• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • রবীন্দ্রসাহিত্যে ফুলের ভাষা

    Sharmistha Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৭ আগস্ট ২০২০ | ৬১৮ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • রবীন্দ্রসাহিত্যে ফুলের ভাষা ও কিছু ফুলের পরিচয়
    ডাঃ শর্মিষ্ঠা দাস

    "মনে হয় যে পাব খুঁজি ফুলের ভাষা যদি বুঝি রে---" ফুলের ভাষা যাকে ইংরেজিতে ফ্লোরিওগ্রাফি বলা হয় তা এক গভীর গোপন সাঙ্কেতিক বার্তা বহন করে চলেছে বহুযুগ ধরে -পশ্চিমের শেক্সপিয়র থেকে পূবের কালিদাস-- ফুলের অনুষঙ্গ দিয়ে কাব্যসাহিত্যের অন্তর্নিহিত বার্তা প্রকাশ করেছেন । রবীন্দ্রকাব্যে গানে আবহমান কালের সাহিত্যের এই পরম্পরা এক বিশেষ মোচড় পেল । নান্দনিকতার মোড়কে চেনা অচেনা সব ফুলই হয়ে উঠল অনন্ত সম্পদ । রবীন্দ্র সুরায় যে একবার মজেছে --বাড়ির আটপৌরে টগর অথবা দুষ্প্রাপ্য কণকলতা --আজীবন সুখে দুখে প্রেমে অভিমানে এসব ফুল ঘুরে ফিরে মনন জুড়ে থাকবে । প্লাস্টিক সভ্যতার নাগরিক জীবনে রবীন্দ্রকাব্যের সব ফুলের সঙ্গে হয়তো আগ্রহী পাঠকের পরিচয় হয়ে ওঠে না--বাগানে পথেঘাটেও হয়তো ইচ্ছেমত খুঁজে পাওয়া যাবে না এদের কিন্তু গুগলামি সবার হাতের মুঠোফোনে--সে কারণে বৈজ্ঞানিক নামসহ কিছু ফুলের কথা বলার এই ধৃষ্টতা -যাতে একটু টাইপ আর আঙুলের ছোঁয়াতেই ফুলগুলোর ছবি সহ বিবরণ দেখতে পারেন - তাহলে মনে রবীন্দ্র কবিতার ছবিটি পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে ।

    "আকাশ যে মৌন ভার বহিতে পারেনা আর নীলিমাবন্যায় শূন্যে - উচ্ছলে অনন্ত ব্যাকুলতা /তারি ধারা পুষ্পপাত্রে ভরি নিল নীলমণি লতা "পিয়ার্সন সাহেব উত্তরায়ণের কোণে ভাগ্যে এই বিদেশী লতাটি রোপন করেছিলেন-নাহলে Sand paper vine অথবা blue bird vine অথবা বৈজ্ঞানিক নাম Petrea volubilis ছাড়া তোমাকে কি নামে ডাকতাম নীলমণি লতা ? কবির নীলাভ সুন্দরী ফুলটির এই নাম দিয়েছিলেন । বড় প্রিয় ছিল তাঁর এই ফুল । ফাল্গুনে যখন ফোটে অপার্থিব সৌন্দর্যই বটে ! গুচ্ছ গুচ্ছ হালকা বেগুনি পাঁচ পাপড়ির বৃন্তটি ফুলের চেয়ে বড়--তার মধ্যে থেকে গাঢ় বেগুনি আভাযুক্ত নীল ফুল উঁকি মারে । ফুটেই ঝরে পড়ে --ঘুর্ণায়মান ঝরে পড়াও দেখার মত। তরুতলে বিছানো নীল বেগুনি ঝরা ফুল-রোমান্টিকতার চূড়ান্ত দৃশ্য ! নীল আকাশের অসীমকে নীলমণি লতার ফুলে ধরার মধ্যে পাই কবির চিরন্তন "সীমার মাঝে অসীম "কে প্রত্যক্ষ করার দর্শন ! বিশাল গ্যালাক্সির সঙ্গে নীলমণি লতার ছোট্ট ফুলটি এক অনন্ত বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রইল ।

    কনকচাঁপা খুবই বিরল ফুল । যাঁরা দেখেননি বৈজ্ঞানিক নাম Ochna squarrosa লিখে গুগলিয়ে ছবিটি দেখে নিতে পারেন নাহলে রবীন্দ্রকাব্য রস অনেকটাই অধরা থাকবে । অনেক কবিতা গানে কবি কনকচাঁপার সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছেন---আহা--হয়তো আমি যেমনটা কবির কথার সুতো ধরে কনকচাঁপাকে খুঁজেছি ,সেরকমই ফুলটি হয়তো বিলুপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে যাবে পাঠকদের প্রচেষ্টায়। উজ্জ্বল হলুদ রঙের ফুলটি-গোল করে সাজানো পাপড়ি --যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ।

    "সুরের গুরু দাও গো সুরের দীক্ষা মন্দাকিনীর ধারা উষার শুকতারা/কনকচাঁপা কানে কানে যে সুর পেল শিক্ষা " বাঙালির প্রাত্যহিক ডালভাতের বাইরে এক স্বর্গীয় সুরের মাধুর্য খুঁজে পেল কনকচাঁপা ফুলে ।
    "নাই আমাদের কনকচাঁপার কুঞ্জ/ বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ " --এখানেও কনকচাঁপার উপমা এক ইউটোপিয়ান স্বর্গের কাছাকাছি অবস্থানকে বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়েছে তা সহজেই বোঝা যায় !

    দার্জিলিং বা সিকিমে লাল গুয়াস মনে প্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয় --আমরা বারবার ছুটে ছুটে যাই , রবি ঠাকুর যে রডোডেনড্রন সুরার আখর হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছেন ।
    " হঠাৎ কখন সন্ধ্যাবেলায় নামহারা ফুল গন্ধ এলায় /প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে অরুণকিরণে তুচ্ছ /উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রন গুচ্ছ " --নিছক ফুল দিয়ে শব্দ মেলাতে নয়-- সচেতন ভাবেই কবি এখানে দুটি বিপরীত মুডের ফুলের উল্লেখ করলেন , ঝলমলে সকাল আর অলস মধুর সন্ধ্যার আমেজটি রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ সহ পুরো এসে পাঠকের হাতে লুটিয়ে পড়ল । রডোডেনড্রনের উজ্জ্বল লালের ঔদ্ধত্য রবীন্দ্রনাথ এমনভাবে খোদাই করে দিয়ে গেলেন বাঙালির মনে যে এটাই তাঁর চিরদিনের প্রেমের ব্র্যান্ড নেম হয়ে গেল !!

    পাঁচিলের এধারে কবিতায় "পাঁচিলের এপারে দেখ একটি সুদীর্ঘ ইউক্যালিপ্টাস,পাশেই দু তিনটি সোনাঝুরি প্রচুর পল্লবে প্রগলভ "--সোনাঝুরি গাছের গল্প শান্তিনিকেতন জুড়ে -কোথাও বনসৃজনে কোথাও বা আপনা থেকেই । গাছ ফুল না চিনলেও সোনাঝুরির হাট শহরের আধুনিক মানুষের খুব পছন্দের জায়গা । Acacia গাছটিকে বাংলায় আকাশমণি বলে ডাকা হত । ফুল না থাকলেও গাছে ছোট কাস্তের আকারে থোকা থোকা পাতার সৌন্দর্য প্রগলভই বটে। লম্বা ঝোলা ডাঁটায় সোনালী হলুদ ঝুরো ঝুরো সোনার গুঁড়ো যেন কেউ ফেভিকলে সেঁটে দিয়েছে--এফুলের নাম 'সোনাঝুরি' --কবি বলার পর সবারই মনে হয়-এছাড়া অন্য নাম হতেই পারেনা ।

    নাগকেশর রবীন্দ্রনাথের আর একটা অতি প্রিয় ফুল--ইংরেজী কবিতায় যেমন গোলাপ তেমনি বারংবার রবীন্দ্রনাথ কবিতা গান উপন্যাসে প্রেমের দ্যোতক হিসেবে ব্যবহার করেছেন নাগকেশরকে --'সত্যি প্রেম' এরই মত এই ফুলের দেখাও যে সহজে মেলে না । চিরহরিত্ বৃক্ষে বসন্তে ফোটে- চারটি সাদা পাপড়ির মাঝে অজস্র হলদে পুংকেশর ,রূপে সুগন্ধে বর্ণে মন উথালপাথাল করে দেয়। "বসন্তে নাগকেশরের/ সুগন্ধে মাতাল/ বিশ্বে যাদুমঞ্চে /রচে সে ইন্দ্রজাল " । 'চোখের বালি' র বিনোদিনী মহেন্দ্র-র বালিশের তুলোর সঙ্গে যত্নে মিশিয়ে দেয় নাগকেশরের রেণু আর আতর- সেই যাদুতে রোমাঞ্চিত হয় মহেন্দ্র ! 'মালঞ্চ' র আদিত্য ঝোলা থেকে ছোট তোড়ায় বাঁধা পাঁচটি নাগকেশর ফুল বার করে সরলাকে বলে-"আমি জানি নাগকেশর তুমি ভালবাস । তোমার কাঁধের ঐ আঁচলের উপর পরিয়ে দেব ?এই এনেছি সেফটিপিন" প্রেম নিবেদনের এক অনন্য মাধ্যম হয়ে থাকছে নাগকেশর । প্রেম অপ্রেমের দোলাচলের মুহূর্তেরও সাক্ষী এই ফুল-- যখন রাণী কমলিকা চৈত্র সংক্রান্তির সেই মাহেন্দ্রক্ষণে রাজা অরুনেশ্বরকে নৃত্যরত অবস্থায় দেখেন নাগকেশরের বনে ! শেষবয়সের কবিতাতেও কবির পিছুটান থেকে বোঝা যায় এই ফুলের উপর দুর্বলতা --যাবার বেলায়-"আর রইবে নাগকেশরের চারা" ।

    একটা ধন্দ কিন্তু থেকে যায় কবি কি নাগলিঙ্গম ফুলকেই নাগকেশর বলে উল্লেখ করেছেন? কারণ শান্তিনিকেতনে (কলাভবন ক্যান্টিনের পাশে এখনো ফুলে ভরা যে গাছটি) যেগুলো দেখা যায় সবই নাগলিঙ্গম --মোটা গুঁড়ি থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ বড় মোটা পাপড়ির কমলা লাল ফুল -মাঝখানে সাপের ফণার মত কেশর । নাগলিঙ্গম আর নাগকেশর একই পরিবারের ফুল বলে অনেকেই ভুল করেন। নাগকেশরের বৈজ্ঞানিক নাম Ochrocarpus longifolius আর নাগলিঙ্গমের Couroupita grianensis . তবে নাগকেশরের মত সুগন্ধ নাগলিঙ্গমের নেই-সুতরাং কবি ভুল করেননি ।

    করবীফুলকে রবীন্দ্রনাথ কত ভাবে যে ব্যবহার করেছেন--কতবার কত রূপক-এর ছাঁচে ফেলেছেন --নিজের মনের কত প্রিজমের মধ্যে দিয়ে রক্তকরবীর লাল রঙকে পাঠিয়ে তার রঙের বিচ্ছুরণের মানে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন তার মাপজোক নেই !! করবী ফুলের অধ্যায়ে তিন রকম করবী ---হলদে করবী বা সাধারণ কলকে ফুল বলে যাকে তার বৈজ্ঞানিক নাম Thevetia peruviana...রক্তকরবী Nerium indicum শ্বেতকরবী Nerium oleander white..এই খটমটে কেজো নাম গুলো বলার উদ্দেশ্য শুধু ওই ভাল করে ছবি দেখে ফুলগুলো যাতে চিনে নেওয়া যায় । রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে আলোচিত ও সর্বকালের আধুনিক লেখাগুলোর অন্যতম "রক্তকরবী" নাটক । অধ্যাপক নন্দিনীর রক্তকরবীর অলঙ্কারের অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝার চেষ্টা করেন- "মালতী ছিল মল্লিকা ছিল ছিল চামেলী ; সব বাদ দিয়ে এ ফুল কেন বেছে নিলে?" এ যেন রবীন্দ্রনাথের নিজের জিজ্ঞাসা ও উত্তর- "আমার রঞ্জনের ভালবাসার রঙ রাঙা -সেই রঙ গলায় পরেছি,বুকে পরেছি,হাতে পরেছি ।" রক্তকরবী যক্ষপুরীতে সহজে মেলে না -কিশোর অনেক খুঁজে জঞ্জালের পেছনে একটা গাছ থেকে নন্দিনীর জন্য ফুল নিয়ে আসে --যান্ত্রিক যক্ষপুরীতে প্রেম ভালোবাসা দয়ামায়ার মতই দুর্লভ এই ফুল । রক্তকরবী ফুল সম্পূর্ণ উপন্যাস জুড়ে কখনো ভালোবাসা কখনো প্রতীক্ষা কখনো দুঃখ কখনো সাহসী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে বার বার ফিরে ফিরে আসে--শেষের নন্দিনীর হাত থেকে খুলে পড়া রক্তকরবীর কঙ্কণ আজীবন আমাদের মনের সিন্দুকে যত্নে তোলা থাকে ।

    "তোমার বনে ফুটেছে শ্বেত করবী আমার বনে রাঙা / দোহার আঁখি চিনিল দোহে-নীরবে ফাগুনে ঘুম ভাঙা" অথবা "আবেগ লাগে বনে বনে-শ্বেতকরবীর অকাল জাগরণে" -এখানে শ্বেতকরবী যেন প্রেমের রেশমী রুমালে কোমল নকশা তোলে। কবিতা গানে যা আলগোছে বলা গোরা উপন্যাসে একেবারে পরিষ্কার ভাবে তুলনা করে লাল গোলাপ ও শ্বেতকরবীর "ফুলের ভাষা" বলে দিলেন রবীন্দ্রনাথ । ললিতা দুটি লাল গোলাপ বিনয়কে পাঠানোর পর বিনয় বলছে-"যুদ্ধেরই রঙ লাল , অতএব সন্ধির ফুল সাদা হওয়া উচিত ছিল " এরপর বিনয় চাদরের নীচ থেকে একগুচ্ছ শ্বেতকরবী বার করে ললিতাকে --"আপনার ফুলদুটি যতই সুন্দর হোক তবু তাতে ক্রোধের রঙটুকু আছে , আমার এ ফুল সৌন্দর্যে তার কাছে দাঁড়াতে পারে না কিন্তু শান্তির শুভ্ররঙের নম্রতা স্বীকার করে আপনার কাছে হাজির হয়েছে "
    কলকে ডাকনামের করবী আটপৌরে গৃহস্থ ফুল --তাকে ঠিক সেরকম জায়গায় রেখেই শব্দছবি আঁকেন কবি-
    'পুকুর ধারে 'কবিতাতে --"দোতলার জানলা থেকে চোখে পড়ে পুকুরের একটি কোণা/ এধারে ডাঙায় করবী ,সাদা রঙ্গন,একটি শিউলি /দুটি অযত্নের রজনীগন্ধায় ফুল ধরেছে গরীবের মত "

    আগুনরঙা কৃষ্ণচূড়া যখন ফোটে সদর্পে নিজের আগমন ঘোষণা করে-ঠিক যেমন "তরুন বীরের বেশে তুমি করলে বিশ্বজয় -একি গো বিস্ময় -অস্ত্র তোমার গোপন রাখো কোন তূণে" । একটুও বেমানান লাগে না- এই বীরের কর্ণভূষণ হিসেবে যখন কবি কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরীকে নির্বাচন করেন । পাঁচপাপড়ির এই ফুলটির বৈজ্ঞানিক নাম Delonix regia . "হঠাৎ কিসের মন্ত্র এসে /ভুলিয়ে দিলে এক নিমেষে/ বাদলবেলার কথা । হারিয়ে পাওয়া আলোটিরে নাচায় ডালে ফিরে ফিরে বেড়ার ঝুমকোলতা " কোনো গুরুগম্ভীর পরিবেশ নয়,একটা ফুরফুরে আমেজ এনেছে এখানে ঝুমকোলতা ফুল । ঝুমকোলতা আমাদের বঙ্গীয় আবহাওয়াতে একটু লতিয়ে চলার পথ পেলেই দিব্বি বেড়ে চলে-বর্ষায় ইতি উতি অনেক ফুল ফোটে । ঝিরিঝিরি বেগুনি সাদা পাপড়ি গোল রাখীর আকারে সাজানো --সত্যি দেখলেই মন ভালো হয়ে যায় । বৈজ্ঞানিক নাম Passiflora incarnata ।

    শৈশবে প্রথম কবিতা মুখস্তর সময়েই শিশু আওড়ায় --"আঁধার হল মাদার গাছের তলা / কালি হয়ে এল দীঘির জল" । পরবর্তী জীবনে কজন এই মাদার ফুলকে চিনে তার সৌন্দর্য দেখার জন্য থমকে দাঁড়ায় কে জানে ! মাদারের পোষাকি নাম মন্দার-প্রাচীনকাল থেকেই সব সাহিত্যে এর উল্লেখ আছে কারণ ফুলটিই পৌরাণিক মতে সমুদ্রমন্থনে মন্দার পর্বত থেকে পাওয়া , সেজন্য পারিজাতও বলে। প্রদীপের শিখার আকারের টকটকে লাল থোকা থোকা ফুল যখন ফোটে --গাছে পাতা থাকেনা , শুধু কান্ড। মৌটুসী পাখিদের খুব পছন্দের ফুল মাদার । ফুল ফুটুক না ফুটুক মাদার গাছ খুব পত্রবহুল কখনো নয় ,এর নীচে আলাদা করে আঁধার হওয়ার কোনো কারণ নেই--তবে কি ছন্দমিল খুঁজতেই --- ! এর বৈজ্ঞানিক নাম Erythrina variegata

    যূথী(যুঁই),চামেলী ,কদম,কেতকী,শিউলি, টগর,কাশফুল,বকুল,পারুল,পলাশ,শিমূল, মালতী,মাধবী --কোন ফুল নেই রবীন্দ্রসাহিত্যে !! ঋতু ও ভাব অনুযায়ী এই সব ফুলের নান্দনিক উপস্থিতি রবীন্দ্রকাব্যের নিজস্ব রসায়নের ফর্মুলা তৈরী করেছে --গবেষক ফারুক আহমেদ দেখিয়েছেন যে সাতষট্টি রকমের ফুল ছশো সাতাশিবার উল্লেখিত হয়েছে আড়াইহাজার রবীন্দ্রসংগীতে !!

    মল্লিকা ছোট্ট সাদা সুগন্ধি ফুল Jasmine sambac-- আমাদের বাংলাভাষীদের জীবনে, সব আবেগঘন মুহূর্তকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রবি ঠাকুর মল্লিকার বিনিসুতোর মালায় গেঁথে বা বেঁধেই দিয়েছেন । "আমার মল্লিকাবনে যখন প্রথম ধরেছে কলি /তোমার লাগিয়া তখনি ,বন্ধু, বেঁধেছিনু অঞ্জলি "--প্রথমপ্রেমের শিহরন দিয়ে শুরু আর বেদনভরা বিদায়বেলায়ও সেই মল্লিকা
    "----ফিরে দেখা হবে না তো আর / ফেলে দিও ভোরে গাঁথা ম্লান মল্লিকার মালাখানি / সেই হবে স্পর্শ তব সেই হবে বিদায়ের বাণী "

    এবার একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে সম্পূর্ণ অন্য এক ফুলের জগতে কবির বিচরণ চিন্তা ভাবনা কেমন ছিল তার খোঁজ নেওয়া যাক । রবীন্দ্রনাথকে বুর্জোয়া কবি দুর্নাম মাঝেমধ্যে শুনতে হয় বইকি । অথচ আমাদের এমন কোনো মানসিক অবস্থান নেই যাকে কবি ভাষায় প্রকাশ করেননি--তেমনি বাংলাদেশে অভিজাত অনভিজাত এমন ফুল খুঁজে পাওয়া মুশকিল যা তাঁর কলমে শব্দরূপ ধারন করেনি। বকফুল বা কুমড়োফুলের বড়া, সজনেফুলের নানাবিধ উপাদেয় পদ বাঙালির রসনা তৃপ্ত করে এসেছে চিরকাল--খাদ্যগুণ তাদের অনিন্দ্য রূপের খাতায় মস্ত এক লাল ঢ্যঁড়া দিয়ে দিয়েছে । বেচারা সেই সব সুন্দর ফুলেদের কাব্যগরিমা দিতে না পারার দুঃখ সুন্দর ভাবে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্যধর্ম প্রবন্ধে "সজনে ফুলে সৌন্দর্যের অভাব নেই। তবু ঋতুরাজের রাজ্যাভিষেকের মন্ত্রপাঠে কবিরা সজনে ফুলের নাম করেন না। ও যে আমাদের খাদ্য, এই খর্বতায় কবির কাছেও সজনে আপন ফুলের যথার্থ্য হারালো। বক ফুল, বেগুণ ফুল, কুমড়ো ফুল, এই-সব রইল কাব্যের বাহির-দরজায় মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে; রান্নাঘর ওদের জাত মেরেছে। কবির কথা ছেড়ে দাও, কবির সীমন্তিনীও অলকে সজনে-মঞ্জরি পরতে দ্বিধা করেন, বক ফুলের মালায় তাঁরই বেণী জড়ালে ক্ষতি হত না, কিন্তু সে কথাটা মনেও আমল পায় না। কুন্দ আছে, টগর আছে, তাদেরও গন্ধ নেই, তবু অলংকার-মহলে তাদের দ্বার খোলা— কেননা, পেটের ক্ষুধা তাদের গায়ে হাত দেয় নি। বিম্ব যদি ঝোলে-ডালনায় লাগত তা হলে সুন্দরীর অধরের সঙ্গে তার উপমা অগ্রাহ্য হত।" বুঝতে অসুবিধা নেই মন জুড়ে কুন্দ আর কুমড়ো ফুল একাকার ।
    পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির আশঙ্কায় আজ এখানেই শেষ করি -- ভরসা পেলে 'রবীন্দ্ররচনার ফুলের অভিধান ও তাৎপর্য' র পসরা নিয়ে আবার কখনো দেখা হবে ।
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৭ আগস্ট ২০২০ | ৬১৮ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ০৭ আগস্ট ২০২০ ১৬:০২95980
  • ফুলেল সুবাসিত লেখা। অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যাগুলো ভাল লাগল। 

    এপারে ঢাকার বলধা গার্ডেনের গেস্ট হাউসে কবি এক রাত কাটান। আর পরদিন সকালে "শংখদিঘি" ঘিরে ফোটা দুর্লভ ক্যামেলিয়া ফুল দেখে লেখেন "ক্যামেলিয়া" কবিতাটি। 

    সেই গেস্ট হাউসটি সংরক্ষণের অভাবে বন্ধ অনেক বছর,  শংখদিঘি মজে গেছে। তবে কি আশ্চর্য! আজও দিঘি ঘিরে কয়েকটি ঝোপে ফোটে অপরূপ ক্যামেলিয়া!                       

  • বিপ্লব রহমান | ০৭ আগস্ট ২০২০ ১৬:১৮95981
  • *সংশোধন :  শংখদিঘি নয়, শংখপুকুর হবে। প্রায় ধসে পড়া গেস্ট হাউসের নাম-   জয় হাউস।   

    একদা এই নিয়ে নিউজ করেছিলাম,  পরে ব্লগ নোট। 

    আগ্রহীরা লেখাটি দেখতে পারেন   

    https://biplobcht.blogspot.com/2015/03/blog-post_16.html?m=1

  • জয়ন্ত ভট্টাচার্য | 2409:4061:2c82:9900:cec5:e600:f382:82c9 | ০৭ আগস্ট ২০২০ ২২:২০96011
  • এক সুনন্দিত, সৌগন্ধময় পেলব আলোচনা। আহা!

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত