আমার একজন দিদিকে মনে আছে। আদ্যোপান্ত কমিউনিস্ট দিদি, বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় বলিয়ে কইয়ে এস এফ আই, এবং ভীষণ প্রিয় দিদি সব ছোটদের। একদিন হাসতে হাসতে মজা করে তার সতীর্থদের বলছে শুনলাম "ভাই, রাজীব গান্ধী যদি কোনোদিন আমার ভোট চায়, তাহলে আমি না দিয়ে পারব না। কী দুধর্ষ সুন্দর মানুষ, আর এমন অপূর্ব হাসি।"তার কিছুদিন আগেই তারা রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে বিশাল মিছিল মিটিং করে এসেছে।
আমাদের দেশে জননেতা জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের সর্বোচ্চ আসনে থাকা মানুষেরা আসলে তো মানুষই, সাধারণ মানুষের মত দোষত্রুটি তাদেরও থাকে, সৎ অসৎ কমবেশি অবস্থাবিশেষে সবাই হয়ে এসেছে।
তাদের মূল্যায়নও সেভাবেই হয়, এবং সময়বিশেষে সেইসব মূল্যায়ন কারা করছে তার ওপরেও কোনদিকে পাল্লা ঝুঁকবে তা নির্ভর করে।
সেই আমলে রাজীব গান্ধী রাজনীতিতে আসার আগে বা সদ্য যখন এলেন ভাইয়ের মৃত্যুর পর, তাকে নিয়ে কিছু কিছু গল্প চালু ছিল। ভালো রাজপুত্রের গল্প। একটা আমার আবছা মনে পড়ে এক কাকুর কাছে শোনা।
ইন্দিরা একদিন দুই ছেলেকে নিয়ে প্লেনে কোথাও যাচ্ছিলেন, তো তিনি ছেলেদের জিজ্ঞেস করলেন যে কী কী বিশেষ কাজ করলে তাদের মনে হয় দেশের লোক খুব খুশী হবে, দেশের ভালো হবে। সন্জয় অনেক ভালো ভালো কাজের কথা বলল। রাজীবের টার্ন এলে উনি বললেন যে, "আমি যদি এখন তোমাদের দুজনকে প্লেন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিই তাহলে মনে হয় দেশের লোক খুশী হবে আর দেশের ভালো হবে"!
এরকম আরো অনেক গুল্প চালু ছিল। সেসময় দলমত নির্বিশেষে বাঙালিরা চেয়েছিল প্রণব মুখার্জি হন প্রধানমন্ত্রী। তাই রাজীবকে খুব ভালো চোখে দেখা হত না। সেসব অবশ্য অন্য গল্প।
রাজীব মারা না গেলে বিপুল ভোটে জিততেন ওই ইলেকশনে, হয়ত ২০১৪ র মতই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ফিরত কংগ্রেস।
কিছুদিন আগে নাগেশ কুকুনুরের "দ্য হান্ট" দেখছিলাম। এদেশে সব কিছুর মত এই ডেথ ইনভেস্টিগেশনও কীরকম বচড তার একটা আভাস পাওয়া যায়।
বারবার ওনার সেই শেষ মিটিংয়ে স্টেজের দিকে যাওয়ার ছবিটা দেখাচ্ছিল, নতুন করে খারাপ লাগল, রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক, কোনো মানুষের এরকম পরিণতি যে কোনো সুস্থমনস্ক মানুষকে বিচলিত করবেই।
রাজীব গান্ধীর লেগাসি নিয়ে সংঘীরা বিশেষ কথা বলে না, এর থেকেই প্রমাণ হয় যে আসলেই এদের হিসাবে নেহরুকে এরা মহান মানে বা তাকেই উনিজীর একমাত্র চ্যালেঞ্জের যোগ্য মনে করে। ইন্দিরাকে এমার্জেন্সি ও রাজীবকে বোফর্স দিয়ে সাপটে গিলে ফেলা যায়।
যদিও আমার ধারণা ভবিষ্যত সে কুড়ি বছর হোক বা পঞ্চাশ বছরই হোক বলবে যে রাফায়েল স্ক্যামের সামনে বোফর্স শিশু !
আর একটা গল্প যা খুব চালু ছিল তা হল ইন্দিরা গান্ধীর দেহ যখন হসপিটালে, সোনিয়া গান্ধী বাইরে। কথাবার্তা চলছে রাজীবকে শপথ নেওয়ানোর, উনি এসে পৌঁছতে, সোনিয়া নাকি পাগলের মত কেঁদে বলেছিলেন উনি কিছুতেই রাজীবকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া তো দূরের কথা, রাজনীতিতেই আর থাকতে দেবেন না!
এটা হয়ত পুরোটা গল্প না হলেও হতে পারে। সেইসময় রাজীবকে অনেকেই " রিলাকটান্ট প্রাইম মিনিস্টার" বলে অভিহিত করত প্রথম দিকে।
আসলে কাল রাহুল গান্ধীর জন্মদিন গেল, সো মি তে এনিয়ে প্রচুর পোস্ট ভিডিও মিম ঘোরাফেরা করছে, ভালোবাসার ঘৃণার দুইয়েরই চাষ, যেমনটা হয়ে থাকে। অনেক পুরনো ভিডিও উঠে আসছে। রাহুল গান্ধী বলতে গেলে আমাদের কনটেমপোরারি। আমাদের আশেপাশের বয়সের। তবে তাকে নিয়ে আমার কোনো স্নেহ বা ক্রাশ কিছুই নেই। অল্পবয়সীরা কী ভাবে জানিনা, কিন্তু রাহুলকে আমার ওই দিদির বর্ণনার রাজীব গান্ধীর মতও মনে হয় না।
কাল একজন লিখেছে দেখলাম যে রাহুল হল সত্যিকারের ভালো মানুষ আর তাই এখনকার রাজনীতিতে বেমানান।
আমাদের সমসাময়িক হওয়াতে বলতে পারি যে রাহুল গান্ধীকে নিয়ে বর্তমান শাসক দল দীর্ঘকাল ধরে ভিলিফিকেশন ক্যাম্পেন চালিয়েছে, আমাদের নিজ নিজ কর্ম ক্ষেত্রে তার এক পার্সেন্ট হলেও বেশীরভাগেরাই সব ছেড়েছুড়ে চলে যেতাম।
রাহুলকে আমার আজকের দিনে যে রাজনীতি বা রাজনীতিকদের আশেপাশে দেখি, সব দল মিলিয়ে, সবকিছুর থেকে আলাদা মনে হয়, অনন্য, "অ্যাক্সিডেন্টাল পলিটিশিয়ান"।
আগে বেশী দেখিনি শুনিনি তার কারণ হল তেমন প্রচার হয়নি। তখন সো মি এরকম ছিল না আর এই আজকের শাসনতন্ত্রের যে প্রচারসর্বস্ব এজেন্ডা তাও ছিলনা।
তাই যেমনটা বলা হচ্ছে যে শিখেপড়ে তৈরি হয়েছে আগে পাপ্পু ছিল তা হয়ত সত্যি নয়।
মানুষের চরিত্র এমনিতেও পাল্টায় না, যা পাল্টায় তা হল অন্যদের দেখার নজরিয়া আর পরিস্থিতি। এই দুইকে নানা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ম্যানিপুলেট করা যায়, যা করা হয়েছে রাহুলের ক্ষেত্রে।
রাহুলের কথাবার্তা দৃষ্টিভঙ্গি এমনকি ২০১৯ এর বিখ্যাত রভিশকুমার ইন্টারভিউ বা কনট্রোভারসিয়াল অর্ণব গোস্বামী ইন্টারভিউ তেও শুনে খুব কিছু বদলেছে মনে হয় না। শুধু অভিজ্ঞতা বেশী হলে, উপলব্ধি বাড়লে অনুভব যেরকম গোছানো লাগে, পরিণত লাগে এখন তাই হয়েছে।
কংগ্রেস বা বিজেপি অথবা বাকী দলেরও রাজনীতির একটা সেট প্যাটার্ন আছে। সে কারণেই এদল ওদল করতে এদের কোনো সমস্যাই হয়না, যেমন বাকীরা কম্পানি বদলায় এরাও দল বদলায়।
এখনকার প্রেক্ষিতে এদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনকে যদি আজিয়ান স্টেবলের সাথে তুলনা করা যায়, তাহলে রাহুল হয়ত হারকিউলিস হতে পারবে না। কিন্তু এও সত্যি যে আজকের দিনে একমাত্র রাহুলেরই মধ্যে তার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সুযোগ পরিস্থিতি যদি কোনোদিন অনুকূলে আসে।
রাহুল যেরকম বিরোধী পেয়েছে বা বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে এত দীর্ঘকাল ধরে ঘরে বাইরে সব জায়গায় তার সিকিভাগও তার পূর্বজদের ফেস করতে হয়নি।
কালকে বার বার সাংবাদিকদের ভিড়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ছবিটা চোখে লাগছিল। কেউ বলবে ক্ষমতার জন্যে, আবার কেউ বলবে মানুষকে ভালোবেসে নীতি আদর্শের জন্যে, আমাদের সময়কাল চেনা মানুষদের দিয়ে আজ এত বছরে বলতে পারি দুইই সম্ভব। যাই হোক বেঁচেবর্তে থাক, ভালোমানুষের আজকাল েত অভাব।