ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বারিধারার কথা

    Mousumi Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ জানুয়ারি ২০২২ | ২৪৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • জানলার কাঁচ ঝাপসা হয়ে আছে। অঝোরধারায় বৃষ্টি চলছে গত রাত থেকে। সন্ধ্যার একটু পর থেকেই ঝিপঝিপিয়ে শুরু হয়েছিল।  রাত বাড়তেই বৃষ্টিও বাড়তে থাকল, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। গরম ধোঁওয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসলাম রোজকার মতোই জানলার পাশের  বেতের চেয়ারটায়। পৌষ মাসের শেষের দিক। ঠাণ্ডা ছিলই। বৃষ্টিতে আরোও জাঁকিয়ে বসেছে ঠাণ্ডা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকতে হয়েছে ঠাণ্ডায়। গরম চায়ে চুমুক দিতেই প্রাণ জুড়িয়ে গেল যেন।  আজ আর কোনোও কাজেই আমার মন বসবে না। এমন সব দিনে কুঁড়েমি পেয়ে বসে আমাকে। সব কাজ বন্ধ করে মনটা আমাকে জোর করে জানলার সামনে বসিয়ে রাখতে চায়। 
     
    শুকনো কাপড় দিয়ে জানলার কাঁচটা মুছে দিতে ঝাপসা ভাব কিছুটা কেটে গেল। অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে।  পাহাড়ের ঢালের শাল, মহুয়ার  গাছের পাতায় লাল ধূলো জমেছিল এতদিন। বৃষ্টিতে ধুয়ে আবার নতুনভাবে যেন সেজে উঠেছে ওরা।  বড় গাছগুলোর তলার ঝোপগুলোকে পার করে ঝলমলে আবহাওয়াতেও তেমন রোদ পৌঁছায় না, আজ তো ঘন অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে সেখানে।  জঙ্গলের বুক চিরে চলে যাওয়া  নববধূর সিঁদুর মাখা সরু সিঁথির মতো পথটা আজ ফাঁকা।  আদিবাসীরা যায় ঐ পথেই শালপাতা কুড়াতে। বাংলোর পিছনের জঙ্গলে পথ হারিয়ে যাওয়া পাহাড়ি ঝোরার আজ বড় তাড়া। ঝরঝর করে বয়ে চলেছে সে। ঘরে বসেই বুঝতে পারছি।  মেঘ গুড়গুড় করছে থেকে থেকে‌। 
     
    সামনের জানলার কাঁচে বৃষ্টির ধারা নানা  সুন্দর  নকশা তৈরী করে চলেছে। ছোট ছোট ধারায় নেমে এসে  একে অন্যের সঙ্গে মিশে  বেয়ে চলে যাচ্ছে। অলসভাবে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলাম, ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে বসে। আজ নড়তেই ইচ্ছে করছে না আমার। বাড়িও ফাঁকা। তিনি গেছেন কয়েকদিনের জন্য শহরে, কাজে। সঙ্গী আছে লতিকাদি। দুজনে মিলে আজ খিচুড়ি আর ডিমভাজা খাব। এমন দিনে শুধু ভালো লাগে এমনভাবে বৃষ্টি দেখতে,  আকাশ, গাছপালার মনকে জানতে আর  দাড়িওয়ালা বুড়োর গানে মজে থাকতে। 
     
    নিজের খেয়ালে মজে আছি। হঠাৎ যেন কে ডাক দিল!  এসো, এসো। যাবে নাকি আমাদের সঙ্গে?
     
    কে তুমি?
     
    –আমি বারিধারা। সেই থেকে বসে দেখছ, চিনতে পারলে না?
     
    –ও ! কিন্তু কোথায় যাব? কোথায় তুমি চলেছ?
     
    –আমি কেন? আমরা বল। মিলেমিশে এখান থেকে গিয়ে রাস্তা বেয়ে, মাঠ পেরিয়ে চলেছি পাহাড়ি ছোট্ট নদীর  সঙ্গে দেখা করতে। 
     
    নদীর সঙ্গে দেখা?
     
    হ্যাঁ তো। ঐ নদীতে জঙ্গল আর জংলা পাহাড়ের বারিধারারাও আসছে তো। তারপর সকলে মিলে নদীর জলের সঙ্গে হুটোপুটি করে ,মজা করে , গাঁয়ের পর গাঁ , মাঠ, ঘাট সব পার করে যাব  বড় নদীতে। তারপর সেখান থেকে  সাগরে। 
    চলো, যাবে কি?
     
    – সাগর? সে তো অনেক দূর!
    – তাতে কি? এমনভাবেই তো যেতে হয় গো! সকলে মিলেমিশে গেলে সে কি আর এমন কাজ?
     
    – তা সাগরে পৌঁছিয়ে কি করবে? বিশাল সাগরে  হারিয়েই যাবে তো!
     
    হারাবো কেন?  আরোও অনেক জলধারার  সঙ্গে মিশে থাকব।  এরপর সূর্যের  আলিঙ্গনের উত্তাপে  মেঘ হয়ে আকাশে ভাসব। তুমি দেখবে বিভোর হয়ে।   আবার ঝরে পড়ব টুপটাপ।  মাঠেঘাটে, গাছের পাতায় শিশির হয়ে থাকব।   কুয়াশার চাদর দিয়ে জংলা পাহাড়কে জড়িয়ে রাখব। বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ব আবারও তোমার জানলায়, এদিকে, সেদিকে। উঁচু  পাহাড়ের চূড়াকে বরফের সাজে সাজাব। জানি আমি, তুমি এমন সাজ দেখতে খুব ভালোবাস। রোদের তাপে সেই বরফ গলে গেলে ঝর্ণা হয়ে,  নদী হয়ে বইতে থাকব। আবার পৌঁছে যাব সাগরে।  এই আমিই বারেবারে নানারূপে চারিদিকে, দিনের পর দিন পার করে চলতে থাকব।
     
    – এত্তোসব তুমি করবে বারিধারা?
     
    বারিধারা বলে উঠল,  আমি না গো!  আমরা , আমরা। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল, জানলার কাঁচ বেয়ে জলধারা ঝরঝরিয়ে বয়ে চলল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Kasturi Das | ১৬ জানুয়ারি ২০২২ ০৯:৫৩502703
  • বাহ্, খুব ভালো লাগলো পড়ে। এমন বৃষ্টি মেদুর দিনের বর্ণনায় মন ঝর্ণার মত সুন্দর হয়ে গেল। 
    আরো লেখো এমন লেখা।
  • স্নিগ্ধা দত্ত | 123.136.184.147 | ১৬ জানুয়ারি ২০২২ ২২:৫৫502714
  • বেশ আমেজ ছড়ানো মন ভরানো !! 
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন