






একদিন সুযোগ পেয়েও যাই। ছোটমামারা তখন ফেরত চলে গেছে, দিদাকে নিয়ে ব্ড়মামা, মাইমা গেছে পুর্বাশায় মেজমামার বাড়ী। সেদিন আমি দোতলার ঠাকুরঘরে এসে ঢুকি, ভেতর থেকে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ছোট্ট খাট থেকে নামিয়ে আনি রামকৃষ্ণ, সারদামণি, অন্নদা ঠাকুর, কালীঠাকুর, গনেশঠাকুরের ছবি। দেয়াল থেকে পেড়ে আনি কৃষ্ণরাধার ছবি। তারপর একটা একটা করে ছবির ওপরে উঠে দাঁড়াই, ছবির কাচ যাতে ভেঙে না যায় তাই ঐ ঠাকুরদের বিছানার তোষক নিয়ে ফটোর ওপরে রেখে তার ওপরে দাঁড়াই। সব ফটো জায়গামত রেখে ধার থেকে টেনে আনি লক্ষ্মী আর সরস্বতীর মূর্তি। এই দুটো ঠাকুরের মূর্তি এনে পুজো হয়, ভোগ দেওয়া হয় আর পুজোর পরের দিন আগের বছরের ঠাকুরের বিসর্জন দেওয়া হয়। এই বছরের ঠাকুর ঠাকুরঘরে থাকে। এগুলো মূর্তি ছবি নয়, এগুলোর ওপরে দাঁড়ানো যায় না, তাই পা দিয়ে ওদের শাড়ি ডলে দিই, পায়ের আঙুল দিয়ে মূর্তির মাথার চুলগুলো রগড়ে দিই। তারপর আবার উঠিয়ে বসিয়ে দিয়ে আসি আর মনে মনে বলি, যে ঠাকুরের দোহাই দিয়ে দিদারা এত মিথ্যে বলে, এতবার অন্যায়ভাবে আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখে, সেই ঠাকুরকে পা দিয়ে ডলে রগড়ে দিলাম। ওদের দেখানো 'ঠাকুর দেখবেন ওপর থেকে' এই ভয় আমি করি না। ওদের উত্তরাধিকার আমি বহন করি না, কোনওদিন করবও না। ... ...




শুভর পুরো শরীরটা যেন বুলেটবিদ্ধ ডলফিনের মত ঝাঁকুনি খেল ক্ষণিকের তরে! দীপের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে সে মাথাটা নীচু করে ফেলল, তারপর সেই অবস্থাতেই মৃগী রোগীর মত স্বর বেরুলো তার মধ্য থেকে, “তার মানে… তোর চোখেও পড়েছে …জানিস, ওকে আমি এখনো স্পর্শ করতে পারিনি! ও শুধু একা থাকতে চায়, কাউকে কাছে দেখলেই ওর গায়ে মনে হয় জ্বালা ধরে! ভাবলাম, বৈবাহিক সম্পর্কটা নিয়ে ওর ভীতি আছে, বেড়াতে এলে কেটে যাবে। দ্বীপটিতে ঢোকার পর ওর চোখেমুখে অন্য রকম খুশীর ভাব দেখে মনে হয়েছিল, বরফ গলতে শুরু করেছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, সে খুশী ওর নিজের কাছে! ও যেন আমায় আরও ঘেন্না করতে শুরু করেছে! তাছাড়া, আর …আর একটা… ব্যাপার …’ শেষ করতে পারে না শুভ, এদিক ওদিক তাকায় ভয়ে ভয়ে, মনে হয়, কেউ শুনে ফেললে নেমে আসতে পারে রোজ কেয়ামত! ... ...

২২শে এপ্রিল ২৫ এর পহেলগামে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারত কী পদক্ষেপ নেয়, তার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম আমরা। যতদিন গেছে - ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং সামরিক শক্তির তুচ্ছতা নিয়ে বহু কথা বলা হয়েছে সামাজিক মাধ্যমের প্রতিটি শাখায়। জনগণেশ বারবার বলেছে - এত অপেক্ষার কী আছে - ভারত তো নিমেষে গুঁড়িয়ে দিতে পারে বিরুদ্ধ দেশকে। দীর্ঘ পনেরদিন অপেক্ষার পর ভারত সরকার দুর্দান্ত আঘাত হেনেছে। পাকিস্তানের সীমানার বাইরে থেকেই ভারত নটি জঙ্গী ঘাঁটি বিধ্বস্ত করেছে মোট একুশটি মিসাইলের আঘাতে। অর্থাৎ নিখুঁত এবং নিশ্চিত আঘাত হানার জন্যে ভারত মাত্র চোদ্দদিন সময় নিয়েছে প্রস্তুতির জন্যে। সরাসরি রণাঙ্গনে নামার আগে এই যুদ্ধ প্রস্তুতির কথাই চিন্তা করেছিলেন যুধিষ্ঠির। বনবাস এবং অজ্ঞাতবাসের তের বছরে ধৈর্য ধরে নিখুঁত পরিকল্পনা করেছিলেন - কী ভাবে যুদ্ধ জয় নিশ্চিত করা যায়। সেই আলোচনাই করেছি - মহাভারতের ... ...




এতগুলো কথা গুছিয়ে বলতে বিনীতাকে শান্ত থাকতে হয়েছে, নিজের ইমোশন চাপা দিয়ে রাখতে হয়েছে, আর আগে কয়েকবার নিজের মনে মনে বলে রিহার্সাল দিয়ে নিতে হয়েছে। মেয়ে প্রশ্ন করল “বাবা আর আসবে না?” উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না বিনীতা, গায়ত্রী বলল, “বাবা হয়তো আর আসবে না, কিন্তু আমরা সবাই তো আছি। আমরা সবাই তোমার কাছে থাকব, তোমার পাশেই থাকব।” এইবার বিনীতা বলল, “বাবা কত ভিডিও করেছেন সেগুলো দেখব আমরা, বাবার কত বই আছে সেগুলো পড়ব।” রঙিন চুপ করেই রইল। বিনীতার মনে পড়ল অরুণাভর লেখা চিঠিতে মেয়ের কথা - “রঙিনকে ব’লো আমার কাজ ফুরিয়ে গেছে তাই চলে গেছি।” এগুলো মেয়েকে বলতে গিয়েও বলল না সে, “কাজ ফুরিয়ে যাওয়া” ব্যাপারটা সে কী ভাবে নেবে জানা নেই। আর এই ধারণা ও পরে কার ওপর কেমন ভাবে প্রয়োগ করবে সেটাও অজানা। ... ...

তার মানে কি অতীতের ওপরে ইরেজার চালিয়ে নতুন ছবি আঁকা ? আমি যুদ্ধ শেষের তিন দশক বাদে পশ্চিম জার্মানি আসি, আমি জার্মান রেডিও এবং টেলিভিশনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ বিভীষিকা বর্ণনায় সঙ্কুচিত হতে দেখি নি। ১৯৭৭ সালে দশ পর্বের একটি ডকুমেনটারি দেখি, তার নাম ফোর ফিয়েরতসিগইয়ারেন, চল্লিশ বছর আগে। জার্মান নিউজরিল, ব্রিটিশ ফরাসি রাশিয়ান টি ভি থেকে সংগৃহীত বিশাল ফুটেজ, জার্মান বর্বরতার নির্মম ছবি। ১৯৭৮ সালে জার্মান স্টেট টেলিভিশন হলোকষ্ট নামের পাঁচ পর্বের একটি একান্ত সত্যনিষ্ঠ আমেরিকান সিরিয়াল ( জারমানে ডাব করা ) দেখায়। নাৎসিদের হাতে, গ্যাস চেম্বারে ইহুদি ভাইস পরিবারের মৃত্যু যাত্রা। তখন মনে হয়েছে অতীতের মোকাবিলা করতে হলে অতীতকে যে জানা দরকার সেটা পশ্চিম জার্মানি হয়তো অস্বীকার করে নি। অথচ দেশ এবং মানুষের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরে জেনেছি পশ্চিম জার্মান স্কুলের ইতিহাস ক্লাসে নাৎসি পিরিয়ড শুধু ছুঁয়ে যাওয়া হতো, গভীরে কখনোই নয়- শিশুদের মাথার ভেতরে অপরাধবোধের গজাল ঠুকে দেবার কি প্রয়োজন ? ( এখন অবশ্য সেটা খানিক বদলেছে, যদিও ক্লাসরুমে ১৯৩২-১৯৪৫কে গুরুত্ব দেওয়া হয় না )। পূর্ব জার্মানির স্কুলের শিক্ষা অন্য রকমের। সেখানকার পাঠক্রম অনুযায়ী নাৎসি দর্শন কার্যকলাপ অত্যন্ত নিন্দনীয়, অমানবিক। মাননীয় নেতা এরিখ হোনেকার সহ বহু কমিউনিস্ট নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন ; প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়েছে, নাৎসিরা ক্ষমতা দখল করে তাদের ওপরে অত্যাচার চালায় বারো বছর যাবত। ইহুদি হত্যা, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, পোল্যান্ড ইউক্রেন রাশিয়ায় তাণ্ডবের জন্য নাৎসিরা দায়ী, পূর্ব জার্মানি নয়। নিতান্ত ভাগ্যের বশে রাশিয়ান ভাইয়েরা এসে নাৎসি দুঃস্বপ্ন থেকে দেশকে বাঁচিয়েছে। ... ...

আকাশী ফেনিল সমুদ্রের উপর দিয়ে- অগাস্টাস সিজারের যুগের ঘনকচিকলাপাতারঙের শ্যাওলা ধরা, কালো মেহগনি কাঠের অবাক জলযান এগিয়ে চলে। পালে— কঙ্কাল নাবিকদের বৃত্রাসুর পাঁজরের মধ্যে দিয়ে খেলা করে যায় ভিজে নীল বাতাস। ... ...

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ। দুনিয়া বদলাচ্ছে। ইউরোপীয়রা একের পর এক ভূখণ্ড দখল করছে।ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, রাশিয়া—তাদের কাছে তখন ‘সভ্যতা’ মানে আধুনিকতা, বিজ্ঞান, শিল্প, জাতীয়তাবাদ।আর মুসলিম দুনিয়া? ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে। এক সময় যে অটোমান সাম্রাজ্য ইউরোপের দরজায় কড়া নেড়েছিল, সেই সাম্রাজ্য তখন নিজেকে টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। মিশর, পারস্য, উত্তর আফ্রিকা, ভারত—যেখানেই তাকানো যায়, দেখা যাচ্ছে পরাধীনতা, বিক্ষোভ, আত্মসমালোচনা। এই পটভূমিতেই মুসলিম সমাজের কিছু মানুষ ভাবতে শুরু করলেন—কেন আমরা পিছিয়ে গেলাম? এবং এখন কী করণীয়? ... ...

সামনেই এগিয়ে আসছে পঁচিশ বৈশাখ। সেই বিশেষ দিনটিকে মাথায় রেখেই লেখা হলো ছোট্ট এক স্বপ্নের কথা, এক শহুরে শান্তিনিকেতনের ইতিকথা। আজ থেকে ঠিক ছয় দশক আগে কর্মেও মননে রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরেই পথে নেমেছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। মানুষ গড়াই ছিল যাঁদের একমাত্র স্বপ্ন। ... ...