ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  রাজনীতি

  • শেখ হাসিনা ডিক্টেটর, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী না

    Irfanur Rahman Rafin লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | রাজনীতি | ০৮ জুন ২০২২ | ৪৮৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • হাসিনার সাথে ইন্দিরার কি কোন মিল আছে? আছে তো বটেই। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেহরু একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন গুরুত্বপূর্ণ মুজিব, তাই তাঁদের কন্যাদের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক!

    *

    নেহরুর কংগ্রেসকে সেকুলার মনে করার রীতি আছে। মুজিবের আওয়ামী লীগকেও। সেদিক দিয়ে ভাবলেও মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। 

    ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন, ১৯৭৭ সালে তা নিজেই তুলে নেন। মাঝখানের পর্বটি ছিল ভারতের ইতিহাসের প্রথম ডিক্টেটরশিপ। বাংলাদেশে হাসিনা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন নাই, তবে ২০১৪ আর ২০১৮ সালে নির্বাচনের নামে প্রহসন আয়োজন করে যেভাবে ক্ষমতায় আছেন, তাঁর শাসনামলকে অঘোষিত জরুরি অবস্থা আর তাঁকে de facto ডিক্টেটর বলা যেতে পারে।

    এইসব মিলের কারণে, বাংলাদেশের ভাবুক মহলে একটা তুলনা টানার প্রবণতা ইদানিং বেশ জনপ্রিয়। শেখ হাসিনাকে 'বাংলাদেশের ইন্দিরা গান্ধী' ভাবার প্রবণতা। কিন্তু আমি মনে করি এই প্রবণতাটা সমস্যাজনক।

    *

    সাগরিকা ঘোষের লেখা ইন্দিরা গান্ধীর বায়োগ্রাফিটা পড়েছি। এখন পড়ছি কে. এস. কমিরেড্ডির ম্যালভেলেন্ট রিপাবলিক। কুমি কাপুরের দ্য ইমার্জেন্সি পাঠ তালিকায় আছে।

    শেখ হাসিনারে নিয়া আমার পড়ার কিছু নাই। ২০০৮ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতায় আছেন। সে-বছর আমার বয়স ছিল ১৬, এখন ৩০।

    আমি একেবারে লিটারালি 'শেখ হাসিনার বাংলাদেশের' তরুণ।

    *

    তো, সমস্যা কী? 

    একাধিক।

    পয়েন্ট বাই পয়েন্ট উনাদের অমিলগুলো আমি দেখাব। আমার জ্ঞানবুদ্ধিঅভিজ্ঞতা অনুসারে। একমত হওয়া বা দ্বিমত জানানো পাঠকদের মর্জি।

    *

    এক, ইন্দিরার আগ পর্যন্ত কংগ্রেসে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ছিল। কিছুটা হলেও ছিল। নেহরু, প্যাটেল, শাস্ত্রী, কামরাজ এঁরা সবাই কংগ্রেসী। কিন্তু বহু বিষয়ে এঁদের মধ্যে দ্বিমত ছিল। সেই দ্বিমত সহ্য করার একটা সংস্কৃতি ছিল। ইন্দিরা কংগ্রেসের সেই অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ধবংস করেন। রাজীব গান্ধী অনওয়ার্ডস, কংগ্রেস একটা ইয়েস ম্যানদের পার্টিতে পরিণত হয়, এবং আজ পর্যন্ত সেই ধারা অব্যাহত আছে।

    আওয়ামী লীগে কোনোকালেই অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ছিল না। মুজিব আমলেও না। শুরু থেকেই এটা ইয়েস ম্যানদের পার্টি ছিল, বলাই বাহুল্য অন্য প্রধান দল বিএনপিও তাই।

    দুই, ইন্দিরার ডিক্টেটরশিপে সঞ্জয় গান্ধীর বিরাট ভূমিকা ছিল। বস্তি উচ্ছেদ বা জোরপূর্বক স্টেরিয়ালাইজেশনের মত সবচে সমালোচিত পদক্ষেপগুলোর পেছনে ইন্দিরার চেয়ে সঞ্জয়েরই বেশি দায় বলা যায়। শিখ দেহরক্ষীদের হাতে খুন হওয়ায় ইন্দিরার ভাবমূর্তি পরে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, সঞ্জয়ের ভাগ্যে তেমন কিছু জুটে নাই।

    কিউরিয়াসলি, শেখ হাসিনার ডিক্টেটরশিপে জয়ের ভূমিকা সামান্য। নাই বললেই চলে। প্রচারণার দিকটা হাসিনার বোনের ছেলে ববি দ্যাখেন, কিন্তু সার্বিক বিচারে, ওবায়দুল কাদের আর র‍্যাব-আর্মির ভূমিকা অনেক বেশি।

    তিন, ইন্দিরা মুখে অন্তত সমাজতন্ত্রের বুলি আওড়াতেন। যদিও সে ছিল বিচিত্র এক বড়লোকী সমাজতন্ত্র। কিন্তু হাসিনা মুখেও পুঁজিবাদের বিরোধিতা করেন না। তাঁর শাসনাধীন বাংলাদেশ নয়াউদার বিশ্বব্যবস্থায় পুরোপুরি সংযুক্ত। বিশ্বব্যাংকরা অকুণ্ঠ চিত্তে বাংলাদেশের 'উন্নয়নের' প্রশংসা করে। ইন্দিরার জরুরি অবস্থায় বৈপ্লবিকতার ভানটুকু অন্তত ছিল। শেখ হাসিনার বাংলাদেশে তা নেই, নির্জলা মূলধারা।

    চার, শেখ হাসিনাকে আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি। জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির পুরো আনুকূল্য তিনি পেয়েছেন। যেসময় থেকে তার ডিক্টেটরশিপের অনানুষ্ঠানিক শুরুয়াত হয়, সেসময় বিশ্ব একটা ব্যাপারে বিচলিত ছিল। সেটা হল ইসলামের লেবাসে আইএসের জঙ্গি তৎপরতা। ফলে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল সময়কালটা জঙ্গি দমনের কার্ড খেলে পার করা গেছে। এরপর ২০২০ সালে কোভিড মহামারী শুরু হল। 'বিশেষ পরিস্থিতি' ম্যান্ডেটহীন সরকারের সুবিধা করে দিল।

    এমন কোনো পরিস্থিতির আনুকূল্য পান নাই ইন্দিরা।

    *

    সবচে বড় অমিলটা হচ্ছে বিরোধীদের রাজনৈতিক পরিপক্কতায়।

    ইন্দিরার ডিক্টেটরশিপের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ঐক্য গড়ে উঠেছিল। জয়প্রকাশ নারায়ণ থেকে অটল বিহারি বাজপেয়ী আর জর্জ ফারনান্দেজ থেকে মোরারজি দেশাই পর্যন্ত বিচিত্র সব আদর্শের ধারকবাহকরা কৌশলগত কারণে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। এটা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা বিশেষ অধ্যায়।

    শেখ হাসিনার বাংলাদেশে তেমন কিছু ঘটে নাই। জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী, আর ইসলামপন্থীরা যে-যার-মত আন্দোলন করে। মাঝেমধ্যে মোর্চা আর জোট গড়ে, ভাঙে, কিন্তু সারা দেশ একটা সাধারণ ন্যুনতম গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হয় না।

    আমার ধারণা, এই ফারাকের মূলে সাংস্কৃতিক রাজনীতি।

    খুশবন্ত সিংয়ের মত দুয়েকজন জরুরি অবস্থার পক্ষে সাফাই গাইলেও মোটা দাগে ভারতের সাংস্কৃতিক বন্দোবস্ত ইন্দিরার বিরোধিতা করেছিল। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বন্দোবস্ত প্রায় পুরোপুরি বিকিয়ে গেছে। এদের মধ্যে ন্যুনতম মাত্রায়ও প্রতিরোধের বাসনা নাই।

    সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় না।

    বাংলাদেশের কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের সিংহভাগের কাজ হইল শেখ হাসিনার ডিক্টেটরশিপের পক্ষে যুক্তি সরবরাহ করা। বা ডিক্টেটরশিপের একটা স্যানিটাইজড চেহারা নির্মাণ করা। এটা শুধু জেলজুলুমের ভয়ে করে না তারা, করে অতিলোভের কারণে, ডিক্টেটরশিপের পক্ষে সাফাই গাওয়া যেহেতু আর্থিকভাবে লাভজনক।

    *

    ফলে, শেখ হাসিনা 'বাংলাদেশের ইন্দিরা গান্ধী' না। দুজন ভিন্ন সময়ের ও ভিন্ন বাস্তবতার ডিক্টেটর। তাই তাঁদের রাজনৈতিক পরিণতিও, সম্ভবত, ভিন্ন হবে।
  • আলোচনা | ০৮ জুন ২০২২ | ৪৮৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • দুর্জয় | 182.16.158.37 | ০৯ জুন ২০২২ ১৩:১৭508677
  • গণতান্ত্রিক ধারায় দল তো এদেশে ছিলোই না,গণতান্ত্রিক ধারায় যে নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকার হয় তা না-দেখা একটা জেনারেশন ইতোমধ্যে তারুণ্য পার করছে এইটুকুও কি কম অবদান! 
  • Ranjan Roy | ০৯ জুন ২০২২ ১৩:৪৫508679
  • ভালো লেগেছে। 
  • guru | 103.211.20.81 | ০৯ জুন ২০২২ ২০:২২508706
  • ভাই খুব ভালোই লিখেছেন | কিন্তু একটা কথা মাথাতে রাখতে হবে আপনাদের যে হাসিনার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ বিশাল আর্থিক বৃদ্ধি অর্জন করেছে যা অন্য কোনো ভাবেই সম্ভব হতোনা |
     
    ঘটনা হলো বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিলো একটি ডিকটেটরশীপ এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে | কিন্তু এটা ইতিহাসের কোনো রসিকতা যে আজকে যেই দলের হাতে ৭১ এর যুদ্ধের নেতৃত্ব ছিল একটি ডিকটেটরশীপ এর বিরুদ্ধে , আজকে সেই দলটি নিজেই একটি ডিকটেটরশীপে পরিণত হয়েছে |
     
    অথচ ডিকটেটরশীপ না হলে কি এতো আর্থিক বৃদ্ধি বাঙলাদেশে সম্ভব হতো ? 
     
    আপনার মতামতের অপেক্ষাতে রইলাম ভাই |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট প্রতিক্রিয়া দিন