

বৃত্তরৈখিকের শেষ পর্ব আজ। লেখকের কথায়ঃ "বৃত্তরৈখিককে উপন্যাস বলেছি, কিন্তু হয়তো ইতিহাসও বলা চলতো। মোটামুটি বিশ শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে সত্তরের দশকের গোড়ায় যাঁদের যৌবনের শুরু এবং পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বেড়ে ওঠা, বাংলাভাষী সেই মধ্যবিত্তদের একদলের ইতিহাস এই রচনার রসদ। পাঠযোগ্যতার খাতিরে একটা গল্পের বুননের চেষ্টা এতে আছে – উপন্যাস নামের আকাঙ্খা সেখানেই – সেটা কতটা মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে পাঠকই তা বলতে পারবেন। কাহিনীর পাত্রপাত্রীদের পুর্ববর্তী প্রজন্মের কথা কোন কোন ক্ষেত্রে গল্পের খাতিরে এসে পড়লেও এই ইতিকথার প্রধান চরিত্ররা মোটামুটি ভারতের স্বাধীনতার সমবয়েসী। এবং এই স্বাধীনতার মতই আশাবাদিতা এবং নৈরাশ্য, আদর্শ এবং আদর্শচ্যুতি, মেধানিষ্ঠা এবং নিম্নগামী মেধা এখানে পাশাপাশি উপস্থিত।" ... ...

বেগুন ভাজার গন্ধে ঘরের পরিবেশ সহজ হয়ে আসছিল। টিউব লাইটের আলো ঘরময়, বারান্দার আলোর নিচে টবের ক্যাকটাস; কুন্তী, গুলগুলে সোফায় গোল্লা পাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল, পুরোনো সব ছবির আড়াল থেকে মুখ বের করছিল গায়ে ছিট ছিট টিকটিকি- এই সব মুহূর্তগুলো অদ্ভূত- মিঠুর খিদে পাচ্ছিল আবার; মনে হচ্ছিল, যেন কিছুই ঘটে নি, যেন এ যাবৎ মৃত লোকজন বেঁচে বর্তে আছে- যেন অফিসফেরতা ট্রেন থেকে নেমে কমলালেবু, সন্দেশ কিনছে স্টেশনের কাছে, একটু পরেই বাড়ি ঢুকবে কড়া নেড়ে। বারান্দা থেকে মুখ বাড়ালেই যেন দেখা যাবে, মাণিক বেগুন বিক্রি করছে কুপি জ্বেলে। মুড়ি খাচ্ছে। মায়া জমছিল মিঠুর গলায়। ... ...
এই লোকটাকে আগেও দেখেছে পিয়েরে, প্রায় রোজই তো দেখে আজকাল। দেখে গা-পিত্তি জ্বলে যায় তার। ইস্ট ইন্ডিয়ার থেকে আসে এরা। মুখটা দেখ? বাইরে থেকে নতুন কেউ এসে গেঁড়ে বসার চেষ্টা করছে ভাবলেই রাগ হয় পিয়েরের। এমন নয়, যে তার কোনো কাজ মার যাবে, কিন্তু সব দেশ থেকে হাড়-হাভাতেগুলো এখানে এসে জমাবে, সেটাও তার ভাল লাগে না। এমনিতেই আজকাল নিগ্রোগুলোর বাড় বাড়ছে খুব। ট্রেমের দিকটা তো পুরোটাই ওদের দখলে। এই লোকটার চেহারা যদিও আলাদা। এদের মতন আরও দুই তিনজনকে দেখেছে মার্দি গ্রাঁর সময়। খুব ব্যবসা জমেছে এদের। হিন্দু জিনিস কিনতে লোকের উৎসাহ দিন দিন বাড়ছে। এই হিন্দুগুলো নিগ্রোদের থেকে আলাদা, শহরের সব জায়গায় পৌঁছে যায়। ওদের আসা-যাওয়ায় কোন বাধা-নিষেধ লাগেনি। হয়তো চেহারার জন্য। কাটা কাটা চেহারার মাজা রঙের এই লোকগুলো, হয়তো চোখের ওইরকম দৃষ্টি বা মাথার ওই গোল টুপির কারণে কেমন দার্শনিক বা শিল্পী স্বভাবের মনে হয়, কিন্তু আসলে খুব বজ্জাত। সেটা ঠিক বুঝতে পারে পিয়েরে, লোক চেনে তো। ফুটপাথে থুথু ফেলল পিয়েরে। ... ...

রাশিয়াতে তখন বাস করেন ছ লক্ষের বেশি ইহুদি। ইজরায়েল চাইল তাঁদেরও আপন দেশে ফেরাতে। রাশিয়ান সরকার জানালেন কোন ইহুদি যদি স্বেচ্ছায় এই সাম্যবাদী সমাজ ত্যাগ করে ইজরায়েলে যেতে চান, সোভিয়েত ইউনিয়ন সে আবেদন অবশ্যই সযত্নে বিবেচনা করবে। তবে তাদের ভরন পোষণ বাবদ যে ব্যয় সোভিয়েত ইউনিয়ন এযাবৎ বহন করেছে তার একটা অংশ বিদেশি মুদ্রায় দিলে এই নির্গমনের অনুমতি সহজলভ্য হতে পারে। কৃষক শ্রমিকের স্বর্গরাজ্য থেকে বিদায় নেওয়ার মাথা পিছু দক্ষিণা কি ভাবে নির্ণীত হত তা জানা শক্ত। ... ...

ভারতের মহিলা ব্যাডমিন্টনে পিভি সিন্ধুর পরে কে? এই হাজার ডলারের প্রশ্নের আগে ভারতীয় ব্যাডমিন্টন নিয়ে আজ আলোচনা করলেন সৌরাংশু- ভারতের অপারেশন টোকিও: পর্ব ৭ -এ। ... ...


রোহার অফিস ঘরের অর্ধেকটা জুড়েই ট্রোফি ক্যাবিনেট। বছর ষাটের ভদ্রমহিলা। গোলগাল, সাদা ফুরফুরে চুল। দেখে মনে হয় মিষ্টি দিদিমাটি। কিন্তু বাপ রে কী মেজাজ তাঁর! আর কথার ধার! কিন্তু ওঁর কাছেই আমাদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে। উনি আমাদের শপ-লিফটিং এর ঘাঁতঘোঁত শেখাবেন। ... ...

এই শহরে সবাই তেতে আছে সনতের মত- যেন প্রতিটি লোক জুয়াড়ি, যেন প্রতিটি লোক একটা হেরো ঘোড়ার ওপর নিজের জীবন বাজি ধরেছে,আর সেহেতু প্রতিটি সেকন্ডে নিজের নাড়ি ধরে হার্টবীট মাপছে, তারপর তেড়েফুঁড়ে শ্বাস নিচ্ছে যেন এই শেষবার। সবার ঘোলাটে চোখ, ছুঁচোলো ঠোঁট, নিঃশ্বাস নেয় ঘন ঘন- সনৎএর নিজেকে কানেকটেড মনে হয়। আজ সকালের বাসে লোকটা এনারসি, সি এ এ নিয়ে খুব চোপা করছিল, সনৎ কিছু বলে নি- জানলার বাইরে তাকিয়ে রাস্তা দেখছিল আপাতনিস্পৃহ, অথচ কান ছিল সজাগ- যেন লোকটার রেসের ঘোড়াকে চিনে নিতে চাইছে। মালটা হঠাৎ টপিক চেঞ্জ করে বিক্রম আর প্রজ্ঞান তুলতে ওর মাথা গরম হয়ে গেল। যেন লোকটা নিয়ম ভেঙে দুটো ঘোড়ার ওপর বাজি ফেলেছে - যার মধ্যে একটা সনতের -যার ওপর বাজি ধরার আর কারোর এক্তিয়ার নেই। নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে লোকটার হাত সরাতে মরিয়া হ'ল সনৎ-“মহাকাশের তুই কী বুঝিস?” ... ...

প্রথম যে কথা বলছিলো সে-ই শুরু করে আবার, ঠিকই, তবে এই সব পরিবর্তন আজকাল হয়েছে। একেবারে প্রথমের দিকে কিন্তু এখনকার ডাইনিং হলটায় শুধুমাত্র কয়েকটা বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলটা শুরু করেছিলেন জয়িদি। তারপর বাস এলো। বাসটা আসার পর থেকে একটা দারুণ কাজ শুরু করলেন উনি, একেবারে জঙ্গলমহলের ভেতরের গ্রামগুলোর থেকে একটা একটা করে বাচ্চাকে ধরে নিয়ে এসে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আমরা স্কুলের বাসে গিয়েও দেখেছি কেমন সব গ্রাম। শুনেছি তখন জলধর নামে এক সাঁওতাল যুবক ছিলো জয়িদির সঙ্গে, সে নাকি পড়াতোও ভালো। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পর থেকে আর নিয়মিত পড়াবার মতো ভালো লোক জোগাড় করা যায়নি। ... ...
সে হল এক ভীষণ বচসা। ভোরের খোঁজে পাখিরা ঘুমের থেকে উঠে উড়বার তোড়জোড় করছিল, আবার নিজের নিজের বাসায় গিয়ে ডানা গুটিয়ে ঘাপটি দিল। রাতের শেষে যে ক’জন মাতাল পথের ধুলায় লুটিয়ে পড়েছিল, অসময়ে খোঁয়ারি ভেঙে গালিগালাজ করতে করতে বাড়ির পথ ধরল। টেন্ডারলয়েনের মাথার উপর দিয়ে যাওয়া সেই সকালের রেল কেন যে মাঝপথে আটকে গেল, নিউ ইয়র্ক হেরাল্ডের তাবড় সাংবাদিক কিছুতেই সেটার হদিশ করতে পারল না। আমান্ডা গোল থামাতে মাঝখানে এসে পড়েছিল, আন্তোনিওর দাবড়ানিতে ছাদের থেকে মাকড়সার মত ঝুলে রইল। সেই দুই ষণ্ডা জোয়ান রুথের দুহাত ধরে চ্যাংদোলা করে আন্তোনিওর ঘরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, রুথের চোখের আগুনের গোলায় ওখানেই কাটা সৈনিক হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। ... ...

শীতের বিকেলে বৃষ্টি হলে ঠান্ডা যেন চামড়া ফুটো করে হাড়ে ঢুকে যায় সটান, তার ওপর ভেজা ফুটপাথ শুকোতে অনেক সময় নেয়- রাতে শোয়ার জন্য একটা শুকনো জায়গা খুঁজছিল প্রফুল্ল। এমনিতে, মন্দিরের সামনের ফুটপাথে প্লাস্টিক পেতে শুয়ে থাকে। গতবছর একটা কম্বল পেয়েছিল - সেদিন কালীমন্দিরে শ্রাদ্ধ- প্রফুল্ল, কপিল, নাথু আর রঘুবীর ফুটপাথে বসে পিন্ডমাখা দেখছে- ন্যাড়া মাথা দুটো ফরসা ছেলে পুজো করতে করতে চোখ মুছছিল। কাজ মিটে গেলে ছেলেদুটো ওদের হাতে লাড্ডু দিল। তারপর টাকা, ধুতি আর কম্বল। গতবারের শীত এই কম্বলের নিচে দিব্যি কেটেছে; তারপর প্লাস্টিক মুড়ে রেখে দিয়েছিল। ... ...

মল্লিকবাজার মোড়ে প্রথমে অন্তঃস্বত্ত্বা অবস্থায়, পরে বাচ্চা কোলে ভিক্ষা করত যে মেয়েটি, মেয়ো রোডের ছেলেটিরই বয়সি সে। কিশোরীর ওই পরিণতি কে করল? কেনই বা সে ওই বয়সে বাড়ি ছাড়া? জানা হয়নি। ফুটপাথে প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে শিশুর সারল্যে কিশোরী মায়ের সন্তানের সঙ্গে খেলা, মাতৃস্নেহে শিশুর যত্নআত্তি করার দৃশ্য যানজটে আটকে থাকা গাড়ির আরোহী, পথচলতি মানুষের চোখ টানত। প্রেস স্টিকার সাঁটা গাড়ির আরোহীর মনে প্রশ্ন তোলপাড় করে দিয়ে যেত, এই কিশোরী মা মৌলালির সেই নাবালিকা নয়তো? ... ...
গোবিন্দর শরীরে যে এত ঘুম জমে ছিল, সে নিজেও জানত না। দিনভর ঘুমাতে কসুর করেনি শুরুর ক’টা দিন। জাহাজের স্টকহোল্ডে কাজ করে শরীরখানা এমন দুমড়ে মুচড়ে যায়, সবসময় ঘুমের জন্য মুখিয়ে থাকে। দু’দিন এমনি গেল। তারপর বদনখান এমন ঝরঝরে হয়ে গেল, মোটে ঘুমই আসে না চোখে। শুয়ে থাকলে বরং গায়ে বেদনা। ওইটুকু তো ঘর, হাত-পা খেলানোর ঠাঁই নেই। পায়চারি করার পরিসর দূরস্থান। সে বেচারা কি করে? বিছানার উপরেই গ্যাঁট হয়ে বসে রইল রাতভোর। বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ফুটল, ঘরের হলুদ আলোর সঙ্গে ছায়া ভুবন তৈরি করল। মানুষের মন বড় অদ্ভুত। জাহাজের জন্য মন আকুলি-বিকুলি করে উঠল গোবিন্দের। অথবা ঠিক জাহাজের জন্য নয়, শুধু একটু বাইরে যাওয়ার জন্য। একটু বাইরের আলো বাতাস, মানুষের মুখ, কারো সঙ্গে দু’টি কথা কইবার তরে পাগলপারা ছটফটানি। ঠিক যেমন একেকবার ফার্নেসে কয়লা ঢেলে গোটা শরীরখান শুকিয়ে যেত, আর ইচ্ছা হত দেয় এক ঝাঁপ মাঝদরিয়ায়, নিশ্চিত মরণ জেনেও, এখন তেমনি ধরা পড়ুক চাই যা খুশি হোক – বাইরে একদম যাওয়া চাই – এমন একটা বেপরোয়া ভাব তাকে গ্রাস করছিল। ... ...

অন্যদিকে ফ্রান্সের পুরনো ইহুদি বিদ্বেষ তার কণ্ঠ খুঁজে পেলো। কট্টর জাতীয়তাবাদী ফরাসিরা জেগে উঠলেন - ইহুদিদের জন্য ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা, ফরাসি সভ্যতা বিপন্ন। সে ক্রোধ এমনি রুদ্র রূপ নিয়েছিল যে এমিল জোলা আনাতোল ফ্রাঁসের মত মানুষের প্রাণ নিয়ে টানাটানি। একশোর বেশি জেলায় ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, তাদের সম্পত্তির বিনাশ চলল -পুলিস নির্বাক দর্শক মাত্র ( হিটলারের বয়েস তখন ন বছর, গোয়েরিঙের ছয় : আইখমানের জন্মাতে আট বছর দেরি আছে )। কোন প্রমাণ ছাড়াই পুনর্বিচারে দ্রাইফুসের সাজা আরও দশ বছর বাড়ানো হল। তাঁকে জানানো হল তিনি মুক্তি পাবেন যদি অপরাধ স্বীকার করেন। পাঁচ বছর ডেভিলস আইল্যান্ডের কঠোর জীবনে ক্লান্ত দ্রাইফুস তাতেই সই করে মুক্ত হলেন ( ডাসটিন হফমান অভিনীত পাপিলন ছবিতে ডেভিলস আইল্যান্ড চিত্রায়িত হয়েছে)। সামরিক বাহিনীতে পুনর্বাসন হল দ্রাইফুসের। তিনি জার্মানির বিরুদ্ধে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।। ... ...

মিনতি, মিনতির মতো মুখচোরা মেয়ে, সে-ও জিজ্ঞেস করেছে, কতো তাড়াতাড়ি? কতো তাড়াতাড়ি খাইয়ে দিতে হবে? তখনো ধৈর্য হারায়নি উৎপল, বলেছে আটটার মধ্যে। তখন লক্ষ্মীকান্ত বলেছে, ঠিক আছে, আমরা ছটার সময় পড়তে বসে যাবো, আটটার মধ্যে পড়া হয়ে যাবে। উৎপল তো কখনও এরকম জবাব দিতে শোনেনি ওদের, ও রেগেমেগে বলেছে, কী পড়তে বসে যাবো পড়তে বসে যাবো করছো, একজনও বসবে না ডাইনিং হলের চেয়ারে। তখন নাকি তিন-চারজনে মিলে একসাথে বলেছে, ঠিক আছে স্যর, আমরা মেঝেতে বসবো। আর তারপর আস্পর্ধা দেখুন, ক্লাস সেভেনের নবীন ঝাঁঝিয়ে উঠে বলেছে তখন, স্যরকেও কী মেঝেতে বসতে হবে ! বিশেষ কোরে নবীনের এই প্রশ্নে উৎপল খুবই আপসেট। আর সত্যি কথা বলতে কী, আমিও একটু শঙ্কিত। ... ...
হাঁ করে গিলছিল আলেফ আর বসির। রেলের ইস্টিশানে নেবে অবধি দেখেছে এই শহরের রঙ-ঢঙ। যেন রোজকার উৎসব লেগে আছে। পথে পথে রঙ্গ রসিকতা, নাচ গানের আওয়াজ, গ্রাহকের প্রতীক্ষায় পশরা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা, কিছুই চোখ এড়ায়নি তাদের। নিউ ইয়র্কের দশ-বিশ তলা ইমারত ওদের কাছে নতুন ছিল। কি তার চমক আর চেকনাই। আশবারি পার্কে দরিয়াপারের মেলা দেখে চুঁচড়োর দরগার বচ্ছরকার পরব ফিকে পড়ে গেছিল এ জন্মের মত। কিন্তু এই শহরের সাজ সহরত নকশা এমন, যেন চারদিকে আমোদের ভিয়েন বসেছে। এমন কোন রঙ তারা জানে না, যার কয়েক পোঁচ পড়েনি কোথাও না কোথাও। থেকে থেকে নিশেন উড়ছে। তাতে কত রকমের মুখ, জন্তু জানোয়ারের চেহারা দিয়ে চিত্র বিচিত্র করে রেখেছে। এই শহর তার উচ্ছল প্রাণ আর বেঁচে থাকার জীবন্ত ছবি নিয়ে শুরুতেই তাদের খুব টেনেছে। ... ...

আমরা তো কাজ করতাম কোম্পানি থেকে দূরে। জঙ্গল পাহাড়ের ভিতর। ওইসব কোম্পানির ব্যাপার। কোম্পানি বডি নিয়ে কি করবে, বডি পাঠাবে কিনা, সেসব খবর আমাদের কাছে আসত না। কে খবর দেবে! আমরা তো বোরিং করার জন্য ঘুরছি। শ্মশান মশান কোনও বাছাবাছি নেই। গু মুত যা থাক! যেইখানে বোরিং করে বোম ফাটিয়ে তেল আছে জানতে পারবে আমাদের সেইখানেই থাকতে হবে। কোম্পানির লোক যেখানে থাকতে হবে বলেছে, সেইখানে একটু পরিষ্কার করে জঙ্গল কেটে সাপ কোপ মেরে তাম্বু টানিয়ে থেকে গেছি। দু হাজার কুড়ির বাইশে মার্চ ওরা শ্মশানে জঙ্গলে পাহাড়ের ঠিক কোন খাঁড়াইতে ছিল সে জায়গার নাম ওদের জানা হয়নি। ওই জঙ্গল পাহাড় থেকে দূরে টি ভি চ্যানেলে প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখা গেল। ঘোষণা হল লকডাউন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, যে যেখানে আছেন সে সেখানেই থাকুন। খবর হল সারা দেশের ট্রেন বাস বর্ডার সবকিছু বন্ধ হল একুশ দিনের জন্য। ... ...

যেন ট্রেনে উঠেছিল লিপি- হুইশল দিতে দিতে প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে ট্রেন আর লিপি বার্থে উঠে বসছে, তারপর রেলের কামরা বদলে যাচ্ছে ওর বাপের বাড়ির পুরোনো ঘরদোরে - মলিন দেওয়ালে ঝুলে থাকা ছবি, ক্যালেন্ডার- খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে আর দেওয়ালে ছবি তৈরি হচ্ছে- বকুল গাছ, জবা, টগর, এই উঁচু নারকেল গাছ তারপর মেপল। লাল হলুদ ঝরা পাতার রাশ পেরোচ্ছিল ট্রেন খুব আস্তে, সে ট্রামে করে চলেছে এরকম মনে হচ্ছিল - তারপর একটা লম্বা ব্রিজে উঠল, স্পীড বাড়াল- ঝমঝম ঝমঝম ঝমঝম; ট্রেনের তীব্র গতিতে ভেঙে গেল বাপের বাড়ির দেওয়াল, ঘরদোর, দেওয়ালের ছবি- ... ...

দুপুরে খাওয়ার সময় পুলকেশও বসেন ওদের সাথে, এবং পুলকেশের বিশেষ অনুরোধে জয়মালিকাও। য়্যোরোপের গল্প হয়, পাঁচ জায়গায় সেমিনারে বক্তৃতা দিয়েছে জয়মালিকা, ধরণী মাতার আরাধনা যে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম আর ভারতের ইণ্ডিজেনাস পপুলেশনের দার্শনিক চিন্তার মহাসম্মিলনের ফসল, ভারতীয় ধর্মের শ্রেষ্ঠ প্রতীক, আদিবাসী ধর্ম আর ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মিলনস্থল, এ চিন্তা নাকি আলোড়ন তুলেছে যেখানে যেখানে গেছে ও সেখানেই। ও যে বক্তৃতা দিয়েছে তার ইংরিজি অনুবাদ, এক একটি কপি পাঁচ য়্যুরো হিসেবে একশো কপি – যা ও সঙ্গে কোরে নিয়ে গিয়েছিলো – সবই বিক্রি হয়ে গেছে ! এসব আলোচনা খুব একটা প্রভাব ফেলে না সোমেশ্বরের ওপর, ও মনে মনে ভাবছিলো জয়মালিকা কী বাচ্চাদের পাদুকাবিহীন ফাটা-পাগুলো লক্ষ্য করেছে আজ ! ... ...