• বুলবুলভাজা  পড়াবই  মনে রবে

  • রেখে গেলেন কবিতা ও গদ্যের আলোকবর্তিকা

    চৈতালী চট্টোপাধ্যায়
    পড়াবই | মনে রবে | ১৬ আগস্ট ২০২০ | ৫৫০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • সম্প্রতি প্রয়াত হলেন বিজয়া মুখোপাধ্যায়, কবি, গদ্যকার, সংস্কৃতজ্ঞ। ‘নারীবাদী’ তকমার পাঁচিলে না ঘিরেও বলা যায় তাঁর লেখালেখি নারীবিশ্বের উঠোনে দাঁড়িয়েই। লিখছেন কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়



    বিজয়া মুখোপাধ্যায় (১৯৩৭—২০২০)         (ছবি: দেবর্ষি সরকার)


    আমরা জানি। জানি, মানে সকলে নয়, কেউ-কেউ জানি, বিজয়া মুখোপাধ্যায় কবি। কেউ-কেউ শব্দটার ওপর আলো কিংবা অন্ধকার ঢেলে দিলাম খানিক। কারণ মেয়েদের লেখাপত্র সম্পর্কে, বিশেষ করে সামাজিক অভিমানবশত নিজের সৃজনের চারপাশে আলোকবৃত্ত তৈরি করতে অপারগ নারীদের অনেকেরই সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করে উঠতে পারি না আমরা। উদাসীন থাকতে ভালোবাসি, পিতৃতান্ত্রিক গ্রুমিং-এর পুণ্যফলে।

    যা বলছিলাম! বিজয়া মুখোপাধ্যায় চমৎকার গদ্য লিখতেন।

    “মল্লিকার জীবনকাল মাত্র ৫১ বছর। গতবছর ওর জন্মদিনের সভায় আমাকে কে যেন যেতে বলল। আমি গেলাম হাতে একটা বই নিয়ে, কিছু বলেছিলাম নিশ্চয়—বলেছিলাম, অন্য অনেকের মতো ওর অসুস্থতাও সেরে যাবে। বিশ্বাস থেকেই বলেছিলাম। ওকে ‘অসুস্থ’ দেখতে দেয়নি আমাকে সুবোধ। তাই, ওকে আমাদের শেষ দেখা কাচের গাড়িতে—ওর মুখের দু-পাশে কয়েকটা গ্ল্যাডিয়োলি ফুল রেখে দিলাম—অল্প জল ছিল একটা ফুলের পাপড়িতে। হতে পারে, সেটুকু চোখের জলের ছদ্ম উপহার; আমার দিক থেকে, মল্লিকার জন্য।”

    “এই সেদিন প্রণবের সঙ্গে আমরা দু-জন, গড়িয়ার ঢালাই ব্রিজের কাছে ‘রেমেডি নার্সিংহোম’-এ গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুভ আর মিতিল এল। শুভ বলল, ‘তোমরা একজন একজন করে বাবাকে দেখে এসো। বাবা আইসিইউ-তে আছে। কথা বলার প্রশ্নই নেই। বিজয়াপিসি, তুমি প্রথম যাও। দরজা খুলেই বাবাকে দেখতে পাবে। দেরি কোরো না যেন।’ গেলাম, দেখলাম চোখ-বন্ধ-আপনি শুয়ে। চলে আসতে আসতে মনে হল, জাগ্রত আর সুষুপ্ত অবস্থার মাঝখানে যেন একটা সাঁকো, পার হয়ে যেতে পারবেন তো এই দীর্ঘদেহ মানুষটি! অনেকে তো সাময়িক ভেন্টেলেশনে গিয়েও ফিরে আসে। কিন্তু ‘এত ভালো স্বাস্থ্য’ ছিল না আপনার, গত কয়েক বছর ধরে। আর জাগলেন না। অথচ সেদিনও বুঝিনি আমি, এই আপনার শেষ শয্যা। এই জন্যই কি লিখেছিলেন অক্ষর প্রকল্প থামিয়ে, শয্যাকে ডেকে, নৌকো থেকে নেমে, শেষবার নীচে শোওয়ার কবিতা। কী করে লেখার সময় বুঝেছিলেন—আপনার সময় অল্প! আমাদের তিনজনের সঙ্গে আপনার আর দেখা হওয়ার কথা ছিল না। তাই দেখা হল না, শুধু দেখে এলাম। জানি না, আকাশে তাকিয়েছিলেন কি না অন্তত একবার।”

    মৃত্যুমুখী এই গদ্য টুকরো দুটো দিয়ে শুরু করলাম ওঁর কথা। কবির গদ্যকবিতার মতো এ কথা বললে, সেই গদ্যের প্রতি কিছুটা অবিচার করা হল বলেই আমি মনে করি। কিন্তু এ-ও দেখেছি, কবির গদ্যে মায়াবী একটা ধরন থাকে। এখানেও আছে। অথচ আত্মজীবনীমূলক, মাত্র একটিই গদ্য বই ওঁর। ‘আমার লেখালেখি’ (প্রকাশক: বিভাব)। পাঠকের হাতে পৌঁছায়নি খুব একটা। ওঁর বাড়িতেই, স্তূপাকার, পড়ে আছে ধূলিধূসরিত হয়ে। এই বইটি পড়লে, পাতায় পাতায় বিদগ্ধ চয়নগুলি ছুঁতে পারলে, আমরা কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায় বলার আগে একটু থমকে থেমে, গদ্যকারও বলব কি না একই সঙ্গে সেটাও ভেবে নিতে পারব।

    বিদগ্ধ শব্দটি উচ্চারণ করেই মনে হল, বিজয়া মুখোপাধ্যায় মেধাবী উজ্জ্বল এক নাম ছিলেন শিক্ষাজগতেও। ওঁর মতো সংস্কৃতজ্ঞ কম। শুনেছি, বুদ্ধদেব বসু যখন ‘মেঘদূত’ অনুবাদের কাজ করছেন, প্রয়োজনে বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শ নিয়েছিলেন কয়েকবার।

    Linda Nochlim-এর একটি আর্টিকল নজরে এল, যার শিরোনাম ‘Why have there been no great women artists?’

    একই সঙ্গে প্রায় কাকতালীয় ভাবে অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তীর একটা লেখার ক্লিপিংস দেখলাম।

    ‘আমি মিসেস আর পি সেনগুপ্ত—এঁটো পেড়ে, চায়ের বাসন ধুয়ে সোজা স্টেজে চলে যাব’।

    এগুলো অপ্রাসঙ্গিক নয়। কেন-না যখনই একজন নারীকে লিখতে হয়, ছবি আঁকতে হয়, অভিনয় করতে হয় কিংবা এককথায় নিজের আইডেন্টিটি তৈরি করতে হয়, কী প্রাণান্তকর কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। যেন সার্কাসের মাঠে ট্র্যাপিজের খেলা দেখাচ্ছেন! সেখানে কোনো তরুণ কবি যদি বলে ওঠেন, বিজয়া মুখোপাধ্যায়? একটাও লেখা পড়িনি তো... তখন বড়ো অপমান লাগে! বস্তুত তিনিও তো মিসেস শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়। প্রতিষ্ঠিত কবির ছায়ায় ঢাকা না পড়ার চেষ্টায় আমৃত্যু লড়াই করে যাওয়া নারী কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায়।

    না। ওঁর চারপাশে নারীবাদের পাঁচিল তুলতে আমি নারাজ। কিন্তু লেখাপত্রগুলো তো নারীবিশ্বের উঠোনে দাঁড়িয়েই। যাকে ‘ফিমেল গেজ’ বললে ভুল বলা হবে না এতটুকু। ওঁর দু-একটি কবিতাকে লিখি বরং—


    যোগ্যতার জন্য

    সমস্ত বাহুল্য খুলে রাখলাম।
    তুলে নিলাম ঘোমটা, সোনার টায়রা,
    সিঁথিমৌর। এই নাও সোনালি রিবন, রেশমী ঝালর, মুক্তোর কাঁটা।
    আর এই রাখলাম তোমার পায়ের একপাশে
    আমার ভুল
    অন্যপাশে অহংকার।
    এবার আমি নিরাভরণ।
    আমার মাথায় রাখো তোমার পাঁচ আঙুলের ছাপ।
    সিঁথিতে সমান্তরাল করো তোমার অক্ষয় তর্জনী।
    মা, এবার আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে বলো—‘‘এই পৃথিবীর যোগ্য হও’’।
    তারপর চলে যাবো আমি নির্বাসনে
    অপেক্ষা করব নতশির
    যতদিন না এই মহীয়ান জন্মের যোগ্য হয়ে উঠতে পারি।

    --

    শৈশব

    একজন বড় মানুষ
    একজন ছোটো মানুষের হাত ধরে হেঁটে যায়।
    বেলা শেষ, সামনে পশ্চিমের মাঠ। আর
    দু’জনের সঙ্গে বরাবর হাঁটে দুটো কালো ছায়া।
    কেউ থামে না।
    ছোটো মানুষের ছোটো পায়ে ব্যথা
    টনটন করে,
    তবু সে জানে বড়মানুষকে সেকথা বলতে নেই। গুরুজন। প্রশ্ন করতে নেই...
    ওই ছায়া কেন এমন সেঁটে থাকে,
    সন্ধের মুখে কেন এত লম্বা হয়ে যায়।
    পরে সে জানতে পারে।
    বুঝতে পারে—ওই কালো কালো মানুষ প্রমাণ
    ভরাট ছবিগুলি
    ছায়া নয়, ওরা উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
    ওরা সবাইকে মাঠের পর মাঠ ছুটিয়ে বেড়ায়,
    নিজেরা ধরা দেয় না।
    দিশেহারা বড়মানুষকে খাদের ধারে নিয়ে
    ফেলে দেয়।
    যখন ছোটমানুষ কাঁদে, তখন আর ওরা নেই
    মুহূ্র্তে নেমে আসে রাত্রি,
    তার কালো ঢাকনার নীচে ঢেকে দেয়
    শিশু মানুষের সত্য।

    অনেক স্তর বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের কবিতায়। একটা বর্ণনা। সেটা ছাপিয়ে যাওয়া ব্যঞ্জনা। আর চিন্তনের নানা খোরাক, যা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাঠেরও অপেক্ষা রাখে।

    বিজয়া মুখোপাধ্যায়। আমার পূর্বনারী। ওঁর কবিতা ও গদ্যের আলোকবর্তিকা রেখে গেলেন আমাদের জন্য।


    --
    বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের ২০টি কবিতা পড়া যেতে পারে এখানে



    শ্রেষ্ঠ কবিতা
    বিজয়া মুখোপাধ্যায়
    দে’জ পাবলিশিং
    মূল্য ১৩০ টাকা


    প্রাপ্তিস্থান — দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্ট্রিট, কলকাতা।
    ফোন নং: ০৩৩-২২৪১২৩৩০/০৩৩-২২১৯৭৯২০
    অনলাইন

    বাড়িতে বসে বইটি পেতে হোয়াটসঅ্যাপে বা ফোনে অর্ডার করুন +919330308043 নম্বরে।


    থাম্বনেল গ্রাফিক্স: স্মিতা দাশগুপ্ত
  • বিভাগ : পড়াবই | ১৬ আগস্ট ২০২০ | ৫৫০ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মিলন গঙ্গোপাধ্যায় | 110.227.82.192 | ১৮ আগস্ট ২০২০ ২৩:০৮96420
  •  বিজয়া মুখোপাধ্যায়কে একজন মহিলা কবি হিসেবে উপস্থাপন না করলেই ভালো হতো। 'আমরা' জানি, 'কেউ কেউ' জানি,  তাতে ক্ষতি কী!  আজ যাঁকে নিয়ে মেতে উঠেছি কাল তাঁর কবিতা পড়ছি কি! 

  • Tim | 2600:1009:b11b:ea36:4188:2a8c:4509:15b | ১৯ আগস্ট ২০২০ ২০:০৬96431
  • ভালো লাগলো। আরো একটু লেখা হলে আরো ভালো লাগত। কবিতা নিয়ে আলাদা করে উৎসাহ জাগানোর জন্য লেখাটা মনে থাকবে। পড়বো।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন