• বুলবুলভাজা  বইপত্তর

  • নতুন জীবন

    বিক্রম পাকড়াশী লেখকের গ্রাহক হোন
    বইপত্তর | ২৭ জুন ২০১০ | ১২৫ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • Orhan Pamuk. The New Life(London: Faber and Faber,2002).Pp 290;£6.99;ISBN 978-0571193783

    একটা নতুন বই। এমন মারাত্মক, আশ্চর্য, আর গোপন - যে কেউ সেই বই পড়ছে তার জীবনটাই বদলে যাচ্ছে চিরকালের মত। প্রথম পাতাটা খুলতেই আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে, সেই বই তার পাঠককে এক নতুন জগতে নিয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যারা এই বইটা পড়ে নি, তারা কী হতভাগ্য, তারা কী বোকা! ওসমান নিজে এই বইটা পড়েছে, সে এখনও ইস্তাম্বুলে কলেজের ছাত্র, মনে মনে জানানকে পছন্দ করে, জানান এই বইটা পড়েছে, জানানের প্রেমিক এই বইটা পড়েছে। জীবন আর ভালোবাসার বিষয়ে যা যা জানা সম্ভব, আর ভবিষ্যতে যা যা জানা যাবে, সব ওতে লেখা আছে।

    "ফেরিত' ওরহান পামুকের লেখা য়েনি হায়াত (The New Life) - এ সেই আশ্চর্য বইটি সম্বন্ধে আর কিছুই জানা যায় না। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে - বইয়ের প্রথম চ্যাপ্টার শুরু হবার আগেই ওসমানের শান্ত তরল জীবন ছিটকে বেরিয়ে যায়, পাঠকও বুঝতে পারে তার পা থেকে চট করে কিছু বোঝার আগেই মাটি সরে গেল। জানান আর তার প্রেমিক নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে - ঐ বই পড়েই - ওসমান লক্ষ্যভ্রষ্ট সিসার মতো অনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে একের পর এক বাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা তুরস্ক দেশ। এক শহর থেকে অন্য শহর, এক টাউন থেকে অন্য টাউন। কোনও কারণ নেই, ওসমান সামান্য পয়সা, আর জিন্স আর একটা ব্যাগ নিয়ে ঘুরে যাচ্ছে। সে কিছু খুঁজছে, কিন্তু কী খুঁজছে জানে না। ওসমানের এই জীবন বদলে দেওয়া বই ও তার এই উদ্দেশ্যহীন সফরে গল্প বলতে এইটুকুই। কারণ, এ অবধি যা ঘটলো ও এরপরে যা ঘটবে সেগুলোর সত্যতার বিষয়েই বিশেষ সন্দেহ হতে শুরু করে। ওসমানের এই বাস সফরে শুরু হয় একের পর এক অ্যাক্সিডেন্ট। এমন পূর্বনির্ধারিতভাবে, যে আমরা অবধি চ্যাপ্টার শেষ হবার আগে বুঝতে পারি যে এইবারে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হতে চলেছে।

    ঠিক আমাদের মতই, ওসমানের বাস অ্যাক্সিডেন্টের নেশা হয়ে যায়, সেখানে সে অ্যাক্সিডেন্টের ধ্বংসস্তূপ দেখে বেড়ায়, মরা মানুষ দেখে বেড়ায়, এরই মধ্যে জানানকে খুঁজে পেয়ে বুঝতে পারে যে সে আসলে জানানকেই এতদিন খুঁজছিল - তারপরে আবার জানানকে হারিয়ে ফেলে - আবার খুঁজে পায়, এবারে ওসমান আর জানান একসাথে এই সফর করতে থাকে - উদ্দেশ্য, জানানের বয়ফ্রেন্ড মেহমেতকে খুঁজে বার করা যে কিনা ঐ বই পড়ে নিখোঁজ হয়ে গেছে। কিন্তু, আসলে তারা তো নানান টাউনে নেমে পুরনো কমিক্স খোঁজে, "দা নিউ লাইফ' চকলেট খোঁজে, যা কিনা তাদের ছেলেবেলায় পাওয়া যেত, ইস্তাম্বুলে - চটচটে, খেতে কেমন যেন, খুব একটা ভালো নয় -এইগুলি এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না ইস্তাম্বুলে।

    বাসে নানান সিনেমার চুমুর দৃশ্যে এরা আটকে যায়, আর তার সাথে আমরাও আটকে যাই, অ্যাক্সিডেন্টের নেশা থেকে চুমুর নেশা, আর সারারাত লম্বা বাসজার্নি, ওসমান আর জানান এত কাছাকাঅছি, তবু জানান মেহমেতকে খুঁজে পেতে চায়, ওসমান তো কেবল খুব ভালো বন্ধু, এমন নয় যে তার প্রতি কখনও কোনও আকর্ষণ হয় না, কিন্তু ওসমান জানানকে চায় আর জানান মেহমেতকে, ওসমান জানানের সাথে ঘুরতে থাকে। কোনও শহরে পাগলাটে আবিষ্কারক, তার ওপরে তুর্কী জাতীয়তাবাদী, কোথাও যেন মেহমেতের বাবার সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে ওসমানের কাকাই বুঝি ঐ গোপন বইটির লেখক। আবার মেহমেতের বাবার থেকে জানা যাচ্ছে যে সি আই এ র মতো একটা সংস্থা আছে যারা কিনা কে ঐ গোপন বই পড়ছে বা সঙ্গে রাখছে, তাদের নজরবন্দী করছে, তাদের প্রয়োজনে মার্ডার করে দিচ্ছে। শহর থেকে শহরে এরা ঘোরে, হদিস পায় না কিছুর। না পাই আমরা।

    অথচ, দা নিউ লাইফ, পামুকের চতুর্থ নভেল হয়ে যখন বেরোল, হই হই করে তার বিক্রি হল। তুরস্কের ইতিহাসে কখনও কোনও নভেল বইয়ের তাক থেকে এত তাড়াতাড়ি উবে যেতে দেখা যায় নি। পাঠকের অসাধারণ প্রতিক্রিয়া হল - ""দারুণ লাগছে, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না''। গল্পটা ঠিক কি হল সেটাই ঠাহর করতে পারছি না। অথচ সব সময় ঐ বইটার কথা মনে পড়ছে। ওরা কি খুঁজছিলো? ওরা কেন ওভাবে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূণ্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল? ঐ অদৃশ্য লজেন্সে কি আছে যার জন্য মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে তার হদিস করে?

    এত অবধি পড়ে, দেখে ও শুনে পশ্চিমি দুনিয়া সাধুবাদ দিল - ""লক্ষ্য করুন পাঠক, কিভাবে ওরহান প্রাচ্য ও প্রতীচ্যকে মিলিয়ে দিয়েছেন, কিভাবে পাশ্চাত্যের আর্বান ফোকলোর গলে ঢুকে পড়েছে সুফি মিস্টিসিজম''। আর এই ধোঁয়ার বলয়ের ভেতর ওরহান পামুক হুতোমের ন্যায় পাঠকবর্গকে ক্রমাগত বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে করতে মঞ্চ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন।

    কিছু কিছু রহস্য, আমরা পড়ামাত্র সামান্য হলেও ধরে ফেলতে পারি। মনে করুন না, ক্যাম্পাকোলা আর কলকাতায় পাওয়া যায় না, কিন্তু আপনার ছোটোবেলায় যেত, বা ঝাল লজেন্স বন্ধ হয়ে গেছে, বিনাকার সাথে প্লাস্টিকের জন্তু জানোয়ার ফ্রি তে দেয় না, বাঁটুল আর নেই - কিন্তু আপনি বাসের পর বাস নিয়ে সারা দেশ ঘুরছেন - কোনও অজগ্রামে মেলায় পুরনো বইয়ের মধ্যে সমস্ত পুরনো কমিক্স বিক্রি হচ্ছে প্রায় বিনা দামে, বয়ামে বয়ামে ঝাল লজেন্স, ঠন ঠন করে ক্যাম্পাকোলা বিকছে - আপনি সময়ের সাথে পেছন দিকে হেঁটে চলে যাচ্ছেন, আগেপিছে করছেন - যার সাথে এই সব কিছু আপনি ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন সে আপনার সাথী, কিন্তু থেকেও সে সঙ্গে নেই, কারণ আপনারা খুঁজছেন তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমিককে। একের পর এক বাস রাতের পর রাত শতশত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পেরোচ্ছে একটা বাস গুমটি থেকে আরেকটা গুমটি। আর প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে আপনার একেকটা বয়েস ফিরে ফিরে আসছে চোখের সামনে। এইরকম নানান কারণে দা নিউ লাইফ যে কেউ পড়ছে, তারই ভালো লাগছে, কিন্তু হাত মুঠো করা মাত্র শীতকালের সকালের আলোর মতো সব পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে।

    কিন্তু সেই সি আই এ-র চর? বই পড়ুয়াদের নজরে রাখা? খুন? সেগুলির কি কিনারা হবে? বুদ্বুদের মত উঠে আসা এই সমস্ত প্রশ্ন, সমস্ত কৌতূহল নিরসনের জন্য প্রথম থেকে শেষ অবধি পড়ুন - দা নিউ লাইফ। শেষ পর্যন্ত পড়ে হঠাৎ বুঝতে পারি, বইটার আদতে শেষ পর্যন্ত এই টানটান উত্তেজনা ধরে রাখার কোনও দরকার ছিল না, এইসব প্রশ্ন, গল্পের প্লট, কৌতূহল, কোনও কিছুরই প্রয়োজন ছিল না - দা নিউ লাইফ কোনও কিছু খুঁজছে না, বিষণ্নতার ডায়েরি লিখে চলেছে মাত্র। পামুক আমাদের কি ঠকান ঠকিয়েছেন, আমরা একেবারে গোড়া থেকে সবটাই জানতাম, সবটাই একেবারে শুরুতেই ধরে ফেলেছিলাম যেই মুহূর্তে ওসমান ঐ অদ্ভুত বইয়ের আকর্ষণে আটকা পড়ে গেল, কিন্তু কী ধরতে পেরেছিলাম সেটা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা হয়নি, সাহস হয়নি।

    প্রথমে এই না ধরতে পারার আফশোস হয়, পামুকের ক্রাফট আমাদের বিস্মিত করে, তারপর একটা অদ্ভুত বিষাদ, বহুদিন আগে হেরে যাওয়ার যেমন বিষাদ মানুষের মনের মধ্যে সবসময় লুকিয়ে থাকে, সেই বিষাদ এসে পাঠককে গ্রাস করে, তাকে বহুদিন আচ্ছন্ন করে রাখে। মনে হয় - যারা এই বইটা পড়ে নি, তারা কেউ আসল ব্যাপারটা কিছুতেই ধরতে পারছে না,চারিদিকে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না, তারা এই দা নিউ লাইফ এর চশমার কাঁচ দিয়ে কিছু দেখেনি,যেন চারিদিকে সকলে অন্ধ হয়ে গেছে। এইভাবে সময়ের সঙ্গে এই বইটা পাঠকের সারা গায়ে ডালপালা খুলে বসে। মনে হয় সকলকে ডেকে ডেকে বলি - আপনারা কি সত্যিই বুঝতে পারছেন না কেন ওসমান, জানান, মেহমেত এরা একটা বই পড়ে এভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল? সত্যিই জানেন না তারা কেন এভাবে ঘুরে বেড়ালো, জানেন না তারা কী খুঁজছে? তাদের সাথে যে সব অদ্ভুত ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো কেন ঘটছে? বা, সত্যিই সেগুলো ঘটছে কি না?

    ২৭শে জুন, ২০১০
  • বিভাগ : বইপত্তর | ২৭ জুন ২০১০ | ১২৫ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন