, মানে ওঁর মাইন্ডসেটের সঙ্গে খাপ খায় না।
    -- ওরে আমার সাইকোলজিস্ট রে! হুঁ, মাইন্ডসেট! সব ব্যাপারে বাতেলার অভ্যেসটা এখনো যায় নি।
    --- সে তো তুই, বিজনদা সবাই।
    --- কোথায় খাপ খুলছিস ? বিজনদা দশবছর আগে সাইকোলজিতে মাস্টার্স করেছে, ইগনু থেকে। আবার ডিজার্টেশনের বিষয় নিয়েছিল-প্যাসিভ অ্যাগ্রেসন সিনড্রোম। বুঝলি? তুমি বল বিজনদা।
    --- হ্যাঁ, তোর খুব খারাপ লাগছে রমেন, কিন্তু কথাটা সত্যি। আমি তখন এদিকেই ছিলাম।
    -- হল তো! আমরা সবাই ছিলাম, উনি ছিলেন না, তবু এঁড়ে তক্কো। আমার ঠাকুমা বলতেন-- রেখে দে তোর দেখা কথা, আমি শুনে এলাম।
    ---কিন্তু বিজনদা, এটা কী করে হয় ?ওঁর মত শান্ত ব্যক্তিত্বের একজন নিরীহ মানুষ--। উনি সিপিএম ক্ষমতায় আসায় কী খরগোস থেকে সিংহ হয়ে যাবেন?
    -- আদ্দেকটা ধরেছিস। খরগোসের ক্ষমতায় আসা। ক্ষমতার সিপিএম-নকশাল-কংগ্রেস হয় না।সত্তরে যখন মানুবাবুরা যুব কংগ্রেসের পতাকার নীচে মাস্তানদের জড়ো করে কোলকাতাকে দুঃস্বপ্নের নগরী করে তুলেছিলেন তখন তোদের পাড়ার দত্তগুপ্ত বাড়ির ছ্যাবলা নিরীহ ছোটকা রাইফেল দিয়ে তোদের গাছ থেকে নারকোল টিপ করে পুকুরে ফেলে নি? পাড়ার চক্কোত্তি বামুনের ছেলে গামছায় শ্রাদ্ধবাড়ির চালকলা বাঁধা ছেড়ে বোমা বাঁধতে শুরু করেনি?
    "সিরাজদ্দৌল্লা" নাটকে দানশা ফকির চরিত্রটা দেখেছিস? যে ছোটবেলা থেকে খোঁড়া, ব্যঙ্গবিদ্রূপ সয়ে বড় হয়েছে , সে কেমন সুযোগ পেয়ে মহা ভিলেন হয়ে উঠল। সেই যে রে , সেই বিখ্যাত ডায়লগ--যেমন তেমন দানশা পাইছ!
    অবশ্য তোরা বোধহয় এসব পড়িস নি।
    --পড়েছি, কিন্তু গুলিয়ে গেছে-- কে যে লিখেছিল? গিরিশ ঘোষ, নাকি শচীন সেনগুপ্ত?
    --- ডি এল রায়ও হতে পারে, কি বল বিজনদা?
    --আঃ, ফালতু কথা ছেড়ে বল, কী বুঝলি?
    -- রমেন যে কিস্যু বোঝেনি, সে তো মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। আমি বুঝলাম যে তোমার দুটো উপপাদ্য।
    এক, ক্ষমতার সিপিএম -নকশাল হয় না। মানে যে যায় লংকায় , সেই হয় রাবণ।
    দুই, ক্ষমতা পেয়ে খরগোসের সিংহ হওয়া। অর্থাৎ, ক্ষমতা নামক বায়বীয় শক্তি বেড়ালকে পোঁদে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে বাঘ বানায়।
    কিন্তু মাস্টারমশায়, আমরা ছাত্র হিসেবে ব্যাকবেঞ্চার। একটু কষ্ট কইরা‌ উদাহরণ সহকারে বুঝাইয়া দেন।

    মাস্টারমশায়ের গম্ভীর মুদ্রা । নীচুগলায় বললেন--এসব কথায় অনেক সময় লাগে। ভাতে ভাত হয়ে গিয়েছে, ডাল করাই আছে। যখন খেতে বসব তখন তিনটে হাঁসের ডিমের বড়া ভেজে দেব। আর আছে লংকার আচার। চলবে তো?
    সেই আদি অকৃত্রিম বিজনদা, ঘোর সংসারী, পরিবারের সবার দিকে নজর, আমরা আড়ালে বলতাম-- বড়পিসিমা।
    --শোন, এবার অন্য শিবিরের এইরকম অকারণ হিংস্রতার একটা গল্প বলি? মানে নকশালদের? সেখানেও একজন মাস্টারমশায়, তবে স্কুলের না, কলেজের।
    -- কে বলত? আমরা চিনি?
    --খুব চিনিস, কিন্তু নাম বলব না। এখন শান্ত ভদ্র বুদ্ধিজীবি, কাগজে প্রবন্ধ-টবন্ধ বেরোয়।অ্যাকাডেমিক লাইনে ব্রিলিয়ান্ট। তবে--।
    বিজনদা আর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ে, তারপর ব্যোম মেরে যায়।
    --আরে কী হল?
    --দাঁড়া, ভাবছি কোত্থেকে শুরু করি। আচ্ছা রমেন, তুই তখন স্কটিশে ইকনমিক্স পড়তি না? রঘুবীর সেন তখন তোদের দু'ব্ছরের সিনিয়র ছিল, মনে আছে?
    -- খুব মনে আছে। হেব্বি আঁতেল। "অনীক" পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। "এস আর " লাইন মারাতো। ওর বাপবুড়ো ভাল বেহালা বাজাত।
    -- "এস আর" আবার কী?
    -- তুই শালা গড়িয়া কলেজের মাল, তুই কোত্থেকে জানবি? আমরা হলাম প্রেসিডেন্সি কনসোলিডেশনের, বল্লে হবে? "এস আর" হল সোশ্যালিস্ট রেভোলুশ্যন গ্রুপ। যারা মনে করত ভারতে কৃষিতে পুঁজিবাদ এসে গেছে, সামন্ততন্ত্র পিছু হটছে। তাই এদেশে চীনের মত পিডিআর বা পিপলস ডেমোক্র্যটিক রেভোল্যুশন হবে না, রুশের মত শহুরে অভ্যুত্থান করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে। অর্থাৎ , চাষি-ফাষি নয়, শ্রমিকদের পোঁদে লাগো।ওদের কানে ফুসমন্তর দাও যে মাইনে বাড়ানো আর বোনাসের দাবি ছেড়ে কারখানার মালিক হওয়ার স্বপ্ন সফল করতে হাতিয়ার তুলে নাও।

    তখন সিপিএম ও সরকারী নকশালদের একই মত ছিল, ভারতে বিপ্লবের স্তর হল জনগণতান্ত্রিক বা কৃষি বিপ্লব। রঘুবীর পরে বড় ইকনমিক্সের অধ্যাপক হল, বিদেশে রিসার্চ করল। ইদানীং রিটায়র করেছে শুনছি। এবার তুমি বল, বিজনদা।
    --- তখন রঘুবীর মাস্টার্স করতে সাউথ সিঁথির ইকনমিক্স বিল্ডিংয়ে গেছে। ওরা আটটা ছেলে চারটে মেয়ে; দুজন আজকের লব্জতে বেশ ঝিংকু। ওখানে তখন নকশালদের ইউনিট, মেয়েগুলিও তাই। রঘুবীরের একটু ইন্টুমিন্টু করার ইচ্ছে হল। ওর ব্যক্তিত্বের একটা আকর্ষণ তো ছিলই।
    কিন্তু ও বাবা! কোথায় কি! যেন গোখরো সাপের বিলে এসেছে। মেয়েগুলো ওকে খালি রাগী রাগী চোখে দেখে, ভাল করে জবাব দেয় না। শেষে ওর কাছে খবর এল যে ওকে "এস আর" গ্রুপের তাত্ত্বিক প্রবক্তা হিসেবে শ্রেণীশত্রু ঘোষণা করা হয়েছে। ওর বেঁচে থাকার অধিকার নেই। খতমের তালিকায় নাম উঠে গেছে। মেয়েদের কাছে নির্দেশ পৌঁছে গেছে, তাই ওদের অমন সাপের মত হিস হিস্‌।
    রঘুবীর বিশ্বাস করেনি যে ওকে মেরে ফেলা হবে। তবু সতর্ক হল। ভীড়ের বাসে বাড়ি ফিরতে লাগল। একা কোন গলিতে ঢুকত না।
    কিন্তু ওপর থেকে যে অধ্যাপক নেতাটি ওর অজান্তে বিচারসভা বসিয়ে ওকে মেরে ফেলার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, তিনি অধৈর্য্য হয়ে উঠলেন। শেষে বেলেঘাটা ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়া হল। ওদের অ্যাকশন স্কোয়াড খুব দক্ষ।
    একদিন রঘুবীর কিডন্যাপ হয়ে গেল। ওরা ওকে মুখ বেঁধে ট্যাক্সির ডিকিতে হাত-পা শেকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় রাত্তিরে শেয়ালদা -ক্যানিং রেললাইনে ফেলে দিয়ে গেল। পুরো হিন্দি ফিল্ম।
    ঠিক সেভাবেই খবরটা পেয়ে ওর এক পুরনো বন্ধু, তখন সংগঠনে সিনিয়র, একজনকে বোঝাল যে এস-আর হোক, যাই হোক --নকশাল তো বটেক। ওকে বাঁচাতে হবে। সেই পথ দেখিয়ে জায়গাটায় নিয়ে গেল। তখনও কোন মালগাড়ি আসেনি। নইলে-। ওই অধ্যাপকটিও খুব ভদ্র, নরম স্বভাবের। কখনও কাউকে চড় মারেন নি।

    এখনও এদিকে দু'একটা টালির ছাদওলা বাড়ি রয়ে গেছে। ফুটপাথ সিমেন্টের, তাতে একপাশে কালো হলুদ দিয়ে সোঁদরবনের বাঘের মত ডোরাকাটা। আঙিনার ভেতর থেকে কখনও উঁকিঝুকি মারে দোলনচাঁপা, জবা বা টগরফুলের গাছ। আর কোথাও ফুটপাথের গায়েই পুরনো মাস্তানের মত মাথা তুলে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে একটা নারকোল গাছ। বয়সের ভারে হেলে গেছে।
    সন্ধ্যে নেমেছে অনেকক্ষণ।
    কিছু জিন্স ও লেগিংস পরা কিশোরী চলে যায় কলকল করতে করতে, পিঠে ঢাউস ব্যাগ, গন্তব্য সম্ভবতঃ কোন কোচিং ক্লাস। পাড়ার ভিতরে ত্রিফলাবাতি নেই।কিন্তু ল্যাম্পপোস্ট অগুনতি। বেশিরভাগের মাথায় আলো জ্বলছে।
    আমরা ফিরছি। অনেক অনেক আড্ডা হল। চলে আসার সময় বিজনদার বিষণ্ণ মুখ। আবার আসিস কিন্তু। তুই তো এখন কোলকাতাবাসী হয়ে গেছিস। অসুবিধে কী?
    -- হ্যাঁ, হ্যাঁ। আসবে না মানে? ওর ঘাড় আসবে।তুমি এমন রেঁধে বেড়ে খাওয়াবে আর ও আসবে না।
    --ধ্যাৎ, আমি কি খেতে পাই নে? নাকি হ্যাংলা?
    --দুটোই। তোর মত যেচে একা থাকার লোকেরা নিজেরা কত রেঁধে খায় আমার জানা আছে। তোদের দর্শন হল-- ভোজনং যত্র তত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে।
    --- ভাগ শালা! তোর মত ফ্ল্যাটের মালিক নই, কিন্তু মাথার ওপর একটা ছাদ ঠিকই আছে। এজমালি তো কি?
    বিজনদা হাসে। বাগানের কাঠের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে আসে। মনে হয় গলির মুখটা অবদি এগিয়ে দেবে।
    --কিছু মনে করিস না রমেন, ও তোকে হিংসে করছে। মানে তোর স্বাধীনতা, সে ওর কপালে নেই।
    --- ভুল বুঝছ বিজনদা! তোমরা দুজনই উমাহারা মহেশ্বর। শ্মশানে মশানে বাস। পুরনো দিনের গাঁজার ধোয়ার মৌতাতে তোমাদের জমবে ভাল।
    --- কাল আসতে পারবি?
    --না, না। কাল নয়। পরে আরেকদিন। ওর মিশন ফেরারি ফৌজ চলছে যে! খুঁজে বেড়াচ্ছে পুরনোদিনের সাত ঘোড়সওয়ারকে।
    --- ক'জনকে পেল?
    --- বিমলেন্দু, আমি আর তুমি। এখনও চারজন বাকি।
    -- তো কালকে কার ইন্টারভিউ নিবি?
    --- না, বিজনদা, ইন্টারভিউ-টিউ নয়। আমি দেখতে চাই তোমরা কেমন আছ? কী ভাবছ? প্রায় আদ্দেক শতাব্দী পেরিয়ে গেল যে! এই বদলে যাওয়া সময়টাকে বুঝতে চাইছি, ধরতে চাইছি।
    -- বেশ তো, কাল কার বাড়ি যাবি বল?
    --বুঝতে পারছি না। ভাবছি আমাদের চে গুয়েভারা সজলের খোঁজ নেব। সেই যে ছোটবেলা থেকেই হাঁপানীতে খুব ভুগত আর নিজেই দরকার মত ডেরিফাইলিন, অ্যামিনোফাইলিন ইঞ্জেকশন ঠুঁসে নিত। এর পরে যাব প্রিয়ব্রতর বাড়ি। শংকর হটাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। বিজনদা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে।
    এদিকে আজকাল গাছে গাছে ঝোপেঝাড়ে জোনাকিরা জ্বলে- নেভে করে না। কোথাও টিভিতে পুরনো ফিল্মি গান বাজছে-- রমাইয়া বস্তাবইয়া! রমাইয়া বস্তাবইয়া! তেলেভাজার দোকানের সামনে কিছু লোকজনের গজল্লা।
    --কী হল? অমন চুপ মেরে গেলে যে?
    -- কেন তুই জানতিস না?
    --কী জানব?
    --- ওরা দুজনেই নেই।
    --কোলকাতার বাইরে? আমার মত প্রবাসী বাঙালী?
    --- না, ওরা দুজনেই মারা গেছে। সেই সত্তরের প্রথম দিকে।
    --- সে কী? কী করে? কী হয়েছিল?
    -- ওসব শংকরের থেকে পরে শুনে নিস। তোরা এখন যা! ভালো লাগছে না।
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৪ নভেম্বর ২০২০ | ৩১৮ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বোকা | 31.220.40.239 | ১৮ নভেম্বর ২০২০ ২২:০৩100458
  • এটা কি নতুন স্টাইলের লেখা? সাদা খাতা জমা দেবার মতন  কিছু?

  • অরিন | ১৮ নভেম্বর ২০২০ ২৩:৫২100459
  • ওমা, শোনেন নি, "কত কথা যাও যে বলি কোন কথা না বলে/ তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি?", এ হচ্চে তার পোস্ট মডার্ন অবতার। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন