• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • আন্তর্জাতিক জনজাতি দিবস ও এক যাদুকর

    Sharmistha Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৯ আগস্ট ২০২০ | ৫৮১ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • আন্তর্জাতিক জনজাতি দিবস ও
    পদ্মশ্রী বুলু ইমাম
    ডাঃ শর্মিষ্ঠা দাস

    ডারউইন সূত্র অনুসারে ,পৃথিবীতে যোগ্যতমের শুধু বাঁচার অধিকার আছে । কে যোগ্যতম সে বিচার করবে কে ? একসময় ছিল প্রকৃতি , ক্রমে বিচারকের আসনে এল এক বিরাট সিস্টেম --রাষ্ট্র,আইন,রাজনীতি এইসব কিছু   যে সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত । শুধু ভারতেই চার কোটি হেক্টর বনভূমিতে দশ কোটি আদিবাসীর বাস । পৃথিবী তে তাঁরা বিপন্নতার মুখে সেই গত চারশ বছর ধরে,শিল্পবিপ্লবের সলতে পাকানোর সময় থেকে ।  অরণ্যসংলগ্ন জমিতে পরম্পরাগত ভাবে ভোগদখলকারী আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে 2007 সালের সেপ্টেম্বর মাসে  রাষ্ট্রসংঘের ও আইএলও 169 এর সুনির্দিষ্ট ঘোষণাপত্রের পরও বিপন্নতা বেড়েছে বৈ কমেনি । সভ্যতার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর তাগিদে নরম নিশানা চিরকাল জনজাতি ও আদিবাসী মানুষ । উদ্যত খড়্গ তাদের উপর নেমে আসে কখনো নদীতে বাঁধ,কখনো কারখানা বা খনির বেশে । অরণ্য ও জমির উপর জনজাতির অধিকারের আইন যেমন আছে তেমনি প্রতিবাদের মুখ বন্ধ করার আইন বা উপায়ও  তৈরী হয়ে যায় ঝটপট । জবরদস্তি নিজেদের বানানো সিস্টেম প্রকৃতির উপরে চাপাতে গিয়ে মানুষ প্রকৃতির নিজস্ব সিস্টেমকে লন্ডভন্ড করে দেয় । এই ভয়ানক ক্ষতির হিসেব পড়তে পারলে অজান্তেই হাতের দশ অঙ্গুলি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠে ।

    সেই মুষ্টিবদ্ধ হাতে  কেউ কলম ধরেন,কেউ বা মিছিলে ফেস্টুন। অন্যপক্ষের  পেশী এত বেশী মজবুত  যে এরপর অধিকাংশ সময়ে ব্যর্থ আন্দোলনের ইতিহাস লেখা হয় ।
    এমন একজন মানুষকে নিয়ে আজকের এতক্ষণের প্রাককথন ,যিনি জনজাতির অধিকার নিয়ে সরকারের সঙ্গে লড়াই করেছেন আজীবন--আবার সরকারের কাছ থেকেই চলতি বছরে  তাঁর সারাজীবনের অবিশ্বাস্য সব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আদায় করে নিয়েছেন  "পদ্মশ্রী " খেতাব । আন্দোলনের পথ পদ্ধতি এবং মানুষটি --কিছুই বাঁধাছকে মেলে না । তাঁর নাম--বুলু ইমাম । নিবাস-ঝাড়খন্ডের হাজারিবাগ । 2019 সালে পদ্মশ্রী পেলেন , 2012 সালের 12th জুন (2011 সালের পুরস্কার ) পেয়েছেন আন্তর্জাতিক গান্ধী শান্তি পুরস্কার । অথচ নিজের দেশে কজন মানুষ তাঁর সম্পর্কে জানেন সন্দেহ আছে । 
    আদতে তিনি শিল্পীই ছিলেন । শিল্প নিয়েই বসত এযাবত -এক বৃহত্তর পরিসরে । প্রথম একক প্রদর্শনী তাঁর কলকাতা শহরেই 1961 সালে ,আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে,লেডি রাণু মুখার্জি ছিলেন  আয়োজক , রাইটার্স ওয়ার্কশপের ডাঃ পি লাল কিউরেটর । 1963 তে আবার একক প্রদর্শনী -- অল ইন্ডিয়া ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফট সোসাইটি ,দিল্লিতে । উদ্বোধন করলেন রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন । এম এফ হুসেন,হুমায়ুন কবীর,বিকানিরের মহারাজার মতো অতিথি ! ক্রমান্বয়ে ইংল্যান্ড,দিল্লি,চন্ডিগড়ে --প্রদর্শনী,বিখ্যাত শিল্প সমালোচকদের প্রশংসিত রিভিউ,খ্যাতি--চলতেই থাকল ।1984 তে শান্তিনিকেতনে কলাভবনেও একটা একক প্রদর্শনী হয়ে গেল ।
    এসবই একজন শিল্পীর জন্য যথেষ্ট ছিল --কিন্তু তাঁর  নিজভূমে যখন শিল্প ও শিল্পীরা বিপন্ন,তখন শুধু নিজের খ্যাতি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা যে স্বার্থপরতা হত । ঝাঁপিয়ে পড়লেন এক বৃহত্তর আন্দোলনে ।
    কি এক চুম্বকের টানে বার বার  যাই হাজারিবাগে ওনার সংস্কৃতি কেন্দ্রে । বার বার ঘুরেফিরে  দেখি--শুধু একটি পরিবারের বছরের পর বছর ধরে সাধনা ।  উচ্চ দামোদর উপত্যকা চষে উদ্ধার করা-- একলাখ বছর আগের  প্রাচীন প্রস্তর যুগের পাথরের ছোট ছোট অস্ত্র, খ্রীষ্টপূর্ব সাতহাজার বছর আগের  ব্রোঞ্জ যুগের গয়না,লৌহযুগের যন্ত্রপাতি । সবসময় ওনাকে বিরক্ত করি না । প্রাচীন গুহার আদলে ,বাড়িতেই নির্মিত চিত্রিত "মাড হাউস" এ বসে গুস্তাভ ইমাম ভাইয়ের সঙ্গেই গল্প করে চলে আসি ।আসলে এক জীবনে যাঁরা একশো জীবনের কাজ করেন তাঁদের নষ্ট করার মত সময় তো কম ।

    সাহস করে দুবছর আগে প্রথম যেদিন ফোন করেছিলাম --দেখা করার  আবদার নিয়ে। কি সৌভাগ্য ! ফোনে দু'চারটে কথায় কি জানি কোথায় মনের কোন তন্ত্রীতে ছোঁয়া লেগেছিল  --বুলু ইমাম বললেন --"কাল এসো । সারাদিন গল্প করব আর অবশ্যই আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ খাবে, তোমার জন্য মাছ ভাতের  স্পেশাল মেনু হবে ।" 
    বিরাট অগোছালো বাগান নিয়ে বাড়ি ।  স্থাপত্যে ,অন্দরসাজে দেশীবিদেশী ককটেল ছাপ সর্বত্র -- ওনার পিতামহী ছিলেন  ইন্দো-ফরাসী মহিলা । বেশ কয়েকটি  কুকুর, বেড়াল ,বাড়ির মানুষ,আদিবাসী শিল্পীরা --সবার জন্য সাম্যের বন্দোবস্ত বেশ বোঝা যায় । এই সব কিছুর কথাই যদি কখনো পুরোটা লিখে উঠতে পারি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আসবে আমার -- 'ঝাড়খন্ড চিত্রকলা ও বুলু ইমাম' কেন্দ্রিক উপন্যাসে ।

    আমি ওনাকে স্যরই বলি --কতকিছু যে জেনেছি ওনার কাছে । দিনের পর দিন ঘন্টার পর ঘন্টা অক্লান্ত সাক্ষাত্কার দিয়েছেন । আমি ক্লান্ত হলেই , আলমারি খুলে বার করে এনেছেন গত পঞ্চাশ বছরের ডায়রি , জার্নাল , নিজের লেখা অগুনতি বই -- আন্টি আর মেগান কাপের পর কাপ গ্রীন টি সাপ্লাই করে গেছেন । ফেরার পথে এক গৃহ স্নেহে ব্যাগে ভরে দিয়েছেন ফরাসী ঘরানায় ঘরে বানানো কমলালেবু বা পেয়ারার মার্মালেডের শিশি ।

    প্রথমদিন স্যর প্রথমেই আমাকে যাচাই করার মতো জিজ্ঞাসা করলেন--"ফোকআর্ট আর ট্রাইবাল আর্টের তফাত বোঝো ?" উদাস  গলায় বললাম--'স্ট্যাটিক অ্যান্ড ডায়নামিক !' খুল যা সিমসিম--মনের আগলের পাসওয়ার্ড হয়ে গেল ওই দুটো শব্দ ।  পরম শ্রদ্ধার মানুষটির স্নেহের বৃত্তে প্রবেশ করলাম ।
    নিতান্ত  সাদামাটা যাপন দেখে বোঝা কঠিন ,কতটা খানদানি বংশের পরম্পরা ।  পূর্বপুরুষ ছিলেন মুঘল বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের শৈশবের  গৃহশিক্ষক । প্রপিতামহ সৈয়দ ইমদাদ ইমাম অধ্যাপনা ছাড়াও খ্যাতনামা উর্দু কবি ছিলেন । পিতামহ সৈয়দ হাসান ইমাম তো দেশ কাঁপানো ব্যরিস্টার,ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ,স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া রাজনীতিবিদ --সেযুগের একডাকে চেনা মানুষ । জীবনের শুরুটা যেভাবে হয়েছিল,কোটিপতি  চিত্রশিল্পী হতে কোনো বাধা ছিল না বুলু ইমামের । কিন্তু ধনীর দামী দেয়ালে টাঙানো ছবির নেপথ্যনায়ক হবার চাইতেও বড় কাজ অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য ।

    হতাশ ভাবে প্রশ্ন করলেন -- 1904 সাল কেন গুরুত্বপূর্ণ জান ?
    দূরের শালগাছের পাতায় চোখ রেখে বললেন --Ancient Monuments Preservation Act of 1904 আর সে বছর,1904 সালেই বাংলা আর বিহারে কয়লাখনির পত্তন । কি ? কাকতালীয়-নয় ?
    বুলু ইমামের  শৈশব কৈশোর যৌবন সবই কেটেছে হাজারিবাগ কে কেন্দ্র করে বিস্তৃত পাহাড় জঙ্গল আদিবাসী গ্রাম চষে--হেঁটে,ঘোড়ায় । সুদূর অতীতের সঙ্গে এক সুতোয় গাঁথা যা কিছু ইতিহাস পেয়েছেন এই পরিব্রজনে যত্ন করে তাঁর দলিল তৈরী করে রেখেছেন । 1987 সালে INTACH ( The Indian National Trust for Art and Cultural Heritage) থেকে যখন আঞ্চলিক কনভেনর হবার প্রস্তাব এল ভালো মাস মাইনেসহ--পছন্দের কাজ লুফে নিলেন ।

    সব কথার মাঝখানেই চলে আসছে  'কি ভয়ানক ধ্বংস কি অপূরনীয় ক্ষতি' র কথা 
    ভীমবেটকা পর্যটনে যাওয়া কম আম বাঙালিই জানেন --বুলু ইমাম হাজারিবাগ সন্নিকটে দশহাজার খ্রীষ্টপূর্বাব্দের গুহাচিত্রের আবিষ্কারক ! হাজারিবাগ শহর থেকে 45 কিলোমিটার দূরে ,ইস্কো গ্রাম । তার পেছনে পাহাড় জঙ্গল । জঙ্গলে নাকি একটা সাপের ফনার আকারের গর্ভযুক্ত একটা গুহা আছে । বুলু ইমামের বাবা টুটু ইমাম ছিলেন শিকারী । প্রথম জীবনে বুলু ইমামও জনহিতার্থে শিকার করেছেন । দুজনেই  দয়ালু শিকারী--শুধু মানুষ খেকো বাঘ আর পাগলা হাতি মারার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা ডাক আসত, সে এক অন্য গল্প । কিন্তু শিকারী টুটু ইমাম একদিন ছেলেকে বললেন--ওই গুহার ভেতরের দেয়ালগুলো গিয়ে দেখো তো , ওখানে কিছু আছে । 1991 সালের ঘটনা   । বুলু ইমাম নিজে যা দেখলেন --এরপর তা দেখালেন গোটা বিশ্বকে। তারপর ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলে প্রায় পঞ্চাশটা ছোট বড় দেয়ালচিত্র সহ গুহা খুঁজে বের করলেন । দেয়ালে যে ছবি আছে , তার কপি তৈরি করালেন , দেশবিদেশের বিশেষজ্ঞদের ডেকে আনলেন । ঠিক এইসময়েই তিনি আন্দোলনে নেমেছেন সরকারের বিরুদ্ধে । কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড এর করণপুরা প্রোজেক্ট শুরু হবে--নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে দুশোর-ও বেশী আদিবাসী গ্রাম । সেইসঙ্গে পৃথিবী থেকে মুছে যাবে মানুষের ইতিহাসের বিরাট এক অধ্যায় । কি করা যায়--কি করা যায় ! দু একটা পদযাত্রা,মিটিং করলেন আদিবাসীদের নিয়ে । কিন্তু কিছু হবার নয় তা আজ সবার জানা । সাদাকালো বাধা দুটো --এক স্বাধীনতার এতবছর পরেও  লিখিত জমির দলিল এঁদের অজানা অধ্যায় । দুই কে  কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের আদিম জনজাতি তার খুব সোজাসাপ্টা প্রমাণ হাতে থাকে না । সুতরাং উন্নয়ন জুজুর কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজের অস্তিত্ব বিলোপ ছাড়া আর কোনো নেই  ।
    "এ সময়ে  আমার শরীরের  পশ্চিমী রক্ত কিছুটা কাজ করল " উত্তেজিত ভাবে বললেন বুলু ইমাম -" আবেগপ্রবণ হবার সঙ্গে বাস্তববাদী ও একনিষ্ঠ ভাবে উপায় খোঁজা--ডকুমেন্টেশন অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন অফ এভরিথিং" । এই জায়গাটাতে ভারতীয়রা সত্যি অনেক কাঁচা ।

    গত কয়েক দশক ধরে অস্ট্রেলিয়াতে আদিম জনজাতির অধিকার রক্ষার আন্দোলনের খবরাখবর রাখছিলেন ।  আশঙ্কায় ভুগছিলেন- সবকিছু উপড়ে ফেলে ,  আমেরিকার "থ্যাঙ্কস গিভিং ডে" র মত আর একটা দিনই কি পরিণতি !  আইনি লড়াইতে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা হলেও  তো সাফল্য পেয়েছে ।  হতাশ হয়ে হাল না  ছেড়ে আরো কঠিন পথ ধরলেন । বুলু ইমামের ভাষায়--"সত্যাগ্রহে নামলাম " । অনশন নয়--ইন্টেলেকচুয়াল সত্যাগ্রহ ।   ইস্কো গুহার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে  যে আদিবাসী গ্রামগুলোর উপর খোলামুখ  কয়লাখনির খাঁড়া ঝুলছে --তাদের গ্রামে ঢুকলেই চোখ জুড়িয়ে যায় । আমার নিজস্ব  অভিজ্ঞতা-- কোনো এক প্রাচীন আর্ট গ্যালারিতে এলাম বুঝি ! সাঁওতাল গ্রামেও দেয়াল চিত্র দেখা যায় । কিন্তু একটু চোখ মেলে দেখলেই বোঝা যায় এ ছবি কিন্তু সবার থেকে আলাদা । এর একটা নিজস্ব ভাষা আছে । ছবির মোটিফ,রঙের কায়দাকানুন,রেখার চলন গমন সব একদম ওদের নিজস্ব-পৃথিবীর আর কোথাও এই মৌলিক কাজের অনুরূপ চিত্রকলা দেখা যায় না ।

    বুলু ইমাম উপযুক্ত তথ্যসূত্র হাতে নিয়ে মঞ্চে নামলেন ।  প্রমাণ করলেন- যে ইস্কো গুহার আদিম গুহাচিত্র আর এই আদিবাসী গ্রামের দেয়াল চিত্রের মধ্যে এমন কিছু মিল আছে যা বোঝায় তাম্রপ্রস্তর যুগ বা তারও আগে থেকে এইসব জনজাতি এই অঞ্চলেই বসবাস করে আসছে । ছবি ছাড়াও উত্তর দামোদর অববাহিকায় আদিম জনজাতির সমাধির প্রমাণ মেলে। বিশেষ ভাবে সাজানো প্রস্তরস্তুপ আর তার উপর মেগালিথ বা বৃহদাকার একটি পাথর প্রচুর পাওয়া গেছে ।  তারা যদি উৎখাত হয় এই অঞ্চল থেকে তাহলে তাদের সঙ্গে তাদের  সংস্কৃতির উত্তরাধিকারও বিলুপ্ত হবে পৃথিবী থেকে ।  প্রত্নতত্ত্বের আন্তর্জাতিক সব সেমিনারে, এই বিষয়ে তার গবেষণাপত্র পড়া চালিয়ে যেতে লাগলেন, আন্তর্জাতিক সব জার্নালে ছাপা হতে লাগল তার বক্তব্য ! সেসময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রধান,ডঃ জুলিয়ান বার্গারের কাছে আবেদন পাঠালেন--ইস্কো গুহা সংলগ্ন জনজাতিদের গ্রামগুলো যাতে  রক্ষা পায় । সেই সঙ্গে প্রচেষ্টা চলল--ওই বিশেষ  দেয়ালচিত্রের "Intellectual Property Rights " আদায় করতে হবে । । বিশ্বজুড়ে একটা আলোড়ন সৃষ্টি তো হল, সেসব খবর সরকারের কাছেও আসতে লাগল বৈকি ।
    সব মিলিয়ে একটা বৃত্ত । হাজার দশেক বছর আগে, বনচারী আদিমানবরা যখন একটু থিতু হবার কথা ভাবছে, একটু একটু করে চাষ আবাদ শিখছে , অন্ততঃ চরম আবহাওয়ার সময়ে গুহায় বাস করছে --তখনই,সেই নোম্যাডিক অথবা সেমি-নোম্যাডিক যুগে আঁকা ইস্কোর গুহাচিত্র । তারপর সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটে চলেছে কিন্তু কিছু সংস্কৃতি বদলায়নি । মুন্ডা, ওঁরা,কুর্মী ,গুঞ্জু --যাঁরা এখন দেয়ালচিত্র আঁকে তাঁদের অনেক অনেক হাজার ঊধর্তন পূর্বপুরুষ ইস্কোতে গুহাচিত্র আঁকত,কেউ বা শুয়ে আছে ওইসব মেগালিথের নীচে !

    করণপুরা কয়লা প্রকল্প বন্ধ করা গেল না কিন্তু অনেকটা পেছোনো গেল ,যে অবসরে ওই আদিম চিত্রকলা সংরক্ষণের  বন্দোবস্ত করা সম্ভব হয়েছে । রাতারাতি নিশ্চিহ্ন  হওয়া থেকে  বেশ কিছু গ্রামকে বাঁচানো গেছে । বিশ্বের সবচেয়ে নামী গুহাশিল্প বিশেষজ্ঞ Erwin Neumayer তাঁর প্রামাণ্য বইতে বিশদে বর্ণনা ও বিশ্লেষণ  করেছেন ইস্কোর ছবিগুলি ।

    বুলু ইমাম অগুনতি বই ,গবেষণাপত্র,ডকুমেন্টারি ফিল্ম দিয়ে নবপ্রস্তর ও তাম্রপ্রস্তর যুগের ইস্কো গুহাচিত্র আর সংলগ্ন গ্রামগুলির দেয়াল চিত্রের মিল প্রমাণ করেই ছাড়লেন । প্রাচীন জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত আদিবাসী সমাজে ,উৎসব আবর্তিত হত বছরে দুবার জীবনের দুটো আনন্দের সময়   ঘিরে--বিবাহ আর নতুন শষ্য ঘরে আসা । বছরে দুবার মহিলারা আনন্দে কোমর বেঁধে লেগে পড়েন । দেয়ালে নতুন মাটি লেপে প্রাকৃতিক  রঙ দিয়ে  তাতে অপরূপ সব ছবি আঁকেন। বিয়ের ছবির নাম "খোওবর" আর নবান্নের ছবির নাম  "শোহরায়" । কাল্পনিক ফুল, মঙ্গললতা , গৃহপালিত পশু এমনকি দাওয়াতে বেয়ে ওঠা পোকামাকড়,প্রতিবেশী গাছপালা--এসবই  ছবির বিষয়বস্তু । এ ঘরানা যে অতি প্রাচীন , প্রাকবৈদিক তার প্রমাণ --ছবির বিষয় হিসেবে কোথাও কোনো পৌরাণিক চরিত্র বা দেবদেবীর অবয়ব নেই ।

    শিল্প,বাঁধ,হাইওয়ে,খনি ইত্যাদি কারনে যখন জনবসতি উচ্ছেদ অভিযান চলে,তার সঙ্গে যখন বহু প্রাচীন সংস্কৃতির মৃত্যু হয়, তখন -- তিন ধরনের মানুষের  প্রতিক্রিয়া পাই । একদল বলে--চুলোয় যাক ওসব,চল উন্নয়নের পথে হাঁটি ।  সংবেদনশীল অপরদল  "কি কি হারালাম" জাতীয় নিবন্ধ রচনা করেন । গোনাগুনতি কয়েকজন সক্রিয় আন্দোলনে নামেন ।  ব্যতিক্রমী  বুলু ইমাম এই কোনো দলেই নন ।
           বুলু ইমাম সম্পূর্ণ নিজস্ব মস্তিস্কপ্রসূত ভাবনা থেকে  ,1993  সালে ভারতে অস্ট্রেলিয়া হাই কমিশনের আর্থিক সহযোগিতায়, পঞ্চাশজন আদিবাসী শিল্পীদের নিয়ে গঠন করলেন TWAC (Tribal Women Artists Co-operative). যে ছবি তাঁরা এতদিন তাদের মাটির ঘরের দেয়ালে কালি মিট্টি, দুধি মিট্টি আর লাল মিট্টিতে  আঁকতেন ,তাদের বললেন --কাগজ বা কাপড়ে অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকো --অনুরূপ শৈলী,বিষয় ও রঙ । জনজাতির অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই এমন কোনোদিন হয়তো আসবে যখন কোনো মাটির বাড়ি থাকবে না । তাহলে তখন শিল্পশৈলীর কি হবে ? সে অন্ততঃ বাঁচুক !!
    TWAC গঠনের উদ্দেশ্য ছিল তিনটি--প্রথমতঃ করণপুরা কয়লাখনি প্রোজেক্টের দ্বারা পৃথিবী কি হারাতে চলেছে  তা সবার  দৃষ্টিগোচরে আনা । দ্বিতীয়--বিলুপ্ত হবার আগে , এই আদিম শিল্পশৈলীকে সংরক্ষণ  । তৃতীয় উদ্দেশ্যটি সবচেয়ে মহৎ, যা খালি চোখে দেখা যায় --শোহরাই ও খোওবর  মহিলা শিল্পীদের আর্থিক স্বনির্ভরতা ।
    1995 সালে  পর পর অস্ট্রেলিয়াতে সতেরোটা প্রদর্শনী করল এই কোঅপারেটিভ এবং সব ছবি বিক্রি হয়ে গেল । কোঅপারেটিভের নিয়ম --উপার্জনের এক তৃতীয়াংশ সরাসরি শিল্পীরা পান । এক তৃতীয়াংশ আদিবাসী  ওয়েলফেয়ারের কাজে লাগে ।  তিন ভাগের বাকি এক ভাগ "সংস্কৃতি মিউজিয়াম " সংরক্ষণের জন্য রেখে দেওয়া হয় ।

    এরপর TWAC র জয়যাত্রায় আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি । ভারতে প্রথম প্রদর্শনী মুম্বই এর কেমোল্ড গ্যালারিতে,1995 সালেই । যাঁরা হাজারিবাগে নিজের গ্রামের বাইরে কখনো পা রাখেনি, 2000 সালে এরকম  পাঁচজন শিল্পী একমাস রইলেন সিডনিতে--অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন মিউজিয়ামের দেয়ালে শোহরায় আর কোওহর এর ম্যুরাল নির্মাণ করলেন । শিল্পকর্মের স্থায়ী স্বীকৃতি আর উপার্জন--অক্ষর পরিচয়হীন গুণী মহিলা,যাঁরা এতদিন শুধু অবজ্ঞা উপেক্ষা অনাহার অর্ধাহারে অভ্যস্ত ছিলেন --তাঁদের করপুট ভরে এল প্রাপ্য সম্মান ! এমনকি সব আন্তর্জাতিক পর্যটক জুরিখে গেলে দেখতে পাবেন, রিটবার্গ মিউজিয়ামের ম্যুরালে, হাজারিবাগের অখ্যাত কুর্মি,গুঞ্জু,ওঁরাও,তিরকিদের নির্মাণ ।

    ইংল্যান্ড,রোম, কানাডা--বিশ্বজুড়ে, এখন পর্যন্ত পঞ্চাশটি বড় মাপের  আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হয়েছে--সব কটিতে বিপুল সাফল্য । বর্তমানে পাঁচশো মহিলা শিল্পী যুক্ত আছেন এই কাজে -- অন্যথা যাদের অমোঘ ভবিতব্য ছিল কয়লাখনির শ্রমিকে পরিণত হওয়া ।  জয়ের টুপিতে ক্রমশ নতুন পালক যোগ হয়েই চলেছে---

    যিনি নঞর্থক 'বিপন্নতা'  কে এমন সদর্থক কাঠামোতে রূপান্তরিত করতে পারেন --তাঁর জন্য অভিধানে বিশেষণের ঘাটতি পড়ে যায় ।

    আজ "আন্তর্জাতিক জনজাতি দিবসে" লাখো কুর্নিশ বুলু ইমাম !

    ( লেখাটি আগামী "ঝাড়খন্ড ও বুলু ইমাম " কেন্দ্রিক ভাবনার উপন্যাসের মুখবন্ধ )
     
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৯ আগস্ট ২০২০ | ৫৮১ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অনিন্দিতা | 103.87.57.77 | ১১ আগস্ট ২০২০ ২২:২৫96177
  • গুরুর পাতায় ক্রমাগত মহামারী, রাজনীতি আর সাহিত্যের গুরুগম্ভীর যুক্তি-তক্কোর লেখাগুলির মাঝে লুকিয়ে থাকা বুলু ইমামের গপ্পোটি এক অন্য জগতে নিয়ে গেল। অসাধারণ এই মানুষটির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত