• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • প্রযুক্তি, পরিবেশ ও মানবকল্যাণ -- নারায়ণ চৌবে স্মারক বক্তৃতা, ২০১৯

    Somnath Roy
    বিভাগ : ব্লগ | ১০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩৬ বার পঠিত
  • আমাকে যখন উদ্যোক্তারা নারায়ণ চৌবে স্মারক বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ করলেন, আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। আমি কীভাবে এই বক্তৃতা দেওয়ার যোগ্য বিবেচিত হলাম, তা আমি বুঝতে পারছিলাম না। বক্তৃতাটি যাঁর স্মৃতিতে তিনি শ্রমিক-উৎপাদক মানুষের মঙ্গলকামনায়, তাঁদের পাশে থেকে জীবন উৎসর্গ করেছেন। নারায়ণ চৌবে এরকম অসংখ্য মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যাঁরা আজীবন অশেষ আত্মত্য্যগ স্বীকার করছেন, যাতে আমাদের চারপাশ সুরক্ষিত থাকে, আমাদের সন্তান দুধেভাতে থাকে। আজকের মঞ্চে নারায়ণ চৌবে স্মারক পুরষ্কার পাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে প্রশান্ত রক্ষিত মহাশয়। আমি খুবই উচ্ছ্বসিত বোধ করছি, তাঁর সঙ্গে এক মঞ্চে আসতে পেরে। তিনি এবং তাঁর সংগঠনও অসামান্য অবদান রাখছেন, যাতে সেইসব মানুষ আর একটু স্বস্তিতে থাকতে পারেন, যাঁদের কথা আমাদের চকচকে মেইনস্ট্রিম আলোচনায় প্রায় আসেই না। প্রশান্তবাবু তাঁর আজকে বক্তৃতাতে বলেছেন, কীভাবে উচ্চপদস্থ সপ্রকারি চাকরি ছেড়ে তিনি এই সমিতির কাজে যোগ দিয়েছিলেন। আমার তো এইটা খুব বড় দুর্ভাগ্য মনে হয় যে, মূলতঃ যাঁদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসে রাজনৈতিক দলগুলি সরকার গঠন করে আর গদিতে বসে আমাদের পে কমিশন হবে কী না আর আমাদের কোন স্কিমে টাকা রাখলে ইনকাম ট্যাক্সে কতটাকা ছাড় হবে, কোন ব্যাংককে কী ধরণের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে, ইত্যাদি বিশাল বিশাল সিদ্ধান্ত নেন, সেইসকল মানুষের বেঁচে থাকায় এক পয়সারও সাহায্য হয় না সেইসব সিদ্ধান্তে। কিন্তু, নারায়ণবাবুর লড়াই, কিম্বা খেড়িয়া শবর সমিতির কার্যপ্রণালী, এই অপাংক্তেয় কিন্তু দেশের নির্ধারক মানুষের পাশে থাকার লড়াই। এবং সেই লড়াইয়ের মূল শর্তই যে আত্মত্যাগ। পরিতাপের বিষয়, আজকের মূলধারার চিন্তাজগতে আত্মত্যাগ এক নিষিদ্ধ শব্দ। এরকম কোনও কাজ আমরা করতে পারিনা, করলেও জনসমক্ষে বলতে দ্বিধা বোধ করি, যা আমাদের নিজের আশু স্বার্থের উল্টোদিকে গ্যাছে। আমার ছোটবেলাতেও আমাদের পাড়ায় এরকম লোক থাকতেন, যাঁরা রাজনীতি করার জন্য প্রোমোশন নেন নি, ক্লাব চালানোর জন্য বাইরের রাজ্যে চাকরি নেন নি, বৃদ্ধ বাবা-মা, বাড়ি দেখার জন্য কেরিয়ার স্যাক্রিফাইস করেছেন। আজকে সেসব হয় না। কিন্তু, ঘটনাটা হচ্ছে, আত্মত্যাগ ছাড়া কোনওদিনও বড়ো কিছু আসে নি। আর, সেইজন্য, এই মঞ্চে আমার নিজেকে অযোগ্য মনে হয়। কারণ, দিনের শেষে, আমি হয়ত শুধু কিছু গোদাগোদা কথা বলেই যাব, নিজের সুবিধের মাটি ছেড়ে এক পা এগোব না। যাই হোক, উদ্যোক্তারা আমাকে এই মঞ্চে সুযোগ দিয়েছেন এ আমার কাছে এক বিরাট সম্মানের ব্যাপার। আমি চেষ্টা করব, আজকের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে নিজের আশু স্বার্থের বাইরে কিছু করার জায়গাটার গুরুত্ব আলোচনা করতে। আমি এখনও মনে করি, যা যা আলোচনা করব, তার বেশিরভাগই আপনারা আমার থেকে ভালো করে জানেন। আপনারা অনেকেই যেহেতু মানুষের মধ্যে থেকে সমাজের মঙ্গলের কাজ করেন, এইসব আলোচনা অনেক বেশি বাস্তবের ভূমিকা থেকে আপনারা উপলব্ধি করতে পারেন। তাও, একটা চেষ্টা করব, দুচারটে জিনিস, যা হয়তো বা চোখ এড়িয়ে থাকতেও পারে, একটু আলাদা করে মনে করিয়ে দেওয়ার। হয়তো আমার একদিকের বলার শেষে আমরা কোনও বড়ো আলোচনাতে ঢুকতে পারব। আর, সেই আলোচনাই হবে, নারায়ণবাবুর স্মৃতির প্রতি, তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
    আমাদের আজকের আলোচনার শিরোনাম- প্রযুক্তি, পরিবেশ ও মানবকল্যাণ। এই আলোচনায়, আমি শিরোনামটার উল্টোদিক থেকে ঢুকি- যা হলো মানবকল্যাণ। মানসিক সুস্থতা থাকলে কোনও মানুষের মনেই দ্বিধা থাকতে পারে না, যে পৃথিবী বা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকান্ডের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ মানবকল্যাণ। আমার প্রতিবেশী ভালো না থাকলে, আমিও ভালো থাকতে পারি না- শুধুমাত্র এই একটা কারণেই আমাদের সকল কাজের মূল লক্ষ্য মানবকল্যাণ হওয়া উচিৎ। কিন্তু, শুধু মানবের কল্যাণ কেন? আমাদের চারপাশে মানুষ ছাড়াও নানাবিধ প্রানী ও বস্তু রয়েছে। তাদের কি বাদ দিয়ে ভাবব? এই প্রসঙ্গে আমি একবার ধর্মগুলোর কথা বলব, মানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত। হয়ত, একটু প্রসঙ্গান্তরে যাচ্ছি মনে হবে, কিন্তু এই অন্যান্য প্রসঙ্গও আমাদের মূল প্রসঙ্গে কথা বলতে সাহায্যই করবে। ধর্মের কথা কেন আসছে, তা বলতে আবার মার্ক্সের সাহায্য নিই। হেগেলের ফিলজফি অফ রাইট নামক প্রবন্ধটির ক্রিটিক লিখতে গিয়ে মার্ক্স লিখছেন- “Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people.” , আমি প্রথম যখন পড়েছিলাম শিউরে উঠেছিলাম এই শব্দগুলোতে। ধর্ম হলো নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস- sigh of the oppressed creature। কী ভয়ঙ্কর কথা! ইতিহাসের মার্ক্সীয় ব্যাখ্যা মানলে নিপীড়ন সেই ইতিহাসের এক চিরায়ত বাস্তবিকতা। সেই নিপীড়নে মানুষ যা প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল, তা এই ধর্মসমূহের ভেতর ঢুকে আছে! এবং নিপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে তার মানবগোষ্ঠীর পদক্ষেপও ছিল, তার সূত্রও হয়তো বা পাবো বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন আংগিক, উপাচার লক্ষ্য করলে। এইবার বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের একটা ফারাক আছে, বিজ্ঞান পূর্বমত খন্ডন করে, নতুন আবিষ্কারকে নিয়ে চলে। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে যেই প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল, বা পরমাণুর গড়নের নতুন সূত্র যেই বেরিয়ে গেল, পুরোনোটা আর বিজ্ঞান থাকল না, ইতিহাস হয়ে গেল। কিন্তু, ধর্ম অনেকসময়ই সেরকম না। পূর্বমত, পূর্ববিশ্বাস প্রভৃতি পরবর্তীকালের উপলব্ধি ও অভ্যেসের পাশাপাশি থেকে যায় ধর্মে। সুতরাং ইতিহাসের একটা বিরাট পর্যায় জুড়ে নিপীড়িত মানুষের অসহায়তা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টাগুলোর আভাস পেতে পারি ধর্ম থেকে। এবার মূল প্রসঙ্গে দেখি, কল্যাণের প্রশ্নকে ধর্মগুলি কীভাবে দেখছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টিয় সব ধর্মকে দেখছি যে তারা শুধু মানুষের কল্যাণের কথা বলছে না, সর্বজীবের কথা বলছে। এমন কী যা জীবিত নয় সেইসব বস্তুর মঙ্গলের কথাও বলছে। বাকি সব ধর্মের থেকে, আমার মনে হয়েছ্‌ ইসলাম অনেক বেশি করে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলে। তার পরেও কোরাণ বলছে জীবজন্তু হচ্ছে মানুষের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার নিদর্শন। হজরত মহম্মদ বলছেন একটা ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রতি কী ব্যবহার করবে মানুষ, তার উপর তার উপর আল্লাহ-র বিচার নির্ভর করবেন। আমরা যদি জনজাতিগুলির ধর্ম দেখি, তাদের বেঁচে থাকার মতন ধর্মের সবকিছুই প্রকৃতিকেন্দ্রিক। এবং প্রকৃতি ও অন্যান্য জীবের সঙ্গে কী করবে আর কী করবে না, তার বিশাল বিধিনিষেধ প্রায় যেকোনও ধর্মেই আছে। অর্থাৎ, আমরা যদি ধর্মকে মানব সমাজের ঐতিহাসিক আচরণের একটা নথি হিসেবে দেখি, তার নিজের কল্যাণের ধারণার সঙ্গে বাকি পৃথিবীর কল্যাণের ধারণা পৃথক ছিল না। জৈনরা তো বাকি জীবকে আহত করবে না, এই চিন্তাভাবনার চূড়ান্ত স্তরে যেত।
    এবার, প্রযুক্তির ভূমিকা, ঐতিহাসিক ভাবেই কিছুটা অন্যরকম হয়ে এসেছে। সভ্য মানুষের ইতিহাস থেকে প্রযুক্তিকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। মানুষ পশু থেকে আলাদা হয়েছে সে যন্ত্র ব্যবহার করতে পারছে বলে। আর এই যন্ত্র ব্যবহার করে সে প্রকৃতির বিরূপতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছে এবং নিজের বেঁচে থাকার লড়াইকে সহজতর করে তুলেছে। এইবার মানুষ যখন প্রকৃতিকে একভাবে বশ করতে পেরেছে, দুদিন পরের বেঁচে থাকার উপাদান জমিয়ে রেখেছে, তখন তার কাছে প্রশ্ন এসেছে সে এসব কীভাবে ব্যবহার করবে, তখন ঐ ধর্মের মতন কিছু হয়তো বা লেগেছে। বা একটা কাজ অনেকে মিলে করবে, সেখানে কার কী যৌথ আচরণ হবে- মৌমাছিদের মধ্যে সেটা প্রায় জন্মগত, কর্মী মৌমাছির পুরুষ মৌমাছি হবার উপায় অতি ক্ষীণ, কিন্তু মানুষের মধ্যে তো সেরকম না। তাই সবসময়ই, তাকে একটা আলোচনার জায়গায় আসতে হয়েছে, কর্তব্য-অকর্তব্য স্থির করতে হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চেতনাগত উন্নতির দরকার তার হয়েছে। এবং এইখানেও ধর্মের একটা জায়গা এসে পড়েছে। ইতিহাসের প্রায় সব পর্যায়েই তাকে এই নীতিমালা তৈরি করতে হয়েছে, যাতে সে সেই প্রযুক্তি হাতে আসার পরও সার্বিক ভাবে জগতের অকল্যাণ না করে ফেলে। ভেবে দেখুন অস্ত্রপ্রয়োগ আর অস্ত্র সংবরণ নিয়ে মহাভারতে কতধরণের নির্দেশ রয়েছে। তাই, প্রযুক্তির শক্তিতে বলীয়ান মানুষের আলাদা করে ধর্ম, আইন, নৈতিকতা ইত্যাদির দরকার হয়েছে। বস্তুত, প্রযুক্তি মানুষকে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করছে, কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকা তার একার বেঁচে থাকা না, অনেক কিছু নিয়ে বেঁচে থাকা – এই বোধ যে তার মধ্যে শুরুর থেকেই থেকেছে সেই ইতিহাসটা আমরা দেখতে পাচ্ছি।
    আমরা এবার কিছু দরকারি প্রযুক্তির ব্যাপারে কথা বলি, আর পরিবেশের উপর তার ভূমিকা নিয়ে কথা বলি। শুরু করা যাক প্লাস্টিক থেকে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্লাস্টিক এক বিপ্লব এনে দিয়েছে, বিভিন্ন জিনিস নির্মাণ ও প্যাকেজিং হচ্ছে খুবই সহজে প্লাস্টিক দিয়ে। এর ওজন কম, প্লাস্টিক পণ্যের দামও কম। আমাদের আজকের সভ্যতায় প্লাস্টিকের বিপুল ব্যবহার। কিন্তু, আমরা আশেপাশে যা যা দেখছি তাতে এই ধারণা খুব স্পষ্ট হয়ে যায় যে প্লাস্টিক আমাদের পৃথিবীর জন্য এক বিরাট বিপদ। জলে মাটিতে ভ্যাটে নালার মুখে সর্বত্র প্লাস্টিক জমে যেতে দেখছি আমরা, খবরে পড়ছি সমুদ্রের তিমি মাছ মরে বালিতে এসে ঠেকছে, তার পেটেও প্লাস্টিক। প্রতিবছর দশ লক্ষ বড় সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিকজনিত কারণে মারা যায়। আমরা যদি প্লাস্টিক নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিচার দেখি, দেখব, ৬০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার ওপরে প্লাস্টিক থেকে এমন কিছু রাসায়নিক নির্গত হয় যা ক্যান্সার এবং আরও অনেক অসুখ আনতে পারে। আর, আপনি নিজের বাড়িতে দেখুন, প্রায় সব গৃহস্থালী সামগ্রীই প্লাস্টিকের। এইবার আমরা জানি প্লাস্টিক বায়ো-ডিগ্রেডেবেল না, অর্থাৎ পচে না, জমে যেতে থাকে। চেন্নাইয়ের ২০১৫র বন্যায় প্লাস্টিকের বড় ভূমিকা ছিল। পলিথিনের ব্যাগ জমে আটকে গিয়েছিল নিকাশী নালার মুখগুলি। প্লাস্টিক সংক্রান্ত সমস্যার একটা সমাধান হিসেবে বলা হচ্ছে রিসাইকেলিং-এর কথা। অর্থাৎ প্লাস্টিক বর্জ্যকে পুনরায় ব্যবহার করা। কিন্তু, আজওভারতের নিজের প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেলিং-এর পরিকাঠামো নেই। আসলে উন্নত দেশগুলোরও নেই। তারা তাদের বর্জ্য অনুন্নত দেশগুলিতে ডাম্প করে। গতবছর অবধি অস্ট্রেলিয়া থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য ভারতে আসত।
    প্লাস্টিক নিয়ে যাবতীয় সচেতনতা সত্ত্বেও ২০০০ থেকে ২০১৫র মধ্যে পৃথিবীতে প্লাস্টিক উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শুধু প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার ভারতে দ্বিগুণ হয়েছে ২০০৭ থেকে ১৫-র মধ্যে। ভারতের ক্ষেত্রে যদি দেখি, প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ এর থেকে অনেকটা বেশি হারে বেড়েছে। এবং আমি-আপনি একজন গড় পড়তা ভারতীয় বছরে ১১ কেজি প্লাস্টিক, মাথা প্রতি, পৃথিবীর বুকে জমিয়ে যাচ্ছি। একটু তলিয়ে দেখা হোক প্লাস্টিক কীভাবে আসে। প্লাস্টিক তৈরি হয় ন্যাপথা থেকে, ন্যাপথা আসে খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়াম শোধনের মাধ্যমে। পেট্রলিয়াম শোধনের একটা ধাপে ন্যাপথা আসে। অর্থাৎ, প্লাস্টিক তৈরির সঙ্গে খনিজ তেলের প্রসেসিং ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। খনিজ তেল একটা আন্তর্জাতিক জিনিস, যার জন্য যুদ্ধ হয়, দেশের সরকার পড়ে যায়, গণহত্যা হয়, সন্ত্রাসবাদ কায়েম থাকে। সেই মাটির তলার তেলে তোলা না কমিয়ে ফেলে প্লাস্টিকের উৎপাদন কমানো কতটা সম্ভব?
    আমরা বরং একটু পেট্রলিয়ামের ব্যবহারটা দেখি - ভারতের মাটিতে ও সমুদ্রে কিছু পেট্রলিয়াম আছে, কিন্তু মূল পেট্রলিয়াম আমরা আমদানি করি। আমাদের অর্থনীতি রাজনীতিও পেট্রলিয়াম, আর খনিজ গ্যাসের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে গেছে। ধরুন, ১৯৯১ এ উদারীকরণের মূল কারণ হিসেবে সংসদে বলা হয় তেল কেনার টাকা নেই। অথচ, তারপর থেকে আমাদের দেশে পেট্রলিয়াম আমদানি বেড়ে চলেছে। মানে, আমরা আমাদের মূল উৎপাদন ব্যায় করছি ঐ তেল কেনার পেছনেই। ২০০৬ সালে ১০০ বিলিয়ন টনের মতন পেট্রলিয়াম আমদানি হত, খরচ হত ১৭০ হাজার কোটি টাকা, আর ২০১৮ তে ২২৮ বিলিয়ন টন পেট্রলিয়াম আমদানি হয়, আর তার জন্য খরচ হয় ৮৮০ হাজার কোটি টাকা। এইবার পেট্রলিয়াম তো অনেক ভালো কাজে লাগে, রান্নাঘর থেকে গাড়ি-এরোপ্লেন-চন্দ্রায়ণ সবই চলে এতে। এর খারাপ দিকটা কী? পেট্রোলিয়াম একধরণের জীবাশ্ম জ্বালানি যা পুড়ে কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি হয়, যাকে গ্রিন হাউস গ্যাস বলে, পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়িয়ে চলে। দেখা যাচ্ছে শেষ পঞ্চাশ বছরে দেড় ডিগ্রির মতন গড় তাপমাত্রা বেড়েছে গ্রিন হাউস গ্যাসের জন্য। গত পঞ্চাশ বছরে এই গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ ৩.৫ গুণ বেড়েছে। লক্ষ্যণীয়, পেট্রোলিয়াম উত্তোলন, গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন এবং প্লাস্টিক উৎপাদন এগুলি প্রতিবছর উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। একমাত্র একটি বছর কমেছিল, যেটি হল ২০০৯, যে বছর বিশ্বঅর্থনীতির মন্দার বছর।
    এর ফলে পৃথিবী গরম হয়ে যায়, তার ফলে একটা ভয়ঙ্কর জিনিস হয় সেটা হল বরফ গলতে থাকে। আমাদের নদীগুলোর উপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। ভারতে জলের সমস্যা নিয়ে সাম্প্রতিক কালে খুব তোলপাড় হয়েছে। জলের মূল সূত্র কিন্তু এখনও এদেশের নদী গুলো। এদের মধ্যে গঙ্গা খুবই গুরুত্বপূর্ণ নদী। গঙ্গা অববাহিকায় যত লোক থাকেম তার পরিমাণ সমগ্র ইউরোপের সমান। গঙ্গোত্রী হিমবাহ এর উৎস। গঙ্গোত্রীকে ৯টা উপশাখা বরফ ও জল দিত, তাদের মধ্যে ৪টে হারিয়ে গেছে, গঙ্গোত্রী ছোট হয়ে যাচ্ছে, হিমালয়ের প্রায় সব হিমবাহই সংকুচিত হচ্ছে, গঙ্গোত্রীতে যত বরফ জমছে আর যত জল বেরোচ্ছে তাতে ফারাকটা যে পরিমাণ বাড়ছে, আগামী পনের বছরে গঙ্গার চরিত্রে তার প্রভাব টের পাওয়া যাবে। গঙ্গায় জলপ্রবাহের তারতম্য হলে সামগ্রিকভাবে ভারতের সমাজ-অর্থনীতি বিপন্ন হয়ে পড়বে। এবং আমাদের সামনে আশু ভবিষ্যৎ হয়ত সেটাই। আমরা অনেকেই জানিনা হরিদ্বার মাতৃসদনের সন্ন্যাসীরা গঙ্গার সুস্বাস্থ্য চেয়ে বহুবছর ধরে আন্দোলন করছেন। অধ্যাপক জি ডি আগরওয়াল (সন্ন্যাস জীবনের নাম স্বামী সানন্দ, পলিউশন বোর্ডের সাবেক প্রধান ও আই আই টি কানপুরের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক), স্বামী নিগমানন্দ, নাগনাথ প্রমুখ অনশনে প্রাণ দিয়েছেন যাতে গঙ্গার উৎস এলাকা শিল্প-মুক্ত থাকে। মাতৃসদনের স্বামী আত্মবোধানন্দ বিশাল অনশন করেছিলেন গঙ্গার উৎস অঞ্চলে অবৈধ নির্মাণ বন্ধ করার দাবিতে। লক্ষ্যণীয়, এঁদের মধ্যে বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদরাও ছিলেন। কিন্ত, এঁরা সরকারের কাছে গঙ্গা বাঁচানোর দাবি হিসেবে যে বিল এনেছেন, তার দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বিজ্ঞানীর নয়, তা ধর্ম ও সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরিবেশরক্ষা শুধু বিজ্ঞানের আবিষ্কার দিয়ে হতে পারে না, কারণ সেগুলোকে প্রয়োগ করছে মানুষের সমাজ। খেয়াল করলে দেখব, শুধু গঙ্গা বা হিমবাহবাহিত নদীগুলি নয়, বৃষ্টির জলের নদীও বিপন্ন হয়ে উঠেছে আজকের দিনে। নর্মদা সাতটা নদীর ধারায় পুষ্ট হত, এখন অমরকণ্টক ব্যতীত বাকি সব উপনদী হারিয়ে গেছে, মূলতঃ মানুষের হাতে নির্মাণকার্যের জন্য।
    আমরা দেখতে পাচ্ছি, পৃথিবীর পরিবেশ ও তার জীবজগতের যে যে বিপদ আজ ঘনিয়ে আসছে, তার সবই প্রযুক্তি ও তার ব্যবহারের সঙ্গে জড়িয়ে। দুঃখের বিষয়, মানুষ বাদে বাস্তুতন্ত্রের বাকি কোনও শরিকই এই প্রযুক্তি থেকে কোনও উপকার পায় না। ঠিক যেমন মানুষের সমাজের মধ্যে অর্থনীতির দিশাগুলি নির্ধারিত হয় উঁচুতলার মুষ্টিমেয় লোকের কথা ভেবে, অথচ তার ফল ভোগ করে এর সুফলের বাইরে থাকা বিশাল মানবগোষ্ঠী। এবং এটাও দেখার যে প্রযুক্তি বা তার রূপায়ণমূলক নীতি কোনওটাই আমি আপনি সচেতন ভাবে নিই নি। চটের থলির বদলে প্লাস্টীকের ব্যাগ ব্যবহার হবে, এ তো আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নয়। বাজারের নিয়ম আমাদের সচেতনতার ওপর জায়গা পেয়েছে বলেই এই দুরাবস্থা তৈরি হয়েছে। তাই, প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে বা পৃথিবীর মঙ্গলকামনায় ব্যবহার করতে হলে এর রাশ সচেতন ভাবে সমাজের হাতে আসা দরকার। যেরকম পরমাণু বোমা রাষ্ট্র বা সমাজের বিধিনিষেধে থাকে, সেরকমই বাকি প্রযুক্তি এবং তার ব্যবহারের উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কারণ, কার্বন দূষণ সম্ভবতঃ পরমাণু বোমার থেকেও বেশি ক্ষতি করে। নদীর প্রসঙ্গে আমরা বড় বাঁধগুলির কথা ভাবতে পারি। ছোট বাঁধ মানুষ ইতিহাসের প্রারম্ভ থেকে তৈরি করেছিল এবং মানুষের স্থানীয় সমাজ তার নিজস্ব চাহিদার কথা ভেবে ছোট বাঁধ, সেচব্যবস্থা ইত্যাদি বানাতো। কিন্তু, বড়ো বাঁধ বানানো শুরু হল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, যেখানে প্রথমেই অবহেলা করা হল স্থানীয় মানুষকে। স্থানীয় মানুষকে তার জায়গা জমি জঙ্গল ছেড়ে দিতে হল বড় বাঁধ বানানোর ফলে। আজকে আমরা জানি নদীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য, পলির পরিমাণ বাড়া, জীববৈচিত্র্য বিনাশ সবই বড় বাঁধের জন্য হয়। ১৯৯৩-এর লাতুর ভূমিকম্প, যার ফলে দশ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল বাঁধের জন্যে জলের ওজন ভূগর্ভস্থ পাত সরিয়ে ফেলার ফলে। দেখবেন, আজকের উন্নত দেশগুলি বড়বাঁধ বানানো প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। অথচ, বাঁধের জন্য স্বাধীন ভারতে ৪.৫ কোটির বেশি মানূষ উদ্বাস্তু হয়, তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র এবং আদিবাসী। এবং এই পর্যায়ে তাদের সম্মতি নেওয়া হয় নি। সেখানে ৪৭ এর দেশভাগে উদ্বাস্তু দেড় কোটি।
    আরও দুটো উদাহরণ দেব- একটি কিছু পুরোনো- উচ্চফলনশীল ধান। ভারত ভাতের ওপর নির্ভরশীল দেশ। চাল একটি জটিল বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এর সাথে নানা কিংবদন্তী জড়িয়ে, নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আচারের সময় একে প্রতীক ও সাক্ষী হিসাবে ব্যবহার করা হয়। যাকে নিয়ে এত মাতামাতি সে যে তার উৎপাদনের জন্য বিশেষ বিশেষ দক্ষতার উদ্ভব ঘটাবে সেটাই প্রত্যাশিত। এজন্যই আমরা তাক লাগানোর মতো বহুবিধ চাষের কৌশল দেখতে পাই, যেগুলির কয়েকটি এমনকি আজকের দিনেও ভারতীয় চাষীদের এবং কিছু আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক উচ্চ শ্রেণিতে স্থাপন করে। এদেশে প্রায় ১,২০,০০০ এর মতো ভিন্ন জাতের ধান ছিল, যেগুলি ছিল আলাদা আলাদা পরিবেশে অভিযোজিত এবং চাষীরা যাদের অভিব্যক্তি ঘটিয়েছিল আলাদা আলাদা প্রয়োজন মাথায় রেখেই। এই জাতগুলির সৃষ্টি হয়েছিল বৈচিত্র্যের প্রতি প্রকৃতির ঝোঁক এবং সহজাত বিজ্ঞানের যোগসূত্রে। বলাবাহুল্য আনুষ্ঠানিক অ্যাকাডেমিক বিজ্ঞানচর্চার কোনও অবদান সেগুলিতে ছিল না। কিন্তু দেখা গেল যে সরকার ও বাজার যখন সমাজ ও স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে ধান গবেষণা করল এবং তার ফল হল হাইব্রিড উচ্চফলনশীল ধান। রকফেলার ফাউন্ডেশনের এক আধিকারিকের ১৯৫৯ সালে লেখা নোটের ভিত্তিতে স্থাপিত হল ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সংক্ষেপে আইআরআরআই। ১৯৬৬ সাল নাগাদ আইআরআরআই তার প্রথম সাফল্য নিয়ে হাজির হলো। এটা ভালোভাবে লক্ষ্য করার বিষয়, যেখানে সিআরআরআই এর গবেষণার ন'টি লক্ষ্য ছিল, আইআরআরআই এর ছিল একটিমাত্র লক্ষ্য। ‘আইআর ৮’ ছিল একটি অর্ধ বামন ধানের জাত যা ইন্দোনেশীয় লম্বা ধানের চারা ও তাইওয়ানের বামন জাতের মধ্যে সংকরায়নের ফলে উৎপন্ন হয়। এই গাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো প্রচুর সার সহ্য করা এবং অধিক নাইট্রোজেন প্রয়োগে ঢলে না পড়ে উচ্চ ফলন দেওয়া (এর দ্বারা এশিয়ার প্রায় সর্বত্র মার্কিন সারের বাজার তৈরী হলো)। জল, সার ও কীটনাশক ছাড়া আইআর ৮ পুরনো ধান গুলির তুলনায় খুব একটা ভালো ফল করতে পারেনা। এর ফলে চাষ হয়ে গেল রাসায়নিক সার, ক্ষতিকর কীটনাশক এবং যন্ত্রচালিত সেচনির্ভর। ফলে চাষীর খরচ বাড়ল, জাতীয় অর্থনীতিকে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের জন্য বিদেশি পেট্রোপণ্যের উপর নির্ভর করতে হল এবং ভৌমজলের ক্ষতিসাধন হল শ্যালো পাম্পের মাধ্যমে। যথেষ্ট পর্যবেক্ষণ ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজের প্রচলন জিন-সম্পদের প্রভূত ক্ষতিসাধন করল, শত শত অমূল্য ঐতিহ্যমণ্ডিত ধান মানব সমাজ থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। আশির দশকে এসে আইআরআরআই পুরনো জাতগুলির প্রকৃত মূল্য স্বীকার করতে বাধ্য হল, কারণ নতুন নতুন পোকার হাত থেকে বাঁচার মতন অভিযোজন ঘটানোর ক্ষমতা এই হাইব্রিড ধানগুলির ছিল না। কী অদ্ভুত ঘটনাচক্র!
    এবার আসি আরেকটি আধুনিকতম প্রযুক্তি, ইন্টারনেটের প্রসঙ্গে- ইন্টারনেট আমাদের জীবনে অপার আশীর্বাদের মত বর্ষিত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় যেকোনো জায়গার যেকোনো তথ্য বস্তুত আমাদের নখদর্পণে বিম্বিত করছে ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের কাজগুলি আমাদের ফোন বা ল্যাপ্টপের বাইরে আর দুটি জায়গায় করা হয়। একটি হল নেট ওয়ার্ক সুইচ আর আরেকটি হল মূল কম্পিউটার বা সার্ভার। এই সার্ভার-কক্ষটিকে পোষাকি নামমে বলে ডেটাসেন্টার, সেখানে হাজার হাজার কম্পিউটার থাকে থাকে সাজানো থাকে। একটি কার্যনিয়ামক প্রোগ্রামের দ্বারা বিভিন্ন কাজ পৃথক পৃথক কম্পিউটারে ন্যাস্ত থাকে। একটি মাঝারি মানের ডেটাসেন্টার আনুমানিক ২৫০০০ পরিবারযুক্ত একটি শহরাঞ্চলের সমান বিদ্যুৎ ব্যায় করে। এবং সারা পৃথিবীতে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ার ফলে এই ডেটাসেন্টারের সংখ্যা ও তার বিদ্যুতের প্রয়োজন গুণিতকের হারে বেড়ে চলেছে। ডেটাসেন্টার, নেটওয়ার্ক এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রগুলি ২০৩০ সালে পৃথিবীর মোট বিদ্যুতের পাঁচভাগের একভাগ খরচ করবে বলে অনুমান। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে আমেরিকায় ইন্টারনেট-জনিত কার্বন-দূষণের যে পরিমাণ ছিল তা আর্জেন্টিনার সব শিল্প মিলিয়ে সামগ্রিক কার্বন-দূষণের সমতুল্য। সেইসময়ে ইন্টারনেট প্রযুক্তি শিশু অবস্থাইয় ছিল। ২০১৪-র পর থেকে সারা পৃথিবী মিলিয়ে ইন্টারনেটের বিদ্যুৎ চাহিদা বাকিসব ক্ষেত্রগুলিকে ছাপিয়ে গিয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই বছর থেকে বিনোদনের জন্য ইন্টারনেটের ব্যবহার বিশাল মাত্রায় বেড়ে যেতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি অনলাইন বিপণনও আছে। সব মিলিয়ে এক বিশাল এনার্জির মাসুল গুণতে হয়ে ইন্টারনেটকে আর আমরা ভাবি খুব সহজে ঘরে বসে অনেক কাজ হয়ে যাচ্ছে, আমরা অপ্রয়োজনেও অনেক ইন্টারনেট-সম্পৃক্ত বিনোদনে মাতি, এবং পরিবেশের উপর তার ক্ষতির দিকটা জানিই না।
    তাহলে কি প্রযুক্তিকে বর্জন করব? মানুষের ইতিহাস তো প্রযুক্তির ইতিহাস। আমাদের রান্না করা, চাষ করা, চাকা বানানো, আগুন জ্বালানো সবই প্রযুক্তি। প্রযুক্তি বাদ দিলে মনুষ্যত্বই থাকে না। কিন্তু, প্রযুক্তির একটা বিশেষ চেহারা আমরা আজকের দিনে দেখছি, যেটা সম্বন্ধে আমাদের সাবধান হতে হবে। ইন্টারনেট কতটা বিদ্যুৎ নেয়, এ সম্বন্ধে আমাদের যেরকম সম্যক ধারণা সচরাচর থাকে না, উচ্চফলনশীল ধান কীভাবে সাধারণ ধানের ক্ষতি করে, কীটনাশক কীভাবে ক্যান্সার বাড়ায় এই ধারণাগুলোও আমাদের নেই। অর্থাৎ, প্রযুক্তি যেভাবে আমাদের কাছে আসছে, তার অনেকটাই অস্বচ্ছ থাকছে এবং আমরা হঠাৎ করে বিনা আয়াসে কিছু সুবিধে পেয়ে যাচ্ছি বলে সেই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে নিচ্ছি। এবং, আর গ্রহণযোগ্যতা আমাদের সচেতন সিদ্ধান্তের উপর থাকছে না। বরং বাজার বা অর্থনীতির উপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা হচ্ছে তার উপকারের দিক ভেবে নয় বরং অর্থনীতির নিয়ম মেনে, লাভের অংক কষে। কিন্তু, বাজারের নিয়মে ছেড়ে রাখলে পরিবেশবান্ধব পাটশিল্প ধ্বংস হয়ে প্লাস্টিক ছেয়ে যাবে। তাই, আমাদের ভাবতে হবে প্রযুক্তির প্রশ্নে সমাজের ভূমিকা কী হবে? সমাজের সচেতন সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে প্রযুক্তির প্রয়োগ বেশিদিন পৃথিবীতে চলতে পারে না। এরকম অর্থনীতি যদি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে রিসেশন না হলে কার্বন ফুটপ্রিন্ট বেড়ে চলে, তাহলে সর্বনাশ। আর একটা সর্বনাশের দিক হল পেটেন্ট বা মেধাস্বত্বের নামে প্রযুক্তির মূল ধাপগুলিকে আড়াল করে রাখা। এর ফলে সেই প্রযুক্তি দীর্ভমেয়াদি অর্থে ভালো কি মন্দ তাই আমরা জানতে পারি না। এবং আমরা উন্নত সভ্যতার বাসিন্দা হিসেবে প্রযুক্তির অধিকারী হই না, শুধুমাত্র তার ব্যবহারকারী হয়ে থাকি। মানুষের ইতিহাসের আর কোনওধাপে তার এই দুরবস্থা হয় নি সে প্রযুক্তির সে অধিকারী নয়, শুধুমাত্র তার ব্যবহার করে কিন্তু আর কোনও ধারণা তার নেই।

    আরও একবার একটু মানবকল্যাণের কথায় আসি। এটা নিশ্চিত যে প্রযুক্তিগুলি অনেক সমস্যা আশু সমাধান করেছে, এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নীত করেছে। দারিদ্র্যসীমার উপরে অনেক মানুষ উঠে এসেছেন। কিন্তু এর মধ্যে একটা গলতা আছে, আগে দারিদ্র্যসীমা নির্ধারিত হত কত প্রোটিন খেতে পারছে সেই হিসেবে, এখন ভোগ্যপণ্য কতটা কিনতে পারে তার হিসেবে হয়- তার মধ্যে পুষ্টির পরিমাপ একমাত্র আর থাকে না। ফলে দেখা যাচ্ছে ক্ষুধা-সূচকে, পরিপূর্ণ আহার পায়না, এরকম মানুষের সংখ্যা এদেশে কমেনি, অন্তত ১/৩ ভাগ মানুষ সেই নিরিখে পিছিয়ে। এর উপর যেটা খুব আশংকার মতন বেড়েছে সেটা হল বৈষম্য। বৈষম্যের যে ইন্ডেক্স, গিনি কোএফিসিয়েন্ট, ৯৪ সালের পর থেকে ভারতে ভীষণ দ্রুত বাড়ছে। এবং গ্রামীণ ভারতেও বাড়ছে। চিন সবার ওপরে এইখানে। এর ফলে কী হয়, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অধিকারে একজনের শক্তি বাড়ে আরেকজনের অধিকার কমে। এবং একটা চক্রের মতন চলতে থাকে, এমন দাঁড়ায় যে প্রযুক্তির সুবিধে শুধু একটা বর্গ পায় আর ক্ষতি দুর্বলরা বেশি ওঠায়। একটা সময় অবধি এই তর্ক চলত যে পরিবেশের ক্ষতি হলেও গরিব মানুষের উপকার হতে পারে, কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে পরিবেশের ক্ষতি সবার আগে আর সবচেয়ে বেশি করে গরিব মানুষের ওপর পড়ে। সমুদ্রের জল বেড়ে যখন ভূমি গ্রাস করে নেয় সবচেয়ে আগে সম্বলহীন হয় গরিব মানুষই।
    আজকে পরিবেশের নিরিখে এটা বোঝা গেছে যে আমাদের গড় জীবনযাত্রার মান আমরা আর বাড়াতে পারি না, একমাত্র যেটা করার তা হল এটা কমানো। অর্থাৎ, এই মুহূর্তে যারা প্রযুক্তির সুফলগুলি পাচ্ছি তাদের জীবনযাত্রার মান অনেকটা কমিয়ে আনতে হবে এবং সেই নিচু তলায় প্রযুক্তির সুফলগুলি ছড়াতে হবে। তাই, আমাদের সেই সব প্রযুক্তিই নিতে হবে যা কেবলমাত্র এই বণ্টনে সাহায্য করে। এবং সেই প্রযুক্তিই বাছতে হবে যা বন্টিত হতে পারে। বাজারের লাভের হাতে এই ভার ছেড়ে রাখলে আমরা নিজেদের উত্তরপ্রজন্মকে আরও বিপন্ন করে তুলব।
    কিন্তু দূষণ একটা আন্তর্জাতিক ব্যাপার। সবচেয়ে বেশি দূষণ আসে চিন আর আমেরিকা থেকে। এই দেশগুলো থেকে আমরা আমদানি করি। আমাদের রপ্তানির থেকে অনেক বেশি বেড়েছে আমাদের আমদানি। আমরা এক বিরাট দেশের বিশাল সংখ্যক অধিবাসীর। আমরা যে বিরাট আমদানি করছি, তা যদি কমাই, তাহলেই বিশ্বের দূষণমূলক উৎপাদন কমবে, বিশ্ববাণিজ্যের গতি পাল্টাবে। তাই ক্রেতা আর ভোক্তা হিসেবে আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নান্যপন্থা।
    লক্ষ্যণীয়, প্লাস্টিক উৎপাদন, কার্বন দূষণ এবং পেট্রোলিয়াম উত্তোলন একটি বছর সারা পৃথিবীতে কমেছিল- সেটা হল ২০০৯, রিসেশনের বছর, অর্থাৎ মানুষের অর্থনীতি মার খেলে পৃথিবীর বাকি সব কিছুর জীবন সুস্থ থাকে। এইটা শিক্ষার। অর্থনীতিকে নিজের নিয়মে ছেড়ে দিলে, গ্রোথ আর কনজাম্পশনের গল্প থেকে না বেরোলে এই গ্রহকে আমরা শেষ করে ফেলব।
    কিন্তু এই কষ্ট আর এই সামান্য আত্মত্য্যাগের জায়গা না থাকলে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অন্যায় করব। আমরা নিজেরা কতটুকু সময়ের জন্য পৃথিবীতে আছি? ধরুন গুহায় থাকা আদিম মানুষ, তারা প্রায় কোনও উপকরণ ছাড়াই বেঁচে ছিল, আর সেইজন্য লক্ষবছর পরে আমরা এসেছি। আমাদের সামনে গঙ্গা-কাঁসাই-সুবর্ণরেখা ২০ বছরে শুকিয়ে যাবে? এবার প্রশ্ন এ কি সত্যিই ইতিহাসের উল্টোদিকে হাঁটা? অসম্ভব প্রকল্প? কিন্তু, আমরা দেখতে পাবো, আমাদের পূর্বমানুষরা দুই তিন প্রজন্ম আগেও এই পথ নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিরাট পর্যায় জুড়ে বিলিতি শিল্পদ্রব্য বয়কট করেছে দেশের মানুষ। স্থানীয় কুটির শিল্পে জীবন চালানোর পথ বেছে নিয়েই সম্ভবতঃ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড়ো গণ-আন্দোলন হয়েছিল। নিজের দেশের দরকারকে মাথায় রেখে নিজের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস বেছে নিয়েছিলেন আমাদের প্রপিতামহ-পিতামহরা। সেইরকমই সচেতন ভোক্তা হওয়া আজও আমাদের খুব দরকারের। নতুন প্রযুক্তির নাম করে যা যা কিছু আসছে তা কল্যাণকর কী না সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার আমাদের। এর জন্যে আমাদের সেই প্রযুক্তিকে বোঝা দরকার, খুবই দরকার। এবং সবচেয়ে বেশি দরকার মানুষের সমাজের সক্রিয় হওয়া, যে ব্যবসায়ীর মুনাফা বা রাজনৈতিক দলের কম্পালশনের বাইরে বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাববে, যে স্বার্থ শুধু আজকের নয় আগামীর, শুধু মানুষের নয়, বাকি পৃথিবীরও।
    এই আলোচনের শুরুতে যে স্বার্থত্যাগের কথা এসেছিল, সেইটাই সম্ভবতঃ আমাদের আজকের একমাত্র করণীয়, নিজের এইমুহূর্তের আরামটুকুকে বাদ দিয়ে একটা বৃহত্তর আঙ্গিকে ভেবে নিজের জীবনযাত্রা ঠিক করার। এবং সমাজের মধ্যে সেই চেতনা নিয়ে যাওয়ার যাতে সার্বিকভাবে আমরা নিজের গোষ্ঠীর স্বার্থের বাইরে উঠে পৃথিবীর কথা ভাবতে পারি। কারণ পৃথিবীর বাকি সক্কলের বেঁচে থাকাটা আমাদের বেঁচে থাকার জন্যেই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
    (খড়গপুর বইমেলা স্মারক সংখ্যায় প্রকাশিত)
  • বিভাগ : ব্লগ | ১০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩৬ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • করোনা ভাইরাস

  • গুরুর মোবাইল অ্যাপ চান? খুব সহজ, অ্যাপ ডাউনলোড/ইনস্টল কিস্যু করার দরকার নেই । ফোনের ব্রাউজারে সাইট খুলুন, Add to Home Screen করুন, ইন্সট্রাকশন ফলো করুন, অ্যাপ-এর আইকন তৈরী হবে । খেয়াল রাখবেন, গুরুর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে গুরুতে লগইন করা বাঞ্ছনীয়।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত