• হরিদাস পাল  অপার বাংলা

    Share
  • একুশের গৌরব : মুনীর অপটিমা থেকে অভ্র

    বিপ্লব রহমান লেখকের গ্রাহক হোন
    অপার বাংলা | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৩১৯ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ১৯৬৫ সালে উদ্ভাবন করেন ‘মুনীর অপটিমা‘ নামে বাংলা ভাষার টাইপরাইটার। ছাপাখানার বাইরে সেই প্রথম প্রযুক্তির সূত্রে বাংলা পেল নতুন গতি। স্বাধীনতার পর ইলেকট্রনিক টাইপরাইটারেও যুক্ত হয় বাংলা। পরে আটের দশকে ‘বিজয়‘ সফটওয়্যার ব্যবহার করে সম্ভব হয় কম্পিউটারেই বাংলা লেখা। আর ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ মুক্ত সফটওয়্যার ‘অভ্র‘ উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক নবযাত্রা।

    আন্তর্জাতিক বর্ণ সংকেতায়ন বা ইউনিকোডে বাংলা বর্ণলিপি যুক্ত হওয়ায় ‘অভ্র‘ ফন্টে সম্ভব হয় ইন্টারনেটে বাংলায় লেখালেখিসহ বাংলায় ওয়েবসাইট নির্মাণ। একই সঙ্গে অফলাইনে বাংলার প্রসার বাড়ে এই সফটওয়্যারে। কম্পিউটারে বাংলা লেখার সুযোগ সৃষ্টি মুদ্রনশিল্পেও এনেছে অভাবনীয় পরিবর্তন।

    ‘অভ্র‘ উদ্ভাবন করেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান খান। মেহেদী, রিফাতুন্নবি, তানভিন ইসলাম সিয়াম, রাইয়ান কামাল, শাবাব মুস্তফা, নিপুণ হক- এই কয়েক বন্ধু সেই থেকে ‘অভ্র’র উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে কাজ করছেন। ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’- এই স্লোগানে ‘অভ্র’র সম্মুখযাত্রা শুরু। এর সমস্ত সংস্করণ ওয়েবসাইট [omicronlab.com] থেকে বিনা মূল্যে ডাউনলোড করে ব্যবহার করা যায়। ব্যবহারকারীর সুযোগ রয়েছে অভ্র, প্রভাত বা ফনেটিক কি-বোর্ড বাছাই করার। এমনকি যিনি কম্পিউটারে বাংলা লিখতে অভ্যস্ত নন, তিনিও অন্তত কিছু বাক্য অভ্রতে লিখতে পারবেন ডিজিটাল কি-বোর্ড থেকে মাউস দিয়ে।

    কয়েক বছর আগে অভ্রতে ফনেটিক ভার্সন যুক্ত হওয়ায় বাংলা টাইপিং হয়েছে আরো সহজ। রোমান হরফে বাংলা কথাটি টাইপ করলে ফনেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি পরিণত হবে বাংলায়। অভ্র ফনেটিক অনলাইন ও অফলাইনে সমান সক্রিয়। এ ছাড়া অভ্রর কোডাররা উদ্ভাবন করেছেন বহনযোগ্য সফটওয়্যার ভার্সন। মুক্ত জ্ঞানকোষ বাংলা উইকিপিডিয়া, সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টালসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সার্চ ইঞ্জিনে এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে এই ফনেটিক অপশন।

    ইউনিকোডে বাংলা যুক্ত হওয়ায় ইন্টারনেটে দ্রুত প্রসার হচ্ছে বাংলার। অভ্র’ ও উইন্ডোজ সেভেন এই কাজকে করেছে আরো সহজ। আর কম্পিউটারের উইন্ডোজ সেভেন ভার্সন থেকে শুরু করে পরের সবগুলো ভার্সনে বাংলা দেখার জন্য আলাদাভাবে প্রয়োজন নেই বাংলা কনফিগারেশনের। এ ছাড়া ব্রাউজিং সফটওয়্যার ফায়ারফক্সেও এখন যুক্ত হয়েছে অভ্র’। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার থেকে তো বটেই, এমনকি মোবাইল ফোনেও সম্ভব হয়েছে বাংলায় লেখাপড়ার কাজ।

    অভ্র সফটওয়্যারে ইউনিকোড ব্যবহার করে সহজেই ই-মেইল, ডিজিটাল সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, বাংলা ব্লগসহ সব সাইটেই বাংলায় চলছে লেখাপড়ার কাজ। ওপার বাংলাসহ সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে মহান একুশের গৌরবগাথা। এ কারণে অভ্রকে অনেকেই বলছেন ইন্টারনেটে বাংলা ব্যবহারের মাইলফলক। উবুন্টু লিনাক্স, উইন্ডোজের সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলা ব্যবহারের।

    বেশ কয়েক বছর হলো শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইট গুগল ও ফেসবুকের বাংলা সংস্করণ। সার্চ ইঞ্জিনের পাশাপাশি গুগলের সব কটি ওয়েবসাইট পরিষেবায় বিশ্বের ৬৫টি ভাষার মধ্যে স্থান পেয়েছে বাংলা ভাষা। ফনেটিকে গুগলেও এখন বাংলায় লেখা সম্ভব হচ্ছে। গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে করা যাচ্ছে বিদেশি ভাষার বঙ্গানুবাদ। তবে এখনো তা অনেকটাই যান্ত্রিক।

    ‘অভ্র‘র পরে এপারে ‘বিজয় বায়ান্ন‘, ‘বিজয় একুশে‘ এবং ‘বিজয় একাত্তর‘ নিয়ে এসেছে বাংলা ইউনিকোড ফন্ট। এসব ফন্টের কি-বোর্ড পুরোপুরি ‘বিজয়‘ টাইপিং সফটওয়্যারনির্ভর। ফলে যাঁরা কম্পিউটারে লেখালেখিতে বিজয় কি-বোর্ডে অভ্যস্ত তাঁরা এটি সহজেই ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া ‘আকাশ নর্মাল‘ ‘অপর্ণা লোহিত‘ ‘বাংলা‘ ‘গোধূলি‘ ‘মহুয়া‘, ‘মুক্তি‘, ‘সোলায়মানলিপি‘সহ ডজনখানেক ইউনিকোড ফন্ট উদ্ভাবিত হয়েছে বাংলায়।

    তবে বাংলা ইউনিকোড ফন্ট অভ্র বা বিজয় (সুতন্বী ওএমজে) বা অন্যান্য কোনোটিই মূদণের জন্য দৃষ্টিবান্ধব নয়। কারণ ছাপার পরে এগুলো মোটা হরফে দেখায়, একেকটি অক্ষর প্রচুর কালি ধরে।

    এই বাধা দূর করতে লেখক-প্রকাশকরা এপারে কনভার্টার ব্যবহার করে ইউনিকোডে লেখা বাংলা পাণ্ডুলিপি মূদ্রণযোগ্য ফন্ট বিজয়- সুতন্বী এমজে‘তে রূপান্তর করে কাজ চালাতেন। বিজয়- সুতন্বী এমজে ইউনিকোড ফন্ট নয়, হালকা-পাতলা গড়নের একেকটি অক্ষর মূদ্রণের জন্য বেশ উপযোগি। তবে কনভার্ট করতে পুরো লেখার বেশকিছু অংশ প্রায়ই ভেঙেচুরে যায়। তখন ধৈর্য ধরে সেসব আবার পুনর্লিখন করতে হয়। বই ছাপার ক্ষেত্রে বিষয়টি পরিশ্রম ও সময়-সাপেক্ষ।

    সম্প্রতি এই বাধা দূর হয়েছে ‘কালপুরুষ‘ নামে ইউনিকোড ফন্ট উদ্ভাবনে। এটি ইউনিকোড হলেও হালকা-পাতলা ও দৃষ্টি নন্দন বলে এই ফন্টেই এখন প্রকাশকরা বই ছাপছেন। যে কোনো ফন্টে লেখাপত্র সহজেই কালপুরুষে রূপান্তর করা যায়, লেখাও ভেঙেচুরে যায় না।

    অভ্রর অন্যতম উদ্ভাবক ডা. মেহেদী হাসান খান এই লেখককে জানিয়েছেন, তাদের কোডাররা এখন অভ্রর নতুন নতুন ভার্সন নিয়ে কাজ করছেন। তারা চেষ্টা করছেন বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যারে অভ্রকে আরো বেশি ব্যবহারবান্ধব করে তুলতে।

  • বিভাগ : অপার বাংলা | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৩১৯ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • প্রতিভা | 162.158.158.180 | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৮:০০91006
  • মেহদি হাসান বাংলাভাষার সুপুত্র ! তার কীর্তি অক্ষয়। লেখককে অনেক ধন্যবাদ আজকের দিনে এই লেখাটির জন্য।
  • বিপ্লব রহমান | 162.158.158.116 | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৮:১০91007
  • যথার্থই বলেছো দিদি। 

    মেহেদির টিম শুধু অভ্র উদ্ভাবনই করেনি, তারা উত্তরোত্তর এর বিকাশ ঘটাচ্ছেন। আর অভ্র সফটওয়ার একদম বিনামূল্যে দিচ্ছেন তারা,  করপোরেট যুগে এ-ও কম কথা নয়।            

  • একলহমা | 108.162.237.87 | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৬:৩৪91011
  • আমার একটা পুরানো লেখে থেকে:

    গিন্নীর হাত ধরে মার্কিন মুলুকে চলে আসার কয়েক সপ্তাহর মধ্যে হাতে এল কম্পিউটার। পড়ার জন্য সিলভার প্ল্যাটার, আজকের ডিভিডির মাতামহী। লেখার জন্য - আদিযুগ চলছে তখন, ডস। আহা! আমায় আর পায় কে, আর কাগজ খুলে হেঁচে কেশে মরতে হবে না! তার পর পেয়ে গেলাম জানালা-৩, দশমিক কত যেন। সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য। আমায় ফেলে বস চলে গেলেন অন্য যায়গায়। নূতন বস সন্ধান দিলেন কোণায় কামড় খাওয়া আপেলের। ওরে না! এ কি জিনিস! দিনে রাতে ম্যাক বাজিয়ে চোস্ত পোস্ট-ডক হয়ে গেলাম। তারপর এল ১৯৯৫। উইন্ডোজ ৯৫ ওয়ালা পি সি। এবং এল নেটস্কেপ। খাড়া লাফ - যুগান্তর ঘটে গেল। কিন্তু এত সবের মধ্যে একটা দুঃখ বাজতে থাকত সর্বদাই। কম্পিউটারে বাংলা লেখা সহজ হচ্ছে না। যা সফটঅয়্যার পাই, কিনে ফেলি, কত যে ডলার গেল, সুবিধা হয় না, লিখে সুখ হয় না।

    দিন কাটে, দিনের নিয়মে। হঠাৎ একদিন কতগুলো দুর্বোধ্য শব্দ সংমিশ্রণের সাথে ঠোক্কর খেলাম - ওমিক্রন, ল্যাব, অভ্র, কীবোর্ড! কি আছে জীবনে ভাব নিয়ে নামিয়ে ফেললাম, চালু করে দিলাম। অনুযোগ-অপ্রাপ্তির দিন শেষ হয়ে গেল। জাদুকর-এর নাম দেখলাম মেহদী হাসান। আমরা যারা বাংলায় লেখালেখি করতে ভালবাসি, বিশেষ করে ইন্টারনেট-এ, আমার মনে হয় আমাদের জীবনে পরিষ্কার দুটি অধ্যায় - অভ্র ব্যবহার করতে শুরু করার আগে এবং পরে, ভাষা উন্মুক্ত হওয়ার আগে এবং পরে।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত