• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

  • হিপনোসিস নিয়ে দু'চার কথা

    ডাঃ অভীক লায়েক
    আলোচনা | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৬৭৮ বার পঠিত
  • ৪.৪/৫ (৫ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ছোটবেলায় সম্মোহন নিয়ে মনে মনে ফ্যান্টাসাইজ করেনি এমন মানুষ আমাদের পরিচিত বৃত্তে বিরল। মহাভারতে অর্জুনের সম্মোহন বাণ, সোনার কেল্লার সেই বিখ্যাত মুকুল মুকুল খেলা, জয়ন্ত মানিক বা কাকাবাবুর উদ্ভট সব সম্মোহনী কাজকর্ম, প্রফেসর শঙ্কু আর হংকংয়ের জাদুকর চী চিংএর টক্কর পড়ে দেখে আর পি সি সরকারের অদ্ভুতুড়ে ট্রেন ভ্যানিশের গল্প শুনে আমরা বড় হয়েছি। পরে সাইকিয়াট্রি পড়তে এসে দেখেছি ব্যাপারটা ঠিক ওরকম না। সম্মোহন বলতে ঠিক কী বোঝায় ঠিকঠাক জানা না থাকায় যে যার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রাণ ভরে বলে গেছেন।

    তাই সম্মোহন, হিপনোসিস নিয়ে একটু গল্প করা যেতেই পারে। প্রচুর মিথের আধার এক কথায়। এবং নামেই পরিচয় সেই মিথের। কারণ যদিও গ্রীকে hypnos মানে ঘুম, হিপনোসিস কিন্তু কোনোভাবেই ঘুম না। এমনিতেও না, ওমনিতেও না। ক্লিনিক্যালিও না, ইইজির ওয়েভ প্যাটার্নেও না। এটা বেসিক্যালি একটা জটিল সেরিব্রাল প্রসেস, যা অ্যালার্টনেস আর অ্যাটেনশন ঘিরে তৈরি হয়। আরেকটা কথা, ক্লিনিসিয়ান বা ম্যাজিশিয়ান আপনাকে তার প্রবল দক্ষতায় হিপনোটাইজ করে ফেললো, বা আপনার ওপর হিপনোটিক ট্রান্স প্রোজেক্ট করলো, এমন না। তার দক্ষতা একটু লাগে, কিন্তু আদতে এটা আপনারই প্রতিভা, আপনি গিফটেড মানুষ, সহজে হিপনোটাইজড হন, ক্লিনিসিয়ান বড়জোর আপনার ক্যাপাবিলিটি বুঝে আপনাকে সেদিকে কিছুটা সাহায্য করেন। এবং সেটা কাজে লাগিয়ে রকমারি সমস্যায়, ব্যথা, উদ্বেগ, বদভ্যাস, ডিসোসিয়েটিভ সমস্যা - এসব কমাতে বা কাটাতে সাহায্য করেন।

    এসবে পরে আসছি। একটু ঐতিহাসিক ধরতাই দিই। পুরনো যুগ থেকেই জনপ্রিয় ধারণা। ওঝা, চিকিৎসক, জাদুকর, ধর্মগুরু। ভারত, চীন, মিশর। এমনকি হিব্রু বাইবেল বা ওল্ড টেস্টামেন্ট। তারপর শেষে এলেন ফ্রাঞ্জ আন্তন মেসমার। আঠারো শতকের শেষে। এঁর কনসেপ্ট ছিল ম্যাগনেটিজম। তরল চৌম্বক ইথারের আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। দেহের মধ্যে সেই চৌম্বক প্রবাহ বাধা পেলে যত রোগের বহিঃপ্রকাশ। রোগীর ম্যাগনেটিক এনার্জি কমে গেছে। ডাক্তার তাকে হিপনোটাইজ করে নিজের ম্যাগনেটিক ফিল্ড কাজে লাগিয়ে রোগীর দেহে এক অদৃশ্য জীবনরস সঞ্চার করবেন। স্বাস্থ্য ফিরে আসবে। এই বিচিত্র বা উদ্ভট চিকিৎসা পদ্ধতি পরিচিত হয়েছিল মেসমেরিজম নামে। ইউরোপে বিদগ্ধ সমাজ মোটের ওপর বুজরুক হিসেবেই ঠাউরেছিল সম্ভবত। তাও ফ্রান্সের রাজা ১৭৮৪ তে একটা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ব্যবস্থা করে, ইন্টারেস্টিংলি যাতে ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, আন্তইন ল্যাভয়শিয়ে এবং জোসেফ গিলোটিন। তো তাঁরাও পুরো জিনিসটাকে "উত্তপ্ত কল্পনা" হিসেবেই রিপোর্ট দেন। গুটিকয় শিষ্য ছাড়া মেসমার মূলত চাপাই পড়ে যান। কিন্তু মেডিক্যাল হিপনোসিস শব্দটা থেকে যায়।

    এর পরের ৫০ বছর ইউরোপের রাজনীতি এই চর্চাকে খুব বেশি উৎসাহ দিতে পারে নি মনে হয়। ১৮৪০ এর দশকে মেসমারের পুনরুত্থান ঘটে। জেমস ব্রেইড, ইংল্যান্ডে রিপোর্ট করেন যে তিনি নাকি চোখের ফিক্সেশন ও চোখ বন্ধ করার মাধ্যমে মেসমারিক ট্রান্স তৈরি করতে পারেন। উনি এর নাম দিলেন monoideism।

    প্রসঙ্গত ভারতে এইসময় এক স্কট ডাক্তার, জেমস এসডেইল, অপারেশন টেবিলে মেসমারের মেথড ব্যবহার করে নাকি বেশ সাফল্য পেয়ে যান। তখনো এনেস্থেটিক ভালো আসে নি। এতে নাকি বেশ বিনা যন্ত্রণায় সার্জারি করা যায় বলে তিনি জানান। কিন্তু পণ্ডিতমহলে বিশেষ কল্কে পান নি। বস্তুত ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি ডাঃ জন এলিয়টসন ল্যান্সেটের একজন সম্পাদক ছিলেন। তিনি মেসমেরিজম নিয়ে সমর্থন জানাতে শুরু করায় তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়।

    কিছুটা চাকা ঘোরে ১৮৮০র পর। ফ্রান্সে ফাদার অব নিউরোলজি বলা হত জঁ মতেন শার্কো-কে। শার্কো জানান হিপনোটিক অবস্থা আসলে একটা স্নায়বিক ঘটনা এবং মানসিক অসুস্থতার একটা লক্ষ্মণ। পিয়ের জ্যানেট তাঁকে সাপোর্ট করেন। জিনিসটা অনেকটা হাওয়া পায়। ভারতের মতো দেশগুলোতেও এ নিয়ে কিছু নাচানাচি হয়। এইসময় ফ্রয়েড ভিয়েনায় যতটা সম্মান চাইছিলেন, ততটা না পাওয়ায় প্যারী এসেছেন। তিনি শার্কোর সাথে হিপনোসিস নিয়ে নাড়াচাড়া করলেন। নিন্দুকে বলে তিনি নাকি একজন রোগীকেই স্টাডি করেন, যাঁর নাম জোসেফ ব্রয়ার। ফ্রয়েডের বুকের পাটা ছিল। এ থেকেই তিনি বলেন হিপনোসিসের মাধ্যমে রোগী তার পুরনো ট্রমার অভিজ্ঞতা আনে, উনি তার নাম দেন abreaction। তবে কিছুদিন পর তিনি হিপনোসিস বাতিল করেন, হিপনোটিক ট্রান্সের সময় নাকি রোগী ও ডাক্তারের মধ্যে ইমোশনাল সম্পর্ক বা ট্রান্সফারেন্স তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা বর্জনীয়। এই ব্যাপারে ফ্রয়েডের এসোসিয়েশন টেকনিক নিরাপদ।

    ফ্রয়েড হাত ছেড়ে দেওয়ায় বিংশ শতকের শুরুতেই হিপনোসিসের বাজার দর অনেকটাই পড়ে যায়। প্রথম মহাযুদ্ধের শেল শকড সেনাদের নিয়ে আর্নস্ট সিমেল কিছু কাজ করলেও এর আসল গুরুত্ব বোঝা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ওইসময় ব্যথা, ক্লান্তি, নিউরোসিস সামলাতে ভালো কাজ করে হিপনোসিস।

    এর মাঝে স্পিগেল আর ওয়াটকিন্স ভালো থিওরি এনেছেন, ইভান পাভলভ বায়োলজিক্যাল দিকটা বোঝার চেষ্টা করেছেন, হাল, ওয়াইৎসেনহফার, হিলগার্ড তাত্ত্বিক ও প্র‍্যাকটিকাল দিকটাকে আরো বাড়িয়েছেন। শেষটায় ১৯৫৫তে বৃটিশ মেডিক্যাল সোসাইটি আর ১৯৫৮য় আমেরিকান মেডিক্যাল ও সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন নিরাপদ আর কাজের চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে একে স্বীকৃতি দেয়।

    এবং একটু সিরিয়াস কাজকর্ম শুরু হয়। হিলগার্ড আর ওয়াইৎসেনহফার তৈরি করেন স্ট্যানফোর্ড হিপনোটিক সাসেপটিবিলিটি স্কেল। তাঁরা দেখেন মোটের ওপর ৮-১০% জনতা আছে, যারা হাইলি হিপনোটাইজেবল। ৮৪-৮৮% মডারেট আর ৪-৬% লো। ওই হাই এবং কিছু মডারেট লোকের মধ্যেই সেই বৈশিষ্ট্যাবলী আছে যাতে তারা খুব সহজে হিপনোটাইজড হতে পারে, এবং তাদের ক্ষেত্রেই হিপনোসিস খুব কার্যকরী চিকিৎসাপদ্ধতি হতে পারে কিছু কিছু রোগের জন্য। তাঁরা আরো দেখলেন যে এই বৈশিষ্ট্যগুলোও স্ট্যাটিক না, বয়সের সাথে একটু আধটু পাল্টায়। সাধারণত ৯-১২ বছর বয়সের জনতা যারা বেশি কল্পনাপ্রবণ, ফ্যান্টাসিতে থাকে, এবং যাদের কনক্রিট অপারেশনাল থিঙ্কিং তৈরি হচ্ছে, তারা বেস্ট ক্যান্ডিডেট। মজার ব্যাপার, সাময়িকভাবে এলেসডি বা এমডিএমএ জাতীয় ড্রাগ বা সেনসরি ডিপ্রাইভেশন কিছুক্ষণের জন্য এই হিপনোটাইজেবিলিটি বাড়িয়ে দিতে পারে, যদিও সেটা বেশিক্ষণ টেকে না। আর হ্যাঁ, কোন ধরনের লোক সহজে হিপনোটাইজড হবে আন্দাজ করার কোনো নিখুঁত রুল অব থাম্ব নেই, মোটামুটি মনোসংযোগদক্ষতা, একাগ্রতা, কল্পনাপ্রবণ ও অনুভূতিপ্রবণ মানুষের সম্ভাবনা বেশি থাকে। আমার সামনের লোকটি হাই হিপনোটাইজার কি না, তা বোঝার স্কেল থাকে, এবং সাধারণত তা বোঝার পর হাই জনতাদেরই হিপনোসিস অফার করা হয় চিকিৎসার ক্ষেত্রে। পাতি লক্ষ্মণবিচার আর কি। সেইসব টেল টেল সাইন দেখে বোঝার চেষ্টা করা হয় সামনের ইনি সেই গিফটেড ৮% এর মধ্যে পড়েন কিনা। মার্কিনীরা সেইসব লিস্টির গালভরা নাম দিয়েছে - "হিপনোসিস ইন্ডাকশন প্রোফাইল", " স্ট্যানফোর্ড হিপনোটিক সাসেপটিবিলিটি স্কেল", "হার্ভার্ড গ্রুপ স্কেল অব হিপনোটিক সাসেপটিবিলিটি", "বারবার সাজেস্টিবিলিটি স্কেল" ইত্যাকার। এর মধ্যে ঐ হিপনোসিস ইন্ডাকশন প্রোফাইলটায় তো মাথার ওপর দিকে তাকাতে বলে চোখে স্ক্লেরার ভিজিবিলিটি দেখেই কিসব বোঝা যায় বলে দাবী করে। আর তার মেডিক্যাল ব্যাখ্যাওয়ালা হাইপোথিসিস রয়েছে গুটিকয়, যদিও এভিডেন্স বেসড নয়। সবার ওপরে, যিনি করবেন, তাঁর মানুষ চেনার এতদিনের অভিজ্ঞতা।

    কিভাবে, বা কোন কোন ফ্যাক্টর হিপনোসিসে মূল ভূমিকা নেয়, তা নিয়ে বিতর্ক আছে যদিও। কারো দাবী থেরাপিস্ট যে সাজেশন দিচ্ছেন তাই নির্ণায়ক, কেউ বলেন রোগীর সামাজিক নির্মাণ।

    একইরকমভাবে হিপনোসিসের সময় আমাদের কী কী পরিবর্তন হয়, তা নিয়েও মতভেদ আছে। হিলগার্ড ছ'টা মূল এলাকা দেখিয়েছেন। এক, সাজেশন অনুসারে কিছু মোটর রেসপন্স বেশি বেশি হবে, কিছু একদম হবে না। এর মধ্যে চোখ খোলা বন্ধ, হাত পা নাড়া, স্ট্যাচু হয়ে যাওয়া, কথা বলা ইত্যাদি। দুই, ইমেজারি, অর্থাৎ নিজের মনের মধ্যে কিছু দেখা, শোনা, অনুভব করা। তিন, স্মৃতি। সাধারণত তাৎক্ষণিক তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা বেড়ে যায়, কিন্তু পার্সনাল বা লজিক্যাল ক্ষেত্রে কমে যায়। চার, বেদনাবোধ চলে যাওয়া এবং হ্যালুসিনেশন। পাঁচ, সাময়িকভাবে ভাষা, মানুষ চেনা এইসব কাজেও গোলমাল। ছয়, হিপনোসিসের পরেও কিছুক্ষণের জন্য বিস্মৃতি আর একটু উল্টোপাল্টা ব্যবহার। সাধারণত জ্ঞান চলে যাওয়া পুরোপুরি হয় না, যেটা হয়, সবদিকে মন না দিয়ে শুধুমাত্র থেরাপিস্ট ও তার সাজেশনের প্রতি সূচীভেদ্য মনোনিবেশ।

    ওই মনোযোগ বা অ্যাটেনশনটাই মূল জায়গা। বস্তুত ওখান থেকেই সব। সেজন্য দেখুন তারাই ভালো হিপনোটাইজড হয়, যারা দারুণ মনোযোগী। সব কিছুর মাঝেও কোনো একটাতে ফোকাস করার প্রভূত ক্ষমতা রাখে। মনোযোগের অন্তত তিনটে জায়গায় প্রভাব ফেলে। প্রথমত, অ্যালার্টনেস। শুধুমাত্র একটা দিকে, বাকি দিকে নয়। দ্বিতীয়ত, ওরিয়েন্টেশন। আর তৃতীয়ত, হাইয়ার কর্টেক্সের কন্ট্রোল। ভালো কথা, পণ্ডিতেরা বলছেন এই অ্যাটেনশনাল শিফটের ম্যাগনিচিউডটা নাকি বড্ডো বেশি, প্রচণ্ড ল্যাদ খেতে খেতে বা বইজাতীয় কিছুতে বুঁদ হয়ে গেলেও আসার কথা না, অন্তত আমার আপনার মতো লো হিপনোটাইজারদের ক্ষেত্রে।

    এই যে হিপনোটিক ট্রান্স, এইসময় লোকজন যেন নিজের ইচ্ছে নিরপেক্ষভাবে অনেক কিছু করে যায়, তার নিজের ক্রিটিক্যাল জাজমেন্ট যেন সাময়িকভাবে থেমে যায়, যেন নিজের থেকে বেরিয়ে নিজেকে দেখছে, অর্থাৎ একটা ডিপার্সনালাইজেশন বা ডিসোসিয়েটিভ অবস্থা হয়, অনেকে ক্যাটালেপ্সি দেখিয়ে ভজগৌরাঙ্গ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে, কিছু ক্ষেত্রে ভুলে যাওয়া, আবার কিছু ক্ষেত্রে নষ্টস্মৃতি পুনরুদ্ধার দুইই হতে পারে, সাজেশন দিলে অনেকসময় তার মানসিক বয়স যেন পিছনে হাঁটতে থাকে, রেয়ারলি সামনের দিকেও, সময়ের বোধ ঘেঁটে যেতে পারে, এমনকি কখনো কখনো স্বপ্নও এসে যায় বলে দাবী করা হয়।

    ওরিয়েন্টেশন মানে আমার চারপাশের পরিবেশ সম্বন্ধে আমি কতটা অবহিত আছি তার একটা রাফ এস্টিমেট। খুব তাড়াতাড়িতে তিনটে জিনিস দেখা হয় - স্থান, কাল, পাত্র। এই জ্ঞান ঠিকঠাক থাকলে সে রোগী ওয়েল ওরিয়েন্টেড।

    হাইয়ার প্রসেস মানে বলতে চাইছি এক্সিকিউটিভ অ্যাটেনশনাল প্রসেস, যেটা আপনে আপ হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ঐচ্ছিক কেন্দ্র থেকে সচেতন নির্দেশের ফলে হয়। আমি পড়ছি, পাশে রাহুল দ্রাবিড় টিভিতে ব্যাট করছেন, বাইরে মুন্নি বদনাম হুয়ি বাজছে - এবার আমি কোনখানে আমার অ্যাটেনশন দেব, এটা আমার সজ্ঞান সিদ্ধান্ত। অথবা, তিনটেই আসবে, কিন্তু কোনটা কতটা আসবে এই ভাগ। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমার ক্রিটিক্যাল জাজমেন্ট কতটা থাকবে, আমি বাস্তব পরিস্থিতি কতটা আঁচ করবো। এবং সেই অ্যাটেনশন থেকে আমার পরবর্তী মোটর কাজকর্ম কতটা প্রভাবিত হবে, এইসব।
    অ্যাটেনশন শিফটের ম্যগনিচিউড মানে কত ইনটেন্সলি বাকি সব ভুলে একটায় বুঁদ হয়ে আছি, গভীরতা। দাবী করা হয় হিপনোসিসে নাকি অনেক বেশি ইনটেন্স অ্যাটেনশন পরিবর্তন হয় আমাদের দৈনন্দিন কাজের তুলনায়।

    ব্যথা আর হিপনোসিসের দু-তিনটে ব্যাপার আছে। ব্যথা দুরকম ভাবে ভাবতে পারি, অ্যাকিউট আর ক্রনিক। প্রথমটায় আসি। এটা সত্যি কোনো শারীরিক কারণ থাকার জন্য হতে পারে, মানসিক কারণেও হতে পারে। শারীরিক ব্যথার হিপনোসিসে সাময়িক উপশম হবে, যেমন পেইনকিলার ওষুধ খেলে হয়। পার্থক্য, সবার হবে না, যারা হাই হিপনোটাইজার, তাদের হবে, অন্তত সম্ভাবনা বেশি থাকবে। এর প্রভাব কতক্ষণ থাকবে স্থির নেই, রোগীর ওপর, এবং তাঁর শারীরিক সমস্যার তীব্রতার ওপর নির্ভর ক'রে ট্রান্সের সাথে সাথে কেটে যেতে পারে, আবার কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনও থাকতে পারে। গত ১৫ বছরে এই নিয়ে কাজকম্মো হয়েছে বার্ন ইনজুরিতে, প্রসবযন্ত্রনায়, সার্জারির আগে। আবার ব্যথা মানসিক কারণে হলে প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়, তুলনায়। রোগীকে শেখানো হয় সেল্ফ-হিপনোসিস, যাতে তিনি প্রয়োজন মত নিজেই নিজেকে সাজেশন দিয়ে পরবর্তী ক্ষেত্রে সমস্যা কমিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু ক্রনিক পেইনের সময় এভাবে সাময়িক উপশমের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যথার ফলে সৃষ্টি হওয়া অন্যান্য সমস্যার নিরসন, যেমন তজ্জনিত ডিপ্রেশন, ডিমরালাইজেশন, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি। হিপনোসিস এখানে এগুলোকে বেশি করে টার্গেট করে। হিপনোটিক প্রসেসকালে ব্যথা অনুভব হয় না কেন, এটার একটা মেডিক্যাল মডেল আছে। বস্তুত পেইন ফিজিওলজিটাই খুব মজাদার। ছোটবেলায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে কেন ব্যথা কমে যায়, সেটা জেনে বেশ পুলকিত হয়েছিলাম মনে পড়ে। ব্যথার গতিপথ সেনসরি রিসেপটর থেকে স্পাইনাল কর্ড, তারপর পিএজি, থ্যালামাস, র‌্যাস পেরিয়ে কর্টেক্স। এর বিভিন্ন স্তরে ইন্টেরাপ্ট করে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করা হয়। মরফিন যেমন স্পাইনাল রিসেপটর আর মিডব্রেন দুখানেই কাজ করে। গরম সেঁক, হাত বুলিয়ে দেওয়া, বরফ ঘষা, মাসল রিলাক্স্যান্ট, আকুপাংচার, অ্যাসপিরিন বা এনেসেআইডি স্পাইনাল লেভেলে কাজ করে রিসেপটর অকুপাই ক'রে। ইলেকট্রিক শক বা অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট আবার মিডব্রেন-ব্রেনস্টেমে কাজ করে। তেমনি বায়োফিডব্যাক, হিপনোসিস, স্ট্রেস রিডাকশন কর্টেক্সে কাজ করে। রোনাল্ড মেলজ্যাকের এটা নিয়ে বহুদিনের কাজ ছিল।

    এবার আলোচ্য সমস্ত কিছুর নিউরোবায়োলজিক্যাল এভিডেন্স যে নেই, তা তো বুঝতেই পারছেন। বস্তুত, ট্রান্সের সময় যেটুকু পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা ওইসব সাজেশনের জন্যই হচ্ছে কি না সেটাই তো বোঝা চাপ। ইইজি করে বিশাল কিছু মেলে নি। মাথার পিছনদিকে থিটা ওয়েভ বেশি আসে যেটা রিল্যাক্সড থাকলে হয়েই থাকে। আর দেখা গেছে লো হিপনোটাইজারদের চেয়ে হাই-দের মাথার সামনের দিকে থিটা ওয়েভ বেশি মেলে, যেটা তাদের কল্পনাপ্রবণতা আর বেশি মনোসংযোগদক্ষতার পরিচায়ক। যেটা মুশকিল সেটা হল ব্রেনের সব জায়গার অ্যাক্টিভিটি ইইজি হিসেবে একরকম ভাবে আসে না। বিটা ব্যান্ড মূলত কগনিটিভ টাস্কের সাথে জড়িত থাকে। আবার বেশিরভাগ ইইজি কার্ভ দেখবেন, বিটা সাধারণত থিটা ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে থাকে। এমনিতে বিটার ক্লিনিক্যাল গুরুত্ব খুব বেশি না। মজার ব্যাপার ৬-৭ হার্জের থিটা, যেগুলো ১৫ মাইক্রোভোল্টের মত থাকে সেগুলো প্রাপ্তবয়স্ক লোকের রিল্যাক্সড অবস্থায় দেখা যায়। আবার বাচ্চাদের ঘুমের সময়ও খুব দেখা যায়। সান্তামারিয়ার ১৯৮৭ সালের পেপার অনুসারে থিটা ওয়েভ বেড়ে যায় হাইপারভেন্টিলেশনে (প্রসঙ্গত এতে আলফাও বেড়ে যায়) এবং মেন্টাল টাস্ক পারফর্মেন্সের সময়। এই রিদম কোথায় শুরু হচ্ছে আরেকটু ডিটেলে জানার জন্য ম্যাগনেটোএনকেফালোগ্রাফি বা এমইজি বাজারে আসে। ওতে কয়েকটা স্টাডি দেখিয়েছিল ফ্রন্টাল ইলেকট্রোডগুলোতে ৫-৭ হার্জের থিটা পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষত যখন মানসিক হিসেব করছি বা খুব ইনটেন্সলি চিন্তা করছি। একটা থিওরি বলে অ্যালার্ট থাকার সাথে পূর্বনির্ধারিত স্মৃতি বা ইমোশন থাকলে সম্ভবত লিম্বিক সিস্টেম তথা হিপ্পোক্যাম্পাস উত্তেজিত হলে টেম্পোরাল ইলেকট্রূডে থিটা দেখা যায়। এবার থিটার মত একটা নিচের ফ্রিকোয়েন্সির ওয়েভ কেন কখনো কখনো এসব উত্তেজনার সময় দেখা যাচ্ছে? এক্ষেত্রে মনে হয় আমাদের ওয়েভ আকার, সময় ইত্যাদির ওপর আরো যে ফ্যাক্টরগুলো কাজ করে, তাদের কথাও ভাবতে হবে; যেমন কারেন্ট জেনারেটর থেকে ইলেকট্রোডের দূরত্ব, যেখানে সিগন্যাল তৈরি হচ্ছে সেখানকার পিরামিডাল সেল লেয়ারের অ্যানাটমিক্যাল ওরিয়েন্টেশন (মানে ঐ নিউরোনগুলো রেডিয়াল ফিল্ড বানালে যতটা সিগন্যাল স্ট্রেংথ যাবে, ট্যানজেনশিয়াল ফিল্ডে অতটা হবে না ইত্যাদি), পাশাপাশি থাকা নিউরোনের সিঙ্ক্রোনাস অ্যাক্টিভেশন ইত্যাদি। সব মিলিয়ে জিনিসটা দেখা যায়।

    হাই আর লো-র মধ্যেকার কিছু তফাৎ নিউরোইমেজিং করেও পাওয়া গেছে। PET আর fMRI মতে হাইদের এক্সিকিউটিভ কন্ট্রোল সিস্টেম আর এটেনশন নেটওয়ার্ক বেটার।

    আমির রাজ হিপনোটিক ট্রান্সের মাঝে কিছু পরিবর্তন দেখেছেন। স্পেশালি সাজেশন দিলে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে সিঙ্গুলেট কর্টেক্সের সামনের দিকে, যেটা অ্যাটেনশন আর মোটর কো-অর্ডিনেশন এবং পার্সেপশনের একটা বড় ঘাঁটি। এছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে ডানদিকের অরবাইটোফ্রন্টাল কর্টেক্সের বেশি কাজ, প্রাইমারি মোটর কর্টেক্স আর প্যারাইটাল লোবের কম কাজ, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন দেখার সময় ফিউসিফর্ম আর লিঙ্গুয়াল কর্টেক্স উত্তেজিত হলে তবেই উল্টোপাল্টা রঙ দেখা এসবও আছে। বলা হয়, এগুলো হল টপ ডাউন ফান্ডা। সবার ওপরে সচেতন কর্টেক্স ব্রেনের সব জায়গাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, যদিও বাস্তবে কাজের সময় কিছু জায়গাকে ফ্রিহ্যান্ড দেয়। এবার সাজেশন পেলে যারা হাই হিপনোটাইজার, তাদের ব্যতিক্রমী অ্যাটেনশনাল ফিল্টারিং নেটওয়ার্ক আর সেনসরি-পার্সেপচুয়াল গেটিং কর্টেক্সের রাজত্বে একটা সাময়িক ক্যুদেতা ঘটিয়ে দেয়। এটা হাইপোথিসিস। ব্রেন ইমেজিং আরো উন্নত না হওয়া অব্দি অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই।

    এ তো গেল ইতিহাসের কথা। এর বর্তমান স্ট্যাটাস কী, জেনে নিই। তথাকথিত হিপনোসিস করে যা কিছু করা যায় বলে দেখা গেছে, তাদের জন্য যে হিপনোসিস আবশ্যিক এমন কোনো কথা নেই। বস্তুত ওই যে বলা হল, অ্যাটেনশন আর মোটিভেশন - এরাই হলো আদত চালিকাশক্তি। তাই থার্ড ওয়েভ সাইকোথেরাপির যুগে এদেরকেই প্রাধান্য দিয়ে আনা হয়েছে একের পর এক থেরাপির মডেল। চিকিৎসার ক্ষেত্রে হিপনোসিস আপাতত ঐতিহাসিক গুরুত্বেই থেকে যাবে। স্বাভাবিক ভাবেই গল্পে ছবিতেও তার আর তেমন ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না, খুব বাজে ব্যাকগ্রাউন্ড রিসার্চ করা শিল্প ছাড়া।
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৬৭৮ বার পঠিত
  • ৪.৪/৫ (৫ জন)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৮:১৯97331
  • সন্মোহনের আদ্যপান্ত জেনে ভাল লাগলো। যদি ভুল করে না থাকি, ফ্রয়েডই কী প্রথম আধুনিক চিকিৎসায় সন্মোহনের সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যবহার করেছেন?

     

    আশকরি, ভবিষ্যতে চিকিৎসায় এর নিরাপদ ব্যবহার আরো বাড়বে।

    আরো লিখুন। আরো জানতে চাই।

    #

    এপারে সিলেটের এক স্কুল শিক্ষক ক্লাস শুরুর আগে ছাত্রছাত্রীদের দু-তিন মিনিটের জন্য চোখবুঁজে আত্মসন্মোহন চর্চা করান। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, মনছবিতে পাঠ নির্দেশিকা ধরা গেলে লেখাপড়া ভাল হয়, সবকিছু অনেক বেশী মনে থাকে।

    এ নিয়ে খবরের কাগজে শীর্ষ সংবাদও হয়েছে।

  • avi | 2409:4061:193:e4d2:7093:db68:7618:882f | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১০:০১97336
  • নাহ, ফ্রয়েড আর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মোটের ওপর বিপরীত মেরুতেই থাকত।

    হিপনোসিস নিয়ে বৈজ্ঞানিক ভাবে কাজ করার চেষ্টা হয়েছে পঞ্চাশের দশকের পর থেকে। শেষ অব্দি তেমন কিছু কনক্লুসিভ মেলে নি। আজকাল সাইকোথেরাপিতে বিশেষ ব্যবহার হয় না। পরীক্ষামূলক ভাবে আমরা দুয়েকবার করে দেখেছি, খুব আশা জাগানো কিছু নয়।

    চোখ বুজে আত্মসম্মোহন যেটা লিখলেন, সেখানেও সম্মোহন স্রেফ কথার জাগলারি, আদতে ওই রিল্যাক্সেশন, মোটিভেশন, কনসেনট্রেশন - এগুলো কিছুটা কাজ করে। সম্মোহনের বাড়তি গুরুত্ব কম।

  • Ranjan Roy | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৭:৫০97349
  • অনেক ধন্যবাদ ড:  লায়েক।

     এসব বিশ্বাস করতে মন চাইত না । বড় বড় ক্লেইম, কিন্তু ব্যখ্যাগুলো কখনও জুৎসই লাগেনি।

  • সুকি | 49.207.206.16 | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৮:৩৫97363
  • ভালো লেখা - এই নিয়ে ব্যক্তিগত ইন্টারেষ্ট আছে তাই আরো ভালো লাগলো। 

  • একক | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৯:৩৭97367
  • এনেলপির ক্লাস করেছিলুম সে বহুকাল আগে,  কল্কাতায়, যিনি ট্রেনার ছিলেন, প্রদীপ আগরওয়াল দেখি এখন হায়দরাবাদে ক্লাস  নেন।  ত সেই সময়েই সম্মহন, আত্মসম্মহন নিয়ে আগ্রহ।  বাট,  সিরিয়াস্লি,  যতই চোখের সামনে দেখার অভিজ্ঞতা থাক, যদ্দিন না খুলির ওপর তার চিপকে, মেপে জুকে একটা হিসেব পাচ্ছি,  ব্যাপারটা গ্রহনযোগ্য লাগে না। 

    হ্যাঁ,  ওই " নিজেকে দেখা    " ইত্যাদি নিয়ে কিছু অভিজ্ঞতা আচে,  এখানে প্রসংগ করা উচিৎ কিনা জানি না,  সবচে বড় কথা সে ফেজ গুলো মোটেই লোকে যেমন কল্পজগতের মত করে বন্ননা দেয়, তার ধারেকাছে না।  

    লেখাটার এপ্রচ খুব ভাল্লাগল। ব্যালান্সড।                 

  • sk | 37.111.239.43 | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:৪৬97414
  • কতকগুলো কথা মনে এলো লেখা ta পড়ে 

    ১। ৮-১০% তো পলিটিক্যালি খুব বেশি মেতে যায় , হুজুগে নেচে যায়, কোর  ফ্যাসিস্ট অনুপাতও ওদের ভয়ংকর সুদিনে ওই রকম সংখ্যাই তো মনে হয় বলে আজকাল ইতিহাস নিয়ে  podcast এ।

    ২। ৮৪% er জন্য কি এটা প্লাসিবো effect er মত  কাজ করছে না?

    ৩।  (সুস্থ মানুষদের জন্য)  আজকাল যেটা  শিল্পসাহিত্যলিরিক লেখায় flow ফ্লোস্টেট বলে - শেষের দিকটা পড়ে সেই  কথা মনে এলো।

    ফ্লো স্টেট নিয়ে আজকাল মোটিভেশনাল বই পত্র ভিডিও  হয় , সেখানে ঐ অটো সাজেশানকে আরো লজিক্যালি  ভাঙ্গা হয়  -  CBT , DBT র কথা ভাবছিলাম আরকি।

  • Debasis Bhattacharya | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১০:০০97457
  • আমার মতে শেষের অনুচ্ছেদটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অথচ গোটা লেখায় তার ছাপ সেভাবে পেলাম না, ফলে এই অনুচ্ছেদটি অনেকটা বিচ্ছিন্ন এবং বিস্ময়কর হয়ে রইল । ওখানে এই যে বললেন ---  'তথাকথিত হিপনোসিস করে যা কিছু করা যায় বলে দেখা গেছে, তাদের জন্য যে হিপনোসিস আবশ্যিক এমন কোনো কথা নেই।বস্তুত ওই যে বলা হল, অ্যাটেনশন আর মোটিভেশন - এরাই হলো আদত চালিকাশক্তি।' --- এর বাস্তব অর্থ খুবই গভীর । সম্মোহন করে যা যা করা যায় সেটাই তো তার অস্তিত্বের প্রমাণ । কাজেই, সে সব করে দেখানোর জন্যে সম্মোহন জিনিসটাই যদি আদৌ না-ই লাগে, তাহলে তো সম্মোহন আদৌ 'কিছু একটা বটে' কিনা সে নিয়েই প্রশ্ন উঠবে । বস্তুত, গত প্রায় ষাট-সত্তর বছর ধরে সেই প্রশ্নই তুলে আসছেন থিওডোর সার্বিন, থিওডোর বার্বার, নিকোলাস স্প্যানোস প্রমুখ সম্মোহন তাত্ত্বিকরা । এখানে আপনি যাঁদের নাম করেছেন সেই শার্কো-ভাইটজেনহফার-হিলগার্ড প্রমুখ সম্মোহন-বিশারদদের ঘরানাকে বলা হয় 'স্টেটিস্ট স্কুল' বা দশাবাদী ঘরানা, আর আমি যাঁদের নাম করলাম তাঁদের ঘরানাকে বলা হয় 'সোশিও কগনিটিভ স্কুল' বা  সমাজ-অনুজ্ঞাবাদী ঘরানা । এই দ্বিতীয়োক্তদের বক্তব্য হচ্ছে, 'সম্মোহন' জিনিসটা হচ্ছে আসলে এক ধরনের সামাজিক ভূমিকা পালন মাত্র --- যেখানে ল্যাবরেটরি সেটিং-এ সম্মোহক ও সম্মোহিত উভয়েই ঠিক সেই আচরণই করেন যা তাঁদের কাছে প্রত্যাশিত --- সম্মোহন করতে ও সম্মোহিত হতে হলে কী কী আচরণ করতে হয় তাঁরা সেটা আগে থেকে জানেন এবং ঠিক সেটাই করে থাকেন, এবং সেটাই আবার সম্মোহন-পরীক্ষার আশ্চর্য ফলাফল হিসেবে গুরুগম্ভীর গবেষণাপত্রে লিপিবদ্ধ হয় । এই অসাধারণ বিতর্কটি বিজ্ঞান-ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে চমকপ্রদ বিতর্ক, অথচ শেষ প্যারাগ্রাফের ইঙ্গিতটুকু ছাড়া এ লেখায় সে কথা এল না । এলে পাঠকেরা চমৎকৃত ও সমৃদ্ধ হতেন বলেই আমার ধারণা ।

  • Debasis Bhattacharya | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১০:১৯97460
  • সম্মোহনের ইতিহাসেও কিঞ্চিৎ সমস্যা আছে বলে মনে হল । লেখাটি থেকে মনে হচ্ছে বুঝি 'হিপনোসিস' শব্দটি মেসমারের আমদানি, কিন্তু তা নয় --- শব্দটি আবিষ্কার করেছিলেন জেম্‌স্‌ ব্রেইড । পরে তিনি বুঝেছিলেন শব্দটি আদৌ সুপ্রযোজ্য হয়নি, এবং তখন তিনি পাল্টে এর নাম দিয়েছিলেন 'মোনোয়াইডিজ্‌ম্‌', কিন্তু ততদিনে আগের নামটি সংশ্লিষ্ট চর্চার পরিসরে শক্ত হয়ে এঁটে বসে গেছে, তাকে আর কোনওদিনই নড়ানো যায়নি । 

    ফ্রয়েড মাত্র একটি নয়, সারা জীবনে বহু রোগীই দেখেছিলেন, যদিও গবেষণার আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর কোনও  ধারণা ছিল না, ফলে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো সবই ছিল কাল্পনিক । জোসেফ ব্রয়ার তাঁর রুগি ছিলেন না, তিনি ছিলেন ফ্রয়েডের সহ-গবেষক, বস্তুত শিক্ষক ও গুরু । তাঁরা দুজনে মিলে এক রোগিনীকে নিয়ে এক বিখ্যাত ও সুদীর্ঘ কেস স্টাডি করেন, নাম গোপন রাখার জন্য তখন সেই রোগিনীর নাম দেওয়া হয়েছিল 'অ্যানা ও', আসল নাম ছিল 'বার্থা প্যাপেনহাইম' । এই কেস স্টাডির ওপর ভর করে তাঁরা যৌথভাবে লিখেছিলেন 'স্টাডিজ্‌ ইন হিস্টেরিয়া' । 

  • Debasis Bhattacharya | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১০:৩১97461
  • যখন লিখছেন, সম্মোহন দিয়ে ব্যথা উপশমের ব্যাখ্যা দেবার জন্য 'মেডিক্যাল মডেল' আছে, তখন নিশ্চয়ই 'মেলজ্যাক-ওয়াল' মডেলের কথা বলছেন । কিন্তু সে মডেলের ব্যাখ্যা কার্যকরী হতে গেলে তো ব্যথার অনুভুতিটাকে সুষুম্নাকাণ্ডের ভেতরকার 'সাব্‌স্ট্যানশিয়া জেলাটিনোসা' নামক 'দরজা'-র মধ্যে দিয়ে যেতে হবে । তাহলে, যে সমস্ত ব্যথা-অনুভুতি ক্রেনিয়াল স্নায়ুর মধ্যে দিয়ে বাহিত হয়, সম্মোহনবিদেরা সে সব ব্যথাকেও উপশম করার দাবি করেন কীভাবে বলুন তো ? সেগুলো তো আর সুষুম্নাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে যায় না, ব্যথার উৎপত্তিস্থল থেকে সোজা মস্তিষ্কে গিয়ে হাজির হয় ! 

  • Debasis Bhattacharya | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১০:৩৪97462
  • অনুভুতিটাকে --- অনুভূতিটাকে । অক্ষর-গ্রন্থনপ্রমাদের জন্য দুঃখিত ।

  • Kajari Roychowdhury | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:০৩97602
  • এমন বিস্তারিত ভাবে বিষয়টির উপস্থাপনার জন্য ধন্যবাদ।

  • avi | 2409:4061:2d11:e760:3cb7:1ade:b3a8:5074 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৫:৪৩97753
  • দেবাশিস ভট্টাচার্য,একদম ঠিক। শেষটায় আমারও তাই মনে হয়েছিল, ওটা আলসেমি দোষে দুষ্ট। শেষ অনুচ্ছেদ বিস্তারিত করা উচিত ছিল।

    হ্যাঁ, মেসমার নিজে হিপনোসিস শব্দটি ব্যবহার করেন নি। শব্দটা পরের। এবং ব্রেইডের মোনোয়েডিজম টার্মটি মূল লেখায় রয়েছে। আসলে এই ইতিহাস একটু সংক্ষেপিত হয়েছে। যেমন থিওডোর বার্বারের স্কেলের কথা আছে, কিন্তু ওঁর বিষয়ে বাকি বিষয়ের অনুল্লেখ আছে। আমি চাইছিলাম সম্মোহনের যেসব ঘটনার দাবি রাখা হয়, তাদের স্বপক্ষে কী রকম নিউরোবায়োলজিক্যাল মডেল আনা হয়েছে, তাদের তালিকা করতে। ঐতিহাসিক অংশটা অবশ্যই অনেক বিস্তারিত।

    সোশিও কগনিটিভ স্কুলের ধারণাগুলো সংক্রান্ত নিউরোবায়োলজি নিয়ে পৃথক লেখা প্রয়োজন। বস্তুত থার্ড ওয়েভ সাইকোথেরাপিতে এই মডেলগুলোই রিফাইন্ড ভাবে ব্যবহার হয়ে চলেছে। এবং আমাদের লিম্বিক সিস্টেমের বিভিন্ন জায়গায় সুন্দর সেগুলো আরোপ করা যাচ্ছে।

    ফ্রয়েড রোগী তো প্রচুর দেখেছেন। মুশকিল হলো, গুচ্ছ থিওরি তিনি একটি মাত্র রোগী দেখেই লিখতে বসে যেতেন। এভিডেন্স বেসড মেডিসিনের যুগে ওঁকে সিরিয়াসলি নেওয়া খুব কষ্টের। আর এই রোগী, শিক্ষক, কলিগ পরিচয়গুলো অনেক সময়েই একাকার হয়ে যেত, যেহেতু তাঁরা একে অপরের ওপর পরীক্ষাগুলো করতেন অনেক সময়। ফলে বিভিন্ন রেফারেন্সে এঁদের ভিন্ন পরিচয়ে উল্লেখ মেলে।

    মেলজাক মডেলের কথা লিখছিলাম। ওটা প্রাথমিক ধারণা। সেই সময় যে কারণে স্পাইনাল কর্ড এসজিআর লেভেলে সাবস্ট্যান্স পি নামের কেমিক্যালের কথা ভাবা হয়েছিল। পরে দেখা যাচ্ছে, পুরো পেন পাথওয়ের বিভিন্ন স্থানেই এরকম ইন্টারাপ্ট করা সম্ভব, অস্যার্থ থ্যালামাস বা কর্টিক্যাল স্তরেও।

    অনেক ধন্যবাদ, আবার। আলোচনা হোক।

  • avi | 2409:4061:2d11:e760:3cb7:1ade:b3a8:5074 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৫:৪৮97754
  • SK, একদম। পুরো সমুদ্র মন্থনের পর শেষ দুই ওয়েভে এই CBT, DBT, MET এরকম কিছুই আমাদের প্রাপ্তি।

    আর প্লাসেবো এফেক্ট কী ভাবে হয়, সে মূল খুঁজতে গেলেও কিন্তু আমরা এই জায়গাতেই পৌঁছাই। :)

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন