এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • মতুর ষষ্ঠী

    চতুর্মূর্খ লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৯ মার্চ ২০১০ | ১২৬৩ বার পঠিত



  • শেষ ঘুমের আয়েস গায়ে মেখে অরুনমামা যখন সবে উঠবো উঠবো করছেন, সেই সময়েই তারস্বরে ঝাউর গিজোর গিজ ঘিনিতা বেজে উঠলো। ভোরের অলস আমেজটা চটকে যাওয়ায় উনি তেলে-বেগুনে জ্জ্বলে উঠলেন। মহাষষ্ঠীর সকাল সাড়ে সাতটাতেই কলকাতা ঘর্মাক্ত হল। তাতে অবিশ্যি কেউ খুব একটা চাপও নিল বলে মনে হল না। প্যান্ডেল-প্রতীমার শেষ সজ্জায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল সকলে। আরেকটা পুজো শুরু হয়ে গেল।


    দোতলার ঝুল বারান্দাটার কোনে চেয়ারটায় বসে ব্রাশ করতে করতে মতু জগতের এই সব কান্ডকারখানা পর্যবেক্ষণ করছিল। বছরের বাকি দিনগুলির থেকে এই চার-পাঁচ দিন বারান্দার নিচের রাস্তাটার রুটিন পাল্টে যায়। এই গলির শেষ প্রান্তে প্যান্ডেল। এখান থেকে একটু ঝুঁকে ঘার ঘুরিয়ে তাকালে প্যান্ডেলের বড় গেটটার ভিতর দিয়ে অসুরটাকে দেখা যায়। আর একটু ঝুঁকলে অসুরের উপরে চেপে বসা সিংহের পাএর থাবাগুলি, আর একটু ঝুঁকলে...

    - অ্যাই মতু অত ঝুঁকিস না, পড়ে যাবি।

    বাবার বাজখাঁই আওয়াজে মতু রেলিঙের উপরে প্রায় ঝুলে পড়া অবস্থা থেকে চেয়ারে ফিরে আসে।

    - তোকে কতবার বলেছি যে অমন ভাবে ঝুঁকবি না! পড়ে গেলে কি হবে? আর কতক্ষন ধরে দাঁত মাজবি! নে মুখ ধুয়ে নে এবারে...

    বাবা ক্রাচ দুটো এগিয়ে দেন মতুর দিকে। ব্যাজার মুখে মতু ক্রাচ বগলে নিয়ে লম্বা বারান্দার উল্টোদিকে বেসিনের দিকে এগোয়।


    আনন্দময় হাজরার জীবনময় সাফল্যের ইতিহাসে একফোঁটা চোনা তাঁর বিবাহিত জীবন। সোমলতার সঙ্গে বিয়েটা একেবারেই সুখের হয়নি। দুজনেই উচ্চাকাঙ্খী এবং অনমনীয় হলে যা হয়। এই রকম সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেষ ভরসা হিসেবে থাকে সন্তান। কিন্তু তাঁদের ছেলেটিও কোন সুখ বয়ে আনেনি পৃথিবীতে। জন্ম থেকেই আংশিক বিকলাঙ্গ এবং সামান্য জড়বুদ্ধি। মতুর জন্মের পাঁচ বছর পর থেকে তাঁরা আলাদা। ডিভোর্সের পর আদালত থেকে আনন্দময় মতুকে জিতে এনেছিলেন। সেও প্রায় চার বছর হতে গেল।

    যদিও সামনা সামনি, বিশেষ করে ছেলের সামনে, তাঁরা স্বাভাবিক ভাবেই কথা বার্তা বলেন, সযত্নে তিক্ততা গুলিকে ঢেকে রেখে। ছেলের সাথে মায়ের দেখাও হয় প্রায়ই। তবে সোমলতা গেটের ভিতরে ঢোকেন না। এই দিনগুলিতে মতুর আনন্দ চোখে মুখে টের পাওয়া যায়। আজও পাওয়া যাচ্ছে। আজ মতু মায়ের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাবে।


    অনেকদিন বাদে সোমলতা আবার এই গলিটার মুখোমুখি। মতুকে নিয়ে বেরোতে হবে আজ। গলির মুখের প্রসন্নর মিষ্টির দোকানটা পেরোলেই মনে হয় এবার সব হারানোর রাজ্য শুরু হল। পুরনো ক্ষয়িষ্ণু তথাকথিত বনেদী বাড়ির ভিতরে জীবনের কতগুলি বর্ণহীন বছর কাটানোর দু:সহ অভিজ্ঞতা মনে পড়ে বারবার। তবু স্রেফ মতুর মুখ চেয়ে কয়েকবার ফিরে আসা।

    পুজোর কদিন এ গলির সব কটা বাড়ি আলোর মালায় সাজানো। দুপাশের আলোর সজ্জা দর্শনার্থীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে প্যান্ডেল পর্যন্ত। ছোটর মধ্যে হলেও এ পাড়ার পুজোটার বেশ নামডাক আছে। তাই ভিড়ও হয়েছে বেশ। বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে হিমসিম খেতে হল সোমলতাকে। দোতলার ডোরবেলটায় হাত রেখে বেল বাজানোর আগে আবার একরাশ স্মৃতি ভিড় করে এল মনে।


    মতু সেজেগুজে মায়ের প্রতীক্ষায়। বাবা ঘরে টিভিতে সন্ধ্যের সংবাদে মগ্ন। মায়ের যেন আসতে একটু দেরিই হচ্ছে আজ। তবে মতু এখন ওর প্রিয় কোনটাতে ওর প্রিয় চেয়ারটায় বসে। পুজোর মধ্যে এই জায়গাটা আরো ভালো লাগে মতুর। এখান থেকে একটু ঝুঁকে ঘার ঘুরিয়ে তাকালে প্যান্ডেলের বড় গেটটার ভিতর দিয়ে অসুরটাকে দেখা যায়। আর একটু ঝুঁকলে অসুরের উপরে চেপে বসা সিংহের পাএর বড় বড় থাবাগুলি, আর একটু ঝুঁকলে... আচমকা কলিংবেল বেজে ওঠে... মতু ঝুঁকে পড়া অবস্থাতেই অন্যদিকে ঘার ঘুরিয়ে কে এলো দেখতে গিয়ে অনেক খানি ঝুঁকে পড়ে... পুরোনো নোনা ধরা রেলিং থেকে ইঁট খসে পড়ে... শেষ অবলম্বন হিসেবে মতু একটা ক্রাচকে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করে।


    শেষ পর্যন্ত কোন মন খারাপ করা দূর্ঘটনা ঘটেনি। মন ভালো করা একটা দূর্ঘটনা ঘটেছিল যদিও। মতুর চিৎকারে আনন্দময় শেষ মূহূর্তে মতুকে টেনে তোলেন। তার পর নিচে গিয়ে সামলান আতঙ্কবিহ্বল সোমলতাকে। মতুর চিৎকার শুনে উপরে তাকানোর পর থেকে দরজাটাকে আঁকড়ে ধরে তখনো থরথরিয়ে কেঁপে চলেছেন সোমলতা।

    মতুর ঠাকুর দেখতে যাওয়াটা আজকে আর হয়ে ওঠেনি। তবে তার বদলে যেটা পাওয়া গেছে তার আনন্দ কোন অংশে কম নয়। আজ তারা তিনজনে একসাথে রাতের খাবার খাচ্ছে।

    ২৯শে মার্চ, ২০১০


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ২৯ মার্চ ২০১০ | ১২৬৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন