এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • অনাদিনাথ দত্ত -- খোল পাখোয়াজের জাদুকর  

    Partha Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৭ অক্টোবর ২০২৩ | ৩৯৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • আজকে রাজনীতি ও তিক্ততা থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে সঙ্গীতজগতের কথা একটু লিখি। অবশ্য এখানেও কোনো গ্যারান্টি নেই কেউ কোনো বিরূপ মন্তব্য করবেনা। তা সে যাই হোক। 

    আমার এক বান্ধবী জ্যোৎস্না ঘটক শান্তিনিকেতনে বড় হয়েছে। সঙ্গীতভবনের ছাত্রী। অসাধারণ রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। তার কাছেই প্রথম শুনেছিলাম অনাদিনাথের কথা। অনাদিনাথ জ্যোৎস্নার বাবা। বিষ্ণুপুর ঘরানার বাদ্যযন্ত্রশিল্পী। মহান শিল্পী। 

    বহুকাল আগে কলকাতার রকপালিশ করা, আড্ডা ও গজল্লা দেওয়া আমরা কয়েকটা ছেলে হুজুগের মাথায় শান্তিনিকেতনে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম বসন্তোৎসবের সময়ে। দোল খেলা, আবির খেলা, এবং রবীন্দ্রনাথের গান ও বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রী শিক্ষক শিক্ষিকাদের মাঙ্গলিক শোভাযাত্রা। মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তার অজানা, অচেনা সৌন্দর্য্যে। 

    সেদিন সন্ধ্যেবেলা আমরা বন্ধুরা বাড়ি ফিরছি। হঠাৎ শুনি একটা বাড়ির সামনের উঠোনে গান হচ্ছে। অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের গান। "বাকী আমি রাখবো না কিছুই। তোমার চলার পথে পথে ছেয়ে দেব ভূঁই।" দৌড়ে গিয়ে হাজির হলাম। শান্তিদেব ঘোষের বাড়ি। গান গাইছেন স্বয়ং শান্তিদেব। 

    সঙ্গে অদ্ভুত, আশ্চর্য্য, স্বর্গীয় বাদ্যযন্ত্র। খোল, পাখোয়াজ। অনাদিনাথ দত্ত। 

    তখন অবশ্য তাঁর নামও শুনিনি। এবং পরেও শুনিনি। আমাদের দেশে সহযোগী শিল্পীদের নাম কেউ শোনেনা, যদি একেবারে রাধাকান্ত নন্দী কিংবা কেরামতউল্লাহ খান না হয়। জাকির হোসেন অন্য যুগের, অন্য খ্যাতির। বাঁশি কে বাজালো? কে বাজালো তবলা, মন্দিরা, সারেঙ্গী, হারমোনিয়াম? কেউ জানেনা। 
     
    মিডিয়া কখনো তাঁদের নাম বলেনা। প্রধান শিল্পীর খ্যাতি ও লাইমলাইটের আড়ালেই তাঁরা জীবন কাটিয়ে দেন। অর্থকষ্টে ভোগেন অনেকেই। 
     
    তার ওপরে অনাদিনাথ ছিলেন নিতান্তই আত্মপ্রচারবিমুখ। তাঁর প্রতিভার কথা কেউ জানতেই পারলোনা খুব কাছের কিছু মানুষ ছাড়া। তাঁর বাদ্যযন্ত্র যে ম্যাজিক সৃষ্টি করে গেছে, তার মূল্য সে সময়েই কেউ দেয়নি, আর আজকের দু পয়সার শিল্পীর দুশো টাকার অহঙ্কারের দিনে সেসব নিরহঙ্কার, সন্ত প্রকৃতির মানুষের কথা কে আর মনে রাখবে?

    জ্যোৎস্না ঘটক নিজেও তাই। কে জানতো, বিবাহপূর্বের জ্যোৎস্না দত্ত এক সময়ে এমন গান গেয়েছে যে আকাশবাণীর বেতার জগৎ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে শান্তিদেব, অর্ঘ্য সেন, সাগর সেন, সুমিত্রা সেনের সঙ্গে জ্যোৎস্নার ছবি বেরিয়েছে রেডিওর অনুষ্ঠানের খ্যাতিতে? নেহাৎ খুব পীড়াপীড়িতে ছবিটা সে দেখিয়েছিলো। পরে বোধহয় মনে মনে আক্ষেপ করেছে কেন যে পার্থকে দেখাতে গেলাম। সে তো ঢাক পেটাবেই। 

    অনাদিনাথের মেয়ে তো। অন্যরকম কীভাবে হবে?

    তা, সেই মহান শিল্পীর আজ শতবর্ষ। পুত্র পুলক দত্ত বের করেছেন এক স্মরণিকা -- "অনাদিনাথ দত্ত -- শতবার্ষিক শ্রদ্ধার্ঘ্য"। তাঁর কয়েকটি ছবি, জীবনকাহিনী, বিষ্ণুপুরের বাড়ি থেকে শান্তিনিকেতনে পঁচাত্তর টাকা মাইনেতে সরকারি চাকরি পেয়ে লুকিয়ে চলে আসার ইতিহাস, এস্রাজের জাদুকর অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয়, এবং রাত তিনটে থেকে বাজনা রেওয়াজ করার গল্প আছে। আছে সঙ্গীতভবনের ছাত্র বিশ্বজিৎ রায়ের লেখা অমৃতবাজারে প্রকাশিত একটি ব্যতিক্রমী লেখা, এবং হ্যাঁ, আমেরিকার এথনোমিউজিকোলজির খ্যাতনামা স্কলার আমেলিয়া মাচিশেফস্কির দুর্মূল্য সাক্ষাৎকার। আমেলিয়াও ছিলেন সঙ্গীতভবনের ছাত্রী ও গবেষক। 

    অনাদিনাথের বাজনা আমি শুনেছি শান্তিদেবের গানের সঙ্গে। যখন চিনতাম না, তখন শুনেছি সামনে বসে। আর যখন চিনলাম, তখন তিনি বহুদূরের বাসিন্দা। যেখানে পৌঁছনো যায়না সামনাসামনি। কিন্তু পৌঁছনো যায় সে সঙ্গীতরসের মূর্ছনার মধ্যে দিয়ে। 

    আপনারা যদি কখনো শান্তিদেবের গাওয়া নাই বা এলে যদি সময় নাই, আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না, ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছো যে দান, আকাশ হতে খসলো তারা, আমার কণ্ঠ হতে গান কে নিলো, বলো সখী বলো, আবার মোরে পাগল করে দিবে কে, সব দিবি কে, কিংবা আমার অতি প্রিয় ফাগুনের পূর্ণিমা এলো কার লিপি হাতে শুনে থাকেন, এবারে শুনবেন সেসব স্বর্গীয় গানের সঙ্গে স্বর্গীয় খোল, পাখোয়াজ আর মন্দিরা। 

    তিনি অনাদিনাথ দত্ত। 

    আজ তাঁর শতবর্ষে প্রণাম জানালাম। 

    _____
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ২৭ অক্টোবর ২০২৩ | ৩৯৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:985:73b0:4fa1:143f | ২৭ অক্টোবর ২০২৩ ২১:০৭525243
  • ভাল লাগল 
  • হীরেন সিংহরায় | 2a00:23c7:672e:2001:49bc:8418:f18f:5c95 | ২৮ অক্টোবর ২০২৩ ০০:৩২525250
  • আহা কি ভাগ্য আপনার - পূর্ব পল্লীর বাড়ির উঠোনে বসে গান গাইছেন শান্তিদেব! অমৃতের আস্বাদ!
  • Abak Chittri | ২৮ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:৪৬525268
  • প্রণাম জানাই 
  • Sumantune | ২৯ অক্টোবর ২০২৩ ০০:২৮525295
  • ছোট, বিনম্র একটি মুগ্ধপ্রায় লেখা। বিষ্ণুপুর এর সঙ্গীত চর্চা বাঙালি ভুলে গেছে। সুবোধ নন্দী, অশেষ বন্দোপাধ্যায়, গোকুল নাগ, মানিলাল নাগ এর বিষয়ে ও মনে হয় না কারোর কোনো আগ্রহ আছে। বাঙালি জাতি কে হয়তো নিজেদের ইতিহাস খোঁজার জন্য পরবর্তি কালে বিদেশি গবেষকদের উপর নির্ভর করতে হবে।
  • ইন্দ্রাণী | ২৯ অক্টোবর ২০২৩ ০৫:১৬525302
  • লেখাটির জন্য ধন্যবাদ জানাই। একসময়ে শান্তিনিকেতনে বিষ্ণুপুরের বহু সাঙ্গীতিক ব্যক্তিত্বের সমাবেশ ঘটেছিল- অনাদিনাথ, রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যয়, অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

    অনেক স্মৃতিকথায় অনাদিনাথের উল্লেখ পেয়েছি।
    ইউটিউবে ওঁর বাদন ও কণ্ঠসঙ্গীতের ক্লিপ রয়েছেঃ




  • syandi | 45.250.246.19 | ৩০ অক্টোবর ২০২৩ ০১:৫২525326
  • @হীরেন সিংহরায়, একটা ছোট্ট কারেকশান। শান্তিদেব ঘোষ থাকতেন সীমান্তপল্লীতে সংগীতভবনের উল্টোদিকের একটা বাড়ীতে। উনি পূর্বপল্লীতে থাকতেন বলে শুনি নি, হয়ত অনেক আগে থাকতেন।
     
     
    @Sumantune, বিষ্ণুপুর ঘরানার আরেক বিস্ময়কর শিল্পী ছিলেন পণ্ডিৎ রণধীর রায়। উনি এস্রাজ বাজাতেন এবং শান্তিনিকেতনের সংগীতভবনে অধ্যাপনা করতেন। যে রাগ রাগিণী উনি বাজাতেন সেগুলো বিশুদ্ধরূপেই বাজাতেন এবং প্রতিটা নোটের ক্ল্যারিটি বজায় রেখেই। আমার এক সঙ্গীতজ্ঞ বন্ধুর এরকমই মতামত। পণ্ডিৎ রণধীর রায় বেশিদিন বাঁচেন নি। ইউটিউবে ওনার বাজনা আছে। লিঙ্ক দিচ্ছি না কারণ টই-এর বিষয়বস্তু আলাদা। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন