ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  পড়াবই  প্রথম পাঠ

  • দূরবীনের ইতিহাস

    বিমান নাথ
    পড়াবই | প্রথম পাঠ | ১৭ জুলাই ২০২২ | ৪২৬ বার পঠিত | রেটিং ৩.৫ (২ জন)


  • যন্ত্রের ইতিহাস নিয়ে বই খুব একটা নজরে পড়ে না। বাংলায় সেটা আরও কম। যেমন, রেল ইঞ্জিনের ইতিহাস। আর সেটা যদি বিজ্ঞানের কোনও যন্ত্রপাতি হয়, তাহলে তো কথাই নেই। এদিক দিয়ে গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আকাশে মেলেছি চোখ’ (২০২২, বিভা পাবলিকেশন) একটি জরুরি বই।

    বইটি দূরবীনের ইতিহাস নিয়ে। এটি এমন একটি যন্ত্র যাকে আধুনিক বিজ্ঞানের সূত্রপাতের মূলে ছিল বললে অত্যুক্তি করা হয় না। দূরবীনের সাহায্যে সৌরকলঙ্ক, শুক্রের দশা, বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করেই গ্যালিলিও মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণার মূলে কশাঘাত করেছিলেন। এর আগে কোপার্নিকাসের বই বেরিয়েছিল বটে, কিন্তু তাতে খুব একটা হেলদোল হয়নি জনমানসে। অনেকের কাছে কোপার্নিকাসের নতুন ধারণা শুধুমাত্র ‘মতবাদ’ হয়েই রয়ে গিয়েছিল, যার পালে এসে হাওয়া দিয়েছিল গ্যালিলিওর আবিষ্কারগুলোর চমক। তারপর আর ফিরে তাকায়নি বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। তাই দূরবীনের মাহাত্ম্য – অন্য যে কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি। ভগীরথের শঙ্খের মত এই যন্ত্রটি হাজারেরও বেশি বছরের ধারণার শিকলে আটকে থাকা অবস্থা থেকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছিল বিজ্ঞানের ধারা।

    এমন একটি বই পড়তে গিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে, যন্ত্রের দরকার কীসের? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার উপলক্ষ্য করেই গৌতমবাবুর বই শুরু হয়েছে। দরকারটা হল মাপজোখের। যা ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান এক পা-ও এগোতে পারে না। প্রাচীনকালে যুক্তি দিয়েই প্রমাণ করার চেষ্টা হত। যার যুক্তি অকাট্য মনে হত তার চিন্তাকেই মেনে নেওয়া হত সত্য বলে। আধুনিক বিজ্ঞান এসে এই ‘মনে হত’-র ব্যাপারটা সরিয়ে হাতেনাতে প্রমাণের ভূমিকা বড় করে তুলে ধরল। কিন্তু তার জন্য চাই সূক্ষ্ম মাপজোখ করার ক্ষমতা। যত গভীর, যত কঠিন প্রশ্ন, তত সূক্ষ্ম সেই প্রশ্নের পরীক্ষার মাপজোখ। তাই দূরবীন এসে যখন আকাশের মাপজোখ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছিল, তখনই আধুনিক বিজ্ঞান তরতর করে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল।

    এই জরুরি কথাগুলো অনেক সময় আমাদের মাথায় থাকে না। গৌতমবাবু বইয়ের প্রথমেই যথাযথ উদাহরণের সাহায্যে এই কথাগুলো টেনে এনে পাঠকের রসাস্বাদনের সঠিক উপায় বাতলে দিয়েছেন। শুধু কোন সালে কী ধরনের দূরবীন বানানো হয়েছিল এবং তার সাহায্যে কী নতুন জ্যোতিষ্ক আবিষ্কৃত হয়েছিল, তার তালিকা বানানোর জন্য বই লেখার কথা ভাবেননি তিনি, এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রথমেই। পাঠকের মনে প্রশ্ন তুলে ধরা এবং সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে দূরবীনের উত্তরোত্তর উন্নতির গল্প বলেছেন তিনি।

    ফলে তাঁর বই পড়ে শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞানের সামগ্রিক ইতিহাস সম্বন্ধেও একটা ধারণা জন্মায় পাঠকের মনে। নতুন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর যন্ত্র বানান বিজ্ঞানীরা। আবার, অন্যদিকে, এইসব নতুন যন্ত্র খুলে দেয় প্রকৃতির একেকটা নতুন জানালা। তাদের সাহায্যে আবিষ্কৃত ঘটনা বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরে আরেকগুচ্ছ নতুন প্রশ্ন। যার উত্তর খুঁজতে ঘটে নতুন আবিষ্কার। বিজ্ঞানের ইতিহাসের এই মূল ধারাটি গৌতমবাবুর বইতে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।

    প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা থেকে আধুনিক পর্যায়ে উত্তরণের পরবর্তীকালে দূরবীনের গঠনে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছিল। প্রথমে লেন্স দিয়ে তৈরি হত, কিন্তু দেখা গেল সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে দূরবীনের সাইজ এমন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ল, যে সেগুলো সামাল দেওয়াই মুশকিল। তখন এসেছিল আয়নার তৈরি দূরবীন, নিউটনের চিন্তার সূত্র ধরে। তারপর কীভাবে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে আরও বড় মাপের দূরবীন তৈরি করা গেল, এই ঘটনাগুলো গল্পের মতো বলেছেন লেখক।

    সঙ্গে রয়েছে বিশেষ কয়েকজন বিজ্ঞানীর জীবন সম্বন্ধে টুকিটাকি খবর। প্রথম গ্রহাণু আবিষ্কার করতে গিয়ে ইতালির বিজ্ঞানী পিয়াজ্জিকে দূরবীনের টঙে চড়তে হয়েছিল। সেখান থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর পা ভেঙে গিয়েছিল। অথবা, ইউরেনাসের আবিষ্কর্তা উইলিয়াম হার্শেলের বোন ক্যারোলিনের গল্প। তিনি কীভাবে দাদাকে সাহায্য করতেন, পর্যবেক্ষণে মগ্ন দাদাকে খাবার নিজের হাতে খাইয়েও দিতেন, এবং কীভাবে তিনি নিজে এক যশস্বী জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন, সেই কাহিনী।

    পৃথিবীতে আধুনিক বড় দূরবীনগুলোর বর্ণনার পাশেই লেখক ভারতের অবস্থিত দূরবীনগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। এরপর এসেছে মহাকাশে পাঠানো দূরবীনের কথা। সেই প্রসঙ্গে চলে এসেছে এক্স-রশ্মি বা অবলোহিত রশ্মির দূরবীনের আলোচনা। এই ‘অদৃশ্য আলো’র তরঙ্গ আমাদের বায়ুমণ্ডল শুষে নেয়। তাই জ্যোতিষ্কগুলো থেকে বেরনো এক্স-রশ্মি অথবা অবলোহিত/অতিবেগনি রশ্মি পরীক্ষা করতে গেলে যন্ত্রপাতি পাঠাতে হয় বায়ুমণ্ডলের বাইরে। কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে।

    শুধু আলোর তরঙ্গই নয়, মহাকাশ থেকে যে শক্তিশালী পদার্থকণাগুলো আসে, বিজ্ঞানীরা সেগুলো ধরারও চেষ্টা করছেন আজকাল। এই নভোরশ্মি বা কসমিক-রে ধরার জন্য বানানো যন্ত্রগুলোও এক ধরনের দূরবীন। শুধু পদার্থকণাতেই আটকে থাকেননি বিজ্ঞানীরা। মহাবিশ্বের দেশকালে অর্থাৎ স্পেস-টাইমে যে তরঙ্গ ওঠে, সেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গও ধরা পড়েছে বিজ্ঞানীদের যন্ত্রে। সেটাকেও দূরবীন আখ্যা দিতে হয়। এই একেক ধরনের দূরবীনে ধরা পড়ে জ্যোতিষ্কের চরিত্রের নানা দিক। সেই তথ্য সাজিয়ে জ্যোতিষ্কগুলোর এক সম্যক রূপ বোঝার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক বিপ্লব এসেছে বলা যায়। তথ্যের সমাহারে, যন্ত্রপাতির বৈচিত্র্যে, প্রশ্নের গভীরতায়, সবকিছুতেই এক জোয়ার এসেছে। এই শুভক্ষণে দূরবীনের ইতিহাস নিয়ে একটি বাংলা বইয়ের খুব দরকার ছিল।

    বইটি কলেবরে বড় নয়, তাই পড়তে বেশি সময় নেয় না। কিন্তু তার রেশ থেকে যায় পাঠকের মনে। বিশেষ করে পরিশিষ্টে যেসব বিষয়ের বিশদ আলোচনা রয়েছে, সেগুলো কৌতূহলী পাঠকের মনকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে যাবে।

    বইয়ে মুদ্রণপ্রমাদ নেই বললেই চলে। বইয়ের শেষে কিছু জরুরি বইয়ের তালিকা রয়েছে, যা থেকে আরও চিন্তার খোরাক পাবেন পাঠকরা। বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য তো বটেই, বাংলার সাধারণ পাঠকের জন্য এমন একটি অনন্য বই উপহার দেবার জন্য লেখককে এবং প্রকাশককে ধন্যবাদ জানাই।

    - লেখক রামন রিসার্চ ইন্সটিটিউট, ব্যাঙ্গালোর-এ কর্মরত বিজ্ঞানী



    আকাশে মেলেছি চোখ
    গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
    ২০২২, বিভা পাবলিকেশন


  • পড়াবই | ১৭ জুলাই ২০২২ | ৪২৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অনিন্দিতা | ১৮ জুলাই ২০২২ ১৭:২১510007
  • বইটির দাম এবং পৃষ্ঠাসংখ্যা কত জানতে পারলে ভাল হত। 
  • শম্পা গাঙ্গুলি। | 27.131.211.3 | ২৪ জুলাই ২০২২ ১৫:১৭510230
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৭৬, দাম ১৯৯ টাকা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন