• হরিদাস পাল  অপার বাংলা

  • নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর রংপুর-ভাষণের প্রতিলিপি

    Somnath Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    অপার বাংলা | ১৯ নভেম্বর ২০২১ | ৩৬১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • অভিভাষণ

    ৩০শে মার্চ ১৯২৯ রংপুরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ।

    মাননীয় অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি মহাশয়, সমবেত ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

    প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মিলনীর সভাপতিত্বে বরণ করিয়া আপনারা আমার প্রতি যে অসীম স্নেহ ও অতুলনীয় সম্মান প্রদর্শন করিয়াছেন তাহার জন্য আমার অন্তরের ঐকান্তিক কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। স্বর্গাদপি গরীয়সী জন্মভূমির সেবক মাত্রই আপনাদের স্নেহের পাত্র এবং গত কয়েক বৎসর যাবৎ দেশমাতৃকার সেবার ভিতর দিয়া নিজের জীবন সার্থক ও সফল করিবার চেষ্টা করিয়া আসিতেছি। বিদেশি আমলা-তন্ত্র মাতৃসেবার প্রচেষ্টাকে সন্দেহপুর্ণ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করিয়া থাকে এবং তারই জন্য আমলাতন্ত্রের নিকট মাতৃসেবককে নানাপ্রকার লাঞ্ছনা ও অত্যাচার ভোগ করিতে হয়। কিন্তু লাঞ্ছিত সেবকের ম্লান ললাটে আপনারা সম্মান ও প্রীতির রক্তচন্দন টিকা পরাইয়া থাকেন এবং ভাব-প্রবণ বাঙালি জাতির স্বাভাবিক উচ্ছ্বাসের সহিত তাহার উপর স্নেহ ও শুভ-ইচ্ছা বর্ষণ করিয়া থাকেন। তথাপি এ কথা বলিতে আমি বাধ্য যে ব্যক্তিগত যোগ্যতার গুণে আমি আজ এ-আসন গ্রহণ করি নাই। আমাকে সভাপতিত্ব প্রদান করিয়া আপনারা সম্মান ও আস্থা দেখাইয়াছেন বাংলার তরুণ জাগ্রত শক্তির প্রতি; এই অনুষ্ঠানে আমি আজ নিমিত্ত মাত্র। আমি এখনো যৌবনের সীমানা অতিক্রম করি নাই এবং অগণিত মুক্তিপথযাত্রীর মধ্যে আমিও একজন পথিক। তাই বলি, হে বাংলা মায়ের সন্তানবৃন্দ, আশীর্বাদ করুন যেন আজিকার এই প্রীতি ও সম্মানের কথঞ্চিৎ যোগ্য হইতে পারি; যৌবনের প্রারম্ভে যে পথ আশ্রয় করিয়াছি, সারাটি

    জীবন যেন ক্লৈব্য, শ্রান্তি ও মোহের হাত এড়াইয়া সেই পথেই বীর পদবিক্ষেপে চলিতে পারি।

    যে স্থানে আজ আপনারা সমবেত, কত ইতিহাস তাহার আছে। কত রাগোজ্জ্বল প্রভাত ও কত ঘোর অমানিশার কাহিনি তাহার অঙ্গে অঙ্গে জড়াইয়া আছে, কত সভ্যতার কাহিনি এই ধূলিতে তাহার চরণ চিহ্ন রাখিয়া গিয়াছে। সেই সমৃদ্ধির স্মৃতি বাঙালির মানসপট হইতে লুপ্তপ্রায়। কিন্তু আত্মবিস্মৃতির ভিতর দিয়া জাতির নবজাগরণ আসিতে পারে না। তাই আসুন, স্মৃতিবহুল এই পুরাতন ও পবিত্র বরেন্দ্রভূমে আমরা একবার কালের অবগুণ্ঠণ সরাইয়া রংপুরের অতীত গৌরবের পর্যালোচনা করি।

    প্রাচীন কিংবদন্তী এই অঞ্চলের সহিত দেবাদিদেব মহাদেবের লীলা বিজড়িত করিয়া রাখিয়াছে। এই শিব ধামে মুক্তিকামী বাঙালিকে আপনারা আজ আহ্বান করিয়াছেন। কালের চক্রান্তে অমৃতের পুত্রগণ শিবত্ব হারাইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে; ‘তাই স্মৃতি দিয়ে ঘেরা’ এই অতীতের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আমরা শব-সাধনার জন্য সম্মিলিত হইয়াছি।

    মহাভারতের যুগে রংপুর প্রাগজ্যোতিষপুরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভগদত্ত ছিলেন রংপুরের অন্যতম রাজা এবং তিনিই নাকি রাজপ্রাসাদ নির্মাণের পর ‘রঙ্গপুর’ নামকরণ করিয়াছিলেন। পরবর্তী যুগে বিখ্যাত পালবংশীয় অধিপতিগণ রংপুর অঞ্চলে শাসন বিস্তার করিয়াছিলেন এবং তাহাদের মধ্যে ধর্মপালের নাম উল্লেখযগ্য। ধর্মপালকে পরাজিত করিয়া মানিকচন্দ্র তাঁহার রাজত্ব স্থাপন করেন। মানিকচন্দ্রের গান আজও নানাস্থানে গীত হইয়া থাকে। এই-সব গানের ভিতর দিয়া উত্তরবঙ্গের অধিবাসীগণ মানিকচন্দ্রের পত্নী ময়নামতির অলৌকিক ক্ষমতার কথা, তাহার পুত্র গোপীচন্দ্রের ও তদীয় পত্নীদ্বয় অদুনা-পদুনার হৃদয়গ্রাহী কাহিনি শুনিয়া থাকেন। তারপর যখন প্রবল পরাক্রান্ত নীলধ্বজবংশীয় রাজগণ রাজত্ব করেন, তখন রংপুর তাঁহাদের অন্যতম রাজধানী ছিল।

    মুসলমান যুগে হুসেন শাহের মতো বিচক্ষণ ও ধর্মপরায়ণ নৃপতি এই অঞ্চলে শাসন করিয়াছিলেন। মুসলমান যুগের অবসানে ও ব্রিটিশ প্রারম্ভে যখন অরাজকতা সৃষ্টি হইয়াছিল তখন ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী প্রভৃতির নেতৃত্বে শত শত সন্ন্যাসী এবং সহস্র সহস্র নির্ভীক ও স্বদেশানুরাগী বঙ্গবাসী স্বাধীনতার জন্য প্রাণপাত করিয়াছিলেন। এই-সব অলৌকিক ঘটনা অবলম্বন করিয়া, বর্তমান যুগে বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ ও ‘দেবী চৌধুরানী’ – প্রণয়নের দ্বারা নবজাগরণের বোধন করিয়াছেন। জাতীয়তার প্রধান পুরোহিত - কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রকে এই রংপুর চিন্তার ও সৃষ্টির কত উপকরণ যোগাইয়াছে! কে বলিতে পারে যে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভারতের যে স্বপ্ন সত্যদ্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়াছিলেন এবং তাহার অতুলনীয় লেখনী সঞ্চালনের দ্বারা তিনি যাহা সাহিত্যে অমর করিয়া গিয়াছেন - সেই স্বপ্ন তিনি রংপুরে দেখেন নাই?

    রংপুরের ইতিবৃত্ত

    আলোচনা করিতে গেলেই মনে পড়ে বরেন্দ্রভূমের কথা, গৌড়ের স্বপ্নময়ী স্মৃতি, পাল সাম্রাজ্যের কাহিনি; সহস্রাধিক বৎসর পূর্বে যে বরেন্দ্রভূমে বাংলার রাজগণের অপূর্ব শৌর্যবীর্য দেখা গিয়াছিল কী শিল্প,কী সাহিত্য, কী পাণ্ডিত্য – সকল বিষয়ে একদিন যে দেশে বাঙালি প্রতিভার চরম বিকাশ হইয়াছিল – আজিকার এই রংপুর সেই বরেন্দ্রভূমেরই অন্যতম অংশ – শৌর্যবীর্যের গৌরবময় লীলাস্থল।

    এই বরেন্দ্রভূমে সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে প্রজাশক্তি ও রাজশক্তির মধ্যে বিপুল সংঘর্ষের ফলে অরাজকতার সৃষ্টি হইয়াছিল। সে সংঘর্ষে জয়ী হইয়া প্রজাবর্গই নিজ মনোনীত ব্যক্তি গোপাল দেবকে সিংহাসনে বসাইয়াছিল এবং দেশ হইতে মাৎস্যন্যায় বা অরাজকতা বিদূরিত করিয়াছিল। তারপর পালবংশের অন্যতম রাজা মহীপালের অত্যাচারে প্রজাবৃন্দ বিদ্রোহী হইয়া উঠে এবং মহীপাল সিংহাসনচ্যুত ও নিহত হন। প্রজামণ্ডলী কৈবর্ত জাতীয় একজন প্রতিভা সম্পন্ন ব্যক্তিকে রাজপদে অভিষিক্ত করেন। তাহার নাম দিব্যক। কৈবর্ত জাতীয় রাজগণ কিছুকাল শাসন করার পর পালবংশীয়েরা আবার বাহুবলে রাজ্য ফিরে পান। পালবংশীয় রাজা দেব পালের আমলে বাঙালি হিমাদ্রি হইতে বিন্ধ্যাচল এবং পূর্ব সাগর হইতে পশ্চিম সাগর পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। “এই দেব পাল উৎকল-কুল উৎকলিত করিয়াছিলেন, হুণ গর্ব খর্ব করিয়াছিলেন, দ্রাবিড় গুর্জরনাথের দর্প চূর্ণ করিয়াছিলেন, সমুদ্র মেখলাভরণা বসুন্ধরা উপভোগ করিয়াছিলেন।“ (গরুড় স্তম্ভ লিপি, ১৩শ শ্লোক)। এই সাম্রাজ্যের রণতরী ভারতের বিভিন্ন নদ-নদীতে গমনাগমন করিত – সুদূর সিংহল সুমাত্রা যবদ্বীপ পর্যন্ত বাংলার পণ্যবাহী -অর্ণবপোত চলিত। কথিত আছে যে বাঙালির এই দিগ্বিজয় বার্তা শ্রবণ মাত্র –“উৎকলাধীশ অবসন্ন হৃদয়ে রাজধানী পরিত্যাগ করিতেন – আর প্রাগজ্যোতিষের অধীশ্বর রাজাদেশ মস্তকে ধারণ করিয়া সন্ধি–বন্ধন করিতেন। বাঙালির বিজয় গৌরবে দাক্ষিণাত্যের শিল্প রুচি অতিক্রান্ত হইয়াছিল, লাট দেশের কমনীয়কান্তি আবিল হইয়াছিল, অঙ্গদেশ অবনত হইয়া পড়িয়াছিল; কর্ণাটের লোলুপ দৃষ্টি অধোমুখে অবস্থিত থাকিতে বাধ্য হইয়াছিল, মধ্যদেশের রাজ্যসীমা সংকুচিত হইয়া গিয়াছিল।”

    এই হইল প্রায় সহস্র বৎসর পূর্বের কথা। এ কীটদ্রষ্ট জীর্ণ ইতিহাস আজিকার বাঙালির নিকট হয়তো নিশাশেষের সুখ-স্বপ্নের ন্যায় প্রতীয়মান হয়।

    বাঙালির এই জাতীয় সভায় দাঁড়াইয়া বাঙালির কর্তব্য সম্বন্ধে কিছু বলিবার পূর্বে আমি তাই একবার আলোচনা করিতে চাই – বাংলার ইতিহাসের ধারা, বাংলার স্বরূপ, বাংলার আদর্শ ও সাধনা। বাংলাকে যে চেনে না – বাঙালির সুখদুঃখের কাহিনি ও আশা-আকাঙ্ক্ষার সংবাদ যে রাখে না, সে বাঙালিকে তাহার কর্তব্য সম্বন্ধে কী পরামর্শ দিতে পারি?

    সমগ্র বাংলা জেলা-মহকুমা প্রভৃতি ভাগ-বিভাগ সত্ত্বেও এক অখণ্ড পূর্ণাঙ্গ দেশ। শীর্ষে ধবল তুষার- কিরীট হিমাদ্রি; চরণদেশ কলহাস্যময় চির চঞ্চল বারিধি; বক্ষে গঙ্গা- পদ্মা- করতোয়া- ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি কলুষহর তরঙ্গ নদ নদীর বিচিত্র শোভা। এই বৈচিত্রের সমাবেশের ফলে আজ আমাদের বঙ্গজননী এক অখণ্ড নিখুঁত রূপের মধ্যে আমাদের নিকট প্রকট হইয়াছেন।

    বিভিন্ন জেলায় সামান্য সামান্য পার্থক্য সত্ত্বেও বাংলার ইতিহাস, বাংলার সমাজ, বাংলার ধর্ম – এক অখণ্ড সত্য। তাই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন একদিন বলিয়াছিলেন – ‘বাংলার মাটির মধ্যে এক চিরন্তন সত্য নিহিত আছে। সেই সত্য যুগে যুগে আপনাকে নব নব ভাবে প্রকাশিত করিতেছে। শত সহস্র পরিবর্তন আবর্তন ও নিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরন্তন সত্যই ফুটিয়া উঠিয়াছে। সাহিত্যে, দর্শনে, কাব্যে, যুদ্ধে বিপ্লবে, ধর্মে ক্রমে, অজ্ঞানে অধর্মে, স্বাধীনতায় পরাধীনতায়, সেই সত্য আপনাকে ঘোষণা করিয়াছে, এখনো করিতেছে। সে যে বাংলার প্রাণ- বাংলার মাটি, বাংলার জল সেই প্রাণেরই বহিরাবরণ।’

    বাঙালির সভ্যতা একদিনে ফুটিয়া উঠে নাই। ফুল কখনো একদিনে ফোটে না। তাহার বিকাশের জন্য অতীতের অনেক আয়োজন আবশ্যক। শতদলরূপী যে বাঙালি সভ্যতা, তার প্রত্যেক দলের মধ্যে আছে অনেক গান, অনেক কথা, সুখ দুঃখের অনেক করুণ কাহিনি। তাহার গন্ধে অনেক কালের অনেক মধুময় স্মৃতি, তাহার প্রতি বৃন্তে আছে বহু শতাব্দীর অনুভুতি চিহ্ন।

    বাংলার একটা চিরন্তন আদর্শ আছে। বিশ্ব দরবারে শুনাইবার বাঙালির একটি চিরন্তন বাণী আছে। সমগ্র বাঙালি জাতির যে অখণ্ড ইতিহাস তাহা সেই শাশ্বত বাণীকে প্রকট করিবার জন্য চিরকাল চেষ্টা করিয়াছে, করিতেছে ও করিবে। আজ আমরা আমাদের ইতিহাসের ধারা ভুলিয়া যাইতে পারি কিন্তু বাংলার ইতিহাস ও বাংলার প্রাণধর্ম কখনো আমাদের ভুলিবে না। বাংলার প্রাণ চায় সর্বদা- বৈচিত্র্য, সমন্বয় ও সাম্য। বাঙালি সব কাজের মধ্যে বৈশিষ্ট্য ও নতুনত্ব ভালবাসে। সে স্বভাবত গতিশীল ও পরিবর্তনাভিলাষী – ‘বিপ্লবী’ বলিলেও বোধহয় অত্যুক্তি হইবে না। অতি প্রাচীনকাল হইতে এমনকী বৈদিক যুগ হইতে, আজ পর্যন্ত এই কথার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যায়।

    বৈদিক যুগে মগধ, বঙ্গ প্রভৃতি পূর্বাঞ্চলকে ‘কিরাত’দেশ বলা হইত। এই প্রদেশ আর্য সভ্যতার গণ্ডীর বাহিরেই ছিল, এবং এই দেশে কোন আর্য আসিলে সে পতিত হইত। এই অঞ্চলের অধিপতিবৃন্দের সহিত আর্যদের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চলিত। ‘দস্যু’, অনার্য প্রভৃতি আখ্যা আর্যদের নিকট পাইলেও এই অঞ্চলের অধিবাসীরা যে অত্যন্ত সুসভ্য ছিল তাহা বেদ ও মহাভারত পাঠ করিলে বুঝা যায়। বৃহত্তর মগধে (বা পূর্বাঞ্চলে) আর্যসভ্যতা ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করিলে স্মৃতির বিধান পরিবর্তন হইল এবং তখন পূর্বাঞ্চলে আসিলে আর্যরা পতিত হইত না। কিরাতদেশে গমনাগমনের বাধা উঠিয়া যাওয়ার পর এই প্রদেশের লোকেরা ক্রমশ আর্যসমাজে স্থান পাইল।

    আর্যসভ্যতার সংস্পর্শ লাভ করিয়া যে শিক্ষা (or culture) পূর্বাঞ্চলে গড়িয়া উঠিল – আমরা তাহার নাম দিতে পারি ‘মাগধী শিক্ষা’(Magadhi Culture)। এই শিক্ষার কেন্দ্র প্রথমে ছিল মগধ দেশে কিন্তু পরবর্তী যুগে মগধ দেশ উত্তরাপথের সহিত সম্পূর্ণ রূপে মিশিয়া গেলে বঙ্গদেশ মাগধী শিক্ষার উত্তরাধিকারী হইল এবং মাগধী শিক্ষার নূতন কেন্দ্র বাংলায় উদ্ভূত হইল। কিছুকাল বৈদিক সভ্যতার প্রভাবে বাস করিয়া পূর্বাঞ্চলবাসীরা বৈদিক ধর্মকাণ্ড ও বর্ণাশ্রম ধর্ম আর সহ্য করিতে পারিল না। দুইটি বিপ্লবের ধারা তখন এই প্রদেশ হইতে প্রবাহিত হইল – জৈন ধর্ম ও জৈন মতবাদ এবং বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধ মতবাদ। এই বিপ্লবের ভিতর দিয়া বৃহত্তর মগধ চেষ্টা করিল সমাজের উচ্চ প্রাচীর ধ্বংস করিয়া সাম্য প্রতিষ্ঠা করিতে এবং বেদের পারলৌকিকতা ও কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে ইহজীবনে নিষ্কাম কর্ম ও সেবার দ্বারা শ্রেষ্ঠ মানবত্ব লাভ করিতে। বহু শতাব্দী পরে বৈষ্ণব কবির অনিন্দ্যনীয় ভাষায়ও এই মানবতার আদর্শ প্রচারিত হইয়াছিল - ‘শুনহ মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’

    এই মানবতা ও সাম্যবাদের আদর্শ রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও প্রকট হইল। বৌদ্ধ যুগে বৃহত্তর মগধে গণতন্ত্রমূলক শাসনপদ্ধতি প্রবর্তিত হয়। ঐতিহাসিকগণ এই যুগের ইতিহাস হইতে প্রায় ৮০টি গনতন্ত্রমূলক রাজ্যের নাম উদ্ধার করেন। যে জৈন ধর্ম আজ মাত্র ভারতের পশ্চিম প্রান্তে আশ্রয় পাইয়াছে – বাঙালি আজ যে ধর্ম সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করিয়াছে, সেই জৈন ধর্মের মহাপুরুষ তীর্থংকরগণ যে অধিকাংশই আমাদের অর্থাৎ অনার্য, মগধ -বঙ্গ প্রদেশের মধ্যে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, সে সংবাদ কি আজকাল রাখি? জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের ভিতর দিয়া বেদ ও বৈদিক ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যে প্রদেশে প্রথম দেখা দিয়াছিল সেখানকার জল ও মাটি যদি বিপ্লবের অনুকুল হয় তবে সে অপরাধ কাহার?

    নূতন ধর্ম ও নূতন আদর্শের প্রেরণায় পূর্বাঞ্চলবাসীরা দিগ্বিজয়ে বাহির হয়। ইহাই বোধহয় ভারতের প্রথম অভিযান – যদিও এই অভিযানের অস্ত্র ছিল তরবারি নয় – জ্ঞানের প্রদীপ! জ্ঞানের প্রদীপ হস্তে লইয়া এই প্রদেশের লোকেরা মেঘস্পর্শী পর্বতরাজি ও উত্তাল তরঙ্গসংকুল সমুদ্র পার হইয়া দেশদেশান্তরে ছড়াইয়া পড়িল। নূতন সত্য, নূতন উদ্দীপনা লাভের ফলে ভারতীয় সভ্যতা সব দিক দিয়া ফুটিয়া উঠিল; কাব্য-শিল্প, দর্শন-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম-কর্ম কিছুরই অভাব রহিল না। যে সম্পদ সৃষ্টি করিয়া ভারতবাসী ধন্য হইল, তাহা লাভ করিয়া সমগ্র এশিয়া জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হইল। ভারতের ইতিহাসে সে এক অতুলনীয় গৌরবময় যুগ।

    এই সময়ে পূর্বাঞ্চলে জগদ্বিখ্যাত নালন্দাবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। চীন পরিব্রাজক ইউয়ান চয়াং এর গুরু, অদ্বিতীয় পণ্ডিত শীলভদ্র এবং জগদবিখ্যাত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান এই যুগে বাংলা দেশে জন্মগ্রহণ করেন। এতদ্ব্যাতীত কত শিল্পী, কত সাধক যে জন্মিয়াছিলেন কে তার হিসাব রাখে?

    বৈদিক যুগের পর ব্রাহ্মণ্য শক্তিকে খর্ব করিয়া ক্ষত্রিয় শক্তি যেরূপ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল – বৌদ্ধ যুগের পর আবার সেই ব্রাহ্মণ্যশক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইল এবং হিন্দু ধর্মের পুনরভ্যূদয় হইল। মৌর্যবংশীয় রাজগণ যেরূপ বৌদ্ধধর্ম প্রচারের সহায়তা করিয়াছিলেন পরবর্তী গুপ্তবংশীয় রাজগণ তদ্রূপ হিন্দু ধর্মের পুনরভ্যুত্থানে সহায়তা করিলেন। বৌদ্ধযুগে ভারতীয় জাতির যে সম্প্রসারণ (expansion) ঘটিয়াছিল তাহা কতকটা বাধা পাইলেও বন্ধ হইল না। সমুদ্র গুপ্তের শাসন কালে তাহার রাজ্য বিপুল ঐশ্বর্য, শক্তি ও বৈভব লাভ করিল। দেশের বাহিরে সুমাত্রা, যবদ্বীপ প্রভৃতি দ্বীপপুঞ্জে ভারতীয় সভ্যতা প্রচারিত হইতে লাগিল।

    প্রাচীনকাল কাল হইতে আরম্ভ করিয়া গুপ্তবংশীয় রাজগণের শাসনকাল পর্যন্ত মগধ ও বাংলাদেশ শিক্ষায় দীক্ষায় ধর্মে কর্মে একসূত্রে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু গুপ্তেরা হীনবল হইয়া পড়িলে দেশে অরাজকতা বা মাৎস্যন্যায় সৃষ্টি হইল। এই অরাজকতা যুগের শেষে মগধ ও বাংলা (বা গৌড় বঙ্গ) বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। বাংলা দেশে সুপ্তোত্থিত প্রজাশক্তি গোপাল দেবকে মনোনীত করিয়া তাঁহাকে সিংহাসনে বসাইল এবং পালবংশের অধীনে বাঙালি আবার বৌদ্ধ হইল। এই সময় হইতে একদিকে মগধ দেশ শিক্ষায় দীক্ষায় উত্তরাপথের সহিত মিশিয়া গেল এবং অপরদিকে বাংলা দেশ নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখিয়া স্বীয় অন্তর্দৃষ্টি ও অনুভূতির প্রেরণায় বৈশিষ্ট্যের পথে চলিতে লাগিল। মাগধী শিক্ষার (Magadhi Culture) কেন্দ্রগুলি মগধ দেশ হইতে বাংলা দেশে স্থানান্তরিত হইল। তারপর বাংলা দেশে অসংখ্য বৌদ্ধ বিহারের প্রতিষ্ঠা; শীলভদ্র ও দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের আবির্ভাব, বিখ্যাত ভাস্কর ধীমান ও বীৎপালের জন্ম। পালবংশের অধীনে বাঙালি শিক্ষায় আত্মপ্রতিষ্ঠ হইয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে দিগ্বিজয়ের অভিযানে বাহির হয়। যুক্ত মগধ-বাংলা মৌর্যবংশের অধীনে যেরূপ সম্প্রসারণ ও দিগ্বিজয় আরম্ভ করিয়াছিল, স্বতন্ত্র বাংলা তদ্রূপ পালবংশের অধীনে সম্প্রসারণ ও দিগ্বিজয় আরম্ভ করে। বাঙালির সাম্রাজ্য যে কতদূর বিস্তৃত তাহা বর্ণনা করিতে শ্রীযুক্ত রাজেন্দ্রলাল আচার্য মহাশয়ের ভাষায় বলিতে হয় - “সিংহাসনে আরোহণ করিয়া ধর্মপাল দেব ‘মনোহর ভ্রূভঙ্গি বিলাসে’ ভোজ, মৎস্য, কুরু, যদু, যবন, অবস্তী, গান্ধার ও কীর প্রভৃতি জনপদের নরপালদিগকে পরাজিত করিয়া ১(১,খালিম পুর শাস্ক,১২শ শ্লোক। ভাগল পুর শাস্ক,৩য় শ্লোক) কন্যাকুব্জের রাজ্যশ্রী লাভ করিয়াছিলেন। রাজসিংহাসন তখন সমগ্র উত্তরাপথের অধিপতি ইন্দ্রায়ুধের করতলগত ছিল। তাহার রাজ্য গান্ধার হইতে মিথিলার প্রান্তসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।”

    আমি ঐতিহাসিক নহি, তবুও আমার বিশ্বাস যে খ্রিস্টীয় অষ্টম অরাজকতার অবসানে পালবংশীয় রাজা গোপাল দেবের প্রতিষ্ঠায় স্বতন্ত্র বাংলা (বা গৌড়বঙ্গ)-র জন্ম। সহস্রাধিক বৎসর বাংলা নানা সুখ দুঃখের ভিতর দিয়া স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের পথে চলিয়া আসিতেছে।

    চিরকাল একভাবে যায় না, তাই পালবংশ শক্তিহীন হইয়া পড়িলে সেনবংশের রাজগণ গৌড়-বঙ্গের সিংহাসন অধিকার করেন।

    সেনবংশের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে হিন্দুধর্মের পুনরভ্যুত্থান আরম্ভ হয় এবং সেনবংশীয় রাজগণের রাজত্বকালে হিন্দু ও বৌদ্ধ সমাজের মধ্যে ভীষণ সংগ্রাম সৃষ্টি হয়। সেনবংশীয়েরা গৌড় -বঙ্গের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন বটে কিন্তু তাঁহাদের আমলে সামাজিক কলহ -বিবাদের দরুণ রাষ্ট্র শক্তিও দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল। তারপর পাঠান রাজ বক্তিয়ার খিলজি মগধ বিজয় করিয়া গৌড়-বঙ্গের পশ্চিমাংশ অধিকার করেন। পশ্চিম বঙ্গের প্রাসাদ -তোরণে যখন ইসলামের অর্ধচন্দ্র শোভা পাইতেছিল পূর্ব বঙ্গের প্রাসাদ শীর্ষ তখনো স্বাধীনতাসূর্যের শেষরশ্মি টুকু নিভিয়া যায় নাই। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী পরে অন্যত্র বাংলা (বা গৌড় -বঙ্গ) মুসলমান শাসনের অধীনে আসে।

    মুসলমান শাসনের সময়ে সাম্যবাদী বৌদ্ধ সমাজ দোটানার মধ্যে পড়িয়া গেল। অধিকাংশ ব্রাহ্মণ্য শক্তির পুনরভ্যুদয় পছন্দ না করিয়া এবং ইসলামের সাম্যবাদে আকৃষ্ট হইয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিল, অবশিষ্ট বৌদ্ধ হিন্দু সমাজে ফিরিয়া আসিল। বাহ্যত বৌদ্ধধর্মের ধ্বংস হইলেও বৌদ্ধধর্মের সাম্যবাদের লোপ হইল না। হিন্দু সমাজের ধমনীতে ক্রিয়া করিতে লাগিল। ইহারই ফলে স্মার্ত রঘুনন্দন নূতন হিন্দুসমাজ গঠন করিবার জন্য নূতন স্মৃতি প্রণয়ন করিলেন – তখন তিনি রাখিলেন মাত্র দুইটি বর্ণ – ব্রাহ্মণ ও শূদ্র। উদার দৃষ্টি লইয়া দেখিলে স্বীকার করিতে হইবে যে রঘুনন্দনের স্মৃতি সাম্যের দিকে বাংলার হিন্দু সমাজকে অনেক দূর লইয়া গিয়াছে। রঘুনন্দনের আরদ্ধ কার্য সমাধা করিবার উদ্দেশ্যে বাংলা দেশে বৈষ্ণব ও ব্রাহ্ম আন্দোলনের আবির্ভাব। সাম্য স্থাপনের প্রচেষ্টা এখনো সফল হয় নাই। ইহা সফল করিতে তিন দিক দিয়া কাজ করা সম্ভব –
    ১) জাতিভেদ একেবারে তুলিয়া দেওয়া। বৈষ্ণব ও ব্রাহ্ম আন্দোলন মোটের উপর এই চেষ্টাই করিয়াছে। ২) সব বর্ণকে শূদ্রে পরিণত করা। ৩) সব বর্ণকে ব্রাহ্মণ করা।

    প্রথম উপায় অবলম্বন করিয়া বাঙালি হিন্দুসমাজ সাফল্যমণ্ডিত হয় নাই। এখন সেই দিক দিয়া আরো চেষ্টা করা উচিত – না অবশিষ্ট দুইটি উপায়ের মধ্যে কোনো উপায় অবলম্বন করা বাঙালির কর্তব্য, তাহা বাঙালি হিন্দুর পক্ষে এখন চিন্তার বিষয়।

    যে জাতির মধ্যে রক্ত – সংমিশ্রণ বেশি পরিমাণে ঘটিয়াছে -সেই বাঙালি জাতিকে আজ রক্ত-সংমিশ্রণের ভয় করিলে চলিবে না। আজ আর অস্বীকার করা যায় না যে বাংলা দেশে মঙ্গোল, দ্রাবিড় ও আর্য রক্তের সংমিশ্রণ খুব ব্যাপকভাবে ঘটিয়াছে। বাঙালি চরিত্রে যে বৈচিত্র্য ও সার্বভৌমিকতা আমরা পাই তাহার অন্যতম কারণ যে এই রক্ত - সংমিশ্রণ নয় - একথা জোর করিয়া কে বলিতে পারে?

    দ্বাদশ শতাব্দীর পর যখন বাংলার রাজদণ্ড মুসলমানের হাতে, সে সময়েও বাঙালির প্রাণধারা সজীব ছিল এবং জীবনের নব নব দিকে নব নব ভাবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করিতেছিল। আমি পূর্বেই বলিয়াছি যে বাঙালি চায় সর্বদা বৈচিত্র্য, সমন্বয় ও সাম্য। সাম্য স্থাপনের জন্য ফল্গু নদীর ধারার মতো একটা প্রচেষ্টা যেমন আদিম কাল হইতে চলিয়া আসিতেছে – তদ্রূপ বাঙালি যখনই শক্তি সামর্থ্য পাইয়াছে তখনই সব দিক দিয়া নিজের ব্যষ্টির ও সমষ্টির জীবনকে ফুটাইয়া তুলিবার চেষ্টা করিয়াছে। একঘেয়ে জীবন বা একঘেয়ে নীতি সে কখনো পছন্দ করিতে পারে না। কিন্তু বৈচিত্র্য যেখানে সে সৃষ্টি করিয়াছে সেখানে সে একতার দৃষ্টি ও সমন্বয়ের ক্ষমতা হারায় নাই। চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে যে কয়টি বিচিত্র চিন্তার, সাধনার ও শিক্ষার ধারা বাংলা দেশে প্রসূত হইয়া বাঙালির প্রাণধর্মের অদ্ভুত পরিচয় দিয়াছে তাহার সমন্বয়ও বাঙালি সঙ্গে সঙ্গে করিতে পারিয়াছে। বাংলার বৈশিষ্ট্যের পরিচয় আমরা পাই – রঘুনাথ শিরোমণির নব্যন্যায়ে, গৌরাঙ্গের দ্বৈতাদ্বৈতবাদে, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের তন্ত্রসারে, রঘুনন্দনের স্মৃতিতে এবং জীমূতবাহনের দায়ভাগে। ন্যায়শাস্ত্রে, আইনশাস্ত্রে, বৈষ্ণব শাস্ত্রে ও সাধনায় এবং স্মৃতিতে বাঙালি নূতন ধারা প্রবর্তিত করিয়াছে। আর তন্ত্রসার সম্বন্ধে আপনারা তো জানেনই যে ইহা ‘গৌড়ে প্রকাশিতা বিদ্যা’। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীকে Golden age of Bengali Culture বলিলে অন্যায় করা হইবে না। চিন্তা ও সাধনার রাজ্যে বাঙালি যাহা আবিষ্কার বা সৃষ্টি করিয়াছিল তাহার পরিচয়, আমরা সমসাময়িক সাহিত্যে পাই। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস, মুকুন্দরাম ও ভারতচন্দ্র, কাশীরাম কীর্তিবাস ও রামপ্রসাদ প্রভৃতি অসংখ্য জ্যোতিষ্ক চতুর্দশ শতাব্দী হইতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলার সাহিত্য গগন আলোকিত করিয়া রাখিয়াছে।

    বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের দান

    বাংলা সাহিত্যের উন্নতি ও পরিপুষ্টি সাধনকল্পে মুসলমানগণও যে কী রূপ সাহায্য করিয়াছেন তাহার সামান্য উল্লেখ করিলেই বুঝা যাইবে মুসলমান বিজয়ের পর হইতে এদেশের প্রতি তাহাদের ভালবাসা ও মমত্ববোধ কী রূপ প্রবল ও আন্তরিক ছিল।

    পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগ হইতে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমাংশ পর্যন্ত সম্রাট হুসেন শাহ গৌড় দেশ শাসন করিতেন। তিনি বঙ্গ সাহিত্যের উৎসাহবর্ধক ছিলেন; তাহার রাজসভায় হিন্দু মুসলমান একত্রে শাস্ত্রের আলোচনা করিতেন, তিনি মহাপ্রভুকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন। ‘পরাগলি মহাভারত ও ছুটি খাঁর অশ্বমেধ পর্বে পত্রে পত্রে হুসেন শাহের গুণ বর্ণনা দৃষ্ট হয়।’ (‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’)

    পদাবলী সাহিত্য বাংলার অমূল্য সম্পদ। কিন্তু মাত্র হিন্দু বা বৈষ্ণব কবিগণের রচনার দ্বারাই যে এ সাহিত্যের সৃষ্টি হইয়াছে তাহা নহে। অন্যান্য রচয়িতা ব্যতীত আকবর ও আকবর শাহ আলি, কবীর, কমরালি, নসীর মামুদ, ফকির হবিব, কতন, সাল – বেগ, শেখ জালান, শেখ ভিখ, শেখলাল, সৈয়দ মরতুজা প্রভৃতি কবিগণের দান কিছুমাত্র তুচ্ছ নহে।

    এইরূপে সাহিত্য-প্রচার ও অনুরূপ সামাজিক রীতিনীতির মধ্য দিয়া হিন্দু ও মুসলমান সমাজের মধ্যে এক নিবিড় বন্ধনের সৃষ্টি হইয়াছিল -এ কথা যে কত সত্য তাহা সমসাময়িক সাহিত্য রচনার মধ্য দিয়াই স্পষ্ট প্রকাশিত হইয়াছে। হিন্দু কবি গল্প বর্ণনাকালে মুসলমান সমাজের নানা পরিচয় দিয়াছেন, মুসলমান কবিগণও তাঁহাদের কাজে রামায়ণ বা মহাভারত -সম্পর্কীয় বহু উপমা ও দৃষ্টান্ত প্রদান করিয়াছেন। “ক্ষেমানন্দ রচিত মনসার ভাসানে দৃষ্ট হয়, লখিন্দরের লোহার বাসরে হিন্দুয়ানী রক্ষাকবচ ও অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে একখানি কোরানও রাখা হইয়াছিল, রামেশ্বরের সত্যনারায়ণ মুসলমান ফকির সাজিয়া ধর্মের সবক শিখাইয়া গিয়াছেন। মীরজাফরের মৃত্যুকালে তাঁহার পাপমোচনের জন্য কিরীটেশ্বরীর পাদোদক পান করিতে দেওয়া হইয়াছিল, ইহা ইতিহাসের কথা। হিন্দুগণ যেরূপ পীরের সিন্নি দিতেন, মুসলমানগণও সেইরূপ দেব মন্দিরে ভোগ দিতেন।” (বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃঃ ৪৬৩); “হিন্দু মুসলমানের মৈত্রী ও সখ্যতা সম্বন্ধে এরূপ বহু দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। প্রায় আড়াই শত বৎসর পূর্বে কবি আলাওল রচিত ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে আলাওলের গভীর পাণ্ডিত্যের পরিচয় আছে। তাঁহার বিদ্যা বুদ্ধিতে যতদূর কুলাইয়াছিল, তিনি পদ্মাবতীতে তাহার কিছু বাদ দেন নাই।” (ঐ – পৃ ঃ ৪৬৮)

    এই সেদিন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির আমলেও মির্জা হুসেন আলি ও সৈয়দ জাফর খাঁ এই দুই সমসাময়িক কবি যে ভাবে বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের সেবা করিয়াছেন; তাহা এযুগের অনেকেরই দৃষ্টান্তস্বরূপ। বস্তুত বাংলার আধুনিক ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্য -ইহার উন্নতিসাধন কল্পে হিন্দু ও মুসলমান কী পরিমাণ সাহায্য করিয়াছেন তাহা নির্ধারণ করা সহজ নয় -এক কথায় বলা যায় জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির চেষ্টায়ই আজিকার সমাজ ও সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছে।

    জাতীয় অবসাদ ও নবজাগরণ

    অষ্টম শতাব্দী হইতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত অশ্রান্ত কর্ম প্রচেষ্টার ফলে বাঙালি যখন ক্লান্ত হইয়া পরিয়াছে তখন মহম্মদ বক্তিয়ার বাংলার দ্বার দেশে আঘাত করেন। বাহিরের সংঘাতে তন্দ্রা বিজড়িত নেত্র উন্মীলিত হইল, বাঙালি আবার সাধন-সমরে প্রবৃত্ত হইল। চতুর্দশ হইতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত অবিরাম সাধনার পর ক্লান্তির ছায়া বাংলাকে আচ্ছন্ন করিল। ঠিক এই সময়ে ইংরাজের তূর্যনিনাদ বাংলার প্রান্তরে শুনা যায়। পাশ্চাত্য শক্তির সংঘাতে বাঙালির শ্রান্তি ক্লান্তি আজ দূর হইয়াছে, সে আজ আত্মবিস্মৃতি ঘুচাইয়া নব নব কার্যে ব্যাপৃত।

    ক্লান্তি, অশ্রদ্ধা ও অবিশ্রাম আত্মকলহ দূর করিবার জন্য উনবিংশ রাজা রামমোহন নূতন আন্দোলন প্রবর্তিত করেন। গৃহবিবাদ ও মতভেদ ঘুচাইবার জন্য তিনি উদার বেদান্ততত্ত্ব প্রচার করেন। যে- সমস্ত আবর্জনা বহু শতাব্দী হইতে পুঞ্জীভূত হইয়া হিন্দু সমাজকে পূতিগন্ধময় করিয়া তুলিয়াছিল তাহা দূর করিবার জন্য সংস্কার আরম্ভ হইল এবং ব্রাহ্মসমাজ সৃষ্টি হইল। এই আন্দোলনের ফলে খ্রিস্টীয় ধর্ম ও খ্রিস্টীয় সভ্যতার আক্রমণ হইতে বাঙালি আত্মরক্ষা করিল।

    রামমোহনের বেদান্ত প্রচারের মধ্যে যে সমন্বয়ের সূচনা দেখিতে পাই তাহা উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে রামকৃষ্ণ – বিবেকানন্দের মধ্যে পূর্ণভাবে ফুটিয়া উঠিল। রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁহার জীবনের অপূর্ব ও অলৌকিক সাধনার বলে বিভিন্ন সাধন পদ্ধতির (যেমন কর্ম, ভক্তি, জ্ঞান) মধ্যে সমন্বয়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে (যেমন শাক্ত, বৈষ্ণব, যোগী, শৈব ইত্যাদি) সমন্বয় এবং বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে (খ্রিস্টীয় ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম ইত্যাদি) সমন্বয় স্থাপন করিয়া গেলেন। পরমহংসের অনুভুতি ও সাধনার উত্তরাধিকারী হইলেন প্রথমে স্বামী বিবেকানন্দ এবং তারপর সমগ্র বঙ্গবাসী। এই সমন্বয় স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন দিক দিয়া – কাব্যে, সাহিত্যে, দর্শনে, বিজ্ঞানে, ব্যাবসা-বাণিজ্যে, ক্রীড়া ও ব্যায়াম কৌশলে সৃষ্টি ও নূতন প্রচেষ্টা চলিতেছে। এতদ্বব্যতীত সমাজে পূর্ণ সাম্য স্থাপনের চেষ্টা চলিতেছে – এবং হিন্দু মুসলমান – নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালিজাতি সাহিত্য – সাধনায় প্রবৃত্ত হইয়াছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলমান সাহিত্যিকের দান যে কোন যুগে শ্লাঘা ও গৌরবময় বলিয়া পরিগণিত হইবে।

    পরমহংসের আরদ্ধ ও অসম্পূর্ণ কাজ স্বামী বিবেকানন্দ হাতে লইলেন। ভারতের বহুযুগসঞ্চিত জ্ঞানের সম্পদ দেশবিদেশে বিকীর্ণ করিবার জন্য তিনি প্রাচীন বৌদ্ধ পরিব্রাজকের মতো জ্ঞানের প্রদীপ হস্তে লইয়া সাগরপারে চলিলেন। এতদিন পরে ভারতবাসী ঘর ছাড়িয়া বাহিরের জন্য পাগল হইল; বিশ্বদরবারে দিবার মতো সামগ্রী নিজের ঘরে খুঁজিয়া পাইল, তারপর রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, রামানুজম, রামন প্রভৃতি ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক ও মনিষীগণ কতদিক দিয়া বিশ্বসভ্যতাকে পরিপুষ্ট করিয়াছেন। এইসব মহাপুরুষের আজীবন সাধনার ফলে আজ সমগ্র ভারতীয় জাতি বুঝিতে পারিয়াছে যে তাহাদের একটা আদর্শ আছে। বাঁচিবার একটা উদ্দেশ্য আছে – পৃথিবীতে জাতি হিসেবে একটা mission আছে।

    নিজের দেশের নবীন জাতি সৃষ্টির কাজও বিবেকানন্দ আরম্ভ করিয়াছিলেন। ব্যক্তির সমষ্টিই জাতি। খাঁটি তৈয়ারি না হইলে স্বাধীন ও বলবান জাতি জন্মিতে পারে না। তাই তিনি বলিলেন ‘Man making is my mission’- খাঁটি মানুষ প্রস্তুত করাই আমার জীবনের কর্তব্য। তারপর খাঁটি মানুষ সৃষ্টি করিবার জন্য তিনি শ্রেণী বিশেষের মধ্যে দৃষ্টি আবদ্ধ না রাখিয়া সমগ্র সমাজের মধ্যে খুঁজিতে লাগিলেন। তাঁহার সেই বাণী অমর হইয়া এখনো বাঙালির ঘরে ঘরে ঘুরিতেছে - “তোমরা উচ্চবর্ণেরা কি বেঁচে আছ ? … তোমরা শূন্যে বিলীন হও, আর নূতন ভারত বেরুক। জেলে, মালা, মুচি, মেথরের ঝুপড়ির মধ্যে হ’তে। বেরুক মুদির দোকান থেকে, ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে। বেরুক কারখানা থেকে, হাট থেকে, বাজার থেকে। … এরা সহস্র সহস্র বৎসর অত্যাচার সয়েছে, নীরবে সয়েছে তাতে পেয়েছে অপূর্ব সহিষ্ণুতা। … অতীতের কঙ্কালচয় – এই সামনে তোমার উত্তরাধিকারী ভারত!”

    এই তো বাংলার Socialism। এই Socialism – এর জন্ম কার্ল মার্ক্সের পুঁথিতে নয়। এই Socialism এর জন্ম ভারতের শিক্ষাদীক্ষা ও অনুভূতি হইতে।

    যে গণ-আন্দোলনের সূচনা বিবেকানন্দের উক্তির মধ্যে পাই তাহা আরো পরিস্ফূট হইয়াছে , দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বাণী ও সাধনার মধ্যে। দেশবন্ধু বলিয়াছেনঃ মনে করিয়ো না শুধু তোমার মধ্যে ও আমার মধ্যে নারায়ণের বিরাজ। সে অহঙ্কার একেবারে ছাড়িয়া দাও। যাহারা দেশের সারবস্তু , যাহারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া মাটি কর্ষণ করিয়া আমাদের জন্য শস্য উৎপাদন করে – যাহারা ঘোর দারিদ্র্যের মধ্যেও মরিতে মরিতে দেশের সভ্যতা ও সাধনাকে সজাগ রাখিয়াছে, যাহারা সর্বপ্রকার সেবায় নিরত থাকিয়া আজিও দেশের ধর্মকে অটুট ও অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছে- যাহারা আজিও , শুদ্ধ চিত্তে সরল প্রাণে, মর্মে মর্মে দেশের মন্দিরে মন্দিরে পূজা দেয়, মসজিদে মসজিদে প্রার্থনা করে- যাহারা জাতির জাতিত্বকে জ্ঞান কি অজ্ঞানে সাগ্নিকের অগ্নির মতো জ্বালাইয়া, জাগাইয়া রাখিয়াছে- যাহারা বাস্তবিকই এদেশের একাধারে রক্তমাংস ও প্রাণ- ‘উঠ, জাগ জাগ’- তাঁহাদেরই মধ্যে ‘নর -নারায়ণ’ জাগ্রত হউক।

    জাতি-গঠন-কার্যে প্রথম সোপান খাঁটি মানুষ সৃষ্টি, দ্বিতীয় সোপান সংঘ-স্থাপন। বিবেকানন্দ প্রমুখ মনীষীগণ চেষ্টা করিয়াছিলেন মানুষ তৈরি করতে। দেশবন্ধু চেষ্টা করিলেন রাষ্ট্রীয় সংঘ (Political Organisation) গঠন করিতে। এমন সংঘ তিনি গঠন করিলেন ইংরেজরা স্বীকার করিতে বাধ্য হইল তাহারা ইতিপূর্বে কখনো দেখে নাই। দেশবন্ধু আজ নাই- তাহার আশা, আকাঙ্খা ও স্বপ্নের উত্তরাধিকারী ভাগ্যহীন আমরাই।

    আজকাল পাশ্চাত্য দেশ হইতে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র- বিষয়ক আধুনিক চিন্তার ধারা এদেশে আসিতেছে। ইহার ফলে অনেকের চিন্তাজগতে বিপ্লব উপস্থিত হইতেছে। কিন্তু যাহা নূতন বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে তাহা প্রকৃতপক্ষে অতি পুরাতন। গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র এদেশে নূতন তত্ত্ব নয়। আমরা আমাদের ইতিহাসের ধারা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছি এবং এখনো ভারতের কোন নিভৃত প্রান্তে প্রান্তে গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রমূলক রাষ্ট্র আছে তাহা জানিনা বলিয়া অতি পুরাতনকে নূতন অতিথি জ্ঞান করিয়া আদরের সঙ্গে আহ্বান করিতেছি।

    সমাজ ও রাষ্ট্র- সম্পর্কীয় কোনো মতবাদকে অভ্রান্ত ও অখণ্ড সত্য বলিয়া মনে করা সমীচীন নয়। অধিকাংশ ism বা মতবাদের ভিতর অল্পাধিক সত্য আছে। তাই Socialism (গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র) - এ সত্য যাহা আছে আমরা তাহা চাই। কিন্তু তাই বলিয়া Fascism -এর শৃঙ্খলা, সঙ্ঘবদ্ধতা ও আজ্ঞানুবর্তিতা একেবারে বর্জনীয় নয়। আমাদের মনে রাখিতে হইবে যে কার্ল মার্ক্সের প্রধান শিষ্য যাহারা- সেই রুশ জাতি- কার্ল মার্ক্সের বাণী অন্ধভাবে অনুসরণ করেন নাই। তা যদি করিত তাহা হইলে এত শীঘ্র রাশিয়াতে Bolshevism -এর প্রতিষ্ঠা হইত না। বস্তুত Socialism -এর মূলতত্ত্বগুলি দেশকালোপযোগী করিবার পর রুশ জাতি তাহা গ্রহণ করিয়াছে।

    বর্তমান সময়ে Socialism -এর নীতিগুলি প্রয়োগ করার পথে আরো বেশি বিঘ্ন উপস্থিত হওয়াতে রুশ জাতি New Economic Policy নামে নূতন অর্থনীতি গ্রহন করিতে বাধ্য হইয়াছে। এই নূতন নীতি অনুসারে ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি (Private Property) থাকিতে পারে এবং ব্যাবসায়ের কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি কারখানার মালিক হইতে পারে। Socialist -এর পক্ষে new economic policy (বা নূতন অর্থনীতি) গ্রহণ করা আত্মহত্যা করার তুল্য। কিন্তু রুশ জাতি নিতান্ত বাধ্য হইয়া তখন তাহা গ্রহণ করিয়াছে। আমাদের মনে রাখা উচিত যে জাতির ইতিহাসের ধারা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও আবহাওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয়তার কথা। অবহেলা করিয়া কোনো মতবাদ বলপূর্বক কোনো দেশে প্রয়োগ করা যায় না। এরূপ চেষ্টা করিলে হয় সে দেশে বিপ্লবের সৃষ্টি হইবে নতুবা Fascism -এর মতো কোনো বিরুদ্ধ মতবাদের প্রতিষ্ঠা হইবে।

    আর- একটি কথা আমাদের মনে রাখা উচিত, ব্যক্তিত্বের বিকাশ না হইলে, কোনো ism বা মতবাদের দ্বারা কোনো জাতির উদ্ধার হইতে পারে না। ব্যক্তিত্ব বিকাশের সহিত জাতির শিক্ষাদীক্ষার নিবিড় সম্বন্ধ আছে। সুখের বিষয় এই যে বলশেভিক রাশিয়ার মনীষীগণ আজকাল এই কথা হৃদয়ঙ্গম করিতেছেন। ট্রটস্কি (Trotsky) তাঁহার Problems of Life নামক পুস্তকে এ-সব কথা সমর্থন করিয়াছেন। তাহার পুস্তকের সমালোচনা করিতে গিয়া মিনস্কি (Minsky) বলিতেছেনঃ-

    “Life itself, the life of the masses and of the individual must be transformed, Ttrotsky says; new principles of life are needed, a new type of citizen must be helped to evolve, a new type of family is about to come into existence in Russia and ought to be helped to do so ...

    Two admissions acquire a special importance, coming from Trotsky. In the place he rejects most emphatically ... the superstitious idea of a distinctly Proletarian class culture. The masses in Trotsky’s new and wiser view, need communion with the universal culture of the ages and ought to be educated accordingly. It should be the task of the Russian intellectuals to help them..

    Trotsky’s second admission is no less important. He says now that the development of Personality is an absolute necessity for the evolution of a new type of family, Communism and Individualism, he declares in his book, far from being antagonistic, are but different social forces mutually attracting and completing each other.”

    বলশেভিক রুশজাতির চিন্তাধারা যেরূপ দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হইতেছে তাহাতে আমার মনে হয় যে জ্ঞানালোকের জন্য রাশিয়ার উপর অতি নির্ভরশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় নহে। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র আমরা গড়িয়া তুলিব আমাদের আদর্শ ও প্রয়োজন অনুসারে এবং আবশ্যক বিদেশ হইতে জ্ঞানরত্ন সংগ্রহ করিব- ইহাই ভারতবাসী মাত্রেরই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

    বিংশ শতাব্দীতে যে মুক্তিসংগ্রাম দেশের মধ্যে চলিতেছে তাহার দ্বিতীয় অধ্যায় পার হইয়া আমরা এখন তৃতীয় অধ্যায়ে পৌছিয়াছি। প্রথম অধ্যায় স্বদেশী যুগ; দ্বিতীয় অধ্যায় বিপ্লবের যুগ; তৃতীয় অধ্যায় অসহযোগ ও গণআন্দোলনের যুগ। অনেকে মনে করিতে পারেন যে আমাদের মুক্ত হইবার সকল প্রচেষ্টা বুঝি ব্যর্থ হইয়াছে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে কোনো শুভ প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয় নাই। যে জাতীয় আন্দোলন গত ২৫ বৎসর বা ৩০ বৎসর ধরিয়া প্রবল্ভাবে চলিতেছে তাহার ফলে আমরা ক্রমশ হৃতশক্তি আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানের জ্ঞান ফিরিয়া পাইতেছি; মেরুদণ্ডহীন জাতি চরিত্রবল অর্জন করিতেছে; শারীরিক বল ও ইচ্ছাশক্তির অনুশীলন দেশের মধ্যে বাড়িতেছে এবং দেশবাসী ক্রমশ সংগবদ্ধ হইতেছে, এ জাত একদিন মুক্ত হইবেই হইবে; ইহা বিধাতৃ- নির্দিষ্ট সত্য। পার্থিব শক্তির সাধ্য নাই যে চিরকাল আমাদের জন্মগত অধিকার হইতে আমাদিগকে বঞ্চিত করিয়া রাখে। আমাদের এক মাত্র সমস্যা কত শীঘ্র আমরা স্বাধীন হইতে পারিব।

    বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ্যৎ কার্যপদ্ধতি

    অনেকে এই প্রশ্ন করিয়া থাকেন- সশস্ত্র বিপ্লবের পথ ছাড়িয়া দিলে আমরা কী উপায়ে দেশকে মুক্ত করিতে পারিব? তাহার উত্তরে আমি বলি – মুষ্টিমেয় ইংরেজ এ বিরাট দেশ শাসন করিতেছে শুধু আমাদের সহযোগিতা লাভ করিয়াছে বলিয়া। গণআন্দোলন আরো শক্তিশালী ও ব্যাপক হইয়া উঠিলে জনসাধারণের মধ্যে আর সহযোগিতাভিলাষ থাকিবে না। তখনই প্রকৃতপক্ষে আমরা অসহযোগ নীতি সার্থক ও সফল করিতে পারিব। এই কার্যে আমাদের একমাত্র অস্ত্র বা উপায় – Propaganda বা প্রচারকার্য। এই Propaganda র বলে বলশেভিকরা এত শক্তিশালী হইয়া উঠিয়াছে, এই Propaganda র চীন জাতি বিনা রক্তপাতে জাতীয় শাসন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিয়াছে। ইংরেজের এই অস্ত্র – গুপ্তমন্ত্র (অর্থাৎ Propaganda র রীতি) বলশেভিকরা সম্যকরূপে শিক্ষা করিয়াছে বলিয়াই ইংরাজরা বলশেভিকদিগকে এত ভয় করে। ইংরেজ জাতি প্রতি বৎসর ভারতবাসীকে ১২০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রয় করিয়া থাকে। এই পণ্যভার উৎপন্ন করিবার জন্য বিলাতে বহু কলকারখানার প্রতিষ্ঠা হইয়াছে। এই ব্যবসায়ের দ্বারা প্রায় এক কোটি ইংরেজ প্রতিপালিত হয়। ভারতবাসীরা যদি বিলাতী পণ্য বর্জন করিতে পারে তাহা হইলে ইংরেজ জাতির কী অবস্থা হইবে তাহা চিন্তা করিলেই আমরা বুঝিতে পারিব। সুতরাং প্রবল পরাক্রান্ত ইংরেজ জাতি অন্নের জন্য ভারতবাসীর উপর একান্ত নির্ভরশীল। ভারতবাসী কোনো প্রকার শান্তি ভঙ্গ না করিয়া যদি বিলাতি পণ্য বর্জন ও অসহযোগ নীতি অবলম্বন করিতে পারে তাহা হইলে এমন অবস্থা আমরা ঘটাইতে পারিব যে ইংরেজ জাতি ইংরেজ জাতি আমাদের ষোলো আনা দাবি শির নত করিয়া স্বীকার করিতে বাধ্য হইবে।

    বর্তমান বৎসর আমাদের উদ্যোগ পর্ব। এই বৎসর প্রাণপণ পরিশ্রম করিলে আমরা আগামী আইন অমান্য বা খাজনা বন্ধ আরম্ভ করিতে পারিব। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই যে আগামী লাহোর কংগ্রেসে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গৃহীত হইবে। তখন আমরা যেন প্রস্তাব করিয়াই ক্ষান্ত না হই। আগামী জানুয়ারি মাসে সমগ্র দেশে বিপুল আন্দোলন সৃষ্টি করিতে হইবে এবং প্রয়োজন হইলে কাউন্সিল ও অ্যাসেম্বলি পরিত্যাগ করিয়া আসিতে হইবে। এমন লোক এবার কংগ্রেস কর্তৃক মনোনীত হইয়া ব্যাবস্থাপক সভায় যাওয়া উচিত, যাঁহারা দ্বিরুক্তি না করিয়া সেখান হইতে চলিয়া আসিতে পারিবেন, প্রয়োজন হইলে সিন ফিন দলের মতো Oath of allegiance না লইয়া আমরা বাহিরে আসিয়া জাতীয় ব্যবস্থাপক সভা গঠন করিব।

    এই কার্য আগামী বৎসর সফল করিতে হইলে এখন হইতেই বিরাট আয়োজন দরকার। আজ জাতির পক্ষে নবোদ্যমে নবভাবে সাধনায় প্রবৃত্ত হইবার প্রয়োজন ঘটিয়াছে; অল্পদিনের মধ্যে যে -সকল ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে; সে-সকল হইতে বুঝিতে পারা যায়, যে আমলাতন্ত্র সরকার সহজে আপনার সম্ভুক্ত অধিকার ত্যাগ করিতে সম্মত হইবে না। জাতি মাত্রেরই আপনার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ অধিকার আছে; এ কথা যে ইংরেজ রাজনীতিকরাও স্বীকার করেন না, এমন নহে। কিন্তু সাম্রাজ্যমদগর্বিত শ্বেতাঙ্গ জাতি আপনাদিগকে বিধাতা কর্তৃক নিযুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের অভিভাবক ভাবিয়া শাসন ও শোষণ নীতির সমন্বয়ে যে অধিকার বাহুবলে প্রতিষ্ঠিত করে, তাহা আত্মিক বলের নিকট তুচ্ছ হইলেও সেই তুচ্ছতা সহজে তাহার নিকট প্রতিভাত হয় না। এই কারণেই কিছুদিন হইতে এশিয়া বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মহাশয় প্রাচীন জাতিসমূহের সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন সম্যক উপলব্ধি করিয়া সে প্রস্তাব তাহার দেশের লোকের সমক্ষে উপস্থাপিত করিয়াছিলেন। এশিয়ার এই যে বিদ্রোহ , ইহা স্বাবলম্বী ও স্বাধীন হইবার সংগ্রাম। ভারতবর্ষ এই ভাব ও আন্দোলন হইতে কখনই দূরে থাকিতে পারে না। কেবল ইংরেজ সাম্রাজ্য নহে পরন্তু ইংল্যান্ডের অস্তিত্ব যখন বিপন্ন হইয়া উঠিয়াছিল, সেই সময় ইংরেজের পার্লামেন্ট ঘোষণা করিয়াছিল- এদেশে দায়িত্বশীল শাসন প্রতিষ্ঠা করিবার উদ্দেশে শাসনকার্যে দেশবাসীর সহযোগিতা লাভই ভারতে ইংরেজ শাসনের কাম্য। এই ঘোষণানুসারে এদেশের শাসন প্রবর্তিত হইয়াছে, তাহার অসারত্ব দূরদর্শী রাজনীতিকগণ প্রথমেই উপলব্ধি করিয়াছিলেন এবং তাহার পর তাহা পদে পদে প্রতিপন্ন হইয়াছে।

    প্রায় ৮ বৎসর দ্বৈতশাসনের অভিজ্ঞতার পর ভারতের শাসন-পদ্ধতির নির্ধারণ করিবার জন্য বিলাতের পার্লামেন্টেও এদেশের অবস্থা-ব্যবস্থা সম্বন্ধে বিশেষভাবে অজ্ঞ, কয়েকজন ইংরেজকে এ দেশে পাঠাইয়াছেন। তাহারা পুলিশ প্রহরী পরিবেষ্টিত হইয়া স্থানে স্থানে গমন করিয়া আপনাদিগের ইচ্ছামত তদন্ত করিয়া ফিরিয়াছেন। দেশের লোক তাহাদিগের কার্যে কোনোরূপ সহযোগ করা জাতির আত্মসম্মানের হানিজনক মনে করিয়া তাহাতে বিরত রহিয়াছে। অথচ এই অসহযোগের জন্যই এদেশের লোক ইংরেজের ক্রোধ অর্জন করিয়াছে। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে এদেশের লোক বিদেশিবস্ত্র ও বিলাতি পণ্য বর্জন করিতে কৃতসংকল্প হইয়াছে। যেদিন কলিকাতায় প্রথম বিদেশি বস্ত্র দগ্ধ করা হয়, সেদিনের ঘটনা কাহারো অবিদিত নাই। সেদিনের ঘটনায় একদিকে যেমন দেশের লোকের দৃঢ় সংকল্পের পরিচয় পাওয়া গিয়াছে, আর-একদিকে তেমনই বুঝিতে পারা গিয়াছে যে এই কার্যে পদে পদে কিরূপ পর্বতপ্রমাণ বাধা। সে বাধা আমাদিগকে অতিক্রম করিয়া অগ্রসর হইতে হইবে।

    আজ কয়েকদিন হইল, আকাশে আবার নূতন মেঘ সঞ্চার হইয়াছে। রাশিয়ার কম্যুনিস্ট আন্দোলনের আতঙ্কে এদেশে গ্রেপ্তার আরম্ভ হইয়াছে। এরূপ ব্যাপার গত ২০ বৎসরের মধ্যে এতবারই ঘটিয়াছে, যে ইহাতে নূতনত্ব কিছুই নাই। দেশের লোককে সন্তুষ্ট করিতে পারিলে এবং তাহাদিগকে দেশরক্ষার কার্যভার প্রদান করিলে যে সর্ববিধ আপদের শান্তি হয়, ইহা বোধহয় স্বাধিকারপ্রমত্ত আমলাতন্ত্র সরকারের বুদ্ধি-বিবেচনার অতীত। আর সেইজন্যই তাঁহারা চণ্ডনীতির প্রবর্তন করিয়া অসন্তোষ পুঞ্জীভূত করিতেছেন। এই নূতন বিপদই যে শেষ বিপদ, তাহা যেন কেহ কল্পনাও না করেন। এইরূপ বিপদের জন্য আমাদিগকে সর্বদা প্রস্তুত থাকিতে হইবে, কেননা আমরা স্বরাজলাভ না করা পর্যন্ত, তরঙ্গের পর তরঙ্গের মতো, বিপদের পর বিপদ দেশের উপর আসিয়া পরিবে।

    আমাদের এখন চিন্তা করা উচিত যে এই-সকল গ্রেপ্তার সম্পর্কে আমাদের শিক্ষণীয় ও করণীয় কিছু আছে কি না। আমার তো মনে হয় যে আমরা তিনটি শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারিঃ –

    ১) শ্রমিক আন্দোলন যতদিন শক্তি সঞ্চয় না করিতে পারিবে ততদিন গ্রেপ্তার ও অন্যান্য প্রকার অত্যাচারের সম্ভাবনা রহিয়া যাইবে। অতএব শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন শাখার মধ্যে মনোমালিন্য দূর করিয়া সদ্ভাব সৃষ্টি করা উচিত।

    ২) লেবার কমিশন (Labour Commission) বর্জন করা উচিত। আমি বুঝতে পারিনা যে হুইটলির সভাপতিত্বে যে কমিশন নিয়োগ করা হইয়াছে তাহা বর্জনের প্রস্তাব আজ পর্যন্ত কেন All India Trade Union Congress (অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ) কর্তৃক গৃহীত হয় নাই। আমরা একদিকে সাইমন কমশন বর্জন করিব এবং অপর দিকে হুইটলি কমিশন বর্জন করা উচিত।

    ৩) শ্রমিক আন্দোলন ও জাতীয় সমিতির মধ্যে অধিক সহযোগিতা হওয়া বাঞ্ছনীয়। একে যাহাতে অপরের সহায়তা করিতে এবং পরস্পরের মধ্যে যাহাতে কোনো প্রকার অসদ্ভাব বা মনোমালিন্য না থাকে তার জন্য সচেষ্ট হওয়া উচিত। আইরিশ ও চীন জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস যত্নসহকারে পাঠ করিয়া আমি দেখিয়াছি যে ঐ দেশে শ্রমিক দলের সহিত রাষ্ট্রনীতিক দলের সহযোগিতা না হইলে মুক্তিলাভ কোনোদিন সম্ভব হইত না। আয়ারল্যান্ডে সিনফিন দল ও শ্রমিক দল একযোগে কাজ করিতে পারে; চীনদেশে কুয়োমিনট্যাং ও কম্যুনিস্ট দল সহযোগে কাজ করিয়া বিদেশির ক্ষমতা ও অধিকার খর্ব করিতে পারে; আর আমরা জাতীয় মহাসমিতি ও শ্রমিকদলের মধ্যে সহযোগিতা স্থাপন করিতে পারিব না কেন? আমার মনে হয় যে এই দুই বিরাট শক্তি সংহত করিতে না পারিলে কী রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, কী অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, আমরা কোনোটাই লাভ করিতে পারিব না। অথচ সহযোগে কাজ করিলেই দুইটাই যথাসময়ে করতলগত হইবে।

    বর্তমান কার্যপদ্ধতি

    মার্কিনে তুলা উৎপন্ন হয়। যে বৎসর প্রয়োজনাতিরিক্ত পরিমাণ তুলা উৎপন্ন হয়, সে বৎসর তাহারা অতিরিক্ত তুলা নষ্ট করিয়া ফেলে তথাপি সস্তায় মাল ছাড়িয়া বাজার খারাপ করে না। পাটের প্রয়োজন যতদিন থাকিবে এবং পাট উৎপাদন বিষয়ে বাংলার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকিবে – ততদিন বাংলা পাট চাষ করিয়া লাভবান হইবার চেষ্টা অবশ্যই করিবে। কিন্তু যেভাবে আমরা পাটচাষ করিতেছি তাহাতে লাভ না হইয়া ক্ষতিই হইতেছে।

    এই পাট সম্পর্কে আর একটি কথা বলিতে ইচ্ছা করি। এদেশে কলিকাতার উপকণ্ঠে যে-সব পাটকল আছে, তাহার অধিকাংশই

    বিদেশীয়- এদেশের লোক তথায় কেবল শ্রমিক। যদি মফস্বলে স্থানে স্থানে ছোট ছোট কলের দ্বারা পাটের সূত্র প্রস্তুত করা যায়, তবে থলিয়া ও চট প্রস্তুত করা কুটির শিল্প হিসেবে দেশে চলিত হইতে পারে এবং তাহাতে বিশেষ উপকার হয়।

    এবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদিগকে গঠনের স্থায়ী ব্যবস্থা করিতে হইবে। এদেশের হাতে চালিত তাঁত যে বিদেশি কলের তাঁতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিতে পারে তাহা প্রতিপন্ন হইয়াছে। আইনের বলে বিলাত এদেশের কাপড় আমদানি বন্ধ করিয়া বিলাতকে এদেশের হাতে -কাটা সূতায় হাতের তাঁতে প্রস্তুত বস্ত্র ব্যবসা খুন করিতে হইয়াছিল – সংগত উপায়ে তাহা সম্ভব হয় নাই।

    তাঁত এদেশে এখনো আছে। সেই -সব তাঁতের জন্য আবশ্যক-মত দেশী সূতা যোগাইবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। ইংরেজ ঐতিহাসিক উইলসন স্বীকার করিয়াছেন , এই শিল্পকে শ্বাসরোধ করিয়া মারিবার জন্য ইংরেজকে রাজনীতিক অত্যাচার প্রয়োগ করিতে হইয়াছিল।

    খদ্দর আমাদিগের স্বাবলম্বনের নিদর্শন। আমরা তাহার জন্য ত্যাগ স্বীকার করিলে চরকার ব্যবহারে দেশের দারিদ্র -সমস্যার আংশিক সমাধান সম্ভব। ইংরেজ রাজত্বেই দিনাজপুর জেলায় গৃহে গৃহে কী রূপ চরকা চলিত এবং অবসরকালে চরকা চালাইয়া মহিলারা কী রূপ লাভবান হইতেন তাহার হিসাব ডক্টর বুকানন দিয়াছেন। দেশ এখন কৃষি প্রধান হইতে কৃষি-প্রাণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এই অবস্থার পরিবর্তন করিতে হইবে, দেশে আবার শিল্প প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। কিন্তু যতদিন তাহা না হয়, ততদিন কৃষকদিগের জন্য- অবসরকালে একটা অতিরিক্ত কার্যের ব্যবস্থা করা বিশেষ প্রয়োজন। যাঁহারা বলেন, সূতা কাটিয়া লাভ অতি অল্প হয়, তাঁহারা এদেশের লোকের গড় আয় সম্বন্ধে বিবেচনা করিয়া দেখিয়াছেন কি? সেই গড় আয় বিবেচনা করিয়া দেখিলে আর চরকার সূতা কাটার লাভ সামান্য বলিয়া বিবেচিত হইবে না।

    বিলাতি বণিক সভা আমাদিগের বিলাতি বস্ত্র বর্জনের বিরুদ্ধে প্রচারকার্যে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। তাঁহারা সম্প্রতি যে পুস্তিকা প্রচার করিয়াছেন, তাহাতে দেখানো হইয়াছে, যে ভারতে যে বস্ত্র ব্যবহৃত হয়, তাহার এক-তৃতীয়াংশ দেশী তাঁতে প্রস্তুত এবং এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি। বিদেশি বস্ত্র বর্জন করিতে হইবে আর দেশী তাঁতে যে সুতা ব্যবহৃত হয় তাহাও প্রায় সবই বিদেশি বলিয়া তাহার স্থানে দেশী সূতা সরবরাহ করিতে হইবে।

    সমগ্র প্রদেশে দেশী কাপড় উৎপন্ন করিবার ও সরবরাহ করিবার জন্য যে বিস্তৃত ব্যবস্থা প্রয়োজন তাহা করিতেই হইবে, নহিলে আমাদিগের বিলাতী বর্জন সংকল্প কার্যে পরিণত করা সম্ভব হইবে না।

    কংগ্রেস এবার শ্রমিক- আন্দোলনকে আপনার আশ্রয় প্রদান করিয়াছেন। সেই আন্দোলন সম্বন্ধে আমার প্রধান বক্তব্য অন্য প্রসঙ্গে পূর্বেই বলিয়াছি। শ্রমিকদিগকে সত্যবদ্ধ করিয়া সুনিয়ন্ত্রিত করিতে হইবে। যাহাতে তাহারা উত্তেজিত ও উৎপীড়িত হইলেও অহিংসায় অবিচলিত থাকে, তাহার শিক্ষা তাহাদিগকে দিতেই হইবে।

    কর্মী ব্যতীত কর্ম সম্ভব নহে! দেশের আহ্বানে সমবেত হইবার জন্য প্রতি জেলায় ১ হাজার কর্মী পাইতেও কি বিলম্ব হইবে? আমার দেশের লোকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অবিচলিত। বঙ্গভূমি কেবল বীরপ্রসবিনী নহেন। ইহার বৃহত্তর গৌরব -ত্যাগে। বাংলার বিজয় কাহিনি যেমন গঙ্গা-যমুনার মিলনক্ষেত্র পুণ্য প্রয়াগে জয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল, ‘পুণ্যভূমি বারাণসী’ অধিকার করিয়াছিল, উড়িষ্যার তালিবনশ্যাম- নীলাম্বুবেলায় শিবির স্থাপন করিয়াছিল এবং উত্তুঙ্গতরঙ্গভীষণ সাগর অতিক্রম করিয়া সিংহলাদি বিজয় করিয়াছিল- বাংলার ত্যাগের আদর্শ তেমনই হিমারণ্যের দুর্গম পথ অতিক্রম করিয়া নানা দেশে ব্যাপ্ত হইয়াছিল। এই বঙ্গদেশে প্রেমধর্ম- প্রচারক শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব হইয়াছিল। এই বঙ্গদেশে দেশবন্ধু দেশসেবাকে ধর্মের বেদীতে প্রতিষ্ঠিত করিয়া ভক্তির পঞ্চপ্রদীপ নিষ্ঠার গব্যঘৃতে পূর্ণ করিয়া তাহার আলোকে মার পূজা করিয়া আপনার জীবন পর্যন্ত দান করিয়া গিয়াছেন। সেই বাংলায় কি কখনো ত্যাগী কর্মীর অভাব হইতে পারে ? একথা বিশ্বাস করিয়া বাঙালি হইয়া বাঙালির নাম কলঙ্ককালিমালিপ্ত করিতে পারি না। দধীচির মতো দেশবন্ধু আত্মত্যাগ করিয়া বাঙালির ব্যবহারের জন্য অস্ত্রোপচার দিয়া গিয়াছেন। বাঙালি! তোমরা সবল বাহুতে সেই বজ্র ব্যবহার করো- অনাচার, অত্যাচার মুহূর্ত – মধ্যে বিনষ্ট হইয়া যাইবে। আজ আমি আবার স্বরাজ-সংগ্রামের জন্য সৈনিক ও সমর- সরঞ্জাম চাহিতেছি। আপনাদিগের উৎসাহ, আপনাদিগের উদ্যম, আপনাদিগের সংকল্প দৃঢ়তা, আপনাদিগের দেশভক্তিতে আমার আস্থা আছে। তাই আমার বিশ্বাস, আমার প্রার্থনা ব্যর্থ হইবে না।

    – জননী জাগৃহী। বন্দেমাতরম।

    (অক্ষরবিন্যাস- শ্রী তাপস ঘোষহাজরা ও শ্রী উৎপল দাস)

     

  • বিভাগ : অপার বাংলা | ১৯ নভেম্বর ২০২১ | ৩৬১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Somnath Roy | ১৯ নভেম্বর ২০২১ ১০:০৮501301
  • ভারতের জাতীয় আন্দোলনের খুব সুসংহত তত্ত্বায়ন আছে এই বক্তৃতায়। বাংলার ইতিহাস নিয়ে নেতাজির অসামান্য প্রজ্ঞার প্রতিফলনও আমরা পাই এই বক্তৃতায়। সাহিত্য-সমাজ-অর্থনীতি-ধর্ম-প্রযুক্তি মিলিয়ে এই দেশের হাজার বছরের ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল সূত্রটি নেতাজি উপস্থাপনা করেছিলেন এই বক্তৃতায়-
    " এই তো বাংলার Socialism । এই Socialism – এর জন্ম কার্ল মার্ক্সের পুঁথিতে নয়। এই Socialism এর জন্ম ভারতের শিক্ষাদীক্ষা ও অনুভূতি হইতে।"
    এই সূত্রের উপর দাঁড়িয়েই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ-আন্দোলনটি সঙ্ঘটিত হয়েছিল।
    এই টেক্সট মাধ্যমিক সিলেবাসে অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিৎ ছিল। তাতে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের কিছু সুশিক্ষা হত। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে এই দাবি ওঠা উচিত যে রংপুর বক্তৃতা স্কুল সিলেবাসে ঢুকুক।
  • Ranjan Roy | ১৯ নভেম্বর ২০২১ ১২:৫০501307
  • হ্যাঁ , সিলেবাসে  নেওয়া দরকার। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন