• হরিদাস পাল  ব্লগ

    Share
  • এক অজানা অচেনা কলকাতা

    Arijit Guha লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১১১ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ১৬৮৫ সালের মাদ্রাজ বন্দর,অধুনা চেন্নাই,সেখান থেকে এক ব্রিটিশ রণতরী ৪০০ জন মাদ্রাজ ডিভিশনের ব্রিটিশ সৈন্য নিয়ে রওনা দিলো চট্টগ্রাম অভিমুখে।ভারতবর্ষের মসনদে তখন আসীন দোর্দন্ডপ্রতাপ সম্রাট ঔরঙ্গজেব।কিন্তু চট্টগ্রাম তখন আরাকানদের অধীনে যাদের সাথে আবার মোগলদের আদায় কাচকলায় সম্পর্ক।দুর্ধর্ষ আরাকানদের মোগলরা কিছুতেই পরাজিত করতে পারে নি।রণতরীটি চট্টগ্রামে গিয়ে অন্য ডিভিশনের সেনাদের সাথে যোগ দেবে।তার কারন ব্রিটিশদের সাথে মোগলদের বাঙলাপ্রদেশ নিয়ে এক স্বার্থের সংঘাত ঘটেছে,সেই সংঘাত মেটাতেই ব্রিটিশরা আরাকানদের সাহায্য নিয়ে মোগলদের বিরূদ্ধে জোট বেধেছে।কি সেই স্বার্থ?এটা জানার জন্য আমাদের আরো কিছুকাল পিছিয়ে যেতে হবে।ঔরঙ্গজেবের পিতামহ জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে।ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ভারতবর্ষে সবে তাদের প্রথম কারখানা খুলেছে সুরাটে ১৬২০ সালে।এরপর তাদের লক্ষ্য পশ্চিম থেকে পূর্বে ব্যবসার সম্প্রসারণ।কম্পানির প্রতিনিধিরা বাংলা,বিহার ও উড়িষ্যায় ব্যবসার সম্ভাবনার দিক খতিয়ে দেখার জন্য পূর্বদেশে এসেছে।বাংলার সুবেদার তখন ইব্রাহিম খাঁ।কিন্তু পরিবহন খরচ ও অন্যান্য পরিকাঠামোগত অসুবিধের কথা ভেবে প্রতিনিধিরা তাদের পরিকল্পনা তখনকার মত মুলতুবি রাখে।যত দিন যেতে থাকে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির প্রতিযোগী পর্তুগিজরা যারা ইতিমধ্যে এদেশে জাঁকিয়ে ব্যবসা করছিলো তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দিতা শুরু হয়ে যায়।স্বভাবতই কম্পানিকে তখন ব্যবসার নতুন ক্ষেত্রের সন্ধান করতে হয়।তারা তখন ঠিক করে যে এবার পূর্বপ্রদেশে ব্যবসার প্রসারণ ঘটাতেই হবে।তারা সম্রাটের সাথে দেখা করে পাকাপাকি ভাবে পূর্বপ্রদেশে ব্যবসা করার ফর্মান আদায় করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।এমতাবস্থায় ভাগ্যলক্ষী তাদের কাছে অর্থাৎ কম্পানির কাছে এক অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দেয়।ইতিমধ্যে দিল্লীর মসনদে আসীন হয়েছেন সম্রাট শাহ জাহান,তার প্রিয় সন্তান হচ্ছে বড় ছেলে দারা শিকো এবং বড় মেয়ে জাহান আরা।দুজনেই বিদ্যা বুদ্ধিতে তুখোড় এবং শিল্প সংস্কৃতি চর্চায় পারদর্শী।সখীদের নিয়ে এক নাচের আসরে হঠাৎ করেই জাহান আরা একটি লন্ঠনের আলো থেকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে যায় ও তার প্রাণসংশয় দেখা দেয়।সম্রাট কণ্যার চিকিৎসার জন্য হণ্যে হয়ে যান,কিন্তু কোন ডাক্তার বৈদ্যই তাকে আশার আলো দেখাতে পারে না।এরকম সময়ে এক ইংরেজ চিকিৎসক ডক্টর ব্রাইটন জাহান আরাকে সুস্থ করে তোলেন।সম্রাট তো যারপরনাই খুশ হয়ে ডাক্তার কে পুরষ্কৃত করতে চান,এদিকে এই ডাক্তার আবার আদতে ছিলেন কম্পানির ডাক্তার।তিনি এই সুযোগে সম্রাটের কাছে কম্পানিকে পূর্বপ্রদেশে ব্যবসা করতে দেওয়ার ফর্মান চান।সম্রাট খুশি মনে তা দিয়েও দেন।এই ফর্মানের ফলে কম্পানি বাংলামুলুকে ব্যবসা শুরু করলো এবং বিহারের পিপলীতে একটি কুঠি নির্মাণ করলো।ডাক্তারের কৃতিত্ব তখনো শেষ হয় নি।পিপলীতে কুঠি নির্মান হল আর সম্রাট তার আরেক পুত্র সুজাকে বাংলার সুবেদার করে পাঠালেন।রাজমহলে ছিলো সুবেদারের দরবার।সেখানকার কোন এক মহিলা কর্মচারী অসুস্থ হওয়াতে আবার ডাক পড়লো ডাক্তার ব্রাইটনের।তিনি তাকেও সুস্থ করে তুললেন।এবার সম্রাট আবার খুশী হয়ে পিপলীর পাশাপাশি হূগলীতেও কুঠি নির্মাণের অনুমতি দিলেন।এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে যায় এবং ১৬৬৪ সালে শায়েস্তা খাঁ ঔরঙ্গজেবের হয়ে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন।তখন মোগলদের সাথে ব্রিটিশদের একটা বেশ মাখো মাখো সম্পর্ক চলছে।কম্পানি সম্রাটের কাছে আবেদন জানালো চিরকালের মত বাংলাতে ব্যবসা করার ফর্মান দিতে।ঔরঙ্গজেবও কালবিলম্ব না করে ফর্মান জারি করে দিলেন।কম্পানি খুশিতে গদগদ হয়ে ফিরে যায় এবং হূগলীতে এই ঘটনাকে উদ্‌যাপন করার জন্য ইংরেজ সৈন্যবাহিনী ৩০০ টি গান স্যালুট প্রদর্শন করে কম্পানিকে।এই প্রথম হূগলীতে ইংরেজ সৈন্যের পদার্পণ ঘটল।এর আগে অবধি কম্পানি প্রতিনিধিরাই যা দাপাদাপি করার করেছে,কিন্তু সেনাবাহিনীর এই আগমন শায়েস্তা খাঁকে একটু ভাবতে বাধ্য করল।তার মনে খটকা জাগে ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে।এখান থেকে শায়েস্তা খাঁর সাথে ব্রিটিশদের সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে।ইতিমধ্যে ১৬৮৪ সালে আরেকটি ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটিশ কম্পানি রঙ্গমঞ্চে আবির্ভুত হয়েছে।তাদের থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি এবার শায়েস্তা খাঁকে দাবী জানায় হূগলীতে দূর্গ নির্মাণ করতে দিতে হবে।কিন্তু শায়েস্তা খাঁ এর অনুমতি স্বাভাবিক ভাবেই দিতে পারে না,উল্টে কম্পানির ওপর আরো ৩.৫% খাজনা আরোপ করে দেয়।কম্পানির মর্যাদায় আঘাত লাগে।ইংল্যান্ডের রাজাকে তারা নালিশ জানায়,আর তার সাথে আরো বলে রাজা যেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে মুঘলদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে বিষয়টির মীমাংসা করে।রাজা দ্বিতীয় জেম্‌স অ্যাডমিরাল নিকলসনের নেতৃত্বে বিশাল পরিমান ব্রিটিশ ফৌজ পাঠিয়ে দেয় চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে,আর মাদ্রাজ রেসিডেন্সির ক্যাপ্টেনকে বলা হয় তার ডিভিশনের সেনা নিয়ে সে যেন অ্যাডমিরাল নিকলসনকে চট্টগ্রামে গিয়ে রিপোর্ট করে।
    এই আদেশ পেয়ে ক্যাপ্টেন তার ডিভিশনের ৪০০ জন সৈন্য নিয়ে মাদ্রাজ বন্দর থেকে রণতরীতে চেপে বসলেন।প্রথম কদিন জাহাজ অনুকূল বাতাস পেয়ে তরতর করে এগিয়ে চলল।এরপর সমুদ্রে উঠল এক সাংঘাতিক ঝড়।সেই ঝড়ের অভিঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেল জাহাজের সমস্ত দিগনির্দেশকারী যন্ত্রপাতি।কিন্তু স্বস্তির বিষয় কোন প্রাণহানি ঘটল না।ঝড় থেমে যাওয়ার পর জাহাজ আবার যথারীতি এগিয়ে চলল চট্টগ্রাম অভিমুখে।অবশেষে বন্দরের দেখা পেয়ে ক্যাপ্টেন নোঙর ফেলতে আদেশ করলেন।বন্দরে সবাই নেমে যাওয়ার পর কোথাও কোন ব্রিটিশ সেনা দেখতে না পেয়ে ক্যাপ্টেন একটু চিন্তিত হয়ে পরলেন।স্থানীয়দের কাছে খবর নিয়ে জানলেন যে তারা চট্টগ্রামের বদলে দিক ভুল করে এসে পরেছেন হূগলী বন্দরে।ইতিমধ্যে ওদিকে তখন শায়েস্তা খাঁর কাছে খবর চলে এসেছে যে প্রচুর পরিমানে ব্রিটিশ সৈন্য আরাকানের রাজার সাথে হাত মিলিয়ে মোগলদের সাথে যুদ্ধ করতে আসছে।শায়েস্তা খাঁ খাজনা বাড়ানোর অভিঘাত এতটা হবে এটা আশা করেন নি।দিল্লীর বাদশার কাছেও সেনা সমাবেশের খবর গেছে।উনি এবার শায়েস্তা খাঁকে আদেশ করেন বিষয়টি মিটমাট করে নিতে।বাদশার আদেশ,মাথা পেতে মেনে নিতেই হবে।তাই একটা সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘটে।কিন্তু এর কিছুকাল পরেই কোন একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশদের সাথে শায়েস্তা খাঁর সৈন্যদের ঝগড়া লেগে যায় এবং ব্রিটিশরা প্রভূত পরিমাণে প্রহৃত হয়।এর বদলা ব্রিটিশরা নেয় হূগলী অঞ্চলে সাধারণ মানুষের ৫০০ টি ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে।ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে শায়েস্তা খাঁ ঠিক করেন হূগলী অঞ্চলে আর ব্রিটিশদের অস্তিত্বই রাখবেন না।মাদ্রাজ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন যিনি যুদ্ধ না হওয়ার কারণে এই কদিন বেশ আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি এবার প্রমাদ গুনলেন।দেখলেন যে আর হূগলীতে থাকা নিরাপদ নয়।তার রেজিমেন্ট নিয়ে গঙ্গা ধরে আরো দক্ষিণে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত একটি জায়গায় নোঙর ফেললেন।সালটা ২০ শে ডিসেম্বর ১৬৮৬ এবং জায়গাটির নাম সুতানুটি।জাহাজ থেকে নেমে এলেন মাদ্রাজ ডিভিশনের ক্যাপ্টেন জোব চার্ণক।হ্যা,এই সেই জোব চার্ণক যাকে এতকাল আমরা কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জেনে এসেছি।সুতানুটি জায়গাটির শান্ত ও মনোরম পরিবেশ জোব চার্ণক কে খুব আকৃষ্ট করে।অল্পদিনের মধ্যেই তিনি জায়গাটিকে খুব ভালোবেসে ফেলেন।কিন্তু শান্তি তার জীবনে আসছে না।ওদিকে শায়েস্তা খাঁর কানেও জোব চার্ণকের সুতানুটিতে অবস্থানের খবর চলে গেছে।বেগতিক দেখে আবার ওনাকে পালাতে হল।এবার আশ্রয় নিলেন আরো দক্ষিণে হিজলী বলে একটি দ্বীপে।হিজলী দ্বীপের পরিবেশ কিন্তু সুতানুটির মত মনোরম ছিলো না।স্যাতঁস্যাতেঁ আবহাওয়া তার সাথে ম্যালেরিয়ার উৎপাত।জোব চার্ণকের অর্ধেক সেনা সেখানে মারা গেলো মশার কামড়ে আর বাকি অর্ধেক হাস্পাতালে ভর্তির অবস্থায় পরে রইল।
    ওদিকে দিল্লীতে তখন চলছিলো অন্য এক নাটক।মোগলদের সাথে সম্পর্কের অবনতি হওয়াতে ব্রিটিশরা এক ভিন্ন পন্থার আশ্রয় নেয়।ব্রিটিশ নৌবাহিনী সে সময় পৃথিবীতে অন্যতম শক্তিশালী এক নৌবাহিনী ছিলো।আরব সাগরের প্রায় পুরোটা তাদের দখলে ছিলো।এরকম অবস্থায় আরব সাগরের যেখানেই তারা ভারতীয় জাহাজ দেখত,আক্রমন করে বসত।এতে ভারতের নিজস্ব বাণিজ্য তো মার খাচ্ছিলোই,উপরন্তু অন্য এক সমস্যাও দেখা দিচ্ছিলো।সে সময় মক্কায় হজ করতে গেলে একমাত্র পথ ছিলো জলপথ এবং সেটি ছিলো আবার আরব সাগরের ওপর দিয়েই।এতে করে যারা হজ করতে যেতো তারা প্রচুর পরিমাণ বাধার সম্মুখীন হচ্ছিল।ঔরঙ্গজেবের আমলে তার প্রজারা মক্কায় তীর্থ যাত্রা করতে যেতে পারবে না?চিন্তায় পড়লেন ঔরঙ্গজেব।এছাড়াও ব্রিটিশরা পূর্বপ্রদেশে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ফলে তার খাজনা আদায়ও অনেক কমে গেছে।কারন ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি আর যাই করুক ব্যবসা সংক্রান্ত খাজনাটা ঠিক মত দিয়ে যেতো।সব দিক ভাবনা চিন্তা করে ঔরঙ্গজেব ব্রিটিশদের সাথে একটা রফায় আসতে চাইলেন।ইতিমধ্যে শায়েস্তা খাঁ অবসর গ্রহন করেছেন।তার জায়গায় বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হয়েছেন ইব্রাহীম খাঁ।বাদশার আদেশে তিনি জোব চার্ণক কে অনুরোধ করলেন সুতানুটিতে ফিরে আসতে আর ওদিকে বাদশার সাথে ব্রিটিশদের সন্ধি স্থাপনের ফলে তারা আবার বাংলায় ব্যবসা শুরু করল।অবশেষে ৩০ জন সৈন্য নিয়ে জোব চার্ণক আবার ফিরে এলেন তার প্রিয় জায়গা সুতানুটিতে ১৬৯০ সালের ২৪শে অগাস্ট।এখানেই কলকাতা আর গোবিন্দপুর নামে আরো দুটি গ্রাম জমিদার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের থেকে কিনে নিয়ে বসবাস শুরু করলেন,এবং এখান থেকেই কলকাতার কলকাতা মহানগরী হয়ে ওঠার ইতিহাসের শুরু।যদিও জোব চার্ণক খুব একটা বেশিদিন তার প্রিয় জায়গাটা উপভোগ করে যেতে পারেন নি।১৬৯২ খৃষ্টাব্দে এখানেই তিনি দেহত্যাগ করেন।
    এবার দেখা যাক এই গল্প শুরুর আগে আরো কোন শুরু আছে কিনা।এতক্ষন ধরে তো আমরা কলকাতা মহানগরীর প্রতীষ্ঠার ইতিহাস শুনলাম।এখন দেখি ১৬৯০ এরও আগে কলকাতার কোন রূপরেখা পাওয়া যায় কিনা।এতদিন অবধি মনে করা হত সেন্ট জন চার্চে রাখা জোব চার্ণকের সমাধিটাই কলকাতার সবথেকে প্রাচীন সমাধি।কিন্তু আরেকটি সমাধিফলক আমাদের সব প্রাচীনতার হিসেব গুলিয়ে দিয়েছে।সেটি হচ্ছে রেজাবীবা নামে এক আর্মেনীয় মহিলার সমাধি,যেটি কলকাতার আর্মেনীয়ান চার্চে রাখা রয়েছে।সমাধিটির গায়ে যে তারিখ খোদাই করা রয়েছে সেটি হচ্ছে ১৬৩০ খৃষ্টাব্দ।এই রেজাবীবা হচ্ছে এক নামকরা আর্মেনীয়ান ব্যবসায়ী সুকিয়াসের স্ত্রী।এই সুকিয়াসের নামেই কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিট রাস্তাটি হয়েছে।অর্থাৎ জোব চার্ণকের আসার অনেক আগে থেকেই কলকাতার বুকে আর্মেনীয়ান বণিকরা ব্যবসা করা শুরু করেছিল।শুধু আর্মেনীয়রা নয়,বাঙালীরাও যে ব্রিটিশদের আগে থেকেই ব্যবসা করত তার প্রমাণ হচ্ছে সুতানুটি নামটি।এই নামটি এসেছে সুতার নুটি,অর্থাৎ সুতার মন্ড থেকে।পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে সরস্বতি নদী মজে যেতে শুরু করে আর তার সাথে ঐতিহ্যশালী সপ্তগ্রাম বন্দর ও দুর্বল হতে শুরু করে।এই সময়ে বাঙালী তন্তু ব্যবসায়ীরা গঙ্গার পশ্চিম তীর,অর্থাৎ হূগলী,সপ্তগ্রাম ইত্যাদি থেকে সরে এসে পূর্ব তীর অর্থাৎ সুতানুটিতে এসে বসবাস এবং বাণিজ্য করতে শুরু করে।তারা সুতোর মন্ড তৈরি করে ব্যবসা করত বলে জায়গাটির নাম সুতানুটি হয়েছে।সম্ভবত উত্তর কলকাতার হাটখোলা অঞ্চলে এই বাণিজ্যটা চলত। সেখানে হাট বসত বলে জায়গাটির নাম হাটখোলা হয়েছে।এই সুতানুটির পাশাপাশি আরো দ্যুটি গ্রাম কলকাতা ও গোবিন্দপুরও সে সময়ে বেশ উল্লেখযোগ্য ছিলো।কলকাতা বা কলিকাতা নামের উল্লেখ আমরা বহু প্রাচীন কালে পাই।চন্ডীমঙ্গল কাব্যে আমরা কলকাতার উল্লেখ পাই এভাবে “কালিঘাটা মহাস্থান কলিকাতা কুচিনান/দুইকুলে বসাইআ হাটে/ডানিবামে জত গ্রাম তার লব কত নাম/রন্ধন ভোজন হানুঘাটে।“এখানে উল্লিখিত কুচিনান হচ্ছে কলকাতারই একটা অংশ।১৮৩২ সালে ক্যাপ্টেন প্রিন্সেপের সার্ভে এবং মেজর শুলস্‌ এর ম্যাপ থেকে জে বি টাসিন নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক map of the city and environs of Calcutta বলে একটি বই লেখেন,সেখানে কলকাতার যে মানচিত্র রয়েছে,সেখানে মানিকতলা মেন রোড যেখান দিয়ে সোজা লবনহ্রদ অর্থাৎ আজকের সল্টলেকে গিয়ে পরেছে তার উত্তর দিকে লেখা রয়েছে GHOORERABAD আর দক্ষিণ দিকে লেখা রয়েছে KANKOORGATCHA(কাকুঁড়গাছি)আর এর ঠিক পূর্ব দিকে লেখা রয়েছে KOOCHNAN(কূচিনান)।কাকুঁড়গাছি রোডের পাশে দেখা যাচ্ছে কাকুঁড়গাছি লেন আর তার গায়েই রয়েছে কুচিনান রোড।এছাড়াও বিপ্রদাস পিপলাই রচিত মনসামঙ্গল কাব্যেও আমরা কলকাতার উল্লেখ পাচ্ছি যেখানে চাঁদ সওদাগর সিংহল যাত্রা করছে তার বজরা নিয়ে আদি গঙ্গা ধরে,এবং তার যাত্রাকালীন যেসব গ্রামের নাম আমরা পাই সেগুলো হছে চিত্রপুর(অধুনা চিৎপুর),কালিক্ষেত্র কালীঘাট ও কলকাতা।কালীঘাটের মন্দির আমরা জানি বহু প্রাচীন।যে সময়ের কথা হচ্ছে,অর্থাৎ চাঁদ সদাগরের সময়,কালীঘাট ছিল গঙ্গা যা এখনকার আদি গঙ্গার পাড়ে দুর্ভেদ্য জঙ্গলের মধ্যে।এখানে তান্ত্রিকরা তন্ত্র সাধনা করতেন।এখানে প্রথম নকুলীশ শিবাবতার রূপে পূজিত হন।এই নকুলীশ হচ্ছে শৈব সম্প্রদায়ের একটি ধারা।মহাভারতে পাশুপত মতের উল্লেখ রয়েছে।অর্জুন শিবের থেকে পাশুপতাস্ত্র নামে এক মারণাস্ত্র লাভ করেন।এই পাশুপত সম্প্রদায়ই খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে রাজস্থানের কোন এক অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী নকুলীশ বলে এক ব্যক্তির হাত ধরে জনপ্রিয় হয়। তিনি এই মতের প্রসার ঘটান প্রধানত দক্ষিণ ভারতে এবং উত্তরে কাশ্মীরে।পরবর্তীকালে শৈব সাধকগণের হাত ধরে তিনি শিবের আরেকটি রূপে পর্যবসিত হন এবং নকুলেশ্বর ভৈরব নামে পরিচিত হন।কালীঘাটের শৈব সাধকরাই প্রথম এই নকুলীশকে শিবাবতার রূপে প্রতিষ্ঠা করে নকুলেশ্বর ভৈরব নাম দেন।বিভিন্ন শৈব পূরাণে ত্রয়োদশ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত নকুলি শিবের উল্লেখ পাওয়া যায়।অতএব আমরা ধরে নিতেই পারি যে ত্রয়োদশ খৃষ্টাব্দের আগেই কালীঘাটে নকুলেশ্বর ভৈরবের প্রতিষ্ঠা হয় এবং শৈব সাধকরা সেখানে সাধনা শুরু করেন।এখানে প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি বলে রাখি,এই পাশুপত মত সপ্তম খৃষ্টাব্দ নাগাদ প্রচুর ব্যাপ্তি লাভ করে এবং সেসময়ই এই মতাবলম্বীরা বারাণসিতে দখলদারী কায়েম করে এবং নেপালের পশুপতিনাথ মন্দির যা খৃষ্টীয় চতুর্থ শতকে তৈরি হয়েছিল তা এই সময়কালেই ভক্তদের দ্বারা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।এই কালীঘাট মন্দিরেই মনসামঙ্গল কাহিনীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী চাঁদ সদাগর কালিকার পুজো দিয়ে তার বজরা নিয়ে সিংহলের পথে যাত্রা শুরু করেন আদি গঙ্গা ধরে।এর থেকে বোঝা যায় যে কলকাতা সংলগ্ন সেই অঞ্চল পঞ্চদশ শতকেই বেশ নামকরা ছিল।এরপরে কলকাতার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে আবুল ফজ্‌লের আইন ই আকবরীতে,যেখানে বলা বলা হয়েছে কলকাতা,বাকোয়া ও বারবাকপুর এই তিনটি গ্রাম সাতগাঁ সরকারের অধীনে অবস্থিত।আইন ই আকবরীর লিখিত কাল আনুমানিক ১৫৯০ খৃষ্টাব্দে।অর্থাৎ ষষ্ঠদশ শতকেই কলকাতা এবং সংলগ্ন অঞ্চল বেশ সমৃদ্ধশালী অঞ্চল ছিল বলে অনুমান করা যায়।সেসময়ে যদিও কলকাতা নামক গ্রামটির বিস্তার ছিল খুবই কম।উত্তরে এখনকার মহাত্মা গান্ধী রোড থেকে দক্ষিণে ধর্মতলা পর্যন্ত।এমনকি কালীঘাট মন্দিরও সেসময়ে কলকাতার অন্তর্গত ছিল না।এই কারনেই চাঁদ সদাগরের বর্ণনায় কলকাতা ও কালীঘাট দ্যুটি পৃথক স্থান হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।তখনকার এই কলকাতা গ্রামের উত্তরাংশের কিছু গ্রাম ছিল নদীয়ার কৃষ্ণনগরের রাজাদের অধীনস্থ এবং দক্ষিণে বেহালা বড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত গ্রামগুলো ছিল সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের অধীনস্থ।তবে উত্তরের সুতাবুটি গ্রাম,মধ্যে কলকাতা গ্রাম ও দক্ষিণে গোবিন্দপুর গ্রাম,এই তিনটি গ্রামই অবশ্য সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের ছিল।কলকাতা গ্রাম পরিচিত ছিল ডিহি কলকাতা বলে আর এর আশেপাশে কিছু গ্রাম যেমন কালীঘাট,চিত্রপুর,গোবিন্দপুর,সুতানুটি ইত্যাদি নিয়ে ছিল পরগণা কল্কাতা।ক্রমে ক্রমে এই পরগণা কলকাতাই আজকের বিশাল কলকাতা মহানগরীতে পরিনত হয়েছে।
    তাহলে এতক্ষণ ধরে যা দেখা গেলো তাতে দেখলাম ১৬৯০ খৃষ্টাব্দে জোব চার্ণকের হাত ধরে কলকাতার ধীরে ধীরে মহানগরী হয়ে ওঠার পথচলা শুরু হলেও তার আগেও কলকাতার বেশ ভালোরকম অস্তিত্ব ছিল।এই কারনেই জনৈক আবেদনকারীর মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট ২০০৩ সালে এক ঐতিহাসিক রায়ে জানায় যে জোব চার্ণক কে কোনভাবেই কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আর মর্যাদা দেওয়া যাবে না।

    (সিইএসসি শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত)
  • বিভাগ : ব্লগ | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১১১ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • pi | 24.139.221.129 (*) | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৫:৩১64257
  • ইন্টারেস্টিং। জানতাম না।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত